পুশকিন ( শেষ পর্ব)

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৮/০৪/২০১৯ - ১১:১৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সেরা পুশকিন বিশেষজ্ঞ সের্গেই ফোমিচেভের পিছন পিছনে ভল্টের ভারী দরজা দিয়ে প্রবেশ করি। এক তাকের উপর থেকে চামড়ায় মোটা নোটবই নিয়ে তিনি দেখান লেখা ছাড়াও সেখানে নানা মুখ ও ফিগার আঁকা, যা কবি শব্দের আবেশের বসে আঁকিয়ে ছিলেন। বিশেষজ্ঞ ভদ্রলোক পাতা উল্টাতে উল্টাতে তিনি দেখাতে থাকলেন কোন পাতায় ‘জিপসি’ লেখা, কোথায় ‘ওনেজিন’ যেখানে এক কোণে রাজকীয় তাতিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।

সেখানের ১৮টি নোটবইতে কবিতা, বিচ্ছিন্ন স্তবক, নানা রূপরেখায় ভরা। এবং রচনার সবকিছুর পাশেপাশেই তিনি রচনাকালও লিখে রাখতেন। এভাবেই আমরা জানতে পারি ৩৭২ লাইনের দীর্ঘ কবিতা ‘কাউন্ট নুলিন’ তিনি মাত্র ২ দিনে লিখেছিলেন, অথচ তাঁর সমপরিমাণ অনেক কাজেই মাসের পর মাস লাগতো।

পুশকিনের নোটবইগুলো থেকে জানা যায় তাঁর আশা ছিল সেই নিষ্ঠুর নিষ্পেষণের যুগে তিনি কিভাবে মানুষের স্বাধীনতাকে তুলে ধরেছেন। তবে জারের প্রশংসায়ও লেখা কবিতাও প্রকাশ হয়েছিল কবির।

এই ব্যাপারে আধুনিক রাশিয়ান কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কোর সাথে একমত হই আমি, তাঁর মনে, ‘পুশকিন ভুল করতেন বটে, কিন্তু সেগুলো ছিল খাঁটি ভুল। তিনি কোন পা চাটা খয়ের খাঁ ছিলেন না, জারকে অপমান করে হয়ত এক সকালেই জ্বালাময়ী কবিতা লিখতেন, আবার দিনের শেষে একজন মানুষ হিসেবে জারের জন্য করুণাও বোধ করতেন।

লম্বা, দড়ির মত পাকানো দেহের ইয়েভগেনি ( গেনিয়া নামে ডাকলেই খুশী হন), মস্কোর বাহিরেই এক লেখকদের নিবাসে থাকেন। লম্বা হাত নেড়ে নেড়ে, শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে যাই বলছিলেন, তাইই যেন কবিতার মত হয়ে যাচ্ছিল, রাশিয়ানদের কাছে পুশকিন কী, এটা নিয়ে এর মাঝেই প্রায় ৬টা সম্পর্কের কথা বলে ফেললেন, যেমন তিনি পরিবারের সন্তানদের একজন। পুশকিন সেই ক্রশ যা পরার দরকার হয় না, কারণ সেটা চামড়ায় নিচে ইতিমধ্যেই প্রোথিত।

তাঁর তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা স্বাধীন লেখকসঙ্ঘের কথা বলে যাচ্ছিলেন, যা হয়তো সোভিয়েত এজেন্সিকে মুছে দিবে যারা কিনা অনুগত শব্দশ্রমিকদের পুরস্কৃত করে বাকিদের বিস্মৃতির আঁধারে ঠেলে দিত। তাঁর মতে ‘এই প্রথমবারের মত রাশিয়ার ইতিহাসে আমাদের লেখার উপরে কোন সেন্সর নেই। এত দীর্ঘ কাল ধরে আমাদের আত্মায় শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছিল।‘

