মগের মুল্লুকে রোহিঙ্গা বিলোপের আয়োজন!

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি
লিখেছেন আব্দুল্লাহ এ.এম. [অতিথি] (তারিখ: শুক্র, ০১/০৯/২০১৭ - ৪:৫৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রায়শই আমাদের জন্য বিশেষ গুরুতর হয়ে ওঠে, অতি সম্প্রতি যেমনটি হয়েছে । আমাদের অতি নিকট এই প্রতিবেশীদের সম্পর্কে যেমন আমদের তেমন একটা জানাশোনা নেই, তেমনই জানা নেই এই সঙ্কটের স্বরূপ। আমাদের টক শো গুলোতে খাপছাড়া গোছের কিছু তথ্য এবং মন্তব্য শুনে মেজাজটাও বিগড়ে গেল, তাই এ সম্পর্কে কিছুটা জানার চেষ্টা।

আধুনিক মিয়ানমার সাতটি রিজিওন এবং সাতটি ষ্টেট এ বিভক্ত। রিজিওনগুলি জাতিগত বর্মী সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং ষ্টেটগুলি সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। রাখাইন ষ্টেট মিয়ানমারের এমনি একটি অঞ্চল, যা প্রধানতঃ সংখ্যালঘু রাখাইন নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত। রাখাইন ষ্টেটে আরো একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও বিদ্যমান, যারা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। মিয়ানমারের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় কোটি, আর রাখাইন ষ্টেটের জনসংখ্যা ত্রিশ লক্ষ। রাখাইন ষ্টেটের এই জনমিতিতে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, এই সংখ্যা শুধুমাত্র রাখাইনদের, রোহিঙ্গারা এই হিসাবের অন্তর্ভূক্ত নয়। তাহলে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কত? সরকারীভাবে রাখাইন ষ্টেটে রোহিঙ্গা কেউ নেই, তাই তাদের কোন সংখ্যাও নেই। সরকারী ভাষ্য মতে- রাখাইন ষ্টেটে রোহিঙ্গা বলে কোন কালে কিছু ছিল না, তবে বাংলাদেশে তেমন কিছু থাকলেও থাকতে পারে, বস্তুতঃ পক্ষে বাংলাদেশেরই কিছু লোক ব্রিটিশ আমল থেকে জীবিকার অন্বেষনে রাখাইন ষ্টেটে আগমন করেছে, অবৈধভাবে তাদের কেউ কেউ এখনও রয়ে গেছে, এরা এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় হয়, ততই মঙ্গল। তবে রোহিঙ্গা সূত্রগুলির ভাষ্য মতে তথাকথিত রাখাইন ষ্টেটে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা পনের লক্ষ এবং আরো পনের লক্ষ বাংলাদেশে ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শরনার্থী হিসেবে অবস্থান করছে।

ফিরে দেখা আরাকানঃ
১৯৭৪ সাল পর্যন্ত রাখাইন ষ্টেট এর নাম ছিল আরাকান ডিভিশন। আরাকানের ইতিহাসবেত্তাগন নাকি এর সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস সঠিকভাবে ব্যাক্ত করতে পারেন, এবং বিগত সাড়ে তিন হাজার বছরের রাজবংশ লতিকা নিখুঁতভাবে বর্ননা করতে পারেন। তখন থেকেই নাকি এর নাম "রাখাইন প্রাই"। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার আর্থার ফেয়ার এর মত হলো- বৈদিক যুগে আরাকান অঞ্চলকে বলা হতো রক্ষপুরী, কারন তৎকালীন আর্যদের মতে এখানে যারা বসবাস করতো, তারা ছিল রাক্ষস। সম্ভবতঃ এ অঞ্চল জুড়ে তখনও নেগ্রিটো জনগোষ্ঠী বসবাস করতো, যাদের সুদূর পূর্ব প্রজন্ম এখনকার আন্দামানবাসী, মিয়ানমারেও নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর একটি দল এখনও বসবাস করে। সেই থেকে বৌদ্ধ শ্রমনরাও এ অঞ্চলকে রক্ষপুরী বলে অভিহিত করতো, পালি ভাষায় রচিত প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থে এই নাম পাওয়া গেছে। তো সেই রাক্ষস থেকে রক্ষ>রক্ষইং>রাখাইং>রাখাইন.....। অবশ্য আরাকানীদের মতে রাখাইন শব্দের অর্থ হলো "স্বদেশের প্রতি একনিষ্ঠ"। ইতিহাসের প্রথম পর্যায়ে আরাকান ছিল বৃহত্তর ভারতীয় অঞ্চলেরই একটি অংশ, তখন এর পরিচয় ইন্দো ইউরোপীয়ান সভ্যতা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। আরাকানী উপকথা অনুযায়ী প্রথম দিকের রাজবংশের নাম লক্ষ্যনীয়- মারু, কান্যরাজজ্ঞ, চন্দ্র-সূর্য, এ সময়ের রাজধানীর নাম ধান্যবতী, সময়কাল ৩৩২৮(?) খৃষ্টপূর্ব- ৩২৬ খৃষ্টাব্দ। এর পরের রাজবংশের নাম দেব চন্দ্র, রাজধানী বৈশালী, সময়কাল ৩২৭-১০১৮ খৃষ্টাব্দ। সবই ইন্দো ইউরোপীয় শব্দাবলী, এবং এরা সবাই হিন্দু রাজবংশ। তবে এ সকল উপকথা আরাকানীরা আর কতদিন ধারন করবেন বলা মুশকিল। খৃষ্টীয় দশম সালে প্রথম এ স্থানের অধিকার গ্রহন করে পূর্ব দিক থেকে আসা মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা, তখন থেকেই রাখাইন বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে বলা যায়।

আরাকান থেকে রাখাইন ষ্টেটঃ
আরাকান ষ্টেটের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন ষ্টেট রাখার কারন হলো আরাকান নামটি বিদেশীদের দেয়া(?)। দেখা যাক এ বিষয়ে ইতিহাস কি বলে। গ্রীক লেখক টলেমী তাঁর জিওগ্রাফিয়া গ্রন্থে এ অঞ্চলকে 'Argyre' বলে অভিহিত করেছেন। বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বলেছেন আর্কান। মোগল মানচিত্রে এর নাম আরাকাম, আইন ই আকবরীতে আরকাহাং, মোগল সেনাপতি মির্জা নাথান তার বাহারিস্তান ই গায়েবী তে এ অঞ্চলের নাম বলেছেন আরাখাং, অধীবাসীদের রাখাংগি। ইউরোপীয় বিভিন্ন পরিব্রাজকদের বর্ননায়ও স্থানটির বর্নিত হয়েছে আরাকান কিংবা সমজাতীয় কোন শব্দে। এঁরা সবাই অবশ্য বিদেশী, কিন্তু সেখানের মানুষেরা একে কি নামে ডাকতো? আরাকানের চন্দ্র বংশীয় রাজা আনন্দ চন্দ্রের প্রস্তর ফলকে(৮ম শতাব্দী) এ অঞ্চলকে বলা হয়েছে আরাকাদেশ, যা আরাকানেরই নামান্তর।

ফিরে দেখা মগ ও মগের মুল্লুকঃ
আরাকানীরা একসময় গর্বভরে নিজেদের মগ হিসেবে পরিচয় দিত। গর্বের কারন- তারা নিজেদের বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির পীঠস্থান মগধ থেকে আগত রাজবংশের উত্তরসূরী মনে করতো। আসলে হিন্দু ধর্মের পুনঃ জাগরনের কালে ৮ম শতাব্দীতে মগধ থেকে বৌদ্ধগন বিতারিত হয়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যান, তাদের একটি অংশ আরাকানে এসে ঠাঁই নেয়। এঁরা নৃ-তাত্বিকভাবে মঙ্গোলিয়ান ছিলেন না, ছিলেন ইন্দো ইউরোপীয়ান বা আর্য বংশদ্ভূত। তাদেরই প্ররোচনায় আরাকানে হিন্দু চন্দ্র রাজবংশের পতন ঘটে এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন মঙ্গোলীয় রেসের নতুন বৌদ্ধ রাজবংশ, ফলতঃ নতুন বৌদ্ধ রাজতন্ত্রে এই মাগধী বৌদ্ধরা উচ্চ আসন লাভ করেন, কিন্তু আরাকানে ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার পতন ঘটে, উত্থান ঘটে তিব্বতী-বার্মান ভাষার। কালের পরিক্রমায় স্বল্পসংখ্যক মাগধী বৌদ্ধ বৃহত্তর মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে বিলীন হয়ে যান, কিন্তু সমগ্র আরাকানী বৌদ্ধ সমাজকে তাঁরা মগ কৌলিন্যে অভিষিক্ত করে যান। আরাকানীদের ইতিহাসে শেষ আরাকানী রাজবংশ তথা কিংডম অব মারুক-উ হলো আরাকানীদের স্বর্নযুগ, সময়কাল ১৪৩০-১৭৮৫ খৃষ্টাব্দ। এর মধ্যে ১৫৮২ খৃঃ থেকে ১৬৬৫ খৃঃ হলো সুপার স্বর্নযুগ। দস্যু তস্করের দল যদি ধনবান হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে তাদের দ্বারা অন্য অনেক মানুষের চরম সর্বনাশ হয়েছে। বস্তুতপক্ষে এই সময়কালের মগ রাজারা হার্মাদ(পর্তুজীজ) জলদ্যস্যুদের সহায়তায় নিজেরাও একটি মগ দস্যুবাহিনী গড়ে তুলে মধ্য ও দক্ষিন বাংলায় লুন্ঠন ও দস্যুতার এক অবর্ননীয় নজীর সৃষ্টি করেছিল। বাংলার এ অঞ্চল থেকে সম্পদ ও মানুষ লুন্ঠন করে মগ রাজারা সমৃদ্ধির শিখরে আরোহন করেছিল, আর বাংলার বিস্তীর্ন অঞ্চলকে বিরান ভূমিতে পরিনত করেছিল। বাংলার অসংখ্য নরনারীকে তারা দাস হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল, আর তাদের অধিকৃত চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশালে স্থাপন করেছিল চরম নৈরাজ্যকর মগের মুল্লুক। অবশেষে ১৬৬৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ তাদের সম্পূর্নরুপে দমন করে চট্টগ্রাম অধিকার করলে বাংলায় মগের মুল্লুকের অবসান ঘটে। চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে মগ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পালিয়ে চলে যায় আরাকানে, নিজেদের কলংক আড়াল করার নিমিত্তে তারা এত সাধের মগ নামটি বিসর্জন দিয়ে রাখাইন এবং মারমা নাম গ্রহন করে।

রোহিংগা বলে কি আসলেই কিছু ছিলঃ
মধ্যযুগের আরবীয় ভুগোলবিদ রশীদু উদ্দীনের বয়ান মতে স্থানটির নাম রাহান, ব্রিটিশ পর্যটক রেলফ ফিচ একে বলেছেন রকন, রেনেলের ম্যাপে এটা রাশাওন, ত্রিপুরার রাজবংশের বিবরন মতে এটা রোসাং। মধ্যযুগে আরাকান রাজসভা অলংকৃত করে রেখেছিলেন যে সব বাঙালী কবিরা, তাঁরা এ দেশের নাম বলেছেন রোসাং, রোসাঙ্গো, রোসাঙ্গো সার, রোসাঙ্গো দেশ ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে রোসাং শব্দটি ভালভাবেই ছিল, সুতরাং ছিল রোসাংয়ের বাসিন্দারাও। রোসাংয়ের বাসিন্দারা কি নামে অভিহিত হতে পারেন? রোসিংগা এবং তা থেকে রোহিংগা শব্দটি কি খুবই সম্ভব নয়?

আরাকানে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটলো কি ভাবে, এ বিষয়ে সুধী মহলে দুরকম ভাষ্য প্রচলিত। রোহিঙ্গা তরফে বলা হয়ে থাকে একাদশ শতাব্দী আরব বনিকেরা আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন ও বসবাস শুরু করে। তারা বানিজ্যের সাথে সাথে ইসলাম প্রচারেও ব্রতী হয়, তাদের আনুকুল্যে অনেক সুফি দরবেশও এ অঞ্চলে আগমন করে। এভাবে যেমন চট্টগ্রামে, তেমনি সমুদ্র তীরবর্তী আরাকানেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিস্তার ঘটে। আজকের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সেইসব আরব এবং তাদের দ্বারা ধর্মান্তরিত মুসলমানদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। আরাকানী তরফে ভাষ্য সম্পূর্ন অন্যরকম, তাদের মতে রোহিঙ্গা বলতে কোন কিছু নেই, ১৮২৪ সালে বৃটিশরা বার্মা অধিকার করলে আরাকান সন্নিহিত চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বাঙালীরা জীবিকার অন্বেষনে আরাকানে আসতে থাকে, সেই জনস্রোত এমনকি ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরেও বিচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে। বস্তুতপক্ষে এরা হলো বাঙালী মুসলিম। মগ রাজত্বকালে যে বিপুল সংখ্যক বাঙালিকে দাস হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়ে উভয় পক্ষই আশ্চর্যরকম ভাবে নিরব-রোহিঙ্গা বুদ্ধিজীবিরা কৌলিন্য হারাবার ভয়ে, আর আরাকানীরা নিজেদের দুস্কর্ম প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে। হতভাগ্য সেইসব বাঙালী ব্ন্দীদের সিংহভাগই অবশ্য বিভিন্ন কারনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কিন্তু যারা কোনক্রমে প্রানে রক্ষা পেয়েছে, তারা কোথায় গেল? সত্যনিষ্ঠ হলে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে তারা এখনকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাঝেই বিরাজ করছে।

রোহিঙ্গা নির্মুল প্রকল্পঃ
১৭৮৪ সালে স্বতন্ত্র আরাকান রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বর্মীরা আরাকান দখল করে নেয় এবং তখন থেকে এটি বার্মা বা মিয়ানমারের একটি রাজ্য। বর্মীদের আরাকান দখল নিরপদ্রুপ ছিল না, আরাকানী বৌদ্ধ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে একে রক্ষার চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ ব্যার্থতায় পর্যবাসিত হয়। সে সময় মুসলিম এবং বৌদ্ধ নির্বিশেষে অনেকে আরাকানী পালিয়ে বৃটিশ শাসিত চট্টগ্রামে পালিয়ে আসে, বেশী আসে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। সেখান থেকেও তারা পুনরায় আরাকান মুক্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যার্থ হয়। অবশেষে ১৮২৫ সালে বৃটিশরা বার্মা অধিকার করলে আরাকান বার্মার একটি প্রদেশ হিসেবে বৃটিশ অধিকারভূক্ত হয়। বৃটিশ রাজত্বে নিরাপত্তামূলক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা আবার আরাকানে ফিরে যায়। বৃটিশ শাসনামলে বার্মার সর্বাত্মক উন্নয়নের ফলস্রুতিতে আরাকানের আকিয়াব একটি বড় সমুদ্র বন্দরে পরিনত হয়। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে নাবিক এবং সমুদ্র ও নৌসংক্রান্ত কাজে পটুত্ব লাভ করার কারনে আকিয়াবে তাদের কাজের সুযোগ ঘটে, এসময় অনেক চট্টগ্রামবাসী কাজের সন্ধানে আকিয়াবে গমন করে। আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানী আগ্রাসনের সময় তারা চট্টগ্রামে ফিরে আসে। অবশ্য শুধু চট্টগ্রামের অধিবাসীরাই নয়, সমগ্র বাংলা এমনকি সমগ্র ভারত থেকেই বহু মানুষ ভাগ্যান্বেষনে বার্মায় পারি জমাতে থাকে (শরৎচন্দ্রের "শ্রীকান্ত" স্মরনীয়)। বার্মায় বৃটিশ শাসনের অব্যবহিত পরেই অবশ্য বৃটিশ বিরোধী মনোভাব অঙ্কুরিত হতে থাকে, বৌদ্ধ শ্রমনেরা সাধারন বর্মীদের মধ্যে বৃটিশবিরোধী মনোভাব প্রচার করতে থাকে। ১৯০৬ সালে রেঙ্গুন কলেজের ছাত্ররা ইয়াং মেনস বুদ্ধিষ্ট এ্যাসোসিয়েশন (YMBA) প্রতিষ্ঠা করে, ১৯১৭ সাল থেকে তারা রাজনৈতিক দাবীসমূহ উত্থাপন করতে শুরু করে এবং সংঘের নাম পরিবর্তন করে "জেনারেল কাউন্সিল অব বার্মিজ এ্যাসোসিয়েশন(GCBA) রাখে। GCBA অধিকতর সুসংহতভাবে রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার হতে থাকে, এদের একটি শাখা আবার বিদেশী তথা ভারতীয় খেদাও আন্দোলনের সূচনা করে, যার ফলস্রুতিতে ১৯৩০ সালে রেঙ্গুনে একটি দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এ সময় "দো বা মা(আমদের বর্মী সংগঠন)" নামে আরো একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, এরা নিজেদের থাকিন(মাষ্টার) বলে পরিচয় দিতে থাকে। থাকিনরা অচিরেই প্রবল ভারতীয় বিরোধী প্রচারনার সূচনা করে সারা বর্মায় তা ছড়িয়ে দিতে থাকে। ভারতীয় বিরোধী মনোভাবের এই ঢেউ আরাকানেও এসে পৌঁছায়, এবং দূর্ভাগ্যবশতঃ বংশ পরম্পরায় আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরও ভারতীয় হিসেবে পরিগনিত করা হয়। থাকিনরা ছিল বর্মী বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী, তাদের নেতা অং সান (নোবেল জয়ী অং সান সুকির পিতা) বার্মার স্বাধীনতার লক্ষে বর্মীদের সংগঠিত করতে থাকেন। তিনি আরাকান সফর করে আরাকানী বৌদ্ধদের থাকিন মতাদর্শে আহবান জানান, কিন্তু রোহিঙ্গাদের এর বাইরে রাখেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে অং সান তার সহযোগীদের নিয়ে গোপনে জাপান চলে যান এবং জাপানের সহায়তায় স্বাধীনতা লাভের উদ্দ্যশ্যে সেখানে বার্মীজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মী(BIA) গঠন করেন। জাপানী সেনা সমর্থিত BIA এর প্রথম দলটি নে উইনের নেতৃত্বে ১৯৪২ সালে প্রথম দিকে রেঙ্গুনে প্রবেশ করলে, তার আগেই বিপুল সংখ্যক ভারতীয় বিভিন্ন উপায়ে বার্মা ত্যাগ করতে শুরু করে এবং এদের অধিকাংশ পথেই মারা পড়ে। অচিরেই আকিয়াবেও আক্রমন হলে ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত আকিয়ব ত্যাগ করে। এই পর্যায়ে থাকিনরা আরাকানকে রোহিঙ্গা মুক্ত করার জন্য এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনা আঁটে। প্রাথমিকভাবে তারা নির্দেশ দেয় যে সকল মুসলমানের অবয়ব রাখাইনদের মত নয়, বাঙালীদের মত, তাদের অবিলম্বে আরাকান ত্যাগ করতে হবে। এর পর ১৯৪২ সালের ২৮শে মার্চ BIA এর তত্বাবধানে আরাকানী থাকিনরা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের উপর। গ্রামের পর গ্রাম রোহিঙ্গা ঘর বাড়ীতে আক্রমন চালিয়ে হত্যা করা হয় বহু রোহিঙ্গা মুসলিমকে, আগুন জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয় বসত ভিটা। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে আরাকানের বহু স্থানে সংঘবদ্ধ আক্রমন চালিয়ে হত্যা করা হয় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা নরনারীকে, বহু রোহিঙ্গা সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিরল হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে অং সান জাপানের সহায়তায় স্বাধীনতার লক্ষ্যে BIA গঠন করলে বার্মিজ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী এবং রাখাইনরা তাতে ব্যাপক সাড়া দিয়েছিল, কিন্তু রোহিঙ্গারা সমথর্ন ও সহায়তা দিয়েছিল ইংরেজদের। এই বিষয়টি ইংরেজদের পছন্দ হলেও বার্মিজ এবং রাখাইনদেন চরমভাবে ক্ষুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি লক্ষ করে শেষ দিকে এসে অং সান পক্ষ বদল করেন এবং এন্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রীডম লীগ(AFPFL) নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এ্যালাইড ফোর্সেস তথা ইংরেজদের সমর্থন দেন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার প্রশ্নে অং সানের সংগে ব্রিটিশদের আলোচনা শুরু হয়। বার্মায় বর্মী ছাড়াও শান, কাচিন, চীন, কারেন ইত্যাদি আরও জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে, অং সানকে তাদের সংগে সমঝোতায় আসতে হয়। কিন্তু আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানরা আলাদা কোন জাতি কি না, এ বিষয়ে রাখাইনদের সুস্পষ্ট অভিমত হলো আরাকানের মুসলমানরা হয় আরাকানী, নয়তো বাঙালী, তারা রোহিঙ্গা নয়, সমগ্র বার্মার মুসলমানদেরও একই মত। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গারা আলাদা ভাবে জাতিসত্বার আলোচনায় অংশ নিতে পারে নি। আরাকানের পক্ষে আলোচনায় থাকিনরাই অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, ফলে স্বাধীন বার্মায় আইনসম্মতভাবে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের একটি দল মিঃ জিন্নাহর সাথে দেখা করে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর আরাকানকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করার প্রচেষ্টা গ্রহন করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু অং সান এ বিষয়ে জিন্নাহকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে স্বাধীন বার্মা সকল মুসলমানের প্রতি সাংবিধানিক ভাবে সমতা ও মর্যাদাপূর্ন আচরন করবে। ফলে এ বিষয়ে জিন্না আর কোন আগ্রহ দেখান নি। তবে অং সান মোটামুটি ন্যায্যতার ভিত্তিতেই রোহিঙ্গা ইস্যটি সমাধানের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করেন, কিন্তু বার্মার স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই তাঁর মৃত্য হলে বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমনি আস্থাহীনতার পরিবেশে ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে এবং অং সানের মৃত্যুজনিত কারনে উ নু বার্মার ক্ষমতাভার গ্রহন করেন। ঘটনা নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় যখন ১৯৪৯ সালে কিছু রোহিঙ্গা জনৈক জাফর কাওয়ালের নেতৃত্বে একটি মুজাহিদ দল গঠন করে উত্তর আরাকানের বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন গ্রহন করে। বর্মী সরকার অবধারিত ভাবে বল প্রয়োগের মাধ্যমে মুজাহিদ কান্ডের সমাপ্তি ঘটাতে চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যাপারটা সহজ হয় না। দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলতে থাকে, তবে ধীরে ধীরে মুজাহিদদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরে, তারা নানা রকম অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় এবং রোহিঙ্গাদের আস্থা হারিয়ে ফেলে। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী উ নু ১৯৫৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর এক বেতার ভাষনে রোহিঙ্গাদের একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ঘোষনা করেন এবং সুসংহত বার্মার প্রতি ঐক্যবদ্ধ হতে রোহিঙ্গাদের প্রতি আহবান জানান। রোহিঙ্গারা এই আহবানে মোটামুটি সাড়াও দেয়। স্বাধীন বার্মায় ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা সংসদে নির্বাচিত হতে থাকেন। সেই সাথে আরাকান ষ্টেট গঠনের আলোচনাও মোটামুটি সন্তোষজনক পথেই এগোতে থাকে। দীর্ঘদিন পর একটি শান্তির সুবাতাস বইতে থাকে আরাকানে, রোহিঙ্গাদের মনে জেগে ওঠে আশা। কিন্তু সকল কিছু ভেস্তে যায় ১৯৬২ সালে, যখন জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশে সামরিক আইন জারী করেন।

বার্মা স্বাধীনতা লাভের সময় শান, কারেন, মন, চীন, কাচিন ইত্যাদি জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের জনগন স্ব স্ব জাতির জন্য আলাদ ষ্টেট বা রাজ্য লাভ করে, কিন্তু আরাকান কোন ষ্টেট এর মর্যদা পায় নি। এর কারন রোহিঙ্গারা আরাকানকে একটি আলাদা ষ্টেট ঘোষনার দাবী জানালেও রাখাইনরা পৃথক আরাকান ষ্টেট চায় নি, তার কারন হলো সেই আরাকান ষ্টেটে রোহিঙ্গারা জনবল, শিক্ষা, এবং আর্থিক দিক থেকে রাখাইনদের কাছাকাছি অবস্থানে ছিল, এমতাবস্থায় প্রস্তাবিত আরাকান ষ্টেটে ভবিষ্যতে রাখাইনদের চেয়ে রোহিঙ্গাদের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু গনতান্ত্রিক বার্মায় রোহিঙ্গা সাংসদদের ক্রমাগত দাবীর মুখে এবং ক্ষমতাসীন AFPFL দলের অনুকূল মনোভাবের কারনে সরকার আরাকান ষ্টেট গঠনের দিকেই এগিয়ে যায় এবং এ নিয়ে রাখাইন এবং রোহিঙ্গাদের সাথে আলোচনা সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলে। এমনি পরিস্থিতিতে ১৯৬২ সালের মার্চে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে এবং সংবিধান বাতিল, পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়া, সরকারের নির্বাহী এবং বিচারিক সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, বাক স্বাধীনতা রহিতকরন সহ অনেক গনবিরোধী কার্যকলাপের সাথে সাথে আরাকান ষ্টেট গঠনের প্রকৃয়াও বাতিল করে দেয়।

সামরিক জান্তার নতুন মিশনঃ
নে উইনের সামরিক সরকার দেশে একটি তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন করে, দেশের সকল রাজনৈতিক দল বাতিল করে তারা বার্মা সোসালিষ্ট পার্টি প্রোগ্রাম নামে একটি নতুন সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে। দেশের সকল কার্য নির্বাহের জন্য রেভ্যুলেশনারী কাউন্সিল গঠন করা হয়। আরাকান সমস্যার সমাধানের জন্য এই রেভ্যুলেশনারী কাউন্সিল এক মধ্যযুগীয় নতুন কৌশল অবলম্বন করে, এই কৌশলের সাংকেতিক নাম নাগারনিন। এর আওতায় তারা প্রথমেই দেশের সকল ব্যাংক, বড় শিল্প ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করন করে, আরাকানের ক্ষেত্রে এই কার্যক্রম ছোট বড় সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই করা হয়। বহু দিন ধরে আরাকানের ছোট বড় প্রায় সকল ব্যাবসা কার্যক্রম রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল, সুতরাং এই পদক্ষেপের কারনে রোহিঙ্গাদের আর্থিক অবস্থান ভেঙ্গে পড়ে। কয়েক বছরের মধ্যে আরাকানের আর্থিক ক্ষমতা রোহিঙাদের কাছ থেকে বর্মী এবং নব্য রাখাইন সম্প্রদায়ের কাছে চলে যায়। গনতান্ত্রিক সরকারের সময় বিভিন্ন সরকারী চাকুরিতে যে সকল রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তাদের অনেককে বরখাস্ত করা হয়, অন্যদের জন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, যাতে তারা চাকরী ছাড়তে বাধ্য হয়। নতুন ভূমি বন্দোবস্থ অনুযায়ী কৃষিজমি এবং কৃষিকার্য থেকে রোহিঙ্গাদের অপসারন করা হয়। এইভাবে রোহিঙ্গাদের সার্বিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার পর ১৯৭৮ সালে শুরু করা হয় অপারেশন কিং ড্রাগন অপারেশন। এটা ছিল সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সম্মিলিত সামরিক এবং বেসামরিক সার্বিক আক্রমন। অনেক রোহিঙ্গার মৃত্য হয় এবং অনেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে যায়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এলে বার্মা দাবী করে বাংলাদেশ থকে কিছু বাঙালী নাশকতার উদ্দ্যেশ্যে বার্মায় এসে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে গোপনে অবস্থান করছিল, সরকার একটি আদম সুমারীর আয়োজন করেছে বলে তারা ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে গেছে। জিয়াউর রহমানের তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এই রোহিঙ্গা শরনার্থীদের আগমনে কিঞ্চিত অর্থাগমের সম্ভাবনা এবং কিঞ্চিত আলগা মাতুব্বরি ফলানোর সুযোগ খুঁজে পায়। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংগঠন UNHCR প্রথমে দ্বিধায় ছিল যে এরা আদৌ বার্মিজ রোহিঙ্গা শরনার্থী, নাকি অনুপ্রবেশ কারী বাঙালী। কিন্তু বিধিনিষেধ ও বাধা সত্বেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসল ঘটনা প্রকাশ পায়, বিশেষতঃ প্রখ্যাত সাংবাদিক ফ্রাঙ্কুইস হাউটার এ বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক মহলের টনক নড়ে। আন্তর্জাতিক চাপে বাংলাদেশ ও বার্মার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সংগঠিত হয় এবং সে অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে UNHCR এর নথিভূক্ত তিন লক্ষ শরনার্থীর মধ্যে দুই লক্ষ শরনার্থী আরাকানে ফিরে যায়। ধারনা করা হয় সমপরিমান কিংবা আরও বেশী শরনার্থী বাংলাদেশী সমাজে মিশে যায়। এর পরপরই বার্মার জান্তা সরকার একটি নাগরিকত্ব আইন প্রনয়নের কাজে হাত দেয় এবং ১৯৮২ সালে তা কার্যকর করে। এই আইন অনুযায়ী বার্মায় তিন ধরনের নাগরিক আছে; এক- যে সমস্ত জাতিস্বত্বা ১৮২৩ সালের পূর্ব থেকে বার্মায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, সেই জাতিস্বত্বার সকল মানুষ বার্মার নাগরিক। দুই- যারা ১৮২৩ সালের পর বার্মায় এসেছে, কিন্তু ১৯৪৮ সালের সিটিজেন এ্যাক্ট অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভ করেছে, তারা সহযোগী নাগরিক। তিন- যারা সহযোগী নাগরিকত্ব গ্রহন করতে পারে নি, তারা ন্যাচারালাইজড নাগরিক, নতুন ভাবে আবেদন করে তারা অপেক্ষমান তালিকাভূক্ত হতে পারে। নাগরিকত্ব প্রদানের সকল প্রকৃয়া করেছে কাউন্সিল অব ষ্টেটস, তাদের বিবেচনা অনুযায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির প্রায় সকল মানুষ ১৮২৩ সালের পরে বার্মায় আগমন করেছে, সুতরাং রোহিঙ্গা যেমন কোন জাতিস্বত্বা নয়, এরা বার্মার নাগরিকও নয়। কেউ একজন বার্মার নাগরিক না হলে সে কোন রকম নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারবে না, কোন স্থাবর সম্পদের মালিক হতে পারবে না, সরকারী চাকুরীর জন্য আবেদন করতে পারবে না, কোন রকম ব্যাবসা পরিচালনা করতে পারবে না, উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পারবে না, কতৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত এলাকার বাইরে যেতে পারবে না, এমনকি বিয়ে করতে হলেও কতৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে, এবং সে অনুমতি লাভের সম্ভাবনা খুবই কম।

১৯৮৮ সালে স্বাধীন বার্মার রুপকার অং সানের কন্যা অং সান সুকি দেশে এসে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক লীগ নামে নতুন দল গঠন করেন। গনতন্ত্রের দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে বার্মার ছাত্র সমাজ এবং জনগন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে নে উইনের পতন ঘটে, এবং অবশেষে ১৯৯০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সু কির দল বিপুল বিজয় অর্জন করলেও জান্তা নির্বাচন বাতিল করে দেয়, ধরপাকর এবং ব্যাপক নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করতেও সক্ষম হয়। জনগনের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য প্রথমে বাংলাদেশে একটা ছোট্ট সামরিক অভিযান চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু বিডিআর এবং সেনা সদস্য হত্যা ও অপহরন করা হয়। বর্মী সরকারের অভিযোগ- বাংলাদেশ বর্মী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিচ্ছে। এরপর পূর্বতন কায়দায় আবার রোহিঙ্গাদের উপর অভিযান চালিয়ে তাদের ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ১৯৯২ সালে এপ্রিল নাগাদ বাংলাদেশে UNHCR এর হিসাব অনুয়ায়ী তিন লক্ষাধীক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রবেশ করে। তখন খালেদার সরকার আবার কিছু অর্থাগমের উপলক্ষ্য খুঁজে পায়, সংগে যুক্ত হয় নতুন দানব "জামায়াতে ইসলামী"। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সাম্প্রদায়িক অর্থ নিয়ে এসে কিছু রোহিঙ্গাকে নতুন ধরনের দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের ধান্ধা শুরু করে এই পরনো পাপীরা। এর মধ্যেই আবার আলোচনা ও দেন দরবার শুরু হয়, কিন্তু রোহিঙ্গারা এবার বার্মায় UNHCR এর সরাসরি তত্বাবধান ছাড়া ফিরে যেতে অস্বীকার করে। বর্মী নাগরিকত্ব আইনের সকল বিষয় মেনে নিয়ে UNHCR আরাকানে তাদের কিছু কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি লাভ করে এবং নানা আলোচনার পর অধিকাংশ তালিকাভূক্ত রোহিঙ্গা বার্মায় ফিরে যায়, কিন্তু অনেকে ফিরে যেতে অস্বীকার করে। সুতরাং ১৯৯২ সালে বৈধ এবং অবৈধভাবে যে সকল রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের অধিকাংশই আর ফেরত যায় নি।

এই আলোচনায় কয়েকটি বিষয় ফুটে উঠেছে, তা হলো-
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রায় হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে আরাকানে বেড়ে উঠেছে, কিন্তু স্থানীয় রাখাইনদের সাথে এই সময়কালে তারা একটি প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, সমগ্র বার্মায় প্রায় সত্তর লক্ষ মুসলমান নাগরিক আছে, অন্য সবাই স্ব স্ব ষ্টেটের জনগোষ্ঠীর মাঝে মিশে যেতে পারলেও রোহিঙ্গারা তা পারে নি। উদার বর্মী বুদ্ধিজীবিগন রোহিঙ্গাদের পৃথক জাতিস্বত্বা স্বীকার করলেও একটি রক্ষনশীল বর্মী ও আরাকানী গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের পৃথক জাতিস্বত্তা জোর করে অস্বীকার করতে চায়। প্রধানতঃ আরাকানী বৌদ্ধ শ্রমনেরা রোহিঙ্গাদের জাতিগত এবং সংখ্যাগত উত্থানে আশঙ্কাগ্রস্থ, রোহিঙ্গাদের দ্রুত জন্মহার তাদের মধ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিনত হয়ে যাবার আশংকার জন্ম দিয়েছিল। গনতান্ত্রিক অবস্থায় রোহিঙ্গাদের ন্যায়সংগত অধিকার লাভের সম্ভাবনা দেখা দেয়, কিন্তু সামরিক জান্তা বৌদ্ধ শ্রমনদের সমর্থন নিজেদের অনুকূলে রাখার জন্য মধ্যযুগীয় পন্থায় রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে সচেষ্ট। সামরিক জান্তা তাদের দীর্ঘমেয়াদী নাগারনিন কার্যক্রমে মোটামুটি সাফল্য লাভ করেছে, সমৃদ্ধ রোহিঙ্গা জাতিকে একটি হীনবল গোষ্ঠীতে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে, এখন ক্রমাগত উৎপীড়নের মাধ্যমে তাদের বাস্তুচ্যুত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে পারলে উদ্দ্যেশ্য পুরোপুরি সফল হয়। আপাতদৃষ্টিতে এ উদ্দ্যেশ সফল হবার নয়, কিন্তু চেষ্টা করত দোষ কি? বিশেষতঃ বাংলাদেশে যখন তাদের প্রতি একটা সহানুভূতিশীল জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারা এদের গ্রহন করার জন্য উপযুক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল এবং জাতিসংঘের আচরণ অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক; সাইপ্রাস, পূর্ব তিমুর, দক্ষিন সুদানের ব্যাপারে তাদের যে উদ্যোগ, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান ঠিক তার বিপরীত। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ইতিহাস আন্তর্জাতিক মহলের অজানা থাকার কথা নয়, কিন্তু UNHCR বার্মী সামরিক সরকারের নাগরিকত্ব আইন মেনে নিয়ে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রকৃয়া চালানোয় এটা ধরে নেয়া যায় প্রকারান্তরে তারা রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে অং সান সুকি মিয়ানমারের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে অনেকেই রোহিঙ্গাদের ভাগ্যোন্নয়নের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু সে সে আশার গুড়ে বালি পড়তে খুব একটা সময় লাগে নি। সুকি ক্ষমতায় আরোহণের জন্য গনতন্ত্রকামী নেত্রী, শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেলেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তিনি আর যাই হোন, মানবতাবাদী নেত্রী নন।


মন্তব্য

মন মাঝি এর ছবি

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তিনি আর যাই হোন, মানবতাবাদী নেত্রী নন।

যাবে না কেন, যায় বৈকি! স্রেফ 'ম'-টাকে '' দিয়ে বদলে দিন। তাহলেই হবে!

শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেলেও

এখন বোঝা যাচ্ছে নোবেল কমিটি ভুল করে ভেড়ার চামড়া গায়ে লাগানো একটা ওয়্যারউলফকে পুরষ্কারটা দিয়ে দিয়েছে।

****************************************

মন মাঝি এর ছবি

রূপকথার পিশচপুরী বা রাক্ষসরাজ্যের সাথে বাস্তব দুনিয়ার "মগের মুল্লুক"-এর তফাৎ কি বুঝতে পারছি না কিছুতেই!

****************************************

মন মাঝি এর ছবি

আপনার এই লেখাটার মালমশলা ইংরেজিতে পাওয়া যাবে কোথাও?

****************************************

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

মালমসলার প্রায় সবই তো ইংলিশে। আমার মূল লেখাটা বেশ খানিকটা আগের, তখন যে সকল বই ও জার্নাল ব্যবহার করেছিলাম তার কয়েকটির তালিকা নীচে দিয়েছি। আর ওয়েব সোর্সগুলোর রেফারেন্স এখন আর কাছে নেই, হয়ত সেসব আর সেভাবে কার্যকরও নেই। তবে ওয়েবে বর্তমানেও প্রচুর মালমসলা বিদ্যমান।

ইয়ামেন এর ছবি

তথ্যবহুল লেখা, ভাই। এই জন্য ধন্যবাদ। আরো ভালো হবে আপনি যদি কিছু আপনার রেফারেন্সগুলো যোগ করে দিতে পারেন লেখার শেষে। তাহলে আমার মত আরা আরো বিস্তারিত পড়তে/জানতে ইচ্ছুক, তাদের সুবিধা হতো।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

লেখার সিংহভাগই অনেক আগের, তখন যেসব ওয়েব সোর্স ব্যবহার করেছিলাম তা আর সংরক্ষন করা হয় নি। কিছু বইপত্র এবং জার্নালের তালিকা আছে যা এ লেখায় কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল, তার তালিকা দেয়া গেল।

* MRAUK-U by Tun Shwe Khine
* Rise of MRAUK-U by Unknown Writer
* Portuguese in Bengal by JJA Campos
* Recism to Rohingya in Burma by Dr. ABid Bahar
* Rohingya- Missing Links in Arakan History by Satyendra Nath Ghoshal
* The Situation Of Rohingyas In Arakan-Burma(Myanmar)- A journal by Burmese Rohingya Association in Japan( BRAJ)
* About Araka and Rohingya- A journal by Noor Kamal, General Secretary, Arakan Historical Society (A.H.S),
* Elephant, Slaves and Rubies- by Dr. Jacques P. Leider
* SOAS Bulletin of Burma Research

সোহেল ইমাম এর ছবি

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস এতোটা জানা ছিলোনা।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবাই কি মুসলমান, নাকি অন্য ধর্মের অনুসারীও কিছু আছে?

আব্দুল্লাহ ভাই লেখাটা ভালো হয়েছে।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মন মাঝি এর ছবি

এখানে দেখতে পারেনঃ http://bdnews24.com/bangladesh/2017/09/04/over-500-hindus-reportedly-flee-myanmar-violence-into-bangladesh

****************************************

সোহেল ইমাম এর ছবি

ধন্যবাদ লিংকটার জন্য।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মন মাঝি এর ছবি

১। অশান্তির অপদেবী অং সান সুকি-র শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার বাজে রসিকতাটা প্রত্যাহার করে নেয়ার দাবী উঠছে ইতিমধ্যেইঃ Take away Aung San Suu Kyi’s Nobel peace prize. She no longer deserves it

২। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত উপরে উল্লেখিত লেখাটা থেকেই একটা পাঠক মন্তব্যের অংশ বিশেষ উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। এই মন্তব্যের বক্তব্য শুধু সুকি-ই না, এমন আরও অনেক তথাকথিত পশ্চিমা লিবারেল মূল্যবোধ বা রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন বা হিরো-হিরোইন হিসেবে উপস্থাপিত পশ্চিমা পুঁজি, বিশ্ব-রাজনীতি, স্বার্থ আর তাদের মিডিয়া সৃষ্ট চুনকাম করা বহু কাকতাড়ুয়া শিখণ্ডীর ক্ষেত্রেই দারুনভাবে প্রযোজ্যঃ

She was not, or never should have been, an inspiration…. those figures held aloft or otherwise deployed by Western interests as heroic figures of liberal values are almost always, perhaps even necessarily, compromised consciously or unconsciously by complicity with the most rapacious interests of Western capital. Liu Xiaobo, who was so maniacally devoted to Western apologetics that he sought to justify American atrocities in Vietnam, Cambodia and Laos, would also fit that pattern.

সুকি, লিউ শিয়াবো, মহম্মদ ইউনুস, এই তালিকার যেন কোন শেষ নাই...... পুরনো আপ্তবাক্যটাই খালি বারবার মনে পড়ে তাই -- "চকচক করিলেই সোনা হয় না!"। নতুন একটা আপ্তবাক্যও আমরা চালু করতে পারি এখন --

নোবেল পুরষ্কার দিলেই মানুষ হয় না!

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

১। লেখাটা হঠাৎ করে শেষ করে দিলেন। পটভূমির পর আজকের অবস্থা পর্যন্ত কী করে আসলো সেটা বলুন। সেখানে মায়ানমার সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো, আরাকানী দলগুলো, কাছের অন্যন্য জাতিগোষ্ঠীগুলো এবং বাংলাদেশের সরকারগুলোর ভূমিকা নিয়ে বলুন। প্রয়োজনে আরেকটি পর্ব লিখুন।

২। 'রোহিঙ্গা'দের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়টা আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়। সম্ভব হলে এই সম্পর্কে কিছু জানান। অবশ্য কেউ ইন্দো-অ্যারিয়ান হলেই সে মায়ানমারের নাগরিক হতে পারবে না, এটা কোন যুক্তি হতে পারে না।

৩। আরাকানী গ্রুপগুলো গত প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশে যে সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গী তৎপরতার সাথে যুক্ত (এর সাথে অস্ত্র আর মাদক ব্যবসা তো আছেই) সে সম্পর্কে বলুন। ডঃ আবুল বারাকাতের "মৌলবাদের অর্থনীতি" বইটার শেষে যে জঙ্গী গ্রুপগুলোর নামের তালিকা আছে সেখানে অনেকগুলো আরাকানী গ্রুপের নাম আছে।

৪। আরাকানীদের ব্যাপারে অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর (যথা কাচিন, কারেন, শান, চিন ইত্যাদি) অবস্থান কী? বিশেষত তাদের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর অবস্থান কী?

একটা প্রশ্ন। পুশ-ইন করা বা পালিয়ে আসা লোকগুলোকে আমরা 'রোহিঙ্গা' বলছি কেন? কেন আমরা তাদেরকে 'মায়ানমারের নাগরিক' বা 'বার্মীজ' বা 'বর্মী' বলছি না? রাজনৈতিক পরিভাষায় সেটাই কি সঠিক হতো না? অন্তত বিশ্ব দরবারে আমরা যখন এটা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলবো তখন তাদেরকে মায়ানমারের নাগরিক বলাটাই তো উচিত।

ব্যাপক খাটাখাটুনি করে লেখার জন্য ধন্যবাদ আবদুল্লাহ্‌ ভাই!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

স্বীকার করে নেয়া ভাল যে এটা একটা ফাঁকিবাজি পোষ্ট। এর অধিকাংশই বেশ কিছু আগে লেখা হয়েছিল, তাই অতি সাম্প্রতিক কোন বিষয় এতে নেই। তবে অতি সাম্প্রতিক বিষয়াবলী মোটামুটি সবাই কমবেশি জানেন, এটা ধরে নিয়েই এই পোষ্ট দেয়া হয়েছে, যাতে করে যাদের প্রয়োজন তাঁরা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটা ধারনা পেতে পারেন।

রোহিঙ্গা'দের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন তত্ত্ব আমি উদ্ধার করতে পারি নি। রোহিঙ্গা তরফের এবং তাঁদের প্রতি সহানুভুতিশীল বাংলাদেশী পণ্ডিতদের প্রায় সকলেরই অভিমত হল নৃতাত্ত্বিক রোহিঙ্গারা আরব বংশোদ্ভূত অতি সম্ভ্রান্ত একটি জাতি। আমার ব্যাক্তিগত ধারনা এবং অভিমত হল চট্টগ্রামের বাঙ্গালী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ফিজিক্যাল নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে একই জিনিস। এক সময় এঁরা সবাই ছিলেন রোসাং রাজ্যের অধিবাসী, পরবর্তীতে একদল চাটগাঁইয়া, অন্যরা রোসাইঙ্গা, রোহাইংগা বা রোহিঙ্গা। দক্ষিণ কক্সবাজারের বাঙ্গালী এবং রোহিঙ্গা'দের মুখের ভাষাও প্রায় একই রকম।

আরাকানি বিভিন্ন গ্রুপের জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড, চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচর্যা, ইয়াবা এবং অন্যান্য দ্রব্যাদির চোরাচালান, এবং অন্যান্য সামাজিক দূষণ সম্পর্কেও সবাই কমবেশি অবগত আছেন। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা সময়ের দাবী। চেষ্টা করবো এ নিয়ে একটি পোষ্ট দিতে, আপনাকেও অনুরোধ জানাবো এ বিষয়ে কিছু লিখতে।

এ ব্যাপারে আপনার সাথে একমত যে, রোহিঙ্গা'দের বর্মী বলে অভিহিত করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত, বড়জোর বর্মী রোহিঙ্গা। কিন্তু যে কারনে বার্মার অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে কারেন, কাচিন, শান ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করা হয়, সেই কারনেই বোধ হয় তাঁদের রোহিঙ্গা বলা হয়ে আসছে, সাথে মুসলিম শব্দটি যোগ করে তাতে প্যান ইসলামিজমের একটা ফ্লেভার দেয়ার চেষ্টা হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

রোহিঙ্গা তরফের এবং তাঁদের প্রতি সহানুভুতিশীল বাংলাদেশী পণ্ডিতদের প্রায় সকলেরই অভিমত হল নৃতাত্ত্বিক রোহিঙ্গারা আরব বংশোদ্ভূত অতি সম্ভ্রান্ত একটি জাতি।

অর্থাৎ আরব বংশোদ্ভূত = সম্ভ্রান্ত?

তাহলে তো রোহিঙ্গাদের উচিৎ দারিদ্র্য এবং জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশের পরিবর্তে সৌদি আরব/কুয়েত/কাতারের মত দেশে অ্যাসাইলাম ক্লেইম করা! তখন বোঝা যাবে কে কতটুকু আরব বংশোদ্ভূত!

Emran

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

এ ব্যাপারে সৌদি আরবের এক ধরনের "ঢাক ঢাক গুড় গুড়" অবস্থান আছে। সেখানে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে কয়েকলাখ রোহিঙ্গা গিয়ে আর ফেরত আসে নাই। মক্কা মদিনা জেদ্দায় তারা বেশ বড় কলোনি বানিয়ে অবস্থান করে। তাদের বহিস্কারের ব্যাপারে সিরিয়াস কোন উদ্যোগ নেয়া হয় না, কিন্তু তারা কোন আকাম করলেই(সেটা প্রায়শই করা হয়ে থাকে) তা নিয়ে বাংলাদেশকে ঝাড়ি মারা হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

১৯৭৮ সালের বাংলাদেশী পত্রপত্রিকার কিছু দেখার সুযোগ হলো। সেখানে (ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বাংলাদেশ অবজারভার) পালিয়ে আসা লোকজনকে 'বর্মী' বা 'বর্মী মুসলমান' বলে অভিহিত করা হয়েছে। বর্মী নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যারা এদের ওপর হামলা চালিয়েছিল তাদেরকে 'মং' বলে অভিহিত করা হয়েছে। এপ্রিল-মে মাসে বিপুল সংখ্যক বর্মী মুসলিমকে হত্যা করে নাফ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। পালিয়ে আসা লোকজনের মুখে আরাকানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও গণহারে ধর্ষণের কথা জানা যায়। এই 'বর্মীরা' বা 'বর্মী মুসলমানেরা' কবে থেকে এবং কী করে বাংলাদেশের মিডিয়ায় ও প্রশাসনের কাছে 'রোহিঙ্গা' হয়ে গেলো সেটা খুঁজে বের করা দরকার।

বস্তুত প্রথম থেকেই আরাকানের মুসলিম নারীরা কখনো বিচ্ছিন্নভাবে এবং কখনো ব্যাপকহারে ধর্ষণের শিকার হয়ে আসছে। দুনিয়ার অনেক দেশেই সংখ্যালঘু নারীরা নিয়মিত ও অধিক হারে যৌন নিপীড়ন ও যৌন হয়রানীর শিকার হয়ে থাকেন। কিন্তু মায়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী ও স্থানীয় মং/রাখাইনদের দ্বারা আরাকানের মুসলিম নারীদের ধর্ষণের ব্যাপারটি ঐ প্যাটার্নে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু দিন পর পর যখনই কোন না কোন ছুতোয় আরাকনের মুসলিমদের ওপর হামলা হয়, তখনই ব্যাপক হারে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই ব্যাপারটি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ উচ্চবাচ্য বা ব্যাপারটিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত ও মোকাবেলার কথা শুনতে পাইনি।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সোহেল ইমাম এর ছবি

পাণ্ডবদা, বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত একটা লেখা দেন।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সুমাদ্রী এর ছবি

<রোহিঙ্গা>'রা চট্টগ্রাম-এর মানুষ না অধুনা 'চট্টগ্রাম' মূলতঃ বৃহত্তর আরাকানের একটা ক্ষুদ্র অংশ সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। বিভিন্ন সূত্রে পড়েছি 'ফেনী' নদী পর্যন্তই ছিল 'আরাকান'-এর সীমানা। দক্ষিণ চট্টগ্রাম এর অনেক জায়গার নাম এখনও 'রাখাইন'/'মগ' নাম [ চিরিঙ্গা, হারবাং, হ্ণীলা, কুতুপালং ইত্যাদি ]; চট্টগ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় এখনও এক বিশেষ দেবীর উদ্দেশ্যে পূজা করে থাকে যার নাম 'মগদেশ্বরী'। তবে রোহিঙ্গা <মুসলমান>-দের নিজেদের মধ্যে যে 'পরিচয় সংকট' আছে তা বলা বাহুল্য, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মাঝে হিন্দু-বৌদ্ধও আছে যাদের সংখ্যা খুবই কম। মূলতঃ এদের মাতৃভাষা যা সেটি চট্টগ্রামের ভাষাই, 'ইসলামিকরণের' ফলে তারা বেশ কিছু উর্দু-আরবী শব্দ করে এই যা [ সরকার=হুকুমত; জাতি=কওম ইত্যাদি]। এখানেই ব্যাপারটা আমার কাছে গোলমেলে মনে হয়। <রোহিঙ্গা>-রা যদি শতশত বছর ধরে [ অষ্টম শতকে আরবীয় জাহাজডুবি এবং 'রহম-রহম' কাহিনি উল্লেখ্য] সেখানে বসবাস করে থাকে তবে তাদের ভাষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতো [ চর্যাপদ-এর বাংলা আর আধুনিক বাংলা যেমন আলাদা ]। কিন্তু একজন 'এথনিক' চাটগাঁইয়া হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণে এই অসংগতিটা বেশ ধরা পড়ে। আমার মনে হয় এটা খুব সম্ভব যে বৃটিশ বা তৎপরবর্তী পিরিয়ডে প্রচুর দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ আরাকানে গিয়ে বসবাস করা শুরু করে এবং তাদের ভীড়ে মিশে যায় বংশপরম্পরায় সেখানে বাস করতে থাকা ইন্দো-আর্য্য জনগোষ্ঠী। ভারতীয় হিসেবে যারা ব্রহ্মদেশ[বার্মা]-এ কাজ করতে বা ব্যবসা করতে যেত সন্দেহ নেই তাদের সিংহভাগই ছিল বাংলা অঞ্চলের মানুষ বা আরও বিশেষভাবে বলতে গেলে 'চট্টগ্রাম' এর মানুষ। 'রেঙ্গুন' এ চালের ব্যবসা, কাঠের ব্যবসা, স্বর্ণালঙ্গারের ব্যবসায় এদের একচেটিয়া দখল ছিল। সেখানে এখনও আছে 'চট্টল বুড্ডিস্ট এসোসিয়েশান'; লেখক-বুদ্ধিজীবি সলিমুল্লাহ খানের আত্মীয়-পরিজনদের বিরাট অংশ এখনও ওখানেই থাকেন। প্রপিতামহ দীর্ঘকাল রেঙ্গুন অঞ্চলে ছিলেন, চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িগুলো প্রায়ই এই কিছুদিন আগ পর্যন্তই ছিল মাটির তৈরী আর তার 'বিম'গুলোকে আমরা জানতাম বার্মা থেকে আসা। কে কাকে দখল করে, কে কার ভাগে হাত দিয়েছে জানি না, বার্মার অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে অনেক 'মুসলমান' বাস করেন এবং তাদেরও অনেকেই মূলতঃ চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলে থাকে। <রোহিঙ্গা> হিন্দুদের মতো এরাও 'ভারতীয়' হিসেবে পরিচিত বার্মায় এবং বার্মায় এদের নিয়ে কোন বড় দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায় না, কিন্তু <রোহিঙ্গা> মুসলমানদের ব্যাপারে সমগ্র বার্মায় যে ধরনের বিদ্বেষ দেখা যায় সেটা খুব আশ্চর্য্যজনক। <রোহিঙ্গা>-দের নিজস্ব ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চাওয়া,'জিহাদ' প্রীতি, একাধিক বিয়ে-অধিকতর সন্তান জন্মদান প্রকল্পের মাধ্যমে 'কিছু' একটার স্বপ্ন দেখা, এবং সর্বোপরি 'রাখাইন' জনগোষ্ঠীর সাথে সংঘর্ষ-বিবাদ-'ধর্ষণ' এ লিপ্ত হওয়া এসবের কারণেই হয়ত সমগ্র বার্মায় <রোহিঙ্গা> খেদাও কর্মসূচীতে বর্মীদেরও এক ধরণের মৌন সম্মতি দেখা যায়।

https://www.youtube.com/watch?v=g1xrk89bjIw

https://www.youtube.com/watch?v=k0dUIDs7tFo

অন্ধকার এসে বিশ্বচরাচর ঢেকে দেওয়ার পরেই
আমি দেখতে পাই একটি দুটি তিনটি তারা জ্বলছে আকাশে।।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিমরা মিয়ানমারে বসবাসরত সাধারন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মতই বিবেচিত হয়েছিল। গত শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের বিভিন্ন সময়ে ভারতীয়বিরোধী দাঙ্গাগুলো সহ্য করে যারা টিকে থাকতে পেরেছিল, তারা এখন মোটামুটিভাবে নিরপদ্রুপ রয়ে গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারটা আলাদা-

১। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে বার্মার সকলেই যখন জাপানের পক্ষে যোগ দিয়ে দখলদারী ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান গ্রহন করেছিল, রোহিঙ্গারা তখন ব্রিটিশ পক্ষে যোগ দিয়েছিল। বার্মানদের কাছে রোহিঙ্গাদের এই আচরণ ছিল স্বাধীনতা বিরোধিতার সমতুল্য।
২। বার্মার স্বাধীনতাকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীনতা বলে মনে করে নি, তারা পাকিস্তানে অঙ্গীভূত হতে চেয়েছিল।
৩। বার্মার স্বাধীনতার পর রোহিঙ্গারা পৃথক একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র মুজাহিদ দল গঠন করে বেশ কিছু অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল।
৪। এসব কর্মকান্ডের মাঝে আরাকান বা রাখাইন ষ্টেটের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সাথেও রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক অত্যন্ত বিরুপ অবস্থায় উপনীত হয়েছিল।
৫। দীর্ঘদিন ধরে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মাঝে মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের ইসলাম প্রচারের কার্যক্রম বৌদ্ধ শ্রমণদের অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল।
৬। সর্বোপরি আরাকানী বৌদ্ধদের তুলনায় রোহিঙ্গাদের জন্মহার অত্যন্ত বেশী হওয়ায় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী কালের বিবর্তনে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় উপনীত হয়েছিল।

ফলে বার্মিজ সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা বিরোধী কার্যক্রমে স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কোনরকম সহানুভূতি তো তারা পায়ই নি, বরং রাখাইন ষ্টেটের বৌদ্ধ শ্রমণেরা এ ব্যাপারে সেনাবাহিনীর কট্টর সমর্থকে পরিণত হয়েছে। রাখাইন ষ্টেটের বৌদ্ধ শ্রমণদের প্রতি সমর্থন দিয়েছে মিয়ানমারের সকল বৌদ্ধ শ্রমনেরা। মিয়ানমারের সমাজ জীবনে বৌদ্ধ শ্রমনেদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ফলে ইচ্ছা থাকলেও(যদি থেকে থাকে) অং সান সুচী'র পক্ষে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে মানবতার জয়গান গাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আফটার অল তিনি একজন গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হুমম ইয়ে, মানে...

আরও আসুক! পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA