জসীম উদদীনের ভ্রমণকাহিনী ‘চলে মুসাফির’

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৯/১০/২০১৫ - ১:০০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পল্লী কবি জসীম উদদীন ১৯৫০ সালে মার্কিন দেশে গেছিলেন সরকারি সহায়তায়, পথিমধ্যে থেমেছিলেন বাহরাইন, লন্ডনে এবং আইসল্যান্ডে অল্প সময়ের জন্য, আবার আমেরিকার থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। সেই সময়ের অধিবাসীদের গল্প লিখেছিলেন সরল ভাষায় ‘চলে মুসাফির’ বইতে। গতকাল সন্ধ্যায় হাচল সৈয়দ আখতারুজ্জামানের সংগ্রহে বইটি দেখা মাত্রই ধার নিয়ে একটানা পড়ে শেষ করে ফেললাম, ১২৮ পাতার কলেবরকে খুব একটা বড় বলা যায় না, কিন্তু নানা রঙবেরঙের ঘটনার আগমনে বইটি বেশ চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে।

বইয়ের পাতায় পাতায় পল্লীকবির জ্ঞানতৃষ্ণা প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষ করে যে কোন দেশের সমাজ এবং মানুষের সাথে মেশার আকাঙ্ক্ষা ও সেই সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ তাঁর ভ্রমণের মূল্য উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় খুব সহজেই। যেমন বিলেত ভ্রমণের সময় কবি লিখেছেন 'লন্ডন ষ্টেশনে নামিয়াই বন্ধুবরদের সাথে দেখা হইল। তাদের একজনের বাসায় এরা আমার থাকার ব্যবস্থা করিয়াছে। আমি বলিলাম- তোমাদের সাথে থাকিলে তো আমি এদেশের কিছুই জানিতে পারব না। আমার এক ব্রিটিশ বন্ধু, হেলেম টেনিসন, বেথনাল গ্রিনে থাকেন তাঁর বাসায় যাইব'।

১০০% একমত, যে কোন দেশে যেয়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সেই দেশের মানুষের সাথেই মিশতে হবে, আর বিশেষ করে বাঙালী সমাজে একবার ভিড়ে গেলে দাওয়াত খেতে খেতেই পুরোটা সময় মাটি হবে। একই কাজ তিনি করেছেন মার্কিন মুলুকেও, বলেছেন ২০ দিন একটানা ভাত খাই নি, তাই আজ খেয়ে তৃপ্তি পেলাম কিন্তু এই খানা, এই ভাষা, এই সমাজ তো দেশে গেলে প্রতিদিনই পাব, তাই আপাতত এই দেশ সম্পর্কে জেনে নিই।

১৯৫০ সালে তাঁর এই অজানার প্রতি অ্যাডভেঞ্চার আমাদের অভিভূত করে বৈকি! তাঁকে চা দিতে আসা হোটেল বয়ের কাছ থেকে যখন তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাবার নিমন্ত্রণ আদায় করেন, এলিস নামে অচেনা সুন্দরীর সাথে প্রথম পরিচয়েই ট্যাক্সি চেপে অজানা শহরে যান, যে কোন নতুন শহরে যেয়ে সেখানে লেখক-গায়কদের আড্ডায় ঢুঁকে পড়েন অনায়াসে, প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলার গানের, ছড়ার। সদ্য আয়ত্তে আনা মার্কিন উচ্চারণে ঠেকে ঠেকে ইংরেজি বলতে বলতে ‘ মারো জোয়ান হেইও বুঝিয়েছেন। তাঁর সদা কৌতূহলী খোলা মনের পরিচয় পেয়ে অতি আমোদিত হয়েছি, সাধারণ অনেক ভ্রমণকাহিনীর মত সেই দেশের সাথে প্রতি অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশে কত ভাল, কত সুন্দর এই তুলনা করে বইটি আত্মঅহমিকায় বিষিয়ে তুলেন নাই। তবে পাশ্চাত্যের ভাল দিকগুলো তুলে এনেছেন তাঁর কলমে, সেই সাথে সারা পৃথিবীতেই যে ভাল মানুষ আছে, তারা নানা রূপে নানা কালে দেখা দেয়, নিঃস্বার্থ ভাবে উপকার করে প্রতিদান দেবার সুযোগ না দিয়ে চলে যায় জীবনের পথে সেই কথা বারবার বলে জানিয়েছেন লোককবির কথা-
‘নানার বরন গাভীরে ভাই একই বরন দুধ-
আমি জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত!’

