কোমলমতি!!-৩

স্বপ্নহারা এর ছবি
লিখেছেন স্বপ্নহারা (তারিখ: শনি, ১৮/০৭/২০০৯ - ৮:৪০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব http://www.sachalayatan.com/guest_writer/25556
দ্বিতীয় পর্ব http://www.sachalayatan.com/swopnohara/25636

আমি আগেই বলেছি 'কেচকি পোলাপাইন' বা 'খুচরা পয়সা' গুলোকে কোমলমতি বললে আমার বড়ই মেজাজ খারাপ হয়। সাইজে ছোট বলে অযথা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এদের ক্ষমতাকে ছোট করার কোনই মানে নাই (সব একেকটা ধানী মরিচ)। তাদেরকে কোমল বললে আমি অফেন্স নিবনা; কোমলশিশু বলেন আমি মাইন্ড করবো না; কোমলপশু (!) বললেও বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই...কিন্তু তাদের মন-মতি কোমল এইটা শুনলেই আমার গায়ে জ্বালা ধরে! (সেই জ্বালা 'বিলাই চিমটি' বা 'চোতরা পাতার' জ্বালার চেয়ে কম না!) একবার ভেবে দেখেনতো, এরা মারামারি-যুদ্ধের কম্পুটার গেমগুলা যে দক্ষতায় খেলে...তাগো হাতে আসল মাল থাকলে কি হইত!! ভাবলেই গা-শিউরে উঠে। অথবা ধরেন 'বুশ'-এর মানসিকতার একজন পিচ্চিরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বানাইলে দুনিয়াতে আমরা থাকতাম কিনা? তখন এখনকার বুশরে দেবদূত মনে হইত-তাইনা?

আমার আর আমার ভাইয়ের দুই-একটা কাহিনী প্রথম দুই পর্বে বলেছি। আজকের পর্ব আমার বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী আর চেনাজানা কিছু মানুষের ছেলেবেলার অতিকোমল মনের কিছু কার্যকলাপ নিয়ে।

।।এক

আমি নিশ্চিত মুসলিম পুরুষদের প্রায় সবারই মুসলমানীর ('খৎনা') সময়কার অম্ল-মধুর কিছুনা কিছু স্মৃতি আছে। আমি ভিন্ন ধর্মের বলে আমায় কখনো প্রসেসটির ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি...কিন্তু কাছ থেকে অনেককেই যেতে দেখেছি। সবারই তখন ধারণা ছিল এই জিনিসটা না করলে 'মুসলমান' হওয়া যায় না...ওইটা করার পর একজন মানুষ মুসলমান হয়! যাদের হয়ে গেছে তারা অবশ্য দল বদল করে অন্যদের 'কাপুরুষ' নামে অভিহিত করত; সেই কাপুরুষদের অবশ্য একপর্যায়ে নিজেদের 'প্রেস্টিজ' বাচাঁনোর জন্য আগ্রহী হতে হত। ব্যাপারটি একদম ছোট বয়সে আমার বন্ধুদের মাঝে যথেষ্ট ভীতিকর ছিল। সামাজিক চাপে নতি স্বীকার করার আগে এবং যথেষ্ট বড় হওয়ার আগে মুসলমান হওয়ার জন্য অনেকেরই খুব একটা ইচ্ছা দেখা যেত না। 'হাজাম' নামক এক ভয়ঙ্কর ব্যক্তি ওই কর্মটি সম্পাদন করতেন...এবংএলাকায় শিশুমহলে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন! তাকে আশেপাশে দেখা গেলে কিসের খেলা কিসের অন্যান্য কাজ...জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা 'য পলায়তি স জীবতি' বিদ্যুৎ গতিতে পালিত হত! মনে আছে, একবার দুই বন্ধুর মধ্যে চরম মারামারি চলছে...যারা অংশগ্রহণ করছিনা তারা দুইপক্ষের চীয়ারলিডারের কাজ করছি। হঠাৎ সেই ভয়ঙ্কর ব্যক্তিকে দূর থেকে দেখা গেল...যে ছেলেটি অন্যজনকে শুইয়ে ফেলে জয়ের সুবাতাস পাই পাই করছে সেই দেখা গেল সবার আগে দৌড় (কিছুদিন পরই তার কাজটি সম্পাদিত হওয়ার কথা চলছিল)! চীয়ার লিডারদের কথা না হয় বাদই দিলাম! আমি যদিও জানতাম আমার ওই ব্যাপারটা করা হবেনা তবু সেই ব্যক্তিকে দেখলে আমারও শিড়দাড়াঁ বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে যেত!

আমার এক বন্ধুর যখন সেটা হয়...তখন সে নিতান্তই ছোট...পাঁচ বছরের। যতদূর মনে পড়ে তাকে প্রথমদিন নাঙ্গা অবস্থায় আর দুই/তিন দিন লুংগি পরে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। তার পাশের বাসার প্রায় সমবয়সী মেয়েটি ছিল খুবই কৌতূহলী...তাই সেই দিনগুলোতে তাকে বেশ কয়েকবার আমার বন্ধুটিকে (এবং তার বস্তুটিকে) দেখার জন্য প্রচন্ড আগ্রহী দেখা গেল। কোনভাবেই তাকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছিল না...আমার বন্ধুটিও লজ্জায় মুখ-চোখ লাল করে অন্যদিকে তাকিয়ে অথবা ঘুমের ভান করে সময় কাটাতে হচ্ছিল। বেচারার জন্য মায়া হচ্ছে? উহু...আমার সেই বন্ধুটি পরে শোধ নিয়েছিল সেই মেয়ের উপর 'তুই আমারটা দেখছস...এখন..."!

।।দুই

দুনিয়ার তাবৎ শিশুদের আমি দুইভাগে বিভক্ত করিঃ একদল যারা চশমা ভয় পায়...আরেকদল যারা চশমাকে খুবই পছন্দ করে। ক্লাস ফাইভ থেকে আমার চোখে হাই-পাওয়ারের চশমা...তাই অভিজ্ঞতা থেকে জানি যারা চশমা পছন্দ করে সেসব শিশু থেকে ১০০ হাত দূরে থাকা বাধ্যতামূলক। আমার মামাত ভাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় খাবার গুলোর একটা ছিল...আমার চশমা চাবানো! বলাই বাহুল্য...আমাকে তার খুবই পছন্দ ছিল এবং সেটা আমার বিকট দর্শন চেহারার কারণে বা আমি তাকে আদর করব এই কারণে না!

কেচকি-দের আরেকটা প্রিয় জিনিস হল ঘড়ি; একটা সময় ওয়াটার রেসিস্ট্যান্ট বা ওয়াটার প্রুফ ঘড়ি ছিল বিপুল চাহিদার জিনিস। সেটার প্রতি অসীম আগ্রহ থাকত ছোটদের...বিশেষত একটু বড় হওয়া ছোটদের! যেকারণে যেসব বাসায় বাবা-মামা-চাচাদের ওই ধরনের ঘড়ি থাকত...প্রায়ই সেসব বাসার সব ধরনের ঘড়িগুলোকে তাদের সামর্থ্যের এবং যোগ্যতার চরম পরীক্ষা দিতে হত। একবার আমার ছোট মামার একটা নতুন দামী ঘড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না...বাসায় ছুটা কাজের লোকের দিকে সন্দেহের তীর বিপুলভাবে বর্ষণ করা হতে লাগল! এক সপ্তাহ পর ঘড়িটি পানি রাখার ড্রামের ভেতর পাওয়া গিয়েছিল এবং সাথে আমার মামাত বোনের ছোট্ট ক্যাসিও ঘড়িটিও...যেটির দাবি ছিল 'পানি দ্বারা তার ধ্বংস-সাধন সম্ভব নয়'। সে ঘড়িটি পটল তুলেছিল এবং দুর্ভাগ্যক্রমে আমার মামার ঘড়িটি কখনোই এমন দাবি করেনি তবুও তাকে মরতে হয়েছিল প্রতিযোগিতায় অনিচ্ছাকৃত অংশগ্রহণের কারণে!!

।।তিন

আমি যখন বুয়েটে পড়ি তখন আমার পাশের বাসায় চার-পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটি মিষ্টি মেয়ে আসে। আমি তখন বড় চুল রাখতাম...কবি হওয়ার বিপুল বাসনা ছিল। (কাজে না হতে পারি দেখতে কবি হতে তো নিষেধ নাই...খাইছে) সে আমার মা-কে জিজ্ঞাসা করে আপনার এটা কি ছেলে না মেয়ে? (বিশ্বাস করেন আমারে মেয়ে মনে হওয়ার কোনই কারণ নাই...আর তাছাড়া মুখ ভর্তি দাড়ি-জুলফির জঙগল ছিল) মা উত্তর দেয়ার পর সে তার মতামত ব্যক্ত করে, 'আন্টি মনে হয় আল্লাহ আপনার ছেলেরে মেয়ে বানাইতে চাইছিল...পরে হঠাৎ ছেলে বানাইয়া পাঠাইয়া দিছে'!!

শিশুদের মত পলিটিশিয়ান দুনিয়াতে থাকলে দুনিয়ার চেহারা কী ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তা ভাবতেই ভয় লাগে। প্রতিটি শিশুই হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ-কে হারানোর যোগ্যতা রাখে বলে আমি বিশ্বাস করি। একটি শিশুকে যদি জিজ্ঞেস করেন আপনি কেমন...সে বেশিরভাগ সময়ই আপনাকে 'পচা' বলে অভিহিত করবে। মন খারাপ করবেন না...হাতে একটা চকলেট নিয়ে তার সামনে গিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করুন...নিশ্চিতভাবে তার উত্তর ভিন্ন হবে। এই পর্যায়ে আপনি নিজেকে আসলেই ভাল মানুষ প্রমাণের জন্য তার হাতে চকলেট তুলে দিন...এবং তার খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এবার আবার জিজ্ঞাসা করুন...অবাক হবেন জেনে কারণ আপনার প্রতি তার ধারণা একদমই ভালনা...তার প্রথম অভিমতের চেয়ে আপনি হয়ত আরও একটু বেশি 'পচা'!! অবশ্য কেউ কেউ আপনাকে এতক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখবেনা...চকলেট হাতে পাওয়া মাত্রই আপনি আপনার সম্পর্কে তার রায় পেয়ে যাবেন এবং সেটা খুব একটা ভাল কিছু না!

শিশুদের প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা হয় 'মা ভাল না বাবা ভাল?'...সাধারণত কাছাকাছি যে থাকে সে-ই ভাল বলে তার মত পাওয়া যায়; দুইজনই কাছে থাকলে...'দুজনেই ভাল'! এতটা সুবিধাবাদী আপনি এই বয়সে হতে পারবেন বলে মনে হয়?

।।চার

শিশুদের প্রাকৃতিক কর্মের পর আউটপুটের প্রতি সবসময়ই বিপুল-বিশাল আগ্রহ। আজকাল অবশ্য শিশুদের সেই নির্মল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে ...ন্যাপি-ডায়াপারের অন্যায় আগ্রাসনের কারণে! আমি নিশ্চিত যদি এক সপ্তাহ থেকে দেড় বছরের শিশুদের দাবিদাওয়ার একটা তালিকা বা একটা জরীপ করা হয়...ন্যাপি ব্যান্ড করার দাবি উপরের দিকেই থাকবে।

আমার বাবার এক বন্ধুর মেয়ের তিন বছর বয়স পর্যন্ত তার অসম্ভব প্রিয় প্রাকৃতিক বড় কর্মটি সম্পাদনের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ছিল বিছানার অথবা বালিশের উপর! একপর্যায়ে সে বোরড ফীল করতে থাকায় (!) সে কিছুদিনের জন্য তার পছন্দের জায়গা পরিবর্তন করে...বালিশ এবং লেপের তলায়!

আমার সহধর্মিনীর খালাত ভাইয়ের কথা বলি। তার বাবা-মায়ের বিয়ের অনেকদিন পর তার জন্ম...যেকারণে তার রাজত্বের প্রজাদের অনেক অত্যাচার-নিপীড়ন মুখবুজে সহ্য করতে হতো। তিন-চার বছর হওয়ার পরও তার খুব প্রিয় একটা কাজ ছিল কার্পেটের চার কোণায় (নিখুঁত জ্যামিতিক দূরত্ব বজায় রেখে) বড় প্রাকৃতিক কর্মটি সম্পাদন করা। তাকে উপর্যূপরি নিষেধ এবং শাসন করায় সে সেই কর্মটি থেকে নিবৃত্ত হয়। কিছুদিন ভালই ছিল। কিন্তু একদিন ড্রইংরুম থেকে ব্যাপক বিকট গন্ধ পাওয়া গেল... কার্পেটের কোণায় কিছুই দেখা গেলনা। কার্পেট উল্টানোর পর...আবার নিঁখুত জ্যামিতির চতুর্ভূজ!!

আমার পাশের বাসায় একটি ছেলে থাকত...বড়ই মায়াময় চেহারার শান্ত-শিষ্ট ছেলে, যার জীবনের লক্ষ্য ছিল বড় হয়ে সে ঠেলাগাড়ি চালাবে! সারাদিন বারান্দায় বসে সে রাস্তা দিয়ে যাওয়া ঠেলাগাড়ি দেখত। তার মা ছিল বেশ পরিপাটি কিন্তুঅসম্ভব শুচিবাইগ্রস্ত...দিনে ২/৩ বার ঘর মোছা হত। সেই ছেলেটিকে একদিন কোন কিছু ময়লা করার কারণে একটু শাসন এবং সামান্য প্রহার করা হয়েছিল। সেদিন তার মা গোসল করতে যাওয়ার আগে সে বাথরুম করতে যায়। কিছুক্ষণ পর বিকট বিশাল চিৎকারে সেই বাড়ির এবং আশে পাশের বাড়ির বাসিন্দারা চমকে উঠি...সেই আন্টিকে হাউমাউ করে কাঁদতে এবং হাত-পা ছুঁড়তে দেখি। ঘটনা জানা গেল...তার নিষ্পাপ দর্শন পুত্রটি প্রাকৃতিক বড় কর্ম সম্পাদন করে তার তোয়ালেতে পুরীষ মুছে আসে (একটু বেশি পরিমাণেই!)। এবং উনি গোসল শেষে মুখ মুছতে গিয়ে ...!

এরপর কেউ যদি শিশুদের মন নরম বলে রায় দেন...সেই তোয়ালে তার দিকে ছুঁড়ে মারতে আমি দ্বিধা করবনা...খাইছে

(চলবে)


মন্তব্য

মূলত পাঠক এর ছবি

মাঝরাতে পড়ে যা হাসলাম, প্রতিবেশী ছুটে আসে নি এই ভাগ্য!

প্রজাপতি [অতিথি] এর ছবি

আপনার তিনটি পর্ব এক সাথে পড়ে ভীষন মজা পেলাম। বাচ্চাদের সাইকোল্জি খুব সুন্দর করে উপস্হাপন করছেন।

ভুতুম এর ছবি

পিচ্চিরা বড় ডেন্চুরাস!

-----------------------------------------------------------------------------
সোনা কাঠির পাশে রুপো কাঠি
পকেটে নিয়ে আমি পথ হাঁটি

-----------------------------------------------------------------------------
সোনা কাঠির পাশে রুপো কাঠি
পকেটে নিয়ে আমি পথ হাঁটি

তানবীরা এর ছবি

এদেরকে কোন দুশমন কোমলমতি কয় ?
---------------------------------------------------------
রাত্রে যদি সূর্যশোকে ঝরে অশ্রুধারা
সূর্য নাহি ফেরে শুধু ব্যর্থ হয় তারা

*******************************************
পদে পদে ভুলভ্রান্তি অথচ জীবন তারচেয়ে বড় ঢের ঢের বড়

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।