বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-৮ : শেওড়া

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি
লিখেছেন আব্দুল গাফফার রনি [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১৫/০৪/২০১৩ - ১০:৩০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


আমি ধোপদস্তুর এক গৃহস্থ পরিবারে জন্মেছিলাম। কৃষিই ছিল আমাদের একমাত্র পারিবারিক পেশা। গোয়ালভরা গরু ছাগল যেমন ছিল। তেমনি সেসব প্রতিপাললেনর জন্য রাখালও ছিল। গরু-ছাগলের জন্য আলাদা আলাদা রাখাল। মাঝে মাঝে রাখালরা কামাই করত। তাদের তো জ্বরজারি আছে! তো সেদিন আমার কাঁধে চলে আসত রাখালের ভার। বিশেষ করে ছাগলের জন্য পাতা সংগ্রহ করা। কথায় আছে ‘পাগলে কি না কয়, ছাগলে কি না খায়!’ কিন্তু আমাদের ছাগলগুলো এ প্রবাদের ধার ধারত বলে মনে হত না। বিশেষ করে রাখাল যেদিন না আসত, সেদিন আমের পাতা এনে দিলে নবাবজাদার তা মুখে তুলবেন না। সারামাঠ ঘুরে ঘাসকাটাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আবার আমের আস্ত একটা বাগান থাকলেও একটা কাঁঠাল গাছ আমাদের ছিল না। তাই আমাকে জেনে নিতে হয়েছিল কাঁঠালপাতা ছাড়া সহজে পাওয়া যায় এমন কোন লতা-পাতা ছাগলের পছন্দ। বলাই বাহুল্য, কাঁঠাল পাতার পরেই ছাগলের সবচেয়ে বেশি পছন্দ শেওড়া গাছের পাতা। তো যে ক’দিন রাখালের কামাই সে ক’দিন শেওড়া বাবাজিদের সাথে আমার সখ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই সখত্যা শুধুই একপক্ষীয়।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজের একটা গল্প নিয়ে টালিগঞ্জে একটা সিনেমা তৈরি হয়েছে কিছুদিন আগে। ‘গোঁসাই বাগানের ভূত’। সেই সিনেমার একটা গাণ ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ফিরছে—-‘শেওড়া গাছে কে পাজামা কাঁচে / দীঘির জলে কে নেংচিয়ে চলে...’ এখানে এই গানটার কথা তুললাম এজন্য, আমাদের দেশে শেওড়া গাছ আর ভূত-প্রেত একে অপরের পরিপূরক কিনা। যারা শেওড়া গাছ দেখেন নি তাদের কাছে রূপকথার তেপান্তরের মাঠ আর শেওড়া গাছ--দুটোই স্বপনালোকের জিনিস। তবে যারা দেখেছেন, তাদের নিশ্চয় শেওড়া গাছের নাম শুনলেই গা-ছমছমে একটা ভাব চলে আসে—তা তিনি ভূত-প্রেতে যতই অবিশ্বাস করুণ না কেন। প্রাচীন মিথ তো আছেই, শেওড়া গাছের চেহরাও ভয় ধরানোর জন্য দায়ী।

গ্রামের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে আজ শেওড়াগাছ চেনে না। একেবারে দেখেনি যে তা নয়। দেখলেও নাম জানে না। যদি এদের নামটা বলেও দেয়া হয় তবু ভয় পাবে বলে তো মনে হয় নয়। বরং বিদ্রুপ করে বলবে, ‘এহ্, এটা শেওড়া গাছ। আর মাথায় পখিই বাসা করতে পারবে না, ভূত থাকবে কোথায়?’
এই ছেরেমেয়েদের দোষ দেয়া যাবে না। এই সিরিজের আগের পর্বে আমি বৈঁচির দুর্দশার কথা বলেছিলাম। বৈঁচির মতো অতটা ভয়াবহ না হলেও শেওড়া গাছের অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। মেঠোপঘে-ঘাটে, ক্ষেতের আইলে, বেড়ায়, জঙ্গলে, বাঁশবাগানে কিছু ঝোপালো শেওড়াগাছের দেখা মিললেও ভয় গা ছমছমে বিরটা বিরাট শেওড়াগাছ আজকাল আর চোখে পড়ে না।
আমাদের গ্রামে মাঝারি সাইজের ২৫-৩০ বছর বয়সী একটা গাছ ছিল। জানি না গাছটা এখনো আছে কিনা। তেবে আব্দুল কুদ্দুস নামে এক ভদ্রলোক তার ব্যক্তিগত পার্কে বিলুপ্তপথযাত্রী বেশকিছু গাছপালা লাগিয়েছেন। সেখানে গোট দশেক শেওড়া গাছেরও ঠাঁই হয়েছে। তার মধ্যে তিনটে গাছ অন্তত মাথায় ২০ উচ্চতা ছাড়িয়ে গেছে। পার্কটা নিয়ে সচলায়তনে একটা কুদ্দুসপার্ক নামে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। সময় করে একবার দেখে নিতে পারেন।


গ্রামাঞ্চলেই যেখানে শেওড়া গাছ বিরল সেখানে ঢাকায় তার দেখা পাওয়াটা একই সাথে আমাকে অবাক এবং ভাগ্যবান করছে। সেদিন হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার্কের ভেতর পেয়ে গেলাম এরকম বেশ কয়েকটা শেওড়াচারা। সৌভাগ্যবশত এগুলোর দেখা না পেলে এই পোস্টের জন্য আমাকে আরেককবার গ্রামে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। মাঝারি সাইজের গারেছ অস্পষ্ট ছবি আমার কাছে থাকলেও পাতার স্পষ্ট কোনো ছবি ছিল না। এগুলো সে অভাব মেটাল।


শেওড়াগাছের কাণ্ডের রং সবুজাভাব ধূসর । কাঁঠাল গাছের কাণ্ডের মতো এর কাণ্ডেও সাদা সাদ ছোপ আছে। কাণ্ডের গোড়া থেকেই ডালপালা বের হয়। সেগুলো সময়মতো ছাঁটলে শেওড়াগাছ বৃক্ষে পরিণত হয় । না ছাঁটলে ঝোপালো হয়ে পড়ে থাকে। শেওড়া গাছের কাণ্ডের বেড় ৩-৪ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। কাণ্ড প্রায় বাবলা গাছের মতো শক্ত। বহবর্ষজীবী বৃক্ষ জাতীয় এই উদ্ভিদ ৬০-৭০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।


শেওড়া গাছের পাতার দের্ঘ্য ২-৩ ইঞ্চি। একপক্ষল। ডিম্বাকৃতির। মাঝ বরাবর পাতার প্রস্থ ১.৫-২-ইঞ্চি। পাতা পাতলা। কঁচি পাতার রং হালকা সবুজ।


বয়স্ক পাতার সোজা দিক অর্থাৎ ওপর দিকের রং গাঢ় সবুজ। পাতার সোজা দিকটা মসৃণ।


শেওড়া পাতার উল্টোদিক অর্থাৎ যেদিকটা মাটির দিকে থাকে, সেদিকটা ডুমুরপাতার মতো খসখসে। উল্টোদিকের রং হালকা সবুজ।


ফুলের ছবি দুটো Lonly Tarvel সাইট থেকে নেয়া

শেওড়ার ফুল ফল সম্পর্কে আমি একেবারেই অজ্ঞ। ওপরের ছবি দুটো দেখে আশা করি ফুল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবেন। শেওড়ার ইংরেজি নাম Sand paper tree ও বৈজ্ঞানিক নাম Streblus asper। [ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নামের জন্য কৃতজ্ঞতা : মহুয়া, সচলায়তন]

‘পথের পাঁচালী’-তে বিভূতিভূষণের বর্ণণায় শেওড়া---
প্রতিদিন দুপর বেলা আলমারী হইতে বাছিয়া বাছিয়া এক একখানি করিয়া বই সতুর নিকট হইতে চাহিয়া লইয়া যায় এবং বাঁশবনের ছায়ায় কতগুলো শেওড়াগাছের কাঁচা ডাল পাতিয়া তাহার উপর উপুড় হইয়া শুইয়া পড়ে।

-----------------------------------------------------
এই সিরিজের অন্য পোস্টগুলো--
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-১ : শিয়ালকাঁটা
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-২ : ভাঁটফুল
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-৩ : কালকসুন্দা / কালকসিন্দা
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-৪ : আকন্দ
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-৫ : আশশেওড়া
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-৬: কচুরিপানা
বাংলার গুল্ম-তরু-লতা-৭ : বৈঁচি


মন্তব্য

বন্দনা এর ছবি

গাছপালা তেমন একটা চিনিনা, আপনার সিরিজটা পড়ে, আর ছবিগুলা দেখে ছোটবেলায় দেখা গাছগুলা মনে করার চেষ্টা করছি। এই গাছ ও দেখেছি, কিন্তু নাম জানতামনা। সিরিজ চলুক।

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
সিরিজ চলবে। ভালো থাকবেন।

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

মানিক চন্দ্র দাস এর ছবি

চলুক!!!! এতো সময় পান কই ভাই? অ্যাঁ

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

ভাই রে, সময়টাই তো বড় বাধা। আমার রাতের ঘুম হারাম হয়েছে--- দেঁতো হাসি

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

মহুয়া এর ছবি

Family- Moraceae (Mulberry)
Common name- Sand paper tree
Botanical name- Streblus asper

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

ধন্যবাদ মহুয়া।
আপনার তথ্যগুলো মূল পোস্টে সংয়োজন করলাম।

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

সচল জাহিদ এর ছবি

আপনার এই সিরিজটা পড়া হয়, মন্তব্য করা হয়না অবশ্য। ভাল লাগছে।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

ধন্যবাদ
ভালো থাকবেন

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

সিরিজটা সচলায়তনে নতুন ধরনের একটি সংযোজনও বটে। বিশেষ একটা সময়ের কারনে খুব একটা মন্তব্য আসছেনা তবে সিরিজটি পরবর্তীতে অনেকের অনেক প্রয়োজন মেটাবে বটে।
ধন্যবাদ আপনাকে, সিরিজটি চালিয়ে যাবার জন্য। চলুক

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

ধন্যবাদ
মন্তব্যের চেয়েও জরুরি বিষয় হলো পাঠক পড়ছেনি কিনা। যদি পড়েন তাহরে শ্রম সার্থক।

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

তারেক অণু এর ছবি

দারুণ চলুক

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

ধন্যবাদ অণুদা দেঁতো হাসি

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

তানিম এহসান এর ছবি

আপনার এই সিরিজ’টা চলুক।

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

সিরিজ চলবে। হাতে যে পরিমাণ ম্যাটার আচে তাতে মাস দুয়েক এই গাছপালা দিয়েই করে খেতে (লিখে খেতে) পারব। দেঁতো হাসি

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

শাব্দিক এর ছবি

“শেওড়া গাছের পেত্নি” তাহলে এই গাছেই থাকে? খাইছে

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

আব্দুল গাফফার রনি এর ছবি

হঁ ভাই----

----------------------------------------------------------------
বন পাহাড় আর সমুদ্র আমাকে হাতছানি দেয়
নিস্তব্ধ-গভীর রাতে এতোদূর থেকেও শুনি ইছামতীর মায়াডাক
খুঁজে ফিরি জিপসি বেদুইন আর সাঁওতালদের যাযাবর জীবন...
www.facebook.com/abdulgaffar.rony

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।