কার্বনের মায়াজাল - ৩

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৯/০৯/২০১৯ - ১:১৫পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কার্বনের মায়াজাল -২ তে বলেছি কেমিক্যাল ভ্যাপার ডিপোজিশান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিভাবে গ্রাফিন রান্না করা যায়। কিন্তু রান্না কেমন হয়েছে, অর্থাৎ গ্রাফিনের মান কিভাবে যাচাই করবেন? গ্রাফিনের মান মুলত এর মধ্যে খুঁত বা ডিফেক্ট এর পরিমান বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়। আরেকটা মজার ব্যাপার হল কার্বনের মায়াজাল -১ এ বলেছি যে গ্রাফিন খালি চোখে দেখা যায়না। কারন গ্রাফিন খুব পাতলা, উপরন্তু গ্রাফিন প্রায় ৯৭% স্বচ্ছ। একটা জিনিস যদি খালি চোখে দেখাই না যায় তাহলে আদৌ সেটা ঠিকঠাক তৈরি হয়েছে কিনা তা ই বা জানছি কি করে! কিংবা গ্রাফিনের এই জাদুকরী গুনগুলো আসেই বা কোত্থেকে? সেটা বুঝতে হলে গ্রাফিনের গঠন প্রকৃতি আরেকটু বিস্তারিত বুঝতে হবে।

কার্বনের ইলেকট্রন সজ্জা থেকে আমরা দেখি বিশুদ্ধ কার্বন পরমানুর সবশেষ স্তরে (অরবিট) ১টি s এবং ৩ টি p উপস্তর (অরবিটাল) একাকী দিনাতিপাত করছে। কিন্তু কাহাতক আর একা থাকা যায়! তাই গ্রাফিন গঠনের সময় ১টি s ও ২ টি p উপস্তর ফন্দি আঁটে। তারা নিজেদের ইলেক্ট্রন ভাগাভাগি করে আরেকটা কারবনের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য তৈরি হয়। তিন নাম্বার স্তরটা এসব জানেনা। সে তাই মাথায় ইলেক্ট্রন মেঘ নিয়ে একাই দাড়িয়ে থাকে। বাকি দুইজন হাইব্রিডাইজড অরবিটাল তৈরি করে এবং আরো এমন কার্বন পরমানু খুঁজতে থাকে যেখানে তাদের মত মীরজাফর অরবিটাল আছে; যারা কিনা ইলেক্ট্রন মেঘ ভাগাভাগি করে হাইব্রিডাইজড অরবিটাল বানিয়ে বসে আছে। দুই কার্বন পরমাণুর এই হাইব্রিডাইজড অরবিটালরা তখন ইলেকট্রন শেয়ার করে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়। এভাবে কোটি কোটি কার্বন পরমাণু পরস্পর যুক্ত হয়ে গ্রাফিনের ষড়ভুজাকৃতি মায়াজাল তৈরি করে। সব কারবনেই ওরকম একটা করে বোকা p অরবিটাল থেকে যায় যারা কারও সাথে যুক্ত হতে পারেনি। যারা মাথায় নিঃসঙ্গ পাই ইলেক্ট্রন নিয়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে অনুপম রয় এর গান গুন গুন করতে থাকে, "ওরা বড় হবে চড়বে গাড়ি, আর আমি কাটব ঘাস!" আসলে কিন্তু ওরা এমনি কাজকর্মবিহীন দিনাতিপাত করেনা। গ্রাফিনের যা জাদুকরী ক্ষমতা সব ওদের বদৌলতেই ! এই নিঃসঙ্গ পাই ইলেক্ট্রনগুলো গ্রাফিনে বিদ্যুতবেগে তড়িৎ পরিবহন করে। গ্রাফিনের উচ্চ তাপ পরিবহণ ক্ষমতার জন্যও ওরাই দায়ী।

