অরগ্যানিক ইলেক্ট্রনিক্সঃ ভবিষ্যতের পরশ পাথর (পর্ব-৪)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০৯/০৬/২০১৪ - ৬:৪৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পর্ব ১-এ ছিল সিলিকনের বিকল্প কি হতে পারে তার সূচনা
পর্ব ২-এ ছিল সেই বিকল্প পেতে আমাদের পরমানু-তারেকানু পর্যায়ে কি শর্ত মানতে হবে সেই গল্প
পর্ব ৩ ছিল সেই শর্ত মেনে তৈরী করা বিকল্পটা কার্বন থেকে তৈরী, মানে কি না, জৈব (অরগ্যানিক)-সেই নিয়ে

পর্ব ৩ শেষ করেছিলাম বিষ্ময় পরমানু কার্বন, যা দিয়ে বস্তুজগতের প্রায় ১০ ভাগের ৯ ভাগ বস্তুই তৈরী, সেটা দিয়েই আমাদের সিলিকনের বিকল্প কোন উপ-পরিবাহি তৈরী করতে হবে-সেই কথা বলে। কিন্তু কিভাবে? কেমন করে হাতে আসবে আমাদের সেই প্রাণ-ভোমরাটা? আসুন তাহলে শুরু করা যাক! প্রথমেই আসুন চেষ্টা করে দেখি কার্বন বাবাজির হৃদয় ছুঁয়ে দেখা যায় কিনা! চলুন দেখি এর ঘটে কি এমন আছে যে, ৯০% বস্তুই এর তৈরী! কেমন করে গান করে এই গুণী

বলেছিলাম, কার্বন হচ্ছে ৬ জোড়া ইলেকট্রন-প্রোটন ব্যবস্থা। ইলেকট্রনগুলো প্রোটনগুলোকে (এবং নিউট্রনগুলোকে) কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ঘুরছে। ৬ টি ইলেকট্রনের মধ্যে ৬ নম্বরটা সবচেয়ে দূরে, আর ১ নম্বরটা সবচেয়ে কাছে। বলেছিলাম, বাইরের কোন ইন্ধন, এই যেমন ধরুন, তাপমাত্রা কিংবা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার জন্যে কোন উদ্দীপক বা ধরুন, ভোল্টেজ পার্থক্য ইত্যাদিতে সবচেয়ে দূরের ইলেকট্রনটাই লাফিয়ে পরে, যত্তসব কান্ড কারখানা ঘটায়। মানে কিনা, ঐ শেষের ইলেকট্রনই এই সবকিছুর জন্য দায়ী। সেদিক থেকে ১ নং বা ২ নং ইলেকট্রনগুলো একদম মায়ের বাধ্য ছেলে; নড়েও না, চড়েও না। তাহলে বুঝতেই পারছেন কেন হয় এমনটা? ঐ কেন্দ্রের সাথে বনিবনা যার যত কম, সে তত সহজে কেন্দ্র ছেড়ে, মানে কিনা, পরমানু ছেড়ে চলে যায়। অনেক সময় একাধিক ইলেকট্রনও চলে যায় পরমানু ছেড়ে, কারণ তারা প্রথমত, শেষের দিককার ইলেকট্রন আর দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রের সাথে তাদেরও বনিবনা কম থাকে। তো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই যেহেতু নতুন নতুন বস্তু তৈরী হয় সেহেতু যে পরমানুর শেষের দিক থেকে যতবেশি ইলেকট্রন ছাড়িয়ে নেয়া যাবে, সেই পরমানু থেকে তত বিভিন্ন বৈচিত্র্যের বস্তু তৈরী করা যাবে। ধরুন, লোহা থেকে যদি শেষের ২টা ইলেকট্রন ছাড়িয়ে নিয়ে অক্সিজেনের সাথে মিলমহব্বত করিয়ে দেয়া যায় তাহলে তৈরী হয় এক ধরনের অক্সাইড, যার নাম ফেরাস অক্সাইড; আবার ৩টা ইলেকট্রন ছাড়িয়ে তৈরী করা যায় অন্য ধরনের অক্সাইড, যার নাম ফেরিক অক্সাইড। দেখুন কেমন কান্ড! একই লোহা, একই অক্সিজেন কিন্তু তৈরী করা বস্তুতে কত বৈচিত্র্য!

তাহলে এতক্ষণে আপনি ভালই বুঝতে পেরেছেন, কার্বন বাবাজির কেন এত দৌড়! নিশ্চয়ই ঐটা ওর ঐ শেষের ইলেকট্রন নিয়ে ভালই খেলা দেখাতে পারে! ভাল মানে কি শুধু ভাল, সবচেয়ে ভাল! এর মতন আর কেউই পারে না। ওমন পলক ফেলতে তো কেউ পারে না

আসলে কার্বনের ৬টি ইলেকট্রনের মধ্যে শেষের ৪টি ইলেকট্রনই ঝাপিয়ে পরে বাইরের ইন্ধনে। আর তাই এর থেকে তৈরী বস্তুর বৈচিত্র্যেরও অভাব নেই! তবে সেইটিই শেষ কথা নয়! এই ৯০ ভাগ বস্তু তৈরী করার জন্য তার আরও দুটো বিষয় আছেঃ
১/ কার্বনের শেষের ঐ ৪টা ইলেকট্রন নিজেরা মিলেমিশে এমন এক অবস্থা তৈরী করে যে ঐ ৪ টা ইলেকট্রনেরই শক্তি হয়ে যায় 'সমান'। তখন তারা অন্য যেকোন পরমানুর সাথে মিলেমিশে যেতে পারে। এটাকে হাইব্রিডাইজেশন বলে। অন্য কিছু পরমানুও কিছুটা হাইব্রিডাইজেশন দেখায়, তবে কার্বনের সাথে কোন তুলনাই হয় না। আর
২/ এই বিশেষ হাইব্রিডাইজেশনের ক্ষমতাবলে একটি কার্বন পাশের কার্বনকে, তারপরের কার্বন তার পরেরটাকে, এভাবে ইচ্ছেমতন, যেমন খুশি, যেদিকে খুশি লম্বা-লম্বা চেইন বানাতে পারে।

ধরুন, একটা কার্বনের সাথে আছে অক্সিজেন, আরেকটার সাথে আছে সালফার আর আরেকটার সাথে আছে নাইট্রোজেন। এখন এই ৩ টা ভিন্ন বস্তুর ৩টা কার্বন আবার নিজেরা চেইন বানাতে পারে। তাহলে, কি হলো? হলো এই যে, ৩ কার্বনের হলো মেলা ভবে এসে! এই তৈরীকৃত ৩ কার্বনের চেইনটাতে কার্বনগুলোর একটা অক্সিজেন, আরেকটা সালফার, আর শেষেরটা নাইট্রোজেন ধরে আছে। বেশ না? তো ধরুন, এখন অন্য আরেকটা বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী একটা ১০০ কার্বনের চেইন। মজা হচ্ছে, ঐ ১০০ কার্বনের চেইনটা ঐ ৩ কার্বনের ছোট্ট চেইনটার সাথে লাগিয়ে দিলে হয়ে যায় অন্য একটি নতুন বস্তু যার কার্বন সংখ্যা ১০৩! এই ১০৩ কার্বনের চেইন কিন্তু সোজাসুজি ১০৩ কার্বন চেইনের থেকে পুরোপুরি ভিন্ন! যদিও তাদের কার্বন সংখ্যা সমান, কিন্তু একটার সাথে অক্সিজেন, সালফার, আর নাইট্রোজেন থাকাতে তা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বস্তুতে পরিণত হয়। আবার ধরুন, ঐ ১০৩ কার্বনের অক্সিজেনটা যদি কোন অন্য পরমানুর সাথে গাঁটছড়া বাঁধে, ধরুন, ফ্লুরিন; তাহলে এই নতুন ১০৩ কার্বনের বস্তুটাতে একটা ফ্লুরিনও থাকবে। এই দুইটা আপাত প্রায় একই রকম বস্তুর বৈশিষ্ট্য ঐ শেষের ফ্লুরিনের জন্য হতে পারে আকাশ-পাতাল। উদাহরণ হিসেবে বলছি, একটা হয়ত কঠিন, সহজেই গলে যায় আর আরেকটা হতে পারে বায়বীয়।যাইহোক, এখানে একটা উদাহরণ দেখে নিন টুক করে। লক্ষ্য করুন, এই চিত্রে বাম পাশ থেকে ২ নং কার্বনটা আরেকটি কার্বনকে আর ৩ নং কার্বনটা একটি ব্রোমিনকে ধরে আছে। খেলা এখানেই শেষ নয়! ঐ যে বললাম হাইব্রিডাইজেশন; সেই কারনে একটা চেইনের মধ্যে পাশাপাশি দুটো কার্বন আবার ৩ রকম ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গীতে জোড়া লাগতে পারে। তাহলে বুঝতেই পারছেন, বৈচিত্র্যের আর শেষ নেই!

আবার ধরুন, ২টা কার্বন, প্রত্যেকের সাথে আছে ২টা করে হাইড্রোজেন; মানে, ২ কার্বন, ৪ হাইড্রোজেন। এই ২ কার্বন বিশেষ হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে জোড়া লেগে তৈরী করে ইথিলিন। এখন, এই ইথিলিন যদি অনেকগুলো পাশাপাশি বসে একটা চেইন বানায় সেটাকে বলে পলি-ইথিলিন, যেটাকে আমরা সচারাচর পলিথিন বলে চিনি আর কি! এইরকম কার্বনের চেইন বানানোকে বলে পলিমারকরণ (পলিমারাইজেশন)। ইথিলিনের পলিমারকরণ থেকে পলি-ইথিলিন, এইভাবে ভিনাইল-ক্লোরাইডের পলিমারকরণের মাধ্যমে পলি-ভিনাইল-ক্লোরাইড ইত্যাদি পলিমার পাওয়া যায়। এখন, আপনি যে প্লাস্টিকের চেয়ারটাতে বসে আছেন সেটাও পলি-ইথিলিন, আর বাজারের ঐ নিষিদ্ধ পাতলা ব্যাগ, সেটাও পলি-ইথিলিন। আবার দূর্ঘটনায় কারো চোয়াল, হাড় ভেঙ্গে গেলে চামড়ার মধ্যে কৃত্রিম হাড় বানানো হয় যে প্লাস্টিক দিয়ে, সেটা কিন্তু ঐ একই পলি-ইথিলিন। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, এক্ষেত্রে সেটা হবে শুদ্ধতম পলি-ইথিলিন, প্রায় ৯৯% শুদ্ধ, যেটা বাজারের ব্যাগ বা প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল বানাতে দরকার হয় না, ৮০% শুদ্ধতাই সেসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট। একইভাবে, আপনার চার্জারের তারের উপরের প্লাস্টিকের আবরণটা এক ধরনের পলি-ভিনাইল-ক্লোরাইড (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) আর আপনার বাসার পাইপ, সেটাও পলি-ভিনাইল-ক্লোরাইড। আপনি হয়ত পিভিসি পাইপ নামে চেনেন! তো বুঝতেই পারছেন, এখানে ভিন্ন মাত্রার পলিমারকণ করে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বস্তু তৈরী করা হয়েছে, যদিও তারা একই। সাধারণভাবে বলছি, চেইনে যত বেশি কার্বন, বস্তুটা ততবেশি শক্ত।

আরেকটা মজার ব্যাপার করতে পারে এই কার্বন বাবাজি, আর ঐটাও আমাদের প্রাণ-ভোমরাটার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, ৬ টি কার্বন। এরা পাশাপাশি বসে একটা চেইন তৈরী করলো; কিন্তু করলো কি, ১ম আর ৬ষ্ঠ কার্বনটা আবার মিলে গেল। মানে কিনা, এরা ৬ কার্বনের একটি ষড়ভূজ (হেক্সাগন) তৈরী করলো যার ৬টা বাহু আছে আর ৬টা কোনায় ৬টা কার্বন আছে। মজাটা হচ্ছে, এই ৬টি কার্বন এমনভাবে ষড়ভূজ তৈরী করে যে ১ম-২য় টা এক রকমের হাইব্রিডাইজেশন, ২য়-৩য় টা অন্য রকমের হাইব্রিডাইজেশন; ৩য়-৪র্থ টা আবার প্রথম রকমের হাইব্রিডাইজেশন, ৪র্থ-৫ম টা আবার দ্বিতীয় রকমের হাইব্রিডাইজেশন; ৫ম-৬ষ্ঠ টা আবার প্রথম রকমের হাইব্রিডাইজেশন আর সর্বশেষ ৬ষ্ঠ-১ম টা দ্বিতীয় রকমের হাইব্রিডাইজেশন। একটু অসুবিধা হচ্ছে কি! এভাবে দেখুন ব্যাপারটাকেঃ ধরুন, দু ধরনের হাইব্রিডাইজেশনের নাম যদি দিই হাই-১ আর হাই-২, তাহলে ৬টা কার্বনের ষড়ভূজটা হাই-১, হাই-২ এর একটা পর্যায়ক্রমিক অবস্থান যেখানে এই হাই-১ আর হাই-২ মিলে কার্বনগুলোকে বেঁধে রাখে। সবগুলো কার্বনের সাথে ১টা করে হাইড্রোজেন যদি লাগিয়ে দেয়া যায় তাহলে এটা ৬ কার্বন আর ৬ হাইড্রোজেনের একটা ষড়ভূজ হয়। মানে কিনা, চিন্তা করুন, ৬টা কার্বন, হাই-১ আর হাই-২ করে করে গোল পাকিয়ে আছে যাদের প্রত্যেকের সাথে আছে একটা করে হাইড্রোজেন। এই বস্তুটাকে বলে বেনজিন। এক ঝলক এখানে দেখে নিন; ২ দাগ মানে হাই-২ আর ১ দাগ মানে হাই-১। এটা এমন গোল পাকানো কার্বনের জন্য সবচেয়ে সহজ ব্যবস্থা! এখানে একটু বলে নিই, হাই-১ বা হাই-২ নামে আসলে কিন্তু কিছু নেই, এদের নাম অন্য! সহজে বোঝার জন্যে ওভাবে বলছিলাম আর কি! আগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন।

যাই হোক, যা বলছিলাম, চেইন বানানো যেমন কার্বনের একটা বৈশিষ্ট্য; সেখানে যেমন হাইব্রিডাইজেশন থাকতে পারে, প্রধান চেইনের সাথে সাইড চেইন থাকতে পারে, তেমনি গোল পাকানোটাও কার্বনের আরেকটা বৈশিষ্ট্য। সেখানেও হাইব্রিডাইজেশন থাকতে পারে, যেকোন একটা কার্বন তার সাথের হাইড্রোজেনটাকে ছেড়ে সালফার কে ধরতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার কি হতে পারে দেখুন! এমনও হতে পারে যে ২টা বেনজিন তাদের এক কোনার একটা হাইড্রোজেনকে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা গাঁটছড়া বেঁধে বসতে পারে! মানে কিনা, ২টা বেনজিনের ষড়ভূজ পাশাপাশি লেগে যেতে পারে। এভাবে ৩টাও হতে পারে, ৪টাও হতে পারে! ষড়ভূজের চেইন এভাবে বাড়তেই থাকতে পারে! আবার এরা যে একটার পরে একটা বসে শুধু ষড়ভূজেরই চেইন বানাবে তাই শুধু নয়, ষড়ভূজগুলো মিলে জোট পাকিয়ে একটা ষড়ভূজের জাল বানাতে পারে! এভাবে ষড়ভুজগুলো একটার সাথে একটা লেগে বড় জাল বানালে সেটাকে বলে গ্রাফিন। আবার এইভাবে তৈরী জালটা মুড়িয়ে, এর সবপাশের কার্বনের মাথাগুলো লাগিয়ে দিয়ে যদি একটা বড় ফুটবলের মত তৈরী করা যায় সেগুলোকে বলে বাকমিনিস্টারফুলেরিন বা ফুলেরিন বা বাকি-বল। ঐ যেমন ফুটবলগুলো বানায় না অনেকগুলো ষড়ভূজ সেলাই করে, তেমন আর কি! এখানে বাকি-বলটা বা গ্রাফিনের জালটা কার্বনের ষড়ভূজ না হয়ে পঞ্চভূজ বা অনেকসময় ত্রিভূজ দিয়েও তৈরী হতে পারে। বাকি-বল আর গ্রাফিন এখানে দেখে নিন চট করে। (ভেবেছিলাম কোন চিত্র, ডায়াগ্রাম কিছু না দিয়েই লিখবো, পারলাম! )

যাক, অনেক আলোচনা হলো এই কার্বন বাবাজিকে নিয়ে! সাধে কি আর কার্বন 'কার্বন' হয়েছে! ঐ দামী ডায়ামন্ডটাও কার্বনের, ঐ পেন্সিলের শিসটাও কার্বনের। আপনি, আমি, ঐ ব্যাকটেরিয়া আর ঐ যে বার্গারটা খাচ্ছেন, সবই কিন্তু কার্বন থেকেই তৈরী! সবই জৈব! যতই সাই-ফাই মুভিতে অন্য কোন গ্যালাক্সির কোন এলিয়েন দেখাক, আর তা সিলিকন বা টারমিনেটরের 'পারদের' ই হোক, সব কিন্তু ভুয়া! এই মহাবিশ্বে, যদি কোথাও কোন প্রাণ থেকে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই কার্বনেরই হবে। আমাদের জানা-পরিচিত সব প্রাণিকূল থেকে হয়ত সেসবের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তা কার্বন থেকেই তৈরী হবে-এটা নিশ্চিত!

আজ এখানেই এই পর্ব শেষ করছি। আসছে পর্বে আমরা দেখবো এই হাইব্রিডাইজেশন, চেইন, বাকি-বল, গ্রাফিন ইত্যাদির মধ্যদিয়ে কি করে পরিবাহিতা পাওয়া যায়। আলোচনা করতে চেষ্টা করবো এসবের গবেষণা নিয়ে- আমরা বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছি এসবের গবেষণায়, আশার আলো কতটা দেখা যাচ্ছে, আরও কতদূর যেতে হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো। সবচেয়ে বেশি যেটা জোড় দেব সেটা হচ্ছে কেন আমাদের এই সিলিকনের বিকল্পটা দরকার-সেই আলোচনায়। সিলিকন দিয়েই তো সব করা যাচ্ছে, আমাদের তাহলে আর ঐ প্রাণ-ভোমরার খোঁজ করার দরকারটা কি? শুধু কি ঐ সকালবেলা আয়নাতে রেটিনা নেভিগেশন দিয়ে ইমেইল চেক করার নতুন ডিভাইস বানিয়ে যাতে ঐ জায়ান্ট ইলেক্ট্রনিক্স 'ক্যাপিটালিস্ট'রা আরও পয়সা কামাতে পারে সেই ব্যবস্থা করার জন্য এই প্রাণ-ভোমরা খুঁজে মরছি? আর কি কোন কারণ নেই? এ দিয়ে কি এইরকম সব 'ফ্যান্সি' জিনিসই হবে নাকি আসলেই আম-জনতার কোন কাজে আসবে? মানব-সভ্যতার কোন কাজে কি লাগবে ঐ প্রাণ-ভোমরা? কোন কাজে লাগবে? এসব জানবো আমরা আসছে পর্বগুলোতে, ততদিন অপেক্ষা করিয়ে রাখলাম তাহলে! আকর্ষণ ধরে রাখতে শুধু এটুকু বলে রাখি, আমাদেরকে প্রাণ-ভোমরাটা খুঁজে বের করতেই হবে। না হলে সভ্যতাই টিকিয়ে রাখা দায় হয়ে যাবে যে! আজ আর কাল, আমাদেরকে এই বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করতেই হবে।

যেতে যেতে ছোট্ট করে বলে যাইঃ এই যে আমরা এতক্ষণ কার্বনের বিভিন্ন উপায়ে, বিভিন্ন বৈচিত্র্যের বস্তু বানানোর কথা জানলাম, সেগুলোর বিভিন্ন পর্যায় আবিষ্কার আর তার ব্যাখ্যা করে নোবেল পেয়েছেন অনেকজন বিজ্ঞানী। এক ঝলকে উইকির এখানে দেখে নিন। আমার জানামতে এখানে যে ২ টা যুগান্তকারী আবিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না সেগুলো হচ্ছেঃ
১/ ঐ বাকি-বলের জন্য নোবেল, যেটা ১৯৯৬-এ দেয়া হয়েছিল আর
২/ কার্বনের ষড়ভূজের জাল, মানে কিনা, ঐ গ্রাফিনের জন্য নোবেল, যেটা ২০১০ সালে দেয়া হয়েছিল।
আরও হতে পারে, আমার জানা নেই। কত নাম না জানা মানুষগুলো; কত কি করে চলেছে তারা আপনার-আমার জন্য! এই সকল নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আর তাদের সহকর্মী বিজ্ঞানী, হয়ত তারা নোবেল পান নি, আমরা তাদের নামও জানি না তবু তাদেরই মেধায় আমরা এগিয়ে চলছি নিরন্তর, তাদের সকলের প্রতিই রইলো হৃদয়ের গহীন থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

ভাল থাকুন। ধন্যবাদ।
-স্বপ্নচারীর স্বপ্ন


মন্তব্য

মেঘলা মানুষ এর ছবি

হাততালি সিরিজ ভালোই এগুচ্ছে। কার্বন শেকল নিয়ে যখন আলোচনা করলেনই, কিছু ছবি লিংকে না দিয়ে লেখার মাঝে দিলে আম পাঠকের আরাম হত বিষয়টা আত্মস্থ করতে।
শুভেচ্ছা হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ হাসি
ইচ্ছে করেই দিই নি; পাছে ঐ ডায়াগ্রাম/স্কিমেটিক্স দেখে যাও একটু পড়ার আগ্রহ হয়, সেটাও যদি চলে যায়! হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

মেঘলা মানুষ,

আপনাকে লিখবো করে! কুর্সেরার নতুন কোর্স শুরু হয়েছে পলিমার সোলারের উপর। ডেনমার্কের টেকনিক ইউনিভার্সিটির। ৬ সপ্তাহের কোর্স, ২য় সপ্তাহ চলছে। সময় পেলে রেজিস্ট্রেশন করে শুরু করে দিতে পারেন! সপ্তাহে ২/৩ ঘন্টা খুব বেশি হলে!

[url=https://www.coursera.org/course/opv] অরগ্যানিক সোলার সেল-থিওরী এন্ড প্রাকটিস[ /url]

বেশ ভাল কিন্তু! হাসি

-স্বপ্নচারীর স্বপ্ন

এক লহমা এর ছবি

ভাল হচ্ছে। বেশ জমে উঠেছে। পরের পর্বের জন্য অবশ্যই অপেক্ষায় থাকছি।
ভাল লেগেছে আপনি ষড়ভূজ কথাটা ব্যবহার করেছেন বলে। আরো ভাল লাগবে চেইন-এর বদলে শিকল, শেকল, শৃঙ্খল এইসব লিখলে। আপনি ত আপনার পক্ষে যতটা করা সম্ভব হচ্ছে করছেনই, অনুযোগ নেই কোন। আমি শুধু আমার ভাল লাগার অনুভবের কথাটা জানিয়ে গেলাম। কি করা যাবে বলুন, আমি এই রকমই!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ হাসি
আপনি যে এরকমই, তা তো বুঝতেই পারছি! শিশুপালনের (বেবিসিটিং) দায়িত্বটা বেশ করে যাচ্ছেন! হাসি লেখার সময় তাই আপনার কথা আর হিম্ভাইর কথাই কিন্তু ভাবি! দেঁতো হাসি
ভাল থাকুন।
-স্বপ্নচারীর স্বপ্ন

অতিথি লেখক এর ছবি

এই মহাবিশ্বে, যদি কোথাও কোন প্রাণ থেকে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই কার্বনেরই হবে। আমাদের জানা-পরিচিত সব প্রাণিকূল থেকে হয়ত সেসবের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তা কার্বন থেকেই তৈরী হবে-এটা নিশ্চিত!

ভাই, এত নিশ্চিত হইলেন কেমনে? আমরাতো পুরো মহাবিশ্ব এখনো উল্টে পাল্টে দেখতে পারিনি। যেদিন মানুষ মহাবিশ্ব ঘুরে এসে বলবে,"এই মহাবিশ্বের সব কিছু দেখে ফেলেছি। কার্বন ছাড়া একটা প্রানীও দেখি নাই" ঠিক সেই দিন হয়তো আপনার কথাটা ১০০% সত্য হবে দেঁতো হাসি

লেখা পড়ে আনন্দ পাইতেছি। চলুক চলুক

সোহেল লেহস

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ সোহেল হাসি

আসলে ১০০ ভাগ নিশ্চিত কি কোন কিছুতেই হওয়া যায়? গাণিতিকভাবেই সম্ভব না! চোখ টিপি

এ ব্যাপারে একটু আধটু আগ্রহ আছে, কিছু পড়ে জেনেছি, কিছু কোর্স করেছি, করছি। তাই কিছুটা জানি আর কি! খালি কলসীর মতই হাসি তবে এ নিয়ে ধুন্ধুমার আড্ডা দেয়া যায় কিন্তু! দারুন বিষয়! অনেকে আলোচনাটা 'ওয়াচ মেকার'/ ধর্ম/দর্শনের দিকে নিয়ে নিতে চায় যদিও, তবে এটা পুরোপুরিই বিজ্ঞান। খুব বেশি এখানে লেখা/বলার সুযোগ নেই তবে এটুকু বলিঃ ধরুন, আলোর গতি কেন আমরা যেটা জানি সেটাই? কেন প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক ঐটাই? কেন ইলকট্রনের ভর ঠিক ঐটাই? এভাবে কখনও ভেবে দেখেছেন কি? এইসব ধ্রুবকগুলোর মানএকদম 'ফিক্সড' তাই আমাদের জানা মহাবিশ্বকে আমরা ঠিক যেমনটা দেখছি তেমনটাই দেখি। এ ব্যপারটা ধরে নিয়ে বলা যায়, জানা মহাবিশ্বে কার্বনেরই রাজত্ব। যদি অন্যকোন প্যারালাল মহাবিশ্ব থেকে থাকে আর সেখানে ভিন্ন একগুচ্ছ ধ্রুবক থেকে থাকে তাহলে সেই মহাবিশ্বে হয়ত অন্য কোন মৌল কার্বনের জায়গাটা নিতে পারে! নাও পারে! কিন্তু আমাদের জানা মহাবিশ্ব যেহেতু এরকম, তাই কার্বনই এখানের রাজা! তা আপনি যত আলোকবর্ষ দূরেই জান না কেন! হাসি

আরেকটা ব্যাপার একটু বলে রাখিঃ আমাদের ঐ দূরের নক্ষত্রটাতে কিন্তু যেতে হয় না ওটাকে প্রাথমিকভাবে জানতে। হাজার লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের ঐ নক্ষত্র এমনকি অধুনা তার গ্রহগুলোকে পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি! এইখান থেকেই কিন্তু বলে দিচ্ছি ঐখানে কতটুকু পরিমানে কি কি মৌল আছে! এবং সেটা কোন গাঁজাখুড়ি নয় কিন্তু! হাসি

কি যে এক আজব, অদ্ভুত সময়ে বেঁচে আছি! কত কিছু যে হচ্ছে! আর তারচেয়েও অদ্ভুত কি জানেন? আমরা এত দারুন একটা সময়ে আছি কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও আমরা বুঝতে পারি না! চেষ্টাটা পর্যন্ত করি না!

যাই হোক, ভাল থাকুন।
-স্বপ্নচারীর স্বপ্ন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA