রিমঝিম রিমঝিম শিলং শহরে একদিন

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি
লিখেছেন সৈয়দ আখতারুজ্জামান (তারিখ: শনি, ১০/১০/২০১৫ - ২:৩২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

নিশুতি রাত। পাহাড়ি পথে গোধূলি টের পাওয়া যায় না, ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। গাড়ি চলছে সাপের মতো। একেঁ বেঁকে। হেড লাইটের আলোয় দেখতে পাচ্ছি পাহাড়ধ্বসের খাড়া কার্ণিশ। ঝাকুনি খাচ্ছি মাঝে মাঝে। দক্ষ ড্রাইভার নির্বিকার। সিডিতে বাজছে, পারদেশি... পারদেশি... জানা নেহি...মুঝে ছোড়কে...। কে জানে কোথায় বিপদ লুকানো!

গুয়াহাটি থেকে শিলং ১১৬ কিলোমিটার। তিন ঘণ্টার পথ। কলকাতা থেকে ২২ ঘণ্টার অম্লমধুর দুর্দান্ত ট্রেন ভ্রমণ শেষে গুয়াহাটি এসেছি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। তারপর টাটা মানজায় (গাড়িতে) শিলং যাত্রা। লাবান, বাত্তিবাজারের বনি গেস্ট হাউজে আমাদের জন্য রুম বুক করা আছে। আমাদের রিজার্ভ গাড়ির ‘আসামি’ ড্রাইভার জাকির হোসেন বনি গেস্ট হাউজ চেনে। সুতরাং খোঁজাখুঁজির কোন বাড়তি ঝামেলা রইলো না। ফুরফুরে মনে বৃষ্টিরাজ্য শিলং এর পথে আমরা এগিয়ে চলেছি।

এগিয়ে চলেছি না বলে উল্কার গতিতে ছুটে চলেছি বলা ভালো। ঘড়িতে যখন নটা বাজলো ঠিক তখনই গাড়ির উইন্ড শিল্ডের ওপর গুড়িগুড়ি বৃষ্টির ফোঁটা দেখতে পেলাম। ভ্রমণবন্ধু মুন্না চেচিয়ে উঠলো - আমরা শিলং এসে গেছি, বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জাকির হোসেনও মৃদু হেসে সায় দিলো। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে যে অঞ্চলে সেখানে বেড়াতে যাবো আর বৃষ্টি দেখতে পাবোনা তা কী করে হয়! আর আমাদের ক্ষেত্রে তো রাজকীয় ব্যাপার, বৃষ্টিদেবতা নিজে আমাদের স্বাগত জানাতে মুশলধারায় ঝরতে লাগলেন। হেড লাইটেল উজ্জ্বল আলো। কিন্তু বৃষ্টির জমাট দেয়াল ভেদ করে ওপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ড্রাইভার গাড়ির গতি কমাতে বাধ্য হলো। ওয়াইপারের গদাং গদাং শব্দে হিন্দি গানের তাল কেটে যাচ্ছে। রাস্তার লম্বা-সাদা-দাগ দেখে দেখে আন্দাজ করে চলছে ড্রাইভার। থামার উপায় নেই। দেবতার বৃষ্টিপুষ্প গ্রহণ করতে করতে এগিয়ে চলছি। আধা ঘন্টা এভাবে চললো, তারপর ঝুপ করে বৃষ্টি উধাও হয়ে গেলো। এক ফোঁটাও নেই। এ কী তামাশা! মানে রাস্তা একেবারে খটখটে শুকনো। জাকির হোসেন বলল, এটাই শিলং এর আবহাওয়ার ধরণ। এই আছে, এই নেই। দু একদিন থাকলে বুঝে যাবেন। পরিস্কার বাংলা। আসামের লোকদের সাথে বাংলা সহজেই বলা যায়। অহমী আর বাংলা প্রায় কাছাকাছি। হঠাৎ সামনে দেখি কুয়াশার কু-লী। কুয়াশা নাকি মেঘ! দেখতে দেখতে এমন অবস্থা হলো, জাকির হোসেনকে পুরো আন্দাজের ওপর ভর করে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। সামনে কিছুই দেখা যায় না। এ কেমন শহর শিলং! এতো যেন অভিমানী কিশোরী! এই তার ব্যকুল কান্না, তো ঐ তার মুচকি হাসি। ডাগর তার শরীরের পাহাড়ি বাঁকে বাঁকে অজানা শিহর ওৎ পেতে আছে। আমি যেন বহুদিন পরে ফিরে পাওয়া তার প্রেমিক পর্যটক। সত্যিই এই অন্ধকারেও শিলং শহরের আবছা অবগুণ্ঠিত রূপে মোহিত হয়ে গেলাম। দূর থেকেই চোখে পড়লো বাতিজ্বলা শিলং শহরের কেন্দ্রস্থল। নক্ষত্রমন্ডল যেন ভুল করে নেমে এসেছে শিলং-এর পাহাড়ি উপত্যকায়। পাহাড়ের গায়ে যেন জোনাকজ্বলাআঁচল বিছানো। আমরা যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে নটা বেজে একটু বেশি। সমস্ত চরাচর নিঝঝুম। কোন রেস্তরা বা দোকান কিছুই খোলা নেই। কনকনে ঠান্ডায় হাতের আঙুল, নাকের ডগা, কানের লতি জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি শহরের এটাই নিয়ম। সূর্য ডুবলো তো সব ডুবলো। দোকান বন্ধ। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। আমাদের কপাল ভালো - আসার পথে একটা ছোট্ট যাত্রা বিরতিতে ডিনার সেরে ফেলেছিলাম। সুতরাং নো টেনশন। সোজা রুমে ঢুকে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। ঢাকা থেকে টানা ৪২ঘণ্টা ভ্রমণ করার পর টানটান না হয়ে আর উপায় কী! একটা কুকুর সেই কখন থেকে গলা টেনে টেনে ডেকে চলেছে। সমস্ত শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। থেকে থেকে কুকুরের ডান যেন সেই নিস্তব্ধতাকে আরো গাঢ় করে তুলছে। আকাশে তারা নেই। মেঘের কম্বল গায়ে মহাজগত নির্জন হয়ে আছে। রুম হিটার চালু করে দিলাম। আমরাও আর জেগে থাকতে পারলাম না। রাজ্যের ঘুম কুয়াশার মতো আমাদের চেতনাকে ঢেকে দিয়ে গেলো।

পরদিন। সে এক স্মরনীয় সকাল! হোটেলের বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সর্বনাশ! বেড়াতে যাবো কী করে! কিন্তু এটাইতো শিলং। বৃষ্টিই-তো এর মোহনীয় রূপের শাশ্বত প্রকাশ। বৃষ্টিরাজ্য আমাদের স্মৃতির ভা-ার বর্ষণমুখরে সমৃদ্ধ করে ফেরত পাঠাবেন এটাইতো কাম্য। কিন্তু আমরা যে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছি তার কী হবে! ভাবতেও কষ্ট হয়, মাত্র তিন ঘন্টার দূরত্বে গুয়াহাটি শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নাভিশ্বাস ওঠা ৩৪ ডিগ্রীর উত্তাপ।

হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ। আমি কম্বলের তলা থেকে মুখ বের করলাম না। টের পেলাম পাশের বিছানা থেকে মুন্না অনুপায় হয়ে উঠলো। কাঁপতে কাঁপতে দরজা খুললো। দেখলো, দরজায় সটান দাঁড়িয়ে আমাদের শিলং-এর বন্ধু জন ওয়ানখার।
‘সুপ্রভাত! আহা কী সুসংবাদ! আমাদের আজকে শিলং ভিউপয়েন্ট যাওয়া হবে!’, জন একগাল হেসে রেইনকোট খুলতে খুলতে আমাদের ভ্রমণপরিকল্পনা বয়ান করতে লাগলো।
জন ওয়ানখার, যার আমন্ত্রণে আমাদের এই ভ্রমণ, মেঘালয়ের একটি ভ্রমণপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তরুণ যুবক। বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ। তাঁর পেছন পেছন রুমে ঢুকলো দু কাপ আগুন গরম চা। ওঠার সময় অর্ডার দিয়ে উঠেছে। নিতান্তই ভদ্রলোক। আমি কি আর কম্বলের তলায় থাকতে পারি?

জন চেয়ারে বসতে বসতে হুকুম দিলো, 'তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, নিচে গাড়ি দাঁড়িয়ে।'
আমরা খুশিতে বাক্যহারা হয়ে গেলাম, ঘুম থেকে উঠেই ম্যারাথন বৃষ্টির চেহারা দেখে মুষড়ে পড়েছিলাম। জনকে সাথে পাওয়ায় গাড়িও পেয়ে গেলাম, সব মুশকিল আহসান হয়ে গেলো। আমরা ঝটপট রেড়ি হয়ে নিলাম। দ্রুত নাস্তা শেষ করে প্রথমেই চললাম, পুলিশ বাজার।


পুলিশবাজারে যাওয়ার রাস্তা

শিলং শহরের হৃদয়ে এই পুলিশ বাজার। একটা গোল চক্কর মতো এলাকা। এই বৃত্ত থেকে গোটা দশেক রাস্তা বেড়িয়ে গেছে শিলং শহরকে ফালি ফালি করে। যাকে বলা যায় দশরাস্তার মোড়। আর এই রাস্তাগুলোর দুপাশ ধরে যত বাজার, কত দোকান, শত বড় বড় অফিস, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ব্যাংক, শপিংমল ইত্যাদি। সব এখানে।

শিলং এর কমলা বিখ্যাত। আমরা ডজন ডজন খেয়েছি।


ছবিতে যদিও গেস্টহাউজটাই আগে চোখে পড়ে, কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই নিচতলার দরজার উপরের সাইনবোর্ডটা চোখে পড়বে।পুলিশবাজারের কাছেই রবীন্দ্রনাথের নামে আছে এই পাঠাগার।


কেনাকাটা আর যত গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার অর্ধেকটা এই পুলিশ বাজারকে ঘিরেই। আমরা ডলার ভাঙানো, মোবাইল সিম কেনা, ট্যুরিজম অফিস থেকে বিনামূল্যে কিছু ম্যাপ আর বুকলেট নিয়ে পুলিশ বাজার ত্যাগ করলাম।

এবার শিলং পিক যাত্রা। শিলং পিক বা ভিউ পয়েন্ট থেকে পুরো শহরকে এক নজরে দেখা যায়। সকালের স্বচ্ছ আলোয় পুরো শহর দেখতে দারুণ লাগে। পথে যেতে যেতে জন শিলং সম্পর্কে কয়েকটি জরুরী তথ্য দিয়ে দিলো। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং। অনুমানে ছোট খাটো মনে হতে পারে। কিন্তু প্রায় সাড়ে ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন। ৭টি জেলা। খাসি, জৈন্তা, গারো আর ইংরেজী মাধ্যমে অধিবাসীরা কথা বলেন। তাপমাত্রা এই অক্টোবরে ১৫ ডিগ্রী থাকলেও আসছে শীতে ৭/৮ ডিগ্রীতে নেমে আসবে। আমরা ১৯৬৫ মিটার উঁচু শিলং পিকে উঠে হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম। কী সুন্দর ছবির মতো সাজানো একটা শৈল শহর! দু দুটো ওয়াচ টাওয়ার থেকে পর্যটকরা মনের আশ মিটিয়ে এপাশ ওপাশ দেখে নিতে পারেন। তাইতো এর আরেক নাম শিলং ভিউ পয়েন্ট। পাশের স্যুভিনয়র শপ থেকে কিছু বাঁশ আর কাঠের স্মৃতিচিহ্ন আর চা-দোকান থেকে গরম গরম ভূট্টা আর চা খেয়ে আমরা ছুটলাম এলিফ্যান্ট ফলস দেখতে। ভ্রমণের এই ছোটাছুটি পার্টটা কখনোই ভালো লাগে না। তবুও উপায় কি! রথ দেখা আর কলা বেচা একসাথে করলে কিছু ছাড় দিতেই হয়। নইলে সারাটা দিন এই পাহাড়ের চূড়াটাতেই বসে থাকতাম। অদূরে ভ্যালির মঞ্চে মেঘচরিত্ররা কী দারুণ নাটক যে দেখাতে সক্ষম তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।

এলিফ্যান্ট ফলস খুব সুন্দর। মেঘালয়ে এই ঝর্ণার খুব নামডাক। ১০ টাকা টিকেট। সাথে ক্যামেরা নিলে আরো ১৫ টাকা। ঝর্ণা ধাপে ধাপে নিচে নেমে গেছে বহুদূর। ঝর্ণার কলকল ছলছল ঝরঝর কলতানে কী সুধা মেশানো থাকে কে জানে! অপার্থিব ভালো লাগায়ে মন ছেয়ে যায়। মনে হয় এইতো বেঁচে আছি, এ জন্যেই বেঁচে আছি। ভ্রমণে এইসব অসাধারণ দৃশ্য দেখলে কাছের মানুষদের কথা খুব মনে পড়ে। মিস করি। একটা পাথরের সিড়ি ঝর্ণার পাশদিয়ে আঁকা বাঁকা হয়ে নিচে নেমে গেছে। আমরা সিড়ি দিয়ে সাবধানে নিচে নামতে থাকলাম। একদম নীচে নেমে দেখলাম জলপ্রপাতের সমতলে বয়ে যাওয়া রূপ। উষ্ণ ঝর্ণাজলে চোখেমুখে ঝাপটা দিলাম। মিষ্টি পানি। লোকালয় থেকে দূরের হলে নির্দ্বিধায় পান করতাম। হাতে সময় কম। আমরা ফিরে চললাম শহরের দিকে।

বেলা এগারোটা বাজে। এসে নামলাম মাওলাই এলাকায়, ডন বসকো মিউজিয়ামের সামনে। দেখার মতো জাদুঘর। সাত তলা। এই জাদুঘর ডন বসকো সেন্টার ফল ইনডিজেনাস কালচার এর একটি অংশ। প্রত্যেক তলার গ্যালারীগুলো আদিবাসীদের উপাদানে ঠাসা। এখানেই দেখলাম খাসি, জৈন্তা, গারো এবং আরো কত আদিবাসীদের পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাপনের উদাহরণ, অলংকার, উৎসব, শিকার, দৈনন্দিন উপকরণের হাজারো নমুনা। চোখ জুড়িয়ে গেলো। কাছেই এই সংক্রান্ত আরেক জাদুঘর ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সাংমা স্টেট মিউজিয়াম। ঘণ্টাখানেকের বেশি জাদুঘর দেখা ক্লান্তিকর। তথ্য-উপাত্তে মাথা জমাট বেধে যায়। কিন্তু আদিবাসীদের এইসব নিদর্শন দেখতে আমার কোনো ক্লান্তি নেই। দেখতে দেখতে এক সময় মনে হতে থাকে কোথাও যেন উৎসব আয়োজন হচ্ছে আর আমি যেন সেই সময়ের কোন আদীবাসি বসতির পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছি।

মিউজিয়াম থেকে বেরুতে বেরুতে দুপুর। তারপর ওয়ার্ড’স লেকে নৌবিহার। নৌকায় চড়তে যতটা ভালো লাগলো তার চেয়ে হাজারগুন বেশি ভালো লাগলো লেক থেকে পাশের উঁচু পাহাড়গুলো দেখতে। ঘন্টা খানেক লেকে ঘোরাঘুরি করে মনেহলো পেটের মধ্যে ছুঁচো ডন দিচ্ছে। ঘড়িতে ৩টা বাজে। তাড়াতাড়ি তীরে তরী ভেড়ালাম। অর্থাৎ ওয়ার্ড’স লেক ভ্রমণ শেষ। পাশের এক রেস্টুরেণ্ট থেকে আলু পরাটা, মুরগীঝোল, সবুজ সালাদ আর মিস্টি দই দিয়ে দারুণ লাঞ্চ শেষ করলাম। জন বললো, চলো, তোমাদের লেডি হায়দরি পার্ক দেখাই। অবসর কাটানোর দারুণ জায়গা। বিখ্যাত শিলং গলফ কোর্স এখানেই। ভারতে দ্বিতীয় সবচেয়ে পুরাতন ১৮-গর্তওয়ালা প্রাকৃতিক গলফ কোর্স এটি। একসময় পুবের ‘গ্লেন এগেল’ বলে বিখ্যাত ছিলো এটি। সবুজের গালিচা বিছানো এই পার্ক। বিকেলের আলোয় দারুণ লাগছে। দেবদারু গাছের লম্বা ছায়া পড়েছে রাস্তায়। আমরা একপ্রান্তে কিছুটা নিরিবিলি জায়াগা খুঁজে পেয়ে বসে বিশ্রাম নিতে লাগলাম। সকাল থেকে সময়ের হিসেবে অনেকটা দেখে ফেলেছি। পথে পথে যেতে শিলং শহরের সবুজ কাঁচের গম্বুজওয়ালা সবচেয়ে বড় মসজিদটি দেখে নিলাম। রাজ্যের কেন্দ্রিয় পাঠাগারের উল্টোদিকে দেখলাম শহরের সবচেয়ে বড় গীর্জা ‘ক্যাথেড্রাল অব মেরী হেল্প অব ক্রিশ্চিয়ানস’।


সন্ধ্যায় আবার ফিরে গেলাম পুলিশ বাজারে। যেমন স্থানীয় মানুষ তেমনি প্রচুর পর্যটকের ভিড় তখন। স্ট্রীট ফুডের পসরা সাজিয়ে বসেছে রাধুনীরা। চাওমিন, ডিমের অমলেট, পরাটা, লুচি, পুরী, চপ, ভূট্টা, স্যুপ, কী নেই সেখানে। সকলেই কিছু না কিছু অর্ডার দিচ্ছে। অধিকাংশই তরুন তরুণী। পরিবারসহ কয়েকটা দল দেখলাম।

গরম ধোঁয়া ওড়া চা খেতে খেতে, ছবি তোলা আর হাসি ঠাট্টা গল্লে অনেক সময় পার হয়ে গেলো। পুরো শহর ঘুমিয়ে গেছে আরো আগেই। পুলিশ বাজারের এই জায়গাটাই প্রাণের শেষ স্পন্দন নিয়ে জেগে আছে। যাওয়ার সময় হলো। জন পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করলো। প্যাকেট খুলে দেখি হাড়ের হাতলওয়ালা একটা ফোল্ডেড চাকু। এ কী! জন বলল, ‘উপহার। মেঘালয়ের স্মৃতি সাথে নিয়ে যাও।’ জন আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আগামীকাল সকালে আমরা ঢাকা ফিরে যাবো। শিলং শহর ঘুমে অচেতন। শুধু আকাশ কাঁপানো মেঘের বিদ্যুৎ চমক আর গুড়িগুড়ি বৃষ্টির শব্দ জেগে আছে।

শিলং ছেড়ে চলে যাচ্ছি কিন্তু এইসব হাসিমাখা মুখগুলো কোনদিন ভোলা যাবে না।
=====================================================================

সাধারণত এখানেই আমি লেখা শেষ করি। শুধু বাংলাদেশের আগ্রহী পর্যটকদের কথা ভেবে এই অংশটুকু বাদ দিলাম না।

কিভাবে যাবেন:
সবচেয়ে সহজ পথ তামাবিল বর্ডার থেকে গেলে। মাত্র ৮৬ কিলোমিটার। সময় লাগে ৩ ঘণ্টা। কলকাতা হয়ে গেলে লাগবে অন্তত ৪২ ঘণ্টা। প্রথমে বাসে বা ট্রেনে কলকাতা। তারপর ২২ ঘণ্টা ট্রেনে গুয়াহাটি। তারপর ৩ ঘণ্টার গাড়ি পথ। বিমানে গেলে কোলকাতা হয়ে গুয়াহাটি। তারপর গাড়িপথ।

কত খরচ:
তামাবিল থেকে গেলে যাতায়াতে হাজার দুয়েক টাকা খরচ হবে। কোলকাতা হয়ে গেলে হাজার পাঁচেকের কম নয়। বিমানে গেলে দশ থেকে তেরো হাজার টাকায় যাতায়াত। রাত প্রতি দুজনের জন্য ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় পুলিশ বাজারে ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন। সারাদিনের জন্য একটি গাড়ি ভাড়া করতে পারবেন আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায়। যদি বন্ধুবান্ধবসহ ৮ জনের একটি দল হয় আর তামাবিল বর্ডার থেকে যেতে পারেন তাহলে অল্পখরচের দুই/তিন দিনের শিলং ভ্রমণ আপনি থাকা খাওয়া ঘোরা সবসহ সর্বোচ্চ মাথাপিছু বারো হাজার টাকায় সেরে আসতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন:
পুলিশ বাজারের কোন হোটেলে থাকা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। এছাড়া বাত্তিবাজার, লাবান এলাকাতেও অনেক হোটেল আছে। সেন্টার পয়েন্ট, পেগাসাস ক্রাউন, বোলেভার্ড, জেকে ইন্টারন্যাশনাল, বনি গেস্ট হাউজ ইত্যাদি অল্প দামে বেশ ভালো মানের হোটেল।

কি কি দেখবেন:
যদি আমাদের মতো একদিনের ভ্রমণে যান তাহলে শুরুতেই শিলং ভিউ পয়েন্ট আর এ্যালিফ্যান্ট ফলস দেথে আসবেন। এই দুটো শহর থেকে কিছুটা বাইরে। এরপর শহরে এসে আমরা যা যা দেখলাম সেগুলো দেখে নেবেন, সাথে ইন্টারেস্টিং ইনসেক্ট মিউজিয়াম আর মাত্তিলাং এ্যামুউজমেন্ট পার্কও দেখে নিতে পারেন।

আর যদি দুদিন থাকেন তাহলে পরের দিন চেরাপুঞ্জি যাবেন। যাওয়ার পথে দুয়ান সিং সিয়েম ভিউ পয়েন্ট, ওয়াহকবা ফলস, ন¯িœথিয়াং ফলস, নোহকালিকাই ফলস, নংথিমাই ইকো পার্ক, সেভেস সিস্টার ফলস, মাউসমাই কেভ, গ্রীন ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট, থাংক্রাং পার্ক, সা-ই-মিকা পার্ক ইত্যাদি দেখতে পাবেন। চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের দিনটিতে যদি আকাশ পরিস্কার থাকে তাহলে এই দিনটি হতে পারে আপনার জীবনের অন্যতম সেরা ভ্রমণস্মৃতিসমৃদ্ধ।

যদি তিনদিন থাকেন তাহলে তৃতীয় দিন মাফলাং দেখতে যেতে পারেন। শহর থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে। মাফলং খাসি পাহাড়, আদিবাসী গ্রাম, অর্কিড বাগান, প্রজাপতি, বাহারি ফুল আর পবিত্র অরণ্যের জন্য বিখ্যাত। যারা প্রকৃতি পচ্ছন্দ করেন তাদের জন্য মাফলং অবশ্য দ্রষ্টব্য। ফেরার দিন মাউলিনং দেখে তারপর দাউকি বর্ডার দিয়ে দেশে ফিরবেন। মাউলিনং ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। অন্তর্জালের কোনো কোনো সূত্রের তথ্যমতে, পুরো এশিয়াতে নাকি এমন পরিচ্ছন্ন গ্রাম আর দ্বিতীয়টি নেই। সিলেটের তামাবিল থেকে খুব কাছে এই গ্রাম। তাই এ গ্রামটি দেখতে আলাদা কোন দিন নষ্ট করবেন না। ফেরার পথে দেখে নিলেই হলো। আর কী? এবার দিন ঠিক করুন আর ব্যাগ গোছান।

[চেরাপুঞ্জিসহ পুরো মেঘালয়ের ভ্রমণ নিয়ে আসছি আগামি পর্বে। ]

ছবি: 
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন
06/04/2008 - 9:06অপরাহ্ন

মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

কথার যাদু একটা ভ্রমন কাহিনিকে শিল্পোত্তীর্ন সাহিত্যে রূপান্তরিত করতে পারে, আর কবিদের হাতে ভ্রমনকাহিনি যতটা সুস্বাদু হয়, ততটা কথাসাহিত্যিকদের হাতেও হয়ত হয় না!
অসম্ভব ভাল লেগেছে, ভাইয়া, এই সপ্তাহান্তে সচল তার পুরনো রূপ ফিরে পেয়েছে যেন, অনবদ্য লেখার সমাহারে পাঠকের ছুটিকে সার্থক করে তুলেছে।
শুনেছিলাম, শিলং সেই জায়গা যেখানে রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছিলেন 'শেষের কবিতা'র লাবন্যকে। আরও শুনেছিলাম, শিলংয়ে থাকা-খাওয়া-যাওয়ার খরচ অনেক কম, আর যাওয়ার পথেই পড়ে অগণন পাহাড়ি ঝর্ণা! সেই শিলংয়ে যাওয়ার কত যে ইচ্ছে, কিন্তু ঘরকুনো স্বভাবের জন্য কোথাও যাওয়া হয়নি!

ভ্রমণের এই ছোটাছুটি পার্টটা কখনোই ভালো লাগে না।

ঠিক। এর জন্য অবশ্য নিসর্গ দেবীও খানিকটা দায়ী, তার রূপে বিমোহিত ভক্তের আর পা-ই সরে না, এক দৃষ্টিতে শুধু তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়, ভুলে যেতে হয় বিশ্বচরাচরের সবকিছু!

ভ্রমণে এইসব অসাধারণ দৃশ্য দেখলে কাছের মানুষদের কথা খুব মনে পড়ে।

আমার তখন নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হয়, বাসায় রেখে আসা আসা স্বজনদের কথা মনে পড়ে, তারাও যদি দেখতে পেত এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য!
।।।।।।।।।
অনিত্র

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ অনিত্র।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

মুস্তাফিজ এর ছবি

ছবি আমার এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।

...........................
Every Picture Tells a Story

ফালতু প্রোগ্রামার  এর ছবি

আমারো...

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

আমিওতো ছবি দেখতে পাচ্ছি না। কী জটিলতা তাও বুঝতে পারছি না। সামওয়ান হেল্প!

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

মুস্তাফিজ ভাই, ছবি এখন দেখা যাচ্ছে।

মুস্তাফিজ এর ছবি

চমৎকার সব ছবি

...........................
Every Picture Tells a Story

অতিথি লেখক এর ছবি

আমিও ছবি দেখতে পাচ্ছি না। মন খারাপ

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

ছবি এখন কি দেখা যাচ্ছে?।

অতিথি লেখক এর ছবি

এখন দেখা যাচ্ছে। চমৎকার সব ছবি, সেই সাথে অসাধারণ বর্ণনা। সামনের বছর শিলং এ যেতেই হবে।

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

তাহসিন রেজা এর ছবি

চমৎকার লাগল শিলং ভ্রমণ উত্তম জাঝা!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ, তাহসিন রেজা।

ঝিঁ ঝিঁ পোকা এর ছবি

চমৎকার ভ্রমণ বর্ণনা ও ছবি ৷ সাথে রইলাম ৷ উত্তম জাঝা!

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

ধন্যবাদ ঝিঁঝিঁ পোকা। সাথে থাকুন। শীঘ্রই আসছি পরের পর্ব নিয়ে।

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

‌‌ছবিগুলো লেখার শেষে সব একসাথে আবার আসে কেনো?

হাসান মোরশেদ এর ছবি

স্মৃতির শহর, এই শহর ও জানে আমার প্রথম কিছু কিছু হাসি

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

আগামী পর্বে মেঘালয়ের বিস্তারিত থাকবে। সময় পেলে চোখ বুলায়েন ভাই।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আপনার লেখার হাত ভাল, কবিতা এবং ভ্রমন বিষয়ক লেখা ছাড়া অন্যান্য বিষয় নিয়েও তো লিখতে পারেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে মঙ্গোলয়েড অবয়বের অন্য সকল নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা টিবেটো-বার্মান গোত্রের, শুধু খাসিদের ভাষা সাঁওতালদের কাছাকাছি, মন-খেমার গোত্রের। নারী স্বাধীনতায় ওরা তথাকথিত সভ্য জাতিগুলোর চেয়ে বহু যোজন পথ এগিয়ে, ওদের সমাজটা পুরুষতান্ত্রিক নয়, নারীতান্ত্রিক। সিলেটে খুব সামান্য দেখেছি, সুযোগ পেলেই খাসিদের দেখার জন্য চলে যাব মেঘালয়।

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

লিখতেতো মনটা আকুপাকু করেই। সময় পাই না। দারুণ দারুণ কিছু বই পড়ছি। ভাবছি ছোট ছোট করে হলেও রিভিউ লিখবো।

স্পর্শ এর ছবি

মোহনীয় লেখনী। ভালো লাগলো পড়ে।

৪২ ঘন্টার জার্নি করে, মাত্র এক দিনের ভ্রমনটা একটু লস হয়ে গেল না?


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

ধন্যবাদ স্পর্শ। নিজের অনুপস্থিতির কারণে আপনার সাথে অনেক দিন পর সাক্ষাত হলো। ভালো লাগলো।

আর ঐ ৪২ ঘণ্টাও ভ্রমণ, জার্নি নয়। মানে আমার জায়গায় Paul Theroux থাকলে The Great Railway Bazar এর দ্বিতীয় পর্ব নামিয়ে ফেলতে পারতো। দ্বিতীয়ত আমার ভ্রমণ যদিও শিলং এ একদিনের ছিলো কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতে ছিলো ১৪ দিনের। তার মধ্যে মাত্র ১ দিনের গল্প মাত্র শেষ হলো। সময় সুযোগ বুঝে পুরো কাহিনীটা লিখবো।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

শিরোনামটা চমৎকার লেগেছে!

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

ধন্যবাদ। আর শিরেনামের নিচের লাইনগুলো কেমন লাগলো?

তারেক অণু এর ছবি

শিলং শহরে যাবার মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে মনে হয়েছিল এই শহরটাতে থাকা যায়। এমন অনুভূতি সাধারণত হয় না। আবার ঘুরতে যেতে চাই, সম্ভব হলে ঘোর বর্ষায়।

এলিফ্যান্ট ফলস বেশি ওভাররেটেড মনে হয়েছিল।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।