দা ম্যানিফেস্টো

শুভাশীষ দাশ এর ছবি
লিখেছেন শুভাশীষ দাশ (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৭/০৩/২০১১ - ১১:২৫পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

।১।

চেয়ারম্যান মাও লিখেছিলেন দা রেড বুক। তাঁর বক্তৃতা ও উদ্ধৃতি নিয়ে লেখা এই বিখ্যাত চটি ম্যানিফেস্টো। তেইশ বিষয়ে দুশো উদ্ধৃতি নিয়ে প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৬৪ সালে ; পরে বিষয় বাড়ে আর কোটেশনের সংখ্যাও। তেত্রিশ বিষয়ে চারশো সাতাশটি উদ্ধৃতি দিয়ে বইটি তার আকার নির্দ্দিষ্ট করে। বইটি এই পর্যন্ত কত কপি ছাপানো হয়েছে সেটার গণনা প্রায় অসম্ভব। কিছু সূত্র মতে, সেই সংখ্যা সাড়ে ছয় বিলিয়নের মতো। চীনে এই বইয়ের বহুল প্রচার হয়েছিল কারণ এটা পড়া বা সাথে থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। জনতাকে কোনো কিছুতে বাধ্য করানোর চৈনিক ধারাবাহিকতা এখনো বর্তমান। ‘দা রেড বুক’ বইয়ের তেত্রিশ বিষয়ের মধ্যে স্বাধীনতা কোনো বিষয় হিসেবে আসেনি।

।২।

মার্ক্স এঙ্গেলসের কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়তে অসাধারণ। A spectre is haunting Europe — the spectre of communism- এর মতো চোখ ধাঁধানো বাক্য দিয়ে শুরু। বই হিসেবে প্রকাশ পায় ১৮৪৮ সালে। শ্রেণীসংগ্রামের বিশ্লেষণ আর ধনতন্ত্রের গোঁজামিল ব্যাখ্যা করে সমাজতন্ত্রের স্বরূপ কি হবে সেটা নিয়েই এই নাতিদীর্ঘ বই। অধ্যায়ের সংখ্যা মাত্র চারটি। বইয়ের শুরুতে আতঙ্ক আর শেষে ঝংকার। দুনিয়ার মজদুর এক হও।

।৩।

দা গ্রীন বুক। আরেকটা ম্যানিফেস্টো। মুয়াম্মার গাদ্দাফির লেখা। প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। ১৯৬৯ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গাদ্দাফি ক্ষমতা দখল করেন। কিছুদিন মন্ত্রী পদ নিয়ে থাকলেও পরে ‘লিবিয়ার অভ্যুত্থানের পথ-প্রদর্শক নেতা’ নামের তকমা সাঁটিয়ে ৪২ বছর ধরে একনায়ক স্বৈরশাসক হিসেবে টিকে আছেন। গাদ্দাফির বই অনেকটা রেড বুকের আদলে লেখা। তিনটি অংশে বিভক্ত বইটির বিষয় সংখ্যা পঁচিশ। ‘নারী’ একটা বিষয় হিসেবে উল্লেখ আছে দা গ্রীন বুকে। একই ঘটনা রেড বুকেও। গ্রীন বুকে ‘বাসায় রাখা কাজের লোক’ একটা বিষয় হিসেবে উল্লেখ আছে। এর সাথে আধুনিক দাস-ব্যবস্থার তুলনা করে এই চর্চার মুক্তি ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থানে গ্রীন বুক পুড়িয়েছে আন্দোলনকারীরা। গাদ্দাফি ক্ষমতায় টিকে থাকতে নিজের জনতার ওপর গুলি চালাতে দ্বিধা করেনি। জনবিচ্ছিন্ন গাদ্দাফি’র পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার।

।৪।

গান্ধিজির অহিংসা এখন জিন শার্পের তত্ত্ব। অহিংসা কিভাবে আন্দোলনে অংশ নেয় সেটাই শার্প তার বইতে দেখান। ভদ্রলোক আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমারিটাস প্রফেসর। বয়স তিরাশি। ‘ফ্রম ডিক্টেটরশিপ টু ডেমোক্র্যাসি’ তাঁর চটি ম্যানিফেস্টো। অগণতান্ত্রিক সরকার হটাতে শার্পের বই আন্দোলনকারীদের অহিংস পথ দেখিয়েছে। তাঁকে বলা হয় ‘অহিংসার ম্যাকিয়াভেলি’। বইতে অধ্যায় দশটি। পরিশিষ্টে ১৯৮ টি অহিংস পদ্ধতির নাম উল্লেখ আছে। সম্প্রতি আরব বিশ্বে তরুণ আন্দোলনকারীরা শার্পের পথ ধরে আন্দোলন করে সফলতার মুখ দেখেছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহেও শার্প। এমনকি লিবিয়াতেও।


মন্তব্য

দিফিও-1 এর ছবি

হাহাহা, আপনার ১,২, ৩ পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, কমেন্টে শার্প সাহেবের কথা লিখবো খাইছে
নিউইয়র্ক টাইমসে দেখলাম এই ভদ্রলোকের কথা।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

হ্যাঁ, শার্পকে নিয়ে অনেকেই লিখছেন। আমাদের হাসান ফেরদৌস হালকা টাইপো সহ একটা লেখা আলুতে ছাপাইছেন।

নৈষাদ এর ছবি

চলুক । চার নম্বরটা চমকপ্রদ।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

পড়ে ফেলেন, বস্‌।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ধর্ম চালাতে গেলে ধর্ম্মপুস্তক লাগে। কখনো সেটা ঈশ্বরের বানী, দেবদূতের মাধ্যমে তার পয়গম্বরের কাছে পাঠানো; কখনো নিজেকে ঈশ্বরের অবতার দাবী করা অবশ্য-নমস্যদের বানী। এসব ধর্ম্মপুস্তক কোটি হিসাবে ছাপানো হয়, বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়, বইয়ের ছায়ার আড়ালে তরবারী-বন্দুক-জেল-জুলুম-ইনক্যুইজিশন থাকে। এসব জিনিষ মনে হয় প্রাকৃতিক, তাই বায়োলজিক্যালি ডিগ্রেডেবল। সময়ের সাথে সাথে পঁচতে শুরু করে, একসময় তা ধুলায় মিশে যায়।

চার নম্বর ধর্ম্মপুস্তকটা পড়িনি। তবে সেটা পঁচতেও সময় লাগবে বলে মনে হয় না। এখন সব কিছুর "হাফ লাইফ" খুব কম হয়, আণবিক ভর কম মনে হয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

চার নম্বরটা পড়েন। বেশ সহজ সরল। অহিংস আন্দোলনের পপি গাইড।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

নামালাম, এবং পপি গাইড ধরনের পয়েন্ট দিয়ে দিয়ে আন্দোলন করার তরিকাগুলোও পড়লাম।

একটা কোচিং সেন্টার খোলা দরকার। কেবল আরবী ভাষাটা একটু শিখতে হবে (ব্যাকরণ জানি, শব্দ-ভাণ্ডার নেই), তাহলেই আরবগুলোকে ছাত্র বানিয়ে পড়ানো শুরু করা যাবে - একেবারে কড়কড়ে পেট্রোডলার আয় হবে।

গতকাল এক আত্মীয়ের কাছে শুনলাম সৌদি আরবে গরিব-দুঃখীদেরকে ব্যাপক দান-খয়রাত করা শুরু হয়েছে; ভিক্ষা দিয়ে সম্ভাব্য আন্দোলন ঠেকানোর কৌশল হিসাবে। দারুণ মজা! শেষে "মোর লন্সো গ্যালো, মোর পন্সো গ্যালো" অবস্থা না হয়!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অনিন্দ্য রহমান এর ছবি

দুই নম্বরটা পড়ছি দুয়েকবার। আমার পক্ষে অনেকগুলা ধর্ম পালন করা কঠিন। "কারো" "পথ" ধইরা "কেউ" কি আসলেই "আন্দোলন" "করে"?


রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

করে তো। একাত্তর।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

অহিংসা আন্দোলন বিষয়ে আমার ব্যাক্তিগত কিছু অভিমত আছে।
অহিংসা আন্দোলন সফলতা পায় অভ্যন্তরীণ সরকারের ক্ষেত্রে। আপনার দেয়া উদাহরণ থেকেই বলি: আরব বিশ্বের সাম্প্রতিক বিপ্লব বা, মিয়ানমারের দিকে তাকান; দেখবেন সেখান আন্দোলন দেশের অনৈতিক-অত্যাচারী সরকারের বিরুদ্ধে, বিদেশী শাসকদের বিরুদ্ধে নয়।
বিদেশী শাসকদের বিরুদ্ধে অহিংসা আন্দোলন তেমন সফল হয় না বলেই ইতিহাস নজির রাখে। ভারতের স্বাধীনতায় গান্ধীজীর অহিংসা আন্দোলন কতটুকু সফল, সে বিষয়ে এখনো প্রশ্ন আছে। ভারতবাসী ব্রিটিশ রাজের অত্যাচার থেকে স্বরাজের অত্যাচারে স্থানান্তর হয়েছে মাত্র; এটাকে কতটুকু স্বাধীনতা প্রাপ্তি বলা যায়, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও বিদেশী শাসকের শোষণ হতে মুক্তির রক্তাক্ত সসস্ত্র সংগ্রাম।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

গান্ধিজির ব্যাপারটা অল্প কথায় বোঝানো মুশকিল। আপাতত ক্ষ্যামা দিলাম।

পাগল মন এর ছবি

যে স্বাধীনতা তেমন ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়না সেটার কদর একসময় কমে যায় (বাংলাদেশের কথা আলাদা)। তাই অহিংস আন্দোলনে আমার কিছু সমস্যা আছে আর এটার সফলতা নিয়ে সংশয়।

------------------------------------------
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
তবুও তো ভাই কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

সশস্ত্র বিপ্লবের পথ তো খোলাই আছে। আর আপনি সশস্ত্র করুন, অশস্ত্র যাই করুন করুন এক দুইটা শর্মিলা বসু থাকলে তারাই বলে দিবে আসলে বিপ্লবটা কি ছিল! দেঁতো হাসি

ফাহিম হাসান এর ছবি

বুঝলাম আমার পাঠতালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো মাস্ট রীড। অন্তত মেপে কথা বলা শেখার জন্য।

সাফি এর ছবি

অহিংসা এর বিপরীতে রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমের আন্দোলনের সাম্প্রতিক উদাহরন কি হবে?

দিফিও-1 এর ছবি

আরো কিছুদিন ওয়েট করেন---লিবিয়ারটা হতে পারে চিন্তিত

সাফি এর ছবি

এখন পর্যন্ত লিবিয়ার ঘটনা আমার কাছে জনসম্পৃক্ত আন্দোলনের (ইজিপ্ট বা তিউনিশিয়া) চেয়ে গৃহযুদ্ধ বা দু'পক্ষের লড়াই মনে হচ্ছে বেশী।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

লিবিয়া যে কোন পথে যায়!

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

এগুলো পড়িনি। বুঝলাম অনেক পিছিয়ে আছি। পড়ার পথ বাৎলে দেবার জন্য শুভাশীষ দা আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

আবার দা! আমি কিন্তু বটি। খাইছে

স্বাধীন এর ছবি

চলুক
দুই নম্বরটা নিয়ে লিখেছিলাম। ৪ নম্বরটা সেইভ করতে পারলাম না। হাতের কাছে থাকলে ইমেইলে পাঠাতে পারবে? অগ্রীম ধন্যবাদ রইলো।

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

এখানে সব পাবেন।

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

তিন নম্বরটা পেয়ে বেশ আনন্দ পেলাম। চলুক!

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।