শুঁয়োপোকারা যখন প্রজাপতি

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ০৭/০৮/২০১১ - ১:৪৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে একলা হই। মানুষ হয়ে জন্মাবার একটা বড় সুবিধা বা অসুবিধা যেটাই বলি না কেন, তা হল, প্রচন্ড ভীড়ের মাঝেও একাকিত্বের স্বাদ নিতে পারা। চারিদিকে হই-হুল্লোড়, চিৎকারের মাঝে হুট করে নিজের মনে হারিয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ যেমন থাকে, তেমনি আবার অনেক সময় একলা হতে চাওয়াটার পূর্ণতা প্রাপ্তি হয় না এই কোলাহলের কারণেই..

আজ সকাল থেকেই আকাশের মন খারাপ। ঘুম থেকে খুব ভোড়ে উঠেই এই মুখ ভার করে থাকা আকাশ দেখে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াই বারান্দায়। পিলারে ঝুলতে থাকা কাপড় শুকানোর লোহার তারগুলোয় ভর দিয়ে তাকিয়ে দেখি ধূসর-কালো আকাশকে। মেঘ চিড়ে উড়ে যায় ভোরের পাখি কাক, আর সকাল- সাঁঝ পার্থক্য করতে না পারা কোন চিল। হলে থাকলে কেবল এই সময়টায়ই নৈ:শব্দের কোলাহল শোনা যায়, উপভোগ করা যায় এক অদ্ভূত একান্ত নিস্তব্ধতা। কেমন যেন অনুভূতি.. একটা বিশাল ক্ষুদ্রতা ঘিরে ধরে।

ভোরের আমেজটা হুট করে কেটে যায় না কেবল ঐ খেয়ালি আকাশের কারণে। ঘুম ঘুম চোখ ঐ চিলের মতই প্রতারিত হয় বাড়তি বেলাকে ভোরের হালকা রোদের সাথে গুলিয়ে ফেলে। আমি রুমে ফিরে আসি। পত্রিকা পড়ি। কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে থাকি। প্রযুক্তির কল্যাণে ভালোবাসার মানুষের সাথে খুনসুটি খুব সহজ হয়ে যায় নিত্যিদিন। ভালোবাসার মত এক অসম্ভব সৌভাগ্যের অধিকারী এক জুটির নারীটি তার প্রিয় মানুষটিকে তার নামে কোন এক গায়িকার গাওয়া গানের লিংক দিয়ে আসে। তাই নিয়ে দুষ্টামি। তাদের কল্যাণে খোঁজ পাওয়া অ্যালবামের গান শুনতে থাকি। গায়িকা হয়ত গেয়েছে তার মত করে। আমি ভাবতে বসি আমার মত করে। আমি পথে একলা হাঁটি/ তবু তুমি নেই পাশে/দু'চোখে জল আসে/ বাদল এসে ফিরে গেল আবার..

শুনতেই থাকি, শুনতেই থাকি। হঠাৎ কি মনে হয়, পুরোনো ছবিগুলো দেখতে বসি। দেখতে দেখতে হুট করেই যেন ফিরে যাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকগুলোতে। রাতে চিন্তাভাবনা, পরদিন সকালে উঠেই কোথাও ঘুরতে চলে যাওয়া। এমন কখনো হয় নি। তাই বলে ঘুরতে যাইনি, তেমনটাও না। বেশ কয়েকদিন ধরে গুঁতোগুতি করে ঠিকই প্রতি বন্ধে কোথাও না কোথাও যাওয়া হত। আর, সেখানে গিয়ে প্রতিবারই আমাদের কারো কারো বাকিদের খোঁচা পুরো ভ্রমণজুড়ে সহ্য করা! প্রতিবারই ফিরতি পথে ঠিক করা, আর না এদের সাথে। তারপরও আবার কোথাও যাওয়ার কথা উঠলে প্রবল উৎসাহে লাফিয়ে ওঠা।

এই আমাদের শেষ ঘুরোঘুরি প্রায় ১ বছর আগে। সবাই ব্যস্ত। কেউ গানের অ্যালবাম নিয়ে, কেউ ছবি তোলা নিয়ে, কেউ তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে; সবাই যার যার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত রকমের অনুরক্ত। ভালোবাসার জায়গা থেকে কেউ যদি কিছু করে, সেটা ঐ বিষয়ে কথোপকথন চলাকালিন তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে। আমার বন্ধুগুলোও তেমনি। সারাদিন এগুলো নিয়ে তারা ব্যস্ত। দিন শেষে রুমে ফেরে কিছু ঘর্মক্লান্ত দেহ, আর চনমনে মন।

আমার রুম আর তাদের রুম ৯ তলার তফাৎ। প্রতিদিন যাওয়া হয় না। তাদের সাথে দেখাও হয় না, পড়াশুনার বিষয়ের পার্থক্যের কারণে ক্লাস চলাকালীন সময়ে।

আমাদের দেখা হয় এখন রাতে। সাড়ে ৯টা/ ১০টায় মাঝে মাঝে ফোন আসে, "ঐ ***, রুমে আয়।"

আমি জানি, কেন ডাকছে। তারপরও ভাব নেই, 'কেন?'
- একটু খেলাধূলা করবো।
: আমার কাজ আছে, পরশু জমা।
- আয় না ভাই, আয়। একটা খেলবো।
: ধূর মিঞা!!

ভাব নিয়েও ঠিকই ফোনটা রেখে যাই খেলাধূলা করতে। "আই. বি." খেলতে!

আর, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদের বন্ধুরা? তারাও ব্যস্ত। কেউ চাকরিতে, কেউ নিজে নিজে কিছু একটা দাঁড় করানোয়। সবাই ব্যস্ত। ক্লাসে দেখা হয়। স্যারেরা যখন তার জ্ঞানভান্ডারের কিছু অংশ আমাদের অকৃপণভাবে বিলানোয়, আমরা তখন নিজেদের ভুবনে নিমগ্ন। ক্লাস শেষ, কেউ নেই, সবাই যার যার কাজে রওয়ানা..

আমরা কয়েকজন তবু থেকে যাই। কিছু কথা বলি, কিছু সময় কাটাই। মাঝে একেকদিন একেকজনের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে দুপুরে কোথাও খেতে যাই। দিন চলে যায়।

একেকজন একেকটা শুঁয়ো পোকার মতন। প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হবার প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে..

প্রতিদিন আমাদের কেবল ব্যস্ততাই বেড়ে চলেছে। তবুও মনে বাজতে থাকে, "হাতছানি দিয়ে বলে যাও, 'আমি যাব না'/ ফিরে এসে হঠাৎ দেখি/ আমার মনের আঙিনায়/ পথে তুমি হেঁটে যাও..."

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

এই লেখাটা যখন লেখি তখন আমি ৪-১ এর পরীক্ষা দেই। ৪-২ এর পরীক্ষা দিয়ে কাগজে- কলমে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি তাও প্রায় বছরের তিন- চতুর্থাংশ ঘুরে গেল। এই বন্ধুদের সাথেই হল ছেড়ে একসাথে বাসা নেয়া। দিন- রাত একসাথে থাকা, হাসি- ঠাট্টা, গল্প- কথা। কিন্তু, হঠাৎ করেই কর্মস্থলের পরিবর্তনে হুট- হাট করে সবারই ছড়িয়ে- ছিটিয়ে যাওয়া। কয়েকজন চিটাং, একজন গাজীপুর- সাভার, আমি রয়ে গেলাম ঢাকায়। আগে তাও প্রতিদিন অন্তত: দেখা হত, এখন বড়জোড় কথা হয়। তাই তো তাদের কেউ একজন বাসায় আসবে বললেই বাকিরা তাড়াতাড়ি অফিস সেরে বাসায় চলে আসি, কেউ বিকালের শিফট সকালেই সেরে বাসায় অপেক্ষা করি; আর পরদিন সাত সকালে উঠতে হবে জেনেও রাত জেগে গল্প করি। তবুও মনে হয় গল্প ফুরোয় না..

আর, আমার বিভাগের বন্ধুগুলো? তাড়াও ব্যস্ত। কারোই অবসর নেই। তবুও একটাই ভালো দিক, ফেসবুক। প্রতিনিয়তই যোগাযোগ, হাই- বাই..

আগে বলেছিলাম, প্রত্যেকে শুঁয়োপোকার মতন, প্রজাপতি হবার অপেক্ষায়। আর, আজ মনে হচ্ছে, প্রতিটি শুঁয়োপোকাই আজ বর্ণিল প্রজাপতি হয়ে অনেকগুলো বাগানের শোভা বাড়িয়ে চলেছে..
ভালো থেকো বন্ধুরা..

---
মুক্ত বয়ান


মন্তব্য

আয়নামতি1 এর ছবি

লেখটা ভালো লাগলো। সব বন্ধুদের শুভকামনা হাসি

তিথীডোর এর ছবি

এইচএসসি ০৫ ব্যাচ ছিল সচলে সবচাইতে দলভারি, এখন সবাই-ই উধাও... মন খারাপ
অনেকদিন পর লিখলেন বয়ান।
ভাল্লাগলো পড়তে। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

অপছন্দনীয় এর ছবি

হুঁ, সচল তখন 'খোকাখুকুদের' কলতানে মুখরিত হতো...

অর্ক রায় চৌধুরী এর ছবি

চলুক

অপছন্দনীয় এর ছবি

হাসি

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

হ... এইটাই নিয়ম হাসি

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

আশফাক এর ছবি

ভাল্লাগলো ভাইয়া।

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

প্রজাপতি হবার সময় চলে আসছে। আর মনে হচ্ছে, আমি শুঁয়োপোকা হয়ে খুব খারাপ ছিলাম না...

ধৈবত(অতিথি) এর ছবি

মুক্তদার সচলে প্রথম লেখা নাকি? ভালো থাকেন। প্রজাপতি হয়ে 'ফুলে ফুলে' ঘুরে বেড়ান।

তানিম এহসান এর ছবি

প্রজাপতিদের জন্য শুভেচ্ছা!

বন্দনা কবীর এর ছবি

ভাল থাকুক বন্ধুরা চিরকাল...

বন্দনা কবীর এর ছবি

ভাল থাকুক বন্ধুরা চিরকাল...

মৃত্যুময় ঈষৎ এর ছবি

স্মৃতিময় বাতায়ন বলে যায়....................

ভালো লাগলো প্রসূনদা................নিয়মিত লেইখেন............... চলুক


_____________________
Give Her Freedom!

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

প্রজাপতি লাইফের মজা হলো স্বাধীনতা... তবে মাঝে মাঝে শুঁয়োপোকা লাইফে ব্যাক করতে পারলে খুবই আরাম হতো... মন খারাপ

চলুক

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

তারেক অণু এর ছবি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।