সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মামলার সাক্ষী ও নির্যাতিতরা - দ্য আনসাং হিরোজ

রানা মেহের এর ছবি
লিখেছেন রানা মেহের (তারিখ: সোম, ২৩/১১/২০১৫ - ৮:৫৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শুধু বাংলাদেশের নয় পুরো বিশ্বের ইতিহাসে দুজন ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী মিলিটারির সাথে এই দুটো লোক তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধে কাজ করে গেছে গণহত্যাকারী হিসেবে-সুপ্রীম রেসপনসিবিলিটি হিসেবে।
বাংলাদেশকে ভারমুক্ত করার পথে এক ধাপ এগিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি হয়েছে এই দুই নৃশংস যুদ্ধাপরাধীর। কাল আর আজ যখন আমাদের দেশের প্রচার মাধ্যমগুলোর জানানোর কথা একাত্তরে তাদের ভূমিকা কী ছিল, কোন কোন অপরাধে এই শাস্তি প্রাপ্য তাদের কিংবা তুলে আনা উচিত ছিল এই দুই পশুর হাতে নির্যাতিত মানুষের রক্ত নিঙড়ানো কষ্টের উপাখ্যান, অসম সাহসী সাক্ষীদের কথা তখন মিডিয়া নির্লজ্জ্বের মতো, লোভী বেহায়া পাপীর মতো বারবার দেখিয়ে গেছে তাদের সন্তানদের বিদ্রুপভরা মন্তব্য, অপরাধীদের খাবারের মেন্যু, তাদের পরিবারের দুর্বিনীত আচরন।
এই দুজনের অপরাধ একজন আরেকজনের কম না। কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচারে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মামলার সাক্ষীদের কথা, তাদের দেয়া সাকা চৌধুরীর অত্যাচারের বিস্তৃত বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

২০১০ এর ২৬শে জুন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর নামে একটা কেইস ফাইল করা হয়। একই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর প্রতিপক্ষ দলের মিছিলে অগ্নি সংযোগের মামলায় গ্রেফতার হন তিনি। তিনদিন পর ১৯শে ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ এর ১৭ই নভেম্বর আদালর তার বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণেরর অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণীত হওয়ায় ২০১৩র ১ই অক্টোবর তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা সহ ৪১ জন সাক্ষী রাষ্টপক্ষের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেন। এদিকে ৫ জন সাক্ষী আনার কথা থাকলেও আসামীপক্ষ মাত্র ৪ জন সাক্ষী হাজির করতে পারে যার মধ্যে একজন অভিযুক্ত নিজে। দুবছর পর ২৯শে জুলাই ২০১৫তে আপীলের রায়েও সুপ্রীম কোর্টে তার সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকে। আপীলের শেষ পর্যায়ে অভিযুক্ত পাকিস্তানে ছিলেন এই যুক্তি দেখিয়ে অ্যালাবাই হিসেবে পাকিস্তানের ৮ জন 'বিশিষ্ট' ব্যাক্তিকে আদালতে হাজির করতে চান আসামীপক্ষ। সেই অ্যালাবাইদের বক্তব্যে বিভিন্ন গড়মিল থাকায় এবং সর্বোপরি আইনত নতুন সাক্ষী গ্রহণের কোন সুযোগ ন থাকায় সেই আবেদন নাকচ করে দেয় আদালত। ২০১৫ এর ১৮ই নম্বেম্বর তার করা রিভিউ আবেদন খারিজ হয় আদালতে। সবশেষ উপায় হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা মঞ্জুর না হওয়ায় এবং সব রকম আইনী বাঁধা দূর হওয়ায় ২২শে নভেম্বর ২০১৫ এর প্রথম প্রহরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার রায় কার্যকর করা হয়।

বিভিন্ন সাক্ষীর বয়ানে জানা যায় তার প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। ১৯৭০ এর নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরী হেরে যান অপেক্ষাকৃত তরুণ এক আওয়ামীলীগ কর্মীর কাছে। ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী দুজনেরই ধারণা ছিল এর পেছনে দায়ী হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত লোকেরা। তাই ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সুযোগ পাওইয়া মাত্র তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে মূলত হিন্দুদের ওপর। জগৎমল্লপাড়া, সুলতানপুর, গহীরা, উনসত্তর পাড়ায় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা চালান তিনি। আগুনে পুড়িয়ে দেন তাদের ঘরবাড়ি, লুট করা হয় তাদের সম্পদ, অল্পবয়স্ক মেয়েদের তুলে দেন পাকিস্তানী সেনাদের হাতে। তার হাত থেকে ছেলে, বুড়ো, বাচ্চা কেউ রেহাই পায়নি। তার বাসস্থান গুডস হিলে আল শামস বাহিনীর টর্চার সেল গড়ে তোলেন তিনি। চট্টগ্রামের আল শামস ও আল বদর বাহিনী মূলত তার বাবা ফজলুল কাদের এবং তার নির্দেশনাতেই গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও তার নিষ্পত্তি তুলে ধরছি নীচে।

মধ্যগহীরা গণহত্যা (চার্জ ২) – ২০ বছর কারাদণ্ড
১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল সালাউদ্দীন কাদেরের নেতৃত্বে মধ্যগহীরায় পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, দুলাল শর্মা ও জ্যোতিলাল শর্মাকে হত্যা করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের চাক্ষুষ সাক্ষী – ৬ এর ভাষ্যে জানা যায় ১৩ই এপ্রিল ১৯৭১ এর সকালে মিলিটারি আসার খবরে পালিয়ে যাবার উদ্দেশ্য ঘর থেকে বের হন সাক্ষী ৬, বাবা জয়ন্ত কুমার শর্মা, তার ভাই সুনীল শর্মা, ভাগিনা দুলাল শর্মা। পালাবার পথে শুনতে পান হানিফ খন্দকারের মসজিদ থেকে ঘোষনা দেয়া হচ্ছে, শান্তি কমিটি ঘোষনা করা হয়েছে। গ্রামবাসী বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন যেন ঘর ছেড়ে বাইরে না যান অন্যথায় তাদের সম্পত্তি লুট করা হবে। তাদের জানানো হয় ঘরে থাকলে তারা বিপদমুক্ত থাকবেন।
ঘোষনায় আশ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরে খেতে বসেন তারা। একটু পরেই দেখতে পান পাকিস্তানী মিলিটারির সাথে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী তাদের দরোজায় দাঁড়িয়ে। মিলিটারিরা তাদের ভয় না পেয়ে ঘরের বাইরে আসতে বলে। বাইরে আসা মাত্রই একজন আর্মি বলে হ্যান্ডস আপ আর আরো তিনজন আর্মি তাদের হাত ধরে টান দেয় নিজেদের দিকে নিয়ে আসতে। সাক্ষী ৬ জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন আর তার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে চিৎকার করে পায়ে পড়ে যান আর্মিদের, জীবন ভিক্ষা চান। সৈন্যরা বাকিদের ঘরের ভেতর যেতে বলে মাখন লাল শর্মাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসে উঠোনে। পরিবারের বাকি সদস্যরাও ঘরের বাইরে এসে মিনতি করতে থাকে তাদের জীবন বাঁচানোর।
পাকিস্তানী সেনারা তাদের পশ্চিমদিকে মুখ করে দাঁড়াতে বলে এবং গুলি চালায়। গুলি চালানো শুরু হবার সাথে সাথে পড়ে যাওয়ায় বেঁচে যান সাক্ষী ৬। সালাউদ্দীন ও সেনারা ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

তারা চলে যাবার পর তিনি দেখতে পান তার মা পঞ্চবালা শর্মা, বোনের ছেলে দুলাল শর্মা, ছোট ভাই সুনীল শর্মা এবং কাকা জ্যোতিলাল শর্মার লাশ পড়ে আছে আর গুরুতর আহত কাকা মাখন লাল শর্মা মার যান কদিন পর। গুলির শব্দে বধির হয়ে আরেক ভাই বিমল কুমার শর্মা পরের দিন আশ্রয় নেন গুরুদোয়ারা গ্রামে। গুরুতর আহত বাবা সাক্ষী ৬কে জীবন বাঁচানোর জন্য ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলেন। প্রতিবেশী দারুচাচার সহায়তায় মুসলিম বেশ ধরে ভারতের রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেন সাক্ষী ৬ এবং তার ভাই।
শর্মা পরিবারের ওপর নির্বিচার হত্যার স্বপক্ষে আরো সাক্ষ্য প্রদান করেন সাক্ষী ২৯, ঘটনার সময় যার বয়স ছিল ৯ বছর। তিনি জানান তিনি ও তার পরিবার পালাবার সময় গুলির শব্দ শুনতে পেয়ে তারা পাশের ঝোঁপে আত্মগোপন করেন। এক ঘন্টা লুকিয়ে থাকার পর সেই ঘরে গিয়ে দেখতে পান পঞ্চবালা, সুনীল, দুলাল ও জ্যোতিলালের নিষ্পন্দ দেহ এবং গুরুতর আহত জয়ন্ত ও মাখন লাল উঠোনে পড়ে আছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ এর ধারা ৩(২)(সি)(আই) অনুসারে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণীত হওয়ায় অভিযুক্তকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।

নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকাণ্ড (চার্জ ৩) – মৃত্যুদণ্ড
এই অভিযোগে বলা হয় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ১৯৭১ সালের ১৩ ই এপ্রিল সকালে পাকিস্তানী সেনাদের সাথে এনে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করেন।

নূতন চন্দ্র সিংহের ভাইয়ের ছেলে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৪ জানান যৌথ পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি থাকতেন কুণ্ডেশ্বরী ভবনে এবং ভবন দেখাশোনার কাজ করতেন। বিশিষ্ঠ সমাজ সেবক নূতন চন্দ্র সিংহ ছিলেন কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় এবং এর কারখানা, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ, ছাত্রীনিবাস এর প্রতিষ্ঠাতা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর সাক্ষী ৪ এবং আরো কজন নূতন চন্দ্রকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাবার অনুরোধ করেন কিন্তু অস্বীকৃতি জানান তিনি।

১৩ তারিখ সকাল ৯টার দিকে তারা দেখেন একটি আর্মি জিপে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, তার কিছু সংগী এবং পাকিস্তানী মিলিটারি কুণ্ডেশ্বরী ভবনে প্রবেশ করছে। সাক্ষী ৪, হিমাংশু ও মনোরঞ্জন কাছের জঙ্গলে লুকিয়ে দেখতে থাকেন কী ঘটছে। আর্মি এবং সাকা চৌধুরী নূতন চন্দ্রের সাথে কথা বলার পর চলে গিয়ে আবার ফিরে আসেন ১৫/২০ মিনিট পর। তার একটু পরেই গুলির শব্দে ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে তারা প্রতিবেশী আবুল বাশারের বাসায় আশ্রয় নেন এবং তাকে অনুরোধ করেন নূতন চন্দ্রের খবর নিয়ে আসতে।
আহমেদ বাশার তাদের জানান নূতন চন্দ্রের মৃতদেহ মন্দিরের সামনে পড়ে আছে। তারা ফিরে গিয়ে দেখতে পান তার মাথায় ও বুকে গুলির চিহ্ন। পরের দিন সাক্ষী ব্রজহরি কর্মকারের কাছ থেকে সাক্ষী ৪ জানতে পারেন ঘটনার সময় ব্রজহরি এবং গোপাল দাশ দালানের একতলায় ছিলেন। সেখান থেকে তারা দেখেন নূতন চন্দ্র সিংহের সাথে কথা বলার পর চলে গিয়ে আবার সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, তার বাঙালি সহযোগীরা এবং পাকিস্তানী মিলিটারি ফিরে আসে। তারা টেনে হিঁচড়ে তাকে বের করে মন্দীর থেকে এবং ব্রাশফায়ার করে তাকে। মিলিটারির ব্রাশ ফায়ারের পর সাকা চৌধুরী নিজে তাকে আবার গুলি করেন।

এই ঘটনার আরেকজন চাক্ষুষ সাক্ষী হলেন সাক্ষী ১৪, গোপাল চন্দ্র দাশ, ঐ সময়ের কুণ্ডেশ্বরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ্য। ঘটনার দিন, ১৩ই এপ্রিল ১৯৭১ কুণ্ডেশ্বরী কমপ্লেক্সে লুকিয়ে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০টি পরিবারের খোঁজে পাকিস্তানী মিলিটারি ও সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী কমপ্লেক্সে আসে। তাদের আসার পরেই সাক্ষী ১৪ এবং ব্রজহরি ভবনের একতলায় আশ্রয় নেন এবং বাকিরা লুকায় কাছের ঝোঁপে। সাক্ষী ১৪র বর্ণনাও আগের সাক্ষীর সাথে মিলে যায়।
তদন্ত অফিসার সাক্ষী ১৪র সাথে সেই একতলায় যান এবং তার বর্ণনা মতো ঘটনার একটি ভূসঙ্গস্থান চিত্র আঁকেন। সাকা চৌধুরীর পক্ষের সাক্ষী অনেক চেষ্টা করেও তার সাক্ষ্যে কোন গড়মিল আবিষ্কার করতে পারেনি।
ব্রজহরির ভাষ্যে নূতন চন্দ্রের ছেলে প্রফুল্ল চন্দ্র জানতে পারেন তার পিতার মৃতদেহ তিনদিন ধরে ওখানেই পড়ে ছিল।

চাক্ষুষ সাক্ষী এবং শোনা সাক্ষীর পাশাপাশি কোর্টে পেশ করা হয় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত দৈনিক বাংলার প্রতিবেদন। যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর সম্পৃক্ততার কথা। একই ধরণের বর্ণনা পাওয়া যায় “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র-অষ্টম খণ্ড” এর পৃষ্ঠা ৪৬৫ এবং আরো কিছু পত্রিকায়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ এর ধারায় ৩(২)(a) বর্ণিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে প্রত্যক্ষ্য অংশগ্রহণ এবং যথেষ্ট পরিমাণ অবদানের (substantially contributing) অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণীত হওয়ায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা (চার্জ ৪) – ২০ বছর কারাদণ্ড
১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল সকালে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ও তার দল এবং পাকিস্তানী মিলিটারিদের সম্মিলিত বাহিনী পরিকল্পিতভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সেখানে গণহত্যা চালায়।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ১২র ভাষ্যমতে তিনি সুলতানপুর গ্রামের অধিবাসী এবং একজন অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার। ১৩ই এপ্রিল এর সকালে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাবধানবাণী শুনে তিনি ও তার পরিবার দ্রুত পালিয়ে যান। দুই ঘন্টা পরে জগৎমল্লপাড়ার ঘটনা শুনে সেখানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং দেখেন তার বড় ভাইয়ের বৌ জ্যোৎস্নাবালা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। তিনি তাকে উদ্ধার করে বীনাজুরিতে নিয়ে আসেন।
কিছুক্ষণ পর বীনাজুরিতেও আক্রমণ শুর হলে তিনি কোনক্রমে ভারতে পালিয়ে যান। স্বাধীনতার পর ফিরে এসে দেখতে পান তার বড়ভাই হিমাংশু বিমল চৌধুরী, আরেক ভাই শীতাংশু বিমল চৌধুরী, কাকা সুরেন্দ্র বিমল চৌধুরী, কাকী চারুবালা চৌধুরী এবং আরেক ভাই কিরন চন্দ্র চৌধুরী সহ গ্রামের বহু মানুষ এই আক্রমনে নিহত হয়েছেন। প্রতিপক্ষ উকিল তাকে জেরা না করায় আদালতে ধরে নেয়া হয় এই গণহত্যার ঘটনা সত্যি।

রাষ্টপক্ষের সাক্ষী ১৩ জানান তার বাবা তাকে এবং তার পরিবারকে বীনাজুরিতে তার পিসী কুটি রানীর ঘরে যেতে বলেন। ওই দিন, ১৩ই এপ্রিল দুপুরে মামা অরবিন্দ সিংহের কাছে জানতে পারেন স্থানীয় মুসলিম লীগ কর্মীদের সহায়তায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং পাক আর্মি জগৎমল্লপাড়া আক্রমন করেছে এবং সেই আক্রমনে মারা গেছেন পিতা প্রমাংশু বিমল চৌধুরী, ভাই অশোক কুমার চৌধুরী, পিসী মনোরমা চৌধুরী, কাকা সীতাংশু বিমল চৌধুরী, কাকাতো ভাই অমলেন্দু চৌধুরী সহ ৩০/৩৫ জন মানুষ। তিনি আরো জানতে পারেন জ্যোৎস্নাবালা চৌধুরী, অমলেন্দু চৌধুরী সহ অন্যান্যরা গুরুতরভাবে আহত।
স্বাধীনতার পর ভারত থেকে ফিরে তিনি জ্যোৎস্নাবালা এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে শুনতে পান কীভাবে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর সহায়তায় পাকিস্তানী আর্মি জগতমোল্লা পাড়ায় নির্বিচার গণহত্যা চালায়। এমনকী প্রথম ঘটনার এক মাস পর সাকা চৌধুরী আবার ফিরে আসে এবং অপহরণ করে হত্যা করে বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী, বিভূতি চৌধুরী, বীরেন্দ্র চৌধুরীকে।

