নগরী ঢাকা ৪

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শনি, ০৮/০৮/২০২০ - ৩:৫৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া আজকের দিনের বড়সড় কোনো নগরীকেই আর বেশি দিন টিকিয়ে রাখা (সাস্টেইনেবল) বা নিদেনপক্ষে কার্যকর রাখা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন আর তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার এক নগর থেকে আর এক নগরের মাঝে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য, দরকার নগরের অভ্যন্তরে নাগরিকদের এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য দরকার নগরীর জ্বালানী (এ্যানার্জি) চাহিদা মেটানোর জন্য। নগরে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য। নাগরিকদের প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার জন্য। এমনকি এখনকার শহরগুলোর পার্ক, জলাশয় বা প্রাকৃতিক পরিবেশও প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল-পার্ক কিমবা ঢাকার হাতিল-ঝিলের কথা বলা যায়। কারণ এই জায়গাগুলোর স্বাভাবিক বাস্তু-সংস্থান (ইকো-সিস্টেম) অনেক আগেই বিঘ্নিত ক’রে ফেলা হয়েছে, কিমবা এই জায়গাগুলোকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই প্রাকৃতিক ভাবে জায়গাগুলো সেরকম নয়।
কিন্তু আধুনিক কালের প্রযুক্তি ব্যাপারটা যেন প্রেমিকার হৃদয়াবেগের থেকেও বেশি দ্রুত পরিবর্তনশীল। মান্ধাত্তার আমলের প্রযুক্তি ঠিক কতটা উপযোগী ছিলো জানি না। তবে সেসব প্রাযুক্তিক উপকরণগুলো বহুদিন টিকতো ব’লে একধরণের প্রচার আছে। টিকে থাকাটাই সাস্টেইন করা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে সূক্ষ্ণ (সফিস্টিকেটেড অর্থে) প্রযুক্তি-পণ্য বা আয়ুধ (টুল) দীর্ঘস্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। ফলে এই ধরণের পণ্যগুলো দ্রুত বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের উৎসে পরিণত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের তাই বেশ কিছু হ্যাপাও আছে। পরিত্যক্ত প্রযুক্তির ভার বহনের ক্ষমতাও আজকের দিনের শহরগুলোর তাই না থাকলেই নয়, অন্তত খানিকটা হলেও। সেক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার-প্রযুক্তি সহায়ক হ’তে পারে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের আর একটা বড়সড় জটিলতা হ’লো এটা চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, তা কিনে ফেলার পরও। (এটা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন আমার বাবা যিনি এখনো মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারেন না।) প্রযুক্তি-পণ্য ব্যবহারের জন্য অনেক সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। আবার দক্ষতাও এমন একটা জিনিস যা সবাইকে সমান ভাবে ধরা দেয় না। তবে আজকের দিনের শহরকে মোটামুটি কর্মক্ষম রাখার জন্য যে প্রযুক্তিগুলোর দরকার পড়ে তার ব্যবহার-প্রণালী শহরের সব নাগরিকের না জানলেও চলে। কিন্তু যাদেরকে এই ব্যাপারগুলো জানতেই হবে তাদের সংখ্যা আর দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শহরে গ’ড়ে তুলতে হয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বা ইনিস্টিটিউট।
এই একুশ শতকের কোনো একটা শহর বা নগরে যে পরিমাণ মানুষ গাদাগাদি হ’য়ে বসবাস করে প্রাকৃতিক (অর্গানিক অর্থে) ভাবে সেভাবে বসবাস করা যায় না। বিলেতিরা যখন ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশ ছেড়ে চ’লে গেলো তখন এই দেশের মানুষের গড় আয়ু ২৭/২৮ বছরের কাছাকাছি ছিলো। যদিও নারীপ্রতি সন্তান নেওয়ার হার এখনকার থেকে কয়েকগুণ বেশি ছিলো, তবুও দেশের মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিলো বেশ কম। তার একটা বড় কারণ এই নিম্ন গড় আয়ুর ব্যাপারটা। আবার প্রেক্ষিত আয়ুস্কাল কম থাকায় মানুষজনকে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরী আর বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্নে কম বয়সে সংসার শরু করা ছাড়া বিকল্প ছিলো না, যার সামাজিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে বাংলাদেশ আর ঢাকার মানুষের গড় আয়ু বেশ বেড়েছে। ঢাকার জন-ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে এর নাগরিকদের আয়ুস্কাল বৃদ্ধির বড় ভূমিকা আছে। আবার নাগরিকদের এই আয়ুস্কাল বৃদ্ধিতে শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানের দারুন কিছু কার্যক্রমের ভূমিকাও আছে। অদ্ভুত ভাবে ঢাকাতে এখন নারী-প্রতি সন্তান নেওয়ার হার দেশের সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি।
মোটাদাগে ব’লতে গেলে কারখানা বিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন) পর থেকে শহরের অবকাঠামো খাতে নানা ধরণের পরিবর্তন আনা গেছে ব’লেই আজকের দিনের শহরগুলোতে এতএত মানুষ এতটা ঘনবসতিতেও বেঁচে থেকে বসবাস করতে পারছে। আর সেই পরিবর্তনগুলো সম্ভব হয়েছিলো নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিস্কার আর তার ব্যববহার নিশ্চিত করতে পারার কারণেই। এক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে বিশ শতক পরবর্তী শহরের কাঠামোতে। নাগরিক জীবনে তো বটেই।
অর্থাৎ নগরীকে কার্যক্ষম রাখার জন্য আজকের দিনে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। আর সেই প্রযুক্তিকে সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন যথাযত প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। সিটি-কর্পোরেশন, ওয়াসা, পানি-উন্নয়ন বোর্ড, ডেসা, ডেসকো, পল্লী-বিদ্যুৎ, রাজউক, কেডিএ, সিডিএ, সিভিল-এ্যাভিয়েশন, মেট্রো সার্ভিস, সড়ক কর্পোরেশন ইত্যাকার নানা প্রতিষ্ঠান। আবার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করবে যে মানুষগুলো তাদের দক্ষতা তৈরীর জন্য প্রয়োজন নানা ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তোলা। এ এক বিপুল যজ্ঞ।
আজকের ঢাকা নগরীর জন্ম ১৯৪৭ এর আগে নয়, বাস্তবতার নিরিখে। ১৯৪৭ সালের পরে নানা স্থান থেকে যেভাবে ঢাকাতে মানুষ জড়ো হ’তে শুরু করে তার কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি ঢাকার ছিলো না, প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায়। ফলে ঢাকার বিভিন্ন বসতি কেন্দ্রগুলো বর্ধিত গ্রাম বা নিদেনপক্ষে ছোট শহরের চরিত্র নিয়ে বড় হ’তে থাকে পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত। বাজার, বিদ্যালয়, মসজিদ-মাদ্রাসা আর কিছু রাস্তাঘাট ছাড়া আর কোনো নাগরিক সুবিধা এইসব কেন্দ্রগুলোতে অনেক দিন পর্যন্ত গ’ড়ে ওঠেনি ব’ললেই চলে। এমন একটা শহরেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন মানুষের আগমন ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। কেন যে যায়নি তা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো (বিশ্ববিদ্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) খুব বেশি সমীক্ষাও হয়তো করেনি, অন্তত সাধারণের কাছে প্রকাশ যে করেনি তা বলা যায়। আর করেনি ব’লেই এই নগরীতে মানুষের আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি ব’লেই শহরের অনেক অবকাঠামো নিয়ে ন্যুনতম পরিকল্পনাও সাজানো যায়নি। জানি না দক্ষ মানুষের অভাব ছিলো কিনা। তবে নাগরিকদের ভেতরে এই শহরকে গ’ড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি ছিলো প্রকট। এখনো যে নেই তাও বলা যাবে না।
আশার কথা এই যে ঢাকার কাছে এর নাগরিকদের চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে যে কিছুকিছু সুবিধা বা সার্ভিস যদি গ’ড়ে তোলা না যায় তবে এই শহরের বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো এটা বুঝতে শুরু করেছে তাদের কাছে দুইটার বেশি বিকল্প আছে ব’লে মনে হয় না। হয় এই শহরের অনেকগুলো বর্তমান-সুবিধাকে উন্নত করতে হবে, কিছুকিছু নতুন ক’রে গ’ড়তেও হবে অথবা এই শহর থেকে পালাতে হবে। আমার চেনাজানা অনেকেই যে পালিয়ে গেছেন তা ব’লতে দ্বিধা নেই। আবার অনেককে দেখেছি উন্নত কোনো নগরের উন্নত কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন দক্ষতা শিখে এসেছেন। এখন চেষ্টা করছেন সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে সাহায্য করা যায় কিনা।
কিন্তু বুনিয়াদি একটা নগরকে আগামীর জন্য গ’ড়ে উঠতে সাহায্য করাটাও সহজ নয়। তাতে অনেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান/প্রথা/নায়কদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হয়। কিছু দিন আগে দেখলাম স্থপতি মোহম্মদ মাসুম ঢাকার শিশু-পার্কের পরিলেখ নিয়ে দারুন একটা প্রশ্ন করেছেন। শাহবাগের শিশু-পার্কটি যে জায়গাতে গ’ড়ে তোলা হ’য়েছে সেখানেই ছিলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মঞ্চ। যে স্থপতি শিশুপার্কের পরিলেখটি তৈরী করেছেন তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য-শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোধা ব্যক্তিদের একজন। অথচ তিনি তার করা সেই পরিলেখে ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চিহ্ন (সিম্বল) কে একদম এড়িয়ে গেছেন। এটা সচেতন ভাবে করা কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন। যদি সচেতন ভাবে করা হ’য়ে থাকে তবে তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন কিনা। আর যদি সচেতন ভাবে না করে থাকেন তবে শিক্ষক বা মেন্টর হিসেবে তার ভূমিকাকে যতটা সম্মান করা হয় ততটা সম্মান তার প্রাপ্য কিনা।
কখনো কখনো একজন মানুষও প্রতিষ্ঠান হ’য়ে উঠতে পারেন। শহরই তাদেরকে সেই সুযোগ ক’রে দেয়। কিন্তু তেমন প্রতিষ্ঠানকেও প্রশ্ন করতে হবে নির্দ্বিধায় যদি সামনের দিকে আগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকে। সম্প্রতি অনেকগুলো পত্রিকাকে দেখলাম ঢাকা-ওয়াসার গত এক যুগ/দশকের কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরণের প্রতিবেদন ছাপাতে। ঢাকার নাগরিকেরা তথা সরকার এই সময়কালে এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে কম খরচ করেনি। অথচ সেই অনুপাতে শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন-ব্যবস্থার উন্নতি খুবই হতাশার। অবশ্যই এখানে দায় আছে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মানুষগুলোর। কিন্তু সাথে এই প্রশ্নও তুলতে হবে কেন আমরা ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু প্রতিষ্ঠান গ’ড়ে তুলতে পারছি না। কি কি কাজ করলে তেমনটা করা সম্ভব হবে।
এই কাজগুলোর একটা নিশ্চিত ক’রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। শুধু নালা বা ড্রেন তৈরী আর মাঝেমাঝে সেগুলোকে সংস্কার করে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আর করা যাবে না। তার একটা বড় কারণ ঢাকার পুকুর আর জলাধারগুলোর পরিমাণ অনেক কমে যাওয়া। পুরোনো খালগুলো দখল বা সংকীর্ণ হ’য়ে যাওয়া। তার উপর ঢাকাতে আচ্ছাদিত স্থানের পরিমাণ গিয়েছে বেড়ে। ফলে বৃষ্টির পানি শোষণ করার মতো উন্মুক্ত জমিও গিয়েছে কমে। এই কারণে নালার উপর বাড়ছে অতিরিক্ত পানির চাপ। আবার নালার আয়তন বাড়ানোর উপায়ও একরকম নেই বললেই চলে। একারণেই প্রযুক্তির প্রসঙ্গ চ’লে আসছে। যান্ত্রিক পাম্প ব্যবহার ক’রে দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্প বসানোও হয়েছে। তবে সেগুলোকে সর্বোক্ষণ কর্মক্ষম রাখার মতো দক্ষ লোকবল রাখা হ’য়েছে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয় যান্ত্রিক পাম্পের ধারণক্ষমতা, যতটা পানি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃষ্টির ফলে জমে ততটা পানি কাঙ্ক্ষিত সময়ের ভেতরে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাম্পগুলোর আছে কিনা। দুঃখজনক ভাবে সবক্ষেত্রে শুধু পাম্প বা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান করা যাবে না। কখনো কখনো রিটেনসন পুকুরের দরকার পড়তে পারে। যেটা নিশ্চিত করতে শহর নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা করাটা খুবই দরকারী। যেটা করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান।
নিশ্চিত ভাবেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংকট আছে বাংলাদেশে। কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রামের মতো দ্রুত-বর্ধনশীল দুইটা বড়সড় নগরী থাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ঠিকই আছে। এই দুইটা নগর যদি কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরীতে এগিয়ে আসতে পারে তবে তা উপকারী হ’তে পারে দেশের মাঝারি মানের অন্য শহরগুলোর জন্যও।
এবার আসি যাতায়াত ব্যবস্থাতে প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। এখনো পুরান-ঢাকাতে ঘোড়ায়-টানা গাড়ি চ’লতে দেখা যায়। এটাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার আছে বটে, তবে সে প্রযুক্তি এর ভেতরেই প্রাচীন হ’য়ে গেছে। নগরের চৌহদ্দিও বেড়েছে। তাই সাইকেল-রিকশা আর ঘোড়ায়-টানা গাড়ির মতো বাহন দিয়ে আর কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই বাহনগুলো যে গন-পরিবহন হিসেবে শহরের কিছুকিছু এলাকাতে এখনো দারুন ভাবে কার্যকর সেটা খেয়াল রাখা দরকার। এই বাহনগুলোকে যান্ত্রিক বাহন দিয়ে প্রতিস্থাপনের সময় এসেছে। শুধুমাত্র সময়ের প্রভাবেই এরা প্রতিস্থাপিত হ’য়ে যাবে এটা ভাবা বোকামি হবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনি দিকনির্দেশনা। প্রয়োজন সার্বিক পরিকল্পিত প্রস্তুতি।
১৯৩৬ কিমবা ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে প্রথম সাইকেল-রিকশা আনা হয়। এর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ আমরা তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনিনি। মাত্র কয়েক বছর হ’লো তাতে যান্ত্রিক মোটর যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেও চীন থেকে আনা কিছু ব্যাটারি-পাওয়ারড রিকশা রাস্তাতে চ’লতে শুরু করার পর থেকে। আইনে বৈদ্যুতিন বাহনের অনুমতি এখনো নেই বিধায় এই রিকশাগুলোকে এখনো অননুমদিতই থাকতে হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যাতায়াত ব্যবস্থা বৈদ্যুতিন হওয়ার দিকেই আগাচ্ছে। সাধারণত শুরুতেই কোনো বিষয়ের আইনি কাঠামোটা দাড় করিয়ে নিতে পারলে তার প্রযুক্তি আত্মিকরণে তা সহায়ক হয়।
ঢাকার জন্য যে একটা কার্যকর মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গ’ড়ে তোলা দরকার সেটা এর নাগরিকেরা বহুদিন ধরেই টের পাচ্ছেন। দেরীতে হ’লেও কিছু কাজ শুরু হ’য়েছে। কিন্তু এর সমস্ত প্রযুক্তিই আমাদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সমস্ত ডিজাইন করিয়ে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। যেহেতু এমন প্রযুক্তি আমাদের নিজেদের আবিস্কার করা নয় সেহেতু শুরুতে আমদানি করা ছাড়া উপায়ও নেই খুব একটা। তবে দীর্ঘ-মেয়াদে চিন্তা করলে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসা সম্ভব ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতরেই। শুরু করা যেতে পারে কোচগুলোর নির্মাণ দিয়ে। ধীরে ধীরে অন্য ব্যাপারগুলোও। সেটা লাভজনক না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কারণ চাহিদা বাড়ছেই। আর এটা শুধু ঢাকাতেই আটকে থাকবে না। অন্য বড় শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। আর যেহেতু এটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় সেহেতু এটাকে কেন্দ্র ক’রে অনেক ধরণের প্রতিষ্ঠানই দাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও লাভবান হ’তে পারে এ থেকে।

টীকা:
১. রিটেনশন পুকুরের বাংলা হিসেবে ধারক-পুকুর লিখতে পারতাম হয়তো। রিটেনশন-পুকুর যেহেতু পানি শোষণ আর ধারণ একই সাথে করে তাই শুধু ধারক-পুকুরে সন্তুষ্ট হ’তে পারিনি। শোষণ আর ধারণকে যুক্ত ক’রে কোনো শব্দ বানাতে পারলে বোধ হয় ভালো হ’তো।
২. মাস-র‍্যাপিড ট্রানজিট : দ্রুত আর বহুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। জানি না কিভাবে ছোট ক’রে আনা যায়।
৩. ডিজাইন শব্দটাকে এখন আর নকশা-প্রণয়ন বলার পক্ষপাতি নই আমি। এটাকে চেয়ারের মতো গৃহীত বিদেশী শব্দ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
(রাজীব রহমান)


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

১. ডিটেনশন বেসিন (ড্রাই পণ্ড), রিটেনশন বেসিন (ওয়েট পণ্ড) আর ইনফিলট্রেশন বেসিনকে এক ছন্দে গেঁথে তিনটা বাংলা শব্দ পেলে ভালো হতো। ছাড়পুকুর (যেটা সাময়িকভাবে উদ্বৃত্ত পানি ধরে রেখে একটা সময় পর নিয়ন্ত্রিত হারে আবার ছেড়ে দেবে), ধরপুকুর (যেটা পানি সবসময় ধরবে, আর উদ্বৃত্ত পানির বেগ কমিয়ে মাটিক্ষয় ঠেকাবে; মানে মাটিও ধরে রাখতে সাহায্য করবে) আর শোষপুকুর (যেটা পানি শুষে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে পাঠাবে) বললে একটা আটপৌরে (কিন্তু প্রায় শিশুতোষ) ছন্দ আসে। তবে চিরগম্ভীর নগরনবিশরা ভুরু কোঁচকাতে পারেন।

২. ঢলচলন? 'ঢল' বললে একটা বড়সড় কিছু দ্রুত চলছে, সেটা বোঝানো সম্ভব।

৩. ডিজাইনের বেশ চমৎকার একটা বাংলা আছে, যেটা অভিধানে এবং কয়েক দশক পুরোনো লেখায় থাকলেও অনেকেই ব্যবহার করেন না, আলেখন। ডিজাইনার আলেখক। নকশা প্রণয়ন বা নকশা করাকে মাইকেল মধুসূদনের দেখানো পথে নামধাতুজ ক্রিয়াপদ হিসেবে নকশানো বলা যায় অনায়াসে (আমি একাধিকবার বিভিন্ন লেখায় পড়েছি, মাঝেমধ্যে নিজেও লিখছি)। চেয়ারেরও কয়েকটা বাংলা আগে প্রচলিত ছিলো (কিছু এখনও আছে), কিন্তু কেন আমরা এটাকে দশদিকে রটালাম, কে জানে?

অতিথি লেখক এর ছবি

ছাড়পুকুর, ধরপুকুর,শোষপুকুর শব্দগুলো ভালো লাগলো। বেশ যথাযত। ঢলচলন শব্দটা মজার লেগেছে। ট্রানজিট অর্থে চলন খুব মানানসই শব্দ। বড় ছুটির পরে যখন একসাথে অনেক মানুষ শহরে ফিরতে থাকে তখন শহরে মানুষের ঢল নেমেছে- এমনটা তো বলাই হয়। কাজ চলতে পারে এই শব্দটা দিয়ে। ধন্যবাদ।
(রাজীব)

হিমু এর ছবি

সাস্টেইনেবলের একটা গম্ভীর বাংলা বিকল্প হচ্ছে ভবিষ্যসহ (সাস্টেইনেবিলিটি ভবিষ্যসহতা)। টেকসই শব্দটা আটপৌরে বস্তুর জন্যে বেশি খাটে (এর বিশেষ্যরূপও নেই; ফারসি -সই প্রত্যয় দিয়ে শেষ হওয়া কোনো বিশেষণেরই নেই)।

অতিথি লেখক এর ছবি

সাস্টেইনেবল ব্যাপারটা আবার অনেকটা স্থানিক বা কনটেক্সটচুয়াল। যেমন য়ুরোপের বেশিরভাগ জায়গাতে ভবন বানালে আশা করা হয় তা যেন কয়েক শতাব্দী টিকে থাকে। পাথরের সহজলভ্যতা এই ভাবনাকে সাহয্যও করেছে। এমনকি য়ুরোপে এমন কিছু গাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় যাদের কাঠ দিয়ে বানানো ঘর বৈরী আবহাওয়াতেও অনেক দিন টিকতে পারে। অথচ বন্যাপ্রবণ, ভাঙনপ্রবণ জায়গাগুলোতে এমন ভবন বানানোর চিন্তা করাটাই সাস্টেইনেবিলিটির ধারণার সাথে যায় না। যমুনা নদীর চরে যেমন স্থায়ী অবকাঠামো না বানিয়ে হালকা আর সহজে খুলে ফেলা যায় এমন কিছুই বেশি যুক্তিযুক্ত। যমুনার অতিরিক্ত ভাঙনপ্রবণতা চরের মানুষদেরকে মূলত বাঁশ, টিন আর বাধাইয়ের জন্য বিশেষ ধরণের গুনা-তারের সাহায্যে তৈরী হালকা ঘর বানাতে শিখিয়েছে। যখন ভাঙন আসে তখন সেগুলোকে দ্রুত খুলে ফেলে নৌকাতে তুলে নেওয়া যায়। সেগুলো দিয়েই আবার অন্য চরে বা নদীর তীরে এসে ঘর বাধা যায়। এ্যাডাপটেবিলিটি এদেরকে সাস্টেইনেবল করেছে। টেকসই বা ভবিষ্যসহ দুটো শব্দই সাস্টেইনেবলিটির অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না। এটা একটা ভাবনার বিষয়। কারণ কোথাও সাস্টেইনেবিলিটির জন্য ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখাটা জরুরী, কোথাও আবার প্রকৃতির সাথে দ্রুত পচিয়ে-গলিয়ে মিশিয়ে ফেলাটা জরুরী।
তবে অর্থ যেটা বোঝানোর প্রয়োজন তার জন্য টেকসই আর ভবিষ্যসহ দুইটাই সম্ভবত ব্যবহার করা যায়।

হিমু এর ছবি

আমার কাছে বরাবরই টেকসইকে ডিউরেবলের বাংলা মনে হয়েছে। ভবিষ্যসহতা সরাসরি ডিউরেবিলিটির দিকে ইঙ্গিত করে না (মানে ডিউরেবল না হলেও ভবিষ্যসহ হতে পারে); আপনি যেমন বললেন, প্রয়োজনে প্রকৃতির সাথে বিলীন করে দিতে হতে পারে। এটা ভবিষ্যসহতার আওতায় পড়ে, কারণ আগামীর চাহিদা তা পূরণ করছে (ভবিষ্যতের মোকাবেলার উপযোগী); কিন্তু টেকসইয়ের আওতায় পড়ছে না। আর, যেটা বললাম, টেকসইয়ের বিশেষ্যরূপ নেই বলে "টেকা" ব্যবহার করে ডিউরেবিলিটির ভালো বাংলা দেখি না।

সাস্টেইনেবলকে টেকসই বলার কারণে সরকারি প্রচারে "মাতৃদুগ্ধপান টেকসই করা" গোছের আমলি বাংলা দেখতে হয়। "স্তন্যদানে প্রসূতিকে উৎসাহিত করা" বললেও চলতো।

অতিথি লেখক এর ছবি

টেকসই যে ডিউরেবল ব্যাপারটাকেই ঠিকঠাক বোঝায় সেটা আমারো মত। জানিনা ভালো বাংলা শব্দের অভাবে এটা সাস্টেইনেবলের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছিলো কিনা। কখনো কখনো মনে হয়েছে চলনসই হয়তো সাস্টেইনেবলের প্রতিশব্দ হ'তে পারে। সবকিছু মিলিয়ে যে পরিস্থিতিটা চ'লছে তাই চলনসই। তবে কোনো কিছু চলনসই হ'লেই সেটা যে তুলনামূলক বিচারে উপকারী হবে তা বলা যায় না। যেমন রবার্ট ভেঞ্চুরি বলেছেন, মূলধারার সবই/সবসময়ই সঠিক (মেইনস্ট্রিম ইজ অলওয়েজ রাইট)। কখনো কখনো হয়তো এটার সাথে একমত হওয়া যায়। কিন্তু সবসময় পারি না। তবে মেইনস্ট্রিম বা মূলধারার ভেতরে পরিস্থিতির সঠিক বর্ণনা যে থাকে তা মানি। এই মূলধারাটা চলনসই। তবে ভবিষ্যসহ হবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। সাস্টেইনেবল পরিকল্পনা চলনসই আর ভবিষ্যসহ দুইই হওয়া চাই, এটা বলতে পারি।
(রাজীব)

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আমার কাছে বরাবরই টেকসইকে ডিউরেবলের বাংলা মনে হয়েছে।

য়্যাকদম! চলুক

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

এক লহমা এর ছবি

চলুক
শাহবাগের আন্দোলনের দিনগুলোয় আমার সচলের সন্ধান পাওয়া। আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের অনেক কর্তাব্যক্তি সচলের লেখার খোঁজ রাখেন, এখানের লেখাগুলিকে গুরুত্ব দেন, মান্যতা দেন। কেন মনে হয়েছিল, জানিনা। মনে হওয়াটা সত্যি হলে দারুণ হয়।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের অনেক কর্তাব্যক্তি সচলের লেখার খোঁজ রাখেন, এখানের লেখাগুলিকে গুরুত্ব দেন, মান্যতা দেন। কেন মনে হয়েছিল, জানিনা। মনে হওয়াটা সত্যি হলে দারুণ হয়।

আমার এই ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। তবে সচলায়তনের (হয়তো অন্য কিছু ব্লগেরও) কোনো কোনো লেখা থেকে সময়ের কিছু প্রতিচ্ছবি নিশ্চয় পাওয়া যায়। কয়েক বছর আগেও সচলায়তনে অনেক বেশি লেখক লিখতেন সম্ভবত। সেই সব লেখকেরা কম লিখছেন কিনা জানি না, তবে সচলায়তনে যে এখন তুলনামূলকভাবে কম লেখা প্রকাশ হচ্ছে তা মনে হয়। লেখক হিসেবে প্রভাব রাখতে গেলে লিখে যেতেই হবে। আবার সেই সব লেখা প্রকাশও করতে হবে।
এই লেখা বা ভাবনার প্রকাশ নিয়ে জটিলতা বাধে নানা সময় আর পরিস্থিতিতে। সূর্য ঘোরে না পৃথিবী ঘোরে তাই নিয়েও তো এই পৃথিবীতে কম বিতণ্ডা হয়নি। যা হোক বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারটাও আবার বেশ হেয়ালির। স্থপতি বিজন বিহারী শর্মা সেই ১৯৭৪ সালেই ঢাকার রাস্তার জন্য ইউ-লুপ (বাংলা করা যায় কি এর?) কতটা কার্যকর হ'তে পারে তাই নিয়ে লিখেছেন। এমন কি জাতীয় দৈনিকেও তা প্রকাশ করেছেন। সবখানেই ড্রয়িং আর বর্ণনা সহ। আমাদের কর্তাব্যক্তিদের চোখে যে সেসব পড়েনি তা মনে হয় না। কিন্তু তারা ব্যবস্থা নেননি কখনোই। পরবর্তীতে আরো অনেকেই ইউ-লুপের কথা কর্তাব্যক্তিদের বলার চেষ্টা করেছেন। ঢাকা উত্তরের একসময়ের মেয়র আনিসুল হক যখন কিছু ইউ-লুপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেন তখন কর্তাব্যক্তিরা একজন সিএনজি চালককে সামনে আনলেন। যে সিএনজি চালক মনে করেন ঢাকার রাস্তাতে অনেকগুলো ইউ-লুপ করতে পারলে ঢাকার রাস্তার যানজট অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। এটা ক'রে কর্তাব্যক্তিরা যে কাকে উপহাস করেছিলেন তখন তা এখনো বুঝে উঠতে পারি না। নিজেদেরকে নাকি নগরবিদদেরকে? তবে নগরবিদেরা নিজেদের ভেতরে যে বলেছেন, অন্তত সিএনজি চালকের পরামর্শেও যদি কিছু ইউ-লুপ হয় ঢাকাতে তবু হোক, তা জানি।
কর্তাব্যক্তিরা যে কাকে কখন কতটা গুরুত্ব আর মান্যতা দেন তা এক দারুন হেয়ালি আমার কাছে। না হয় থাকলোই কিছু হেয়ালি!
(রাজীব)

হিমু এর ছবি

বিজনবিহারী শর্মার ঐ প্রবন্ধটি নিয়ে কি সচলে লিখবেন? মানে, শুধু প্রবন্ধটি আগাগোড়া সেঁটে দেওয়া নয়, এটির ওপর আলোচনাসহ?

পড়াশোনার অভাবে সামষ্টিক অতীত নিয়ে পেশাজীবীদের মনেও হীনম্মন্যতার জন্ম হতে পারে। পূর্বসূরীদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ে এ কারণেই আলোচনা প্রয়োজন।

অতিথি লেখক এর ছবি

চেষ্টা করবো আশা রাখি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে মোটরগাড়ির সহজলভ্যতা আর জনপ্রিয়তার কারণে শহরের অভ্যন্তরের রাস্তা কিমবা বাইরের মহাসড়কের রাস্তার নেটওয়ার্কে অনেক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন পড়ে। সে প্রায় সারা পৃথিবী জুড়েই। ব্যাপারটা হয়তো প্রথম মহাযুদ্ধের পরই শুরু হ'য়েছিলো, তবে পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক গতি পায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। ট্রেনকে পাস কাটিয়ে মোটরগাড়ি দখল ক'রে নিতে থাকে স্থল-যোগাযোগ ব্যবস্থার সিংহভাগ। য়ুরোপের অনেকগুলো শহর তাদের মূল সড়কগুলোকে প্রশস্ত করার চেষ্টা করে এই সময়ের ভেতরে। যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি তাদের কাজটাকে হয়তো সহজ করে দিয়েছিলো। আর এটা করতে গিয়েই যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে মোটরগাড়িকে প্রাধান্য দিলে রাস্তার ধরণ কেমন হবে তা নিয়ে অনেক ধরণের সমীক্ষা, গবেষণা, এক্সপেরিমেন্ট বা ট্রায়াল দিয়ে দেখে তারা। তাতে একটা বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে সড়কে ক্রসিং (ঠিক মোড় নয়। মোড় হ'লেও ক্রসিং নাও থাকতে পারে) কমিয়ে আনা গেলে তা সড়ক-দুর্ঘটনা কমিয়ে আনে। হয়তো একটু বেশি ঘুরতে হয় তবুও সার্বিক ভাবে যাতায়াতে সময় কমিয়ে আনা যায়। ওভারপাস বা উড়াল সেতুর প্রচলন না ক'রে সহজেই ইউ-লুপের মাধ্যমে সেটা করা যায়। আর যদি রাস্তাতে গাড়ির চাপ খুব বেশি না থাকে তবে মোড় বা নোডগুলোতে বড়সড় সার্কেল বা গোল-চত্বর বানালে তা বেশ কার্যকর হয়। যেমনটা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে করা হয়েছিলো বেশ আগেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরে ঢাকার গুরুত্ব বাড়তে থাকে দ্রুত। বাড়তে থাকে ঢাকার রাস্তায় মোটর গাড়ির সংখ্যা। যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা অনেকেই তখন এগুলো নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। এখনো পর্যন্ত আমার জানা মতে স্থপতি শর্মাই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই ব্যাপারে প্রথম জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলেন। সেজন্যই ওনার কথা উল্লেখ করা।
(রাজীব)

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

মোটাদাগে ব’লতে গেলে কারখানা বিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন) পর থেকে শহরের

ইয়ে, এটি "শিল্প বিপ্লব" হিসেবে বহুল প্রচলিত, বদলানোর দরকার আছে কি?

যে স্থপতি শিশুপার্কের পরিলেখটি তৈরী করেছেন তিনি বাংলাদেশের স্থাপত্য-শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোধা ব্যক্তিদের একজন।

ইনি কে?

আইনে বৈদ্যুতিন বাহনের অনুমতি এখনো নেই বিধায় এই রিকশাগুলোকে এখনো অননুমদিতই থাকতে হচ্ছে।

সত্য। মফস্বল শহরগুলিতে এই বাহনটি পদচালিত রিকশাকে প্রায় প্রতিস্থাপিত করে ফেলেছে, এবং নিবন্ধিত হিসেবেই। ঢাকাকেও এর বাইরে রাখা অসমীচীন। অলি-গলিতে কিছু চলছে অবশ্য।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।