তাক থেকে নামিয়ে - ০৪

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি
লিখেছেন সাক্ষী সত্যানন্দ [অতিথি] (তারিখ: শনি, ০২/০৫/২০২০ - ১:৩১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সাজিদাক্রান্ত এই বদ্বীপে ইউভাল নোয়াহ হারারির পাঠক বোধকরি নিতান্ত কম নয়! নইলে একই বইয়ের চার-চারখানা ভিন্ন অনুবাদ বাজারে থাকা, এ এক বিশাল ব্যাপার! বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, স্যাপিয়েন্সের অনুবাদ হয়েছে অন্তত চারটে! এবং সে বইয়ের শুরুতে রগরগে খুন-জখম থাকলেও, আদতে সেটি স্রেফ গল্প নয়, ইতিহাসেরই বই। প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগে, এমন সমান্তরাল চিন্তাসূত্র গড়ে ওঠা, খুব অল্প হলেও আশাবাদী করে বৈকি। জানেন তো, আধামাইল দূরে আধামিনিটের জন্য জ্বলে ওঠা মোমবাতিতেও একদা হোজ্জ্বার গা-গরম হয়েছিল? আমার আশাবাদের মাত্রাও তেমনই। স্যাপিয়েন্স ছাড়াও হারারি লিখেছেন আরো। কয়েকবছর আগে ‘Homo Deus- A Brief History of Tomorrow’ শিরোনামে লিখেছিলেন অনাগত ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গল্প। এ বইটি কেন যেন, স্যাপিয়েন্সের মতন টানেনি। এরচেয়ে ভাল লেগেছে- একুশ শতকের একুশটি শিক্ষা। পরিরোধের শহরবন্দী জীবনে প্যান্টালুন পরে বেশ জাঁকিয়ে বসে ইংরিজি প্রবন্ধ পড়ছিলুম। ইংরিজি বড় খতরনাক ভাষা, বুঝতে চাইলে বরং কিছু অংশ অনুবাদ করে ফেলাই উত্তম। আর এটি এমন এক বই, যেটি আলীসায়েবের ঝান্ডুদার মতন- “পড়বিনি ব্যাটা? ও পরাণ আমার!” বলতে বলতে, জনে জনে কলার চেপে ধরে পড়াতে ইচ্ছে করে। কি আর করা? আগেই বলে নেই, এখানে এই বইয়ের অনুবাদ করতে বসিনি। বরং, পছন্দের অংশগুলো ভাগ করে নিতে চেয়েছি, সেইসাথে একটু চুলকে দিতে- যেন বইটা পড়ে ফেলেন।

বইয়ের মুখবন্ধে লেখক জানাচ্ছেন-

এ বইটি লেখা হয়েছে আমজনতার সাথে আলাপের সূত্রে। অনেকগুলো অধ্যায়ে যা আছে, তা আসলে বিভিন্ন সময়ে পাঠক, সাংবাদিক ও সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া নানান প্রশ্নের উত্তর। কিছু অংশ বিভিন্ন মাধ্যমে পূর্বপ্রকাশিতও বটে। ফলে আমি সুযোগ পেয়েছি জনপ্রতিক্রিয়া যাচাই সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পুনর্লিখনের। এতে কিছু অধ্যায় পাবেন প্রযুক্তি নিয়ে, কিছু রাজনীতি, কিছু ধর্ম আর কিছু আছে শিল্পকলা। কিছু অংশ লেখা হয়েছে মানুষের জ্ঞান নিয়ে আবার কিছু অংশে চিহ্নিত করেছি একই প্রজাতির অসীম নির্বুদ্ধিতার কাহিনী। সামগ্রিক প্রশ্নটা আসলে অভিন্ন। আজকের দুনিয়ায় কি হচ্ছে? চলমান নানান ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থ কি? ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান ঠিক কি তাৎপর্য বহন করে? গুজবের এই মহামারীতে আমরা কি করতে পারি? উদারপন্থী গণতন্ত্র কেন বিপদের মুখে? ইশ্বর কি ফিরছেন? নতুন কোন বিশ্বব্যবস্থা কি কড়া নাড়ছে? অনাগত বিশ্বের একচ্ছত্র শাসন কার হাতে- পশ্চিমা, চীনা না ইসলামপন্থী? ইউরোপ কি শরনার্থীদের জন্য সদর দরোজা হাট করে খুলে দেবে? জাতীয়তাবাদ কি পারবে অসমতা কিংবা বৈশ্বিক উষ্ণতার সমাধান করতে? সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে আমাদের করনীয় কি? বইটি মূলত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও, ব্যাক্তি আঙ্গিক এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। একইসাথে, এ যুগের বিপ্লবাত্মক ধারণাগুলোর সাথে বিচ্ছিন্ন ব্যাক্তিজীবনের আন্তঃসম্পর্কটিও আমলে নেয়া হয়েছে।

বইটি মোট পাঁচখন্ডে ভাগ করা। প্রথম খণ্ডের শিরোনাম ‘প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ’, এতে আছে প্রথম চারটি অধ্যায়। অধ্যায়গুলোর শিরোনাম- মোহমুক্তি, কাজ, স্বাধীনতা ও সমতা। পরবর্তী পাঁচটি অধ্যায় আছে ‘রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক দ্বিতীয় খণ্ডে। এই পাঁচ অধ্যায় হল- সম্প্রদায়, সভ্যতা, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম ও অভিবাসন। ‘আশা-নিরাশা’ নামের তৃতীয় খণ্ডে আছে আরো পাঁচটি অধ্যায়। এ পাঁচটির নাম- সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধ, অপমান, ইশ্বর ও ধর্মনিরপেক্ষতা। অজ্ঞতা, ন্যায়বিচার, উত্তর-সত্য আর কল্পবিজ্ঞান শিরোনামের সবচেয়ে আকর্ষনীয় চারটি অধ্যায় আছে বোধহয় ‘সত্য’ নামের চতুর্থ খণ্ডে। অবশিষ্ট তিনটি অধ্যায় রাখা হয়েছে ‘প্রত্যাবর্তন’ শীর্ষক শেষ খন্ডটিতে। এতে আছে শিক্ষা, মর্মার্থ ও ধ্যান! নিচের অংশে এই একুশটি অধ্যায়ের বিচ্ছিন্ন কিছু অংশ ভাগ করতে চাই সবার সাথে। আগেই সতর্ক করে দিচ্ছি- নিছক ব্যক্তিগত ভাললাগা থেকে বেছে নেয়া অংশগুলো, ঐ অধ্যায়ের সারমর্ম বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়। হারারি প্রতি অধ্যায়ে একটি জবরদস্ত ইংরিজি উপ-শিরোনাম ব্যবহার করেছেন। অত ইংরিজি আমার পোষায় না, প্যান্টালুন পরেও না। তাই কি আর করা, কবিনং শরনং গচ্ছামি!

০১। পৃথিবীর সব হাওয়া ছিপ ফেলে আড়ে বসে আছে

কিন্তু, উদারনৈতিকতা আমাদের বড় বড় প্রশ্নে মুখ গুঁজে বসে থাকে। যেমন পরিবেশগত ভারসাম্য কিংবা প্রযুক্তির হানা। ঐতিহাসিকভাবেই উদারনৈতিকতাবাদ আশা করে বসে থাকে যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বুঝি জাদুর কাঠি ছুঁইয়ে রাতারাতি সামাজিক-রাজনৈতিক সংঘাত মিটিয়ে দেবে। উদারনৈতিকতাবাদ পুনর্মিলনে বাধ্য করে শোষক-শোষিত কিংবা ধার্মিক-নিধার্মিক কিংবা আদিবাসী-অভিবাসী কিংবা ইউরোপ-এশিয়াকে। আর সুচতুর বানরের মতন সবাইকেই সে আশ্বস্ত করে যে, তার পিঠার ভাগটাই বড়। বানরের ভাগ করে চলা পিঠাটা যতক্ষণ আকারে বাড়তেই থাকে, ততক্ষণ সমস্যা নেই। মুশকিল হল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনোই বাঁচাবে না আক্রান্ত প্রতিবেশকে, কেননা আক্রমণকারী যে সে নিজেই! এবং, প্রযুক্তির হানায় সৃষ্ট নিত্যনতুন বিভাজন কমবে না একই কারণে- ওঝা হয়ে যে ঝাড়বে, সেই একই জন যে দংশেছে সর্পরূপে! উদারনৈতিক গল্প আর মুক্তবাজারের মরীচিকা, সবাইকে স্বপ্ন দেখায় আরো বড় স্বপ্ন দেখতে। গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও এতে বাধা পড়েনি। এসময়ের প্রতিটি প্রজন্ম, সাংহাই, ইস্তাম্বুল বা সাও-পাওলো, যেখানেই জন্মাক না কেন, আগের প্রজন্মের চেয়ে ভাল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কাজের সুযোগ পেয়েছে। প্রযুক্তির হানা এবং পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার ফলে, অনাগত কয়েক দশকে অন্তত এটুকু ধরে রাখতে পারা লোকেরাই অনেক ভাগ্যবান হবে। [পৃষ্ঠা-১৬]

০২। পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যন্ত্রশ্রমিক আর ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারের উত্থানে সস্তা এবং অদক্ষ শ্রম গুরুত্ব হারাবে। ঢাকায় একটি শার্ট বানিয়ে বিমানে সেটি আমেরিকার বাজারে উড়িয়ে নেয়া হবে অর্থহীন। তারচেয়ে, শার্টটির অন্তর্জালিক লিপিচিত্র কেনা যাবে আমাজনের আঙ্কিক বোতাম চেপে, ছাপা হবে নিউ-ইয়র্কেই। ক্রয়কৃত লিপিচিত্রটি ব্যবহার করে, ব্রুকলিনের একটি ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে সেটি ছেপে নেয়া যাবে সহজেই। একইভাবে ব্যাঙ্গালোরের ভোক্তা-অধিকার কেন্দ্রে অভিযোগ জানানোর চেয়ে সহজ হবে অন্তর্জালিক তথ্যমেঘে কৃত্রিম বুদ্ধির এক প্রতিনিধিকে নালিশ করা। এমনও হতে পারে, আপাত গাড়ল প্রতিনিধিটি প্রতিবার নিজের চেহারা ও কণ্ঠ বদলে নেবে তথ্যমেঘে রাখা ভোক্তার চাহিদামতন। ঢাকা কিংবা ব্যাঙ্গালোরের সদ্য বেকার হয়ে পড়া বস্ত্রশ্রমিক কিংবা কথনশ্রমিকের পক্ষে কঠিন হবে টিকে থাকা, কেননা অন্য কোনও দক্ষতা তাদের নেই। [পৃষ্ঠা-৩৯]

সংরক্ত একাত্মতা আর অর্থপূর্ণ সাধনায় আমরা যদি একটি সার্বজনীন সুরক্ষানীতি গড়ে তুলতে পারি, তাহলে সর্বগ্রাসী ধাপচিত্রণের* কাছে চাকরি হারানোটা- শাপে বর হলেও হতে পারে। বরং জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, আরও আশঙ্কাজনক। সম্ভাব্য গণ-বেকারত্বের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণটুকু মানুষ থেকে ধাপচিত্রণের দখলে চলে যাওয়া নিয়েও আমাদের মাথা ঘামানো প্রয়োজন। কেননা, সেটি উদারনৈতিক গল্পের অবশিষ্ট শ্রোতাদের কবরে পাঠিয়ে দিতে পারে নিমেষেই। সেই সঙ্গে উত্থান ঘটতে পারে আঙ্কিক একনায়কের! [পৃষ্ঠা-৪৩]

(*ধাপচিত্রণঃ Algorithm-এর পরিভাষা হতে পারে কি?)

০৩। নতুন ইশ্বর এক বেরিয়েছে নতুন গির্জায়

“আপনার অনুভূতি কি?” জিজ্ঞাসা না করে “আপনি কি ভাবছেন?” এ প্রশ্ন করলে অনেকে বিব্রত হতে পারেন, অথচ গণউপলব্ধি এর উল্টো। গণভোট আর নির্বাচন সবসময়ই অনুভূতি বেছে নেয়, যৌক্তিকতা নয়। গণতন্ত্র যদি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি হত, তবে সবাইকে সমান ভোটাধিকার বা আদৌ ভোটাধিকার দেয়াই অর্থহীন হত। অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুটিকয়েক মানুষ অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য জানে। ব্রিতাড়ন* সংক্রান্ত গণভোট প্রসঙ্গে খ্যাতনামা জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছিলেন এই বলে- “আমিসহ অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিককে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা অনুচিত, কেননা আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এভাবে চললে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদের গণভোটে ঠিক করতে হবে যে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্যে আলোর বেগ ধ্রুব রাখা হবে কি না? কিংবা যাত্রীদের গণভোটে বেছে নিতে হবে, যে বৈমানিক কোন দিক থেকে বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন।” [পৃষ্ঠা-৪৫]

আমরা সাধারণত বুঝতে পারিনা, অনুভূতিমাত্রই কিছু হিসাবের সমষ্টি। এই হিসাবগুলো আমাদের বোধগম্য মাত্রার এত নিচে আর এত দ্রুত ঘটে, যে আমরা টের পাই না। আমরা লাখো স্নায়ুকোষের নিরন্তর কর্মপদ্ধতি এবং তাদের মাধ্যমে চলমান টিকে থাকা ও পুনরুৎপাদন সংক্রান্ত সম্ভাব্যতার হিসাব অনুভব করি না। সেজন্যই সঙ্গী নির্বাচন কিংবা সাপ দেখে ভয় পাওয়ার বিবর্তনীয় উৎস জানা না থাকলে, এদের আমরা তথাকথিত ‘ইচ্ছা’ ভেবে ভুল করি। এভাবে অজ্ঞাত বিষয়ে গণভোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য হয়ে ওঠে সেই ইচ্ছাই। [পৃষ্ঠা-৪৭]

মোড়কে ছাপা তথ্য থেক ফুসফুসের কর্কটরোগ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান জেনেও সারাক্ষণ ধূমপান চালিয়ে যাওয়া এক কথা। আর, দেহে সংযুক্ত জৈবতথ্য পরিমাপক যন্ত্রের সহায়তায়, সরাসরি ‘আপনার বাঁ-ফুসফুসে গণ্ডাখানেক কর্কটকোষের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে’ এই বার্তা পেয়ে ধূমপান অব্যাহত রাখা আরেক কথা। সারাক্ষণ যন্ত্রের কচকচি কারই বা সহ্য হবে? আপনি চাইলে দিনে বা মাসে একবার সার্বিক তথ্য জানাবে, এমন ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। হাইপোকেন্ড্রিয়াক ছাড়া কেউই মিনিটে মিনিটে এই তথ্য জানতে আগ্রহী হবে না। যন্ত্রের তথ্যকে পাশ কাটিয়ে যেতেই পারেন, কিন্তু সেই তথ্য যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার জীবন-বীমা সংক্রান্ত তথ্যমেঘেও জমা হতে থাকে? [পৃষ্ঠা-৪৯]

(*ব্রিতাড়নঃ Brexit-এর পরিভাষা হতে পারে কি?)

০৪। আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন

অন্য সম্ভাব্য সমাধানের চাইতে, ‘তথ্যের ব্যক্তিগত মালিকানা’ এই ধারণাটি জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ কি আসলে? আমরা বহুবছর ধরে জমিজমা ইত্যাদির মালিকানা ও সেই সংক্রান্ত নিয়মে অভ্যস্ত। আমরা বসতবাড়ির সীমানাপ্রাচীর বানাতে পারি, বেছে নিতে পারি হরেক রকমের নকশাকাটা দরজা, নিয়োগ দিতে পারি দারোয়ান আর তাকে নির্দেশ দিতে পারি কাদের ঢুকতে দেয়া যাবে। কিন্তু, গত দুই শতকে শিল্পকারখানার মালিকানা সংক্রান্ত ধারণাগুলোকে আমরা চকবাজারের শাহী জিলাপির মতন পেঁচিয়ে ফেলেছি। শেয়ারবাজারের সুবাদে, আজ একই লোক একই সঙ্গে বুকপকেটে বেক্সিমকো ফার্মার এক টুকরো এবং পাছপকেটে স্কয়ার ফার্মার আরেকটুকরো মালিকানা ভাঁজ করে রাখতে পারে অবলীলায়। কিন্তু যন্ত্রপাতি বা জমিজমার মতন, তথ্যের মালিকানার ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ এমনকি চিন্তা করাও তত সহজ নয়। তথ্য থাকতে পারে যেকোনখানেই, একইসঙ্গে একাধিক স্থানে। এটি ছুটে যেতে পারে আলোর বেগে, আর এর থাকতে পারে অসংখ্য প্রতিলিপি! আমাদের আইনিজীবি, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক এমনকি কবিদেরও এই গোলকধাঁধা নিয়ে একটু মাথা ঘামানো প্রয়োজন। কিভাবে লোকে তার তথ্যের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করবে- এটিই এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। [পৃষ্ঠা-৮০]

০৫। নিঃসঙ্গ ছিলাম আফ্রিকার গণ্ডারের থেকেও

আন্তর্জালিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক মেরুকরণ সম্পর্কে জাকারবার্গের সমাধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে, মানুষকে কেবল সংযুক্ত করা এবং ভিন্নমতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়াই সামাজিক বিভাজন ভেঙে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। অনেকসময় বিপরীত চিন্তাধারার একটি প্রবন্ধ সামাজিক মেরুকরণকে আরও উস্কে দিতে পারে। জাকারবার্গের পরামর্শ এই যে, মতামতের চেয়ে রক্তমাংসের মানুষটাকে জানা হয়তো উপকারী হতে পারে- আদতে ফেসবুকের চিন্তাটা এমনই। আমরা সামাজিক মাধ্যমে অভিন্ন আগ্রহের যায়গায়, যেমন খেলা কিংবা চলচ্চিত্র সংক্রান্ত মতবিনিময়কালে, সহজাতভাবে ঐকমত্যের চেয়ে মতভিন্নতা নিয়েই আলোচনায় অভ্যস্ত। [পৃষ্ঠা-৯০]

০৬। তবে কি বিজয়ী হবে সভ্যতার অশ্লীল শ্লোগান?

কালোঝান্ডাধারীরা যখন সিরিয়া আর ইরাকের অংশবিশেষ দখল করেছে, তখন খুন হয়েছে লাখো মানুষ, ধ্বংস হয়েছে হাজারো প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন, আর নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যত্ন করে ধ্বংস করা হয়েছে সদ্য-সাবেক শাসক আর পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতিটি চিহ্নকে। কিন্তু, এই দানবেরাই যখন স্থানীয় ব্যাংকে গিয়ে ডলারের পাঁজা পেয়েছে, তখন ডলারের নোটে ওয়াশিংটনের ছবি কিংবা আমেরিকান জাতীয়তাবাদী শ্লোগান দেখেও অনুভূতিতে বিন্দুমাত্র আঘাত পায়নি। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক ধ্বংস করার ধুয়া তুলে তারা ডলার পোড়ায়নি। কেননা, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে, ডলারের ধারণা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। যদিও ডলারের নেই কোনও নিজস্ব দাম- ডলার চিবিয়ে কিংবা পানিতে গুলে খাওয়া যায় না। তবুও ডলারের কল্পিত ধারণায় আমাদের বিশ্বাস এতই দৃঢ় যে, ইসলামী মৌলবাদী কিংবা মেক্সিকান মাদক কারবারী কিংবা কোরিয়ান স্বৈরশাসক, সবাই এতে একমত। [পৃষ্ঠা-১০৬]

আজকাল কেউ অসুস্থ হলে, ভূগোল খুব একটা বাগড়া দেয় না। রোগীটি তেহরান, তেল-আবিব, টরেন্টো বা টোকিও, যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁকে প্রায় একই চেহারার হাসপাতালেই নেয়া হবে। সেখানে দেখা মিলবে একই ছাঁটের সাদা পোশাক পরা চিকিৎসকের, যাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্যই জেনেছেন। তাঁরা একই পদ্ধতিতে একই যন্ত্রের সাহায্যে একই পরীক্ষণের মাধ্যমে একই রোগ নির্ণয় করবেন। তারপরে তাঁরা কোন আন্তর্জাতিক ঔষধ প্রস্তুতকারকের তৈরি একই ওষুধ খেতে বলবেন। কিছু সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকা স্বত্বেও, কানাডীয়, জাপানী, ইরানী বা ইজরায়েলী ডাক্তারেরা মানবদেহ এবং রোগতত্ত্ব সম্বন্ধে অভিন্ন মতামত পোষণ করেন। কালো ঝাণ্ডা হাতে রাকা ও মোসুলে ঝাঁপিয়ে পড়া দখলদারেরা কিন্তু স্থানীয় হাসপাতাল ধ্বংস করেনি। বরং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মুসলিম চিকিৎসকদের আহবান জানিয়েছে, সেখানে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে। মজার ব্যপার হল, এমনকি কালোঝান্ডাবাহী চিকিৎসকেরাও মেনে নিয়েছেন যে মানবদেহ কোষ দ্বারা তৈরি, রোগের উৎপত্তি হয় জীবাণু থেকে আর এন্টিবায়োটিক মেরে ফেলে অণুজীবদের! [পৃষ্ঠা-১০৭]

০৭। কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না...

জলবায়ু পরিবর্তনের নিরিখে, জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদ আসলে পারমাণবিক যুদ্ধের চাইতে ভয়ানক। সর্বাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধ যেহেতু সবাইকেই ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দেয়, তাই এটি ঠেকাতে সব দেশই মোটামুটি একমত। বৈশ্বিক উষ্ণতার সমস্যাটি বিভিন্ন দেশে প্রভাব ফেলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়। কিছু দেশ, যেমন রাশিয়া এতে বরং উপকৃত হতে পারে। রাশিয়ার সাগরতীরবর্তী স্থাপনা কম, তাই সাগরতলের উত্থানে দেশটি ততটা চিন্তিত নয় চীন কিংবা কিরিবাতির মত। আবার, বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে গেলে একদিকে যেমন শাদ পরিণত হতে পারে মরুভূমিতে, অন্যদিকে সাইবেরিয়ার বরফঢাকা প্রান্তর হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যত দুনিয়ার রুটির ঝুড়ি। উত্তর মেরুর বরফ গলে গেলে রুশ অধ্যুষিত উত্তর মহাসাগর হয়ে উঠতে পারে বিশ্ববাণিজ্যের রাজপথ। অধুনা বরফাচ্ছাদিত কামস্কাটকা হয়তে হয়ে উঠবে অনাগত দিনের সিঙ্গাপুর। [পৃষ্ঠা-১১৯]

০৮। কতকিছু দৈবে ঘটে ধরণীর পদপ্রান্তে এসে

বিগত দুই শতাব্দীতে মুসলিম, ইহুদী, হিন্দু ও খ্রিস্টান চিন্তকেরা আধুনিক বস্তুবাদ, আত্মাহীন পুঁজিবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধ শিবিরে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকেরই অভিন্ন দাবী- একবার সুযোগ পেলে তাঁরা আধুনিক যুগের সব সমস্যার সমাধান করে আধাত্ম্যিক মূল্যবোধের বেদীতে এক নতুন আর্থ-সামাজিক পদ্ধতি গড়ে তুলবেন। আসলে তাঁরা অনেক সুযোগই পেয়েছেন। দিনশেষে আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তাঁদের অবদান হল উচ্চমার্গে বিশালাকায় রঙিন নতুন চাঁদ, ক্রুশ, ডেভিডের তারকা কিংবা ওঁ পুনস্থাপন করা। বৃষ্টি নামানোয় নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য, প্রাচীন ওঝারা নিজের বক্তব্যে নিত্যনতুন শর্ত জুড়ে দোষ চাপিয়ে দিতেন ভুক্তভোগীর ঘাড়েই। একইভাবে, আজকের দিনে যখন অর্থনৈতিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়, তখন ধর্মগুরুরা স্বীয় পবিত্র গ্রন্থের নিত্যনতুন ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করে, গ্রন্থটিকেই খেলো করে তোলেন। যেই অর্থব্যবস্থাই গৃহীত হোক না কেন, খোমেনি সবসময়ই এর একটি ব্যাখ্যা খুঁজে পাবেন কোরানে। এর ফলে ঐশী জ্ঞানের উৎস থেকে কোরান নেমে আসে মামুলী এক বিধিমালার কাতারে। হতেই পারে, কোনও এক জটিল অর্থনৈতিক সমস্যার যথার্থ সমাধান হয়তো দিয়ে গেছেন মহামতি মার্ক্স। সেক্ষেত্রে নিরিবিলিতে মার্ক্স পঠন হয়ত খুঁজে দেয় উত্তর, এবং শেখায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে। উত্তর পাওয়ামাত্র মোল্লাসায়েবরা ছুটে যাবেন কোরান খুঁজতে, যদি নবলব্ধ জ্ঞানের সমান্তরালে কোনও আয়াত পাওয়া যায়-এই আশায়। সরাসরি পেলে ভাল, নইলে তো কল্পনাশক্তি আছেই। আসলে সমাধানটা মুখ্য নয়, কোরানে দক্ষ একজন সবসময়ই আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু না কিছু উদ্ভাবনে সমর্থ হবেন। [পৃষ্ঠা-১৩১]

০৯। যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

এই বিতর্কের মূল আসলে প্রোথিত হয়েছে ব্যক্তিক কালসীমা আর সামষ্টিক কালসীমার পার্থক্যে। সামষ্টিক দৃষ্টিতে চল্লিশ বছর খুবই অল্প সময়। কয়েক দশকেই একটি আদিবাসী সমাজে একদল অভিবাসীর পূর্ণ আত্মীকরণ দুরাশা। অতীত সভ্যতাগুলো, যারা বিভিন্ন জাতের মিথস্ক্রিয়ায় সমমর্যাদার নাগরিক সমাজ গড়ে তুলেছে- যেমন প্রাচীন রোম, ইসলামী খেলাফত, চৈনিক সাম্রাজ্য কিংবা অধুনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, প্রত্যেকেই শতাধিক বছর যাবত এই পরিবর্তন করেছে। [পৃষ্ঠা-১৪৫]

এসব বিতর্কের আগে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন মুখ্য হয়ে ওঠে- যেটি সাংস্কৃতিক বোধের সাথে জড়িত। অভিবাসন বিতর্কে জড়ানোর আগে আমরা কি মেনে নেই যে- সহজাতভাবে সকল সংস্কৃতিই সমান গুরুত্ববহন করে? না কি কিছু সংস্কৃতি আদতে অন্য সংস্কৃতির চেয়ে উন্নত? জার্মান কর্তৃপক্ষ যখন লাখো সিরীয় অভিবাসীর জন্য দরোজা খুলে দেয়, তখন জার্মান সংস্কৃতি কি কোনভাবে সিরীয় সংস্কৃতি থেকে শ্রেয়ত্ব দাবী করে বসে? [পৃষ্ঠা-১৪৭]

তাছাড়া, যখনই মানদণ্ড বেছে নেয়ার প্রশ্ন আসে, তখন স্থান-কাল-পাত্র এমনকি সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতাপ্রসূত দাবীই প্রধান হয়ে ওঠে। অনেকসময় মানুষ এমন অতি সাধারণীকৃত দাবী করে বসে, যা আদতে অর্থহীন। সেজন্যই, “উচ্ছ্বাস প্রকাশের ক্ষেত্রে, ঠান্ডাপীরের মুরীদেরা গরমপীরের মুরীদদের চেয়ে কম সহনশীল”- এই ভাষ্যটি অনেকটাই অর্থবহ বৈকি। কিন্তু, “মুসলিম সংস্কৃতি খুবই অসহিষ্ণু” এই ভাষ্যটি বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন! অসহিষ্ণু মানে কি? কাদের প্রতি বা কিসের প্রতি অসহিষ্ণু? একটি সংস্কৃতি ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা বিচিত্র রাজনৈতিক মতাদর্শীদের সাথে প্রচণ্ড অসহিষ্ণু এবং একইসাথে বেঢপ মোটা কিংবা প্রৌঢ়দের সাথে সহনশীল আচরণ করতে পারে, তাহলে? আর মুসলিম সংস্কৃতি বলতেই বা ঠিক কি বোঝায়? এখানে কি সপ্তম শতকের আরব উপদ্বীপের কথা বলা হচ্ছে? ষোড়শ শতকের ওসমানীয় সাম্রাজ্যের কথা বলা হচ্ছে? গত শতকের পাকিস্তানের কথা বলা হচ্ছে? এখানে মাপকাঠিটা কি? যদি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাথে আচরণের প্রেক্ষিতে তুলনায় যাই, তবে ষোড়শ শতকে পশ্চিম ইউরোপের চেয়ে ওসমানীয় খেলাফতকে অনেক সহনশীল মনে হবে। আবার, তালেবান শাসিত আফগানিস্থানের সাথে সমসাময়িক ডেনমার্কের তুলনা করতে গেলে সম্পুর্ণ ভিন্ন ফলাফল আসবে। [পৃষ্ঠা-১৫৩]

১০। ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়

সন্ত্রাসবাদীদের চিন্তনপ্রক্রিয়া ঠিক প্রাতিষ্ঠানিক সেনাপতিদের মতন নয়। বরং তারা ভেবে থাকে নাট্যকার আর নাট্য-নির্দেশকদের মতন। নয়-এগারোর আক্রমণটির গণস্মৃতি এর সাক্ষ্য দেয়। কোন পথচারীকে থামিয়ে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়- ‘নয়-এগারোতে কি ঘটেছিল?’ অধিকাংশই উত্তর দেবে যে- ‘আল-কায়েদার আক্রমনে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সুউচ্চ ভবনদুটি গুঁড়িয়ে গিয়েছিল।’ অথচ, এটিই নয়-এগারোয় ঘটা একমাত্র হামলা নয়। একইদিনে একই গোষ্ঠীর আরও দুইটি হামলা সফল হয়েছিল, যার একটি খোদ পেন্টাগনে। অধিকাংশ মানুষই কেন এটি ভুলে যায়? নয়-এগারোরর ঘটনাটি যদি প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক আগ্রাসন হত, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্ববাহী হত পেন্টাগন হামলার অংশটি। এতে আল-কায়েদা আক্ষরিক অর্থেই শত্রু শিবিরের কেন্দ্রে আঘাত হেনেছিল সফলভাবে। এই হামলায় হতাহত হন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্তা ও বিশ্লেষকেরা। তবুও, গণস্মৃতির সিংহভাগে কেন দুটি বেসামরিক ভবন ধ্বংস হওয়া এবং ব্যাবসায়ী-হিসাবরক্ষক-কেরানিদের মৃত্যুই মুখ্য? উত্তরটি সম্ভবত লক্ষ্যবস্তুদ্বয়ের জ্যামিতিক আকৃতির সাথে সম্পর্কিত। পেন্টাগন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, ভবনটি একেবারেই সাদামাটা এবং কিঞ্চিৎ অপরিচিত একটি স্থাপনা। অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের যমজ ভবনদ্বয়ের একটি গণপরিচিতি আছে এবং সেইসাথে এর ধ্বসে পড়ার দৃশ্যে আছে পর্যাপ্ত নাটকীয়তা! এটি একবার দেখলে ভোলার নয়! [পৃষ্ঠা-১৬২]

১১। নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না

তাহলে, একটা সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধকে কতটা ভয় পাওয়া উচিৎ? চরমপন্থা এড়িয়ে যেতে পারা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভাল উপায়। কিন্তু, দিনশেষে যুদ্ধ এক অনিবার্য বাস্তবতা। গত শতকে ঠান্ডাযুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি এটিই দেখিয়েছে যে, মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে পরাশক্তিগুলোর সংঘাতও শান্তিপূর্ণভাবে মেটানো যায়। এটা হয়তো স্বতঃসিদ্ধ ভবিষ্যদ্বাণীর মতন শোনাতে পারে- কিন্তু এটিও ভয়ানক যে, নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা অনিবার্য। একসময় রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধকেও অনিবার্য ভেবেছিল। এজন্য তারা সেনাবাহিনী গড়েছে, একে অপরকে পাল্লা দিয়েছে অস্ত্রসম্ভারে, যেকোন সংকট নিরসনে অস্বীকার করেছে আপস করতে, এবং নিছক ভদ্রতাকেও ভেবেছে সম্ভাব্য ফাঁদ! এগুলোই উস্কে দিয়েছে যুদ্ধ। অন্যদিকে, যুদ্ধকে অসম্ভব ভেবে নেয়া একেবারেই ছেলেমানুষি হবে। এমনকি যুদ্ধ যদি সবার জন্য বিপর্যয়ও ডেকে আনে, তবু ঈশ্বর, আইন অথবা প্রকৃতি কারো সাধ্য নেই, মানুষের নির্বুদ্ধিতা ঠেকানোর। [পৃষ্ঠা-১৮০]

১২। যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের— মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা

নিঃসন্দেহে, ইহুদীরা অসামান্য ইতিহাস বয়ে চলা এক অনন্য জনগোষ্ঠী। (অবশ্য, এটি সব জনগোষ্ঠীর জন্যই সত্য!) একইভাবে এটিও বলা যায়, ইহুদী প্রথাগুলো ধারণ করে গভীর অন্তর্দৃষ্টি আর মহৎ মূল্যবোধ। (যদিও, এই প্রথাগুলো একইসঙ্গে ধারণ করে বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী এবং অমানবিক কিছু বোধও!) সেইসঙ্গে এটিও সত্য যে, বিগত দুই সহস্রাব্দে ইহুদীরা তাদের জনসংখ্যা অনুপাতে বেশ অসম একটি অভিঘাত রেখে চলেছে ইতিহাসে। অথচ, মানবপ্রজাতির বৃহত্তর ইতিহাসের দিকে, অর্থাৎ প্রায় এক লক্ষ বছর আগে হোমো স্যাপিয়েন্সের উদ্ভব থেকে পুরো ছবিটার দিকে তাকালে দেখা যায়, তাতে ইহুদীদের কোন অবদান নেই বললেই চলে। মানবজাতি সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে, কৃষিকাজ শুরু করেছে, গড়ে তুলেছে নগর, লিখতে শিখেছে, উদ্ভাবন করেছে টাকা- আর এগুলো সবই ঘটেছে ইহুদী জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবের অনেক অনেক আগেই। [পৃষ্ঠা-১৮৫]

আব্রাহামিক ধর্মীয় কাঠামোগুলো থেকে মুসা, যীশু কিংবা মুহম্মদকে সরিয়ে নিলে ‘নৈতিকতা’ ধারণাটি ব্যখ্যা করা দুরহ হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন তৃণভূমিতে নির্বিবাদে বাস করা আদিবাসী গোষ্ঠীরাও তো মেনে চলে নিজস্ব নৈতিক কাঠামো। এখন, নির্মমভাবে তাদের উচ্ছেদ করে চলা ঔপনিবেশিক খ্রিস্টান সেনাদল বনাম সদ্য ভূমিহারা স্থানীয় অধিবাসী- কার নৈতিক মানদণ্ড বেশি ভাল, এই প্রশ্নের কোনও উত্তর আছে কি? নৈতিকতা প্রসঙ্গে, অধুনা বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত করে থাকেন এর বিবর্তনীয় উৎসের দিকে, এবং যার শুরু মানবপ্রজাতির উদ্ভবেরও অনেক অনেক আগে। নেকড়ে, শুশুক বা বানরের মতন সামাজিক সব স্তন্যপায়ী প্রজাতিরই আছে নিজস্ব নীতিসূত্র। যেমন, নেকড়েশাবকেরা একে অন্যের সাথে খেলার সময় কঠোরভাবে মেনে চলে নিজস্ব আইন। তাগড়া কোন শাবক যদি নীতিভঙ্গ করে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি বলপ্রয়োগ করে, অন্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই শাবকটিকে তাজ্য করে খেলা থেকে। শিম্পাঞ্জীরাও কঠোরভাবে মেনে চলে দূর্বলের নায্য অধিকার বিধি। দুবলা এক খুদে শিম্পাঞ্জীর টোকানো কলায় জোরপূর্বক ভাগ বসাতে আসে না শক্তিমান আলফা-পুরুষটি। এই নীতিভঙ্গ করলে আশংকা থাকে নেতৃত্ব হারানোর। [পৃষ্ঠা-১৮৭]

একেশ্বরবাদ মানব প্রজাতির নৈতিক মানোন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখেনি বললেই চলে। বহু ইশ্বরের বদলে স্রেফ একেশ্বরে বিশ্বাসের দরুন মুসলিম নৈতিকতা কি সহজাতভাবেই হিন্দু নৈতিকতার চেয়ে ভাল হয়ে যাবে? আগ্রাসী খ্রিস্টান সেনাদের নৈতিকতা কি আদিবাসী প্রকৃতিপুজারীদের চেয়ে ভাল বলা চলে? একেশ্বরবাদ নিঃসন্দেহে মানবপ্রজাতির একটি অংশকে আগের চেয়ে আরও বেশি অসহিষ্ণু করে ঠেলে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী ধারণাটির প্রচার ও প্রতিষ্ঠায়, যা রূপ নিয়েছে নিরন্তর এক ধর্মযুদ্ধে। বহু ইশ্বরে বিশ্বাসীরা বহুদিন এতেই অভ্যস্ত ছিল যে, বিভিন্ন গোত্রের ভিন্ন ইশ্বরের উপাসনা ভিন্ন উপায়ে হবে। স্রেফ নিজের ইশ্বরের উছিলায় তারা অন্য ইশ্বরের পূজারীকে অভিযুক্ত করেছে বা মেরে ফেলেছে এমন ঘটনা বিরল। অন্যদিকে, একেশ্বরবাদীদের দাবী মোতাবেক তাদের ঈশ্বরই একমাত্র ইশ্বর, উপরন্তু সেই ইশ্বর দাবী করেন বিশ্বজনীন এক নিরংকুশ আনুগত্য। বিশ্বের বুকে ইসলাম ও খ্রিস্টান মতাদর্শীরা যতই ছড়িয়ে পড়েছে, ক্রুসেড, জিহাদ, বিধর্মী-শিকার আর ধর্মীয় বৈষম্য ততই বেড়েছে। [পৃষ্ঠা-১৯১]

উনবিংশ ও বিংশ শতকেই প্রথমবারের মত ইহুদীরা সামগ্রিকভাবে মানব প্রজাতির জন্য কোনও বলার মত অবদান রেখেছে। আইনস্টাইন বা ফ্রয়েডের মতন সুপরিচিত নামের পাশাপাশি বিজ্ঞানে প্রতি একশত জন নোবেল বিজয়ীদের প্রায় বিশ জনই ইহুদী জনগোষ্ঠীর সদস্য, যেখানে বিশ্বের জনসংখ্যায় তাদের উপস্থিতি প্রতি হাজারে দুই জন। আবার, এটিও পরিষ্কার ভাষায় মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই বৈজ্ঞানিক অবদান পুরোটাই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অবদান। এতে সামষ্টিকভাবে ইহুদী জনগোষ্ঠী বা ইহুদী সংস্কৃতির কৃতিত্ব দাবী করার সুযোগ নেই। গত দুই শতকের গুরুত্বপূর্ণ ইহুদী বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানীরা প্রায় প্রত্যেকেই ইহুদী ধর্মীয় সীমার বাইরে গিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। সত্যি বলতে কি, গোঁড়া রাবাইদের টোল ছেড়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারে মনোযোগ দেয়ার পর থেকেই তারা বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পেরেছে। [পৃষ্ঠা-১৯৩]

সংক্ষেপে বলা যায়, ইহুদী সংস্কৃতিতে শিক্ষাগ্রহণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়াটা হয়তো ইহুদী বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানীদের সফলতার একটি বিচ্ছিন্ন নিয়ামক হতে পারে। কিন্তু, আইনস্টাইন, হেবার কিংবা ফ্রয়েডের কাজের ভিত্তি গড়েছিলেন বিধর্মী চিন্তকেরাই। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব কখনোই ইহুদী মতাদর্শ চালিত কোনও ঘটনা ছিল না, বরং তালমুদ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সূত্রেই ইহুদী বিজ্ঞানীরা এর অংশ হতে পেরেছিলেন। বহু শতাব্দী ধরে কেবলমাত্র ঐশী গ্রন্থেই সব উত্তর খোঁজায় অভ্যস্ত ইহুদীদের জন্য, বিজ্ঞানের অসীম জগতে পদার্পন বেশ কঠিনই ছিল, কেননা এতে উত্তর খোঁজা হত সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে- স্রেফ পর্যবেক্ষণ আর পরীক্ষণ থেকে।তাই বৈজ্ঞানিক সাফল্যের সাথে ইহুদী ধর্মতত্ত্বের সংযোগ খোঁজা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ১৯০৫-১৯৩৩ সালে কেবল জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই দশজন ইহুদী বংশোদ্ভূত সেকুলার বিজ্ঞানী নোবেল জিতেছেন অথচ ঐ একই সময়কালে বুলগেরিয়া কিংবা ইয়েমেনের কওমী টোলগুলোয় শিক্ষিত একজন গোঁড়া ইহুদীও বিজ্ঞানের সাগরে একফোঁটা শিশির ঢালতে সক্ষম হননি। যদি ওই দুয়ের মাঝে বলার মতন আন্তঃসম্পর্ক থেকেই থাকে, তবে এই ঘটনা ব্যাখ্যা করা কঠিন। [পৃষ্ঠা-১৯৫]

১৩। আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন

বিশ্বাসীদের ইশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তাঁরা সাধারণত রহস্যময় মহাবিশ্ব এবং মানবীয় বোধের সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করেন। ‘যেহেতু বিগ-ব্যাং ঘটার ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারে না’ তাহলে ‘নিশ্চয় এটি ঈশ্বরেরই কাজ’ এভাবেই তাঁরা বলে থাকেন। ঠিক যেমনটি করে থাকেন জুয়েল আইচ, কথার জাদুতে দর্শকদের ব্যাস্ত রেখে অবলীলায় খরগোশ বের করে আনেন টুপির তলা থেকে। বিশ্বাসীরাও একই পদ্ধতিতে মহাবিশ্বের ধোঁয়াচ্ছন্ন সৃষ্টিরহস্যে ঈশ্বরের অবদান নিয়ে কথামালা বুনতে বুনতে অবলীলায় দুনিয়াবি আইনের খরগোশ বের করে আনেন ঐশী টুপি থেকে। ইশ্বরকে মহাবিশ্বের অজ্ঞাত রহস্যের স্রষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করার পরমুহূর্তেই আচমকা তাঁকে ব্যবহার করা হয় পরিধেয় অনুমোদনে কিংবা বিবাহ-বিচ্ছেদের আইনবিদ হিসেবে। যেহেতু বিগ-ব্যাং ঘটনাটি ব্যাখ্যার অতীত, সেহেতু অবশ্যই চুল ঢেকে রাখতে হবে। অথচ, এদের মাঝে কোনও সংযোগই নেই। বিশ্বের রহস্যের ধোঁয়া যতই ঘনীভূত করা হয়, তার সাথে সমকামী-অধিকার অস্বীকারের আন্তঃসম্পর্কটি ততই উদ্ভট ঠেকে। [পৃষ্ঠা-১৯৮]

যদিও ঈশ্বর চাইলে আমাদের সহমর্মিতা ধারণে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন, তিনি আসলে নৈতিকতা চর্চার অনিবার্য উপাদান নন। নৈতিকতা চর্চায় অতিপ্রাকৃতের ধারণাটি আসলে ধরে নিতে বাধ্য করে যে নৈতিকতা মাত্রই ঐশী উৎসজাত। অথচ নৈতিকতার বোধটি অতিপ্রাকৃত নয়, নিতান্তই প্রাকৃতিক। শিম্পাঞ্জি থেকে ইঁদুর, সব স্তন্যপায়ী প্রজাতিই একধরণের নীতিসূত্র দ্বারা বিরত থাকে চৌর্যবৃত্তি বা খুন থেকে। মানব প্রজাতির বিভিন্ন অংশও ধারণ করে নৈতিকতা অথচ তারা বিশ্বাসী ভিন্ন ভিন্ন ইশ্বরে, এমনকি অনেকে আদৌ বিশ্বাসীই নয়। হিন্দু বৈদিক সূত্র না মেনেও একজন খৃস্টান পারে দয়ার্দ্র হতে। যীশুর ঐশী আবেদন অস্বীকার করেও একজন মুসলমান পারে সততার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। ডেনমার্ক কিংবা চেক প্রজাতন্ত্রের মতন নিধার্মিক দেশগুলোও কোনভাবেই ইরান বা পাকিস্তানের মতন ধর্মরাষ্ট্রের চেয়ে সামষ্টিকভাবে বেশি হিংস্র নয়। নৈতিকতার অর্থ ‘ঐশী আদেশের অনুসরণ’ নয়, বরং এটি বোঝায় ‘ভোগান্তি হ্রাসকরণ’। অর্থাৎ, সহজাত নৈতিক আচরণের জন্য কোনও পৌরাণিক গল্পে বিশ্বাস আনা জরুরী নয়। পরের ভোগান্তি হ্রাস করতে চাইলে সে ব্যাপারে একটি সহজাত সহমর্মিতাই যথেষ্ট। কেউ যদি বুঝতে পারে যে তার একটি কাজ অন্যদের কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এই বোধটিই তো সে কাজে বিরত থাকার জন্য যথেষ্ট। [পৃষ্ঠা-২০০]

কারো কারো ক্ষেত্রে, অপরকে সাহায্যের আদেশদাতা একজন দয়ার্দ্র ইশ্বরের ধারণা, হয়তো ব্যক্তিগত ক্রোধমুক্তিতে সহায়তা করে। এভাবেই অনেকসময় ধর্মীয় বিশ্বাস বিশ্বের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় ভুমিকা রেখে এসেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে, আরো অনেকের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস আসলে হাওয়া দেয় ব্যক্তিগত ক্রোধের অঙ্গারে। নিজের অবদমিত ক্রোধকে সে ভেবে নেয় ইশ্বরের ঐশী ক্রোধরূপে এবং অন্যদের ওপরে চড়াও হয়, তার কল্পনার রাগান্বিত ইশ্বরের অবমাননাকে ব্যাক্তিগত অপমান ভেবে। এভাবে ঐশী আইনের উৎসটি কালক্রমে হয়ে ওঠে ঐশী অনুসারীদের অবিকল প্রতিরূপ। ভদ্রলোক অনুসারীদের ঈশ্বর হয়ে ওঠেন নিপাট ভদ্রলোক, আর ছোটলোক অনুসারীদের ইশ্বর হয়ে ওঠেন ইতরস্য ইতর। কোন এক তীর্থদর্শন যদি তীর্থযাত্রীর মনে শান্তি ও সহাবস্থানের বোধ জাগ্রত করে তোলে, সেটি অতীব চমৎকার। আর অন্য এক তীর্থস্থান যদি হয়ে ওঠে হিংস্রতা আর সংঘাতের উৎস, তবে? নিঃসন্দেহে সেটি বর্জনীয়, এমন হিংসার পীঠস্থান আমরা চাই না। [পৃষ্ঠা-২০২]

১৪। মিলিত মৃত্যুর থেকে বেঁচে থাকা ভাল

তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতিগুলো কি কি? প্রথমটি হল সত্যের সাথে আপোষ না করা, যেই সত্য নিছক বিশ্বাসের বদলে পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণনির্ভর। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসের সাথে সত্যকে গুলিয়ে ফেলা হয় না। কারো হয়ত কোনও গল্পে দৃঢ় বিশ্বাস থাকতেই পারে। হয়ত গল্পটির সাথে জুড়ে আছে কোমল শৈশবস্মৃতি, মনোবৈজ্ঞানিক পরিভ্রমণ কিংবা মগজের কিছু কল্পনাপ্রবণ কোষ, কিন্তু এতে গল্পটির সত্যতা প্রমাণিত হয় না। বরং, মিথ্যে গল্পের ক্ষেত্রেই বিশ্বাস দৃঢ় করতে হয়। কত বড় আমি- কহে নকল হীরাটি, তাই তো সন্দেহ করি- নহ ঠিক খাঁটি! ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার আরেকটি গুরত্বপূর্ণ উপাদান হল সহমর্মিতা। ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতা ইশ্বরের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি গড়ে ওঠে পরের দূর্ভোগের সহমর্মী হতে শেখার সহজাত অভ্যাস থেকে। কোন এক ইশ্বরের নির্দেশ মোতাবেক ধর্মনিরপেক্ষ কেউ চৌর্যবৃত্তি বা খুন থেকে বিরত থাকেননা। বরং, বিরত থাকার অভ্যাসটি গড়ে ওঠে চৌর্যবৃত্তি বা খুনের ফলাফল কিভাবে অপরের জন্য ভোগান্তি ডেকে আনতে পারে, এই বোধ থেকে। স্রেফ ইশ্বরের নির্দেশে হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত থাকার ধারণা খুবই ভয়ানক, কেননা ইশ্বরের নির্দেশ উল্টে গেলে, সহজাত সহমর্মিতার ধারণাটি সাময়িক স্থগিত এবং আখেরে স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে যায়। [পৃষ্ঠা-২০৪]

[এর আগের অনুচ্ছেদগুলোতে সাম্য, চিন্তার স্বাধীনতা, সাহস ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে-অনুবাদক] এই হল ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার মৌলিক বোধ। আগেও বলা হয়েছে, এই বোধগুলো আলাদাভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে গড়ে তোলে না, কড়াকড়িভাবে ধর্মনিরপেক্ষ উৎস থেকেও আসে না। ইহুদীরাও সম্মান করে সত্যকে, খ্রিস্টানেরা সম্মান করে সহমর্মিতা, মুসলিমেরা সম্মান করে সমতা, হিন্দুরা সম্মান করে দায়িত্ববোধ, এভাবে বলতে থাকলে শেষ হবে না। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলো হাসিমুখে এই সত্যকে মেনে নিয়েই ইহুদী, খ্রিস্টান, মুসলমান বা হিন্দুন সমাজের সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে আগ্রহী। কেবল একটাই আশা, সর্বজনীন (অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ) নিয়মের সাথে স্বীয় ঐশী নিয়ম মুখোমুখি হলে, পরেরটি একটু সহনশীল হতে শিখবে। যেমন, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে বাস করতে চাইলে একজন গোঁড়া ইহুদীকেও মেনে নিতে হবে যে বিধর্মীরাও তার সমঅধিকার সম্পন্ন, খ্রিস্টান পাদ্রীদের মেনে নিতে হবে যে ধর্মদ্রোহীকে পোড়ানো যাবে না, মুসলিম মোল্লাদের সম্মান জানাতে হবে অন্যদের চিন্তার স্বাধীনতায়, হিন্দু ব্রাহ্মণদের বিরত থাকতে হবে বর্ণাশ্রয়ী বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে। একই সাথে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ এটি চাপিয়ে দেয় না যে, স্বীয় ইশ্বরকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে, কিংবা প্রতিটি ঐশী ঐতিহ্য কিংবা ধর্মানুষ্ঠান ত্যাগ করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে বিচার করে তার আচরণের ভিত্তিতে, তার পরিধেয় কিংবা ধর্মানুষ্ঠানের ভিত্তিতে নয়। একজন মানুষ অদ্ভুত পোশাক পরে উদ্ভট কোন যজ্ঞে অংশ নিয়েও একইসঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতির প্রতি গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিশীল হতে পারেন। বর্তমান বিশ্বে প্রচুর ইহুদী বিজ্ঞানী, খ্রিস্টান পরিবেশবিদ, মুসলিম নারীবাদী এবং হিন্দু মানবাধিকার কর্মী আছেন। তাঁরা যদি বৈজ্ঞানিক সত্য, পারস্পারিক সহমর্মিতা, সার্বজনীন সমতা এবং চিন্তার স্বাধীনতায় পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বের সদস্যরূপে তাঁদের স্বাগত জানাতে কোনই বাধা নেই। এই শর্তে তাঁদের চাঁদিতে সেঁটে থাকা ইহুদী টুপি, লকেটে ঝোলানো ক্রুশ, সবুজ পাগড়ি কিংবা পৈতা পরিধানে বাধা দেয়াও অনুচিত। একই কারণে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যাবস্থায় শিক্ষকেরা ইশ্বরের ধারণা গ্রহণ কিংবা ধর্মানুষ্ঠানের অংশগ্রহণে শিশুদের বাধা দিতে পারেন না। বরং, এতে শিক্ষকের দায়িত্ব হল সত্য ও বিশ্বাসকে আলাদা করতে শেখানো। এতে শেখানো হয় সকলের প্রতি সহমর্মিতা, জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা, এবং জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বিশ্ববাসীর বৈচিত্রের ধারণা। ফলশ্রুতিতে আশা করা হয় যে, তারা অজ্ঞতাকে ভয় করতে শেখার বদলে বিশ্বজনীনভাবে স্বীয় কৃতকর্মের দায়িত্ব নিতে শিখবে। [পৃষ্ঠা-২০৮]

প্রতিটি বিশ্বাস, মতবাদ কিংবা ধর্মই বয়ে চলে স্বীয় আলোর নিচে থাকা অন্ধকার ছায়াটুকুও। প্রতিটি বিশ্বাসীর উচিৎ আগে সেই আঁধারটুকু স্বীকার করতে শেখা। এখানে ‘আমার সাথে এটি হতেই পারে না’ বলে ছেলেমানুষি আব্দার করলে, সেটি বালুতে উটপাখির মুখ গুঁজে থাকার মতই দেখাবে। নানান ঐশী মতাদর্শের চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ বিজ্ঞান এখানেই এগিয়ে যে, এটি তার ছায়ার ভয়ে ভীত তো নয়ই, বরং নীতিগতভাবেই নিজের ভুল এবং অজ্ঞতাকে মেনে নিয়ে শোধরাতে আগ্রহী। অতিপ্রাকৃত শক্তির নাজিলকৃত ঐশী বানী থেকে পাওয়া পরম সত্য কখনো ভুল স্বীকারে আগ্রহী নয়, কেননা সেটি আত্মঘাতী। কেউ যদি ভ্রান্তিবিলাসী মানবপ্রজাতির সামষ্টিক সহায়তার দ্বারা সত্যান্বেষণের পথ বেছে নেয়, তখন ভুল যে তার নিত্যসঙ্গী হবে, এটি অনিবার্য। ভুল স্বীকারের বড় সুবিধা হল, এটি সংশোধনের প্রথম ধাপ হিসাবে কাজ করে। [পৃষ্ঠা-২১৩]

১৫। কেন মুখ গুঁজে আছ তব মিছে ছলে?

এভাবেই নেতৃস্থানীয়রা আটকা পড়েন হাইজেনবার্গের অনিশ্চিত ভূবনে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে চাইলে তাঁদের মেনে নিতে হয় খুবই বিকৃত এক দৃষ্টিসীমা। আবার সীমানা বড় করলে, নষ্ট হয় মূল্যবান অনেক সময়। এবং এই সমস্যা ক্রমবর্ধমান। অনাগত দশকগুলোতে পৃথিবী হয়ে উঠবে আরও জটিল। প্রতিটি বিচ্ছিন্ন মানুষ, সে দাবার বড়েই হোক কিংবা গজ, জানবে আগের চেয়ে কম। প্রযুক্তির নিত্যনতুন সুবিধা, অর্থনীতির চক্র, রাজনীতির গতিবিদ্যা যা বৈশ্বিক গতির নিয়ন্ত্রক- সবই হয়ে উঠবে আগের চেয়ে আরও ঝাপসা। দুই সহস্রাব্দ আগে মহামতি সক্রেটিস যেমন বলেছিলেন- এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অজ্ঞতা স্বীকার করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। কিন্তু, তাহলে নৈতিকতা আর ন্যায়বিচারের কি হবে? আমরা যদি বিশ্বটাকেই না বুঝি, তবে কিভাবে আলাদা করব সত্য ও মিথ্যাকে? কিভাবে বুঝব কোনটা ন্যায্য আর কোনটা অনায্য? [পৃষ্ঠা-২২২]

১৬। চায়ের দোকানে নিরুত্তর চুপচাপ বসে থাকে- কালীদা!

চৌর্যবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে যখন দৈবাদেশ এসছিল, তখন চুরি বলতে আক্ষরিক অর্থেই নিজহাতে বিনানুমতিতে অন্যের মালিকানালব্ধ মালামাল সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়াকে বোঝাত। এখনকার দিনে চুরির সংজ্ঞা বদলে গেছে বেমালুম। ধরা যাক একটি বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিতে আমার মিলিয়ন ডলারের শেয়ার আছে, যা বছরান্তে শতকরা পাঁচভাগ লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। এখন, এই কোম্পানিটি খুবই লাভজনক, কেননা এর বাহ্যিক কোনও আলগা খরচ নেই। অধীবাসীদের পানির সরবরাহ, সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ দূষণ কিংবা জলজ বাস্তুসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল প্রাণিদের সম্ভাব্য ক্ষতির ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে, এর ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলা হয় বুড়িগঙ্গায়। কোম্পানিটি এর সম্পদের একাংশ ব্যবহার করে ফাইলাস্ত্র সজ্জিত কালো গাউন পরিহিত সেনাদলের লালনপালনে। এর সমান্তরালে দুধকলা দিয়ে পেলেপুষে রাখা হয় পেশাদার লবিয়িস্টদের, যারা গণ্ডারের মতন অসীম ধৈর্যে ক্রমাগত গুঁতিয়ে চলেন, পরিবেশ আইনকে শিথিল রাখার জন্য। ফলে, ক্ষতিপূরণ আদায় কিংবা পরিবেশ আইন, কোনও তরফেই কোনও আশংকা থাকে না। এখন, কোম্পানিটিকে কি ‘বুড়িগঙ্গা চুরির দায়ে’ অভিযুক্ত করা যাবে? সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আমার অবস্থানটি কি হবে? আমি তো কারো বাসায় বিনা অনুমতিতে ঢুকে আলমারি থেকে টাকা ছিনিয়ে আনছি না। এমনকি কোম্পানি কিভাবে লাভ করছে, সে ব্যাপারেও আমি অবগত নই। সেক্ষেত্রে আমি কি লভ্যাংশের মতন শেয়ারানুপাতে বুড়িগঙ্গা চুরির দায়ও ভাগ করে নেব? পর্যাপ্ত তথ্য জানা না থাকলে আমরা ঠিক কিভাবে নৈতিকতা বজায় রাখতে পারি? [পৃষ্ঠা-২২৫]

১৭। সেই সত্য যা রচিবে তুমি, নহে সত্য সব তা- যা ঘটে!

গত শতকের প্রথমদিকে একটি জায়নবাদী শ্লোগান বেশ শোনা যেত। শ্লোগানটির ভাষ্য ছিল- “মানুষবিহীন ভূমি (ফিলিস্তিন) কে ভূমিহীন মানুষ (ইহুদী) দের হাতে ফিরিয়ে দাও!” এখানে দাবীকৃত ভূমির তৎকালীন বসবাসকারীদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হত। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন ইজরায়েলী প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার দাবী করেন- ‘ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী বলে কিছু নেই, কোনকালে ছিলও না!’ এমন ভাবনা ইজরায়েলে আজও প্রচলিত। এ এক অদ্ভুত ব্যপার, বছরের পর বছর তারা এমন এক স্বত্বার সাথে সশস্ত্র সংঘাত করে চলেছে, যার না কি অস্তিত্বই নেই! আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা- ছায়ার সাথে যুদ্ধ করে গাত্রে হল ব্যাথা! এমনকি এই ২০১৬ সালেও, ইজরায়েলী সংসদে আনাত বার্কো নামধারী জনৈক বার্গজীবি দাশুর মতন প্যান্টালুন পরে পরিষ্কার ইংরিজি ভাষায় তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেন ফিলিস্তিনী জনগণ ও তাদের ইতিহাসের অস্তিত্ব নিয়ে। ভদ্রলোকের সন্দেহের ভিত্তি কি ছিল, জানেন? “আরবি ভাষায় তো ‘P’ ধ্বনিটিই নেই, তবে ‘Palestine’ আসবে কোথা থেকে?”- এই তার যুগান্তকারী প্রশ্ন! (উল্লেখ্য যে আরবি প্রতিবর্নীকরণে Palestine-কে লেখা হয় ফালাস্তিন রূপে।) কাজী ইব্রাহীম কি কেবল এদেশেই আছে রে মর্কট? [পৃষ্ঠা-২৩৩]

অর্থাৎ, ভয়ানক এই সত্যোত্তর যুগে ফেসবুক, ট্রাম্প কিংবা পুতিনকে গলা ছেড়ে গালি দেয়ার আগে মনে রাখা ভাল যে মানবপ্রজাতিটি এমনই। সহস্রাধিক বছর আগে থেকেই খ্রিস্টানরা নিজেদের স্বেচ্ছাবন্দী করে এসেছে স্ব-আরোপিত পৌরাণিক বুদবুদে, যেখানে বাইবেলের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কারো নেই। একইভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠী প্রশ্নাতীত আস্থা রেখে এসছে কোরানে। কয়েক সহস্রাধিক বছর যাবত মানবপ্রজাতি যেসব ‘খবর’ ও ‘তথ্য’ প্রজন্মান্তরে বয়ে এনেছে, সেসব আসলে দেবদূত আর পিশাচের অলৌকিক গল্প। বিবি হাওয়াকে যে সাপের ছদ্মবেশে কোনও শয়তান আপেল খেতে উস্কানি দিয়েছিল অথবা বিধর্মী আত্মারা অনন্তকাল পুড়তে থাকবে নরকাগ্নিতে- এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বৈজ্ঞানিক তথ্যও নেই। যেমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণসাপেক্ষ উত্তর নেই- ব্রাহ্মণ পুরুষ কর্তৃক অস্পৃশ্যা নারীর পাণিগ্রহণে ইশ্বর কেন রেগে ওঠেন- এই প্রশ্নের। অথচ সহস্রাধিক বছরযাবত কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করেছে এসব গল্প। কিছু গুজব টিকে থাকে নিরন্তর! [পৃষ্ঠা-২৩৪]

সোভিয়েত প্রচারমাধ্যম এতই সুদক্ষ ছিল যে, এটি একইসঙ্গে নিজদেশের দানবীয় নির্মমতা আড়াল করে সফলভাবে এক সাম্যবাদি কল্পলোকের ধারণা ফেরি করেছে পরদেশে। আজকের দিনেও ইউক্রেনীয়রা অভিযোগ করে থাকে যে, ক্রিমিয়া প্রশ্নে পুতিন সফলভাবে বৈশ্বিক গণমাধ্যমকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছেন। এই সক্ষমতায় স্টালিন আর পুতিনের পার্থক্য করা কঠিন। গত শতকের তৃতীয় দশকে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের বামঘেঁষা অংশটি নিরন্তর সোভিয়েত-প্রশস্তি গেয়ে দাবী করতেন এ এক আদর্শ সমাজ। অথচ, একই সময়ে স্ট্যালিনের পরিকল্পনা মতন উদ্ভূত মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে মারা যাচ্ছিল ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূতরা সহ লাখো সোভিয়েত নাগরিক। এখন এই ফেসবুক আর টুইটারের যুগে, যেকোন ঘটনার বহুসংখ্যক ভাষ্য থেকে বিশ্বাসযোগ্যটি খুঁজে বের করা কঠিন। কিন্তু এটিও সত্য যে- সারা দুনিয়াকে আড়াল করে, কারো পক্ষেই এখন গণহত্যা চালানো অসম্ভব। [পৃষ্ঠা-২৩৮]

কিছু প্রথা স্পষ্টতই কল্পকাহিনী থেকে আলাদা। যেমন টাকা আর ঐশীগ্রন্থের ধারণা, যদিও তা একনজরে ঠাহর করা কঠিন। পাঁচশ টাকার নোট দেখলে খুব কম মানুষের মাথায় আসবে যে এটি স্রেফ মানুষের কল্পিত ধারণামাত্র। এক পিঠে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ছবি আর অন্যপিঠে বাংলাদেশের কৃষিকাজের ছবি ছাপা এই ছোট্ট সবুজ কাগজের টুকরোটি দেখামাত্রই আমাদের মাথায় আসে এর মূল্যমান, যাতে আমরা অভ্যস্ত। এটি কখনোই আমাদের মাথায় আসে না যে- সবাই মিলে এর মূল্যমানের গল্পে বিশ্বাস করি বলেই এর দাম পাঁচশ টাকা, নইলে কেবল কাগজের দাম পাঁচটাকাও নয়। কারো সামনে লাখখানেক টাকাভর্তি ব্রিফকেস রেখে, তার মগজের এমআরআই করলে খুবই মজার জিনিস দেখা যায়। টাকাদর্শনে মগজের সংশয়ী অংশটি (অন্যরা বলেছে বলেই এটি মূল্যবান- এই চিন্তা করা অংশ) আদৌ উদ্দীপিত হয় না, বরং উদ্দীপনা দেখা যায় লোভী অংশ (হায় খোদা! এক্ষুনি চাই- এই চিন্তা করা অংশ) থেকে! অন্যদিকে বাইবেল কিংবা গীতায় ঐশী শ্রদ্ধা করার অভ্যাসটি আসে দীর্ঘসময় আরও অনেক মানুষকে একই আচরণ করতে দেখে। আমরা যে পদ্ধতিতে পাঁচশ টাকার নোটের মূল্য বুঝতে শিখি, ঠিক একই পদ্ধতিতেই কোরানকে পবিত্র বলে মেনে নিতে শিখি। [পৃষ্ঠা-২৪০]

কল্পনা ও বাস্তবতার সাদাকালো সীমানাটি বিভিন্ন কারণেই ধূসর করে তোলা যায়, নিছক মজা করা থেকে শুরু করে টিকে থাকার সংগ্রামে। সাময়িকভাবে হলেও অবিশ্বাসকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনও খেলা কিংবা উপন্যাস উপভোগ করা কঠিন। একটি ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করতে চাইলে প্রথমেই খেলার নিয়মকানুনগুলোকে মেনে নিতে হবে, একই সঙ্গে অন্তত দেড় ঘন্টার জন্য ভুলে থাকতে হবে যে এই নিয়মগুলো নিছক মানুষেরই সৃষ্টি। অন্যথায় বাইশজন মানুষ একটা বাতাসভর্তি চর্মগোলকে অনবরত পদাঘাত করে চলেছে- এই ধারণাটি নিতান্তই উদ্ভট মনে হতে পারে। ফুটবলের শুরুটা হয়তো নিছক বিনোদনের জন্যই হয়েছিল, কিন্তু শেষটা? একজন ইংরেজ অন্ধভক্ত বা আর্জেন্টিনীয় জাতীয়তাবাদীর কাছে এর মূল্য অনেক বেশি। ফুটবলের মাধ্যমে পেলে কিংবা মারাদোনার মতন আন্তর্জাতিক ব্যাক্তিত্ব গড়ে উঠতে পারে। এটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাঁধতে পারে এক সুতোয়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এটিই পারে সহিংসতার উপলক্ষ হতে। জাতি আর ধর্মগুলো স্রেফ ফুটবল দলেরই সুবিশাল সংস্করণ! [পৃষ্ঠা-২৪১]

মানবপ্রজাতি সত্যের চেয়ে ক্ষমতায় বেশি আগ্রহী। লোকে দুনিয়ার রহস্য বোঝার চাইতে এর নিয়ন্ত্রক হতে পছন্দ করে, এমনকি বুঝতে চেষ্টা করলেও এমন আশায় বোঝে যেন সেই জ্ঞান অন্তিমে নিয়ন্ত্রণের কাজে আসে। কেউ চাইলে এমন সমাজের স্বপ্ন দেখতেই পারে যেখানে পৌরাণিক গল্পের দাম নেই, বরং সত্যই সবচেয়ে মূল্যবান। তবে মনে রাখা ভাল, সেই সমাজ অবশ্যই মানুষের হবে না, শিম্পাঞ্জীদের হলেও হতে পারে। [পৃষ্ঠা-২৪২]

বিজ্ঞানীদের উচিৎ হবে গণসম্পৃক্ত উন্মুক্ত বিতর্কে বেশি বেশি অংশ নেয়া। স্বীয় অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিতর্কে, সেটি হোক চিকিৎসাবিজ্ঞান অথবা ইতিহাস, তাঁদের মুখবুজে থাকাটা একেবারেই কাম্য নয়। নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষতার সমার্থক নয়, বরং তা চলমান স্থিতাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা মেনে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল গুটিকয়েক বিশেষজ্ঞ পাঠকের জন্য সীমাবদ্ধ খটমটে জার্নালের পাতায় প্রকাশ করাটা অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে, নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলোকে সাধারণের জন্য বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করাটাও জরুরী। বিজ্ঞান সংক্রান্ত জনপ্রিয় বইয়ের পাশাপাশি শিল্পকলা ও সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমগুলোও এই যাত্রার সঙ্গী হতে পারে। [পৃষ্ঠা-২৪৪]

১৮। একদা এমনই বাদলশেষের রাতে, মনে হয় যেন শত জনমের আগে

অল্ডাস হাক্সলি তাঁর ‘Brave new world’ বইটি লিখেছিলেন ১৯৩১ সালে। এটি লেখা হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন সমাজতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ গেঁড়ে বসেছে রাশিয়া এবং ইতালীতে, জার্মানিতে উত্থান ঘটছে নাজিতন্ত্রের, যুদ্ধংদেহী জাপান এগিয়ে যাচ্ছে চীন জয়ের দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষায়, আর সারা বিশ্বকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলছে মহামন্দা। এমন অন্ধকার সময়েও হাক্সলি তাঁর কল্পনায় দেখেছিলেন এমন এক ভবিষ্যৎ সমাজের, যেখানে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর মহামারী নেই, আছে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি, সমৃদ্ধি আর সুস্থতা। এ এমন এক ভোগবাদী দুনিয়া, যেখানে বল্গাহীন যৌনতা, মোহময় মাদক কিংবা উদ্দাম সংগীতে মেতে আছে সবাই, সুখই যার একমাত্র বোধ। বইটির অন্তর্নিহিত বার্তাটি ছিল- মানুষ আসলে স্রেফ এক জৈবরাসায়নিক যন্ত্র। বিজ্ঞান যদি মানুষের ধাপচিত্রণটি আবিষ্কার করে ফেলে, তবে প্রযুক্তি দিয়েই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। [পৃষ্ঠা-২৫১]

‘The Matrix’ কিংবা ‘The Truman Show’ এর স্রষ্টাদের মতন না ভেবে, হাক্সলি আসলে পলায়নের সুযোগকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কেননা তিনি প্রশ্ন তুলেছেন- কেউ কি আদৌ সফলভাবে পালাতে পেরেছে? আমাদের মগজ এবং নিজস্ব স্বত্ত্বা দুইই যখন ম্যাট্রিক্সের অংশ, তাহলে ম্যাট্রিক্স থেকে পালানো আসলে নিজের কাছ থেকে পালানোরই নামান্তর। এটি এমন এক সুযোগ, যাকে জটায়ুর ভাষায় ‘কাল্টিভেট করে দেখা দরকার, মশাই!’ নিজস্বতার খোলস ছেড়ে পালাতে শেখাই একুশ শতকে টিকে থাকার ভাল উপায় হতে পারে। [পৃষ্ঠা-২৫৫]

১৯। ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেপ সমস্ত কাগজ

এখনকার দুনিয়ায় শিক্ষকেরা ছাত্রদের শেষমেশ একটা জিনিসই দিয়ে থাকে- আর তা হল অবিরত তথ্য। সত্যি বলতে কি, আমাদের সংগ্রহে আপাতত প্রয়োজনের চেয়েও বেশি তথ্য আছে। এর বদলে সবার প্রয়োজন সেই তথ্যকে অর্থবহভাবে ব্যবহার করতে শেখা। এর মাধ্যমেই গুরুত্বপূর্ণ আর অপ্রয়োজনীয় ধারণাকে আলাদা করতে শেখা সম্ভব। এভাবেই অসংখ্য তথ্যকণা জুড়ে দিয়ে বিশ্বজগতের বৃহত্তর অবয়ব দৃশ্যমান করে তোলা যাবে। [পৃষ্ঠা-২৬১]

তথ্য গেলানোর পাশাপাশি শিক্ষায়তনগুলো শিক্ষার্থীদের সাথে জবরদস্তি করে চলে ছকবাঁধা কিছু দক্ষতা অর্জনে। যেমন তারা শেখায় কিভাবে দ্বিতীয় মাত্রার ব্যবকলনীয় সমীকরণের সমাধান করতে হবে, কিংবা কিভাবে সি++ ব্যবহার করে চক্রায়িত যুক্তি গঠন করতে হবে, কিংবা পরখনলে প্রাপ্ত অধঃক্ষেপ আর বলয়ের সাহায্যে কিভাবে অজানা মৌলের উপস্থিতি চিনে নিতে হবে, কিংবা কিভাবে আলাপ চালাতে হবে চীনা ভাষায়। অথচ, আমরা জানিই না ২০৫০ সালে চাকুরিরর বাজার কেমন হবে। আমরা এটিও জানি না, তখন কি কি দক্ষতা প্রয়োজন হবে। আমরা হয়তো অনেক খেটেখুটে বাচ্চাদের সি++ শেখানোর পর ২০৩০ এ গিয়ে টের পাব যে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিমিষেই হাজার পাতার সি++ কোড লিখে ফেলতে পারে। কিংবা, প্রচুর শ্রম দিয়ে চীনা ভাষা শিখে হয়তো দেখব গুগল অনুবাদকের ২০৩২ সংস্করণটি মাও জে দং এর চেয়েও নিখুঁতভাবে অনর্গল বকতে পারে চীনা ভাষার সবকটি উপভাষায়। [পৃষ্ঠা-২৬২]

তাহলে, মেক্সিকো, ভারত কিংবা আলবামার কোন এক পুরাতন বিদ্যালয়ে আটকে পড়া পনের বছুরে কিশোরকে একটি পরামর্শই দেয়া চলে- প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর অতিরিক্ত ভরসা কোরো না। তাঁরা অধিকাংশই নিপাট ভালমানুষ, কিন্তু তাঁরা বাইরের দুনিয়াটাকে বোঝেন না। অতীতে প্রবীণদের নির্দ্বিধায় অনুসরণ করা একটি নিরাপদ পন্থা ছিল, কেননা সেসময় তাঁরা দুনিয়া সম্পর্কে অনেক বেশি জানতেন, এবং দুনিয়া বদলাত খুবই ধীরে। কিন্তু, একবিংশ শতক আলাদা হতে যাচ্ছে। চেনা গ্রহটির অতি দ্রুতগতির ক্রমবিবর্তনের কারণে, প্রবীনেরা কি কালোত্তীর্ন জ্ঞান হস্তান্তর করছেন, না সেকেল পক্ষপাত- এটি নিশ্চিত করা এখন খুবই কঠিন। [পৃষ্ঠা-২৬৬]

অসংখ্য ধাপচিত্রন এই মুহূর্তে নজরে রাখছে সবাইকে। এগুলো দেখছে কে কোথায় গেল, কে কি কিনল এবং কে কার সাথে দেখা করল। অচিরেই এই নজরদারি এসে ঠেকবে প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি প্রশ্বাসে, প্রতিটি হৃদকম্পনে। এখানে দৈথ্য* এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে এই নজরদারি ক্রমোন্নত হচ্ছে এবং হবে। এই দৌড়ে ধাপচিত্রন একবার মানবপ্রজাতির চেয়ে এগিয়ে গেলে, সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে খুব সহজেই, আর তখন কিছুই করার থাকবে না। আমরা সবাই হয়তো বাস করব কোন এক Matrix কিংবা Truman Show-এর ভেতরে। দিনশেষে, ধাপচিত্রণই যদি মানুষের ভেতরটাকে খোদ মানুষের চেয়ে ভালভাবে বুঝে ফেলে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তৃত্বের লাগামটিও চলে যাবে সেখানে। [পৃষ্ঠা-২৬৮]

(*দৈথ্য=Big Data-এর পরিভাষা হতে পারে কি? দৈত্য+তথ্য-ত এই সূত্রে!)

২০। সূর্যমূখী শুনলেই আমার ভ্যানগঘ মনে পড়ে যায়

লোকে ঠিক কেমন উত্তর শুনতে চায়? জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে, লোকে প্রায় সবসময় একটা গল্প শুনতে চায়। হোমো স্যাপিয়েন্স এক গল্প বলিয়ে জীব, যে কিনা তথ্য বা লেখচিত্রের চেয়ে গল্প নিয়েই বেশি ভাবে। তাদের বিশ্বাস, মহাবিশ্বটাই বুঝি সজ্জন আর দূর্জনে ভরা, উত্থান-পতনে জমে ওঠা, শেষমেশ শুভ পরিসমাপ্তিতে পর্যবসিত এক গল্প। লোকে যখন জীবনের অর্থ খোঁজে, তারা এমন এক গল্প শুনতে চায়- যেখানে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেয়ার পাশাপাশি মহাজাগতিক নাট্যমঞ্চে সবার ভূমিকাটি ব্যাখ্যা করা আছে। এই ভূমিকা থেকেই লোকে খুঁজে ফেরে অমোঘ ‘কে আমি?’ প্রশ্নের উত্তর, আখেরে যার আলোয় অর্থবহ হয় নিজের অভিজ্ঞতা আর পছন্দ। [পৃষ্ঠা-২৬৯]

একটি মহৎ আখ্যান দাবী করে, জীবনের মহামঞ্চে মুমিনের ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি হল- আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা, তাঁর বাণী ছড়িয়ে দেয়া এবং তাঁর ইচ্ছার প্রতি নিরংকুশ আনুগত্য নিশ্চিত করা। মুসলিম আখ্যানে বিশ্বাস করলেই কেবল দৈনিক পাঁচবেলা পার্থনায় অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিংবা সেই একই বিশ্বাস অর্থপূর্ণ করে তোলে মসজিদ নির্মাণে অর্থব্যায়কে। অবশেষে একদিন অর্থবহ হয়ে ওঠে কাফির ও মুরতাদদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধও। প্রাতঃকৃত্য সমাপনান্তে পরিচ্ছন্নতা, মদ্যপান কিংবা যৌনাচারের মতন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাগতিক কর্মকান্ডও অর্থবহ হয়ে ওঠে একই আলোয়। [পৃষ্ঠা-২৭২]

সমাজতান্ত্রিক আখ্যানে বিশ্বাসীর দুনিয়াটি একেবারেই ভিন্ন। এতে তার জীবনের একমাত্র কাজ হল আগুনঝরানো ভাষায় লাল মলাটের পুস্তিকা লিখে বিপ্লবের পালে হাওয়া জোগানো, হরতাল সংগঠিত করা আর আখেরে শ্রেণীশত্রুদের গলাকেটে বিপ্লব সম্পন্ন করা। এই আখ্যানটিও যাপিত জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আচরণকেও অর্থবহ করে তোলে। সেটি হতে পারে বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের শোষণের অভিযোগে একটি মার্কা বর্জনে কিংবা বড়দিনের দাওয়াতে গিয়ে বুর্জোয়া আত্মীয়ের সাথে তুমুল তর্কে। [পৃষ্ঠা-২৭৩]

তাহলে লোকে কেন বিশ্বাস রাখে এসব কাহিনীতে? এর অন্যতম কারণ হল, তাদের ব্যাক্তিগত পরিচয়টিই গড়ে উঠেছে এসব গল্পের ভিত্তিতে। লোকে এসব গল্প শুনে এসেছে আশৈশব। উপর্যুপরি একই গল্প তাদের বারবার শুনিয়েছে ঘরের লোক, শিক্ষক, প্রতিবেশী এমনকি পারিপার্শ্বিক সংস্কৃতির ধারকেরা। আর এই অব্যাহত ঘটনাটি শুরু হয়েছে, গল্পের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতন মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্ক্বতা গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই। যতদিনে বুদ্ধিবৃত্তি পরিপক্ক্ব হয়ে ওঠে, ততদিনে সিন্দবাদের বুড়োর মতন গল্পের চরিত্ররা আমাদের মগজে রীতিমত জাঁকিয়ে বসে। ফলে, অর্জিত বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য দ্বারা গল্পটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেয়ে তার সাফাই গাইতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠি। এই কাঠামোয় উত্তর খোঁজাটা হয়ে দাঁড়ায় বাচ্চাদের গুপ্তধন শিকারের মত। এই খেলায় বাচ্চারা তো মাথা খাটিয়ে ঠিক তাই খুঁজে বের করে, যা আগেই লুকিয়ে রেখেছিল বড়রা। চকোলেটের বাক্স লুকিয়ে রেখে ফলের ঝুড়ি উদ্ধারের কোনও সুযোগই এতে নেই। [পৃষ্ঠা-২৮১]

আমাদের নিজস্ব পরিচয় আর সামাজিক কাঠামোর পুরোটাই গড়ে উঠেছে কোন এক গল্পের ভিত্তিতে। কখনোবা গল্পটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অচিন্ত্যনীয় হয়ে পরে। এই অপারগতা প্রমাণ কিংবা সাক্ষীসাবুদের অভাবে নয়, বরং ব্যাক্তিক এবং সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ তাসের ঘরের মতন গুঁড়িয়ে যাবে এই আশংকা থেকে উদ্ভূত। ইতিহাসে কখনো কখনো ভিতের চেয়ে ছাদটিই বেশি ভারী হয়ে যায়। নিজস্ব অর্থ ও পরিচয় যোগানো গল্পগুলো কাল্পনিক হলেও, লোকে অবলীলায় তা বিশ্বাস করে কেন? কিভাবে একটি গল্পকে সত্য বলে অনুভব করানো যায়? কেন লোকে গল্পে বিশ্বাস করতে চায় সেটি নাহয় পরিষ্কার, কিন্তু কিভাবে করে? হাজার বছর আগেই যাজক আর ওঝারা এই উত্তর খুঁজে পেয়েছেন- ধর্মাচার। ধর্মাচার এমন এক জাদুকরী ক্রিয়া যা বিমূর্তকে মূর্ত করে তোলে, গল্পকে করে তোলে বাস্তব। ধর্মাচারের প্রাণ হল মন্ত্রোচ্চারণ। পুরোহিত জলদগম্ভীর কন্ঠে উচ্চারণ করেন- ‘হলদে সবুজ ওরাং ওটাং, ইঁট পাটকেল চিৎ পটাং’ আর ভক্তরা নির্বিবাদে বুঝে নেয়- ‘মুশকিল আসান উড়ে মালি, ধর্মতলা কর্মখালি!’ [পৃষ্ঠা-২৮২]

এটি অবশ্যই হেত্বাভাস। ঈশ্বর কিংবা জাতিগত বিশ্বাসের কারণে দূর্ভোগ পোহাতে হলেই তা বিশ্বাসের সত্যায়ন করে না। এমনও হতে পারে, নিছক সারল্যের দাম চুকাতে হচ্ছে অনেককে। আদতে অধিকাংশ মানুষই বোকা বনতে চায় না, বা বোকা বনে গেলে স্বীকার করতে চায় না। ফলে তারা বিশ্বাসের পদপ্রান্তে আরও অর্ঘ্য হাজির করে চলে, যা চক্রাকারে তাদের বিশ্বাসকেই শক্তি যোগায়। উৎসর্গের মিথস্ক্রিয়া বড় জটিল। জনতার ওপরে ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য, যূপকাষ্ঠে দাঁড়ানো পুরোহিতকে বিনিময়ে কিছুই দিতে হয় না- বৃষ্টি, অর্থ বা বিজয় কিচ্ছু না। বরং তিনি গ্রহণ করেন অনেককিছুই। মাকড়সা একবার মাছিকে রাজি করাতে পারলেই খেলা শেষ। [পৃষ্ঠা-২৮৭]

উৎসর্গ কেবল আখ্যানের প্রতি বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে এমন নয়। এটি আরও অনেক ‘করতে না পারা’ ধর্মাচারের ক্ষতিপূরণ কিংবা দায়মুক্তির পথও বটে। মানবজাতির মহতী আখ্যানগুলোতে এমনসব মানদণ্ড রাখা হয়েছে, যা অধিকাংশ লোকে ছুঁতে পারে না। কতজন খ্রিস্টান অক্ষরে অক্ষরে দশটি ঐশী প্রত্যাদেশ মেনে চলেন? তাঁরা কি কখনো মিথ্যে বলেন না? কামনায় লালায়িত হন না? কতজন বৌদ্ধ মোহমুক্তির পথে হেঁটে নির্বাণ লাভ করেন? কতজন সমাজতন্ত্রী তাঁদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ শ্রমটুকু দেন এবং একই সাথে প্রয়োজনাতিরিক্ত এক টুকরো রুটিও গ্রহণ করেন না? আদর্শের পূর্বঘোষিত মানদণ্ড ছুঁতে অক্ষম লোকেরা উদ্ভাবন করেছে এক নতুন বিকল্প- যার নাম উৎসর্গ। একজন হিন্দু আয়কর ফাঁকি দিতে পারেন, গণিকালয়ে নিয়মিত হাজিরা দিতে পারেন, প্রবীণের সাথে অন্যায্য আচরণ করতে পারেন- এবং এরপরেও নিজের ধার্মিক স্বত্বাকে বুঝ দিয়ে শান্ত রাখতে পারেন কেননা তিনি বাবরী মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া সমর্থন করেন এবং সেখানে একটি মন্দির নির্মাণের তহবিলে মোটা অংকের চাঁদা দিয়েছেন। অতীতের মতন এই একুশ শতকেও স্বীয় অর্থ খোঁজার কন্টকাকীর্ণ পথনির্দেশকারী সিংহ-দরোজা বদলে যায় কিঞ্চিৎ উৎসর্গের খিড়কি-দুয়ারে। খোদ ঈশ্বরের দপ্তরেও ঐশী নথির চলৎশক্তি নিশ্চিত করতে স্বঘোষিত মুহুরীরা হাত পেতে থাকেন ঐশী টেবিলের নিচে। [পৃষ্ঠা-২৯১]

আমাদের হাতেই লেখা হয়েছে বাইবেল, বেদ কিংবা কোরান। আর আমাদের কল্পনাশক্তি এসব আখ্যানের শক্তি জুড়েছে। এই গল্পগুলো নিঃসন্দেহে সুন্দর, কিন্তু সেই সৌন্দর্য আসলে পাঠকের চোখে। জেরুজালেম, মক্কা, বারানসী কিংবা বুদ্ধগয়া নিজে নিজে পবিত্রভূমি হয়ে ওঠেনি, বরং তীর্থযাত্রীরাই সেই পবিত্রতা গড়ে তুলেছেন, এবং তীর্থফেরত যাত্রীদের অভিজ্ঞতার বয়ান সেই পবিত্রতাকে বর্ধিত করছে চক্রাকারে। এই বিশ্বজগৎ স্রেফ একতাল অণু-পরমাণুর জগাখিচুড়ি বই আর কিছু নয়। কোনকিছুই সুন্দর, পবিত্র বা আকর্ষণীয় নয়- যতক্ষন না আমরা সেই ঘোষণা দিচ্ছি। আমাদের অনুভূতিই পাকা আমকে সুস্বাদু, বাঁশির সুরকে মোহময় কিংবা গোময়ের ঘ্রাণকে জঘন্য রূপে সাব্যাস্ত করে। আমারই চেতনার রঙে, পান্না হল সবুজ, চুনি হল লাল। আমাদের অনুভূতিটুকু সরিয়ে নিলে হাতে থাকে অর্থহীন পেনসিল। [পৃষ্ঠা-২৯৮]

রাজনীতিবিদেরা যখন রহস্যভরা ভাষায় কথা বলেন, তখন সাবধান হওয়া ভাল। কেননা এসময় তাঁরা প্রকৃত দূর্ভোগের চিত্রটি আড়াল করে দূর্বোধ্য শব্দবন্যায় প্লাবিত করতে চাইছেন শ্রোতাদের চৈতন্যকে। চারটি শব্দের ব্যপারে খুবই সাবধানঃ উৎসর্গ, চিরকাল, বিশুদ্ধতা এবং মুক্তি। এগুলো শোনামাত্র মনে মনে বিপদের পাগলাঘণ্টা বাজিয়ে দেয়াই নিরাপদ। বিমূর্ত ভাষায় কোনও বক্তা যদি বলেন- ‘তাঁদের এই সুমহান আত্মোৎসর্গ চিরকাল আমাদের এই বিশুদ্ধ জাতির মুক্তির পাথেয় হয়ে থাকবে!’ তাহলে মহাবিপদ। আমাদের উচিৎ, হিংটিংছট মার্কা এসব যন্তরমন্তর এড়িয়ে নিজস্ব বিবেচনাশক্তি খাটিয়ে আসল চিত্রটি দেখার চেষ্টা করা। সেই বৃহত্তর চিত্রে হয়ত এক আহত সৈনিক গোঙাচ্ছে ব্যাথায়, নির্যাতিতা এক নারী হয়ত তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে, আতংকিত এক শিশু হয়ত ক্যামেরা দেখে কাঁপতে কাঁপতে দুহাত তুলে আত্মসমর্পন করছে বন্দুকভ্রমে। এই কষ্টগুলো রক্তমাংসের মানুষের বাস্তব অনুভূতি, কোনও বক্তিয়ার খিলজির ধোঁয়াটে গল্প নয়। গল্পের খোসাটুকু ছাড়িয়ে মানুষের প্রকৃত কষ্টগুলো দেখতে পাওয়া ও সহমর্মী হওয়া খুবই প্রয়োজন। [পৃষ্ঠা-৩০৮]

২১। ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও

নিঃসন্দেহে আমরা পরহস্তে ঝাল খাওয়ার মতন অন্যের এঁটো করা তথ্য থেকে গাদাখানেক বেছে নিয়ে পরিসংখ্যানের সাহায্যে নানান ধাঁচ আবিষ্কার করতে পারি। অনুরূপ পদ্ধতি ব্যবহার করে মনোবিজ্ঞানী ও স্নায়ুবিদেরা মানবমনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে শিখেছিলেন। এভাবে মানবমনকে আরও উন্নত করার প্রচেষ্টায়, এমনকি লাখো জীবন বাঁচাতেও তাঁরা সফল হয়েছেন। কিন্তু পরের মুখে ঝাল খেয়ে একটি সীমার চেয়ে বেশি যাওয়া দুরহ। বিজ্ঞানে যখন একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনাকে খতিয়ে দেখা হয়, তখন সেটি সরাসরি গুঁতিয়ে দেখা উত্তম। নৃবিজ্ঞানীরা যেমন অন্যের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে পরের ধনে প্রচুর পোদ্দারি করে থাকেন। কিন্তু, আসলেই মাওরি সংস্কৃতি ভালভাবে বুঝতে চাইলে লোটাকম্বল বেঁধেছেদে নিউজল্যান্ড রওনা হওয়া ভাল। [পৃষ্ঠা-৩১৪]

প্রযুক্তির নিত্যনতুন যন্ত্রে পুরোপুরি ভরসা করতে না পারলেও আশা হারানো ঠিক হবে না। আমরা বরং নৃবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী কিংবা নভোচারীদের কাছে থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারি। নৃবিজ্ঞানীরা সম্পূর্ন অজ্ঞাত সংস্কৃতি লালন করা দূর্বোধ্য ভাষাভাষী আদিবাসী পল্লীতে কাটিয়ে দেন বছরের পর বছর। জীববিজ্ঞানীরা হিংস্র আর বিষধর প্রাণীর ভয়কে উপেক্ষা করে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেন জনহীন দ্বীপ কিংবা গভীর জঙ্গলে। নভোচারীরা সময়সাপেক্ষ সুকঠিন প্রশিক্ষণের পরেই জিতে নেন মহাকাশের টিকিট। আমরা যদি অপরিচিত সংস্কৃতি, অজানা জীবজন্তু কিংবা সুদূর গ্রহান্তরের জ্ঞানলাভে এতটা অধ্যবসায়ী হতে পারি, তাহলে নিজের মনকে জানতে পিছিয়ে থাকা কেন! ধাপচিত্রনের সাথে পাল্লা দিয়ে আগেভাগেই নিজেদের মন বুঝতে পারাটা জরুরী, খুবই জরুরী। [পৃষ্ঠা-৩১৮]

মনে রাখতে হবে, ইউভাল নোয়াহ হারারি অবশ্যই কোন অকাট্য-অবশ্যমান্য লেখক নন। হারারির ভাষ্যমতেই মানবপ্রজাতির মূল বিশেষত্ব হল ‘গল্প-বলিয়ে প্রাণী’ হয়ে ওঠা। মানবপ্রজাতির এই দৃষ্টিভঙ্গির চমৎকার উদাহরন কিন্তু তিনি নিজেই। আগের বইগুলোতে ইহুদী মতাদর্শের বিশ্লেষণ ‘এড়িয়ে’ যাওয়ার অভিযোগ আমলে নিতেই বুঝি এ বইতে সমতা বজায় রাখতে চেয়েছেন। তবু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে চোখে লাগার মত কোমলতা শিশুসসুলভ লাগে। তাছাড়া, লেখকের নামে ‘মাঘ মাসে চৈত্রের ওয়াজ বদলে ফেলা’ সংক্রান্ত অভিযোগ আছে, এটি অস্বীকার করা যাবে না। এককথায় হারারির অনেকটা সারমর্ম পাওয়া যায় স্যাপিয়েন্স এর একটি (সুফিয়ান-শুভ্র-রাকিব) অনুবাদের ভূমিকায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভাষ্য থেকে, যেখানে বলা হয়েছে-

বইটির সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ হচ্ছে প্রচলিত নানা ধ্যানধারণা নিয়ে লেখকের ব্যাখ্যা। কিছু কিছু ব্যাখ্যা প্রচলিত ব্যাখ্যা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন, সবাই সবকিছু মেনে নিয়েছেন তাও নয় কিন্তু এসব ব্যাখ্যা সবাইকে যে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে, সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র, তাই বিজ্ঞানের সব বিশ্লেষণই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, তা নয়। কিন্তু, তাঁর যুক্তিতর্ক এবং বিশ্লেষণ আমাকে ভাবিত করেছে, সেটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

হারারির অন্যান্য লেখার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তাঁর লেখাগুলি সবাইকে ভাবতে বাধ্য করে- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এখানে ভাল দিক হল, লেখক নিজেই কোন কোন আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন ‘সময়ই উত্তর দেবে’ এই ইঙ্গিত সমেত। একই সঙ্গে লেখক মাঝেমধ্যে বিনয়ের সাথে এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন- তাঁর লেখাই শেষ কথা নয়। আরিফ আজাদ, শামসুল আরেফিন কিংবা রাফান আহমেদদের ‘আনাল হক্ক্ব’ মার্কা বেস্টসেলারাক্রান্ত সময়ে এই উন্মুক্ত চিন্তার প্রয়োজন আছে। ঋত্বিক ঘটক বলেছেন- “ভাবো, ভাবা প্রাকটিস করো!” আর, এই চিন্তানুশীলনে যুক্ত হওয়ার প্রথম ধাপ খুবই সহজ- বইটি পড়ে ফেলুন। শুভপঠন।

পুনশ্চঃ উপ-শিরোনামগুলোর ১ ও ৮ নং ক্রমিক নরেশ গুহ, ২ ও ১২ নং ক্রমিক জীবনানন্দ দাশ, ৩ নং ক্রমিক রণজিৎ দাশ, ৪ নং ক্রমিক রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ৫ নং ক্রমিক হুমায়ুন আজাদ, ৬, ৭, ৯, ১০ ও ১১ নং ক্রমিক হেলাল হাফিজ, ১৩, ১৫ ও ১৮ নং ক্রমিক সুধীন দত্ত, ১৪ নং ক্রমিক নীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ১৬ নং ক্রমিক তারাপদ রায়, ১৭ নং ক্রমিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯ ও ২১ নং ক্রমিক আবুল হাসান আর ২০ নং ক্রমিক পূর্নেন্দু পর্ত্রীর কবিতা থেকে বিনা জামানতে ক্ষুদ্রঋণ হিসাবে গৃহীত।

০১-০৫-২০২০
বাংলাদেশ


মন্তব্য

কর্ণজয় এর ছবি

সকালের নিজস্ব সময়টুকু
কেটে গেল আনন্দঘন পাঠে
১৪ তম অনুচ্ছেদ যখন আবৃত্তি করে
মিলিত মৃত্যুর চেয়ে বেঁচে থাকা ভাল
ধর্ম পুরানগুলোর ঐশী টুপিগেুলো বর্ণালীর
ব্যবচ্ছেদ চলছে
খেয়াল করলাম বেজে চলেছে
সুবিনয় রায়ের কণ্ঠে
উপনিষদের শ্লোক।।

ধন্যবাদ, সত্যানন্দ
বইটা পড়ে ছিল তাকেই
নামিয়ে রাখলাম
আপনার শেষ বাণী শেষ করে।।
আর আপনার অনুবাদ
আর আপনার টুকরো মতলিপি
তাতে ডুবতে পেরেছি
সত্য সাবলীলভাবে----

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ! আসলে উপনিষদের শ্লোক, কোরানের আয়াত, ত্রিপিটকের উপদেশ কিংবা বাইবেলের বাণী কোনটাতেই শান্তির বাণী অনুপস্থিত নেই তো। একইভাবে বিপরীতটিরও অভাব নেই খুঁজলে। এ যেন, হ্যারি পটারের Mirror of Erised! অপরকে সাহায্যের আদেশদাতা একজন দয়ার্দ্র ইশ্বরের ধারণা, নিঃসন্দেহে দুনিয়াটাকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারত। মুশকিল হল, আরও অনেক রাগী দাদামশায়ের ইশ্বর নিরন্তর হাওয়া দেয় ব্যক্তিগত ক্রোধের অঙ্গারে।

ভদ্রলোক অনুসারীদের ঈশ্বর হয়ে ওঠেন নিপাট ভদ্রলোক, আর ছোটলোক অনুসারীদের ইশ্বর হয়ে ওঠেন ইতরস্য ইতর। সঙ্খ্যানুপাতে বেশি হোক বা কম, শক্তি বিচারে ভদ্রলোকেরা পিছিয়ে পড়ছেন যে! মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সোহেল ইমাম এর ছবি

হারারির এই বইটা এখনও পড়া হয়নি। আমার কাছে বোধহয় কোথাও পিডিএফটা আছে। চুলকে দিলেন যখন বইটা পড়ে ফেলতে হবে তাড়াতাড়ি। হাতের বইটা শেষ করেই ওটা ধরবো।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

বাহ, পিডিএফ আছে নাকি? আমার তো ছাপা বই! নইলে যাত্রাপথে অনেক আগেই পড়ে ফেলা যেত। পড়ে ফেলুন। চমৎকার বই। (হাতে এখন কি বই?)

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সোহেল ইমাম এর ছবি

ভ্লাদিমির প্রপ এর ফোকলোরের উপর একটা বই, “মরফোলজি অব দ্য ফোকটেল”। বুঝছিনা কিছু ওষুধ গেলার মত গিলে চলেছি।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

ইয়ে, মানে...

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

এক লহমা এর ছবি

দুর্দান্ত একখানা নামিয়েছ। অনেকদিন লাগবে পুরোটা পড়ে উঠতে। রোজ-ই পড়ছি একটু একটু করে। সুস্বাদু রুটি মুখের মধ্যে একেকটা টুকরো অনেকক্ষণ ধরে রেখে আস্তে আস্তে খাওয়ার মতন। সবটা খাওয়া হলে আবার ফিরে আসব। গুরু গুরু (৫ তারা অবশ্যই) হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- "আবার সে এসেছে ফিরিয়া" বলতে বলতে তাড়াতাড়ি চলে আসুন। হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সত্যপীর এর ছবি

এইটা ভালো পোস্ট হইছে। খাবলা খাবলা অনুবাদের কারণে ইচ্ছামত অনুচ্ছেদ পড়লাম কিম্বা এড়ায় গেলাম। এইরম আরো দেন।

বিজ্ঞান নিয়াও খাবলাপোস্ট কাম্য। পচুর তো ফাঁকিবাজী হৈল।

..................................................................
#Banshibir.

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- একটা কথা, মূল বইটা পড়লে খাবলা খাবলা পইড়েন না। ওইটা সিরিয়ালি পড়াই ভাল।

আর, বিজ্ঞান ভুইলা গেছি। ফাঁকিবাজি না রে ভাই, আসলেই সময় পাইতাম না। দেখা যাউক। ইয়ে, মানে...

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সুমন চৌধুরী এর ছবি

একটা একটা কইরা তাক খালি কৈরা ফালান। তারপর পরের তাকে যান। শুধু তাক না পুরা আলমারি খালি করেন। দেঁতো হাসি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আরেকটা বই তাক থেকে নামিয়ে বসে আছি, কিন্তু পোস্ট নামে না তো! মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সত্যপীর এর ছবি

এইটা নিজের ব্লগে সরায়ে নতুন পোস্ট দিতে পারেন।

..................................................................
#Banshibir.

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

কেবল তাক থেকে নামিয়েছি, দিল্লী বহুদূর...

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

কনফুসিয়াস এর ছবি

এটা প্রিন্ট করে নিলাম, শান্তিতে পড়ব বলে।

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

Md. Jahirul Haque এর ছবি

হারারির বই আসলেই চিন্তা উদ্রেগ করে।

বাঙ্গলাদেশে এই ধরনের বইয়ের অনুবাদ ও পাঠ হচ্ছে তা অনেক আশা যোগায়। আর আরো অনেক এই ধরনের বইয়ের অনুবাদ প্রয়োজন।

তবে আপনার অনুবাদে কিছু কিছু জায়গায় খটমট লেগেছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।