প্রপঞ্চময় পঞ্চক (পরবর্ত্যাংশ)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ১৯/০১/২০১১ - ১২:২২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ধৈবত

প্রপঞ্চময় পঞ্চক (প্রথমাংশ)

নিম্নোক্ত গল্পের সমস্ত চরিত্র এবং ঘটনাই বাস্তব। কাল্পনিকতার সাথে এর সংলগ্নতা কল্পনা করা নিতান্তই অনভিপ্রেত অতিকল্পনা মাত্র দেঁতো হাসি


একটা ছোট্ট ঘর, চারদিকে বাঁশের বেড়া। একটা কেরাম বোর্ড বসানো আছে এক কোনায়। সেখানে দান কয়েক কেরামও চলছে, বাতাসে বরিক পাউডার উড়ছে। পাশেই একটা চায়ের দোকান। রাত অনেক হলেও চায়ের দোকান খোলা আছে। অনেক রাত পর্যন্ত দোকানটায় চা খেতে কিংবা বিঁড়ি টানতে ছেলে-বুড়ো সবাই আসে। আর সময়টা পৌষের পড়ন্ত দিকে বলে, শীতের কুয়াশার চাঁদর ফেঁড়ে দোকানের গরম চায়ের ধোঁয়া অনেক রাত অদ্যি গাঁয়ের ছেলেছোকরাদের জাগিয়ে রাখে।

মাদুর পেতে আমরা বসে আছি। সুমনকে দেখলাম কি কি যেন মিকচার করছে। হাতে কাজ নিয়েই সে বলল, “শাফি, তোমার দোস্ত আর তোমার লাই তো খুব ভালা হোয়াদের(স্বাদ) জিনিস বানাইসি। খাই, মজা ফাইবা”

আমি বললাম, “আমারে দিতে পার। আমার দোস্ত খাবে না।”

“কেন্ খাবে না? একবারে খাঁটি তাল’তুন বানাইসি। শহরে এইরম খাঁটি মাল জিন্দেগীতেও ফাওয়া যাইত ন।”

“না সেটা বুঝলাম, কিন্তু ওর তো এইসব খাই অভ্যাস নাই”

“আরে কি কও। তোমরা হইল গিয়া শহইরগা ফোলা, এসমার্ট চাইর দিক দিয়া। আর এই সামাইন্য জিনিস যদি মেহমান ভাই খাইতে না ফারে তাইলে একটা কথা হইলনি। আমগো গাঁইয়া ফোলাগো লগে তোমগো আর ফারাক কিয়ের?”

আমি কামালের দিকে তাকালাম। সে চুপচাপই আছে, একটু নারভাসও।

সুমন কামালের দিকে ফিরে বলল, “ভাইজান, খাইয়েন একটু। একদম খাঁডি মাল। আফনে মেহেমান মানুষ আইছেন বলি কবিরগা চোরা রে দি হাসমত মেম্বরের তাল গাছ তুন তাল আনাইসি।”

কামাল শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “ঠিকাছে সমস্যা নাই, এতই না যখন কষ্ট করছ...দিও, দিও।”

সব কিছু প্রস্তুত হল। দেখলাম, পুরানো শেয়ানা- হেলাল, জসিম সবাই এসে জমায়েত। হেলাল এসে এক পেয়ালা গটগট করে ঘোলের মত গিলে ফেলল। আমাদের সামনেও এনে রাখা হয়ছে। আমি আমতা আমতা করে একটু চুমুক দিলাম। স্বাদটা বিদঘুটে মনে হল। তারপর চোখমুখ বুজে গিলতে লাগলাম।

কামালও হাতে পেয়ালা নিয়েছে দেখলাম। ঢাকার সব ছেলে পুলে যে “এসমার্ট”, গাঁয়ের এই ভবঘুরে ছেলেদের কাছে এটা প্রমাণ করার গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে তার কাঁধে। দেখলাম সেও পেয়লাটা দুহাতে চেপে ধরে একেবারে পুরোটাই গলা দিয়ে নামিয়ে দিল। তারপর কিছুক্ষন ঝিম মেরে বসে রইল।

কিছু পরেই দেখলাম বেচারার অবস্থা বেগতিক। কেমন যেন উথাল পাথাল শুরু করে দিয়েছে। শার্টের মধ্যে অনেকটুক বমি করে দিয়েছে সে। বমিতে টাটকা তাড়ির গন্ধ। দেখে হেলাল আমাকে বলল, “কিরে শাইপ্যা, এইডা কুন বলদের বাইচ্চারে ধরি লই আইসস ঢাকার’তুন। এইরম করে কা?”

আমি ততক্ষনাত তারেককে বললাম, “তারেক, তাড়াতাড়ি করো। বাড়িতে যাইতে হবে ব্যাটারে নিয়ে। অবস্থা সুবিধার দেখা যাইতেসে না।”

খেয়াল করলাম, কামালের মত অমন ধরণী-ধ্বস্ত না হলেও, আমার মাথায়ও ঝিম মেরে আছে। তারেক আর আমি ওকে ধরে ধরে বাসায় নিয়ে চললাম। আমার মনে শঙ্কা, কারণ বাড়ি শুদ্ধ মেহমান। বাসায় আমি নিতান্তই ভদ্র ছেলে, এই অবস্থায় আমাদের দুজনকে দেখলে সবাই কি বলবে। গাধাটাকে নিয়ে হাঁটছি, আর চিন্তা করছি- বাসায় গিয়ে, কিভাবে কি কি বানিয়ে বলে দায় সারানো যায়।