চিত্র ১ঃ গ্রাফিনের নীল বোকা পি অরবিটাল আর বিশ্বাসঘাতক সবুজ হাইব্রিডাইজড অরবিটাল।

চিত্র ২ঃ গ্রাফিনের কাঠামোতে অরবিটালগুলোকে যেমন দেখায়।

যেসব হাইব্রিডাইজড অরবিটাল ইলেকট্রন শেয়ার করে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়েছিল তারা এক অভেদ্য চীনের প্রাচীর রচনা করে। শক্তিশালী সমযোজী বন্ধন তৈরি করে এমন ভাবে জাল বিছিয়ে রাখে যে ক্ষুদ্র হিলিয়াম পরমানুও এই জাল ভেদ করে ঢুকতে পারেনা। ফলে কোন ধাতুর উপরে যদি গ্রাফিন দিয়ে প্রলেপ দেয়া যায়, তাতে সহজে মরিচা ধরেনা কারন ক্ষয়কারী পরমানু/ আয়নগুলো গ্রাফিন ভেদ করে ভিতরে ঢুকতেই পারেনা। যদি খুঁত হীন গ্রাফিন তৈরি করা যেত তাহলে হয়ত কোনদিনই মরিচা ধরত না। কিন্তু তা সম্ভব হয়না বলে আস্তে আস্তে খুঁতগুলো বড় হতে থাকে আর ক্ষয়কারী আয়ন ভিতরে প্রবেশ করে আগলে রাখা ধাতুকে ক্ষয় করা শুরু করে। নিচের ছবিগুলো (চিত্র ৩) আমি স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ধারন করেছি (আমার পি এইচ ডি থিসিস থেকে নেয়া) । নিচের দুইটা ছবি (c & d) যথাক্রমে লোহাকে লবন পানিতে ১০০০ ঘন্টা চুবিয়ে রাখার আগে এবং পরে। দেখাই যাচ্ছে লোহা ক্ষয় হয়ে ছারখার হয়ে গেছে। উপরের ছবি (a & b) দুইটা যথাক্রমে লোহাকে গ্রাফিন এর আবরণ দিয়ে লবন পানিতে ১০০০ ঘন্টা চুবিয়ে রাখার আগে এবং পরে। গ্রাফিনের আবরণ থাকার কারনে খুব বেশি ক্ষয় হয়েছে কি?

চিত্র ৩ঃ গ্রাফিনের মরিচা প্রতিরোধী গুনের প্রমান।

অদৃশ্য গ্রাফিন স্তর কিভাবে সনাক্ত করা যায়? গ্রাফিন সনাক্ত করার এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে রমন স্পেক্ট্রস্কপি। আনবিক পর্যায়ে এই পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে সে গল্পটা বেশ জটিল। সহজ ভাষায় এই পদ্ধতিতে গ্রাফিনের উপর লেজার রশ্মি ফেলা হয়। এই লেজার গ্রাফিনের পাই ইলেক্ট্রন কে অনুরণিত করে ফিরে আসে আর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সংকেত (পিক) দেখায়। মোটামুটি ১৫৮৪ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে জি পিক আর ২৬৮২ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে গ্রাফিন টু ডি পিক দেখায়। এই জি আর টু-ডি পিকগুলো নির্দেশ করে যে গ্রাফিন আছে না নাই। এবার আসি কয়স্তর গ্রাফিন তৈরি হয়েছে সেটা কিভাবে বুঝব? জি আর টুডি পিকের অনুপাত বলে দেবে কয়স্তর গ্রাফিন তৈরি হয়েছে। যদি জি/টু-ডি = ০,৩৬ এর কম হয় তবে একটাই গ্রাফিনস্তর আছে। জি/টু-ডি = ১-১,৫ হলে মোটামুটি ৩/৪/৫ স্তর বলা যায়। এর বেশি হয়ে গেলে বুঝতে হবে গ্রাফিনের পরিবর্তে গ্রাফাইট হয়ে গেছে। নিচের ছবিতে ক্যামিকেল ভ্যাপার ডিপোজিশানের মাধ্যমে তৈরি মাল্টিলেয়ার গ্রাফিনের সনাক্তকারী রমন স্পেক্ট্রাম দেখা যাচ্ছে। গ্রাফিনের খুঁত ধরার জন্যও রমন স্পেক্ট্রস্কপি ব্যাবহার করা হয়। যদি গ্রাফিনে খুঁত থাকে তাহলে ১৩৩২ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আরেকটা পিক দেখায়, ডি পিক। এই ডি পিকের উচ্চতা থেকে বোঝা যাবে যে কত বেশি কিংবা কম খুঁত আছে (চিত্র ৫)। বেশি উচু ডি পিক মানে বেশি খুঁত। কিন্তু রমন স্পেক্ট্রাম একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে খুঁত নির্দেশ করে, তাই গ্রাফিন সমতলের সমন্বিত খুঁত বের করতে হলে একটা চারকোনা ক্ষেত্রফল জুড়ে রমন ম্যাপিং করা যায়। যা কিনা গড় খুঁত হিসাব করে দেখাবে। এই খুতগুলিই এখনও পর্যন্ত গ্রাফিন ব্যাবহারের প্রধান অন্তরায়।

চিত্র ৪ঃ ক্যামিকেল ভ্যাপার ডিপোজিশানের মাধ্যমে তৈরি মাল্টিলেয়ার গ্রাফিনের সনাক্তকারী রমন স্পেক্ট্রাম (আমার থিসিস থেকে নেয়া)

চিত্র ৫ঃ ডি পিক (আমার থিসিস থেকে নেয়া)

তবে গ্রাফিন নিয়ে এই হইচই শুরু হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা এরকম আরও কিছু মৌল দিয়ে একই রকম দ্বিমাত্রিক স্তর বানানোর চেষ্টা করছেন। গ্রাফিনের এমন আরেক জমজ ভাইয়ের নাম বোরোফিন। দেখতে, শুনতে, কার্যকারিতায় গ্রাফিনের মতই। শুধু কার্বনের জায়গায় বোরোন ব্যাবহার করে চীনের যিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বোরোফিন তৈরি করেছেন। তবে এক্ষেত্রেও বোরোফিনের খুঁতগুলিই বিজ্ঞানীদের বিরক্ত করছে। কিন্তু গবেষণা তো আর থেমে নেই, হয়ত অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে। খুঁতের সমাধান গ্রাফিনের ক্ষেত্রেই হোক কিংবা বোরোফিনে, খুঁতহীন এই মায়াজাল বোনা গেলে ম্যাটারিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিঙে বিপ্লব ঘটে যাবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই!

চিত্র ৬ঃ বোরোফিন

[কৃতজ্ঞতা স্বীকার-
চিত্র ১ ও ২ Riedl, C., Epitaxial Graphene on Silicon Carbide Surfaces: Growth, Characterization, Doping and Hydrogen Intercalation. 2010.

চিত্র ৬ঃ Omidvar, A., Borophene: A novel boron sheet with a hexagonal vacancy offering high sensitivity for hydrogen cyanide detection. Computational and Theoretical Chemistry, 2017. 1115: p. 179-184. ]


মন্তব্য

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সাধারণ পাঠক গ্রাফিন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আর বাংলা ভাষায় এসংক্রান্ত কিছু লেখা আছে বলে চোখে পড়েনি। তাই সিরিজটা চলুক। গুড জব বাবা!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

কোলাকুলি

"বলতে বলতেই হঠাৎ কোত্থেকে "আবার সে এসেছে ফিরিয়া" ব'লে একগাল হাসতে হাসতে দাশু একেবারে সামনে এসে উপস্থিত ।"

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

কিছু ঘাটের মড়া আছে যারা মানে মানে বিদায় হয়ে নবীনদের জন্য জায়গা ছেড়ে না দিয়ে বাতবেদনা একটু কমলেই নির্লজ্জের মতো বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে নিজের জানান দেয়। আশা করি না মরা পর্যন্ত এমন জ্বালাতন চলবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সৌখিন  এর ছবি

ধন্যবাদ

এক লহমা এর ছবি

আপনার এই লেখার মায়াজাল-ও খুব শক্ত করে ধরে রাখছে। এবং - পরিমাণে অল্প। হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সৌখিন  এর ছবি

ধন্যবাদ

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।