পালাবেন না, প্লীজ!

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ২৩/০৭/২০১৭ - ৮:৫৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইদানীং ঘুম ভাঙলে অয়ন খুব আগ্রহ নিয়ে ঘরের সিলিং আর পর্দার ফাঁক গলে আলো আসা খোলা বারান্দার দিকে লোভাতুর হয়ে তাকিয়ে থাকে। খুব আপন মনে হয় সিলিংটাকে। যে ভীষণ যন্ত্রণা আর অস্থিরতায় তখন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে সে, তাতে মনে হয় ঐ সিলিঙের বন্ধনে ঝুলে পড়ে আয়েশে দুলতে থাকলে একটু শান্তি মিলবে। কিংবা উঁচু বারান্দা থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় যে ক্ষণিকের মুক্তি মিলবে চিরমুক্তির আগে সেটাই বা কম কী! নিজের মৃত্যুদৃশ্যের এইসব সুখকল্পনা অয়নকে একটু স্বস্তি দেয়, তার মনে হয় সমাধান তো তার হাতেই আছে, আর কী ভয়!
অয়ন বিছানায় পড়েই থাকে। সময়ের আর কাজের হিসাব ভুলে গিয়ে মিশে রয় বিছানার সাথে। আচ্ছন্নের মত চিন্তার রাজ্যে এদিক সেদিক ঘুরে সে আবার নির্জীব হয়ে থাকে আগের মতই। দিন যেতে থাকে, ভীতু অয়ন একটু একটু করে সাহসী হয়ে ওঠে। সিলিং কিংবা খোলা বারান্দা আরও আপন হয়ে আসে। যে চিন্তাগুলো এতদিন শুধু কল্পনাতেই শান্তি দিত, সেগুলো ইদানীং বাস্তবরূপও পেতে চায়। শুধু মৃত্যুচিন্তায় অয়নের এখন আর স্বস্তি মেলে না, সে চায় আসল মৃত্যু। জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মত কোনও আকর্ষণ, কোনও মায়া, কোনও আশা আর তাকে ঘিরে রাখতে পারে না। এমনই এক সময়ে অয়ন সাহসী হয়ে গেল একদিন, এতদিন ধরে চালিয়ে আসা যুদ্ধে নিজেকে পরাজিত ধরে নিয়ে, নিজের বুদ্ধি, জ্ঞান, ভালোবাসার চরম অপচয় করে সে জীবনকে টা টা গুড বাই বলে ফেলল।

কাছের কয়েকজন দু’দিন হা হুতাশ করল। ফেসবুকে সবাই ভাসিয়ে দিল আক্ষেপ আর দুঃখের ইমো দিয়ে। লাইকের জমজমাট অবস্থা। যাদের কিছুটা সান্নিধ্য বা দায়িত্বশীল সাপোর্ট হয়ত অয়নকে আরও কিছুদূর এগোতে দিত, তারাই এসে দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে পরমুহূর্তে ট্রল পেজে হেসে গড়াগড়ি দিল। বন্ধুদের আড্ডায় কিছুদিন ওর কথা উঠলে কিছুক্ষণ সবাই একটু অস্বস্তির সাথে চুপচাপ থেকে আবার দ্রুত অন্য টপিকে চলে গেল, যাদের খুব কাছের ভাবত তারাও একবারমাত্র শোকপ্রকাশ করে পরক্ষণেই চিরাচরিত হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠল অন্যকারো সাথে, শুধু অয়নের পরিবারটা অস্বাভাবিক হয়ে গেল বেশখানিকটা। কারণ পরিবারগুলো গড়েই ওঠে সন্তানকে কেন্দ্র করে। অন্য সবকিছু আগের মতই চলতে থাকল, জীবন কি থেমে থাকে? যে বিষয়গুলোকে এত গুরুত্ব দিয়ে, যাদেরকে এত গুরুত্ব দিয়ে অয়ন নিজের মধ্যে শেষ হয়ে যেত, যন্ত্রণায় ছটফট করত, সেই বিষয়গুলো বা মানুষগুলোর কোনও অর্থ বা দাম কিছুই থাকল না কারণ অয়নই তো নেই। অয়নের প্রিয় ঘরে, প্রিয় জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়াতে থাকল নতুন মানুষেরা, অয়ন যেখানে বসে সুখের স্বর্গে ভাসত, সেখানে এখন নতুন মানুষেরা একই স্বর্গে ভাসে, যে বাসে ঝুলতে ঝুলতে অয়ন আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে আসা যাওয়া করত, সেখানে এখনও মানুষ ঝুলতে ঝুলতে স্বপ্ন দেখে। শুধু অয়ন নেই, এই বিপুল পৃথিবীতে অয়নের আর কোনও জায়গা নেই। কিন্তু অন্য কোনও ঘরে, অন্য কোনও অয়ন একইভাবে তাকানো শিখছে সিলিং এর দিকে, কিংবা খোলা বারান্দা থেকে নীচের দিকে। মানুষ হারিয়ে যায়, ডিপ্রেশন হারায় না।

ডিপ্রেশন হারায় না কারণ আমরা তাকে চিনে ওঠার আগেই, সাবধান হওয়ার আগেই সে আমাদের গ্রাস করে ফেলে, আমাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আমরা তখন দূর্বল হয়ে নিজেরা যুদ্ধ চালাই ঠিকই কিন্তু অধিকাংশক্ষেত্রেই সেই একলা যুদ্ধে আমরা তেমন সুবিধা করে উঠতে পারি না। তখন বাইরের সাপোর্ট পেলে খুব ভাল, নিজের মানসিক দৃঢ়তা শক্তিশালী হলেও কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যায়, কিংবা সেরে ওঠা যায় এমন কিছু ঘটলে যা কিনা জীবনযাত্রার গতিপথই বদলে দিতে পারে। এর কোনটাই না ঘটলে দিন দিন আরও নীচে নামা ছাড়া আর গতি থাকে না।

ডিপ্রেশন একটা মানুষকে ধ্বংস করে দেয় ভেতর থেকে। বাইরে থেকে অনেকসময় বোঝা যায়, বেশীরভাগ সময়ই বোঝা যায় না বা কেউ তেমন খেয়াল করে না। অত সময়ই বা কার ঘুরে দেখার, যার যার জীবনে ব্যস্ত সবাই। ডিপ্রেশনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, একজন মানুষ কেন ডিপ্রেশনে ভুগছে বা কী ধরণের অনুভুতি বা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্য কাউকে ঠিকঠাক বুঝিয়ে বলতে পারে না। নিজের ভেতরে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউ একটু উত্তাপও বুঝতে পারছে না, এই যখন অবস্থা হয় তখন যে মানুষটা ডিপ্রেশনে ভুগছে সে নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয়, সে মনে করে এটা একান্তই তার নিজের সমস্যা এবং সে নিজেই মনে হয় এই সমস্যার পিছনে অনেকটা দায়ী। তার নিজের ভেতর একটা হীনমন্যতা জন্ম নেয় যেটা তাকে মিশিয়ে দেয় মাটির সাথে।

ডিপ্রেশনে পড়লে মানুষের সব ভাল বিষয়গুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে থাকে ভেতর থেকে। উদ্যোম, আশা, স্বপ্ন, ভালোবাসার মত বিমূর্ত ব্যাপারগুলো তো বটেই, অন্য প্র্যাকটিক্যাল বিষয়গুলোও চরম নেগেটিভভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সবার প্রথমে আসে ঘুম। রাতে ঘুমাতে গেলে দুনিয়ার নেতিবাচক চিন্তা এমনভাবে মানুষটাকে ঘিরে ধরে যে সে ছটফট করতে থাকে এপাশ ওপাশ, ঘুমাতে পারে না। এই যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পেতে অনেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়াই বাদ দিয়ে দেয়। শরীর নিতান্তই ক্লান্ত হয়ে পড়লে যে আচ্ছন্নের মত ঘুমটা আসে সেটাই তখন সম্বল। আবার একবার ঘুমিয়ে পড়লে ঘুম ভেঙে বিছানা থেকে ওঠাও বেশ কঠিন হয়ে যায়। মানুষটার মনে হয়, “কী হবে উঠে! কী আছে করার! কেন করব, কার জন্য করব!” এই চিন্তা থেকে সে পড়ে থাকতে চায় অনন্তকাল ধরে ওই এক বিছানায়। এই অবস্থায় প্রোডাক্টিভিটি একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ঘুমের পরেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় শখ বা ভালো লাগার বিষয়গুলো। মানুষটা আগে যে যে কাজগুলো করে একটু রিলিফ পেত, একটু আনন্দ পেত সেগুলো আর আগের মত থাকে না। সবচেয়ে প্রিয় কাজটাও তখন অর্থহীন মনে হয়, শখের জিনিসগুলোয় আর হাত ছোঁয়াতেও ইচ্ছা করে না। ডিপ্রেশন খুব চালাক শত্রু, যে ব্যাপারগুলো ডিপ্রেশন কাটাতে সাহায্য করতে পারে, সেই জায়গাগুলোই আগে নষ্ট করে দেয়। মানুষের আর রিলিফ পাওয়ার জায়গাটা রাখে না।

ডিপ্রেশনে পড়া যত সহজ, সেখান থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসা ততটাই কঠিন। সবচেয়ে আগে দরকার হল বুঝতে পারা যে ডিপ্রেশন আছে এবং এটাকে প্র্যাক্টিক্যালি নিয়ে এটাকে দূর করার চেষ্টা করা। প্রথম প্রথম নিজে নিজেই চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন মনকে নতুন নতুন কিছুতে ব্যস্ত রাখা যাতে ডিপ্রেশন সময় করেই উঠতে না পারে। এটা হতে পারে প্রচুর ঘোরাঘুরি, একা বা দলবেঁধে কোথাও ঘুরে আসা সময় পেলেই। এটার নাম আমি দিয়েছি, “ছুটতে থাকা, বাঁচতে থাকা”। এতে পথ ও প্রকৃতির প্রতি একটা টান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা জাগে, নতুন নতুন জায়গা দেখার নেশা জাগতে পারে, তখন ডিপ্রেশন অন্তত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে না। আবার আরেকটা আছে, “শিখতে থাকা, বাঁচতে থাকা।” এখানে মানুষকে নতুন নতুন জিনিসের উপর আগ্রহ তৈরি করে তাতে সময় দিতে হয়। যেহেতু আগের ভাললাগার বিষয়গুলো বা শখের বিষয়গুলো আর আগের মত থাকে না তাই নতুন নতুন কিছু খুঁজে বের করতে হয়। যেমন, কোনও একটা স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স করা (এখানে আরেকটা বাড়তি সুবিধা হল, নতুন কোথাও ভর্তি হলে নতুন নতুন মানুষ ও পরিবেশের সাথে পরিচয় ঘটে যেটা ডিপ্রেশন কাটানোর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।), নতুন কোনও ভাষা শেখা, ফটোগ্রাফিতে ঝুঁকে পড়া, মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট শিখতে শুরু করা, জিমে গিয়ে বডি শেপের দিকে নজর দেওয়া ইত্যাদি। এই শেখার ব্যাপারগুলো হতে হয় খুব প্র্যাক্টিক্যাল যেন নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে চলে শিখতে থাকা যায়। নতুন নতুন বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করতে গেলে কয়েকটা বিষয় ডিপ্রেশনে খুব বেশী সাহায্য করতে পারে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে নাজুক অবস্থা তৈরি করতে পারে। এগুলো হল, কথাসাহিত্য, কবিতা, গান, দর্শন, উন্নত চলচ্চিত্র, বা মননশীলতার সাথে খুব ঘনিষ্ট এমন কিছু। এই উপমহাদেশের শিল্প-সাহিত্য কেন জানি দুঃখবিলাসী, হাহাকারজাগানিয়া। এগুলো ডিপ্রেশনে পড়া মানুষকে আরও জীবনবিমুখ করে তুলতে পারে, আরও উদাসীন করে তুলতে পারে এবং বাস্তব জীবন থেকে একটা দূরত্ব তৈরি করে দিতে পারে। ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষের জন্য নিজস্ব ফ্যান্টাসির জগৎ কিছুটা ঝুঁকির সৃষ্টি করে কারণ ঐ ফ্যান্টাসির জগতেই তৈরি হয় ডেথ ফ্যান্টাসি বা মৃত্যুবিলাস।

নিজে থেকে নেওয়া এইসব ব্যবস্থা বেশ ভালোই কাজে দেয় সাধারণত, যদি না সমস্যা খুব গুরুতর আর গভীরে প্রোথিত হয়। আমি নিজে ডিপ্রেশনের এক চরম পর্যায়ে নিজে থেকেই গীটার কিনে নিজেই শিখতে শুরু করেছিলাম কারণ আমার আগের শখগুলো বা ভালোলাগার ব্যাপারগুলো কোনও কাজেই আসছিল না। বইপাগল আমার বইপড়ার অভ্যাস, আমার প্যাশনের জায়গা লেখালেখি, স্বপ্নের জায়গা আঁকাআকি, আনন্দের জায়গা গান গাওয়া, সবই হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই নতুন কিছু শেখা শুরু করলাম। যে আমি কখনও বাড়ির বাইরে দূরে কোথাও যাইনি আগে সেই আমিই জেদ ধরে প্রায় একা গিয়ে হিমালয়ের বরফ ছুঁয়ে আসলাম, পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আসলাম, শান্তিনিকেতনে বাউল গান শুনে আসলাম, ভোরের সূর্যে তাজমহল দেখে আসলাম। তারপর থেকে আমাকে পেয়ে বসল পথের নেশায়, ঘোরার নেশায়, আমি ছুটে বেড়াতে থাকলাম এখান থেকে ওখানে। আমি ডিপ্রেশনকে হারিয়ে দিতে পারলাম অনেকখানি, তবে পুরোপুরি নয়।

ঠিক এই জায়গাতেই ব্যবহার করতে হয় সর্বশেষ মোক্ষম ওষুধ, সেটা হল প্রফেশনাল কারো হেল্প নেওয়া। সেটা হতে পারে কাউন্সিলর কিংবা সাইকিয়াট্রিস্ট। আমার সেকেণ্ড ইয়ারে যখন আমি ডিপ্রেশনে বন্দী প্রায়, তখনই আমার টিচার আমাকে কাউন্সিলিং এর জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, আমি কিন্তু যাইনি। বেশীরভাগ ডিপ্রেশনে পড়া মানুষ এর থেকে সহজে বের হতে পারে না তার প্রধান একটা কারণ হল এটাই, তারা কারো কাছে যায় না। আমি তখন যদি কাউন্সিলরের কাছে যেতাম, তাহলে হয়ত অত ভয়াবহভাবে ডিপ্রেশনের শিকার হতাম না। ডিপ্রেশনে পড়া মানুষ প্রায় সময়ই ধরে নেয় যে কারো কাছে গিয়ে কোনও লাভ নেই, কেউ তার সমস্যা বুঝবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এর একটা কারণ ডিপ্রেশনের কারণ বা ধরণ সম্পর্কে নিজের কাছে পরিষ্কার ধারণা না থাকা। যেন অদৃশ্য এক শত্রু, যার অস্তিত্ব প্রমাণ করা কঠিন কিন্তু যার আঘাত এড়ানো প্রায় অসম্ভব। কেউ কেউ নিজের কাছেও সঙ্কোচে থাকে, মনে মনে ভাবে যে সে কি “পাগল” নাকি যে “পাগলের” ডাক্তারের কাছে যাবে! হ্যাঁ, সমাজের একটা বড় অংশের এটাই ধারণা কাউন্সিলিং কিংবা সাইকিয়াট্রিস্ট সম্পর্কে। অথচ দিনের পর দিন মানুষ মরে যাচ্ছে, এদিকে সেদিকে সুইসাইডের ছড়াছড়ি, চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষ তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই!

জীবন খুব বড় একটা জিনিস, আর একমাত্র সুযোগ। এর আগে বা পরে যাই থাকুক সেটা জীবন নয়। এই পৃথিবীতে নিজের পরিবেশ বা নিজের প্রেক্ষাপটের বাইরেও অনেককিছু পড়ে আছে। জীবনকে সাজানোরও হাজারটা উপায় বের করা যায়। কী হয়েছে আপনার? বেঁচে থাকার কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন না? তাহলে একে শেষ করার আগে একবার মরিয়া হয়ে অন্যভাবে একটু চলে দেখুন না, আপনার তো হারানোর কিছু নেই। ক্যারিয়ার নেই? ভবিষ্যতে কোনও পথ পাচ্ছেন না? নিজেকে যেভাবে দেখতে চেয়েছিলেন তার কিছুই হচ্ছে না? যার সান্নিধ্যে একসময় স্বর্গ নেমে আসত, সেই প্রিয়মুখ এখন অন্যের বিছানা ভাগ করে? যে স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলেন সংসার সেখানে নরক নেমে এসেছে? আপনার কোথাও যাওয়ার নেই? কাউকে কিচ্ছু বলার নেই? ভুল, ভুল, এবং ভুল।

ক্যারিয়ার আপনাকে টানার জন্য, আপনি ক্যারিয়ারকে টানার জন্য নন। যারা আপনাকে নিয়ে কথা বলে বা যারা আপনাকে নিয়ে চিন্তা করছে বলে আপনি ভাবছেন, বিশ্বাস করুন তাদের চিন্তায় আপনি নেই, বা আপনার কিছুতে তাদের কিছু যায় আসে না। আপনি যাদের এত গুরুত্ব দিয়ে নিজে শেষ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের কাছে আপনার জন্য চিন্তা করার মত সময় আছে কিনা ভেবে দেখুন। যদি না থাকে, তাহলে কী আসে যায় অমন মানুষে বা তাদের জাজমেন্টাল রিমার্কস দিয়ে? নিজেকে যেভাবে দেখতে চেয়েছিলেন সেটাই একমাত্র রূপ? মেকাপ কি একরকমের হয়? ভিন্ন ভিন্ন মেকাপে কি একই মানুষকে সুন্দর লাগে না? নিজেকে সাজান অন্যভাবে, নিজেই মুগ্ধ হবেন। যে প্রিয়মুখ আজ দূরে গিয়ে তার নিজের জীবন সাজিয়ে নিয়েছে, সে যদি আনন্দে থাকে আপনিও কি পারেন না আনন্দ খুঁজে নিতে? তার জায়গা অন্য কাউকে দিতে পারছেন না? তার সাথে জীবনের অভ্যাসগুলো একদম জড়িয়ে ছিল, তাই শূন্যতায় মারা যাচ্ছেন? নিজেকে ভাগ করুন ভিন্ন ভিন্ন অংশে। নিজের ক্রিয়েটিভ দিকগুলোর চর্চা করুন, তাতে শক্তি পাবেন। যখন আবার স্থির হবেন তখন শূন্যস্থান পূরণ হবেই কোনও না কোনও ভাবে। পরিবার এখন নরকের অন্য নাম? যার সাথে এক বিছানায় রাত কাটাচ্ছেন তার কদর্য রূপটা দেখা হয়ে গেছে? কিন্তু দিশেহারা হয়ে কোথাও যেতে পারছেন না? প্লীজ, প্লীজ, আপনার সমাজ, পরিবেশ, এমনকি বাবা-মা’র স্বস্তির থেকেও বড় আপনার বেঁচে থাকা। সমাজ আপনার দিকে আঙুল তুললে, পালটা তাকে অগ্রাহ্য করুন, আপনি বিদায় নিলে সমাজ এসে আপনাকে আরেকটা সুযোগ, আরেকটা জীবন দেবে না।

অয়ন পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল, পারেনি। সে পালিয়ে মরেছে আসলে। ডিপ্রেশনের থেকে বাঁচতে চাইলে এর থেকে পালাতে চাইলে কাজ হয় না, কারণ এই ভয়াবহ শত্রুর বাস ভেতরে, একদম নিজের ভেতরে। কোথায় আছে পালানোর জায়গা? অয়ন যদি একটু অন্যভাবে দেখত জীবনটাকে, যদি একটু সাহায্য পেত, যদি একজনও থাকত তাকে তুলে ধরার তাহলে অয়ন এভাবে পালিয়ে হারত না, অন্যভাবে হলেও বাঁচত। ঘরে ঘরে আজ অয়ন এবং আরও হাজারজনের প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে ডিপ্রেশনের রূপ ধরে। সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি বাঁচবেন নাকি পালিয়ে মরবেন।

-সীমান্ত রায়
https://www.facebook.com/sumuraay


মন্তব্য

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সমস্যা হলে একটা বিষয় পরিষ্কার হতে হবে। তাকে কি clinical psychologist-এর কাছে যেতে হবে নাকি psychiatrist-এর কাছে যেতে হবে। সমস্যাটা হয়তো একজন বিষয়সংশ্লিষ্ট counsellor-ই সমাধান করতে পারবেন।

এই ঠিক জায়গায় যাবার ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভুল জায়গায় গেলে খুব কম জনই বলেন, "আপনার সমস্যাটি তো আমার বিষয়সংশ্লিষ্ট না, আপনি অমুক বিশেষজ্ঞের কাছে যান"।

লু**মিল খাওয়া সব সমস্যার সমাধান নয়। অথচ বেশ নামডাকওয়ালা বিষয় বিশেষজ্ঞকে দেখেছি রোগী নির্বিশেষে সবাইকে লু**মিল দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা যাবো কোথায়!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

আমি যেটুকু জানি -
সামাজিক / পারিবারিক / পেশাগত ম্যালএডজাস্টমেন্ট বা অন্য কোন কারনে হাল্কা-পাতলা ডিপ্রেশন হলে কাউন্সেলিং সাইকলজিস্টই হয়তো যথেষ্ঠ। সমস্যা গুরুতর বোধ করলে ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট। সমস্যার কোন গুরুত্ত্বপূর্ণ শারীরিক সিম্পটম থাকলে বা ক্রসওভার হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা অন্য কারনে মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঔষধের ভূমিকা গুরুত্ত্বপূর্ণ বা মূখ্য হয়ে উঠলে - সাইকিয়াট্রিস্ট।

****************************************

শিশিরকণা এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ এই লেখাটির জন্য। ডিপ্রেশন এক ভয়ানক রোগ। যেখানে সুস্থ হয়ে উঠবার ইচ্ছেটাই মারা যায় সবার আগে।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

মেঘলা মানুষ এর ছবি

খুব দরকারী একটা বিষয় নিয়ে লিখেছেন। আমাদের সমাজে বিষণ্ণ‌তা জিনিষটাকে অন্যভাবে দেখা হয়। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত বন্ধু পরিণত হয় ঠাট্টার বিষয়ে, "দু'বেলা না খেতে পারলে বিষণ্ণতা চলে যাবে"। আসলেই যে মনের অসুখ করতে পারে, জীবনের রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ সবকিছু অর্থহীন লাগতে পারে -সেটা আমরা অনেকেই বুঝি না।

একটা জিনিস, বাইরের দেশে বিষণ্ণতার চিকিৎসা অনেকেই নেন, তাদের কি অবস্থা? পরে যদি কখনো ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হয়, ভবিষ্যতে কি তাদের নিয়োগকর্তা এই চিকিৎসাগ্রহণকারীদের অযোগ্য ঘোষণা করতে পারেন?

আমদের সমাজে ডিপ্রেশন বিষয়ে খুব একটা সচেতনতা তো নেই‌ই। অনেক আডে সিবা-গাইগি বিজ্ঞাপন দেখাতো, "বিষণ্ণতা একটি রোগ" -এবিষয়ে তারপর আর কোন অগ্রগতি হয়েছে কি?

শুভেচ্ছা হাসি

মন মাঝি এর ছবি

ডিপ্রেশন নিয়ে সচল সবজান্তাও একটা চমৎকার পোস্ট দিয়েছিলেন এখানে - http://www.sachalayatan.com/sobjanta/54709

****************************************

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA