অভিযোজন কাহিনী – সুইজারল্যান্ড ৯ (শেষ পর্ব)

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি
লিখেছেন ইয়াসির আরাফাত [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ২১/০৮/২০১২ - ৮:৩৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পুরনো প্যাচালঃ, , , , , , ,

মাত্র ছয়দিনের ছুটি, চোখের নিমেষে ফুরিয়ে গেল। ২২শে মে ঢাকায় গিয়েছিলাম, ২৮শে মে লুজানে চলে এলাম। ইয়ান চলে গেছে, কাজেই বাসা খালি। আমার রুমের দরজা অর্ধেক খোলা যেত কেবল, আগেই বলেছি। গভীর রাত, ক্লান্ত শরীরে সেখানেই শুয়ে পড়লাম তিনজনে, বাসা ঠিকঠাক পরে করা যাবে।

পরের কয়দিন মালপত্র এঘর ওঘর করতেই চলে গেল। সব কিছু সরাতেও পারছি না, ইমরান ভাইয়ের জিনিসপত্র না সরানো পর্যন্ত আমাদের মনমতো কিছুই গোছানো সম্ভব নয়। ওনারও ২৮ তারিখে ফেরার কথা ছিল (আমরা না উঠলে তাকে বাসা খালি করে দিতে হতো), কিন্তু রিটার্ণ ফ্লাইটের টিকিট পিছিয়ে ১৫ই জুন করেছেন, আমরা নিরুপায়। তারপরও সাময়িক বলে অবস্থাটা মেনে নিলাম।

৬ তারিখে লক্ষ করলাম, ছেলের সারা গায়ে চাকা চাকা দাগে ভরে গিয়েছে, চুলকাচ্ছে ভীষনভাবে। আমি ভাবলাম, এলার্জিক কোন সিম্পটম হবে। ঢাকায় যাবার আগে আমারও হয়েছিলো, ছয়দিনে সেরেও গিয়েছিলো। পরের দিন কমার বদলে আরও বেড়ে গেলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম, ডাক্তার অনেকক্ষণ দেখে, শখানিক প্রশ্ন করে রায় দিলেন, মশার কামড়। আমি বললাম, অসম্ভব। আমরা মশার দেশের মানুষ, মশার কামড়ের দাগ খুব ভালো চিনি। তাছাড়া ঘরে মশা থাকবে আর কানের কাছে পিন পিন করবে না, এও কি হয়? ডাক্তার তার কথায় অটল। মিনিট পাঁচেক তর্কাতর্কির পর আমার জেদের কাছে হার মেনে তিনি বললেন, ঠিক আছে, মশা কামড়ায় নি। সেক্ষেত্রে অন্য কিছু কামড়াচ্ছে, বাসায় গিয়ে খুঁজে দেখো। কোন ওষুধ দিয়ে কাজ হবে না।

বাসায় গিয়ে দেখি খুব ছোট ছোট কালো পোকা উড়ে বা ঘুরে বেড়াচ্ছে, মারলাম সবকটাকে। সবগুলো জানালা এঁটে দিলাম, রাতে যেন আর না আসে। ঘুম ভেঙে দেখি শুধু বাচ্চার নয়, আমাদের গায়েও চাকা চাকা দাগ। কি যেন সন্দেহ হলো, গুগল ইমেজে গিয়ে “বেড বাগস” লিখে সার্চ দিলাম। যে ছবিগুলো ভেসে উঠল, সেগুলো খুব পরিচিত। গায়ের দাগগুলো একদম আমাদেরগুলোর মত, আর একই রকম পোকা যাবার আগে বাসার দেয়ালে দুই একটা দেখেছিলাম। ছারপোকা! এদের কথা শুধু শুনেছি, গল্পে পড়েছি, কিন্তু দেখিনি কখনো। জঘন্য একটা অনুভূতি হলো, কারণ আমার ধারণা ছিলো এরা নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবিশে জন্মায়। কিন্তু গুগল বলল ভিন্ন কথা, সেভেন স্টার হোটেলেও নাকি এদের দেখা পাওয়া যায়। পরিবেশ নয়, বাহকই এদের বিস্তারের জন্য দায়ী। আপনার বাসায় ছারপোকা থাকতে হলে কাউকে সেটা নিয়ে আসতে হবে, একা একা এরা ছড়ায় না। কিন্তু যেখানে যায়, প্রায় ক্ষেত্রেই সারা জীবনের জন্য গেড়ে বসে। প্রতিটিকে খুঁজে খুঁজে না মারলে এবং ডিমগুলো নষ্ট না করে দিলে এদের বংশবিস্তার রোধ করা অসম্ভব। তারওপর গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী এরা নিজেদের সংখ্যা দ্বিগুনের বেশি করে ফেলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপের কিছু দেশে এদের বৃদ্ধির হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। অনেক আগে শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা “দেশের বাইরে দেশ” বইটি পড়েছিলাম। সেখানে লিখেছিলেন, ভয় কমানোর জন্য জ্ঞানের ওপর ওষুধ নেই (প্রসঙ্গ ভূমিকম্প)। আমার বেলায় উল্টো ফল পেলাম, জ্ঞানের সাথে ভয়ও বেড়ে গেল। কি উপায়ে খুঁজে বের করব এদের? ঢাকায় ইমরান ভাইকে ফোন দিলাম। বাসা যেহেতু ওনার নামে, এজেন্সীর সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব ওনাকেই নিতে হবে, ওদেরকে না জানিয়ে ফ্ল্যাটে কীটনাশক ছড়ালে নিশ্চিতভাবেই প্রতিবেশীদের কমপ্লেইন শুনতে হবে। উনি বললেন অপেক্ষা করতে, এসে ব্যবস্থা নেবেন। নানান দীর্ঘসূত্রিতায় সেই কীটনাশক কোম্পানী বাসায় আসতে জুলাইয়ের ২৫ তারিখ পর্যন্ত লাগিয়ে দিয়েছিলো, দুঃসহ সেই দিনগুলোর কথা আমরা মনে হয় কোনদিন ভুলতে পারব না। আমাদের তিন জনের শরীরে চামড়া ছেলা দাগ গভীরভাবে বসে গিয়েছে, সেরে ওঠার গতি খুব ধীর। একবার ইমরান ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার বাসায় এই সমস্যা, আগে জানালে তো পারতেন। উত্তরে উনি মৃদু হেসে বললেন, আরে আমি তো সপ্তাহে একবার তোষক উল্টেপাল্টে যত কটাকে পেতাম মেরে ফেলতাম, খুব অসুবিধা হয় নি কখনো (বলে কি?)। হাল ছেড়ে দিলাম কিছুক্ষন আলাপের পর। এই ভাইটাল ইনফর্মেশনের যে একটা নৈতিক দিক আছে, এটা ওনার কাছে ধরাই পড়ছে না, শুধু শুধু কথা বাড়িয়ে কি লাভ?

বাসা বদল করার একটা বাস্তব অসুবিধার কথা সুইজারল্যান্ডে আসার আগে বুঝি নি, চিঠিপত্র। প্রচুর চিঠি আসে বিভিন্ন জায়গা থেকে, সবাইকে পত্র দিয়ে ঠিকানা বদলের কথা জানাতে হয়, নইলে চিঠি ঘুরে চলে যাবে। নতুন বাসায় এসে ঝামেলাটা বড় আকার ধারণ করল। নিয়ম অনুযায়ী লেটার বক্সে আমাদের নাম না থাকলে পোস্টম্যান চিঠি ডেলিভারী দেবে না। এদিকে লেটার বক্সে নাম দেয়া সম্ভব নয়, কারণ বাসা আমাদের নামে নয়। তাছাড়া আরেকটি বড় অসুবিধা আছে, নতুন বাসাটি খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার পুরনো বাসার এজেন্সী ডিল করে, তাদেরকে যদি জানাই সেই আমরাই এসে উঠেছি তাদের আরেকটি বাসায়, তাদের রিয়্যাকশন কেমন হবে জানি না, খুব সম্ভবতঃ ইমরান ভাই আমাদের সরিয়ে দেবার নোটিশ পাবেন, নতুবা কন্ট্রাক টার্মিনেশনের হুমকি। যারা এই লেখাটি পড়ছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, আইন কানুন শক্ত এমন যে কোন দেশে যা করবেন নিজের নামে করবেন। নাম গোপন করে বা বেনামে কিছু করলে বিশ্রী আইনি জটিলতায় ফেঁসে যেতে পারেন। আমরা সেরকম পরিস্থিতিতে এখনো পড়ি নি, কিন্তু সেই সম্ভাবনা ছিলো।

পোস্টঅফিস থেকে পরপর তিনবার নোটিস পাবার পর তাদের সাথে দেখা করে আমার অবস্থা ব্যাখ্যা করলাম। তাদের একটাই বক্তব্য, তুমি লেটার বক্সে নাম লাগাও। যদি এজেন্সীর সাথে ঝামেলা থাকে খুব ছোট করে লাগাও, যেন পোস্টম্যান অন্ততঃ ক্লু পায় কোন বাক্সে চিঠি ফেলতে হবে। আমি খুব পীড়াপীড়ি করলাম আমাকে একটা পিও বক্স দেবার জন্য, ওরা রাজী হলো না, যাদের সপ্তাহে মাত্র দশ-বারোটি (বাড়িয়ে বলেছি) চিঠি আসে তাদের নাকি দেয়া যাবে না। মনে খুবই দ্বিধা দ্বন্দ নিয়ে ছোট ছোট অক্ষরে নাম লাগিয়ে দিলাম লেটার বক্সে। বিকালে বাসায় এসে দেখি কাগজটা নেই। কনশিয়ার্জ (এজেন্সীর নিয়োগপ্রাপ্ত কেয়ারটেকার) কাগজটা তুলে নিয়ে রিপোর্ট করে দিয়েছে। দুই দিন পরেই ইমরান ভাইয়ের নামে চিঠি এসে হাজির। তার লেটার বক্সে কেন অন্য মানুষের নাম পাওয়া গেছে সেটার লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলে হয়েছে ১৮ই জুলাইয়ের মধ্যে। পাশাপাশি আমাদের জন্য কমন ওয়াশিং মেশিনের সাপ্তাহিক চাবি বরাদ্দ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধোপা-নাপিত বন্ধ বলে একটা সামাজিক শাস্তি চালু আছে, অনেকটা সেইরকম হলো ব্যাপারটা আর কি! এই দেশে চাইলেই নিজের ওয়াশিং মেশিন লাগানো যায় না, কমন ওয়াশিং প্ল্যান্ট থাকে, সপ্তাহে একবার তিন-চার ঘন্টার জন্য কাপড় ধোয়া যায়। শুধুমাত্র আমাদের হয়রানি করাই এই আদেশের উদ্দেশ্য, এরকম বিদ্বেষ আমার তিন বছরের প্রবাস জীবনে অভুতপূর্ব। কত কি যে দেখব জীবনে!

বলা হয় নি ইমরান ভাই ১৫ই জুন এসে ২৯শে জুন পর্যন্ত আমাদের সাথে ছিলেন। তার বন্ধুরা তাকে কথা দিয়েছিল তিনি এসে তাদের ওখানে উঠতে পারবেন কিন্তু পরে তারা সেটা অস্বীকার করে এবং ইমরান ভাইয়ের মালপত্র আমাদেরকে আরও দুই সপ্তাহ সহ্য করতে হয়। তিনি তারপর কোনমতে সাময়িক একটা ব্যবস্থা করে অন্য শহরে চলে গিয়েছেন। তাকে ফোন করে পরিস্থিতি খুলে বললাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস না করে কেন লেবেল লাগাতে গেলাম সেই নিয়ে আপত্তি করলেন, কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন প্রথম কাজ লিখিত জবাব দেয়া। কাকতালীয় ভাবে সেই দিনই এজেন্সীর কাছ থেকে অন্য আরেকটি চিঠি পেয়েছি। এখানে পারসোনাল লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স নামে একটা জিনিস আছে, আইনগত কোন ঝামেলায় পড়লে এরা সেটা সামলায়, বাড়তি চার্জ কেমন নেয় জানি না। আমার সেই ইন্স্যুরেন্স করা ছিল বলে আমি ৯৬২৫ ফ্র্যাঙ্কের বিল তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে উপায় জানতে চেয়েছিলাম। রীতিমত একজন অ্যাডভোকেট সেই চিঠির আইনগত দিক যাচাই বাছাই করে এজেন্সীকে লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছিলেন। জবাবে তারা জানিয়েছে এক মাসের ভাড়া আর ক্লীনিং চার্জ সহ ২১৫৫ ফ্র্যাঙ্ক পেলেই তাদের চলবে। আমি এই চিঠি পেয়ে শত দুঃখের মাঝেও হাসলাম, আমি এদেশে নতুন দেখে ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করতে চাইছিল, প্রতিষ্ঠিত অ্যাডভোকেটের চিঠি পেয়ে লেজ গুটিয়েছে। আমি ASLOCA’য় না গিয়ে এদের কাছে প্রথমেই গেলে এক মাসের ভাড়াও দিতে হতো না, না জানার কারণে এই জরিমানা হল।

ইমরান ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে ১৮ তারিখে কি জবাব নিয়ে হাজির হব সেটা ঠিক করলাম। ওদেরকে গিয়ে বলব তোমাদের সর্বশেষ ক্লেইম নগদ মিটিয়ে দিচ্ছি। আগের বাসার ঝামেলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করব, বলব ফ্লোরের সমস্যার কারণে আমাদের কিছু করার ছিল না। নতুন বাসার ফ্লোর কংক্রিটের, এখানে সমস্যা হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। আর আমরা গত দুই মাস ধরে আছি, চাইলে অন্যান্য প্রতিবেশীর সাথে কথা বলে দেখুক আমরা কারো কোন অসুবিধা করছি কিনা। জুনিয়র লোকজন আপত্তি করলে জেনারেল ম্যানেজারের সাথে দেখা করে আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার কথা জানাবো, এই অবস্থায় বাসা বদল করা আমাদের জন্য কতটা কমপ্লিকেটেড এটা জানার পর মানবিক কারণে হলেও ওদের রাজী হওয়া উচিৎ বাসাটা আমাদের নামে ভাড়া দিতে।

দুনিয়া বড় কঠিন। যে লোকটি আমাদের সাথে দেখা করতে এলো সে কোন কথাই শুনতে রাজী নয়, আমাদেরকে সেই দিনই বাসা থেকে বের করে দেয়া হবে এরকম হুমকি দিতে থাকলো। তাকেই খুলে বলা হলো আমাদের অবস্থার কথা। তখন সে জানালো তার হাতে থাকলে সে বিবেচনা করে দেখতো, কিন্তু সর্বোচ্চ লেভেল থেকে নির্দেশ আছে আমাদের সাথে কোন রকম অ্যারেঞ্জমেন্টে না যাবার, কাজেই আমরা ঝামেলা না চাইলে যেন মাসের শেষে বাসা ছেড়ে দিই। মাত্র দশ দিনের নোটিসে বাসা পাওয়া লুজানে অসম্ভব, এটা মনে করিয়ে দিতে সে আগস্ট মাসটা সময় দিতে রাজী হলো, এর পরে তারা ব্যবস্থা নেবে। আইন বলে একজন লোককে এত সহজে বাসা থেকে উচ্ছেদ করা যায় না। পুর্ববর্তী নানা ঘটনায় ইতিমধ্যেই মন বিষিয়ে উঠেছিল, কাজেই ঠিক করলাম এই বাসা নিয়ে লড়াইয়ে না গিয়ে নতুন বাসা খুঁজে নেয়াটাই হবে উত্তম।

এর মধ্যে আমার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। আমি আমার বাংলাদেশী ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে চার মাস গাড়ি চালাবার অনুমতিসম্বলিত একটা কাগজ পেয়েছিলাম। সেখানে লেখা আগস্টের এক তারিখের মধ্যে আমাকে ট্র্যান্সপোর্ট অথরিটির কাছে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিয়ে সুইস লাইসেন্স নিতে হবে। লিখিত পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বেলা ঘনিয়ে এসেছে, তাই ১৬ই জুলাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম এর মধ্যে একটা ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হয়ে কয়েকটা ক্লাস করে নেব। ভুলত্রুটি না শুধরে নিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যদি ফেল করি, তাহলে একদম গোড়া থেকে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে (লারনার লাইসেন্স, এরপরে ইন্টারমিডিয়েট সবশেষে এক্সপার্ট), খরচ আকাশ ছোঁয়া। নানা ঝামেলায় ক্লাস করা হয়ে ওঠে নি, এখনও আমি গাড়ি খুঁড়িয়ে চালাই। আর মাত্র পাঁচ দিন বাকী, এই অবস্থায় মরিয়া হয়ে একটা স্কুলে যোগাযোগ করলাম। ইন্সট্রাক্টর গাড়িতে উঠেই বলে, ঢাল বেয়ে নামার সময় তুমি ক্লাচ পুরো নামিয়ে রাখো কেন? আমার যুক্তি ছিলো, ক্লাচ নামিয়ে রাখলে আরপিএম পাঁচশোর ঘরে থাকে, কম আরপিএম নাকি ইঞ্জিনের জন্য ভালো? জুয়ান (ইন্সট্রাক্টর, স্পেনের) বলল, এটা ভুল। ক্লাচ চেপে রাখা মানে গ্যাস ইনটেক হচ্ছে, এটা ফুয়েল এফিশিয়েন্ট নয়। তাছাড়া ঢালে গড়ানোর সময় ইঞ্জিনের বাধা না থাকলে গাড়ি থামানো কঠিন। বোকার হাসি হেসে ভুল ঠিক করার চেষ্টা করলাম, এতদিনের অভ্যাস কি একদিনে যায়? কিন্তু নতুন প্র্যাকটিস করতে গিয়ে লাভ হলো ভীষন, খেয়াল করলাম, গাড়ি যখন থেমে থাকে, ক্লাচ পুরো চেপে রাখলে সেখান থেকে চালানো শুরু করা কঠিন। বরং ছেড়ে দেয়ার আগমুহুর্ত পর্যন্ত জায়গাটায় ধরে রাখলে বেশ কাজ হয়, ব্রেক ছেড়ে দিলেই কিছুটা সামনে এগিয়ে যায় নিজে থেকে, উপরন্তু ঢাল বেয়ে ওঠার সময় গড়িয়ে নিচের দিকে নেমে যায় না। এই আবিস্কারে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল অনেক গুণ, এতদিন শুধু শুধু কষ্ট করেছি! রাইট সাইড ট্রাফিকের নিয়ম কানুন ঝালিয়ে নেবার জন্য কানাডার আইসিবিসি ওয়েবসাইট থেকে “ড্রাইভ স্মার্ট” গাইডটি নামিয়ে নিলাম। শিখলাম নতুন অনেক কিছু (ঢাল বেয়ে নামার সময় ক্লাচ পুরোটা দাবিয়ে রাখা কানাডীয় আইনে অবৈধ!!!)। যথাসময়ে পরীক্ষা দিতে হাজির হলাম এবং সাফল্যের সাথে উৎরে গেলাম। এখন আমি একটি সুইস ড্রাইভিং লাইসেন্সের গর্বিত মালিক।

মূল গল্প থেকে সরে গেছি। তৃতীয়বারের মত বাসা খোঁজার যুদ্ধে নামতে হলো এবার। পুরনো রুটিন, বিজ্ঞাপন দেখে পছন্দসই বাসা বের করি, ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই (খুব অল্প কিছু ফ্রেঞ্চ বাক্য শিখে নিয়েছি), বাসা দেখি, পছন্দ হলে অ্যাপ্লাই করি। যদিও ভরসা হয় না ফ্ল্যাটপ্রতি খান তিরিশেক আবেদনপত্রের মধ্যে আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে। এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলাম, যদি কোন সুপারিশ না থাকে সবচেয়ে প্রথম যে ভ্যালিড অ্যাপ্লিকেশন জমা পড়ে সেটাকেই মনোনীত করে থাকে এজেন্সিগুলো। এবার ছক পাল্টালাম। যে সব বাসার বিজ্ঞাপন দীর্ঘদিন থেকে ইন্টারনেটে ঝুলছে সেগুলোর পেছনে ছুটে লাভ নেই, আমার আগেই কেউ না কেউ নিশ্চয়ই কাগজ জমা দিয়ে ফেলেছে। প্রতিদিন সকালে একেবারে নতুন অ্যাড দেখে ফোন দিই, সম্ভব হলে সেদিনই দেখে আসি। কয়েক সেট কাগজ সাথে নিয়ে ঘুরছি, ফ্ল্যাট পছন্দ হলে অতিদ্রুত এজেন্সির অফিসে গিয়ে আবেদন করে ফেলি। দুটো অ্যাপার্টমেন্টে সবার আগে কাগজ জমা দিতে পারলাম (কেউ কেউ সম্পর্কের জোরে ফ্যাক্স/ইমেইল পাঠিয়ে প্রথম হবার দাবীদার হয়ে থাকে)। একটা অফিস থেকে সাতাশ কিলোমিটার আরেকটা সাত কিলোমিটার দূরে। দ্বিতীয়টি থেকে পরদিন বিকালেই দুঃখ প্রকাশ সূচক ফোন এলো, আমরা বাসাটা পাব না। তিন জনের পরিবারের জন্য দুই রুমের বাসা নাকি খুবই ছোট (!), আমাদেরকে অন্ততঃ তিন রুমের বাসা খুঁজে নিতে হবে। কিঞ্চিৎ অনুনয়েও ভদ্রমহিলার মন গলানো গেল না। অথচ ইনিই দুই দিন আগে বাসার খোঁজ দিয়ে বলেছিলেন, দেখে পছন্দ হলে জানিও, আমি ব্যবস্থা করব। তার যেচে পড়ে সাহায্য করবার মানসিকতায় অবাক এবং খুশি হয়েছিলাম, ফ্ল্যাট ব্যবসার লাইনে এই জিনিসটা কম দেখেছি কিনা! অথচ আজ বলছেন, বসের কড়া হুকুম, তোমাদের বাসা দেয়া যাবে না। একটু দমে গেলাম। ভেতরে আরও ব্যাপার আছে নাকি?

অন্য বাসাটি বেশ আশা জাগিয়ে তুলল। প্রথমে কাগজ জমা দিয়েছি, বাসাও সাড়ে তিন রুমের। যার হাতে বাসা দেবার সিদ্ধান্ত, তার সাথে বার তিনেক ফোনে এবং সামনাসামনি কথা হয়েছে। প্রতিবারই আশ্বাস পেয়েছি, উনি দেখছেন ব্যাপারটা, সাধ্যের সবটুকু করবেন। চতুর্থবারে ফোন করে জানতে চাইলেন, আমি আগে কোন এজেন্সীর বাসায় থাকতাম? উনি তাদের সাথে কথা বলে দেখবেন আমি নিয়মিত ভাড়া দিই কিনা। এটাই শেষ হার্ডল। আমি জানালাম, আমি তো আমার বন্ধুর সাথে একটা বাসা শেয়ার করে থাকি। তার ফোন নম্বর দেব? উনি বললেন, না না, তোমার বন্ধু না, আগে যে এজেন্সীর বাসায় থাকতে তাদের নাম বল। মাথায় বিপদ সংকেত বেজে উঠল। আগের এজেন্সীকে ফোন করলে তারা কি ফীডব্যাক দেবে এটা পরিষ্কার। একবার ভাবলাম বলি, আমি শুরু থেকেই আমার বন্ধুর সাথে থাকি। তারপর মনে পড়ল, এপ্লিকেশনে লিখেছি আমি পিদ্যুতে থাকি মে মাস থেকে, এটা ধোপে টিকবে না। ওরা বুঝেশুনেই ফোনটা দিয়েছে। হতাশ গলায় বললাম, আমি আগে যে বাসায় থাকতাম সেখানে একটা সমস্যা হয়েছিল। ব্যাপারটা আইনজীবী পর্যন্ত গড়ায়। এজেন্সীকে ফোন দিলে আমার নামে শুধুই বদনাম শুনবে। আমার উকিলের কাছে সব কাগজপত্র আছে, তার সাথে কথা বলতে কি তুমি আগ্রহী? নাহ, ম্যাডাম আগ্রহী নন। সব গেল!

পরদিন সকালে আবার জনাবার অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। উদ্দেশ্য, যদি কথা বলে কিছু লাভ হয়। ভদ্রমহিলা জানালেন তার পক্ষে আমাকে বাসা দেয়া সম্ভব নয়, আগের এজেন্সী কন্ট্রাক্ট টার্মিনেট করেছে, এর মানে হচ্ছে আমি ক্রিমিনাল। আমাকে বাসা দিলে এজেন্সী হিসেবে ওদের রেপুটেশন নষ্ট হবে। আমি আরও কিছুক্ষন আলাপ করতে চাচ্ছিলাম, এই পর্যায়ে ওনার বস (বদরাগী এক বুড়ো) বের হয়ে এসে ঝাড়ি দিলেন, এর সাথে এত আলাপ কিসের? তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন চোখে তাচ্ছিল্য নিয়ে বললেন, জনাব, আমরা আপনাকে বাসা দেব না। দুঃখিত, আপনি আসুন। এই কুৎসিত অপমানের পর কথা বাড়ানো সমীচীন নয়। তবুও আমি মরিয়া হয়ে ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, একটি এজেন্সীর সাথে আমার ঝামেলা হয়েছে বলে কি আমি সুইজারল্যান্ডে আর বাসা ভাড়া নিতে পারব না? উনি বললেন, ঠিক তাই। আমরা এজেন্সীগুলো একে অন্যের স্বার্থ দেখব এটাই স্বাভাবিক। তুমি চেষ্টা কর অন্য কারো নামে বাসা ভাড়া নিতে, এছাড়া আমি কোন উপায় দেখি না।

অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, অক্টোবরের দুই তারিখে আমার মেয়ের বার্থ ডেট দেয়া, সেপ্টেম্বরের এক তারিখের মধ্যে বাসা আমাকে পেতেই হবে যে কোন মূল্যে। চূড়ান্ত হতাশ হয়ে প্রফেশন্যাল হাউজ হান্টারদের সাথে যোগাযোগ করলাম। ওদের চার্জ অনেক বেশি, কেউই তিন হাজার ইউরোর নিচে কাজ করতে চায় না। একটা বাড়ি খুঁজে দেবার চার্জ এত বেশি, মেনে নেয়া খুব কঠিন। কিন্তু আমি নাচার! আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। একজনকে আড়াই হাজারে রাজি করিয়ে গত সপ্তাহে কন্ট্রাক্ট সই করেছি। সে দুটি বাসা দেখালো, একটার সাথে স্কুল একেবারে লাগোয়া, সেটাই আমার পছন্দ বলে জানিয়ে দিয়েছি। আমি সন্দিহান ছিলাম, আমার এজেন্ট আমার বদনাম ঢাকবে কি দিয়ে। সেই মহৌষধের নাম সম্ভবতঃ টাকা। মানি টকস এভরিহোয়্যার, এজন্যই এদের এত ফি। গতকাল সে ফোন করে জানিয়েছে, সব ঠিকঠাক, আমি বাসা পাওয়া নিয়ে যেন কোন চিন্তা না করি।

আমার গল্প আপাততঃ এই পর্যন্তই। আমার নিজের হিসেবে, ইউরোপে অভিযোজনের একটা বিরাট কোর্স হয়ে গেল গত একবছরে। আমার লক্ষ্য থাকবে এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে যে কোন জায়গায় ঝামেলা যতখানি সম্ভব বাঁচিয়ে চলা। আমার অভিজ্ঞতা পাবলিক ফোরামে শেয়ার করতে শুরু করেছিলাম এই ভেবে যে কেউ না কেউ এখান থেকে তথ্য নিয়ে নিজে একই ধরণের পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারবেন। এখন মনে হচ্ছে তার দরকার হবে না, সচলের পাঠকেরা আগে থেকেই অনেক বেশি সচেতন। ভালো থাকুন সবাই, এই শুভকামনা রইল। যারা বিভিন্নভাবে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাদের প্রতি আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা। পুরো সিরিজে নানা অভিযোগের একঘেয়ে বর্ণনা দিয়ে একেবারে বিরক্ত করে ছেড়েছি পাঠকদের, তাই ভাবলাম একটা আধা প্রাসঙ্গিক কৌতুক শোনাই। জনৈক ভারতীয় সর্দারজি লোকাল বাসে ভ্রমণ শেষে তার বন্ধুকে অনুযোগ করছিলেন, জানো, পুরো রাস্তা খুব কষ্ট পেয়েছি, সিটে একটা পেরেক উঁচু হয়ে ছিলো, বিঁধছিলো খুব। বন্ধু বললেন, কারো সাথে সিট বদল করে নাও নি কেন? সর্দারজির জবাব, আরে কার সাথে বদলাবো, বাসে কেউ থাকলে তো?

আমার কাহিনীও অনেকটা এরকম। পেরেকটা বিঁধছিলো খুব। তবে তফাত হলো, সর্দারজির সিট বদলের সুযোগ থাকলেও আমার ছিলো না।

ইয়াসির
arafat.is.yasirঅ্যাটgmail.com

(সমাপ্ত)

পুনশ্চঃ ইন্টারনেটে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায় একটি দেশে আসার আগে কি কি জেনে নিতে হবে সে সম্পর্কে। প্রথমে ভেবেছিলাম আমিও আমার মত একটা তালিকা তৈরী করে দিয়ে দিই এই লেখার সারসংক্ষেপ হিসেবে। পরে মনে হলো, পুরো তালিকা অপ্রয়োজনীয়। শুধু সেগুলোই দিয়ে দিচ্ছি যেগুলো ওয়েবে পাই নি

১। পার্সোনাল লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্সঃ খুব কাজের জিনিস। আপনার আইনগত ঝামেলা বীমা কোম্পানি সামলাবে। পুরো বছরের প্রিমিয়াম তিনশো ইউরোর মত। কিন্তু ইন্স্যুরেন্স না থাকলে প্রতিষ্ঠিত উকিলের সাথে একটা ভিজিটেই চারশ ইউরো বেরিয়ে যেতে পারে। আপনি যদি পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় মানুষ হয়ে থাকেন যিনি পুরো জীবনে কারো সাথে বিবাদে জড়াননি, তবুও সুইজারল্যান্ডে আসলে এটা করে রাখবেন। বিপদ কখন কোন দিক দিয়ে আসে বলা যায় না।

২। সুইজারল্যান্ডে কোন অ্যাপার্টমেন্ট রেন্টাল এজেন্সীকে চটাবেন না, আপনার পকেটের বারোটা বেজে যেতে পারে। যদি ঝামেলা দেখেন, বি প্রোঅ্যাক্টিভ, নিজে থেকে কন্ট্রাক্ট বাতিলের নোটিশ পাঠাবেন, যাতে গলা বড় করে বলতে পারেন ওরা আপনাকে নয়, আপনিই ওদেরকে একহাত নিয়েছেন। নতুন বাসার অ্যাপ্লিকেশনের সাথে ওটার একটা কপি লাগিয়ে দেবেন।

৩। সুইজারল্যান্ডে গাড়ির ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম আপনার জাতীয়তার ওপর নির্ভর করে। আমি যে প্যাকেজটা নিয়েছি, সেটার ফি পনেরশ’ পঞ্চাশ সুইস ফ্র্যাঙ্ক। ওই একই প্যাকেজ সুইস/স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের জন্য ছয়শ আর বাকি ইউরোপীয়ানদের জন্য সাড়ে নয়শ ফ্র্যাঙ্ক। এশীয়রা এলিট গ্রুপের বাইরে।

৪। সুইজারল্যান্ডের যে অংশে আপনি থাকতে আসবেন, জেনে নিন তার ভাষা কি। সেই ভাষাটা অবশ্যই শিখে আসবেন, অনেক উটকো ঝামেলা থেকে রেহাই পাবেন তাতে। ইংরেজীর ভরসায় থাকলে আপনি বাদ।

৫। সুইজারল্যান্ডে স্পীড ক্যামেরার সংখ্যা অত্যন্ত বেশি, স্পীড লিমিট মেনে গাড়ি না চালালে প্রতি পদে পদে ফাইন খেতে হতে পারে। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলও এই সিস্টেমের আওতাভুক্ত, কাজেই সাধু সাবধান!

৬। আপনার প্রতিবেশী যদি হয় কোন রাত জাগা বুড়ি, যদি আপনি চল্লিশ বা ততোধিক বৎসর পুরনো কোন বিল্ডিঙয়ের বাসিন্দা হয়ে থাকেন, রাত তিনটায় বাথরুমে বড় কাজের জন্য না যাওয়াই ভালো, পরের দিন অফিশিয়াল কমপ্লেইন পেতে পারেন গভীর রাতে ফ্ল্যাশের শব্দে পাবলিক ন্যুইসেন্স ক্রিয়েট করার জন্য (এটা অবশ্য ওয়েবেই পেয়েছি হা হা)


মন্তব্য

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

অষ্টম আর নবম পর্ব একসাথে পড়লাম। ছারপোকা খুবই খারাপ। এর কামড় যে খেয়েছে সেই জানে কেমন। আপনার ছেলেটার ত খুবই কষ্ট হয়েছে।

যাই হোক, সবকিছু অতিক্রম করে আপনারা এখন ভালো আছেন, এই ভেবে ভালো লাগছে।
সেপ্টেম্বরের দুই তারিখের জন্য আগাম শুভেচ্ছা। হাসি

ইয়াসির এর ছবি

আপনি বোধহয় বলতে চেয়েছেন অক্টোবরের দুই তারিখ? হাসি

আমরা ভালো আছি, অন্ততঃ তাই ভাববার চেষ্টা করছি সবসময়। আপনাকে ধন্যবাদ

অতিথি লেখক এর ছবি

আমিও বাসা খুজতে গিয়ে লাইনের সবার পেছনে। পরে এজেন্সিকে (দালাল) দিয়ে বাসা নিয়েছি। যদিও পকেট কাটে কিন্তু ঝামেলা কম।

আগামী দিনগুলো সুখের হোক।

...ফ্রুলিংক্স

ইয়াসির এর ছবি

আমরাও একই আশা করছি, খারাপ দিন তো আর চিরকাল চলতে পারে না! এবার খালি ঘুরব হাসি কখনো যদি এদিকে আসেন, জানাইয়েন কিন্তু

অতিথি লেখক এর ছবি

মধুরেণ সমাপয়েৎ না হলেও ভালোভাবে শেষ তো হলো - আপনি এখন ভালো আছেন জেনে ভালো লাগছে।
যদি সম্ভব হয়, প্রবাসের আরো অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন (আপনি এবং অন্যান্য প্রবাসী সচলরা)।
ধন্যবাদ।
-অয়ন

ইয়াসির এর ছবি

আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। হাসি

ফাহিম হাসান এর ছবি

যাক, দুঃখের দিন শেষ হল। আপনার জন্য সমবেদনা।

আপনার হাত কিন্তু খাসা - অন্য বিষয়ের উপরও লিখুন না!

ইয়াসির এর ছবি

সমবেদনা শব্দটিতে অস্বস্তি লাগছে কেন জানি।

তবে ঝামেলার দিন প্রায় শেষ এটা ঠিক। ছোট ছোট ঘটনা এক্ত্র হয়ে কি বিশাল পেইন দিতে পারে এটা শিখলাম এখানে এসে।

অন্য বিষয় নিয়ে মনে হয় লিখব, তবে সময় লাগবে বহুত । বুঝতেই পারছেন সামনে নতুন সদস্যের পেছনে অনেক অনেক ব্যস্ত থাকব (কিছু আসে না মাথায় এটাই মূল সমস্যা যদিও)। দোয়া রাইখেন

babunee এর ছবি

এক বসায় আপ্নার পুরা সিরিজ টা পড়লাম। সেশ পরজন্ত সব ভালয় ভালয় সেশ হয়েচে দেখে ভাল লাগ্ল। october দুই এর জন্ন শুভকামনা রইল।

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি

আপনার ধৈর্যের প্রশংসা করছি বাবুনী। পুরোটা এক বসায় পড়তে হলে কিঞ্চিৎ মাথা গরম হওয়া অসম্ভব নয়। অনেক ধন্যবাদ

কল্যাণ এর ছবি

আপনার সিরিজ পুরাটা একসাথে পড়লাম। আমি ভাবতাম দুনিয়ার যত আজিব সমস্যা আমারেই বিশেষভাবে খোঁজে।

অভিযোজন কাকে বলে, কত প্রকার এবং কি কি হাড়ে হাড়ে জানি। একই জায়গায় একেক জনের একেক রকম অভিজ্ঞতা হয় এইটাও নিজে ঠেকে শিখেছি। মাপুতো গেলে পুলিস আজো হুদাই শুধু আমার কাছেই ড্রিঙ্কের পয়সা চায়। কারণ এইখানে অবস্থানরত বিপুল ভারতীয় পাকিস্থানী আর কিছু বাংলাদেশীরা এই কালচার তৈরি করে দিয়ে গেছে। সন্ধ্যা সাতটায় জোবার্গ ইমিগ্রেশন পুলিস ধরে নিয়ে যেয়ে বলেছে আমার ভিসা নকল, আমারে ডিটেনশনে পাঠাবে। আমাকে দুই ঘন্টা জেরা করেছে আবার পুরাটা সময় স্যার স্যার বলেছে। জোবার্গে যে পাড়ায় আমি থাকি, রাত আটটায় হেঁটে শপিং করে বাসায় ফিরেছি (গরীব মানুষ, গাড়ি নাই তাই চরণ বাবুই ভরসা), কিন্তু শহরে বিকেল বেলায় হাইজ্যাক হয়ে যাওয়ার শত শত ঘটনা শুনতে পাই। সুতরাং আপনার একজনের অভিজ্ঞতায় বা বিচারে পুরা সুইস জাতরে বজ্জাত বললে তারা বজ্জাত হয়ে যায় না। আবার আপনার ভোগান্তিটাও মিথ্যা না, সুতরাং আপনার কাছে সুইসরা হাড় বজ্জাত হইতেই পারে। এতে কারো কিস্যু যায় আসে না।

আপনার লেখায় আমি জাতিগত বিদ্বেষ পাইনি। বরং বিদেশ বিভূঁইয়ে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা দেখতে পেয়েছি। যাইহোক, আপনার লেখায় ফাহিম ভাই আর হিমু ভাই এর মন্তব্য খুব ভালো লেগেছে। পিপিদাও বলে গেছে - আমার মনে হয় লেখককে তার মতো লিখতে দেয়া দরকার। এইটা একটা অসাধারণ কথা। মানুষের স্মৃতিচারণ হইল তার একান্ত ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা আর তার ফলে উদয় হওয়া চিন্তা ভাবনার সমষ্টি। সেই চিন্তা ভাবনা মডারেট করে সর্ব্জন পাঠ্য করে যদি লিখতে হয় তাহলে কি আর পিওর স্মৃতিচারণ থাকল? অভিজ্ঞতা আপনার, এর ফলে ভালো মন্দ সুখ অসুখ সবি আপনার। লিখে ফেলেন। খালি একটা কথা, আপনার অভিজ্ঞতার পরিনতিতে যদি আপনি আজকে নব্য নাৎসি পার্টি খুলে ফেলেন বা একটা মেহেরজান প্রসব করেন তাহলে সেটার কন্সিকোয়েন্সো আপনারেই সামলানো লাগবে। মারধোর ঝাড়িঝুড়ি গাল মন্দগুলাও তখন আপনারই হজম করা লাগবে শয়তানী হাসি

একটা মন্তব্য অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক আর ব্যাক্তিগত আক্রমনের মত লেগেছে। কাউকে দাওয়াত দেওয়া না দেওয়া মানুষের নিজস্ব ব্যাপার, সেটা ফোরামে লিখিত দেওয়ার দরকার দেখি না যেখানে সোজাসুজি না করে দেওয়ার মত যোগাযোগের সুযোগ আছে।

সব কথার শেষ কথা হল জীবনে কিছু ঠেলা ধাক্কা না থাকলে পানসে হয়ে যায় না সব?

এই সব ছাড়েন, ভালু একটা পরামর্শ দেই। জোবার্গ আইসা পড়েন আবার। আফ্রিকার মত যায়গা দুনিয়ায় দুইটা নাই, কি কন?

লেখা চলুক।

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি

ওরেব্বাস! বিশাল মন্তব্য। কোনটা ছেড়ে কোনটা কই?

প্রথমেই ভাই বুকে আসেন। সাউথ আফ্রিকারে নিজের দেশের মত লাগে, সেই দেশে কেউ থাকে শুনলে সে কত ভালো যায়গায় আছে সেইটা ভাবলেই মনে গভীর আনন্দ হয়। শেষ লাইনটাই মনে ধরছে সবচে বেশী, সব ঝামেলা ফালায়া সেঞ্চুরিয়নে চইলা যামু, এইটা আমরা প্রতি দুই সপ্তাহে একবার চিন্তা করি, তারপর বাস্তবতার কাছে হাইরা ক্ষ্যান্ত দেই।

আপনের মাপুতো আর জোবার্গের কাহিনী লিখছেন নাকি কোথাও? থাকলে লিঙ্ক দিয়েন, পড়তে আগ্রহী আমি। আফ্রিকায় আপ্নের কতদিন হইল?

সুতরাং আপনার একজনের অভিজ্ঞতায় বা বিচারে পুরা সুইস জাতরে বজ্জাত বললে তারা বজ্জাত হয়ে যায় না। আবার আপনার ভোগান্তিটাও মিথ্যা না, সুতরাং আপনার কাছে সুইসরা হাড় বজ্জাত হইতেই পারে। এতে কারো কিস্যু যায় আসে না।

খাঁটি কথা, আমার মনে হয় বেশিরভাগ পাঠকই এটা বুঝেছে, দুই একজনের বিচ্ছিন্ন মন্তব্য যা এসেছে ওগুলো না এলেই বরং অবাক হতাম।

বা একটা মেহেরজান

কস্কি মমিন!

কল্যাণ এর ছবি

হ মন্তব্য বেশি বড় হয়ে গেছে। লইজ্জা লাগে

আফ্রিকায় আমি সাড়ে তিন বছর। আমার কাহিনী কোথাও লিখি নাই। কয়েকবার শুরু করেও পরে নিজে পড়তে যেয়ে দেখি যা লিখতে চেয়েছি সেটা লিখতে পারি নাই। ধৈর্যেও কুলায় ওঠে নি। ছাইপাঁশ না লিখে শেষমেশ তাই ক্ষান্ত দিছি। পেটে আছে, কোন একদিন শুরু করে দিব সেই আশায় আছি এখন।

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

রায়হান আবীর এর ছবি

দেরী হলেও পড়ে গেলাম। হ্যাপি এন্ডিং হাসি

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি

থ্যাঙ্কু, থ্যাঙ্কু আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

তিথীডোর এর ছবি

পুরো সিরিজ এতদিনে একসাথে পড়লাম। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

ইয়াসির আরাফাত এর ছবি

পুরোটা পড়ে ফেলেছেন? আপনার ধৈর্য্য সাংঘাতিক।

আমি মাঝে মাঝে নিজের পুরনো লিখায় চোখ বুলাই। এই সিরিজে আসলে ভাবি, ক্রমাগত অভিযোগের মেলা বসিয়ে পাঠককে হয়তো ম্যালা বিরক্ত করে তুলছিলাম।

আপনার কি মনে হলো?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।