সাক্ষ্য আইন ১৯(২) ধারা মোতাবেক রেকর্ডকৃত সাক্ষ্যে জ্যোৎস্নাবালা চৌধুরীর কাছ থেকে জানা যায় ১৩ই এপ্রিল ১৯৭১ এ সকাল ১১টার দিকে পাকিস্তানী আর্মি তাদের গ্রামে প্রবেশ করে। দুজন বাঙালী এসে জ্যোৎস্নাবালা এবং তার স্বামী কিরন চৌধুরীকে শান্তি কমিটির মিটিং এর কথা বলে নিয়ে যায়। সেখানে অন্যান্য গ্রামবাসীর সাথে তাদের লাইনে দাঁড় করানো হয় আর মিলিটারিরা নির্বিচারে গুলি চালায় তাদের ওপর। তার স্বামীসহ ৩০/৩৮ জন গ্রামবাসী সাথে সাথে নিহত হন।। জ্যোৎস্নাবালার বুকে গুলি লাগায় তিনি মাটিতে পড়ে যান। তিনি জানান পাকিস্তানী মিলিটারির সাথে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দীন কাদের ছিল। হত্যাকাণ্ড চালানোর পাশাপাশি তারা তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। জ্যোৎস্নাবালা ২০১৩ এর ফেব্রুয়ারিতে মারা যাওয়ায় আদালত ২০১০ এর সেপ্টেম্বরে তদন্ত অফিসারকে দেয়া তার সাক্ষ্য গ্রহণ করে।

মৌখিক সাক্ষীর পাশাপাশি ২০০৮ সালে প্রকাশিত সুপ্রভাত পত্রিকার একটি প্রতিবেদন দেখানো হয় যার শিরোনাম ছিল সাঁইত্রিশ বছর পর “রাউজানের জগৎমল্লপাড়ার বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ হচ্ছে”। এই প্রতিবেদনে দেখানো হয় কীকরে ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল সারিবেঁধে দাঁড় করানো হয় ৪৭ জন মানুষকে এবং চালানো হয় গুলি। জ্যোৎস্নাবালা চৌধুরী সেই প্রতিবেদকের কাছে বর্ণনা দেন কীভাবে তার ঘরের সামনে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং পাকিস্তানী আর্মি গ্রামের মানুষকে নিয়ে আসে এবং গুলি চালায়। জগতমোল্লাপাড়ার ৪৭ জন মানুষ নিহত হন। জ্ঞান ফেরার পর জ্যোৎস্নাবালা ও অমলেন্দু বিকাশ আহত অবস্থায় সেই স্থান ত্যাগ করেন।

চাক্ষুষ সাক্ষী, শোনা সাক্ষী এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে জগৎমল্লপাড়ায় খুন, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, দেশত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে ২০ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

সুলতানপুর গণহত্যা (চার্জ ৫) – মৃত্যুদণ্ড
১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনীল বরণ ধরকে হত্য করে পাকিস্তানী মিলিটারি ও সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ২২ সুলতানপুর গণহত্যার একজন চাক্ষুষ সাক্ষী। তিনি জানান ১৩ই এপ্রিল ১৯৭১ দুপুর ১টা/১.৩০ এর দিকে সঙ্গীসহ শ্লোগান দিয়ে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং পাকিস্তানী আর্মি সুলতানপুরের বণিকপাড়ায় প্রবেশ করে। তাদের ঘরে প্রবেশ করে সাক্ষী ২২ এবং অন্যান্যদের জোরপূর্বক উঠানে নিয়ে আসে। তার কাকা মনীন্দ্র লাল ধর এবং নেপাল চন্দ্র ধর ইতিমধ্যেই সেখানে ছিলেন। সারবেঁধে দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর গুলি চালালে সবাই মাটিতে পড়ে যান কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।
জ্ঞান ফিরে পাবার পর তিনি দেখেন তার বাম পা এবং বাম হাত গুলিবিদ্ধ এবং তার বাবা আর দুজনের মৃতদেহ তার পাশে পড়ে আছে। কোনভাবে তিনি ফটিকছড়িতে তার মামার বাসায় যেতে সক্ষম হন এবং ভর্তি হন চিটাগাং মেডিক্যাল কলেজে। কনুই থেকে তার বাম হাত কেটে ফেলতে হয় এবং গুলি উদ্ধার করা হয় তার শরীর থেকে। এর ফলশ্রুতিতে তিনি জীবনভর পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াচ্ছেন। স্বাধীনতার পর রাউজান থানায় সালাউদ্দীন কাদেরের বিরুদ্ধে একটি মামলাও রুজু করেন তিনি।

২০১১ এর জানুয়ারিতে দেয়া বাদল বিশ্বাসের স্টেইটমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ধারা ১৯(২) অনুযায়ী প্রমাণ হিসেবে আদালতে পেশ করা হয়। বিবৃতিতে বাদল বিশ্বাস বলেন ১৯৭১ এর ১৩ই এপ্রিল দুপুর একটার দিকে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ ফজলুল কাদের জিন্দাবাদ” শ্লোগান দিতে দিতে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং পাকিস্তানী আর্মি গ্রামে ঢোকে। তারা উপেন্দ্র ধর, মনীন্দ্র ধর, নেপাল ধর আর অনীল ধরকে ঘরের বাইরে নিয়ে এসে গুলি করে হত্যা করে।
অনীল গুরুতরভাবে আহত হন আর বাকিরা মারা যান সাথে সাথে। এই ঘটনা ঘটতে দেখে বাদল বিশ্বাস ও তার ভাই ঘরের পেছনের ঝোঁপে লুকিয়ে পড়েন। সাকা চৌধুরী ও বাকি দুবৃত্তরা ঘরে প্রবেশ করে তাদের পিতা উমেশ চন্দ্র বিশ্বাসকে হত্যা করে এবং ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। অনীল তার ভাই এবং ভাইয়ের বঊ ও ভাতিজার সাথে ডাগুয়ার গ্রামে আশ্রয় নেন।
পরের দিন সনাতন বিশ্বাসের সাথে গ্রামে ফিরে এসে দেখেন মৃতদেহগুলো তখনো পড়ে আছে। তিনি এবং তার ভাই মিলে দেহগুলোকে বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে সমাধি দেন এবং ভারত চলে যান। প্রসিকিউশন সাক্ষী ৪১ বলেন তিনি এই সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন স্বাক্ষর সহ কিন্তু বাদল বিশ্বাস ভারতে অবস্থানরত হওয়ায় তাকে আদালতে হাজির করা যায়নি।

মূলত চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনীল বরণ ধর কে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণীত হওয়ায় সালাউদ্দীন কাদেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

উনসত্তরপাড়া গণহত্যা (চার্জ ৬) – মৃত্যুদণ্ড
এই অভিযোগে বলা হয় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, তার সহযোগীরা এবং পাকিস্তানী আর্মি ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল বিকেল ৪/৫ টার দিকে উনসত্তরপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবশত ৭০ জন হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্তকে মেরে ফেলেন। এর মধ্য থেকে ৫০ জনকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৭ আব্বাস উদ্দীন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি জানান উনসত্তরপাড়া মূলত ছিল একটি হিন্দুপ্রধান গ্রাম যেখানে মাত্র ৫/৬ ঘর ছিল মুসলমান কিন্তু হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাবের কোন কমতি ছিলনা।
১১ই এপ্রিল সন্ধ্যায় আর্মি নিকটস্থ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিলে গ্রামবাসী ভয়ে পালিয়ে যায়। ১২ই এপ্রিল পাহাড়তলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গ্রামে আসেন এবং ডঃ নিরঞ্জন দত্তকে বলেন গ্রামবাসীরা তাদের ঘরে ফিরে আসতে পারে। নিরঞ্জন দত্তের আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গ্রামবাসীরা ঘরে ফিরে আসে। পরেরদিন ১৩ই এপ্রিল মতকুল হোসেন, পিয়ারু, বার্মা ইউসুফ গ্রামে এসে তাদের নেতা কথা বলবেন বলে গ্রামবাসীকে এক জায়গায় দাঁড় করায়। সেই সময় সাক্ষী ৭ এর বন্ধু বাবুল মালী তাকে জানায় গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে আর ক্ষিতীশ মহাজনের বাড়ির পাশে গ্রামের সবাইকে জড়ো করছে।
ঘর থেকে বের হবার সময় তিনি দেখতে পান ২/৩টি আর্মির গাড়ি আসছে তাদের দিকে। তারা ভয় পেয়ে যার যার ঘরের দিকে দৌড়তে থাকেন। একটু পরেই চতুর্দিকে গুলির আওয়াজ শুনতে পান এবং দেখেন বাবুল মালি রাস্তায় পড়ে আছে। একটু পর গ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে গুলির আওয়াজ শোনা যায়, গ্রামবাসীরা পশ্চিমদিকে দৌঁড়াতে থাকে।
পরের দিন বেলা দশটার দিকে তিনি শুনতে পান গ্রামের হিন্দুরা তার কথা শুনেই গ্রামে ফেরত এসেছিল এই অনুশোচনায় ডঃ নিরঞ্জন দত্ত আত্মহত্যা করেছেন। ১৫ই এপ্রিল সাক্ষী ৭ এবং তার বন্ধু গ্রামে ফেরত এসে দেখেন বাবুল মালি, তার বাবা সহ ৬০/৭০ জনের মৃতদেহ মাটিতে পড়ে আছে। একটু দুরে দেখতে পান দুজন অন্তসত্তা নারীর মৃতদেহ, তাদের বাচ্চারা গর্ভের ভেতর থেকে অর্ধেক বের হয়ে এসেছে।
তারা একটা বড় গর্ত খুঁড়ে ৬৪টা মৃতদেহ সেখানে সমাধি দেন। স্থানীয় লোকেরা জানান আর্মির গাড়িতে দুজন বাঙালী বসা ছিলেন আর এই উনসত্তর পাড়া গণহত্যায় জড়িত ছিলেন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী।

সুজিত মহাজন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৩১ বলেন তিনি তার বাবা ও বড়ভাইদের সাথে বারান্দায় বসে ছিলেন। এমন সময় পাকিস্তানী আর্মি এবং কিছু বাঙালী সহযোগী তাদের বাড়িতে ঢোকে এবং জোরপূর্বক তার বাবা, ভাই, মা হরিলতা মহাজন, কাকী মেনোতা মহাজন, বৌদি মিনতি মহাজনকে ক্ষীতিশ মহাজনের পুকুরপাড়ে ধরে নিয়ে যায়। তারা আরো অনেককেই ওখানে জড়ো করেছিলেন। একটু পরে গুলির শব্দ শোনা যায় এবং ১০/১৫ মিনিট পর পরিস্থিতি একটু শান্ত হয়।
তিনি পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখেন টিউবওয়েলের পাশে তার বাবা আর ভাইয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে, আরো আছে ৬০/৬২ জনের মৃতদেহ। দুই তিনদিন পর প্রতিবেশীরা পুকুরের পাশে মৃতদের সমাহিত করে। ভাগ্যক্রমে তার মা বেঁচে যান এবং মায়ের কাছ থেকে জানতে পারেন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার সঙ্গীরা এই গণহত্যা ঘটিয়েছে।

বাসন্তী ঘোষ, প্রসিকিউশন সাক্ষী ৩২ এর বয়ানে জানা যায় মুক্তিযুদ্ধের একদিন যখন তার স্বামী বাজার থেকে আসছিলেন একজন মিলিটারি এবং একজন বাঙালী তাদের বাসায় আসেন এবং তার স্বামীকে ক্ষীতিশ মহাজনের বাড়িতে নিয়ে যায়। উনার স্বামীকে বাকিদের মতো লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলিবিদ্ধ করা হয়। তার স্বামীর নাম স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা আছে। আসামী পক্ষের উকিল সাক্ষী ৩২কে জেরা করতে অস্বীকৃতি জানান।.

চপলা রানী, প্রসিকিউশন সাক্ষী ৩৭ জানান চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন বিকেল পাঁচটার দিকে পাকিস্তানী আর্মি চারপাশ থেকে আক্রমণ করে উনসত্তরপাড়া গ্রাম। আর্মিরা তাদের সবাইকে নিয়ে সতীশ মহাজন, ক্ষীতিশ মহাজনের ভাইয়ের পুকুরের পাশে নিয়ে জড়ো করে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করত পেরে ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন তারা।
তার দেবর বেনী মাধব তাদের কাঁদতে নিষেধ করে বলেন চেয়ারম্যান মকবুল এবং সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী আছে পাক আর্মির সাথে। কথা শেষ হবার সাথে সাথেই আর্মি গুলিবর্ষণ শুরু করে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। তার দেবর বেনী মাধব,তারাপদ, বাবা সতীশ ঘটনাস্থলেই মারা যান। মৃতদেহ উলটে দেখে নিজের প্রিয়জন খুঁজতে থাকা মানুষদের কান্না আর বিলাপের শব্দে জ্ঞান ফিরে আসে সাক্ষী তার।
তিনি তার স্বামীকে খুঁজতে থাকেন এবং দেখেন তিনি অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছেন। তারা ঘরে ফিরে এসে এক প্রতিবেশী মুসলমানের বাড়িতে চার রাত থাকেন। ঘটনার সময় তিনি সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে দেখেন এবং সনাক্ত করেন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামীকে।

ধারা ১৯(২) এর সাক্ষ্য আইনের অধীনে ধারণকৃত সাক্ষ্যে মামলা চলাকালিন সময়ে মৃত জ্যোতিবালা পল তার স্টেইটমেন্টে বলেন ১৩ই এপ্রিল ১৯৭১ এ বিকেল ৪/৫ টার দিকে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সাথে তার বাড়িতে ছিলেন। কিছু বাঙালীকে সাথে নিয়ে পাকিস্তানী আর্মি গ্রামে ঢুকে গ্রামবাসীদের ক্ষীতিশ মহাজনের পুকুর পাড়ে জড়ো করে। গুলিচালনা শুরু হলে তার ভাই, শ্বশুড় আর ননদ মাটিতে পড়ে যায়।
৬০/৭০ জনের মতো মানুষ মারা যায় এই ঘটনায়, তিনি নিজেও আহত হন। তার ভাই হেমন্তের হাত দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং প্রায় সাথে সাথেই মারা যান তিনি। তার স্বামী পালিয়ে যান, তিনি তিন রাত কাটান জঙ্গলে।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দীন পাঞ্জাবীদের সাথে ছিল। সালাউদ্দীন এবং সাথে আসা আরো বাঙালিরা পাঞ্জাবীদের হিন্দু ধর্ম পালনকারীদের দেখিয়ে দেয়।

উনসত্তরপাড়া গণহত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণীত হওয়ায় আদালত সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

শেখ মোজাফফর আহমেদ এবং শেখ আলমগীরকে অপহরণ এবং হত্যা (চার্জ ৮) – মৃত্যুদন্ড
এই অভিযোগে বলা হয় ১৯৭১ সালের ১৭৯ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মোজাফফর আহমেদ এবং তার পুত্র শেখ আলমগীরকে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার সহযোগীরা খাগড়াছড়ি তিন রাস্তার মোড় থেকে অপহরণ করেন। পরে তাদের নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ১১ এস এ মাহবুব-উল-আলম একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, শেখ মোজাফফর আহমেদের অন্য সন্তান তার কাছে অভিযোগ করেন যে সালাউদ্দীন কাদেরের প্ররোচনায় পাকিস্তানী আর্মি তার বাবা এবং ভাইকে অপহরণ করেছে এবং তাদের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছেনা।
প্রসিকিউশন সাক্ষী ১৭ উম্মে হাবিবা সুলতানা নির্যাতিত আলমগীরের স্ত্রী এবং অপহরণের ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। তিনি বলেন পাকিস্তানী আর্মি চিটাগাং শহরে গণহত্যা শুরু করার পর তার শ্বশুড়, স্বামী এবং অন্যান্য স্বজনেরা তার শ্বশুড়ের গ্রামের বাড়ি ইয়াসিন নগরে আশ্রয় নেন।
সেখানে কিছুদিন থাকার পর ১৭ই এপ্রিল সকালে তিনি নিজে, শ্বশুড় শেখ মোজাফফর আহমেদ, স্বামী শেখ আলমগীর আর পরিবারের আরো কিছু সদস্য চিটাগাং ফিরছিলেন। হাটহাজারি বাস স্ট্যান্ড এর তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছানোর পর হঠাৎ তদের গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। সেইসময় আর্মি এসে তাদের গাড়ি ধাক্কা দিলে ইঞ্জিন আবার চালু হয় এবং গাড়ি চলতে শুরু করে। কিছুদুর যাবার পর আর্মি তাদের গাড়ি থামায়। এবং সেইসময় সংগীসহ সেখানে আসে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী। আর্মি শেখ মোজাফফর এবং শেখ আলমগীরকে বলে তাদের অনুসরন করতে।
আর্মি তাদের নিকটস্থ ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সাক্ষী ১৭ তার দেবর শেখ ফজলুল হককে আর্মি ক্যাম্পে পাঠান অবস্থা জানার জন্য। ফজলুল ফিরে এসে বলেন আর্মি মোজাফফর এবং আলমগীরকে গ্রেফতার করেছে এবং হুমকি দিয়েছে এই জায়গা ছেড়ে না গেলে তাদেরকেও গ্রেফতার করা হবে।
ভয় পেয়ে তারা সেই জায়গা ছেড়ে চলে আসেন। পরে জানতে পারেন তার মা উম্মে বরকত চৌধুরী সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর আত্মীয় এবং তার স্বামীর বড় ভাই এ কে এম হায়দার মিয়া গুডস হিলে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সংগে দেখা করে শেখ মোজাফফর আহমেদ এবং শেখ আলমগীর এর মুক্তির জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। ফ কা চৌধুরী জানান সাকা চৌধুরী ফিরে এলে তিনি এই বিষয়ে খোঁজ নেবেন।