এটা হয়তো শুক্লপক্ষের রাত, তাই ঝলমলে চাঁদের আলো। হালকা কুয়াশা থাকলেও পথঘাট সবই মুটামুটি দেখা যাচ্ছে। কিছু পথ যেতেই খেয়াল করলাম একটা উটকো গন্ধ। পরে দেখি, কামাল প্যান্টে হিসু করে দিয়েছে। তার চেতনা মোটামুটি লোপ পেয়েছে বলা চলে।

আমি তারেককে বললাম, “কামাল তো প্যান্টের মধ্যে কাম সেরে দিসে। এই অবস্থায় বাসায় নেওয়া যাবে না।”

তারেক কতক্ষন নাক সিঁটকালো, “হ, মুতে যেই গন্ধ, বাপরে বাপ। পুরা বিলাইর মুতের মত”

আমি বললাম, “তুমি মিয়া এক কাম কর। কাছেই তো মনে হয় বশরের বাসা। ওর কাছ থেকে চট করে একটা প্যান্ট আর একটা টি শার্ট নিয়া আসো। আমি ওরে একটু ধোয়ামোছার ব্যাবস্থা করি”

“কোথায় করবা”

“কেন, পূবদিকের আলুক্ষেত পার হইয়া না সিকদারের পুকুরটা। ওইখানেই।”

“তোমার মাথা খারাপ, তুমি এই রাইতের বারোটায় যাইবা সিকদারের পুকুরে।”

“কেন, সমস্যা কি?”

তারেক এবার একটু গম্ভীর হয়ে জবাব দিল, “মনে আছে তোমার দাদায় কেমনে মরছিল। এই সিকদারের পুকুরে ভর দুপুরে যে জাল মারতে গেসিল, পরে টাইনা নামাইয়া ফেলছে। লাশ ভাইসা উঠছিল দুইদিন পরে।”

“হুম”, মাথা নাড়লাম আমি। “কিন্তু আমার দাদা এমনিতেই হার্টের রোগী ছিলেন। অনেকদিন পরে পুকুর নামলে, হঠাত হার্ট এটাক হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। এইখানে হাজরে টাইনা নেওনের কিছু নাই।”

“হুম, তো মুন্সী কাকা যে জন্মের লাইগা পাগল হই গেল। তারপর বাইচ্চা মাইয়ার কান্দনের আওয়াজ, সেইগুলা কী?”

“আরে সবগুলারে প্রত্যেকটার লজিস্টিক ব্যাখ্যাই আমি তোমারে দিতে পারুম। তুমি আগে ওর লাইগা ব্যাবস্থা কর।”

“আরে ধুর, এই পুকুর বড় খল পুকুর। আমি সন্ধার পরে আর অই পুকুরের ধারে পাশেও যাই না। কেউই যায়না। তুমি বরং আরো সামনে আগাইয়া কলিম মিস্তিরীর বাড়ির সামনে যে পুকুরটা আছে ওইটা তে যাও।”

“ঠিকাছে, না হয় সেইটাতেই যাই।”,রাজি হলাম আমি। “কিন্তু তুমি একটু তাড়াতাড়ি জিনিসপত্রের ব্যাবস্থা কর”

---------

তারেক আমাকে রেখে চলে গেল বশরের বাসার দিকে। আমি আধচেতন কামালকে ধরে ধরে মিস্তিরীর বাসার পুকুরে নিয়ে গেলাম। জায়গাটাও মোটামুটি শুনশান। তবে, ঝোঁপে কিসব অদ্ভূদ পোকা ডেকে ডেকে পরিবেশ অস্থির করে তুলছে। আমাদের বাসাটা জায়গাটা থেকে বেশ একটা দূরেনা। বিয়ে বাড়ির আলোকসজ্জা দেখা যাচ্ছে গুটিগুটি ভাবে। যেহেতু জায়গাটা নিরব, আশেপাশের লোকের সাড়াশব্দ নাই, আমি কামালকে পুকুরের ঘাটে ধরে এনে একেবারে দিগম্বর বানিয়েই কোমরপর্যন্ত পানিতে চুবিয়ে দিলাম। বমিতে ভরা শার্ট, আর প্রস্রাবে ভরা প্যান্ট ইটে চাপা দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখলাম। চোখে মুখে একটু পানির ছিটকে দেওয়াতে দেখলাম তার হুশ খানিকটা এসেছে।

ঘোর নিয়ে সে বলল, “দোস্ত, আমি কি ন্যাংটা”

“টেকনিকাললি না, কারন তোর ইজজত আব্রু এই কালো রাত্রি আর পুকুরের পানি হেফাজত করছে”

“দোস্ত, ন্যাংটা থাকলে গুনাহ হয়। আমাকে কাপড় পরিয়ে দে”

“চিন্তা করিস না, তোর জন্য কাপড় চোপড়ের ব্যাবস্থা করতে পাঠিয়েছি। তোর কাপড়ে তুই হেগেমুতে রেখেছিস। তোকে মানাও করেছিলাম বেশি স্মার্ট হতেনা।”

কামাল অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “দোস্ত, পুকুরের ওইপাড়ে ওইটা কি?”

“কোনটা কি?”

“ঐতো ওইটা, কেমন যেন লাল শিয়াল। নাড়াচাড়া করতেছে।”

আমি ভালভাবে ঐপারে তাকিয়ে দেখলাম। পুকুরটা তেমন বড় নয়। এইপাড়টা গাছে ঢেকে থাকলেও, ফকফকা চাঁদের আলোতে ওই পাড়টা দেখতে অসুবিধে হচ্ছিল না। বুঝতে পারলাম কামালের মাল এখনো তাকে বেসামাল করে রেখেছে। সে দেখছে লাল শেয়াল। আর আমি যা দেখলাম সেটা আরো বিপত্তিকর বস্তু। দেখি লাল শাড়ি পরে একটা নতুন বউ, ওইপাশে গুটিসুটি মেরে একটা গাছের তলে বসে আছে।

আমি কামালকে বলি, “সর্বনাশ, কামাল, মনির ভাইয়ের নতুন বউকে দেখেছিলি না তুই।”

তন্দ্রালু চোখেই আমার কথায় সায় দেয় সে।

“ভাবির তো অতীত জীবনে ঘাপলা ছিল রে। আমার মনে হয় সে বিয়েবাড়ি থেকে ভেগেছে”

“কি করে বুঝলি?”

“আরে ভালভাবে চেয়ে দেখ, তুই যেটাকে লাল শেয়াল ভেবে বসে আছিস, সেটা কামাল ভাইয়ের বউ। দেখ তার গলায় গোলাপ-গাঁদার মালাটা, আর আমার দাদীমার দেওয়া পুরু গলার হারটা এইখান থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।”

“অ্যাঁ, দোস্ত শিয়াল টাকে তো আর দেখি না আমি। আর কিছুই দেখি না। আল্লা আল্লা, আমার চোখের কি হইল, ক্লাস লেকচার তুলব কেমনে, এখন।”

“তোর আর কিছু দেখতে হবে না। তুই বসে বসে পুকুরের পানি খা। আমি ব্যাপারটা দেখি। আমাদের বংশের মানসম্মানের ব্যাপার।”, বলেই আমি দৌড়ে ঘাটের উপর দিকটায় উঠে গেলাম।

“দোস্ত, আমাকে এইখানে এভাবে ন্যাংটা ছেড়ে যাইস না। পানি ঠান্ডা! আমার ইয়েতে খুব ঠান্ডা লাগতেছে। আমার কাপড় চোপড় দিয়ে যা”, কামাল একটু গলা কাঁকিয়ে অসহায় ভাবে অনুনয় করতে লাগল।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “তোর কাপড় চোপড় পুকুরে ডুবিয়ে দিয়েছি। তুই পারলে হাতিয়ে বের কর।”-বলেই হাঁটা দিলাম আমি।

পুকুরের ও পাড়টায়, সেই লাল শাড়ি শোভিতার কাছে সামান্য যেতেই দেখি সে উঠে দাঁড়ালো। এবার আমি আরো কাছ থেকে মুখটা খানিক দেখে নিশ্চিত হলাম আসলেই ইনি আমাদের নয়া ভাবি। আমাকে মনে হয় দেখতে পেয়ে চিনতে পেরেছেন তিনিও। আজকে সামান্য সময়ের দেখায় মা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। দেখলাম আস্তে করে জায়গা থেকে সরে যেতে লাগলেন ভাবি। পাশেই চাষের জমি। ভাবি দৌড়ে জমিতে নেমে পড়লেন।

আমিও পিছু নিলাম। আমি হলাম চাচাতো-দেবর। ‘দেবর’ মানে দ্বিতীয় বর। তাই খানিকটা জামাইসুলভ কর্তব্য আমারো আছে। তাছাড়াও পুরো বংশের মানসম্মান এখন আমার সাফল্যের উপর নির্ভর করছে। আমি যদি ভাবিকে আবার বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

আমি জমির আইল ধরে এগুচ্ছি। একটা ব্যাপার, মনে হল ভাবি ম্যারিয়ন জোন্স। আমি কিছুতেই তার সাথে দূরত্ব কমাতে পারছি না। আমি একটু দৌড়ানো শুরু করলে, ভাবিও একটা দৌড়ানি লাগায়। এমন শাড়ি গহনার ভারে এই মহিলা কেমনে দৌড়াচ্ছে আল্লায় জানে। ভাবি-দেবরের চোরপুলিশ খেলা জমে উঠেছে। “ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান”

এভাবে, আমি হ্যাংকস আর উনি ক্যাপ্রিও হয়ে কতদূর গিয়েছি জানিনা। কিছুদূর যেতেই দেখি একটা জলা। চারপাশে অনেক গাছগাছালি। জলার পাড়টা জমি থেকে সামান্য উঁচু। ভাবি তাড়াতাড়ি ওখানে উঠে পড়লেন আর একটা পুরূ গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেলেন। নাহ, এতক্ষন চোরপুলিশ, আর এখন লুকোচুরি খেলতে চাইছেন তিনি। বিয়ের দিনই দেবরের সাথে এরকম খুনসুটি, বিয়ের পর কি না হয় ভেবে পাইনা।

হঠাত আমি শিউরে উঠলাম। জায়গাটা ভীষণ নিরব। কেমন যেন মনে হল, আমি হয়তো ধূ ধূ প্রান্তরের মাঝখানে চলে এসেছি। চারদিকে কেটে ফেলা ধানগাছের মুন্ডু, সামনে দ্বীপের মত জেগে থাকা একটা জলাশয়, আর একখন্ড পরালৌকিক নিস্তব্ধতা। জলাশয়ের চারপাশে অনেক বড় বড় গাছ। ভাবি যেই গাছের আড়ালে গিয়ে মজা নিচ্ছেন, আমি চাঁদের আলোয় খুব খেয়াল করে দেখলাম সেটা একটা তুলাগাছ। তুলাগাছটা তার জাত ভাইদের চাইতে অস্বাভাবিক রকমের বড়। হঠাত আমার খেয়াল পড়ল, এটা সেই তুলাগাছ, যেটার নিচে কাছের শিমুলতলি গ্রাম থেকে একটা হিন্দু পরিবারকে ধরে এনে একাত্তরে গুলি করে মেরেছিল মিলিটারিরা। সেখানে ছিল পাঁচ বছরের এক বাচ্চা মেয়েও। আর জায়গাটা... হ্যাঁ, এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছি এইটাই সেই কুখ্যাত শিকদারের পুকুর।

জায়গাটা চিনতে পেরেই আমার বুকের ভেতরটায় প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। ক্ষনিক আগের সব ঘটনা, এই জায়গা, সব মিলিয়ে-ঝুলিয়ে আমি ততক্ষনাত যেই সিদ্ধান্তে পৌছুলাম সেটা সম্পুর্ণ অবৈজ্ঞানিক, আমার পদার্থবিদ্যাগত ছাত্রসত্ত্বার জন্য সম্পুর্ণ অবমাননাকর। কিন্তু আমি আসলেই নিরুপায়। দ্রুত পেছনে ঘুরলাম, ফিরতি পথে দৌড় লাগাব বলে।

পিছে ঘুরে আমি যা দেখলাম, তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে আসল। দেখি, কিছুই নেই। নেই মানে- নেই। পেছনে ফেলে আসা আমাদের গ্রাম, পাশের শিমুলতলি গ্রাম কিংবা শিতলঘর গ্রাম, সবই বেমালুম উধাও। মনে হল সাক্ষাত শয়তান নেমে এসে, গ্রামগুলোকে তুলে নিয়ে আসমানে চলে গেছে। সেইখানটায় পড়ে আছে কেবল বিদঘুটে অন্ধকার, চাঁদের আলোও যেন হারিয়ে গেছে। আমার পিছনে সেই কুখ্যাত পুকুর, মধ্যে আমি, আর আমার সামনে কোন এক মনুষ্যবিহীন বিরান পৃথিবী।

আমার হাত ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, শীতে না ভয়ে বুজছি না। পা ভারি হয়ে আসছে। আমি অনোন্যপায় হয়ে জমির বুকে এলিয়ে পড়লাম। বুঝতে পারলাম না ঘোরে আছি কিনা। চোখের দৃষ্টি প্রায় মিলিয়ে আসলেও, শ্রবনেন্দ্রিয় সামান্য জাগ্রত। আমি শুনতে পেলাম পিছন থেকে কুকুরের আর্তনাদের শব্দ। খুবই করূন একটা গোঙ্গানির সুর। যদিও লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই জায়গায় কুকুর থাকার কথা না। দাদাজান বলতেন, “ভোরে মোরগ ডাকে ফেরেশতা দেখলে, আর রাইতে কুত্তা কাঁন্দে শয়তান দেখলে।”

--------

আমি, বাসায় আমার রুমে শুয়ে আছি। হামজা মোল্লা, লালচে সাইদি মার্কা দাড়ি দুলিয়ে, গন্ধটে মুখে আমাকে ঝাড়ফুঁক করছেন দেখে খুবই বিরক্ত লাগল। তার বড় বড়, দুর্গন্ধওয়ালা ফুঁ গুলো গায়ে লাগা মাত্রই বমি ধরে আসছে। আশেপাশে আরো অনেকে হা করে আমাকে দেখছে, যেন আমি একটা চিড়িয়া। আম্মা, ফুফুরা, কাকিরা সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তিত। দেখি, পাশে চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে নতুন ভাবি। ভাবিকে সাধারণ সাজগোজেও সুন্দর দেখাচ্ছে। মনির ভাই শালায় ছক্কা মেরে দিয়েছে। আর সেই বল কুড়াতে গিয়েই না আমার এই অবস্থা। হামজা হতচ্ছাড়া বিদায় হতেই, পাশের ঘরের আনজি দাদী আমার কাছে এসে বসলেন। উনি এইখানে সবচেয়ে বেশি মুরব্বি।

ফিসফিসিয়ে তিনি বললেন, “বাবা, আইজ্জা বেয়ানে তো আঁন্নে হারাক্ষন ঘোরের মইদ্যে- ‘হাসনা’, ‘হাসনা’ কইচ্ছেন। হাসনা কেগা?”

আমি বুঝলাম না কিছু। ‘হাসনা’ আমার স্টুডেন্টের নাম, কিন্ত তার নাম আমি ঘুমে জপতে যাব কেন? তাই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলাম।

তিনি আবারো শুধালেন, “আইচ্ছা বাবা, আন্নে এইরইম্যা রাইতে শিকদারের হইরে (পুকুরে) গেছেন কা? আঁন্নে বলে, উগগা হিয়াইল্যার(শেয়াল) ফিছে ফিছে গেসেন।”

আমি বললাম, “আপনে কেমনে জানলেন?”

“আঁন্নের বন্দু কইসে?”, তিনি এবার আরো ফিসফিসিয়ে বললেন, “হুনেন বাবা, আঁন্নের মানসম্মান তো তবুও মালিকে রাইখসে। আঁন্নের বন্দুরে তো মসজিদের হইর ফাড়ে তো ফাওয়া গেসে- গোডা লেংডা”

বুঝলাম গতরাতে আসলেই কামালের প্রতি অনেক অন্যায় করে ফেলেছি। তবে আনজী দাদির সাথে সুর মিলিয়ে বললাম, “হুম, শিয়ালটা ওর প্যান্ট নিয়ে ভাগতেছিল দেখেই তো ওইটার পিছে পিছে দৌড়াইলাম”

“বাবা, এই কাম আর কোনদিন করিয়েন না। এইসব হিয়াল কুত্তার রুফ ধরি, কত খারাপ জিনিসে রাইত বিরাইতে ঘুরে, আঁন্নেরা ছোড মানুষ, বুইজতেন ন”

আনজি দাদী আমাকে ছেড়ে চলে গেলে অন্যান্যরা এসে ধরলেন। মা মাথায় হাত টাত বুলিয়ে দিলেন।

আমি বললাম, “মা, কামাল কই”

“ও তো আইজকা দুফুরে চলি গেসে বাবা। কত কইলাম এক মুঠ ভাত খাই যাইতে, কতা হুনে নাই।”

আমি বুঝলাম, আমি কাল রাতে কামালকে অই অবস্থায় একা ফেলে গিয়ে তার উপর আসলেই অনেক অন্যায় করে ফেলেছি।

মা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আসলে বাবা কি হইসে, ঠিক করি ক তো”

আমি ভাবলাম কথা বেশি পেঁচিয়ে লাভ নেই। মায়ের কাছে সত্য স্বীকার করেই ফেলি। কারন বেশি নয়ছয় করে কথা বলতে গেলে পুরা ব্যাপারটা আরো বিব্রতকর হয়ে উঠতে পারে।

“আসলে মা, আমি আর কামাল, কাল রাতে সামান্য নেশা পানি খেয়েছিলাম বাজারে গিয়ে। জাস্ট কৌতুহল আর কিছু না। পরিমানটা ঠিকমত সামলে উঠতে পারিনি দেখেই....”

মা ফস করে জ্বলে উঠলেন, “কী, কী কস! ক আমারে, কে তোগোরে বাজারে নিসে। সুমইন্যা, সাদেইক্যা এই বদমাইশগুলা না? হারামজাদারা তো নিজেরা সব বকলমের একশেষ, আর আঁর এই শিক্ষিত ফোলাডারে নষ্ট কইত্যে চায়....খাড়া”

আমি উঠে বসে বললাম, “মা দেখ, তুমি বেশি চিল্লাচিল্লি করোনা তো। মুরুব্বিরা শুনলে আরো খারাপ বলবে।”

“চুপ কর তুই। খাড়া, আঁই আইজজাই তোর আয়নাল কাকারে কইয়ুম হেতাগোরে বেগডিরে সাইজ কইত্যে।”

আমি মাকে অনেক প্রবোধ দিয়ে চেষ্টা করলেও তেমনটা শান্ত করতে পারিনি। মা ঠিকই বড় কাকাকে গিয়ে বলে দিলেন। পরে কাকা গিয়ে আমার বয়েসী পাড়ার প্রত্যেককে নাকি খুব করে শাসিয়ে দিয়েছেন। কেন আমাকে আর বেড়াতে আসা আমার ঢাকাইয়া বন্ধুকে কান্দিরঘাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হল, সে কারণে তিনি রেগে অস্থির। তবে বিয়ের মৌসুম বলে এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করা হয়নি।

----------

দুই দিন পর, বৌভাত। বেচারা কামাল নেই, তাই আমি একা একাই কনেপক্ষের সুন্দরী মেয়েদের দেখছি। সঙ্গে একটা ব্যাপার খুব করে ভাবছি। গত দিন থেকে কয়েকটা খন্ডচিন্তন গুছিয়ে নিয়ে, সেই রাত সম্পর্কে আমি মোটামুটি একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌছুলাম।

প্রথমত, আমি নিশ্চিত, কামালের মত তাৎক্ষনিক না হলেও, তাড়ির প্রভাব- আমাকে ধীরেসুস্থে ভাল মতই তাড়িত করেছিল, অনেকটা স্লো পয়েজনিং এর মত। তার প্রথম প্রমান আমার স্থানিক বাছবিচারে বিভ্রান্তি। বিকারগ্রস্থ কামালকে নিয়ে আমার কলিম মিস্তিরীর পুকুরপাড়ে যাবার কথা থাকলেও, আমি ভুল করে চলে যাই মসজিদের পুকুরে। দুটো পুকুরের কো-অর্ডিনেট প্রায় কাছাকাছি হলেও, সুস্থ নির্ভুল-চেতনায় আমার এই ভুল করার কথা না।

দ্বিতীয়ত, আমার এক অন্তর্মুখী বন্ধুকে দেখেছি গাঁজা খেয়ে তার যৌনজীবনের গোপন কথা গড়গড়িয়ে বলে দিতে। অ্যালকোহলের প্রভাবে, ততটুকু না হলেও, প্রণয়ধর্মী বা আধি-প্রণয়ধর্মী চিন্তাভাবনা গুলো সেই সময়ে আমার মস্তিষ্কে ঠিকই এসে পড়েছিল। আমার ছাত্রির প্রতি আমার অবচেতন কট্টুক প্রণয়াসক্ত সেটা মাত্রিকভাবে জানা না থাকলেও সে সময় তার কথাই মাথায় চলে আসে, কারণ পেশাগত কারণে সমসাময়িকে তার সাথেই আমার কথাবার্তা বা আনুষাঙ্গিক মিথস্ক্রিয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশী। টাল মাথায়- এই প্রনয়চিন্তন কিম্বা দুর্বল যৌনচেতনা আমাকে মসজিদের পুকুরের ঐপাড়ে নারিমূর্তি দেখতে সাহায্য করেছে, যেটা কামালের ক্ষেত্রে ছিল লাল শেয়াল টাইপ কিছু। কামাল মারত্মক সাইনোফোবিক, তাই কুকুর-শিয়াল জাতীয় ক্যানাইন তার অসংলগ্ন মনে স্থান করে নিয়েছে আগে।

তৃতীয়ত, কাছে যেতেই ওই অজ্ঞাত নারীর মুখ স্বভাবতই রুপায়িত হয়েছে নয়া ভাবির মুখের আদলে, কারন ঘটনার নিকটবর্তী সময়ে আমার দেখা সবচে সুন্দরী মহিলা ছিলেন ভাবি। তাই, সেসময়ে আমার ক্ষীন প্রতিক্রিয়াশীল সেরিব্রাল কর্টেক্স অপেক্ষাকৃত টাটকা এবং প্রভাববিস্তারী সৌন্দর্যের- সেই নির্দিষ্ট মুখচ্ছবিই তৈরী করে নিয়েছে এই জায়গায়।

চতুর্থত, যেই জায়গায় আমি দৈবক্রমে বা দুর্ভাগ্যক্রমে স্বীয় কাল্পনাজাত সেই ছায়ামূর্তির পশ্চাতধাবন শুরু করেছিলাম সেখান থেকে সিকদারের পুকুরের জ্যামিতিক অবস্থান ছিল প্রায় শূন্য ডিগ্রীতে, এবং খোলা জমিতে আর অন্য কোন প্রতিবন্ধক ছিলনা। সে অবস্থায় আমার সাম্ভাব্য গতিপথ সরলরৈখিক হওয়াটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক, তাই সরাসরি শিকদারের পুকুরপাড়ে পৌছুনো ছাড়া আর কোন গত্যন্তরই আমার ছিলনা।

পঞ্চমত, আজ দুদিন ধরে কুয়াশার স্তর একটু ঘন হয়েছে দেখলাম। এই আবহপরিবর্তন সেইদিন মধ্যরাত থেকেই শুরু হয়েছিল হয়তো। চন্দ্রালোকে, কুয়াশা ভেদ করে কাছের পথঘাট, তুলাগাছ, পুকুরপাড়- দেখা সম্ভব হলেও অপেক্ষাকৃত দূরের গ্রামগুলো কোনভাবেই দেখা সম্ভব নয়। বরং দৃষ্টিপটে, কুয়াশার ধুম্রজাল একটা বিস্তীর্ণ অন্ধকার পটভূমি তৈরী করে আমাকে মনস্তাত্বিকভাবে আরো বিদ্ধস্ত করে দেয়।

ষষ্ঠত, সিকদারের পুকুরপাড়ে বাঁশঝাড় ছিল প্রচুর। চিকন বাঁশপাতার সাথে, খোলা জায়গার মুক্ত বায়ুর সংঘর্ষে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির অদ্ভূদ শব্দ উদ্ভুত হতে পারে। তার সাথে আমার লুপ্তপ্রায় শ্রবনানুভূতি আর নার্ভাস ব্রেকডাউন যোগ করলে, আনুষাঙ্গিক শ্রুতিবিভ্রম অমন অস্থানে কুকুর, শেয়াল, এমনকি নেকড়ের গোঙ্গানিও তৈরী করে নিতে পারে।

নাহ, মাল খাওয়াটা ধীরে সুস্থে শিখে ধাতস্থ হতে হবে। কি ঘোরের মধ্যেই না পড়ে গিয়েছিলাম সেই রাতে। কামালের জন্যে মন খারাপ হচ্ছে। শালার ভাইকে তারেক ন্যাংটু অবস্থায় পুকুর থেকে তুলেছে। ভাবছি, হলে গেলে সে আমার উপর কি রাগটাই না ঝাড়ে। উঠোনে বাহারি সাজের মেয়েদের ফাঁক গলে দেখলাম নতুন ভাবিকে আলতা দেয়া হচ্ছে। ভাবলাম, ভাবিকে কি মুখ ফুটে বলব, যে ঘোরের মধ্যে আমি তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছি। শুনে, উনি না আবার কি মনে করেন।

হঠাত শুনলাম মিহি একটা কন্ঠস্বর, “কি ভাইজান, আঁই কইসিলামনা আঁন্নে আস্তা লুইচ্চা”

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। আর আমার চোখমুখ শক্ত হয়ে আসলো, অনেকটা রাগেই-

“মানে?”, আমার পালটা প্রশ্ন।

“মানে আবার কিতা। কইসি না যে, মাইয়া মাইনষেরে দেইখলে আঁন্নের ল্যাড়ল্যাড়ানি উডি যায়”

“এই, তোকেনা বলেছিলাম, এই পাড়ায় আসতে না”, আমি রূঢ় ভাষায় বললাম।

“কিন্তু কি কইত্যাম, হেই রাইতে আঁন্নে আঁরে দেখি যেইভাবে ফিছে ফিছে ছুইটলেন, হেরলাইতো আবার আঁন্নের কাছে আইসি”- বলেই কী না একটা বিশ্রী হাসি।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবার। “বলতে চাস কি তুই?”

“হুনেন ভাইজান, আমগো দুই ভাই শুধু গ্রামডির উরফে বইছিল। হেরলাই, আঁন্নে গোডা গ্রামই আর চোখে দেইখলেন না। যদি আঁন্নের উরফে আসি বইতাম, তাইলে তো আন্নে আজিজ মিয়ার দোয়ানের ডাইলফুরি হই যাইতেন মনে অয়। হেহেহেহে”- এইবার তার মুখের হাসিটা আমার বিভৎস মনেহল।

আমি পুরাই ব্যাক্কল হয়ে গেলাম। “তুই গেলি এইখান থেকে। আমি কিন্তু হামজা মোল্লারে খবর দিমু।”

“ওই লাল দারিঅলা মুরগা আঁর কিতা কইরব। হেতে যেইসব দোয়া কালাম ফরে, বেগডি ভুলভাল; মুতিও ঠিকমত হানি(পানি) লয় না”- আবারো হাসি

আমি অসহায় হয়ে রইলাম।

সে ফের বলে, “হুনেন ভাইজান, আঁন্নে হইলেন.....আঁন্নে হইলেন শহইরগা ভোদাই”

বলে, সে আমাকে আবারো জিহ্বা দেখিয়ে চলে গেল। আমি তার নাচতে-দুলতে দূরে সরে যেতে থাকা চঞ্চল পদক্ষেপগুলোরে দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। আমি যে একটা শহুরে ভোদাই, কথাটা মনে প্রানে মেনে নিলাম। মোটামুটি সন্দেহাতীত ভাবেই। কারন তার শেষ শব্দগুলো- “আঁন্নে হইলেন শহইরগা ভোদাই”, আমার কেমন জানি মনে হল, সেগুলো যখন সে বলছিল, সেটা ছিল একটা স্পষ্ট পুরুষালি কন্ঠস্বর।

--------------------------------------------


মন্তব্য

কৌস্তুভ এর ছবি

শুতে যাচ্ছিলাম, লগইন করিয়ে ছাড়লেন?

গল্প ভালো হয়েছে। পরিবেশের আমেজটা খুব ভালো পেলাম।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

কী বলতে চাইলি বুঝলাম না।
পাঠক হিসেবে আমার ব্যর্থতা মন খারাপ

---আশফাক আহমেদ

অতিথি লেখক এর ছবি

মাথায়, থিওরী আর ফরমুলা ঠাসাইয়া নিয়া, পড়তে নিলে কেমনে বুঝবি দেঁতো হাসি হয়তো না বুঝাইতে পারাটা গল্পবাজ হিসেবে আমার অক্ষমতাও হইতে পারে মন খারাপ

আবার পড়িস, কিছুই বুঝাইতে চাইনাই। বুঝাইতে চাইসি, এইসব সায়েন্টেফিক যুক্তি-ব্যাখ্যা আসলে কিছুইনা, সউব ফাউ। অই মাইয়া আসলেই জ্বীন পালে, তার পাওয়ার আছে দেঁতো হাসি

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

“অ্যাঁ, দোস্ত শিয়াল টাকে তো আর দেখি না আমি। আর কিছুই দেখি না। আল্লা আল্লা, আমার চোখের কি হইল, ক্লাস লেকচার তুলব কেমনে, এখন।”

আমি বুঝলাম না কিছু। ‘হাসনা’ আমার স্টুডেন্টের নাম, কিন্ত তার নাম আমি ঘুমে জপতে যাব কেন? তাই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলাম।

গড়াগড়ি দিয়া হাসি গড়াগড়ি দিয়া হাসি গড়াগড়ি দিয়া হাসি

গুরু ধৈবত, কী আর বলব??? আপনি পারেনও বটে। চলুক চলুক চলুক

-অতীত

অতিথি লেখক এর ছবি

লিখতে চাইছিলাম হরর গল্প, হইয়া গেল কিনা কমেডি। ওঁয়া ওঁয়া

ধূর, আর লেখমুই না জিন্দেগীতে দেঁতো হাসি

ধৈবত

ধুসর গোধূলি এর ছবি

ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ভালো লেগেছে।

কিন্তু শেষমেশ মেয়েটার (নাম জানি কী?) কণ্ঠে পুরুষালী স্বর শোনাটা সেইসব ব্যাখ্যায় পানি ঢেলে দিলো কিছুটা। তবে এমনও হতে পারে মেয়েটার কণ্ঠে পুরুষালী স্বরটাও কল্পনা!

পুরো ঘটনাটার ব্যাখ্যা দাঁড়াতে পারে এমন- আপনি যখন আধিভৌতিক জিনিস নিয়ে মশকরা করছিলেন, তখন এই মেয়েটা সেটা শুনেছে অনতিদূর থেকে। আর তারপর থেকেই তার ব্যাপারে অন্যসবার মতো আপনার মনেও ভয় ধরিয়ে দেয়ার জন্য মনে মনে ফন্দি এঁটে যাচ্ছিলো। বন্ধুদের সাথে তাড়ি খাওয়ার প্ল্যানটা তার মনোবাসনা পূরণ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। সে টাকে টাকে থেকে আপনাদের অনুসরণ করেছে। এবং আধাটাল কামালকে নিয়ে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে তৈরী হয়ে। কারণ সে জানতো তাড়িতে কামাল টাল হবে (এবং আপনিও)। চায়ের দোকানের সেই কথোপকথন থেকে সে এটা আন্দাজ করে নিয়েছে।

তারপর সবকিছু আপনার বর্ণনাতেই আছে। সিকদারের পুকুরে সবাই যেতে ভয় পেলেও সেই মেয়েটি পায় নি। কারণ সে ঐটুকু সাহস অর্জন করতে পেরেছে বলেই গাঁয়ের সবাই তাকে সমীহ করে চলে।

একেবারে শেষে এসে সে কোনোভাবে আপনাকে আপনার ব্যাখ্যার বাইরে নিয়ে হিপনোটাইজ করার চেষ্টা করেছে, যাতে আপনার মনে হয়েছে আপনি তার কণ্ঠে পুরুষালী স্বর শুনেছেন। পুরো ব্যাপারটাই মেয়েটির তৈরী।

