ইতিহাসপাতাল [পর্ব ৫]

ওডিন এর ছবি
লিখেছেন ওডিন (তারিখ: শুক্র, ০৩/০৬/২০১৬ - ১২:৪৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইতিহাসপাতাল মানে হলো হাসপাতালের ইতিহাস। ব্যপারটা ইতিহাসের হাসপাতালও হতে পারে। । আবার হয়তো এইটা পাতালের হাসপাতালের ইতিহাস। ইতিহাসপাতাল ওইরকমই কিছু একটা আরকি। আসলে হাড় ভাঙ্গার হাসপাতালে নিজের হাড় ভেঙ্গে অন্যের হাড় জোড়া দেয়ার কাজ করার মাঝে মাঝে অনেক মজার মজার ব্যপারস্যপার ঘটে। ইতিহাসপাতাল সেইগুলোরই টুকরো গল্প। হাসি

বছরচারেক আগে, এইরকম গনগনে গরমের একটা দিনেই- ইমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটারে সকালবেলার শিফটে ডিউটি। এক বয়স্ক ভদ্রলোক পিছলে পড়ে কোমরের হাড্ডি আর সাথে হাতের কবজির হাড্ডি ভেঙ্গে এসেছেন। কোমরের হাড্ডিতে পরে বড়সড় অপারেশন লাগবে, প্লেট স্ক্রু দিয়ে ফিক্স করতে হবে। হাতের কবজির ভাঙাটাও খারাপ। তবে কেটে অপারেশন না করে, ওনাকে অজ্ঞান করে, হাড়ের ভাঙা টুকরোগুলো ইমেজ ইনটেনসিফায়ারে (এক ধরনের লাইভ এক্সরে মেশিনে) দেখে টেনেটুনে জায়গামতো বসিয়ে প্লাসটার করে দিলেই হয়তো হয়ে যাবে। এইটা আমরা এখনই করার পরিকল্পনা করলাম, ওনাকে অজ্ঞান করে এইটা করা হবে, নাহলে উনি প্রচণ্ড ব্যথা পাবেন, আমাদের রিডাকশন (হাড়ের ভাঙা টুকরো টেনে ম্যানিপুলেট করে জায়গামতো নিয়ে আসা) -ও ঠিকমতো হবে না।

গিয়ানজামটা লাগলো ওনার কোমরের ভাঙা নিয়ে, যেহেতু ওইখানে ভেতরে ব্লিডিং হচ্ছে, ওনাকে এক রক্ত না দিয়ে অজ্ঞান করা যাচ্ছে না। সাথের এনেস্থেসিস্ট ভাই আপত্তি করছেন। এইরকম ভাঙায় আগেই এক ইউনিট রক্ত দেয়ার ব্যপারটা অবশ্য ইউজুয়াল প্রোটোকলের মধ্যেই পড়ে। দিয়ে নিলে ভালো, না দিলেও ক্ষতি নাই কিন্ত পেশেন্টের শকে চলে যাওয়া একটা ঝুঁকি থাকে, অজ্ঞান করা থাকলে সেই শক ম্যানেজ করা অনেক ঝামেলা।
ওনার রক্তের গ্রুপিং করে আনা হলো। সেইটা দেখা গেলো বি নেগেটিভ। বেশ দুষ্প্রাপ্য একটা গ্রুপ। হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে নেই, ভদ্রলোকের সাথে আত্মীয়স্বজনেরও কার এই গ্রুপের রক্ত নেই। তার ভার্সিটিপড়ুয়া এক ছেলের এক বন্ধুকে ডেকে আনা হলো, তার বি নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত। কিন্ত ঝামেলা পাকালেন রোগি নিজেই, উনি এই ছেলের রক্ত নিবেন না। কারণ ছেলেটা হিন্দু। কোন হিন্দুর রক্ত ওনার শরীরে ঢুকুক, এইটা উনি চান না (ভদ্রলোক এক্সাক্টলি, একেবারে অক্ষরে অক্ষরে, আগের লাইনের এই কথাগুলো বলেছিলেন)

আমরা পড়লাম মহাবিপদে। একে তো ওনার হাতের ব্যপারটা ইমার্জেন্সি, অজ্ঞান করে করলে এখনই করতে হবে। রক্তের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করা যাচ্ছে না। আবার উনিও নাছোড়বান্দা- এই ছেলের রক্ত উনি নিবেন না। তার পরিবারের লোকেদের অনেক জোরাজুরির পরেও যখন ওনাকে সেই রক্ত নেওয়ানো গেলো না, আমরা রক্ত না দিয়েই অজ্ঞান করার সিদ্ধান্ত নিলাম। উনি যে রক্ত নিতে রিফিউজ করছেন- এর সমস্ত ঝুঁকি ইত্যাদি তাকে জানানো হয়েছে, স্পেশালি এই কথাটা লিখিয়ে তার আর তার ছেলেদের সইসাবুদ নিয়ে আমরা হাতের রিডাকশন করার জন্য তৈরী হলাম।

ভদ্রলোককে টেবিলে শোয়ানোর পরে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক ইত্যাদি এঁটে ফেলে যখন তার হাতের শিরায় অজ্ঞান করার ওষুধ আস্তে আস্তে দেয়া হচ্ছে, উনি আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ছেন, ঠিক সেই সময়টায় আমি তাঁকে বললাম- বুচ্ছেন আংকেল, আমি তো বটেই, ওই যে 'অজ্ঞান পার্টি'র যেই ভদ্রলোক আপনাকে অজ্ঞান করছেন- (মানে আমাদের অ্যানেস্থেসিস্ট ভাইয়া) উনিও কিন্তু হিন্দু।

আর ঠিক সাথে সাথেই ,ভদ্রলোকের নিস্তেজ হতে হতে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ দপ করে খুলে গেলো। আর সেই বিস্ফোরিত দৃষ্টি দিয়ে আমাদের অ্যানেস্থেসিস্ট ভাইয়ার দিকে তাকাতে তাকাতেই উনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

________________________________________________________________

জুন ২, রাত সাড়ে এগারোটা

পাদটীকা

  • ১. পুনশ্চ এক- যারা এখন আমাকে একজন নির্দয় পাপিষ্ঠ কসাই ঠাউরে বসেছেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, আমিও বুঝি ওইসময় কথাটা বলা ঠিক হয় নাই। বেচারা পুরো অজ্ঞান থাকার সময়টাতেই একটা দুশ্চিন্তা নিয়া অজ্ঞান থাকবে। খুব বাজে ব্যপার হয়েছে সেইটা। কিন্ত আমি এমনই। কি আর বলবোহ!

    পুনশ্চ দুই- পরের দিন সকালবেলা রাউন্ডে গেলাম ভদ্রলোকের খবর নিতে আর কোমরের অপারেশনের শিডিউল ঠিক করতে। গিয়ে শুনি উনি কেবিনে তেলাপোকার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পান্থপথের এক পাঁচতারা হাসপাতালে চলে গেছেন। আমি একবার ভাবলাম, ওইখানে গিয়ে তাকে বলে আসবো কি না- রিউমার আছে যে ওই হাসপাতাল একদল ফান্ডামেন্টালিস্ট ক্রিশ্চিয়ান ইভানজেলিস্ট গ্রুপ পরিচালনা করে। চোখ টিপি পরে অবশ্য নানা গিয়ানজামে আর যাওয়া হলো না।


মন্তব্য

সোহেল ইমাম এর ছবি

দেঁতো হাসি মজা পেলাম আর বুঝলাম আমিও আপনার মতই পাপিষ্ঠ। দারুন লেখা, আপনার আগের পর্ব গুলোও খুঁজছি, পড়ে ফেলবো।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সবজান্তা এর ছবি

আপনার একদমই উচিত হয় নাই শেষমুহূর্তে জানানো।

আপনার উচিত ছিলো আরো আগেই জানানো, তাহলে ওই লোক অজ্ঞান না করেই অপারেশন করতে বলতো। ব্যাপারটা আরো মজার হইতো।

খেকশিয়াল এর ছবি

হাহাহা এইটা বলছিলা একবার। অজ্ঞান করার সময় বলাটা বেশি জোস ছিল। পুরাই মুভির ভিলেনগো বাটে ফালানের মত ব্যাপার। দেঁতো হাসি

-----------------------------------------------
'..দ্রিমুই য্রখ্রন ত্রখ্রন স্রবট্রাত্রেই দ্রিমু!'

তিথীডোর এর ছবি

'সিক' রোগীকে ভাল 'সিল' দিয়েছেন দেখি।অজ্ঞান করার সময় বলা উচিত ছিল আসলে। দেঁতো হাসি

অবশ্য আপনার কাছে রোগি পাঠানো এমনিতেই রিস্কি, হাসিয়ে মেরে ফেলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

জাকির  এর ছবি

"হিন্দুরক্ত না হলে আপনাকে বাঁচানো শক্ত" - এইকথা বললে তো এনেস্থেশিয়া ছাড়াই অজ্ঞান করা যেত|

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

উনি কাকরাইল মোড়ের সহীহ হাসপাতাল ছেড়ে পান্থপথ গেলেন ক্যান? ঈমান দুব্বল? চিন্তিত

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

স্যাম এর ছবি

মন খারাপ

হাসিব এর ছবি

আবহমান বাংলার একটা খন্ডচিত্র এটা। রক্ত দেয়া, চোখসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করা বিষয়ে ধার্মিকদের কাছ থেকে আপত্তি দেখা যায়।

অতিথি লেখক এর ছবি

হিন্দু-বৌদ্ধ-য়াহুদী-নাছারা-কাফের-মুশরেক-নাছতেকদের আবিষ্কৃত/বানানো যন্ত্রপাতি দিয়ে চিকিৎসা করলে, তাদের বানানো ঔষধ গ্রহন করলে, তাদের উৎপাদিত/বানানো খাবার খেলে, তাদের বানানো পণ্য ব্যবহার করলে, তাদের সেবা নিলে, তাদের দেশে গেলে বা পরিবার-পরিজনকে পাঠালে, তাদের লেখা বই পড়লে, তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়লে, তাদের কোম্পানিতে চাকুরি করলে কি ঈমান-আক্বিদা-দ্বীন ঠিক থাকে? যদি ঠিক থাকে তাহলে হিন্দুর রক্ত নিলে ঈমান-আক্বিদা-দ্বীন চলে যায় কীভাবে? আমরা জানি এইসব প্রশ্নের উত্তর এই লোকগুলো কখনো দিতে পারবে না। তারা নিজের মনে নিজেকে কখনো এমন প্রশ্ন করবে না। এরা শুধু সমাজের সাথে ভণ্ডামী করে না, নিজের সাথেও করে।

আশালতা এর ছবি

খালি কথাই বললেন? দুইটা থাবড়া দিলেন্না ক্যান? পরে বলতেন হেলুসিনেট করেছে।

----------------
স্বপ্ন হোক শক্তি

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

মানুষ অদ্ভুত

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

তাহসিন রেজা এর ছবি

আমার এক বুড়ো রিলেটিভকে নিয়ে এমন সমস্যায় পড়েছিলাম।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

তানিম এহসান এর ছবি

আজিব মানুষ!

অতিথি লেখক এর ছবি

নতুন পর্ব কবে আসবে ?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA