লাংকাভি এবং ভোলা যায় না এমন কিছু মুহূর্ত

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ০৭/০৮/২০১১ - ১:৪০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

২০১০ এর শুরুতে আমাদের একটা একটা রিসার্চ-পেপার প্রেজেন্টেশন এর জন্য একটি কনফারেন্সে নির্বাচিত হল। কনফারেন্সটি ছিল মালোশিয়ার লাংকাভিতে। অনেক খুশি ছিলাম আমরা। পেপার একসেপ্ট হয়েছে এইজন্য না আমরা খুশি ছিলাম দেশের বাইরে ঘুরতে যাব বলে । অন্য সবাই হয়ত পরিকল্পনা করতো কনফারেন্সে কি কি করা যায় সেটা নিয়ে আর আমরা করেছিলাম কোথায় কোথায় ঘোরা যায়, কিভাবে সারারাত আড্ডা মারা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক অনিশ্চয়তার পরে প্রাণের বন্ধু আল-আমিনকে রেখে আমাদের যাত্রা শুরু হল। ছাত্র মানুষ তারপরে আবার টাকা পয়সার টানাটানি(বলতে গেলে মোজার ভেতর থেকে টাকা বের করেছিলাম) তাই টিকিট কাটলাম দুনিয়ার সবথেকে বাজে এয়ারলাইন্স “এয়ার এশিয়াতে”। বিমান ঢাকা থেকে ছেড়ে (বিকাল ৪ টা) থামল কুয়ালালামপুর সেখান থেকে কানেক্টিং ফ্লাইট ধরে লাংকাভি। দিনটি ছিল ৫ই জুলাই, আমাদের প্রেজেন্টেশন ছিল পরেরদিন। আমরা খুব সকালে পৌছে গেলাম। আমরা উঠলাম “এবি-মোটেল” নামক হোটেল এ। রুম ভাড়া ছিল ১২০ আর.এম(চারজনের রুম)। প্রথমদিন আমদের কেটেছিল আইল্যান্ড-হোপিং(২৫ আর এম করে নিবে) এ এবং দ্বিতীয় দিন ক্যাবল কার(২৫ আর এম) এবং কনফারেন্স।

৫ জুলাই দুপরের দিকে আমরা আইল্যান্ড-হোপিং এ বের হয়ে পড়লাম। একটা ছোট স্পিড বোট এ আমরা ৪ জন সহ মোট ১০ জন। ছিল একটি অস্ট্রেলিয়ান কাঁপল এবং একটি জার্মান কাঁপল। বোট ছাড়ার পড় থেকেই কাঁপল গুলা এমন দুষ্টামি শুরু করলো যে আমাদের টেকা দায় হয়ে গেল :D। আমরা বংলায় এত গালাগালি করলাম এত বোঝালাম কোন লাভ হল না। যাহোক অনেকক্ষণ সাগরের মধ্যে চলার পরে আমরা ঈগলদের রাজত্বে “পুলাউ সিংগা বেসার” চলে এলাম। হাজার হাজার ঈগল। আমাদের মাঝি আগে থেকেই একটা মুরগী নিয়ে এসেছিল, সে মুরগীর টুকরা ছুড়ে ছুড়ে মারতে লাগলো আর ঈগলগুলো ছো মেরে নিয়ে যেতে লাগলো। খুব খুব ভাল লাগছিল ঈগলদের খাওয়া দেখতে।

আমাদের বোট

ঈগল ফিডিং

আইল্যান্ড হোপিং এর সময় দেখা যাবে এই আইল্যান্ডটি

ঈগলদের খাওয়ানোর পরে আমরা চলে এলাম “পুলাউ দায়াং বুন্তিং”। দূর থেকেই মাঝি দেখিয়ে দিল কিভাবে পাহাড় তৈরি করছে একজন গর্ভবতী মহিলার ছবি, সত্যিই অসাধারণ ছিল। গর্ভবতী মহিলার একটি লেক আছে সেখানে আমরা যাত্রা বিরতি করলাম। লেকটা খুব সুন্দর, আমি আর রুবেল তো না থাকতে পেরে নেমেই পড়লাম যদিও রুহিন আর রনি মন খারাপ করে উপরে বসে থাকলো কাপড় ভিজবে বলে( অভাগা!!!!)।

দায়াং বুন্তিং মার্বেল জিও ফরেস্ট পার্ক

দায়াং বুন্তিং মার্বেল জিও ফরেস্ট পার্ক

দায়াং বুন্তিং মার্বেল জিও ফরেস্ট পার্কের লেক

সবশেষে আমরা চলে এলাম “বেরাস বাসাহ আইল্যান্ড”। আইল্যান্ডটি খুব খুব সুন্দর। বীচের বালি ছিল আরও বেশি সুন্দর এবং রোমান্টিক। যেহেতু আমরা কেউ বিবাহিত নয় তাই মনে হল এমন এক রোমান্টিক পরিবেশে বসে হানিমুনের ছোটখাট একটি পরিকল্পনা করে নেয়া যাক খাইছে । এখানেই শেষ হল আইল্যান্ড হোপিং এরপরে আমরা ফিরে চললাম হোটেল এ।

বেরাস বাসাহ আইল্যান্ড

বেরাস বাসাহ আইল্যান্ড

বেরাস বাসাহ আইল্যান্ড

বেরাস বাসাহ আইল্যান্ড

হোটেল এ ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। বীচের আড্ডা দিয়ে শুরু হল আমাদের ট্যুর এর প্রথম রাত। অসাধারণ একটি রাত ছিল, বলতে গেলে জীবনের বাইরে জীবন। রাতটিতে একমাত্র অতৃপ্তি ছিল বন্ধু সিকির অনুপস্থিতি। ভোর বেলায় আমরা ঘুমাতে গিয়েছিলাম।

৬ ই জুলাই খুব সকালে আমাদের প্রেজেন্টেশন ছিল। জীবনের এত মজা রেখে তুচ্ছ একটা প্রেজেন্টেশন খুবি বোরিং লাগছিল। কিন্তু নিজেদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মহামূল্যবান কিছু সময় নষ্ট করে অবশেষে প্রেজেন্টেশন আমি করলাম। প্রেজেন্টেশন শেষে একটি মূহুর্তও নষ্ট করি নাই বেরিয়ে পড়লাম ক্যাবল কারের উদ্দেশ্যে। ক্যাবল কার এবং তার আশেপাশের পরিবেশ বিশেষ করে ঝুলন্ত ব্রিজটি আসলেই অসাধারণ।

ক্যাবল কার থেকে লাংকাভি

ক্যাবল কার থেকে

ঝুলন্ত ব্রিজ

হোটেল এ ফিরতে ফিরতে এদিনও সন্ধ্যা। ফিরেই শুরু হল রাতের আড্ডা। আমাদের বাঙালিদের আড্ডা বিখ্যাত কিন্তু বিদেশিদের যে মুগ্ধ করতে পারে তা জানা ছিল না। জানলাম যখন দেখলাম কিছু ইরানী কিছু রাশিয়ান চলে এসেছে আমাদের সাথে আড্ডা মারবে বলে। শুরু হল আমাদের নতুন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা। ভালই চলছিল কিন্তু প্রকৃতি বায়না ধরল আমাদের সাথে আড্ডা মারবে বলে। শুরু হল সামুদ্রিক ঝড়। আমাদের বিদেশি বন্ধুরা সবাই ভয়ে রুমে পালালো কিন্ত আমাদের নতুন বন্ধু প্রকৃতির আবদার মেটাবার জন্য আমরা রয়ে গেলাম। অনেকসময় অনেককিছুকে অসাধারণ শব্দটি দিয়ে বোঝান যায় না, এক্ষেত্রেও ঠিক তাই।

৭ই জুলাই আমরা লাংকাভি থেকে কুয়ালালামপুর এবং সেখান থেকে ৯ই জুলাই ঢাকা। আমরা বন্ধুরা কার্জনে বসে আড্ডা মারলেও সেটা স্পেশাল হয় তারপরেও বলব অসাধারণ ছিল এই ট্যুরের লাংকাভি অংশটুকু। একবার সময় করে অবশ্যই ঘুরে অবশ্যই ঘুরে আসবেন, এরথেকে বেশি কিছু বলতে চাই না।

সবশেষে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আপানাদের জন্য কিছু টিপস...
১। আমাদের মত ছাত্র এবং টাকা পয়সার টানাটানি থাকে তবে টিকিট কাটুন হাতে সময় রেখে। যত আগে কাটবেন তত কম লাগবে টিকিটের দাম।
২। আমরা ভুল করেছিলাম লাংকাভিতে দুই দিন থেকে। আপনারা কমপক্ষে ৩ দিন থাকবেন।
৩। বীচ বসে সারারাত আড্ডা মারতে ভুলবেন না। আর আড্ডার সময় যদি অ্যালকোহল পছন্দ করেন তবে আপনার ট্যুর ১০০/১০০। এখানে অ্যালকোহল ট্যাক্স ফ্রি, তারমানে পানির থেকে অ্যালকোহল সস্তা।
৪। কেনাকাটার তেমন কিছু নাই। তাই যত পারেন কম কিনেন।
৫। বাঙালিদের জন্য খাওয়া-দাওয়া কঠিন তাই ডিম-রুটির মধ্যেই থাকুন। বাঙালি রেস্তোরা পাবেন তবে ভুলেও ঢুকবেন না, বেশি খাতির করবে, সহ্য করতে পারবেন না।
৬। ট্যাক্সি ভাড়া কম। ৪/৫ জন হলে সবথেকে ভাল হবে ট্যুর এর জন্য, এতে খরচ অনেক কমবে।

তন্ময়_আহসান


মন্তব্য

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

বাহ। দারুণ।
(মহিলা শব্দটি উৎপত্তিগত কারনে সুন্দর নয়। নারী শব্দটি ভালো। হাসি )

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

আয়নামতি1 এর ছবি

'........বাঙালি রেস্তোরা পাবেন তবে ভুলেও ঢুকবেন না, বেশি খাতির করবে, সহ্য করতে পারবেন না।' শয়তানী হাসি

কৌস্তুভ এর ছবি

বেড়ানোর গল্প ছোট হলেও ভাল লাগল। ছবিগুলোও সুন্দর, তবে বেশিরভাগই ঠিক ভাবে এমবেড হয় নি বলে দেখা যাচ্ছে না...

বানান একটু সাবধানে। কাঁপল > কাপল, হোপিং > হপিং, বংলায় > বাংলায়, ছো > ছোঁ, খুবি > খুবই... ...

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

চলুক

অতৎপর এর ছবি

অস্ট্রেলিয়ান আর জার্মান কাপলগুলা কি দুষ্টামি শুরু করেছিল ভাইজান? চোখ টিপি

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

বেশ কয়েকটা ছবি দেখা যাচ্ছে না মন খারাপ
আমি স্রেফ অবহেলায় বিনা খরচায় মালয়েশিয়া ঘুরাঘুরি হাতছাড়া করছিলাম একবার, সেই দুঃখ চাগায়ে দিলেন মন খারাপ

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

মৃত্যুময় ঈষৎ এর ছবি

চলুক


_____________________
Give Her Freedom!

স্বপ্নাদিষ্ট (অতিথি) এর ছবি

যাবার ইচ্ছা তো বাড়িয়ে দিলেন ভাই! হাসি
বানর টা কি নৌকার উপর বসেছিল? চিন্তিত

--স্বপ্নাদিষ্ট
=============================
যে জাতি নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন করে না, আল্লাহ তার ভাগ্য পরিবর্তন করেন না।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।