ভাবনার ল্যাম্পপোস্ট

ওডিন এর ছবি
লিখেছেন ওডিন (তারিখ: সোম, ০৩/০৬/২০১৯ - ১১:৩৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কৈশোর থেকেই আমার মাথাধরার ব্যরাম আছে। ঠিক মাইগ্রেইন না, তবে ব্যথাটাকে মাইগ্রেইনের গ্রামে থাকা গরিব আত্মীয় বলা যেতে পারে। জানান দিয়ে কপালের একপাশ থেকে ভোঁতা ব্যথাটা শুরু হয়- আস্তে আস্তে সেইটা বাড়তে থাকে। আজকে সন্ধে থেকে ব্যথাটা আসি আসি করছে। এইরকম ছুটির শুরুর দিকেই মাথাব্যথায় দুটো দিন ডাউন হয়ে থাকা কোন কাজের কথা না।

এর মধ্যে একটু আগেই আমার ছোটলোক বন্ধু সুমনের সাথে আলাপ করার সময় এই মাইগ্রেইন এর একটা চমৎকার বাংলা জানতে পারলাম- আধকপালি। ছেলেটা স্বভাবে ছোটলোক হলেও বেশ জ্ঞান রাখে, এইটা স্বীকার করতেই হয়।

ফোনের খেজুরে আলাপে আধকপালির প্যাথোজিনেসিস কিভাবে কি - এইসব কথাবার্তা গড়াতে গড়াতে চলে গেলো দেজা-ভ্যু এর দিকে। এই ব্যপারটা আমার প্রায়ই হয়। যেহেতু স্বভাবে ছোটলোক, সুমন দাবী করা শুরু করলো যে মাইগ্রেইন আর দেজা-ভ্যু একসাথে হওয়াটা নাকি নানা মানসিক সমস্যার লক্ষণ, হইলেও হইতে পারে এইটা স্কিতজোফ্রেনিয়া। তাকে ধমকটমক দিয়ে ফোন রেখে মাথাধরার নিদান করতে গেলাম- গান ।

ভিপিএন দিয়ে স্পটিফাই ব্যবহার করি, কিন্ত দেশি গান শোনার জন্য ইউটিউবই এখনও সবচে দারুন জায়গা। বেশ খেটেখুটে অনেক কয়টা প্লে-লিস্ট করেছি। সেইসব ঘাটাঘাটি করছি, আগুনেশেয়ালের আরেক ট্যাবে ফেসবুক খুলেছি। এক বড়ভাই তার তোলা ছবি পোস্ট করেছেন। সন্ধেবেলা- একটা নিঃসঙ্গ ল্যাম্প পোস্ট। সাথে এই কয়টা লাইন

ভাবনার ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে স্বপ্নের রাজপথে,
কোথাও কেউ নেই শুধু একজন ট্র্যাফিক পুলিস
গ্রীন সিগন্যাল তুলে দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে আছে
তুমি আসবে ফিরে এই রূপসী নগরে

সাথে সাথে আমার দেজা-ভ্যু হোলো। এই গানটা প্রথম যখন শুনলাম, সেই সময়গুলোর।

উনিশশো চুরানব্বই। বরিশাল। ক্লাস এইট।
সকালবেলা বিশ্বনাথ সারের বাসায় পড়তে যাওয়া।
শীতল, কুয়াশায় মোড়ানো শিশিরে ভেজা সব ভোর।

সেই উনিশশো চুরানব্বই সালে বরিশাল শহরে বারো-তেরো-চোদ্দ বছরের প্রত্যেকটা ছেলের সাইকেল ছিলো। প্রত্যেকটা ছেলের। এমনকি আমাদের বিশালদেহী কালাপাহাড় মামুন-এরও। নিঝুম ভোরবেলা স' রোডের দিক থেকে সে যখন তীরবেগে সাইকেল চালিয়ে আসতো, সরু সাইকেলটা তো দূর থেকে দেখা যেতো না, মনে হতো বিশাল একটা কালো পাথরের টুকরো রাস্তার কয়েকফুট ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে আসছে। শুধু আমার জন্য সাইকেল অ্যালাউড ছিলো না। দুইবার মাথা একবার হাত আর একবার পা ভাঙা ছেলে, যার বাপ আবার অর্থোপেডিকস এরই ডাক্তার- তার জন্য সাইকেল নিষিদ্ধ, যেইরকম সোভিয়েত ইউনিয়নে নিষিদ্ধ ছিলো দ্য রোলিং স্টোনস।

তাই বলে সাইকেল চালানো বা কারোরটার পেছনে বসে শহর দাবড়ে বেড়ানো, কোনোটাই বাদ ছিলো না, সাথে সাথে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও। এই দুই হাজার উনিশ সালে এইটার পোষাকি নামই হয়ে গেছে রাইড শেয়ারিং। রাইড শেয়ার বা চালানো , তানভীরের সাইকেলই সবচে বেশি ব্যবহার করা হতো। হৃদপিন্ডে একটা সমস্যা ছিলো ওর- বেশি জোরে হাটলে বা দৌড়ালে শ্বাসকষ্টে নীল হয়ে যেতো, শুধু ধীরে সাইকেল চালানোতে ওর কোন ঝামেলা হতো না। তাই স্বাভাবিকভাবেই ওর সাথে দুর্ঘটনাপ্রবণ আমাকে গছিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

এইরকম এক কুয়াশামোড়া ভোরে আমি তানভীরের সাইকেলের পেছনে, আর বগুড়া রোডে অপসোনিনের কারখানার সামনে এসে প্রথমে ডানে, এরপরে বায়ে মোড় নিয়ে গার্লস স্কুলের সামনের রাস্তাটায় আসামাত্র তিনটা কুকুর আমাদের বিনা উষ্কানীতে তাড়া করলো। তানভীরের পক্ষে জোরে প্যাডেল করা সম্ভব না ওর হৃদয়ের দূর্বলতার কারণে, এদিকে আমার ওজনও খুব একটা কম ছিলো না। বেগতিক দেখে হাতে ধরা হোমওয়ার্কের খাতা দুটো কুকুরগুলোর ওপর ছুড়ে দিয়ে কোনোমতে পালিয়ে বেচেছিলাম আমরা।

হ্যা, কুকুরের হোমটাস্ক খেয়ে ফেলার যেইসব গল্পগুলো আপনারা প্রায়ই শুনে থাকেন, তার কিছুটা হলেও সত্যতা আছে। আমি সাক্ষী। যদিও তানভীর সাক্ষ্য দিতে পারবে না। Dead man tell no tales. সে নিরানব্বই সালের ঠিক ওইরকম এক কুয়াশামোড়া ভোরেই চলে গেছে।

সেইসব হোমওয়ার্কের প্রাপক বিশ্বনাথ সারও পারবেন না। উনিও বেচে নেই। গত বছর মারা গেলেন। নাকি তার আগের বছর? মনেও পড়ছে না। কত কত স্মৃতি এখন আর মনে পড়ে না। শুধু ফিলিংস এর ১৯৯৩ সালে বের হওয়া 'জেল থেকে বলছি' রেকর্ডের গানের এই নস্টালজিয়াটুকু আছে।

তুমি আসবে ফিরে এই রূপসী নগরে
তুমি আসবে ফিরে এই রূপসী নগরে,
রূপসী নগরে.
ভাবনার ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে।

-

আধকপালি আস্তে আস্তে বাড়ছে। রাত সোয়া এগারোটা। এখন ঘর অন্ধকার করে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। এইরকম একদিন ঠিক ঠিক এই ঘুম আর ভাঙবে না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যেই তিনটামাত্র মানুষ জানতো যে হোমওয়ার্ক আসলেই কুকুর খেয়ে ফেলতে পারে- তাদের কেউ আর তখন থাকবে না। মানুষ তখনো মনে করবে এটা রূপকথা, এখন যেমন মনে করে।

_
পথচারী এই আমি বড় একা দাঁড়িয়ে
তন্দ্রা হারিয়ে গেছে দূর বন্দরে পালিয়ে
নূপুর পায়ে তুমি আসবে যখন
নীরব রাতের ঘুম ভাঙবে তখন
একটু খানি কাছে থেকো তুমি
ভাবনার ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে
স্বপ্নের রাজপথে

-

_____________________________________________________________
৩ জুন, রাত সোয়া এগারোটা


মন্তব্য

তারেক অণু এর ছবি

সুমন মিয়াঁ মাথার উপরে পানের পিক ফেলার ব্যাপারটা আলোচনা করেছেন কি?

লেখা চলুক-

অবনীল এর ছবি

একদিন ঠিক ঠিক এই ঘুম আর ভাঙবে না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যেই তিনটামাত্র মানুষ জানতো যে হোমওয়ার্ক আসলেই কুকুর খেয়ে ফেলতে পারে- তাদের কেউ আর তখন থাকবে না।

হাততালি হাততালি হাততালি

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

সত্যপীর এর ছবি

চুরানব্বই সালে আমিও ক্লাস এইট। বরিশালে থাকতাম না, তবে আমারও একটা নীল রঙের এভন সাইকেল ছিল। সেইটার পাতলা একটা ক্যারিয়ার ছিল, সেই ক্যারিয়ারে চড়ায়ে বন্ধু নোমানকে নিয়ে গেছিলাম আজিমপুর হুদাই। আজান পড়ার সাথে সাথে ক্যারিয়ার গেল ভেঙে। আমি বললাম ওহহো, এখন তো তোকে নেওয়া যাবে না। অন্যান্য সময়ে মহা আত্মবিশ্বাসী নোমান আচমকা ভ্যাঁ করে কেঁদে দিয়ে বলেছিল আমি এখন কিভাবে বাসায় যাব। কিভাবে যাব।

কিভাবে নোমান বাসায় গিয়েছিল অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। কেবল যাওয়াটা মনে আছে।

স্পটিফাই গুগল প্লে ম্যুজিক এমাজন ম্যুজিক সবডি ভুয়া। এক ইউট্যুবই ভালো। প্লেলিস্ট লিঙ্ক দিবেন নাকি?

..................................................................
#Banshibir.

অনিকেত এর ছবি

মনটা বিষাদবিধুর করে দিলে হে হাড়ের ডাক্তার--সেই সাথে দে জাভ্যুও হল আমারও !

ভিন্ন প্রসঙ্গেঃ তোমার লেখা যে আমি কী ভীষন পছন্দ করি, এইটা তোমাকে কখনো বলেছিলাম?!

গগন শিরীষ এর ছবি

চমৎকার লাগল,খানিকটা বিষণ্ণও বটে!

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

আহা, ভীষণ স্মৃতিকাতর করে দিলেন!
৯৪ সাল, কলেজে পড়ি তখন, ঢাকা কলেজ। রংবাজী আর রকবাজীই সম্বল। ২৪ ঘন্টা। ঐ আমলে ঢাকা শহরে এমন কোনো কনসাট নাই যেটায় এই বান্দা হাজির থাকতো না... আর জেল থেকে বলছি অ্যালবামটা ছিলো ভীষণ একটা চমক। জেমস এর গুরু হয়ে ওঠার শুরু...

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

নজমুল আলবাব এর ছবি

৯৪ সালে এইটে পড়তা? আচ্ছা...

স্মৃতিকাতর করে দিলে হে

জি.এম.তানিম এর ছবি

বিষাদমাখা অথচ কী ভীষণ সুন্দর একটা লেখা!

-----------------------------------------------------------------
কাচের জগে, বালতি-মগে, চায়ের কাপে ছাই,
অন্ধকারে ভূতের কোরাস, “মুন্ডু কেটে খাই” ।

করবী মালাকার এর ছবি

এক টুকরো বরিশাল, ভাল তো আমার লাগতেই হবে। তবে বরিশালে সিনিয়রিটি আমার।
এই যে পাতলা পাতলা ঘটনা এখনকার প্রজন্ম শুনে বলবে - মানে কি? এ তো দেখি হুদাই। মানেহীন এগুলো শোনার কোন মানে হয় না।
এমন হুদাই, মানেহীন ঘটনা, অনুঘটনাই আমদের অমুল্য নস্টালজিয়া। কখনও কখনও আমাদের চোখের জল।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

আবারো সেই পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল। একেকটা গান একেকটা সময়কে সামনে হাজির করে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।