মুজিব বর্ষে স্মৃতিচারনাঃ বঙ্গবন্ধু ও একটি সেতুর কথা।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি
লিখেছেন আব্দুল্লাহ এ.এম. [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ১৮/০৩/২০২০ - ১২:৫২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বাবার চাকুরীর সূত্রে ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের কোন একটি দিনে আমরা সপরিবারে ভুরুঙ্গামারি নামক একটি প্রত্যন্ত স্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি। রংপুর থেকে লালমনিরহাট গামী ট্রেনে এসে তিস্তা নদীর উপরে যে তিস্তা রেলওয়ে সেতু, তার কাছেই তিস্তা নামের একটি অতি অর্বাচীন রেল জংশনে আমরা কুড়িগ্রামগামী ট্রেন ধরার জন্য দুপুরের পর পর এসে পৌঁছালাম। আব্বা বললেন- ঐ তো কুড়িগ্রামের ট্রেনটি প্লাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছে। তা অবশ্য ছিল, কিন্তু যেখানে সেটা দাঁড়িয়ে ছিল তাকে আদৌ প্লাটফর্ম বলা চলে কি না সে বিষয়ে আমার মনে ঘোরতর সন্দেহ দেখা দিল। রেলের লাইন এবং তথাকথিত প্লাটফর্ম একই সমতলে অবস্থিত, সেই প্লাটফর্মে মাঠের মত সবুজ ঘাসের আস্তরন। জংশন ষ্টেশন হওয়া সত্বেও একটি মাঝারি সাইজের টিনের ছাদবিশিষ্ট আধাপাকা চৌচালা ঘর যার সর্বসাকুল্য স্থাপনা, সেটাও সেই একই সমতলে দাঁড়িয়ে। মিটার গেজ লাইনে পাঁচ-ছয়টি রং চটা বিবর্ন বগি এবং তার সামনে মান্ধাতার আমলের একটি স্টীম ইঞ্জিন উল্টোমূখো হয়ে যেন শুয়ে শুয়ে ধুঁকছে। দেখেই মনটা হাহাকার করে উঠলো- হায়! হায়! এই ট্রেনে করে হবে আমাদের 'এ জার্নি বাই ট্রেন'?। ততদিনে ডিজেল ইঞ্জিনের রেলগাড়ীতে চড়তে অভ্যস্ত হয়েছি এবং কয়লার ইঞ্জিনওয়ালা গাড়ীকে খুবই অস্পৃশ্য বলে মনে করি। এক ধরনের অপমানজনক হতাশা নিয়ে একটি বগিতে আমরা উঠে বসে গাড়ী ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। অনেক বিলম্বে গাড়ী ছাড়ার আয়োজন দেখা গেল, ঘন্টি বাজলো, সিটি বাজলো, ট্রেনটি নড়েচড়ে উঠলো, কিন্তু একি! এ দেখি পিছনের দিকে চলার আয়োজন করছে! দুই চার কদম পিছিয়ে অবশেষে সেটা আবার সামনের দিকে চলা শুরু করলো। মনুষ্যসমাজে লংজাম্প টাইপের এ্যাকশনের প্রয়োজনে কোন কোন সময় প্রথমে এরকম পিছু হটার প্রয়োজন পড়ে বটে, কিন্তু একই ব্যাপার যে রেলগাড়ির ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, তা সেই প্রথম দেখলাম। ট্রেন অতি ধীরে চলা শুরু করেছে, ইঞ্জিনের বিকট শব্দ কানে আসছে, বোঝাই যাচ্ছে এই কয়টা বগি এবং তার নিজের দেহটিকে টেনে নিয়ে যেতে তার যারপরনাই তকলিফ হচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গেল, কিন্তু ট্রেনের গতির তেমন হেরফের হচ্ছে না। শেষমেশ অধৈর্য হয়ে আব্বার কাছে জানতে চাইলাম এই অসহ্য ধীরগতির অবসান কখন হবে। আব্বা জানালেন, এটাই এই ট্রেনের স্বাভাবিক গতিবেগ। বিস্ময়ে,হতাশায় এবং অশেষ যন্ত্রনায় বিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। এরপর খুবই বিরক্তি নিয়ে ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীদের আর জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যাবলী দেখার চেষ্টা চালালাম। রেল লাইনের পাশে দিয়ে চলে গেছে একটি কাঁচা সড়ক। মাঝে মধ্যে বাইসাইকেল চালিয়ে কেউ কেউ ওভারটেক করে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, তাদের কেউ কেউ আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে এক ধরনের অবজ্ঞার হাসি ছুঁড়ে দিচ্ছে। সেইসব নরাধম সাইক্লিষ্টদের প্রতি প্রচন্ড ক্রোধ জন্মাচ্ছে, কিন্তু কিছুই করা যাচ্ছে না। এভাবে বহুক্ষন যন্ত্রণা পোহানোর পর এক জায়গায় ট্রেনটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো। তখন বোঝা গেল সেটা একটা রেল ষ্টেশন বটে, নাম তার সিঙ্গেরডাবরী হাট। নামের কী বলিহারি রে বাবা, যেমন রেলপথ, তেমনই তার ষ্টেশনের নাম ও ছিরি। অপোগান্ড বালক আমি, নামের মহাত্ম তখন আর কী বুঝবো। অনেক পড়ে একজনের কাছে সে নামের একটা সম্ভাব্য উৎস জেনেছি। আগে মহিষের শিং দিয়ে নানা ব্যবহারিক জিনিষপত্র তৈরি করা হত, যেমন শিঙ্গা, চিরুনি, চেরাগ, ইত্যাদি। এই শিং দিয়ে এক ধরনের চামুচও নাকি তৈরি হত, বাংলায় চামুচের আর একটি নাম হল ডাবর বা ডাবুর। সিঙ্গেরডাবরী হাট নামটির সাথে হয়ত বাংলার এক প্রাচীন শিল্পপন্যের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলো, তারপর একসময় রাতের আঁধার। ট্রেনে বাতির ব্যাবস্থা নেই, তাই ভেতরে দেখার কিছু নেই। বাইরে আবছা অন্ধকারেও তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আরও দুটি ষ্টেশন রাজারহাট ও টোগরাইহাট পেরিয়ে অনেক বিলম্বে, যেন বহুযুগের পরে আমরা কুড়িগ্রাম ষ্টেশনে এসে পৌছলাম। তখন রাত হয়ে গেছে, সুতরাং সেদিনের মত যাত্রা বিরতি। আমরা আব্বার পরিচিত একজনের বাসায় রাত্রিযাপন করে পরদিন ভুরুঙ্গামারীর উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে গরুগাড়ীতে ধরলা নদীর চরের মাঝ দিয়ে বেশ কিছুদূরের খেয়াঘাট অবধি। তারপর খেয়া নৌকায় ধরলা নদী পার হয়ে পুনরায় ভিন্ন গরুগাড়ীতে পাটেশ্বরী নামক এক স্থানে আগমন। পাটেশ্বেরী একটি বাস টার্মিনাল বটে, সেখানে বিচিত্রদর্শন কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীর অপেক্ষায়। তারই একটিতে চড়ে আমরা অতিশয় শীর্ণ একটি কংক্রিটের রাস্তা বেয়ে ২৪ মাইল রাস্তা দু-আড়াই ঘন্টায় অতিক্রম করে ভুরুঙ্গামারীতে এসে পৌঁছলাম। এমন ঘোর মফঃস্বলে এর আগে কখনো বসবাস করি নাই, ফলে এক ধরনের হাঁসফাঁস অবস্থা প্রথম দিকে দেখা দিল। কিন্তু দুরন্ত কৈশরের চাপল্যে দিন কয়েকের মধ্যেই সে ভাব অনেকটাই কেটে গেল। ভুরুঙ্গামারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে ভর্তী হওয়া গেল। সহপাঠী এবং সহপাঠিনীদের প্রায় সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড়, কেউ কেউ অনেক বড়। ছেলেদের অনেকেরই গোঁফদাড়ি স্পষ্ট, মেয়েদেরও নারীত্বের লক্ষণ সুস্পষ্ট। ক্লাসমেটদের মধ্যে দু একজন ইতোমধ্যেই বিবাহের পবিত্র দায়িত্ব সুসম্পন্ন করেছেন। ক্লাসের আবহে যৌনতার সংস্কৃতি প্রকট। সেই ভয়াবহ ঘুর্ণাবর্তে পড়ে আমার এবং আমার মত অল্পবয়স্ক আর দু একজন বালকের প্রান ওষ্ঠাগত। তবে লাভও কিছুটা হচ্ছিল, নারী পুরুষ এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ক বিস্ময়কর নানা গুঢ় গুপ্তজ্ঞান অর্জন করে পুলকিত শিহরিত দিশাহারা হতে হচ্ছিল। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল সেই ঘোর মফস্বলে আমার স্কুলের শিক্ষকেরা কিন্তু ছিলেন অনন্য। আজ এত বছর পরে স্মৃতিচারন করতে যেয়ে অবাক হয়ে ভাবি তাঁদের কথা। বাবার বদলীর চাকুরি হওয়ায় আমায় নানা স্কুলে পড়তে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, কিন্তু ভুরুঙ্গামারী দ্বিমুখী হাই স্কুলের শিক্ষকেরা ছিলেন সত্যি অনন্য। পাঠ্যবইয়ের বাইরে শিল্প সংস্কৃতি সঙ্গীত ইতিহাস সমাজতত্ব রাজনীতি নানা বিষয়ে তাঁদের আলোচনা ছিল সত্যি প্রশংসনীয়।

ভুরুঙ্গামারীর ভৌগলিক অবস্থান বেশ ইন্টারেস্টিং! কুড়িগ্রাম মহকুমার তিনটি থানা নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ি এবং ভুরুঙ্গামারী উত্তরদিকে লম্বালম্বি হয়ে ভারতের পেটের মধ্যে ঢুকে গেছে, এর মধ্যে ভুরুঙ্গামারীর অবস্থান সর্ব উত্তরে। এর এক পার্শ্বে পশ্চিমবাংলা, অন্য পার্শ্বে আসাম। পুব দিকে আসামের গোয়ালপাড়া জেলা, আর পশ্চিম দিকে পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার। মাঝে কোন কোন স্থানে ভুরুঙ্গামারীর প্রস্থ মাত্র কয়েক মাইল। সুতরাং ভুরুঙ্গামারীর অধিকাংশ গ্রামই বর্ডার লাইন বরাবর। সহপাঠী এবং অন্যান্যদের কাছে গল্প শুনে বোঝা যায় এখানকার মানুষ অহরহ নানা কাজে ইন্ডিয়ায় যাতায়াত করে। দু পাশ থেকে দুটি নদী(নাকি নদ?) ঢুকেছে ভুরুঙ্গামারীতে, একটি ছোট- ফুলকুমার, অন্যটি বড়- দুধকুমার। দুটি নদীই বর্ষায় দুর্ধর্ষ রুপ ধারন করে। ভুরুঙ্গামারীর উপর দিয়ে দুটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ন কিন্তু পরিত্যাক্ত পথ চলে গেছে। একটি আসাম বেঙ্গল রেলপথ- লালমনিরহাট থেকে মোগলহাট গিতালদহ ভুরুঙ্গামারী সোনাহাট ধরে সেটা চলে গেছে ধুবরি হয়ে গুয়াহাটি অবধি। অন্যটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে জাপানী আগ্রাসনের মুখে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রয়োজনর নির্মিত একটি সরু পিচ ঢালা পথ, যা দিনহাটা থেকে ধুবরি বোঙ্গাইগাঁও তেজপুর হয়ে চলে গেছে ডিব্রুগড় অবধি। অঞ্চলটি একসময় কামরূপ রাজ্যের, পরে কামতাপুর তথা কোচবিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভিতরবন্দ পরগণা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি প্রশাসনিক এলাকা। বারংবার মোগল হামলা এবং পরবর্তীতে ইংরেজ আগ্রাসনের সময় ভিতরবন্দের মাটি বারংবার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, অনেকের মতে সেই থেকেই ভুরুঙ্গামারীর নামকরন। সেই ভিতরবন্দ এখন এ অঞ্চলের একটি নিস্তরঙ্গ গণ্ডগ্রাম। ভুরুঙ্গামারীতে দু ধরনের আঞ্চলিক বাংলা প্রচলিত, একটি রংপুরি বাংলা, অন্যটি আসামী বাংলা, যা অনেকটা ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার মত। ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিক থেকে কৃষিকাজ এবং অন্যান্য প্রয়োজনে ময়মনসিংহ থেকে মানুষজনকে আসামের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাঁদের উত্তরপুরুষেরা সেই আদি ভাষা এখনও প্রায় অবিকলভাবে ধরে রেখেছে। ৪৭এর দেশ বিভাগের সময় তদের কেউ কেউ কুড়িগ্রামের আসাম সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এসে ঠাঁই নিয়েছে, তাই ভাষার এরকম দ্বৈত অবস্থান। তাদের কেউ কেউ সম্ভবত দেশ বিভাগের আগে থেকেই এখানে বসবাস করে, কারন সমাজে তারা যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি সম্পন্ন, স্বল্প সময়ে যা অর্জন করা কঠিন। আর আছে কুড়িগ্রামের ট্রেডমার্ক অসহনীয় মঙ্গা। মরা কার্তিকে এখানকার অধিকাংশ মানুষের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে, জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়ে।

স্কুলে একাধিক শিক্ষক আমাদের ক্লাসে পাঠ্য বিষয়ের বাইরে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে সহনীয় মাত্রায় নানা আলোচনা করতেন। আমি তার কিছু বুঝতাম, অনেকটাই বুঝতাম না। শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানি, শেখ মুজিব নামগুলো সেই ক্লাস থ্রী/ফোরে পড়ার সময় থেকেই শুনে আসছি। এখন অন্যান্য আরও কিছু নাম শুনতে থাকলাম। সময় যত গড়াতে থাকলো, চারিদিকে রাজনৈতিক আলোচনা এবং কর্মকাণ্ড ততই জোরদার হতে লাগলো। আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, ন্যাপ, জামায়াতে ইসলামী দলগুলোর সম্পর্কে শুনতে এবং জানতে থাকলাম। আমাদের এক শিক্ষক শামসুল হক চৌধুরী, আমাদের কী পড়াতেন তা মনে নেই, কিন্তু স্কুলের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তিনি ছিলেন মধ্যমণি, একদিন জানতে পারলাম তিনি হলেন আওয়ামী লীগের একজন নেতা। আগে থেকেই তাঁর ভক্ত ছিলাম, এখন শেখ মুজিবের দলের নেতা জেনে তাঁর প্রতি ভক্তি যেন আরও বেড়ে গেল। বিভিন্ন জনের সাথে আব্বার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বুঝতে পারলাম তিনিও আওয়ামী লীগের সমর্থক। এ ছাড়াও যারাই আমার প্রিয়, যারাই আমার কাছে তখন গুরুত্বপুর্ন, তাঁদেরও সবাইকে যেন আমার আওয়ামী লীগেরই সমর্থক বলে মনে হতে লাগলো। সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসের মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জোরদার হয়ে উঠলো। মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে জনসভা হয়, আমাদের স্কুলের মাঠে একদিন আওয়ামী লীগের বেশ বড় একটা জনসভা হল। সভায় বিভিন্ন জনের দেয়া বক্তব্য থেকে মনে হতে লাগলো পশ্চিম পাকিস্থানের সাথে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া অত্যাসন্ন। জামাতে ইসলামীও একটা বেশ বড় জনসভা করলো, তাতে গোলাম আজম এসে বক্তৃতা করেছিল। এই সভায় দেখলাম মাঠভর্তি শুধু দাঁড়ি টুপিওলা হুজুর, এইরকম এত লোক হঠাৎ কোথা থেকে হাজির হল ভেবে খুব অবাক হয়েছিলাম। মুসলিম লীগের একটি গ্রুপ একটা ছোট মিটিং করলো। সবচেয়ে ছোট মিটিংটি হল ভাসানি ন্যাপের, জনা পঞ্চাশেক লোক এতে জড়ো হয়েছিল, শ্লোগান দিয়ে তারা বললো- ভোটের আগে ভাত চাই। আমার এক মামা আমায় একটা রং এর বাক্স কিনে দিয়েছিল, সেটা দিয়ে জলরং এ নানা কিছু আঁকতাম। একদিন আঁকলাম নদীতে নৌকা। নিজের শিল্পকর্ম দেখে আমি নিজেই মুগ্ধ, কি মনে করে নিচে লিখে দিলাম "সোনার বাংলা শ্মশান কেন? নৌকা মার্কায় ভোট দিন"। সেটা নিয়ে গিয়ে ছোট্ট বাজারটায় একটা দেয়ালে আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে দিলাম। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন ভীড় করে সেটা দেখতে এল। আমার অপটু হাতের আঁকা সেই নৌকার কারনে আমি এক ধরনের বেশ খাতির লাভ করলাম। আর একদিন সমবয়সী দু তিনজন খেলার ছলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী শ্লোগান প্রাকটিস করছিলাম, এতে মুগ্ধ হয়ে ছোট ছোট কয়েকটি ছেলেমেয়ে এসে জুটে গেল। বেশ মজা পেয়ে আমি ওদের নিয়ে একটা মিছিল মিছিল খেলা শুরু করে শ্লোগান দিয়ে এগিয়ে চললাম, এবং খেলাটা সবার খুব পছন্দ হল। সময়ের সাথে সাথে মিছিলের আকার বাড়তে লাগলো এবং কিছু সময়ের মধ্যেই সেটা এক দেড়শ শিশু-কিশোরের বিশাল মিছিলে পরিণত হয়ে গেল। কিছুক্ষন পর সন্ধ্যা নেমে এল, তখন একটি ছেলে একটি চ্যালা কাঠে আগুন ধরিয়ে মশালের মত বানিয়ে মিছিলে যোগ দিয়ে একটি ভিন্ন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে দিল। মিছিলের শ্লোগান সবই প্রো আওয়ামী লীগ যেমন- ভোট দিবেন কোনখানে নৌকা মার্কা যেখানে, নৌকায় আছে মোজাহার ভোট দিয়ে কর পার, নৌকায় আছে শামসুল ভোট দিতে কোর না ভুল, ইত্যাদি। ঘন্টা খানেক মিছিলবাজী করে ফিরে আসার পর দেখি আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের স্থানীয় নেতারা আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সবাই আমাকে প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দিল এবং আমি স্বভাবতই আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেলাম। তাদের কাছে আমার একটা গুরুত্ব তৈরি হল বলা যায়।

একদিন শুনলাম মিটিং করার জন্য শেখ মজিবর রহমান আসছেন, তবে ভুরুঙ্গামারীতে নয়, কুড়িগ্রাম ও নাগেশ্বরীর মাঝামাঝি স্থান নাগেশ্বরীতে। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল, কারন শেখ মুজিবের মিটিং দেখার খুব শখ, কিন্তু নাগেশ্বরী তো অনেক দূরে, প্রায় ১২ মাইল। পরে শুনলাম এখানকার কয়েকজন আলাউদ্দিন চাচার গাড়ী নিয়ে মিটিংএ যাবে। নির্ধারিত দিনে জমানো একটি টাকা নিয়ে সেই গাড়ীর কাছে হাজির হলাম, মনে আশা, কেউ হয়ত আমাকে যেতে অনুরোধ করবে। কিন্তু কেউ তেমন অনুরোধ করলো না। শেষে গাড়ী স্টার্ট দেয়া মাত্র আমি লাফিয়ে গাড়ীতে উঠে বসলাম। কয়েকজন আপত্তি জানালো এত ছোট মানুষকে সাথে নিতে, কিন্তু অন্য কয়েকজনের প্রশ্রয়ে আমার যাওয়ার সুযোগ হল। গাড়ীটা ব্রিটিশ আমলের একটি পেট্রোল চালিত ছোট পিক আপ, তাতে সিট বসিয়ে যাত্রী পরিবহনের ব্যাবস্থা করা হয়েছে। গাড়ী ছাড়ার কিছুক্ষন পর এর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। এটা স্টার্ট দিতে হয় হ্যান্ডেল ঘুড়িয়ে, কিন্তু হ্যান্ডেল ঘুড়ানোতে কাজ হল না। শেষে কয়েকজন নেমে গেল গাড়ী ঠেলতে, আমিও নামলাম। স্টার্ট নিল, কিন্তু কিছুদূর গিয়ে আবারো স্টার্ট বন্ধ, সুতরাং আবার ঠেলা। এ প্রক্রিয়া বারংবার চলতে থাকলো এবং বলা যায় এভাবেই আমরা গাড়ীতেই এলাম, কিন্তু চড়ে নয়, ঠেলে। অনেক বিলম্বে আমরা নাগেশ্বরীর উপকণ্ঠে এসে পৌঁছলাম, লোকের ভীড়ের কারনে গাড়ী সেখানেই থামানো হল। সব মানুষ সামনে হাঁটছে, বিশাল জনস্রোত। এর আগেও আমি জনসভা দেখেছি, কিন্তু সত্যিকারের একটা বিশাল জনসভা বলতে কী বুঝায় তা সেদিন উপলব্ধি করলাম। এত মানুষের সমাগম আমার কাছে ছিল অকল্পনীয় একটি ব্যাপার। যাই হোক, মানুষের ফাঁক ফোঁকর গলে আমি মূল সভাস্থলের দিকে এগিয়ে চললাম। মাইকে এখন বক্তৃতা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু আমার তো মঞ্চের কাছে যাওয়া চাই। অবশেষে আমি মঞ্চের কাছেই পৌছে গেলাম এবং দেখতে পেলাম বক্তৃতা করছেন আমার স্বপ্নের মানুষ শেখ মজিবর রহমান। এতদিন পত্রপত্রিকায় তাঁর ছবি দেখেছি, তাঁকে চাক্ষুষ দেখে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই তাঁর বক্তৃতা শেষ হল এবং মিটিংএর সমাপ্তি ঘটলো। তাঁর বক্তৃতার দুটি কথা শুধু এখনও আমার মনে আছে, এক- রাত হলে মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামী, পিডিপি সবাই একসাথে বসে পরামর্শ করে কী ভাবে আওয়ামী লীগের ক্ষতি করা যায়। দুই- আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই ধরলা নদীর উপর আমরা ব্রীজ করে দেবো ইনশাল্লাহ। গাড়ীর দিকে ফিরে চললাম, দেখি এক যায়গায় জটলা। কাছে গিয়ে দেখলাম একটা ব্যাজ বিক্রি হচ্ছে, দাম এক টাকা। ব্যাজটা হাতে নিয়ে দেখি তাতে মাঝখানে শেখ মুজিবের ছবি, উপরে গোল করে লেখা জয় বাংলা, নিচে গোল করে লেখা জয় বঙ্গবন্ধু। ব্যাজটা কিনে ফেললাম। সেই প্রথম আমি জয়বাংলা শব্দটার সাথে পরিচিত হলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, ফিরতি পথে গাড়ীটা আর কোন ঝামেলা করলো না। আন্ধারীঝার নামক একটা বাজারের পাশে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল, গাড়ীটা সেখানে দাঁড় করানো হল। বুঝতে পারলাম তারা আওয়ামী লীগ ছাত্র লীগের স্থানীয় নেতা। তারা জানালো শেখ মুজিব জীপ গাড়ীতে চড়ে ভুরুঙ্গামারীর দিকে গেছেন, হয়ত কিছুক্ষণ পর আবার ফিরবেন। তাদের সাথে আমাদের গাড়ীর নেতাদের কোন বিষয় নিয়ে আলাপ চলছিল, আমরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। তখন বোধ হয় গোধূলি লগ্ন। হঠাৎ আমাদের মাঝে চঞ্চলতা দেখা দিল, দেখা গেল দূর থেকে একটি জীপ এগিয়ে আসছে। সবাই চিৎকার করে বলল- ঐ তো শেখ সাহেবের গাড়ী। মুহুর্তের মধ্যে ভীড় জমে গেল, শেখ সাহেবের গাড়ীটি এসে জটলার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। একটি হুড খোলা জীপ, সামনে ড্রাইভারের পাশের আসনে তিনি আসীন। তিনি গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়ালেন, সবাই তাঁকে ঘিরে দাঁড়ালো, আমিও ঠেলেঠুলে ভীড়ের একেবারে সামনে। তিনি কয়েকজনের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন, কিছু সৌজন্যবাক্য বিনিময় করলেন, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর আবার যেয়ে গাড়ীতে উঠলেন, গাড়ী এগিয়ে গেল।

পাদটীকাঃ কুড়িগ্রাম থেকে পাটেশ্বরী পর্যন্ত ধরলা নদীর দুধারে যে বিস্তীর্ন বালুচর, সে পথ বঙ্গবন্ধু পাড়ি দিয়েছিলেন গরুর গাড়ীতে চড়ে। তোফায়েল আহমেদের স্মৃতিচারণায় সে কথা অনেকবার উঠে এসেছে। পাটেশ্বরীতে বোধ হয় তাঁর জন্য একটি জীপ গাড়ীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যাতে চড়ে তিনি নাগেশ্বরীর জনসভা এবং পরে ভুরুঙ্গামারী অবধি গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু ঘাতকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কারনে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ধরলা নদীর উপর সেতুটি বঙ্গবন্ধুর সরকার নির্মান করে যেতে পারে নি। বহু বছর পরে তাঁর সেই আরাধ্য কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা, প্রতিশ্রুতিটির ব্যাপারে তিনি কী অবগত ছিলেন? একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার ধরলা নদীর উপর বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুত সেই সেতুটি নির্মান করেছে।


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

"মারী" মানে কী? চিলমারী বুড়িমারী ভুরুঙ্গামারী এমন অনেক স্থাননামে (toponym) এটা আছে।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী মারী শব্দটি সংস্কৃত মারণ শব্দ হতে ব্যুৎপন্ন। বিভিন্ন অভিধানে এর অর্থ হত্যা এর সমার্থক। এক হিসাবে এর সত্যতা মেলে কারন চিলমারী, বুড়িমারী, বোয়ালমারী, শৈলমারী, পুটিমারী, কৈমারী, পক্ষীমারী মোগলমারী সহ প্রায় সকল নামেই কোন না কোন কিছুকে হত্যার আভাষ পাওয়া যায়। ভুরুঙ্গামারী নামকরন দুভাবে হতে পারে, এক- রক্তে রাঙ্গা ভুমি অর্থে, দুই- ভুরুঙ্গ মাছ মারা অর্থে, রুই মাছের আর এক নাম ভুরুঙ্গ।

আবার কোন কোন সূত্রে এটি বাংলায় স্থান নামের শেষে ব্যবহারের জন্য প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ বিষয়ে অবশ্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পাই নি।

নৈষাদ এর ছবি

ভাল লাগল আপনার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।

দেখা যাচ্ছে, আপনার রাজনীতি সচেতনতার শুরু সেই কৈশোরেই …।

(এই ব্যাপারটা একটা আক্ষেপ হিসাবেই রয়ে গেল। কৈশোরে যখন বই-পত্র পড়তে শুরু করি, কেন যেন রাজনীতির ব্যাপারে তেমন ইন্টারেস্ট পেতাম না। তখন যাদের সংস্পর্শে এসেছিলাম, ইতিহাসের অনেক খুটিনাটি জানতে পারতাম। হায়, তাঁরা আর বেঁচে নাই।)

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।