| ‹ পুরোনো ব্লগ | সব ব্লগ | নতুন ব্লগ › |
খুব কাছ থেকে শহীদ মিনার দেখা ১৯৭৫ সালে। প্রভাত ফেরীও। বাবা আর আমরা দুভাই ফজরের আজানের পরপর রওয়ানা দিয়েছিলাম। খালি পায়ে। বাবা রাতভর ঘুমোননি, ফুলের তোড়া বানিয়েছেন। সেখানে ছিলো আমাদের বাগানের নানা জাতের ফুল। তোড়াটা দিয়েছেন আমার হাতে। ঘুম চোখে ঢাকার রাস্তায় খালি পায়ে হাটার ভাবনাটা যথেষ্ট রোমাঞ্চকর ছিলো। তাও কিনা বাবার সাথে। জীবনে খুব বেশীবার ব্যাপারটা ঘটেনি। মনে আছে বাবা পালা করে আমাদের দু'ভাইকে কোলে নিচ্ছিলেন হাটার শ্রান্তি কমাতে।
বয়সটা ঠিক অভিব্যক্তি পড়ার বয়স না। তবে লেখাটা লেখার সময় কল্পছবিতে ভাসছে তা। চোখমুখে দৃপ্তভাব নিয়ে এক চেতনাদীপ্ত বাঙালী তার উত্তরসূরীদের নিয়ে যাচ্ছেন শেকড়পাঠে। আশে পাশে প্রভাতফেরী আমাদের সমান তো বটেই নানা বয়সী নারী-পুরুষের ভীড়। মুখে সেই গান। শহীদ মিনারের এখনকার বেদী ছিলো না। মূল মিনার পর্যন্ত পৌছানোও হয়নি। আমরা সেখানে পৌছানো পর্যন্ত যতদূর এসেছে ফুলের স্তবক, সেখানেই দিতে হয়েছে শ্রদ্ধাঞ্জলী। মনে পড়ছে বাবা তোড়াটা আমাদের দু'ভাইকে হাত দিয়ে ধরতে বলেছিলেন। পথে তমাল নানা প্রশ্ন করছিলো, বাবা জবাব দিয়ে যাচ্ছিলেন। একুশের প্রথম পাঠ আমার সে রাতেই।
শহীদবাগ ছেড়ে মধুবাগে আসার পর আমি খেলাঘরে জড়িয়ে পড়ি। সাদা শার্টপ্যান্টের ওপর লাল স্কার্ফ। ফেব্রুয়ারি আসতেই শুরু হতো রিহার্সেল- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো, ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়, আর দেবো না ধান হে, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে। মনে পড়ছে '৭৭ সালে প্রথমবার খেলাঘরের অভিভাববকত্বে মা আমাকে একা ছেড়েছিলন শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে। প্রভাত ফেরী সেরে খোলা ট্রাকে চড়ে গান গেয়ে বেড়ানো ঢাকা শহর জুড়ে।
আইডিয়াল স্কুলে ঢোকার পর স্কাউটিংয়ের প্রেমে পড়লাম। প্রভাত ফেরিতে তখনও যাই না এমন না, তবে বিশেষ দিবসগুলোয় স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানগুলোর আকর্ষণ ছিলো। সরাসরি টিভিতে দেখায়, তাই স্কাউট হয়ে সেখানে যাওয়া। ভারতেশ্বরী হোমসের মেয়েদের অপূর্ব প্রদর্শনী, মাদ্রাসাগুলোরও- বিশেষ করে একটি ফিফটি সিসি বাইকে ৮-১০জনের সার্কাস। দুপুরে মডার্ন ব্রেড রোলস দুটো, একটা কমলা, কখনো সেদ্ধ ডিম, কখনও বা কলা- স্কাউটদের খাবার।
এই পর্যায়ে আমার ব্যক্তিগত মনভূমে একুশ নিয়ে একটা দুর্দান্ত অর্জন ছিলো। সেটা হলো শহীদ মিনার ঠিকঠাক আঁকতে পারা। আঁকাআকি আমার বরাবরই কাক-বকের পা। শহীদ মিনারের কোনগুলো ঠিকমতো দিতে পারতাম না। অনেক চেষ্টার পর নিজে থেকে বুঝে গেলাম সমান্তরাল দুটো রেখার একটিকে কতখানি বাড়িয়ে অন্তর্ছেদ ছাড়াই তা কৌণিক রূপ দেওয়া যায়। সে আবিষ্কারের আনন্দে আর্কিমিডিসের উদযাপনও কোন ছাড়।