অনেকের কাছেই পুশকিন এক সাধু সন্ন্যাসী, অনেকের কাছে বড় ভাইয়ের মত। বিখ্যাত ভাস্কর লিওনিড বারানোভ বললেন, ‘বছর দুই আগে পুশকিন আমার স্টুডিওতে আসে, আর এখন অবধি এখানেই আছে।‘ চারিদিকে সব ছাঁচ, প্লাস্টার, ধাতু, এবং বেশক’টা পুশকিন! ‘ তোমরা আমেরিকায় তোমাদের সংবিধান রচয়িতাদের দিকে গর্ব ভরে তাকাতে পারো, আমাদের এমন কেউ ছিল না। পুশকিন সেই বিরল রাশিয়ান, যিনি ছিলেন স্বাধীনতার প্রতিমূর্তি।‘

পুশকিন যদিও স্রেফ টিকে থাকার জন্য করণীয় বিষয় নিয়ে লিখে যান নি কিছুই, যা আজকের রাশিয়ায় বড্ড প্রয়োজন। স্বাধীনতার অর্থ কী যখন দুধ, রুটি, সসেজের মত জীবন বাঁচানো প্রতিদিনকার খাদ্য চড়া দাম দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কিনতে হয়। অ্যালা জিসমানোভা রাশিয়ান জনগণের মনোজগৎ নিয়ে বলেন,’ এটা আমাদের আত্মার এক দুর্লঙ্ঘ রহস্য, শুধু বস্তু দিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট করা যায় না। জনগণ দ্রুতই বুঝতে পারে যে এটা যথেষ্ট নয়, এবং এর পরপরই তারা কবিতার জগতে ফিরে আসে আবারও।‘

এবং যখন তারা এটা করে, তরুণ পদ্যরচয়িতা মারিয়ে স্তেপানোভা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে ওঠেন, ‘প্রতিটি ভালো কবিতাই বেঁচে থাকার এক উত্তম ক্ষেত্র’, সোভিয়েত কবিরা জোরালো এবং সুন্দর সব লেখা লিখে গেছেন, কিন্তু তাদের যথার্থ কোন মানে নেই। আমাদের এখন আদির দিকে ফিরতে হবে, আমাদের ফিরতে হবে পুশকিনের আমলে।

এবার আমাদের মূল গল্পে ফেরা যাক। নির্বাসন থেকে ফেরা কবির বয়স তখন ২৭। মস্কো ও পিটার্সবার্গে সামান্য সময়ের জন্য জনপ্রিয় নাম। কিন্তু তাঁর পাঠকদের নিয়ে স্বয়ং কবির কোন ধারণা ছিল না, তারা তাঁর সৃষ্টির বড্ড ভক্ত ছিল, এবং কবির আরও গভীরে যেতেই চাচ্ছিল।

সমাজ ছিলো অস্থির , লিবারেলরা সন্দেহ করত তিনি জারের কাছে মাথা বেঁচে দিয়েছেন। ত্রিটিকরাও জলদিই তাঁর কবিতা অবজ্ঞা করা শুরু করল। আভিজাত্য খসে পড়ার সাথে সাথে যেন তাঁর কবিতায় হতাশার সুর গেঁথে বসল।

কিছুটা থিতু হবার জন্য বিয়েও করলেন। অন্য অনেককেই এড়িয়ে ১৬ বছরের নাতালিয়া গোনচারোভাকেই তাঁর স্ত্রী হিসেবে উপযুক্ত মনে হল যিনি সুনিতম্ব ও নিটোল বক্ষের অধিকারিণী এক পরমা সুন্দরী ছিলেন, যদিও বুদ্ধিমত্তায় পুশকিনের ধারে কাছেও ছিলেন না।

নাতালিয়ার মায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা পুশকিনের মতই ভাঙাচুরা ছিল, যদিও তিনি কবির কাছ থেকে বিশাল অংকের ঋণ দাবি করে বসলেন। নাতালিয়ার বিবাহমূল্য হিসেবে, এবং বিয়ের গাউনের জন্যও। সোজা কথায় নাতালিয়ার জন্য, সমাজের অনেক তরুণীর মতই, একটা বিক্রয়মূল্য হাকা হয়েছিল।

এই অর্থ সমস্যার সমাধানের জন্য পুশকিন তাঁর বাবার দেওয়া এক সম্পত্তির অংশ , যা মস্কো থেকে ৩০০ মাইল পূর্বে বল্ডিনো নামের জায়গির থাকে। যদিও কবি মুক্তির জয়গান গাইতেন, তাঁর বন্দক রাখা সম্পত্তি হয়ে যায়, ২০০ মানুষের জন্য ৩৮০০০ রুবল ( আজকের দিনে ১লাখ ২০ হাজার ডলার)। বিয়ের জন্য এর অর্ধেক অর্থ পুশকিন দিয়ে দেন। বল্ডীনোর বর্তমান বাসিন্দাদের অনেকেই সেই ভূমিদাসদের বংশধর। কাঠমিস্ত্রি ভাসিলি স্কোভোরোদভ কে যখন জিজ্ঞাসা করলাম যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা এক বিবাহের বলি ছিল এটা নিয়ে সে কী মনে করে, ঘাড় নাড়িয়ে সে জানালো সেটা সেই যুগের এক নিয়ম ছিল, যেমন আমেরিকায় তখন চালু ছিল দাসপ্রথা।

পুশকিনের ভাষায় বল্ডিনো ছিল স্থবির এক জায়গা , কিন্তু সেখানে ১৮৩০এ অবস্থানের মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই ৩০টা কবিতা, ছোট গল্প, এবং ‘মোজার্ট ও স্যালিয়ারি’ নাটক লিখে ফেলেন ( এই নাটক থেকেই হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র অ্যামাডিউস নির্মিত হয়)।

বল্ডিনোর এক পাতাঝরা শরতে কবির মন জুড়ে ছিল কেবল সেন্ট পিটার্সবার্গের সেই বিখ্যার পিটার দ্য গ্রেটের অশ্বারোহী ভাস্কর্য। সম্ভবত তখনই তিনি সর্বোৎকৃষ্ট কবিতাটি লিখেন The Bronze Horseman, যেখানে ইউজনে নামের এক কেরানি নেভা নদীর বন্যায় তাঁর প্রেমিকাকে হারিয়ে দুঃখে প্রায় উম্মাদ হয়ে যায়, রাগে ক্ষোভে এক রাতে সেই নগরীর প্রতিষ্ঠাতার ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে রাগ উগড়ে দিতে থাকেন

Up there
Grat wonder-worker you, beware!

পিটারের ধাতব মুখ যেন অপমানে পুড়ে জীবন্ত হতে থাকল। ইউজেন সারা রাত দৌড়রত অবস্থায় তাঁর পিছনে শুনতে থাকলো-

High upon his charging brute,
The Bronzen Horseman in pursuit.

এর পর থেকে মুখ আড়াল না করে আর তড়িঘড়ি করে না চলে ইউজেন ঐ ভাস্কর্যের সামনে আর যেত না।

পুশকিন এবং নাতালিয়ার বিয়ে হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৩১। কবিকে এই ঘটনায় বেশ সুখী করে তোলে, বন্ধুদের কাছে এটাও জানিয়েছিলেন যে জার তাঁর প্রতি বেশ সদয়, তখন বছর সরকারী ভাতা হিসেবে ৫০০০ রুবল করে পাচ্ছেন তিনি।

কিন্তু তখন আসলে কবি নয়, বরং ১৮ বছরের নাতালিয়াই জারকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। জার পুশকিনকে বেড চেম্বারের একজনে পরিণত করে ফেললেন, যার কাজ ছিল সকল বল নাচ এবং প্রাসাদের অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা। সেই সাথে জারের কথা ছিল যে নাতালিয়া অবশ্যই প্রাসাদের নাচের অনুষ্ঠানে অংশ নিবে।

কবি বেচারা বেশ ঝামেলাতেই পরেছিল মেডেল আটা সব ইউনিফর্ম আর froth ব্যয়বহুল গাউনের ভিড়ে, যখন প্রতিটি পুরুষ চোখ খুঁজে ফিরত নাতালিয়াকে। কবির জীবনীকার আব্রামভিচের মতে সেখানে এমন কোন পুরুষ ছিল না যে নাতালিয়ার প্রেম পড়ে নি। এমনও হয়েছে যে এক অভিজাত লোকের ১৩ বছরের পুত্র এসে নাতালিয়াকে বলেছিল ‘ আমাকে বলতেই হবে যে আমি তোমায় ভালবাসি, কারণ এখনই আমার বিছানায় যাবার সময় হয়ে যাবে।‘

নাতালিয়া এই মনোযোগ উপভোগই করত, এবং প্রতিদানও দিত। তার কাছে দেওয়া পুশকিনের চিঠিগুলো ( যা কিনা পুলিশ আগে পড়ত) অনেকটা ছিল বাবার উপদেশ দেওয়ার মত যে ফষ্টিনষ্টী করা কোন বোধসম্পন্ন কাজ না, আমি চাই তোমার সম্মান স্বাধীন সত্ত্বা, মর্যাদা দেখতে, জারের সাথে বেশি মেলামেশা করবে না।‘

কম্যুনিস্ট লেখকেরা নাতালিয়াকে অভিজাত মহলের দুশ্চরিত্রা সুন্দরী হিসেবে দেখালেও গ্রেগরি পুশকিন , যে কিনা কবি ও নাতালিয়ার বংশধর, এই ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে বলেন নাতালিয়া কোন খারাপ মানুষ ছিলেন না। মা হিসেবে ভালো ছিলেন, তিনি এবং পুশকিন আসলে বেশ সুখীই ছিলেন। ৬ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি ৪ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, এবং এখনের গবেষকরা তাকে বিবাহ বহির্ভূত সন্তানের জন্য দায়ী করেন না।

গ্রেগরি সাথে যখন আমার দেখা হয় তখন তার বয়স ৭৮। তাঁর শব্দের কাছে ঘেঁষা মানে প্রাভদা সংবাদপত্র পড়া, সে জানালো তাঁর ঠাকুরদা উইলে লিখেছিল, ‘কোন সময় কবিতা বা গদ্য লেখার চেষ্টা কর না, তুমি কোনভাবেই আলেক্সান্ডার সের্গেইভিচের চেয়ে ভালো লিখতে পারবে না, , আর যদি তুমি তাঁর চেয়ে খারাপ লিখ, আর মানে তুমি তাঁর নামকে অপমান করছ!”

রাজকীয় কোষাগার থেকে পুশকিনের দেনা বাড়তেই থাকে, প্রথমে ২০ হাজার রুবল, তারপর ৩০ হাজার রুবল। কবির আশা ছিল নতুন লেখাগুলো থেকে এই টাকা জলদিই তিনি শোধ করতে পারবেন। কিন্তু জনগণ এইগুলো এবং বন্ধুদের সাথে বের করা সাহিত্য জার্নাল খুব একটা গ্রহণ করল না।
তারপরেও কবি তাঁর নিজস্ব ধারা বজায় রেখেই চলার চেষ্টা করেছেন, জারকে সন্তুষ্ট করার জন্য বা আমজনতাকে তৃপ্ত করার জন্য লেখার ভঙ্গী বদলান নি। তিনি স্বৈরতন্ত্রের নিন্দা করে একটা কবিতা প্রকাশও করে ফেলেন, যেখানে জার নিকোলাসকে ক্লান্তিতে অথর্ব বলে অভিহিত করে শাসন কাজে একেবারে অনুপস্থিত বলে ঘোষণাও দেন।

মানুষ তাকে বিষণ্ণ, বেদনাক্রান্ত এবং উদ্বিগ্ন দেখত। দুই দুই বার তিনি ডুয়েল লড়তে চেয়ে ছিলেন টনটনে অপমানবোধের কারণে, যদিও কোনটাই তখন গৃহীত হয় নি।

১৮৩৬ সালে জর্জ দ্য অ্যান্থেস নাতালিয়ার অনুগমন করছিল। সে ছিল এক সুদর্শন ফরাসী যে রাশান অশ্বারোহী সৈনিক, এবং ডাচ রাষ্ট্রদূত ব্যারন লুই ভন হেকেরেনের পালকপুত্র। সে নাতালিয়ার প্রতি তার মুগ্ধতা বারংবার প্রকাশ শুরু করে এবং শেষ অবধি জনসম্মুখেই, এবং নাতালিয়াও আর শেষ অবধি তাকে নিয়ন্ত্রেনের চেষ্টা করেন নি। যখন সে নাতালিয়ার দিকে নরম প্রেমের দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে পড়ে এক মাজুরকা নাচতে যায় একসাথে তখন পুশকিন ভারী ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন ।

১৮৩৬ সালের ৪ নভেম্বর পুশকিন ডাক মারফত এক তলব পান যেখানে তাকে ‘অসতীর পতি’ খেতাব দেবার কথা উল্লেখা করা হয়। কে যে সেই চিঠি লিখেছিল সেই নিয়ে এখনো রহস্য কাটে নি। কিন্তু পুশকিন ক্রোধে ফেটে পড়ে জর্জকে ডুয়েল লড়ার আহ্বান জানায়।

এরপর যে সমস্ত ঘটনা ঘটতে থাকলো তা কমেডি অপেরাকেও হার মানায়! ব্যারন লুই ভন হেকেরেন এবং জর্জ দ্য অ্যান্থেস দুইজনেই একটি সমাধান দেন যে সকল গুজবের নিষ্পত্তির জন্য অ্যান্থেস নাতালিয়ার বোন ক্যাথেরিনকে বিয়ে করবেন, অ্যান্থেস তার সাথেও মেলামেশা করতেন, তবে হয়তো নাতালিয়া কাছে ঘেষাড় জন্য এবং এর ফলে পুশকিনও এই সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকবেন। যদিও কবি এতে খুশী হয়েই রাজি হয়েছিলেন, যদিও জানতেন বন্ধুরা এঁকে কাপুরুষোজনিত বলে মনে করবে। সন্মানের মর্যাদা ছিল জীবনের সর্বোচ্চ বিষয়।

১৮৩৭র ১০ জানুয়ারি সেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। পুশকিন সংগতকারণেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন নি। এই সময়ে সামাজিক নানা অনুষ্ঠানের কারণে কবি এবং নব দম্পতি দিনের পর দিন প্রায় এক সাথেই কাটাতে থাকেন। এবং অ্যান্থেস আবারও নাতালিয়ার দিকে হাত বাড়াবার চেষ্টা করে। পুশকিন মৃত্যুদূত এক চিঠিতে অপমানজনক সকল কথা লিখে তাকে কাপুরুষ ও কলংক হিসেবে অভিহিত করেন।

পুশকিনের অনেক বন্ধুই এই ট্রাজেডি ঘটনা এড়াবার জন্য জারকে দায়ী করেছিল এই বলে যে কেন তিনি অ্যান্থেসকে দূরে কোথাও বদলি করে দিচ্ছেন না। আবার অনেকেই মনে করেন গুপ্ত-পুলিশ প্রধান কাউন্দ বেকেণ্ডরফ যেহেতু পুশকিনকে পছন্দ করতেন না, সেও চাইছিল ডুয়েলটা হয়ে যাক।
২৭ জানুয়ারি, বিকেল ৪টার দিকে কবি তাঁর ডুয়েলের সাথী হিসেবে এক স্কুলবন্ধুকে নিয়ে শহরের বাহিরে স্রু কালো নদীর পাশে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে পৌঁছান, জানা ছিল তাঁর ভায়রাভাই অ্যান্থেস সেখানে অপেক্ষায় থাকবে।

সাহায্যকারীরা প্রায় হাঁটু সমান উচ্চতার তুষার পরিষ্কার করে ডুয়েল লড়ার মত জায়গা খুঁড়ে বাহির করে। আঁধার ঘনিয়ে আসার একটু আগেই দুইজন এগোনো শুরু করলো দুইজনের দিকে। যখন তারা পরস্পরের থেকে ১২ কদমেরও কম দূরত্বে তখন অ্যান্থেস প্রথম গুলি করে, পুশকিন পড়ে যান, এক হাত সামান্য উঁচু করেই গুলি ছোড়েন, এবং সেই গুলি অ্যান্থেসকে বিদ্ধ করতে দেখে ‘ব্রাভো’ বলে চিৎকার করে উঠেন। কিন্তু তাঁর নিজের আঘাত ছিল ভয়াবহ।

পুশকিনের মৃত্যুবার্ষিকীতে মানুষেরা ডুয়েলের সেই স্থানে আসে যা একটা অবেলিস্ক দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে, স্থানটি এখন চারপাশের বাসভবন দিয়ে ঘেরা আর রাস্তা ও রেললাইন দিয়ে যেন জোড়া লাগানো।