চিত্তাকর্ষক সব ব্যক্তির সাথে কবির আলাপের বিবরণের মধ্য সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটি ছিল কবি এজরা পাউন্ডের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। দুঃখজনক ভাবে সাক্ষাৎটি ঘটেছিল পাগলা গারদে, এজরা পাউন্ড তখন প্রায় উম্মাদ, তাঁকে চিকিৎসার জন্য রাখা হয়েছিল মানসিক হাসপাতালে, সেই অবস্থাতেও তিনি কনফুসিয়াসের অনুবাদ করছিলেন। নাৎসি সংসর্গের অভিযোগ তিনি অভিযুক্ত, ফলে তাঁর সাথে দেখা করাও ছিল বেশ কঠিন, কেবল মাত্র সেই দেশের সরকারের লোক অনুমতি দিলেই সম্ভব। যা হোক, এজরা পাউন্ডের স্ত্রী কবি জসীম উদদীনের কথা শুনে সেই ব্যবস্থা করে দিলেন। এজরা পাউন্ড বঙ্গদেশের কবিকে বেশ কিছু বই উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘ বইগুলি তো বন্ধুবান্ধবদের দেওয়ার জন্যই। তারা যখন সচল তখনই জীবন্ত। অচল বই তো মৃত। এগুলি বিতরণ করিয়া দেওয়াতেই আনন্দ।’
পরবর্তীতে এই দুই কবির মাঝে পত্রযোগাযোগ ছিল।

রসিক কবি সব দেশের তরুণীদের সম্পর্কেই সুখ্যাতি করেছেন, বিশেষ করে আইসল্যান্ডের মেয়েদের নিয়ে লিখেছেন ‘যেসব মেয়ে আমাদের খাবার পরিবেশন করল তাহারা সকলেই যেন ডানাকাটা পরী। তাহাদের মধ্যে কে কাহার চেয়ে বেশি সুন্দরী নির্ণয় করা যায় না’।

যেহেতু প্রথম ভ্রমণ ১৯৫০ সালে, সদ্য তৈরি হওয়া রাষ্ট্র জোড়া লাগা পাকিস্তান এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সম্পর্কে তাঁর মোহভঙ্গ হয় নাই তখনো, কিংবা হলেও হয়ত রাষ্ট্রযন্ত্রের সেন্সরের কারণে তা প্রকাশিত হয় নি। কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে তাঁর চিন্তা যে দূরদর্শী এবং সূক্ষ ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৬০ এর দিকে করাচীতে লেখক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে-

হাজার হাজার মাইল দূরে আমাদের পূর্ব পাকিস্তান। সেইখানে আমাদের অনেক রীতিনীতি আপনাদের হইতে আলাদা। পশ্চিম পাকিস্তান হইতে পূর্ব পাকিস্তানে যাইয়া সেই আলাদা রীতিনীতি দেখিয়া আমাদের কোনো কোনো ভাই মনে করেন, এই পার্থক্য হিন্দু-প্রভাবের ফল। তাহারা আশা করেন এইসব পার্থক্য ভাঙ্গিয়া আমরা আপনাদের সঙ্গে আসিয়া এক হই।

কিন্তু এই ধারণা ভুল। কারণ আমাদের মেয়েরা শাড়ি পরে। যখন রঙিন শাড়ি পরিয়া আমাদের মেয়েরা কলসি কাঁখে লইয়া সরষেক্ষেতের আঁকা-বাঁকা পথ ঘুরিয়া পদ্মা নদীতে পানি আনিতে যায় তখন বাঁশীর সুর বহিয়া আমাদের মনের কথা আকাশে ছড়ায়। মেয়েদের এই শাড়িকে আমরা কত ছন্দে কত উপমায়ই না রূপ দিয়েছি। সেই শাড়ি মেঘের মতো, রামধনুর মতো, ময়ূর পাখির পাখার মতো। এখন যদি কেহ বলেন এই শাড়ি বদলাইয়া আমাদের মেয়েদের ঘাগরা বা ইজের পরিতে হইবে, সেকথা আমরা শুনিব না। তেমনই আমাদের পদ্মা-যমুনা-মেঘনা নদী হইতে আমরা যে অপূর্ব ভাটিয়ালি সুর কুড়াইয়া পেয়েছি তাহাও আমরা ছাড়িব না। আপনাদের এইখানে যে অপূর্ব সিন্ধি পাঞ্জাবি আর পস্তু লোকগীতি শুনিবার সৌভাগ্য আমরা হইয়াছে তাহা আমার কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ করিয়াছে। পার্থক্যের জন্যই মানুষ মানুষের বন্ধু হয়। আমরা ভিতরে যাহা নাই তাই আমরা অপরের নিকটে পাইয়া তাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করি। অনন্তকাল ধরিয়া নারী-পুরুষে যে মিলন তাহাও সেই পার্থক্যের জন্য।

বইটির সঠিক প্রকাশ কাল বুঝতে পারলাম না, ইন্টারনেটে আছে ১৯৫২, বইতে আছে ১৯৬৬। বইটি ২০১২ সালে পুনঃপ্রকাশ করেছে পলাশ প্রকাশনী। পড়ে দেখুন পাঠক, আমাদের জল-হাওয়ার কবির চোখে বহির্বিশ্ব!

ছবি: 
07/07/2011 - 11:39অপরাহ্ন

মন্তব্য

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

এটা পড়িনি, কিন্তু আত্মজৈবনিক গ্রন্থ "জীবনকথা" পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। সে বইটিও প্রকাশ করেছে পলাশ প্রকাশনী। সুযোগ পেলেই পড়ার আশা করছি।

তারেক অণু এর ছবি

আমিও পড়ি নাই, সংগ্রহ করতে হবে।

অতিথি লেখক এর ছবি

এই বইটা অনেকদিন ধরেই পড়ার ইচ্ছা। আপনার আলোচনা পড়ে তা আর ও বেড়ে গেল। আপনার সাথে আমিও একমত যে, যে কোন দেশে গেলে সে দেশ কে জানার জন্য সে দেশের মানুষের সাথে মিশলে জানা গভীর হয়। অনেক শুভেচ্ছা।
------------------------------
ইচ্ছে মত লিখি
http://icchemotolikhi.blogspot.in/

তারেক অণু এর ছবি

পড়ে ফেলেন, ভালই লাগবে আশা করি

অতিথি লেখক এর ছবি

আালোচনা পড়ে বইটা পড়ার ইচ্ছা জাগতেছে।

স্বয়ম

তারেক অণু এর ছবি

সেই বিষয়ে আরও জানার চেষ্টা করছি, জানা দরকার

তারেক অণু এর ছবি
হাসিব এর ছবি

১০০% একমত, যে কোন দেশে যেয়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সেই দেশের মানুষের সাথেই মিশতে হবে, আর বিশেষ করে বাঙালী সমাজে একবার ভিড়ে গেলে দাওয়াত খেতে খেতেই পুরোটা সময় মাটি হবে।

এইটা আমি ২০০% একমত।

এজরা পাউন্ডের প্রসঙ্গ পড়তে গিয়ে ভাবতেছিলাম সেই সময়টাতে আমরা আরো দুইজন বিখ‍্যাত বাঙ্গালিকে চিনি যারা অক্ষশক্তির মধ‍্যে সমস‍্যা দেখেননি। এদের একজন সুভাষ চন্দ্র বসু, আরেকজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এইরকমটা হলো কেন?

অতিথি লেখক এর ছবি

আমার কাছে ইংরেজদের বিষয়ে সরব/নীরব বিতৃষ্ণাই এর কারন বলে মনে হয়। অপ্টিমিস্টিক মানুষ ক্যাওজকে ল্যাডার হিসেবে দেখে। সুভাষ চন্দ্রও জার্মানির নেতৃত্বে অক্ষশক্তির বাধানো যুদ্ধকে স্বদেশের জন্য পরাধীনতা থেকে মুক্তির দারুন এক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।

রব

অতিথি লেখক এর ছবি

আমাদের স্কুল জীবনের প্রতিটি শ্রেণীতেই পল্লী কবি ছিলেন অবধারিত, আর কবি পরিচিতি-তে পল্লীকবির উল্লেখযোগ্য বইগুলোর তালিকায় সুখপাঠ্য ভ্রমনকাহিনি 'চলে মুসাফির' নামটিও ছিল অবধারিত। তো সবসময়ই একটা কৌতূহল ছিল, যে কবি গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে খুঁজে বেরিয়েছেন মনি-মুক্তো, সেই তিনি কিভাবে দেখেছে যান্ত্রিক পাশ্চাত্যকে!
অণু ভাইকে অনেক ধন্যবাদ সে কৌতূহল কিছুটা হলেও মেটানোর জন্য।
।।।।।।।।।
অনিত্র

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

'ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়' আর 'যে দেশে মানুষ বড়' পেলে পড়ে ফেলেন। ভাল লাগবে। হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

মাসুদ সজীব এর ছবি

চলুক

-------------------------------------------
আমার কোন অতীত নেই, আমার কোন ভবিষ্যত নেই, আমি জন্ম হতেই বর্তমান।
আমি অতীত হবো মৃত্যুতে, আমি ভবিষ্যত হবো আমার রক্তকোষের দ্বি-বিভাজনে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA