প্রত্যাশা

রোমেল চৌধুরী এর ছবি
লিখেছেন রোমেল চৌধুরী [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৩/০৩/২০১১ - ৯:১৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

রাতের নিকষ গায়ে বুনে দিতে পারি যদি আমাদের ভালোবাসা সব
আমদের কিছু গান, কিছু কিছু ছেঁড়া সুখ, মায়াময় প্রিয় অনুভব
কিছু ম্লান মুখ যদি ফের ভাসে মাঠে মাঠে দুপুরের বিরহী বাতাসে
ফিকে রোদ নিভে এলে সুর তুলে ঝিঁ ঝিঁ ডাকা পুকুরের চেনা চারিপাশে
যখন তারারা এসে অচেনা দিনের মতো ভিড় করে আকাশের গায়
নিভে আসে ছায়াপথ আলো জ্বেলে দিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে দূর নীলিমায়
জ্যোৎস্নার ঢেউ এসে আকাশের নদী তীরে স্নেহ মেখে দেয় বার বার
আমাদের সব প্রাণ সেইক্ষনে মিলে মিশে আহা যদি হয় একাকার!

একদিন এই ঘরে ভালোবাসা ছিল আর ছিল কত সোনার প্রহর
নিবিড় স্বপ্নের মতো বুক জুড়ে আঁকা ছিল শরতের পাখিডাকা ভোর
সবুজ টিয়ের মতো তরুণ ধানের ক্ষেতে চোখ পেতে রাখবার দিন
রয়ে গেছে এখনো কি তাদের স্নেহের কোলে আমাদের আরো কিছু ঋণ?
কদিনের বেঁচে থাকা ধুঁকে ধুঁকে বুকে নিয়ে কেমিক্যালে ভেজা ভালোবাসা
স্মৃতি বড় জ্বালাময়ী, তার চেয়ে জ্বালাময়ী এতটুকু রাঙা প্রত্যাশা।


মন্তব্য

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

"স্মৃতি বড় জ্বালাময়ী, তার চেয়ে জ্বালাময়ী এতটুকু রাঙা প্রত্যাশা।"
ভালো লাগলো...

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

বোন,
ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ছে ধুলো ছুটছে তুফান মেল
পড়ন্ত রোদ, ধুলোয় ঢাকা স্মৃতির সাইকেল;

স্মৃতির ছিপে আটকে গেছে আজব কিসিম মাছ
সেসব ভুলে হাঁপটি ছেড়ে বাঁচ বাবাজী বাঁচ।
ভালো লাগা থাকতে থাকতেই পালিয়ে বাঁচুন।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

স্মৃতি বড় জ্বালাময়ী, তার চেয়ে জ্বালাময়ী এতটুকু রাঙা প্রত্যাশা।

বরাবরের মতই দুর্দান্ত বস্‌ গুরু গুরু

শুধু শেষের লাইনের আগের লাইনে "কেমিক্যাল" শব্দটা কেনোজানি এই অসাধারণ কবিতার শব্দমায়ার পুরো আবহের সাথে খাপছাড়া লাগলো। এটা নিতান্তই আমার দুর্বল মস্তিষ্কের আবাল অভিমত।

অতীত

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

সূবর্ণ অতীত,
নিশ্চয়ই একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন, ব্লগে কবিতা প্রকাশ করে কবি আর নিভৃতচারী থাকতে পারছেন না। তাঁকে পাঠকের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমি মনে করি এটি একটি পজেটিভ দিক। কবিকে এবার অবগুন্ঠন খুলতে হবে, দুর্বোধ্যতার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অবকাশ আর নেই। পাঠকের চোখ খুলে যাচ্ছে, তারা শব্দচয়ন, ছন্দ প্রকরণ, রূপকল্প, বিন্যাস, উপমা-রূপকের হেঁয়ালি, আবহ সঞ্চারের মুনশিয়ানা, কালোত্তীর্ণতা, সময়ের স্ত্রোত মাপার পারদর্শিতা, কল্পনাবিন্যাস সবকিছুর ব্যাখ্যা চাইছেন। শুধু লিখেই কবির দায়িত্ব খালাস হচ্ছে না, একই সাথে তাঁকে ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইতে না হলেও ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে নিজের অবস্থানকে। আমার মনে হয় এই ধারা অব্যাহত থাকলে কবির বচন রচনার উৎকর্ষ যেমন বাড়বে, তেমনি স্বল্পায়াসেই তৈরি হবে শিল্পবোদ্ধা সমঝদার পাঠক।
'কেমিক্যাল' শব্দটি প্রতিস্থাপনের জন্য যুতসই জাতভাই খুঁজছি! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। হাসি

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

বস, জীবন আর প্রকৃতিকে এতো নিবিড়ভাবে বেধেছেন যে নতুন করে বড়োই আত্মনুসন্ধানের সাধ জাগে। তার পরেও সাইকেলের চাকার জীবন। মাঝে মাঝে টাল খায়, মাঝে মাঝে স্পোক কাটে, আর প্রায়শই পাঙ্কচার হয়।

বাঁচতে হয় বলেই বেঁচে থাকা হয়,
সমীকরণে আসেনা জয় পরাজয়।

লেখায় যথারীতি উত্তম জাঝা!

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ছোটো,
তোর অসাধারণ দ্যূতি ছড়ানো মন্তব্য সংসার বিরাগী করে। চল, যাবি নাকি বানপ্রস্থে?

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

বস, যেখানেই যেতে বলেন যেতে পারি, অসুবিধা নেই। বানপ্রস্থেও যেতে পারি। তবে নিশ্চিত হতে হবে যে যেখানে যাবো সেখানে বিড়ি সিগারেট পাওয়া যায়। নাহলে আমি নেই। পৃথিবীর সব সুখ বাদ দিতে পারি কিন্তু বিড়ি বাদ দিতে পারবো না।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

তাহলে চল মাজারে যাই, এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

তা'ই যাই, চলেন বস। বিড়ির মধ্যে কিছু শুকনোও মিশিয়ে নেবো যদি পাই।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

চলুক

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

রাজাসাহেব,
গাড়ী যে আর চলে না! আসি আসি বলে শব্দেরা দিচ্ছে ফাঁকি! আপনি তো এরই মধ্যে সুপারহিট!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

পুরো একমত, রাজাবাবু একটার পর একটা মাস্টারপিস ঝেড়ে যাচ্ছেন। দারুন উপভোগ্য রাজাবাবুর লেখাগুলো।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

রোমেল ভাই---রাত:স্মরণীয় ভাই,

আমি যে লাজে মরে লাল হয়ে যায়।

লইজ্জা লাগে লইজ্জা লাগে লইজ্জা লাগে

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

সবুজ পাহাড়ের রাজা লাল হলে তো লাল-সবুজের এই দুর্দিনে কিছুটা আশার আলো দেখি!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

উত্তম জাঝা!

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

আজ রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যাব।
সব বন্ধুরা যাচ্ছে।
কয়েকদিন থাকবো।
নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছি রে ভাই।
কত যে সৃত্মি.......................................

রোমেল ভাই, রাত:স্মরণীয় ভাই আর সচল পরিবারের সবাইকে খুব মিস করবো।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

শুভকামনা রইল। ভালো কাটুক আপনার সময়।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

দুর্দান্ত! আপনার লেখা বরাবর দুর্দান্ত

________________________________________
হামিদা রহমান
প্রতিটি দিন-ই হোক, একটি সুন্দর দিন

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

বোন,
ছেলেবেলায় হা ডু ডু খেলায় আমায় নিতো না কেউ। বেশিক্ষণ দম ধরে রাখতে পারতুম না বলে। অক্ষরবৃত্তের ছাব্বিশ মাত্রায় বাঁধা সনেটটিতে তাই একটু দমের খেলা খেলে নিলুম। জীবনানন্দের ‘শকুন’ ও ‘পথ হাঁটা’ সনেট দু’টিতে এমনটি পাবেন। তবে সেখানে পংক্তিবিন্যাস ভিন্নতর। অষ্টক-ষটকে বিভক্ত না হয়ে বরং তিন পংক্তির চারটি স্তবক। বোধকরি, দমের ও প্রাণের খেলায় আমার মতোই জীবনানন্দও বড় উপেক্ষিত ছিলেন। তোমায় ধন্যবাদ।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

শেখ জলিল এর ছবি

আমদের কিছু গান, কিছু কিছু ছেঁড়া সুখ, মায়াময় প্রিয় অনুভব
কিছু ম্লান মুখ যদি ফের ভাসে মাঠে মাঠে দুপুরের বিরহী বাতাসে
ফিকে রোদ নিভে এলে সুর তুলে ঝিঁ ঝিঁ ডাকা পুকুরের চেনা চারিপাশে
যখন তারারা এসে অচেনা দিনের মতো ভিড় করে আকাশের গায়
............................চমৎকার স্মৃতি, প্রত্যাশা। খুব ভালো লাগলো।
আসলে আমরা দুঃখবাদী কবিরা জীবন বাবুকে বুকে আঁকড়ে রাখি আজীবন। আমাদের কথা, গানে, কবিতায় সত্যিকারের জীবনানন্দীয় ছোঁয়া ফিরে আসে বারবার।

যতবার তাকে পাই মৃত্যুর শীতল ঢেউ এসে থামে বুকে
আমার জীবন নিয়ে সে থাকে আনন্দ ও স্পর্শের সুখে!

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ঠিক বলেছেন জলিল ভাই।

আমাদের পায়ে মাঠ, দুঃখঘাসে ভরা
আমাদের পায়ে ফুল : চাপা, চ্যাপ্টা, মরা

তাই,
দুঃখের তিমিরে ডুবে আমরাতো তিমির বিনাশী
জীবন ও আনন্দ খুঁজে নিজ ভুমে হই পরবাসি

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

সবুজ টিয়ের মতো তরুণ ধানের
ক্ষেতে চোখ পেতে রাখবার দিন

ভাল কবিতা পড়ার আনন্দটা অসাধারণ

রাখাল বালক

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

লইজ্জা লাগে

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

প্রখর-রোদ্দুর এর ছবি

রাতের নিকষ গায়ে বুনে দিতে পারি যদি আমাদের ভালোবাসা সব
আমদের কিছু গান, কিছু কিছু ছেঁড়া সুখ, মায়াময় প্রিয় অনুভব....

শিশির এর মতো যেন ঝড়ে পরে স্মৃতির আভায় সবুজ লুকিয়ে রাখা বুকে ।
ভালো লাগলো ।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ভাই,
'রাতের তারার মাঝেই লুকিয়ে আছে দিনের সকল আলো'
প্রখর-রোদ্দুরের মাঝে খেলা করে ছায়া ঝিলমিল জলতরংগ।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

কুটুমবাড়ি [অতিথি] এর ছবি

ভালো লাগল, রোমেল ভাই। একজন ভক্ত পাঠক হিসেবে আপনার কাছে দিনদিনই প্রত্যাশা বাড়ছে। হাসি

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

কুটুম ভাই,
ধন্যবাদ আপনাকে, যথাসাধ্য চেষ্টা থাকবে আমার!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ঘ্যাচাং

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

কৌস্তুভ এর ছবি

আপনার প্রকৃতির উপর কবিতাগুলো প্রায়ই দেখি পরিবেশবাদী আন্দোলনের কাজেও ব্যবহার করা যায় হাসি

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

কৌস্তুভ ভাই,
এই আন্দোলন বোধকরি খুব জরুরী। আমাদের সবাইকে নিজ অস্তিত্ব রক্ষায় এতে সামিল হতে হবে।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

একটা বিষয় আমি বুঝিনা, কবির ভাবনা আর অনুভূতি ঠিক ১৪ লাইনেই (যেখানে আবার ৮+৬-এর প্যাঁচ আছে, শেক্সপীয়ারিয়ান বা পেত্রার্কিয়ান ফর্মুলার প্যাঁচ আছে) প্রকাশ করা যায় কীভাবে? এতে কি কবির স্বাধীন চিন্তা ব্যাহত হয় না? মাত্রা ভাঙলে যদি ভাব প্রকাশ সঠিক ভাবে হয় তাহলে বাধা কোথায়! ছন্দের মিল হতে গেলে যদি ভাব পালটে যায় তাহলে সেই কবিতা কি স্বার্থক? - আমার এই প্রশ্নগুলো এই কবিতা সম্পর্কে নয়। কবিতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ খুব সীমিত বলে রোমেল ভাইয়ের এই পোস্টে আলোচনাটা তোলার ধৃষ্টতা দেখালাম। আমি কবি নই, তাই কেন ওসব হতে পারে তা জানি না। কবিরা জানালে আমার মত কবিতা পাঠকদের উপকার হয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

একটা বিষয় আমি বুঝিনা, কবির ভাবনা আর অনুভূতি ঠিক ১৪ লাইনেই (যেখানে আবার ৮+৬-এর প্যাঁচ আছে, শেক্সপীয়ারিয়ান বা পেত্রার্কিয়ান ফর্মুলার প্যাঁচ আছে) প্রকাশ করা যায় কীভাবে? এতে কি কবির স্বাধীন চিন্তা ব্যাহত হয় না?

বোধকরি সনেটকে তুলনা করা চলে সুকঠিন ভাস্কর্যের সুডৌল সৌন্দর্যের সাথে। সেখানে কাঠামোগত স্থুলতা কিম্বা শীর্ণতা কোনটিই কাম্য নয়। চৌদ্দ পংক্তির সুনির্ধারিত অবয়বে ইতালীয় সনেটের ধাঁচে বাংলাভাষায় প্রথম রচিত সনেট মধুসূদনের। কিন্তু তারও আগে চৌদ্দ পংক্তির কবিতা কি রচিত হয় নি? হয়েছে। কাহ্নপাদারামের ‘রাগ দেশাখ’ কিম্বা চণ্ডীদাসের ‘সিন্ধুড়া’ও তো চৌদ্দ লাইনের পদ্য। কিন্তু সেখানে সুকঠিন ভাস্কর্যের সুডৌল সৌন্দর্য নেই, আছে মনোহর বনপুস্পের বিচিত্র আনন্দ-সুরভি। আপনার মতানুযায়ী সেখানে রয়েছে চিন্তা ও ভাব বিকাশের সুবিধা পাবার জন্য প্রকরণগত শিথিলতাকে প্রশ্রয় দান। এইসব কবিতার ভাবদেহকে দীর্ঘায়িত করাও যেমন দূরূহ নয়, তেমনি সংকুচিত করাও সম্ভব। কিন্তু সনেটের সঙ্গীতধ্বনিতে বেজে উঠে প্যাশন ও অনুভূতির যূথচারী অনুরণন। শব্দ, রূপক, সূক্ষ্মতা ও গাঢ়বদ্ধতা তার ভাবদেহকে করে সমৃদ্ধ ও সুডৌল। সংক্ষিপ্ততা ও সংহত গড়ন স্বাক্ষর বহন করে শৈল্পিক উৎকর্ষের। সনেটের তুলনা সমুদ্রের উজান-ভাটার সাথে। অষ্টকে উচ্ছলিত, ষটকে অবগুণ্ঠিত। আর যদি মিল-বিন্যাসের কথায় আসি, তবে পংক্তি থেকে পংক্তিতে অন্ত্যমিল যত দূরান্তরিত, ভাবের বিস্তারও ততদূর প্রসারিত। মিল-বিন্যাসের মধ্যদিয়েই এক একটি বিষয়-কল্পনা অখণ্ড রসমূর্তি ধারণ করে। সমতল প্রশস্ত পথ ছেড়ে সার্কাসের সরু দড়ির উপর ভারসাম্য রেখে হেঁটে যাওয়ার মুনশিয়ানা দেখাবার কি প্রয়োজন, বলুন তো?

আর স্বাধীন চিন্তায় বাধাদানের প্রশ্ন উঠছে কেন? কে বলেছে যে কবিকে শুধু রাগ সংগীত গাইতে হবে? তিনি ভাটিয়ালি কিম্বা ভাওয়াইয়া যেমন গাইতে পারেন, তেমনি হার্ডরক কিম্বা র‍্যাপ। তবে কিনা তিনি যেটাই গান না কেন, প্রত্যেক গানেরই কিন্তু নিজস্ব একটা সুর আছে সেটি তাঁকে সমীহ করে চলতে হয়। হার্ডরকের সুরে যেমন রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া যায় না তেমনি শিথিল বিন্যাসে সনেট হয়না। তবে এমন তো নয় যে কবিকে তাঁর কবিতা লেখার জন্যে শুধুমাত্র সনেটের কাছেই দায়বদ্ধ থাকতে হবে। তাছাড়া সনেটেরও তো রয়েছে নান রকমফের, এমনকি স্পেন্সরীয় স্তবকবুনোটে নয় পঙক্তির সনেট লিখেছেন মোহিতলাল, অজিত দত্ত, জীবনানন্দ খোদ বাংলায়। তাই বোধকরি বৈচিত্র্য হারাবে না, স্বাধীনতাহরণ ঘটবে না।

মাত্রা ভাঙলে যদি ভাব প্রকাশ সঠিক ভাবে হয় তাহলে বাধা কোথায়!

ভাবপ্রকাশ আর মাত্রাবিন্যাসের বিপরীতমুখি অবস্থানে মাত্রা কিম্বা ছন্দ ভাংতে নিষেধ আছে বলে তো জানিনা? কিন্তু যদি মাত্রাবিন্যাস, মধ্য-অন্ত্য-আন্তঃমিল আর ভাবপ্রাকাশ পরস্পরের সহায়ক হয় (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহায়ক হয় বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস) তবে?

তবে কি না মাত্রা ও ছন্দ ভাঙায় সকলেই নয় দড়। ভাঙারও নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। সেটি না শিখলে তছনছ করে ভাঙা যাকে বলে তাই হয়। অপরূপভাবে ভাঙা গড়ার চাইতেও যে সুন্দর! তবে আমি মনে করি কাব্য রচনার প্রথম থেকেই মুক্তছন্দে লিখা অনুচিত। যাতে এটুকু ভাবার অবকাশ না থাকে যে, কবি বোধকরি ছন্দে সুবিধা করে উঠতে পারেন নি।

ছন্দের মিল হতে গেলে যদি ভাব পালটে যায় তাহলে সেই কবিতা কি স্বার্থক?

ছন্দ বলতে আমরা অনেকেই শুধু মিলকেই বুঝি। ছন্দের প্রসারিত প্রান্তর যে মিলের বারান্দা ছাপিয়ে আরও অনেকদূর চলে গেছে তা ব্যাখ্যা করবার জন্য দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন। সংক্ষেপে এটুকুই বলি, ছন্দের দোলা লাগানোর মুল উদ্দেশ্যই কিন্তু ভাবের মেজাজকে সুললিত ও সুবিন্যস্ত করার মাঝে আবর্তিত।

আপনার জিজ্ঞাসা নিঃসন্দেহে বড়ই মধুর আলোচনা অবতারণা করার মতো। আমি আকাট মূর্খ, তাই বোধকরি তেমনটি হলো না। আমি কবি নই, আমায় ক্ষমা করবেন।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

কবি, এই আলোচনাটা দরকারী - অন্ততঃ কবিতার পাঠকদের কাছে। এখানে যা বললেন সেগুলোকেই একটু বিস্তারিতভাবে, উদাহরণসহ লিখে পোস্ট করে দিন সচলের পাতায়। আলোচনাটা সেখানে চলুক। তাতে আমাদের জানার পরিধি বাড়বে, জানার মধ্যে থাকা ভুল দূর হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

এরকম একটা পোস্ট দেবার কথা একবার চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু পরমুহূর্তেই সাত-পাঁচ ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। এখন ভাবছি, কেতাবী আলোচনায় না গিয়ে এই বিষয়গুলিকে লঘু আদলে ফুটিয়ে তোলা যায় কি না।

হয়ত একটা ধুম আড্ডার ছবি আঁকা হলো। তাতে কতগুলো চরিত্রের সংলাপের মধ্যদিয়ে উঠে আসলো বিষয়গুলো। হালকা রসিকতাও থাকলো কিছু। কিন্তু আমার তো ষষ্ঠপাণ্ডব, হিমু, নজরুল, তিথীডোর, তাসনীম, অনিন্দ্য, কৌস্তুভ (আরো অনেকেই এই তালিকায় আছেন, তালিকা দীর্ঘ হবে বলে তাদের নাম অনুচ্চারিত থাকলো) এইসব সচল কিম্বা হালের মেঘদূত নামের অচলটির মতো গদ্য লেখার মুগ্ধ করা শৈলী নেই, নেই কুশলী প্লটবিন্যাসের ক্ষমতাও। তাই এমন আলোচনার ছবি তুলে ধরতে আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আসুন না, কয়েকজন মিলেই লেখা যাক। টেকনিক্যাল বিষয়গুলির দায়িত্ব না হয় আমিই নেব।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

তিথীডোর এর ছবি

জ্যোৎস্নার ঢেউ এসে আকাশের নদী তীরে স্নেহ মেখে দেয় বার বার
আমাদের সব প্রাণ সেইক্ষনে মিলে মিশে আহা যদি হয় একাকার!

চলুক

স্মৃতি বড় জ্বালাময়ী

'পড়বে কিছু পালক পুড়ুক,
অশ্বমেধের ভস্ম উডুক বাতাস চিরে।
আজকে দেখি খালি মুঠোয়
অন্য রকম কষ্ট লুটোয় ছটফটিয়ে।
বাসর-ভাঙা বাসি ফুলে উড়ছে মাছি....
কেবল স্মতি গন্ধ আছে, তাইতে আছি গা ডুবিয়ে।
ডুবতে ডুবতে সব চলে যায় অন্য পারে
সুর্য থেকে সন্ধ্যা ঝরে শিশির-কাতর।'
#যখন তোমার ফুলবাগানে – পুর্ণেন্দু পত্রী হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

বোন,
ধন্যবাদ দু'কারণে।
এক। কবিতা পড়বার জন্য।
দুই। এমন চমৎকার কবিতা পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য। পত্রীর কথোপকথন তেমন মন লাগিয়ে পড়িনি। বাস্তবিকই আমি আজন্ম প্রেম কিম্বা স্বপ্ন বিবর্জিত।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।