সেই তুষারাচ্ছন্ন জমিতে তাদের লাইন ধরে যেতে দেখলাম সেই স্মম্ভের দিকে। একজন মহিলা একে একে আটটা লালরঙা স্মরণচিহ্ন সেখানে রাখলো। এক পিতা তাঁর দুই কন্যাকে এনেছিল যারা হাঁটু গেড়ে বসে মোমবাতি জ্বালালো কবির স্মরণে।

কালো শাল জড়িয়ে কোট পড়া এক বৃদ্ধা হাজির হলেন। অবেলিস্কের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বুকে ক্রশ এঁকে একটি গোলাপ রাখলেন বেদিতে। আঁধার ঘনিয়ে আসছিল। রাস্তার দিকে ফেরার সময় পিছন ফিরে দেখি সেই বৃদ্ধা তখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে, পাথরের মূর্তির মত, নিজেই এক মনুমেন্ট হয়ে যেন এক সেইন্টকে সন্মান জানাচ্ছেন।

জার নিকোলাই ক্রুদ্ধ জনতাকে পাত্তাই দিলেন না। তিনি নাতালিয়াকে পেনশনের ব্যবস্থা করে দিয়ে, পুশকিনের যাবতীয় দেনা শোধ করে দিলেন। নাতালিয়া আবারও বিয়ে করে। অন্যদিকে ভ্যান হেকেরেন, এবং অ্যান্থেস ক্যাথেরিন সহ রাশিয়া ছেড়ে চলে যায়।

কবির শবদেহ মিখালোভাস্কায়াড় কাছে এক মনেসট্রিতে নিয়ে যাওয়া হয় শেষকৃত্যের জন্য, জনতার রোষ এড়ানোর জন্য পুলিশ পাহারা ছিল কড়া ভাবে। লাশ হয়েও পুশকিন পুলিশপ্রধান বেকেন্ড্রফকে এড়াতে পারেন নি। কিন্তু তিনি তো কখনোই মারা যান নি।

১ম পর্ব

২য় পর্ব

লেখা- মাইক এডওয়ার্ডস
( ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে ১৯৯২র সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত )


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

চলুক
হতচ্ছাড়া আন্থেস! বিটকেল জার! বেচারা পুশকিন আর তাঁর লেখার গুণমুগ্ধ ভক্তরা!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

তারেক অণু এর ছবি

জার হবে, আর বিটকেল হবে না, তা হবে না, তা হবে না !

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

পুশকিন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হল, সেই সাথে একটা ব্যাপার বেশ দৃষ্টিকটু মনে হল, কারনে অকারনে কমিউনিস্ট আমলকে কটাক্ষ করার চেষ্টা, এর কোন দরকার ছিল না। আপনাকে ধন্যবাদ!

তারেক অণু এর ছবি

এটাই স্বাভাবিক, দিনের শেষে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকও এটা থেকে সহজে বের হতে পারে না। আবার তাদের বলা অনেক কিছুই পরে দেখা গেছে ঠিক হয়েছে, যেমন যে সোভিয়েত দেশে সবার সম্পদ সমান হবার কথা ছিল, সেখানে আজ সবচেয়ে বেশী বিলিওনিয়ার! কোন মন্ত্রবলে যেন?

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

সেখানে আজ সবচেয়ে বেশী বিলিওনিয়ার! কোন মন্ত্রবলে যেন?

কেমনে? স্ট্যালিন তো নাই, পুতিন সাহেবের সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতে হবে।

তারেক অণু এর ছবি

হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ, কার ঘাড়ে কটা মাথা?

অবনীল এর ছবি

অণু ভালো লাগলো সিরিজটা। কবির জীবনের নানা অজানা তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ। তার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো নিয়ে কি প্রতিক্রিয়া লেখার পরিকল্পনা আছে ? ভালো লাগতো পড়তে। ধন্যবাদ শ্রমসাধ্য এই অনূবাদ উপহারদেবার জন্য।

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

কর্ণজয় এর ছবি

অনেকদিন পর একটু সুস্থির হয়ে সেই ফেলা আসা সোভিয়েত আকাশে ঘুরে আসলাম। ভাল লাগলো খুব। একটু বিষন্নও- ইতিহাসের সকল পরিক্রমাই স্বাভাবিক, তবুও সোভিয়েত সেই সময়টার জন্য একটু বিষন্নতা জমা হয়ই কেন জানি-

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।