সাক্ষী ১৭ জানান ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী সেই সময় চট্টগ্রামে গণহত্যা চালাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি, তার মা এবং তার ভাই একাধিকবার গুডস হিলে গিয়েছেন তার স্বামী এবং শ্বশুড়কে মুক্ত করার আর্জি নিয়ে। ঘটনার প্রায় এক মাস পর ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান সালাউদ্দীন এই বিষয়টা দেখছেন এবং তিনি সালাউদ্দীনের সাথে কথা বলবেন।
সাক্ষী ১৭ মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন, সাকা চৌধুরী তার শ্বশুড়কে মেরে ফেলেছেন যেহেতু তার শ্বশুড় একজন প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা । তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামীকে সনাক্ত করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ২০ শেখ মোরশেদ আনোয়ার, শহীদ মোজাফফর আহমেদের আরেক সন্তান। তিনি জানান ১৯৭১ এর ১ এপ্রিল তিনি পরিবারের বাকি সদস্যদের থেকে আলাদা হয়ে তার আরেক ভাই এবং চাচা সহ কয়গ্রাম গ্রামে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর তার চাচারতো ভাই আনোয়ার এবং চাচা আলী সেখানে আসেন এবং বলেন তার ভাই এবং বাবা চিটাগাং আসার পথে আর্মি দ্বারা অপহৃত হয়েছেন। হাটহাজারির কাছে তাদের গাড়ি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গাড়ি থেমে যাবার পর আর্মির গাড়ি তাদের ধাক্কা দিলে গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। একটু পর সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী তার দল নিয়ে একটি জিপে এসে তার বাবা শেখ মোজাফফর আহমেদ এবং ভাই শেখ আলমগীরকে অপহরণ করে নিকটস্থ আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
তার ভাইয়ের শ্বশুড় ফজলুর হক ক্যাম্পে গিয়ে তাদের মুক্তির অনুনয় করেন কিন্তু তাকে জানানো হয় আর্মি তাদের গ্রেফতার করেছে। সাক্ষী ১৭র মাতা উম্মে বরকত চৌধুরী তার আত্মীয় ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাসস্থান গুডস হিলে একাধিক বার গিয়ে তার মুক্তির জন্য ফ কা চৌধুরীকে অনুরোধ করেন। ফ কা চৌধুরী নিশ্চিত করেন তার ছেলে সাকা চৌধুরী এই বিষয়ে জড়িত আছে। তিনি এও বলেন শেখ মোজাফফর এবং শেখ আলমগীর মারা গিয়েও থাকতে পারে। সাক্ষী ২০ আদালতে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে সনাক্ত করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে আদালতেকে জানান সালাউদ্দীন কাদের চিহ্নিত না করলে তার বাবা এবং ভাই আজ বেঁচে থাকতেন কারণ পাকিস্তানী আর্মি তাদের চিনতোনা। শুধুমাত্র সাকা চৌধুরীই তাদের চিনতেন বলে পাকিস্তানী আর্মি তাদের গ্রেফতার করে ক্যাম্পে নিয়ে খুন করে।

অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণীত হওয়ায় এই অভিযোগে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

সাংবাদিক নিজামউদ্দীন আহমেদকে অপহরণ ও নির্যাতন (চার্জ ১৭) – পাঁচ বছর কারাদণ্ড
এই অভিযোগে বলা হয় ৫ই জুলাই ১৯৭১ সালে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী প্রখ্যাত সাংবাদিক নিজামউদ্দীনকে (রাষ্ট্রপক্ষীয় সাক্ষী ১৫) অপহরণ করে গুডস হিলে নিয়ে নির্যাতন এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখেন।

সাক্ষী ১৫র বয়ানে জানা যায় তিনি ঐ সময় চিটাগাং সরকারী কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থি ছিলেন। তিনি, সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম এবং সিরাজ পাকিস্তানী আর্মির সাথে লড়াই করার জন্য নন্দন কানন এলাকায় একটি দল গঠন করেন। তারা ক্যাম্প হিসেবে বাছাই করেন হাজারি লেইনের একটি আধপোড়া বাড়িকে। তারা ওই জায়গায় যুদ্ধের কৌশল নিয়ে আলোচনা করতেন আর একই সময়ে চেষ্টা করতেন স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের।
সহসাই ৫ই জুলাই তারা যান বাহন আসার শব্দ শুনতে পান এবং দেখেন সাদা পোষাক পরা তিন চারজন তরুন সহ পাকিস্তানী আর্মি তাদের ঘিরে ফেলেছে। তারা হাত বেঁধে তাদের গুডস হিলে নিয়ে যায়। গুডস হিলে পৌঁছার পর সাদা একজন আনন্দে হাত উঁচু করে বলে মিশন সফল হয়েছে। তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বসার ঘরে যেখানে ফজলুল কাদের চৌধুরীকে তাদের ব্যাপারে জানানো হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী সাক্ষী ১৫কে আঘাত করেন এবং আদেশ দেন তাদের ওপর নির্যাতন চালানোর। এরপর সাক্ষী ১৫ এবং বাকিদের আলাদা করে ফেলা হয়।

তাকে নির্যাতনকারীদের পারষ্পরিক আলাপ থেকে তিনি জানতে পারেন ফ কা চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী তাকে অপহরণ করেছেন এবং পরে তিনি নিজেই নিশ্চিত হন সাকা চৌধুরী তার অপহরণকারীদের একজন। মধ্যরাতে তাকে গুডস হিলের গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে তিনি তার মারাত্মকভাবে আহত বন্ধুদের দেখতে পান। পরেরদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় টর্চার সেলে। তিনি এবং তার বন্ধুদের চিটাগাং স্টেডিয়ামের আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে জুলাইয়ের ১৩ তারিখ পর্যন্ত তাদের ওপর নির্যতন চালানো হয়।
সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম মুক্তি পান, সাক্ষী ১৫ এবং তার বন্ধু সিরাজকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের জেলে পাঠানো হয় এবং ১৮ই নভেম্বর মুক্তি পাবার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। সাক্ষী ১৫ আদালতে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে সনাক্ত করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ১৯ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম ঝুনুও একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বর্ণনা সাক্ষী ১৫র দেয়া বর্ণনার সাথে মিলে যায়।
৫ই জুলাই অপহরণের পর তাদের গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে বসার ঘরে ফজলুল কাদের চৌধুরী তাদের পরিচয় পাবার গালাগালি শুরু করেন। ফ কা চৌধুরীর লোকেরা শুরু করে তাদের প্রহার করা। সেইসময় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীও সেখানে ছিলেন। সিরাজুল ইসলাম এবং নিজামুদ্দিনক ঘরের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়, তাদের অনুসরন করেন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী। পরেরদিন চিটাগাং স্টেডিয়াম টর্চার সেলে তাদের নির্যাতন করার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয় আর বাকি দুজনকে পাঠানো হয় চিটাগাং ক্যান্টনমেন্টে। তিনিও আদালতে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে সনাক্ত করেন।

আসামীপক্ষের জেরার জবাবে তিনি জানান নির্যাতনের ফলে তার কোমরের হাড় এবং দাঁত ভেঙ্গে যায়। তিনি আরো জানান ফ কা চৌধুরী গুডস হিলে আল বদর এবং আল শামস ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন আর আরেকটা আল বদর ক্যাম্প বসিয়েছিলে ডালিম হোটেলে। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং আরো কজন ফ কা চৌধুরীর বাংলোর আল শামস ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী ১৮ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার দেবব্রত সরকারও তার সাক্ষ্যে গুডস হিলে আল শামস এর টর্চার সেল থাকার কথা বলেন।

অপহরণ, নির্যাতন ও ইচ্ছারবিরুদ্ধে কারাবাসের অভিযোগ প্রমাণীত হওয়ায় আদালত সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে ৫ বছর কারাবাসের শাস্তি প্রদান করেন।

সাকা চৌধুরী ছেড়ে দেননি এই অভিযোগের অন্যতম সাক্ষী ওয়াহিদুল আলম ঝুনুকে। ২০১৩র ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ আন্তর্জাতিক আদালতে সাক্ষী দেয়ার মাত্র ১০ দিন পর ২২শে ফেব্রুয়ারি তার লাশ পাওয়া যায় ২২ ঘন্টা নিখোঁজ থাকার পর। তার পরিবারের কাছ থেকে জানা যায় তাকে অনেকবার হুমকি দেয়া হয়েছিল সাক্ষী দিলে তার পরিনতি ভালো হবেনা। পরিবার অভিযোগ করে সাকা চৌধুরীই ঝুনুর হত্যাকারী।

মোহাম্মদ সালেহউদ্দীনকে অপহরণ, নির্যাতন এবং ইচ্ছারবিরুদ্ধে আটক (চার্জ ১৮) – পাঁচ বছর কারাদণ্ড
এই অভিযোগে বলা হয় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ও তার দল ১৯৭১ সালের জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে মোহরা গ্রাম থেকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য মোহাম্মদ সালেহউদ্দীনকে অপহরণ করে গুডস হিলে নিয়ে যায় এবং সেখানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রেখে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৮ জানান তখন তিনি চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তার বয়স ছিল ১৯। তিনি লজিং থাকতেন মোহরা গ্রামের রাজা খান চৌধুরীর বাসায়, মার্চে ক্লাস বন্ধ হয়ে যায় তিনি সেখানে ফেরত যান। জুলাইয়ের শেষের দিকের এক বিকেলে বুড়ির চর ইউনিয়নের শামসু মিয়া তার তিনজন সঙ্গী নিয়ে তার ঘরে আসেন। শামসু মিয়ার এক সঙ্গীর পকেটে অস্ত্র গোজা দেখে তিনি ভয় পেয়ে যান এবং শামসু মিয়ার কথামতো তাকে অনুসরণ করেন।
মিলিটারি জিপে করে তাকে গুডস হিলে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দেখেন ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী দুজনেই উপস্থিত আছেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী জানতে চান তিনিই সালাউদ্দীন আহমেদ কিনা। হা সূচক জবাব পাবার পর ফ কা চৌধুরী মারার জন্য বলেন তাকে একটা কাঠের টুকরো দেয়ার কথা।
তারপরেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্যারাজে। সেখানে কুখ্যাত আল শামস চীফ হামিদুল কবির এবং সেকান্দার নির্দয়ভাবে পেটানো শুরু করে তাকে। সালেহউদ্দীন তার মুখে, ঠোঁটে তীব্র আঘাত পেয়ে মাটিতে পড়ে যান। তারা খাটের তক্তা দিয়ে পেটানো শুরু করার এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। তারা তাকে মুক্তিবাহিনীর নাম এবং তাদের অবস্থান বলতে বলে। কিছুক্ষণ পর তারা তাকে টেনে হিঁচড়ে নীচের তলায় সিঁড়ির কাছে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। সেখানে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীও ছিলেন। অত্যাচারের মাত্রায় খুশী না হয়ে সাকা চৌধুরী নিজেই এগিয়ে এসে চড় মারেন তাকে এবং বলেন তাকে নিয়ে যেতে। তাকে নীচের তলায় নিয়ে গিয়ে বিরামহীনভাবে হোস পাইপ দিয়ে পেটানো হয়।

সালেহউদ্দীনের ধারণা ছিল তিনি মারা যাচ্ছেন। এইসময় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই ওই রুমে আসেন। তিনি সালেহউদ্দীনকে বলেন মোহরা গ্রামে কি এমন কোন মুসলিম লীগ মেম্বার আছে যে তার পক্ষে কথা বলবে? সালেহউদ্দীন তখন মুসলিম লীগের দুই নেতা নুরুল হুদা কাদেরী এবং বাদশা মিয়ার নাম বলেন। নুরুল হুদা আশ্বাস দেন তার মুক্তির ব্যাপারে কথা বলবেন ফ কা চৌধুরীর সাথে। পরের দিন দুপুরে গ্রামের কিছু প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা এসে সালাউদ্দীন কাদেরকে বোঝান যে সালেহউদ্দীন অনেকদিন ধরে এই গ্রামে বসবাস করছেন এবং তিনি একজন ভালো ছাত্র। তার বিনা অনুমতিতে গ্রাম না ছাড়ার আদেশ দিয়ে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী সালেহউদ্দীনকে মুক্তি দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ২৫ আবু তাহের একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি জানান জুলাইয়ের শেষের দিকে তিনি শুনতে পান আবদুল মোতালেব এর লজিং মাস্টার সালেহউদ্দীনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গুডস হিলে। তাকে ছাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি মুসলিম লীগ লিডার বাদশা মিয়া এবং নুরুল হুদার সাথে কথা বলেন এবং পরের দিন গুডস হিলে যান।
সেখানে সালেহউদ্দীনকে দেখেন গুরুতর আহত অবস্থায়। মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে কোন তথ্য দিতে অপারগ হওয়ায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তার সঙ্গীরা তাকে নির্দয়ভাবে পিটিয়েছে। সালেহউদ্দীন একটা বড় পাঞ্জাবী পরা ছিলেন এবং সাক্ষী ২৫কে তার দেহের আঘাতের চিহ্ন দেখান।

সোলায়মান, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ২৬ বলেন জুলাইয়ে তিনি জানতে পারেন অন্যান্য রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে সালেহউদ্দীনকে গুডস হিলে ধরে নিয়ে গেছে। সালেহউদ্দীন ছিলেন একজন লজিং মাস্টার এবং বাদশা মিয়া ও শামসুল হুদা তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে।
অপহরণ, নির্যাতন ও অবৈধভাবে কারাবাসের অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণীত হওয়ায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
--------------------

২০১০ এর ডিসেম্বরে তাকে গ্রেফতারের পর ২০১৫ র নভেম্বরে তার ফাঁসি হবার আগ পর্যন্ত এই বিচার প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত করার জন্য এমন কোন কাজ নেই যে তিনি এবং তার পরিবার করেনি। নিজের উকিলকে বরখাস্ত করে নিজে মামলা চালানো শুরু করে আবার মাঝপথে উকিল নিয়োগে সময়ক্ষেপন, আপিলের পর্যায়ে এসে নতুন সাফাই সাক্ষ্য নেয়ার অনুরোধ, আদালত থেকে রায়ের কপি চুরি করা এমনকী রিভিউ পর্যায়ে এসে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদপত্র দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানে ছিলেন জাতীয় হাস্যকর দাবী সবই করেছেন তিনি ও তার পরিবার। পুরো বিচারের সময়েই তিনি এবং তার পরিবার আদালতের প্রতি বিদ্রুপ, অসম্মান করেই গেছেন।

কিন্তু এতোকিছুর পরেও থেমে থাকেনি তার বিচার। চট্টগ্রামের এই ত্রাস, রাউজান এলাকার দুর্দমনীয় আতংক শেষ পর্যন্ত ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে ঝুলেছে। বিচার পেয়েছে তার হাতে নির্যাতিত, নিহত,অত্যাচারীত শত শত মানুষ, সহস্র পরিবার। পয়সা আর গ্ল্যামারের ঝলমলে আলোয় ঝলসে যাওয়া মিডিয়া কোনদিন বলবেনা এইসব অসম সাহসী সাক্ষী যারা প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে, সব হারাবার সম্ভাবনাকে অসীম শক্তিতে মাড়িয়ে দিয়ে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন এই অকল্পনীয় দানবের বিরুদ্ধে তাদের কথা। তারা ব্যস্ত হুম্মাম কাদের নামের চৌধুরী পরিবারের আরেকটা অশ্লীল লোকের দম্ভভরা সাক্ষাৎকার নিতে, সালাউদ্দীনের শেষ খাবারের মেন্যু, তার শেষকৃত্যের খুঁটিনাটি বর্ণনা নিয়ে।

দিনের শেষে এই জ্যোৎস্নাবালা, চপলা রানী এই গোপাল দাশেরাই বাংলাদেশ। মিডিয়া নামের যাত্রার প্রিন্সেসদের নৃত্য শেষ হবার অপেক্ষা না করে এরাই সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর অটল সাম্রাজ্য ধংশ করে, সম্মিলিত হাতে ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয় এই দানবের গলায়।
মধ্যগহীরা, সুলতানপাড়া, উনসত্তরপাড়া গ্রাম আপনাদের আত্মত্যাগ আজ বাংলাদেশকে নতুন জীবন দিল। জয় বাংলা।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

এই লেখা লিখতে সাহায্য নেয়া হয়েছে যে সমস্ত সংবাদ প্রতিবেদন থেকে -

১) http://bdnews24.com/bangladesh/2015/09/30/full-verdict-of-bnp-leader-salauddin-quader-and-jamaats-mujahid-published
২) http://www.dhakatribune.com/bangladesh/2015/nov/18/sc-starts-hearing-sq-chys-review-plea
৩) http://bdnews24.com/bangladesh/2015/07/28/bangladesh-waits-for-final-verdict-on-war-criminal-death-row-convict-salauddin-quader-chowdhurys-appeal
৪) http://bdnews24.com/bangladesh/2015/11/19/review-verdicts-of-death-row-war-criminals-salauddin-quader-mujahid-reach-jail
৫) http://photos.bdnews24.com/media/2015/07/29/sq-chowdhury-atrocities-in-1971
৬) http://archive.samakal.net/print_edition/details.php?news=13&view=archiev&y=2013&m=10&d=02&action=main&option=single&news_id=370258&pub_no=1545
৭) http://archive.samakal.net/print_edition/details.php?news=13&view=archiev&y=2013&m=10&d=01&action=main&option=single&news_id=370141&pub_no=1544
৮) বেশিরভাগ তথ্যই নেয়া হয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়েছে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের রায় থেকে। http://supremecourt.gov.bd/resources/documents/700203_Criminal_Appeal_No.122_of_2013.pdf

৯) এই মামলার একজন সাক্ষী ওয়াহিদুল আলম ঝুনু খুন হন সাক্ষ্য দেয়ার মাত্র ১০ দিন পর। কোনভাবে লেখায় এই জিনিস বাদ পড়ে গিয়েছিল। শঙ্খচিলের ডানাকে কৃতজ্ঞতা ভুল ধরিয়ে দেয়ার জন্য। http://archive.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=270263


মন্তব্য

শেহাব এর ছবি

গুল্লি

শান্ত এর ছবি

অমানুষ বললেও কম বলা হবে।

__________
সুপ্রিয় দেব শান্ত

স্যাম এর ছবি

দিনশেষে যারা বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশের মঙ্গল হোক।
অনেক ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

Laila Mahmuda Shilpi এর ছবি

এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। জয় বাংলা।
রানা মেহেরকে ধন্যবাদ, সবগুলো রেফারেন্স এক সাথে রাখার জন্য।

অতিথি লেখক এর ছবি

দিনের শেষে এই জ্যোৎস্নাবালা এই গোপাল দাশেরাই বাংলাদেশ। মিডিয়া নামের যাত্রার প্রিন্সেসদের নৃত্য শেষ হবার অপেক্ষা না করে এরাই সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর অটল সাম্রাজ্য ধংশ করে, সম্মিলিত হাতে ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয় এই দানবের গলায়।
এর থেকে দামী কথা আর হতে পারে না।

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

গুল্লি

তানিম এহসান এর ছবি

চলুক চলুক

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

কেউ কি একটু দয়া করে জানাবে যে সচলে কি করে একটি লেখা বুকমার্ক করতে হয়?

গান্ধর্বী এর ছবি

এই দানবের তাণ্ডবের বর্ণনা শুনলে সত্যিই শিউরে উঠতে হয়। ফাঁসি কার্যকরের খবর শুনে বড় স্বস্তি লাগে তাই।

গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটার জন্য সাধুবাদ জানাই আপনাকে।

------------------------------------------

'আমি এখন উদয় এবং অস্তের মাঝামাঝি এক দিগন্তে।
হাতে রুপোলী ডট পেন
বুকে লেবুপাতার বাগান।' (পূর্ণেন্দু পত্রী)

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

শেয়ার দিলাম

____________________________

হাসিব এর ছবি
অতিথি লেখক এর ছবি

দিনের শেষে এই জ্যোৎস্নাবালা এই গোপাল দাশেরাই বাংলাদেশ। মিডিয়া নামের যাত্রার প্রিন্সেসদের নৃত্য শেষ হবার অপেক্ষা না করে এরাই সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর অটল সাম্রাজ্য ধংশ করে, সম্মিলিত হাতে ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয় এই দানবের গলায়।
মধ্যগহীরা, সুলতানপাড়া, উনসত্তরপাড়া গ্রাম আপনাদের আত্মত্যাগ আজ বাংলাদেশকে নতুন জীবন দিল

জয় বাংলা।।।

অতিথি লেখক এর ছবি

শেয়ারের অপশন বন্ধ কেন? এই লেখা শেয়ার না করতে পারলে ক্যাম্নে কি?

ফারাসাত

হাসিব এর ছবি

শেয়ারের অপশন বন্ধ না। এটা হতে পারে আপনার এ‍্যাডব্লক ফেইসবুক বাটনটা দেখাচ্ছে না। আপনি লিংক কপি করে ফেইসবুকে পেস্ট করে দেখুন। কাজ হবে।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ।

ফারাসাত

রানা মেহের এর ছবি

শেহাব,এই মাত্র খেয়াল করলাম এই ইমীর সাথে সাকার একটা মিল আছে চোখ টিপি

শান্ত, পারলে আপিলের রায়টা পড়ে দেখিস। ভয়াবহ দানব।

স্যাম ভাই, ধন্যবাদ। এই বাংলাদেশ কোনদিন হারবেনা।

লায়লা, আর কিচ্ছু পড়তে হবেনা শুধু আপিলের রায়টা একবার পড়ে দেখলেই জানবেন কী ছিল সাকা।

রুপক, ধন্যবাদ।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

রানা মেহের এর ছবি

আব্দুল্লাহ, আপনার প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারলাম আমি নিজেও জানিনা সচলে কীভাবে বুকমার্ক করে।
এডিট - এখন দেখলাম শেয়ারের কাছেই বুক্মার্ক অপশন আছে।

তানিম ভাই, ধন্যবাদ।

গান্ধর্বী, একটা হায়েনা ছিল এই লোক। পারলে আপিলের রায়টা পড়ে দেখবেন। আমি পড়ে শিউরে উঠেছিলাম।

হিজিবিজবিজ, ধন্যবাদ।

হাসিব ভাই, আপনি বললে ঠিক আছে। হাসি

অতিথি, ফারাসাত, ধন্যবাদ

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

শুভ এর ছবি

যেদেশে ভিন্নমত প্রকাশের জন্য কিংবা স্রেফ বই ছাপানোর জন্য প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ খুন করা হয় আর সরকার কিছুই করতে পারে না.....সেই দেশে এসব অসম সাহসী মানুষ ৪ জন অন্ধকারের কিংবদন্তিকে ঝুলিয়ে দিল....কীটগুলো সুযোগ পেলে কিংবা সরকারের পালাবদল হলে কি করবে ভাবতেও ভয় লাগছে....

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

ইংরেজী করা দরকার লেখাটা।

রানা এর ছবি

লেখককে এই লেখাটির জন্য অনেক ধন্যবাদ । রায়ের কপির জন্য-ও।
ভবিষ্যতের অনেক রায়ের দিকনির্দেশনা এখান থেকে পাওয়া যাবে হয়তো।
রায়ের শেষ দিকে কম্বোডিয়ার খেমার রুজ ট্রাইব্যুনালের এক কো- প্রসিকিউটরের প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে- যে নিহতের কন্যা ঘটনাক্রমে তাঁর পিতার পরিণতি জানতে পারেন পথের এক খাদ্যবিক্রেতার খাবার মুড়িয়ে দেয়া কাগজ থেকে, যে কাগজটি ছিলো তাঁর পিতার কাছ থেকে জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তি - এবং ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন।

খুনী যখন ক্ষমতাবান এবং তার বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণ ধ্বংসে সক্ষম, তখন নথিপত্র কিভাবে সংগ্রহ করা যায়- এই ঘটনাটি তার দিকনির্দেশনা যেন- রায়ের এই চমৎকার উদ্ধৃতিটি অসাধারণ।

জয় বাংলা।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

দিনের শেষে এই জ্যোৎস্নাবালা এই গোপাল দাশেরাই বাংলাদেশ। মিডিয়া নামের যাত্রার প্রিন্সেসদের নৃত্য শেষ হবার অপেক্ষা না করে এরাই সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর অটল সাম্রাজ্য ধংশ করে, সম্মিলিত হাতে ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয় এই দানবের গলায়।

চলুক

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ এই গুরুত্বপূর্ণ লেখার জন্য, বিশেষ করে রায়ের কপির পি.ডি.এফ. শুধুমাত্র আপনার লেখাতেই পেলাম। আর কোথাও (অনলাইন/অফলাইন সংবাদ পত্র/ ব্লগ) পেলাম না, কেউ সম্ভবত সুপ্রিম কোর্টের এই ডেটাবেজ সম্পর্কে অবগত না।

এইদিকে গত কয়দিন ধরে "বাংলার ডার্ক জাস্টিস, বর্গাবাবা বর্গ্ম্যান আল বিলায়তি" বেশ ছ্যাচ্ছ্যার করে উনার ব্লগ ছাড়ছেন, আর ছাগুর পাল শেয়ারও দিচ্ছে প্রচুর, এই পি.ডি.এফ.টা কাজে দিবে অনেক।

আর সবচেয়ে ভাল হইত মার্সি পিটিশন টা লিক হইলে। আমি প্রিন্ট কইরা বাধায়ে ঘরে টাঙাইয়া রাখতাম।

ঈয়াসীন এর ছবি

এই লেখাটা একটি তথ্যসূত্র-র উৎস হয়ে থাকবে। ধন্যবাদ আপনাকে।

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

রানা মেহের এর ছবি

শুভ, আমরা যদি সচেতন না থাকি এই সাক্ষীরা এখনই নিরাপদ না। মিডিয়া ব্যস্ত সাকার ছেলেকে হাইলাইট করতে, এই লোকগুলোর কথা কেউ ভাবছেনা।

মুর্শেদ, কেউ করে দিতে পারলে ভালো হয়। আমার সময় নেই একদম।

রানা, এই প্রতিটা মামলার রায় একেকটা জাতীয় দলিল। পারলে পড়বেন বাকিগুলোও সময় পেলে। অসাধারণ জিনিসপত্র জানা যায় পড়লে।

সত্যানন্দ, ধন্যবাদ।

অতিথি, মার্সি পিটিশনটা পাবলিক করা হলে ভালো হতো।আমার ধারণা আসামীরা ওখানেও প্রচুর ত্যানা পেচিয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের এই ডেটাবেইজটা অসাধারণ। আপনি ঠিক বলেছেন, অনেকেই এটা সম্পর্কে জানেনা।
বার্গম্যান এতো ভুলে ভরা ছাইপাশ ছেলেমানুষী জিনিসপত্র লেখেন, রিফিউট করতেও লজ্জ্বা লাগে।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

খুব দরকারি এবং পরিশ্রমী লেখা। অনেক ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

নাশতারান এর ছবি

মিডিয়া ব্যস্ত সাকার শেষ মেনু, শেষ মুহূর্ত, সাকা পরিবারের জঞ্জাল কভার করতে। ব্লগ যে কত জরুরি, কত শক্তিশালী তা এই একটা পোস্ট দিয়েই বুঝিয়ে দেওয়া যায়। অনেক ধন্যবাদ এই শ্রমসাপেক্ষ কাজটা করে ফেলার জন্য।

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

অতীব প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী একটি লেখা বটে। শ্রমসাপেক্ষ লেখাটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। চলুক

রানা মেহের এর ছবি

ঈয়াসীন, ধন্যবাদ।

ত্রিমাত্রিক কবি, ধন্যবাদ ভাই। পরিশ্রম হয়েছে। কিন্তু যা পড়তে পেরেছি তা অমূল্য।

নাশতারান, মিডিয়ার ওপর বিতৃষ্ণা এসে গেল। এত অসভ্য মানুষ হয় কীকরে?

প্রৌঢ় ভাবনা, আপনিও ধন্যবাদ জানবেন।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

অতিথি লেখক এর ছবি

আমাদের মিডিয়ার কথা বলে লাভ নাই। গোআজম মরার পর মিডিয়া এমন লাইভ টেলিকাস্ট করলো, সাকা মুজাহিদের ক্ষেত্রেও তাই, যে মনে হলো, এরা অতিগুরুত্বপূর্ণ কেউ। হুমায়ুনের মৃতু্যতে এরা যা করে, এদের ক্ষেত্রেও তাই করে। অথচ দরকার ছিল, প্রতিটা যুদ্ধাপরাধীর নৃশংসতা ও অপরাধ এবং তার ভুক্তভোগী জনপদের বক্তব্য সম্বলিত একটা করে প্রামাণ্যচিত্র বানানো। যাতে এদের রায় কার্যকর বা মৃত‌্যু (এটা লিখতে খারাপ লাগছে কিন্তু আলীম আর গোর ক্ষেত্রে সে ঘটনা ঘটেছে) হলে সেদিন নিউজ এবং এই প্রামাণ্যচিত্রকে সংশ্লেষ করে প্রচার করা। যাতে এদের ভয়াবহ চেহারাটা নজরে পড়ে। এটাও না পারলে নিদেনপক্ষে একটা বাচিক উপস্থাপন করা যেতেই পারতো বা পারে। ফাঁসির অপেক্ষার সসময় লাইভ টেলিকাস্টের নামে এরা ক্রমাগত ভুলভাল তথ্য, একই কথা বলে যায়, কিন্তু অপরাধ সম্পর্কে একটা শব্দ বলে না। মিডিয়ার দরকার প্রচার আর তা দায়দ্বায়িত্বহীন। বিচার প্রশ্নে নানা বিরোধী মতামত ও আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাঝখানে যেভাবে এসব অপরাধীর পরিবারের আবেগ তুলে আনা হয় তার প্রভাব জনমনে পড়ে।

যাক, অসংখ্য ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।

স্বয়ম

এক লহমা এর ছবি

চলুক
লিঙ্কগুলো কয়েকদিনবাদে আর কাজ করবে না। এখনই ওগুলোর পিডিএফ করে রাখা দরকার।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

চলুক

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নীড় সন্ধানী এর ছবি

প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর রায়ের পর এ ধরনের একটা তথ্য বিবরণী প্রকাশ করা উচিত সরকারের তরফ থেকেই। এটাকে সংরক্ষিত ডকুমেন্টেশনের অংশ হিসেবে জমা রাখলাম নিজের আর্কাইভে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

পাঁচতারা।
আমাকে লগইন দেখাচ্ছে কিন্তু কোনো কাজ করতে পারছি না। পাঁচতারাও খুঁজে পাচ্ছি না।
সুলতানা সাদিয়া

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

পেরেছি হাসি

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ / তথ্যপূর্ণ লেখা উপহার দেওয়ার জন্য। । অনেকেই দাবী করেন যুদ্ধপরাধীরা তখনকার পরিস্থিতে বাধ্য হয়ে রাজাকার হয়েছিলেন। যদিও জানি তারা সত্যকে আড়াল করার জন্যই এটাকে একটা অজুহাত হিসাবে উপস্থাপন করেন তথাপি তাদের নজরে এই ধরনের লেখাগুলো আনা একান্ত প্রয়োজন।
-----
ব্লগারাদিত্য

অতিথি লেখক এর ছবি

সময় নিয়েই পড়লাম। লেখককে ধন্যবাদ।

রাসিক রেজা নাহিয়েন

রানা মেহের এর ছবি

স্বয়ম - সেটাই। এদের অপরাধ কী না জানলে এদের প্রতি সমবেদনাইতো আসবেই। মিডিয়ার দায়িত্ববোধতো পরের কথা এরা যে আসলে কাদের জন্য কাজ করে বোঝা মুশকিল।

একলহমা, icsforum.org এর মিডিয়া আর্কাইভ পাতায় চোখ রাখতে পারেন। ওখানে খবরগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়।

নীড় সন্ধানী, এটা সরকারের দায়িত্ব মনে করিনা আমি। সরকার বিচার চালিয়ে যাচ্ছে, রায় কার্যকর করছে, রায়ের কপি সংরক্ষন করছে, আর কী করবে? এর প্রচারের দায়িত্বতো মিডিয়ার। সরকারের আশায় বসে থাকলে মিডিয়াকেই সুবিধা দেয়া হয় আসলে।

সাদিয়া, অনেক ধন্যবাদ।

ব্লগারাদিত্য, ছোট অঞ্চলের ছোট কেউ বাধ্য হয়ে রাজাকার হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এই লোকগুলো মাস্টার প্ল্যানার। তারা যা করেছে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করেই করেছে। তাদের ক্ষেত্রে এসব বলার সুযোগ নেই।

নাহিয়েন, আপনাকেও ধন্যবাদ পড়ার জন্য।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখাটা অনেক বিস্তৃত, অনেক কিছু জানা গেল। চমৎকার লিখেছেন, রানা আপু। মিডিয়ার নির্লজ্জ্বতার কথা তুলে আনার জন্য ধন্যবাদ।

দেবদ্যুতি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA