ইস্কুলবেলার গল্প (২৩)

তুলিরেখা এর ছবি
লিখেছেন তুলিরেখা (তারিখ: শুক্র, ২৪/০৫/২০১৩ - ৫:২৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

"টেঁপি, অরুণিমাকে মনে আছে তোর? " অন্বেষাকে জিজ্ঞেস করি।
এখন আর টেঁপি নামের জন্য বিশেষ রাগ দেখায় না অন্বেষা, মনে হয় এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

সে বলে, "কোন অরুণিমা? জীবনানন্দের? সেই যে, "মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা স্যান্যালের মুখ?" "

"না রে, অরুণিমা দত্ত, আমাদের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়তো স্কুলে। মনে আছে? "

অন্বেষা আমার দিকে তাকায়, মনে করার চেষ্টা করে। তারপরেই মনে পড়ে যায় মনে হয়, সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে, ওর চোখের উপরে জলের পর্দা। আমাকে দেখাতে চায় না।

গতকাল একটা পুরানো গল্পের বই খুঁজে পেয়েছি, অরুণিমা দিয়েছিল আমাকে, তখন আমরা ক্লাস নাইনে। উপহারের পাতায় অরুণিমার হাতের লেখা কয়েকটা কথা, তারপরে নাম সই। কবেকার কথা সব। তারপর থেকেই ভীড় করে আসছে স্মৃতিরা।

অরুণিমা আমাদের সঙ্গে পড়তো, একইসঙ্গে আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাধ্যমিকের কিছু আগে, তখন টেস্ট পরীক্ষাও হয়ে গেছে, মূল পরীক্ষা মাস দুই পরে, তখন অরুণিমা মারা যায় জন্ডিসে। সাধারণ একটা অসুখ কীভাবে জটিলে দাঁড়িয়ে গেল কেজানে! একেবারে হঠাৎই চলে গেল সে। ষোলো বছরের কিশোরী, মাথা ভরা দীর্ঘ, পিঠ ছাপিয়ে পড়া চুল, মুখখানা বৃষ্টিধোয়া স্থলপদ্মের মতন, মালিন্যহীন অথচ কেমন কারুণ্যমাখা। আজও সে সেই বয়সেই দাঁড়িয়ে আছে, সময় তাকে আর ধরতে পারে নি।

অরুণিমার কথা ভাবতে গেলেই স্পষ্ট হয়ে মনে পড়ে ক্লাস সেভেনে এক অতিথি শিক্ষিকার ক্লাস, বিটি টিচার বিপাশা দিদিমণি, তিনি ব্যাকরণের ক্লাস নিচ্ছেন, আগেরদিনের পড়ানোর থেকে জিজ্ঞেস করছেন একে এক ছাত্রীকে দাঁড় করিয়ে। "মধুর" কথাটা একটা বিশেষণ, এর বিশেষ্য কী হবে? কেউ বলতে পারে না, কেউ বলতে পারে না, শেষে অরুণিমা উঠে দাঁড়িয়ে বললো "মাধুর্য"। এতগুলো বছরের এত এত স্মৃতির মধ্যে এই ক্ষণটা কেন যে এত স্পষ্ট হয়ে ধরা রইলো আমার মনের মধ্যে কেজানে! "মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হলো শেষ"---প্রহর এত তাড়াতাড়ি কেন শেষ হয়ে যায়?

আমাদের তখন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতো জানুয়ারি মাসের দুই তারিখে, শেষ হতো ডিসেম্বরে। বাৎসরিক পরীক্ষা হতো পুজোর ছুটির পরে ইস্কুল খুললেই, বেশ অনেকদিন ধরে চলতো পরীক্ষা। তারপরে বেশ কিছুদিন ছুটি থাকতো, তখন দিদিমণিরা খাতা দেখতেন। রেজাল্ট বেরোতো ডিসেম্বরের শেষাশেষি। রেজাল্ট বেরোনোর দিন সবার চাপা টেনশান। যতক্ষণ না ফলাফল নিশ্চিত জানা যাচ্ছে ততক্ষণ টেনশন কমে না কারুর। বেলা বারোটার আগেই অবশ্য সব ফয়সালা হয়ে যায়। যে যার রেজাল্ট নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। তারপরে জানুয়ারীতে নতুন ক্লাস। নতুন বইয়ের গন্ধ। শীতের নরম রোদ্দুরের দিন।

ক্লাস ফাইভে সিক্সে সেভেনে জানুয়ারীটা হালকা হালকা সব ক্লাস, বেশীরভাগ দিনই ছুটি হয়ে যেতো নির্ধারিত সময়ের আগেই, কোনো কোনোদিন টিফিনের আগেই। দিদিমণিদের মিটিং ‌ইত্যাদি থাকলে এরকম সব হঠাৎ ছুটি পাওয়া যেতো। সেসব দিনে মজাও হতো, স্কুলের পুবের দিকের নির্মীয়মান ঘরগুলোর কোনো একটা ক'জন বন্ধু মিলে কিছুটা গল্প টল্প করে তারপরে বাড়ি।

ক্লাস ফাইভে সিক্সে কয়েকদিনের জন্য পড়াতে আসতেন বিটি টিচাররা। আসলে এঁরা ছিলেন বি এড এর ছাত্রী, শিক্ষিকা হবার জন্য ট্রেনিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতেন, যার একটা অংশ হলো স্কুলে সত্যিকারের ক্লাসে পড়ানো। তারপরে পরীক্ষায় পাশ করে এঁরা নিশ্চয় কোনো স্কুলে চাকরি পেতেন। আমাদের সাদামাঠা স্কুলদিনের মধ্যে এঁদের নতুন মুখগুলো বেশ একটা সুন্দর নতুনত্ব তৈরী করতো। যদিও কেউ কেউ অভিযোগ করতো এদের জন্য সময় নষ্ট হচ্ছে, আমাদের রেগুলার সিলেবাস শেষ হতে দেরি হবে বা হয়তো সেটা ঠিকমতন শেষ হবেই না। আবার কেউ কেউ বলতো মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য খুব এমন কিছু ক্ষতি হবে না। আমাদের রেগুলার টিচাররা ঠিকই এই ফাঁকটুকু পুরণ করে ফেলতে পারবেন। আর হতোও তাই।

ইস্কুলের পড়াশোনা তো ছিল একটা সূত্র মাত্র, বেশীটাই তো করতে হতো বাড়িতে হয় নিজেরা নিজেরাই নয় অভিভাবকের কিছু সাহায্য নিয়ে নয়তো প্রাইভেট টিউটরের সাহায্য নিয়ে। পরে ক্লাস নাইনে টেনে তো প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাওয়া প্রায় একরকম আবশ্যিকই হয়ে গেল। একধরনের সামাজিক শর্ত যেন!

এইসব প্রাইভেট টিউটররা বেশিরভাগই স্থানীয় বয়েজ স্কুলের বা গার্লস স্কুলের টিচার ছিলেন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন বিশেষ নামজাদা। এঁরা প্রধানতঃ হয় অঙ্ক করাতেন নয়তো ইংরেজী পড়াতেন। আমাদের সময় জীববিদ্যার একজন শিক্ষকও বিশেষ সফল হয়ে উঠেছিলেন। খুবই চাহিদা ছিল এঁরও। এঁদের বাড়ীতে ব্যাচে ব্যাচে ছাত্র ছাত্রী পড়তো। একেক ব্যাচে প্রায় দশ বারোজন কিংবা তারো বেশী। ছোটোখাটো একেকটা ক্লাস বলা যায়। কেউ কেউ গ্যালারির মতন বসার ব্যবস্থা করে পড়াতেন। এসব ছিলো রীতিমতন সমান্তরাল ব্যবসা।

স্কুলগুলোতে নিয়মিত যেসব পড়াশোনা হওয়ার কথা ছিল, সেসব কিছুই হতো না। বা হলেও নামেমাত্র হতো। কিছু কিছু ব্যতিক্রমী ভালো শিক্ষিকা ছিলেন, তাঁরা কিছুটা যত্ন সহকারে পড়াতেন আর তার বাইরেও ছাত্রীদের সাহায্য করতেন। কিন্তু তাঁরা বিরল। বাকীরা কেউ বিশেষ কেয়ার করতেন না ছাত্রীরা কেউ আদৌ কিছু শিখলো কি শিখলো না তাই নিয়ে।

পাশাপাশি রমরমা হয়ে উঠেছিল এইসব প্রাইভেট টুইশনের ব্যবস্থাগুলো। এর মধ্যে যে একটা নৈতিকতার অভাব আছে সূক্ষ্ম হলেও, সেটা অভিভাবকরা কেউ কেউ লক্ষ্য করলেও না দেখার ভান করতেন। আর ছাত্রছাত্রীদের তো কথাই নেই। স্কুলে ঠিকঠাক পড়াশোনা হবার আশা প্রায় কেউই করতো না। না ছাত্রছাত্রী না তাদের অভিভাবক।

আর এইসব প্রাইভেট টিউটরদের নিজেদের মধ্যেও সূক্ষ্ম রেষারেষি চলতো, কার কাছে বেশী ছাত্রছাত্রী যায়, কার কাছে তত বেশী যায় না, কার ছাত্র বা ছাত্রী পরীক্ষায় কত ভালো করে---এইসব নিয়ে রেষারেষি। আর ছাত্র ছাত্রীরাও ঐসব প্রাইভেট পড়ার সূত্রেই আলাদা আলাদা গ্রুপ হয়ে যায়। অমুক স্যর এর স্টুডেন্ট বা তমুক দিদিমণির স্টুডেন্ট ---এইরকম। কে ভালো সাজেশন দেন, কে ভালো নোটস দেন, এই সব সংবাদ ছড়িয়ে পড়তো ছাত্রছাত্রীদের মুখ মুখে।

তারপরে তো উচ্চমাধ্যমিক স্তরে আরো সাংঘাতিক বেড়ে ওঠে এইসব প্রাইভেট কোচিং এর ব্যাপার, তখন অনেকেই জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্য এক এক সাবজেক্টের জন্য দুই বা তিনজন করে প্রাইভেট টিউটরের কাছে যেতে থাকে। এক পরিচিত মাষ্টারমশায় এর নাম দিয়েছিলেন বুস্টার ডোজ! সে এক ঘোর রমরমা কান্ড।

পরের পর্বে হবে সেই যুদ্ধের কথা।

(চলমান)


মন্তব্য

গুরুত্বহীন এর ছবি

এতো সুন্দর করে লিখেন কিভাবে? পড়লে মনে হয় পুরোটা চোখে দেখতে পাচ্ছি

তুলিরেখা এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
ধন্যবাদ ভাই। আপনার ভালো লেগেছে জেনেই মনটা খুশ হয়ে গেল। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

ষোলো বছরের কিশোরী, মাথা ভরা দীর্ঘ, পিঠ ছাপিয়ে পড়া চুল, মুখখানা বৃষ্টিধোয়া স্থলপদ্মের মতন, মালিন্যহীন অথচ কেমন কারুণ্যমাখা। আজও সে সেই বয়সেই দাঁড়িয়ে আছে, সময় তাকে আর ধরতে পারে নি।

জীবন কী অদ্ভুত তাই না? কাউকে থামিয়ে দেয় আচমকা...অথচ স্মৃতিতে সে বেঁচে থাকে জ্বলজ্বলে।
লেখা ভাল লেগেছে তুলিরেখা।

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

তুলিরেখা এর ছবি

সত্যিই জীবন বড় অদ্ভুত, বড়ই আশ্চর্য। মানুষের স্মৃতিও কম আশ্চর্য ব্যাপার না।
ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

হ্যাঁ, একজন অভিভাবক হিসাবে কোচিং, প্রাইভেট টুইশন ইত্যাদি বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
লেখা ভাল লেগেছে। লেখা চলতে থাকুক। চলুক

তুলিরেখা এর ছবি

প্রাইভেট টুইশন নিয়ে অনেক কথা লেখার আছে, দেখি কবে হয়।
ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

আশালতা এর ছবি

খুব রোদের দিনে আমাদের স্কুলের টিফিনে বিরাট এক ফালা করে তরমুজ খেতে দিত। এই গল্পটা আমি ঢাকার অনেক বাচ্চাকে বলে হিংসেয় নীল করে দিয়েছি। সেদিন মিতিনের স্কুলে গিয়ে দেখি বাচ্চারা সবাই সেরকম করে তরমুজ আর চিনি দেয়া লেবুর সরবত টিফিন খাচ্ছে। দেখে ভীষণ মজা লেগেছে । হাসি
যুদ্ধের গল্পের জন্য পপ্পন নিয়ে বসলাম। পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

----------------
স্বপ্ন হোক শক্তি

তুলিরেখা এর ছবি

আরে তাই নাকি? তরমুজ দিতো? খুব ভালো ইস্কুল তো! হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।