এবার আমাকে বলেন দেখি। আপনি কি তাড়ি খেয়েছেন কখনো, আসলেই? কঠিন শীতের রাতে এক গ্লাস তাড়ির এ্যাকশন কেমন হওয়া উচিৎ? শাস্ত্রমতে, গরমের দিনে তাড়ির এ্যাকশন সর্বোচ্চ হওয়ার কথা। কিন্তু শীতের রাতে এক গ্লাস তাড়িতে দিগ্বিদিক হারিয়ে (য়েখানে মনে হয়েছে তাড়ি কামালের জন্য প্রথম হলেও, আপনার জন্য না) নববধূর পেছন পেছন সিকদারের পুকুরের দিকে চলে যাওয়া ভালো কথা নাতো! হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

হায় হায়, কন কি? পড়ে দেখলাম তাড়িতে নার্ভাস স্টিমুলেশন কতটুকু হবে, সেটা তার মধ্যকার অ্যালকোহলের উপর নির্ভর করে। কিন্তু এলকোহল কেমনে দেয় সেইটা জানিনা হাসি । আর এইখানে আমি কিন্তু বলছি অ্যালকোহলিক জিনিস আমার আগে খাওয়া হয়নি। হাসি

যাই হোক, মদ গাঞ্জা না খাইয়া শুধুমাত্র সেইটা নিয়া গল্প ফাঁদা তো বিশাল ডেঞ্জারাস ব্যাপার্সাপার দেখতেসি। সামনে এইসব পদার্থকে গল্পে আনতে গেলে কোনটা সাধারন আদমির উপর কেমনে কি করে এইডা ইনশাল্লা আপনের কাছ থেইকা জিগায়া লমু নে, ধূগো দা
ধন্যবাদ

ধৈবত

ধুসর গোধূলি এর ছবি

আমার কাছে জিগায়া লাভ নাইরে ভাই। এই ব্যাপারে আমার এবং আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলির তুলনায় আমি শিউর যে আপনি নিজে থেকে লিখলেই ঢের ভালো লিখতে পারবেন। হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাবতেছি একটা খুনখারাবির থ্রিলার লিখব। তাইলে তো দেখি এখন আগে একটা খুনখারাবি করেই দেখতে হয় হো হো হো
যাই হোক এই ব্যাপারে আমার তেমন ভাল কিছু জানা নাই। তবে এটা লেখার আগে আমি ইয়ারদোস্ত মহলে একদুইজন মালখোরের সাথে শলাপরামর্শ করেছিলাম, তবে তারা স্বচ্ছ কোন ধারণা দিতে পারে নাই মন খারাপ

ধৈবত

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

ভালোই। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের অংশটা পড়ে আবারো তোর ঘেঁটে লেখার ভালো প্রবণতাটা লক্ষ্য করলাম। কিন্তু এই গল্পে তোর নিজস্ব কিছু খুঁজে পেলাম না। তোর সহজাত বর্ণনাভঙ্গী বা রস এখানে নেই।

নিজের মত করে একটা ল্যাখ, সময় নিয়েই ল্যাখ না হয়। ততক্ষণ অন্যান্য লেখা পড়- মন্তব্য কর।

আর ইয়ে, আইজ্জারটা দিসোস ?? দেঁতো হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

হুম, আজকে এক্সাম হলে কি কি করে এসেছি, ঐটা নিয়েই একটা ভাল রম্যলেখা দিয়ে ফেলা যাবে দেঁতো হাসি
যাই হোক, এখানে একটা আধিভৌতিক ঘটনা তুলে ধরতে চেয়েছি, তাই হয়তো এমনটা লেগেছে

ধৈবত

অদ্রোহ এর ছবি

চলুক

এই গল্পটা পড়তে পড়তে আমার বারবারই একটি কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, অন্যান্য সব আধিভৌতিক ঘটনার মত এটাও একটা ক্লিশে প্লটের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছিল, শেষমেশ অবশ্য সে আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। আমার মতে, এ ধরনের গপ্পে আগাপাশতলা সব ঘটনা যুক্তির ছাঁচে ঢালতে গেলেই কেলো লাগে, তাই শেষটাতে যদি একটু অমীমাংসিত রহস্যের গন্ধ না থাকে তবে ঠিক যেন জমেনা। তাই, সেই রাত সম্পর্কে গল্পকথকের ব্যাখ্যাগুলো যেমন ভালই লেগেছে তেমনি শেষটাতে এসেও গল্পটা খুব একটা টাল খায়নি।

--------------------------------------------
যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি-বাড়ি যায়
তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।

অতিথি লেখক এর ছবি

এরপর, সেইদিন গ্রামের বাড়িতে টয়লেটে যাওয়ার সময়, হাম্মামখানার ঠিক পিছনে বর্জ্যভরা ডোবার ধারে হামাগুড়াইতে থাকা, তোর রুপ ধরা যেই খারাপ জিনিসটারে দেখছিলাম ভাবতেছি সেইটাকে নিয়ে গল্প লিখব। রেডি থাকিস দেঁতো হাসি

ধৈবত

অতিথি লেখক এর ছবি

ব্যাপক মজা পাইলাম... হাসি
এহন থিকা মুতি ঠিকমত হানি লইতে অইব... চোখ টিপি

হিমাগ্নি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ, হিমাগ্নি

এহন থিকা মুতি ঠিকমত হানি লইতে অইব...

পাক পবিত্র হয়ে চলবেন, প্রয়োজনে ওযু করে থাকবেন চোখ টিপি । নাপাক জিনিসকে এইসব খারাপ বস্তু বেশি আছর করে কিন্তু

ধৈবত

সাস এর ছবি

উত্তম জাঝা!

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

গল্প ভালো হয়েছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।