কর্কট রোগ ও কয়েকটা কথা

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ৩১/১২/২০১৪ - ১২:২৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কেন যেন মনে হচ্ছে এই নামে অন্য একটা লেখা আমি আগেই পড়েছি, তাই অবচেতনে শিরোনামটা রয়ে গেছে। যদি তাই হয়, তাহলে একই নামে আবার লেখার দায়ভার আমি নিচ্ছি, কিন্তু বিষয়টা ইচ্ছাকৃত না। নিজের মায়ের মৃত্যুটা খুব কাছে থেকে দেখার পর ক্যান্সারের প্রতি এই অদ্ভুত ভীতিটা বেড়ে গেছে আরও কয়েক গুণ। কিছুদিন আগে একটা লেখা পড়ছিলাম, একজন ক্যান্সার রোগীর লেখা। লেখাটার সারমর্ম হল এই যে, “যখন আমার মৃত্যু হবে আমার সন্তানদের খুব সহজ ভাষায় বলবে যে আমার মৃত্যু হয়েছে, খুব দুঃখ প্রকাশের দরকার নেই, শুধু আমার কিছু ভাল কথা তাদের বল, আর বল যে আমার যদি ক্ষমতা থাকত আমি কখনো আমার সন্তানদের ছেড়ে যেতাম না। অতএব ওদেরকে কখনো বলবে না যে আমি পৃথিবী ছেড়ে আরো ভাল একটা জায়গায় চলে গিয়েছি। শুধু বল যে আমি বেঁচে ছিলাম, এখন আমার মৃত্যু হয়েছে!” “When I die someday just tell the truth: I lived, I died. The end!”

লেখাটা পড়ার পর খুব ইচ্ছা হয়েছিল সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করি, মনে হচ্ছিল আমার মা নিজের হাতেই লিখে গিয়েছেন। কিন্তু এটা পরার পর স্পষ্ট যেটা মনে হল যে বিষয়টা খুব সরল, শূণ্যতার জায়গাটা এরকমই থাকবে, তাই অনর্থক দুঃখ বা স্বান্তনার কোন মানে নাই। আমার মায়ের পৃথিবী ছিলাম আমরাই! বড় হবার সাথে সাথে আমাদের পৃথিবীটা শুধু আরো বড় হয়ে গিয়েছিল বোধহয়! তখন আমি মাস্টার্স করতে কানাডায়, মন্ট্রিয়ালের আমার ছোট স্টুডিওটাতে পরীক্ষা পড়ালেখার প্রচন্ড চাপ সামলে মাত্র সেমিস্টার ব্রেকে একটু ঠান্ডা হয়ে বসেছি। ঠিক তখনি বাসা থেকে ডাক্তার বড় বোনের ফোন, "আম্মুর একটা ছোট টিউমার ধরা পড়েছে, ক্যান্সার কি না এখন জানি না। তবে খুব দ্রুত চিকিতসা শুরু করতে হবে! আম্মু জানাতে বেশ খানিকটা দেরী করে ফেলেছে!" ঠিক সেই মুহুর্তের অনুভুতিটা কি ছিল সঠিক মনে নেই।

আম্মুর ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পরার পর অনেক ঘেটেছি বিষয়টা নিয়ে, পড়তে গিয়ে দেখছি আমাদেরও এই ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশি। পরিবারে খুব কাছের কারো থাকলে এই রোগ হবার ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেক গুণে। "Early detection" ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করার এক নম্বর পূর্বশর্ত! দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমার মা সংকোচ, ভীতি আর সামাজিক সংস্কারবশত ক্যান্সারের লক্ষণ সবাইকে জানাতে অনেক দেরী করেছিলেন। আমি জানি, মানুষের মৃত্যু যেখানে যেভাবে হবার সেভাবেই হবে, কিন্তু সব কিছুর পরও মনে হয়, শুধু যদি একটু আগে জানাত! কি মূল্য এই সংস্কারের যদি জীবনটাই না থাকল। হাত-পা, আর প্রতিটা অঙ্গের মত এটাও মানুষের স্বাভাবিক একটা অঙ্গ, এই সহজ কথাটা এতটা কাল ধরে সমাজ একটা রাখঢাকের মধ্যে কেন রেখে দিয়েছে আমার মাথায় ঢুকে না!

মাস্টার্সের একটা কোর্সে ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপর একটা ডেটা এনালাইসিস করতে গিয়ে কিছুটা লিটারেচার রিভিউ করতে হয়েছিল। তখন জানতে পারি, নারী হয়ে জন্মানোটা ব্রেস্ট ক্যান্সারের অন্যতম ঝুঁকি! কিন্তু পুরুষদেরও হতে পারে, তবে নারীদের হবার সম্ভাবনা পুরুষদের চেয়ে প্রায় একশগুণ বেশি! বয়স্ক মানুষের ঝুঁকিটা তুলনামূলক কম বয়স্কদের চেয়ে বেশি। যাদের অতিরিক্ত এলকোহল সেবনের অভ্যেস তাদের জন্যেও বিষয়টা গুরুতর। তবে নিজেদের লাইফস্টাইল আর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় অনেকটা। প্রতিদিনের রুটিনে অল্প একটু সময় একটু শরীর চর্চা ঢুকিয়ে দিন। বেশ কিছু ভেষজ প্রতিরোধকের কথাও শুনেছিলাম তখন! গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের দেশীয় মশলা গুলোর ক্ষমতা আছে ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে কাজ করার। গবেষণা বলে, দক্ষীণ এশীয় দেশের হতঃদরিদ্র্য মানুষগুলো তারপরও ভাল থাকে, কারণ পাশ্চাত্যের মত জাঙ্ক ফুড তাদের কপালে জোটে না। দেশীয় মশলা খাবারে ব্যাবহার করে তারা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। বিশেষ করে পরিমিত পরিমাণে হলুদ, জিরা, আদা এই তিনটি দৈনন্দিন ব্যাবহারের মশলা পারে কর্কট রোগ থেকে আপনাকে রক্ষা করতে। চিকিতসাবিজ্ঞানে ক্যান্সারের প্রতিষেধক আছে এখন, কেমোথেরাপি আর সার্জারি (Mastectomy)। যদিও আমার মা কে দেখেছি কেমোথেরাপির পরে কষ্ট ক্যান্সারের রোগের কষ্টের চেয়ে কিছু কম না। প্রতিষেধক থাকলেও অবশ্য তা সবসময় সফল না। অনেক গবেষণার পরও ব্রেস্ট ক্যান্সারের আসল কারণ অবশ্য এখনও অজানা।

তবে অনেকে বলেন, ক্যান্সার রোগীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক শক্তি। বেঁচে থাকার ইচ্ছা বা মনের জোড়। অনেক রোগীর পক্ষেই সেটা ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে আসে পাশের মানুষদের। তাদের সবসময় বোঝাতে হয় যে তাদের এখনও এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে। হয় পৃথিবীকে আরও কিছু দেবার জন্য, নাহয় শুধুই কারও ভালবাসা পাওয়া বা ভালবাসা দেবার জন্য। ভালবাসা আর ইচ্ছাশক্তির জোরে ফিরে আসে অনেক কর্কট রোগী মৃত্যুর দ্বার থেকে। মোটামোটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন এই পৃথিবীতে আরও অনেকদিন। কিন্তু আমি এটা কখনই চাইব না এক্ষেত্রে একটা মানুষের জীবন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠুক।

সারা পৃথিবীতেই কর্কট রোগীর সংখ্যা সঙ্কাজনক হারে খুব দ্রুত বাড়ছে। আমাদের সচেতনতা আর নিজেদের প্রতি একটু খেয়াল হয়ত পারে এই সংখ্যাটা কমিয়ে আনতে। মৃত্যু নিয়ে কিছু বলার সাধ্য আমার নাই, কিন্তু দিন শেষে অন্তত বলতে যদি পারি চেষ্টা করেছি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, সেটাও কিছু কম না! আমাদের সুপারফিশিয়াল জীবনের মাঝে খানিকটা সহানূভুতিসুলভ আচরণ করতে পারে অনেক কিছুই। একটু হাসি, একটু সাহস আর একটু প্রার্থনা বোধহয় আমরা সবাই সেইসব কর্কট যোদ্ধাদের দিতে পারি। কিন্তু তার বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্তিটা হতে পারে অনেক বেশি, আমরা যতটুকু ভাবি তার চেয়েও বেশি।

আনীকা

ছবি: 
24/08/2007 - 2:03পূর্বাহ্ন

মন্তব্য

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

লেখাটা ভাল লাগলো এবং আমার জন্য সময়োপযোগীও বটে। সদ্যই আমার পরিবারে একজনের এই রোগ ধরা পড়েছে। বড্ড মনোকষ্টে আছি। আপনার লেখাটা একটা দিগনির্দেশনাও বটে। খাদ্যাভ্যাস এবং কায়িক পরিশ্রম মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় বটে তবে আমাদের শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্তের জীবন যাপনে এর বড়ই অভাব। কেউ কেউ জিমে যান বটে তবে তা নিতান্তই অল্প সংখ্যক।
ক্ষয়, লয়, মৃত্যু অনিবার্য। জীবনের অলঙ্ঘনীয় বিধান। কিন্তু তারপরও আমরাতো স্বাভাবিক মৃত্যুই চাই। যন্ত্রণাদায়ক রোগভোগের নয়।

শাব্দিক এর ছবি

ক্যান্সার রোগীর পরিবারের সবাই এই ভয়ানক ব্যধিতে আক্রান্ত হয়।
যাদের পরিবার বা কাছের মানুষ কর্কট রোগে ভোগে তারাই এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারবে। ক্যান্সার যুদ্ধরত পরিবারের সদস্যদের মানসিক, অর্থনৈতিক, শারিরীক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন।

কামনা করি মানব সম্প্রদায় এই রোগ থেকে মুক্তি লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় আবিষ্কার করতে সক্ষম হোক।

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

আপনার বেদনা সামান্য হলেও বুঝতে পারছি। এবং সমবেদনা প্রকাশ করছি।

গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের দেশীয় মশলা গুলোর ক্ষমতা আছে ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে কাজ করার। ... ... ।বিশেষ করে পরিমিত পরিমাণে হলুদ, জিরা, আদা এই তিনটি দৈনন্দিন ব্যাবহারের মশলা পারে কর্কট রোগ থেকে আপনাকে রক্ষা করতে।

এই গবেষণার কোনো সূত্র দিতে পারেন? কৌতূহলী হলাম। একটি মশলায় শতেক উপাদান থাকতে পারে। সেইসব উপাদানের কোনটি কীভাবে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে, আর তা কীভাবে প্রমাণিত হয়েছে সেটা জানতে আগ্রহী!

ভালবাসা আর ইচ্ছাশক্তির জোরে ফিরে আসে অনেক কর্কট রোগী মৃত্যুর দ্বার থেকে।

এই কথাটি অবৈজ্ঞানিক। ক্যান্সার রোগীর জন্য (সকলের জন্যেই) ভালোবাসার প্রয়োজন আছে। সকলেরই উচিত রোগীকে সাহস যোগানো। কিন্তু ভালোবাসা এবং ইচ্ছাশক্তি ক্যান্সার রোগীকে মৃত্যুর দ্বার থেকে কীভাবে ফিরিয়ে আনে?

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

Sohel Lehos এর ছবি

চলুক

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

Sohel Lehos এর ছবি

আপনার এই লেখা কয়েকদিন আগেই পড়েছি। কমেন্ট করব করব বলেও আর করা হয়নি। যাহোক, উপরে অনার্য সঙ্গীতের দ্বিতীয় কথাটি'র সাথে আমি একমত। ভালবা্সা হয়তো বেঁচে থাকার জন্য উৎসাহ যোগায় কিন্তু রোগীকে মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আনে কথাটি আসলেই অবৈজ্ঞানিক হয়ে যায়।তবে হ্যা, একজন ক্যন্সার রোগীর অনেক মানসিক সাপোর্টের দরকার আছে।

একজন ক্যান্সারের রোগীকে যে শারীরিক এবং মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা একমাত্র ক্যন্সারের রোগী এবং খানিকটা হয়তো তার পরিবার কিংবা কাছের মানুষগুলো বুঝতে পারে। কিমোথেরা্পিতে ব্যাবহৃত ঔষধগুলো নিজেরাই অনেকটা বিষ স্বরুপ। ক্যান্সার সেলগুলোকে মেরে ফেলতে গিয়ে দেহের দফারফা করে ছাড়ে। আর রেডিয়েশন থেরাপি খারাপ সেলের পাশাপাশি অনেক ভাল সেলও মেরে ফেলে।

ক্যান্সার মানেই মৃত্যু অবধারিত তা কিন্তু নয়। অনেক ধরণের ক্যান্সার আছে। কিছু কিছু বেশ নিরাময়যোগ্য।

খুব অল্প বয়সে ক্যান্সারের মত ভয়বহ এক রোগের সাথে আমাকে লড়াই দিতে হয়েছিল। আমি যখন সবে সতের থেকে আঠারতে পড়েছি তখন ধরা পরল আমার হডজকিন'স ডিজিজ আছে। যা এক ধরণের ক্যান্সার। কিমো এবং রেডিয়েশন দুটোই নিতে হয়েছিল। ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাকে যে কোন পর্যায়ে যেতে হয়েছিল সেটা বর্নণা করা খুব কষ্টকর। অল্প বয়সে ভিনদেশে একা একা জীবন নিয়ে লড়াই চালানো আমার পক্ষে সম্ভব হত না যদিনা অসম্ভব ভাল কিছু ডাক্তার এবং নার্স আমার সাহায্যে এগিয়ে না আসতেন। "আমার স্মৃতকথন" নামে সচলায়াতনে একটা লেখা শুরু করেছিলাম। যদি আমার সামর্থে কুলায় (আমার লেখার স্কিল দুর্বল) এ ব্যাপারে বৃত্তান্ত লেখার ইচ্ছা আছে।

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

@অনার্য সঙ্গীত: অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।

আমার মনেহয় নিচের লিঙ্কটি আপনাকে সাহায্য করতে পারে আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে। সাথে আরও কিছু লিঙ্ক উল্লেখ করলাম, এসব জায়গাতেও বলা হয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধে বিভিন্ন মশলার ভূমিকা সম্পর্কে। আমি বিশেষ করে তিনটির নাম উল্লেখ করেছি কারণ এই তিনটি আমরা সচরাচর সবচেয়ে বেশি ব্যাবহার করে থাকি।
http://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK92774/

http://www.aicr.org/cancer-research-update/august_21_2013/CRU_spices_cancer_prevention.html
http://www.everydayhealth.com/cancer-photos/herbs-and-spices-for-cancer-prevention.aspx#07
http://eisamay.indiatimes.com/entertainment/cinema/8-indian-spices-that-prevent-cancer/articleshow/19429136.cms
http://bdnewsdesk.com/sasthokotham/10216-2014-11-13-18-53-39

আর আসলে প্রতিটা মানুষের মৃত্যুর সময় আগে থেকেই নির্ধারিত হয় বলে জানি। কিন্তু বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি না থাকলে আসলে বেঁচে থাকাটাও আর হয়ে ওঠে না। এই কথাটার কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে কি না জানি না, কিন্তু বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যাবে অনেক। তার ভিত্তিতেই কথাটা বলা। হাসি

আনীকা

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।