এবং শহীদ মিনার বানানো। পাড়ায় আমাদের ক্লাব থেকে শেরে বাংলা স্কুলে শহীদ মিনার বানাতাম। মধুবাগ মাঠ থেকে শুরু করে যত খালি জায়গা আছে আমাদের বয়সীদের একটা প্রতিযোগিতা লেগে যেত এই মিনার বানানো নিয়ে। বাশের কঞ্চি দিয়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর মিনার বানাতে সাহায্য করেছিলো মাসুদ। পেছনে কালো পোস্টারে সাদা রং দিয়ে বর্ণমালা লিখেছিলো বায়েজীদ। মিনারের বেদি বানানো হয়েছিলো ইটে ওপর কাদামাটি লেপে। রাতভর ফুলচুরি করেছিলো আমান, পিন্টু, মিলুরা। মিনারের ওপরটায় জাতীয় পতাকার বৃত্তটা কেটে লাগাতে বেশ কষ্ট হয়েছিলো মনে আছে। পরে কাগজ দিয়েই সারা হয়েছিলো তা।
আরেকটু বড় হতেই বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মূল মিনারে যাওয়া আসা। প্রভাত ফেরীতে নয়। রিকশায় চড়ে ঢাকা মেডিকেল কিংবা হাইকোর্ট। তাও সকাল ৮টা-৯টার পর। উদ্দেশ্য মেয়ে দেখা, আড্ডাবাজি, বিড়ি ফোকা। বইমেলা এলো আরো পরে। মেডিকেলে একুশ মানে ভয়ঙ্কর কিছু। দুদিন আগে থেকে অন্য মহড়া, অস্ত্রে শান। রাত ১১ টার আগেই মিনারের আশপাশ দখল। প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠন, মায় শিক্ষকদের পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। আমাদের তোড়া মূল মিনারের সবচেয়ে ওপরে থাকবে। দেখা যায় মতো এমনিভাবে কোমরে মেশিন গুজে মিনার বেয়ে উপরে ওঠা। দড়ি দিয়ে বাধা। ঝামেলা হয় কিনা সেদিকে সতর্ক থাকা, এবং নেতারা ঠিকঠাক শ্রদ্ধা জানিয়েছেন নিশ্চিত করে হলে ফেরা।
কাজে ঢোকার পর একুশ শুধুই একটা ছুটির দিন। ঘুমিয়ে কাটানোর। কে যায় ভিড়ভাট্টা ঠেলে বই মেলায়!
কিংবা জাবর কাটার। কাটতে কাটতেই হিটখুরির বদনাম ঘোচাতে বেশ একটা পোস্টও নামিয়ে দেওয়া গেলো সচলায়তনে।
২
কথা ঠিক। আমরা শেখ মুজিবের বিরাট প্রতিকৃতি ব্যবহার করতাম তোড়ায়। ছাত্রদল জিয়ার, জাতীয় পার্টি এরশাদের। ইউনিয়নের তোড়ায় মনে হয় না ছবি থাকতো। শিবির পালন করতো দোয়া দিবস
৪
হইতারে, তাগো কাছে মিনারে ফুল, গান গাওয়া এইসব বেদাতি কাজ কারবার। আবার মেইন স্ট্রিমে থাকতে হবে- তাই দোয়া দিবস। আমাগো ক্যাম্পাসের কথা কইলাম
৫
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই ছবি টাঙানোর প্রতিযোগিতায় এরশাদের সময় একবার খুনোখনি পর্যন্ত হয়। ছাত্রদল-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে গুলিতে লাশ পড়ে এক ক্যাডারের। পরে ঢাবি কর্তৃপক্ষ সব সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে শহীদ মিনারে ছবি-ব্যানার ঝুলানোর ওই অসুস্থ
রীতি বন্ধ করে।
........
আহ, শৈশবের সেই প্রভাত ফেরি! পিয়াল ভাই অনেক কথা মনে করিয়ে দিলেন।
৬
![]()
৭
![]()
৯
শেখ মুজিব না জিয়া কার ছবি মিনারের সর্বোচ্চ জায়গায় যাবে এই নিয়ে হুড়োহুড়ি দেখে শহীদ মিনারে যাওয়া বন্ধ করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় সদলবলে রাতভর ঘোরাঘুরি করে সকালে পৌঁছে যেতাম বাংলা একাডেমিতে, সেখানেই আমাদের একুশে উদযাপন।
১০
আমারও মনে পড়ল,
ছোটবেলায় মতিউর ভাই এর সাথে রাত্রে গিয়ে দেখি ছবি নিয়ে কি লাফালাফি!
তবে সবচে' জঘন্য ছিলো দুপুর একটার পর শ্রদ্ধার ফুল নিয়ে হাজারো টোকাই আর জন্তু গোত্রীয় মানুষের ফুল ছিটাছিটি আর কাড়াকাড়ি পর্ব..
__________________________________
ছাগল আমার ছাগল তোমার শিং দিয়ে যায় চেনা...
১১
এই বেদাতী কারবার চলছে চলবে। কেউ উল্টা পাল্টা কিছু কইলে হুদা মাইর। আমার মনে হয় আমরা এই ধরনের একটা পরিস্থিতিতে যাইতাছি.....
১২
সুন্দর স্বাভাবিক বিবর্তন
----------------
মুহাম্মদ
১৩
সুন্দর স্বাভাবিক বিবর্তন
----------------
মুহাম্মদ
১৪
আহ, সেই প্রভাত ফেরি! পিয়াল অনেক কথা মনে করিয়ে দিলে।
কাটতে কাটতেই হিটখুরির বদনাম ঘোচাতে বেশ একটা পোস্টও নামিয়ে দেওয়া গেলো সচলায়তনে।
====
এম. এম. আর. জালাল
"ফিরে দেখুন একাত্তর ঘুরে দাঁড়াক বাংলাদেশ।"
১৬
সেকালে সইতো না এই যন্ত্রনা, আজকে প্রবাসে বসে বসে দুঃখ পাই যেতে না পারার কষ্টে। মনে করিয়ে দিলেন পুরনো কথা।
সাইড টপিক... এই বৃদ্ধাঙ্গুলির ইমোটিকনটার একটা নতুন শর্টকাট দরকার। "(অরূপ)" লিখলে এটা আসলে ভাল হয়। ![]()
১৮
- বড় ভাই টাইপো হইছে মনে হয়, আসরের আযান না হয়ে ফজরের আযান হলে বোধহয় ঠিক হয়।
লেখাটা আগাগোড়াই ভালো লাগলো। আমারও প্রথম শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়া হয় বাবার সাথে। মজার ব্যাপার হলো, আমি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এখনো ফুল দিতে পারিনি। হয়ে ওঠেনি। ঢাকায় যখন ছিলাম ২০ তারিখ রাতেই ফিরে যেতে হয়েছে হাইকোর্টের সামনে থেকে কেনা বিশাল তোড়া হাতে। সেটা পরদিন বড়-ছোট ভাইদের সাথে আমাদের স্কুলের মিনারে অর্পণ করতে!
_________________________________
<সযতনে বেখেয়াল>
১৯
আমারও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কখনও ফুল দেয়া হয়নি।
আপনি আইডিয়ালে পড়তেন? আমিও ওইখানে স্কাউটিং এর প্রেমে পড়েছিলাম। অবশ্য কড়া বাবা মার কারণে কোনদিন জাম্বুরি কিংবা অন্য কোন অনুষ্ঠানে যাবার সুযোগ হয়নি।
২০
সময়ের সাথে সাথে অনুভূতিগুলো কেমন ভোঁতা হয়ে যায়। শৈশব বা কৈশোরের সেই উচ্ছলতা গ্রাস করে নেয় জীবনের লাঙ্গল।
২১
দারুন লাগল পড়তে। অনেক অনেক স্মৃতি মনে করাইয়া দিলেন।
বাপ্পী
১
আগে একটা ব্যাপারও ছিলো ফুলের তোড়ার পাশাপাশি । সেটা হলো জাতীয় নেতাদের ছবি টাঙানো । বাঁচা গেছে ঐ প্র্যাকটিস এখন আর নেই ।