ডানায় সমুদ্রের ঢেউ

তুলিরেখা এর ছবি
লিখেছেন তুলিরেখা (তারিখ: সোম, ২৮/০৩/২০১১ - ৬:৪০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১।

মায়ের বুকের কাছে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে মৈত্রেয়ীর। কেমন একটা নরম ওমের গল্প সেখানে! সে কল্পনায় অনুভব করার চেষ্টা করে কেমন হবে সেই দেশ! কিন্তু মাকে বলতে পারে না, কেমন সঙ্কোচ হয়। মা আবার তাড়িয়ে দেয় যদি? যদি বলে যা যা, চলে যা?

মৈত্রেয়ী, যাকে কাছের লোকেরা ডাকতো মিতিন। মা নিতো না মিতিনকে। মিতিন ওর ঠাকুমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতো সবসময়, ঘুমাতো ও ঠাকুমার সঙ্গে। মায়ের সঙ্গে ঘুমাতো ছোট্টো ভাইটা। একেকদিন মায়ের সঙ্গে ঘুমাতে চাইলে মা ঠেলে বার করে দিতো-বলতো, "না না আজকে না, আরেকদিন।" ঠেলে দেওয়া সেই কোমল মেয়েটা মরে যেতো তক্ষুনি, জানে মিতিন। জন্মাতো অন্য একটা মিতিন- যে জানে পৃথিবী কত কঠিন, যে জানে প্রত্যাখ্যান কাকে বলে,আঘাত কাকে বলে, আগুন কাকে বলে। ঠেলে দেওয়া মেয়েটা কোমল মন নিয়ে মরে যেতো, সে তো জানতে চায় নি কাকে বলে আঘাত, কাকে বলে অবহেলা, কাকে বলে প্রত্যাখ্যান-আর তা তাকে জানতেও হবে না।

"আরেকদিন"-মা বলতো মিতিনকে। মানে আরেকদিন মা নেবে তাকে। কোলের কাছে, ওই কোমল ওমের মধ্যে। সেই আরেকদিন আর আসে নি, বছরে বছরে কত্ত বড় হয়ে গেছে মিতিন, উঠানের আমগাছটার মতন। তারপরে একদিন নিজের এক ঘর হয়েছে তার, সেখানে আর কেউ নেই, শুধু মিতিন আর তার বইয়েরা। না, মা নেই সেখানে। বিছানা করে দিয়ে, মশারি গুঁজে দিয়ে মা চলে যায়, মিতিন তার কেউ না। তার যে সত্যি-মেয়ে ছিলো, সেতো মরে গেছে কবে! মা জানতেও পারে নি।

মিতিনের ঠাকুমাও নেই আর, সময়ের কাছে সাক্ষ্য দিতে চলে গেছে কোন্‌ অজানায়, যেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না। আসে না কি? হয়তো আসে, অন্য কোনো নতুন সময়ে, অন্য কোনো নব-রূপকথায়! সেই ছোট্টো মেয়েটা, অবাক রাত্রে চুপচাপ মরে গেছিলো যে, প্রত্যেক প্রত্যাখ্যানের রাতে যে মরে যেতো নতুন করে, সে কি কোনোদিন ফিরে আসবে? অন্য কোনো দেশেকালে, অন্য কোনো জীবনে? না আসাই ভালো তার, না আসাই ভালো। এ জগৎ কঠিন, বড়ই কঠিন তার পক্ষে।

কতকাল সময় আর খেলেনা তাকে নিয়ে! সেই লুকোচুরি, দৌড় দৌড়, টুকি। সেইসব অরূপগন্ধী সকাল, সেইসব শিরশিরে হাওয়া, সেই লংকাগন্ধের গ্রীষ্মদুপুর, ক্লান্ত মধুর বিকেল, মনকেমন করা হেমন্ত, গোধূলির ম্লান রাঙামাটি আলো, আনন্দের শরতের দ্রুতচ্ছন্দ প্রহর- সবকিছুর ভিতর দিয়ে টুকি টুকি টুকি করে দৌড়! বৃদ্ধ কাল হাসিমুখ দাদামশায়ের মতন, একমুখ সাদা দাড়ি শরতের মেঘের মতন- সবকিছু নিয়ে ঐ আলোছায়া হাসিকান্না দু:খসুখ রাগবিরাগের ভিতরে সস্নেহ হাসি নিয়ে চেয়ে থাকতেন। কেউ যে কাল পেরিয়ে যেতে পারেনা জীয়ন্তে!

অথচ ঐ বুড়ো দাদামশায়ের কি যে স্নেহ, বারে বারে ধরা দিতে চান কচি কচি আঙুলগুলোর মধ্যে। ঐ শিরাওঠা হাতগুলো ওঁর, কি কোমল কি স্নিগ্ধ! শীতের শেষবেলার মাঠে চু কিতকিত খেলায় জলদা হয়ে কোর্টের বাইরে পড়ে যাওয়া বালিকাটিকে নিজের পাশে ডেকে এনে খেলতেন তিনি, ওর ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু যা কেউ কোনোদিন দেখেনি-তা উনি মুছে দিতেন ওঁর সাদা উত্তরীয়ে। দখিন বাতাসে শুকিয়ে যেতো সে জলের দাগ। মার্চের বিকেলে কি মনকেমনকরা বাতাস বইতো! ছাদের উপর থেকে কত দূর পর্যন্ত দেখা যেতো। ঐ দূরে পশ্চিমে গাছের ঘন সবুজ রেখা নীল হয়ে আসতো, সেখানে আকাশে নীল বুকে মিশে গেছে পৃথিবীর সবুজ আঁচলটি। দিগন্তকুহেলী এসে ঢেকে দিয়েছে সে ঘন রহস্য।

ঐ তো ওরা গানের ক্লাসে চলে যাচ্ছে খাতা বগলে নিয়ে, শনিবারের বিকেলমাঠ একলা পড়ে আছে, কেউ আজ খেলবে না কিৎকিৎ, কাকজোড়া বুড়ী বসন্তী,ভাইবোন বা এমনি এমনি কোনো তখনি বানানো খেলা। তাই বুঝি মাঠের মনখারাপ? কোণের খেজুরগাছগুলোরও মনখারাপ? তাই মাঠ শনিবারের বিকেল এলেই অমন চুপ হয়ে যায়? মিতিন একা একা ভাবে।

মাঠের পাশে ঐ তো ঝুনিদিদিদের বাগান- জিনিয়া ফুল লাগায় ওরা। আর কত রঙের গোলাপ। তুলতে পারা যায় না। সবসময় বুড়ো রাগী একটা লোক পাহারা দেয়। ঝুনিদিদির রিটায়ার করা বাবা। রিটায়ার করলে কি লোকে খুব রাগী হয়ে যায়? কাজকর্ম থাকে না বলে? তখন খালি চোর ধরার মতলব খোঁজে? ঝুনিদিদের পাশেই অনুদের বাড়ী, ওর ভালো নাম অনুব্রতা। ওখানে কতকিছুই হবে, রবীন্দ্রজয়ন্তী, পর পর বেশ অনেক বছর ওদের প্রশস্ত ছাদে, তারপরে একদিন আসবে উল্কা দেখার রাত্রি। একদিন অনুর বাবার স্মৃতিসভাও।

জানালার বাইরে উথালপাথাল জ্যোৎস্নায় আকুল পৃথিবী, মিতিন আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দক্ষিণা হাওয়া ঝুরুঝুরু করে শব্দ করছে আমগাছটার পাতায় পাতায়। যেন কানে কানে কথা কইছে। মিতিনের চোখের জল কবে শুকিয়ে গেছে, একদিন সব ফিরে আসবে-সে জানে। যেমন ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া নদী! তখন এইসব ঘরবাড়ী, উঠান, আমগাছ, ধানক্ষেত, ঝিরিঝিরি হাওয়া, ঘুমিয়ে থাকা সব প্রিয় মানুষেরা-তারা কোথায় থাকবে? কোথায় হবে সেই ফিরে আসা? সে কি পৃথিবীতেই নাকি অন্য কোথাও? নিশ্চয় অন্য কোথাও, যেখানে মানুষের জীবনের ক্ষুদ্রতাগুলি, নিষ্ঠুরতাগুলি নেই, যেখানে অসীম করুণা আলোর মতন ছড়িয়ে আছে অসীমতর হয়ে!

চোখ বন্ধ করে মিতিন , ফিসফিস করে বলে, " আমি একদিন যাবো তোর কাছে, একা একাই যাবো। সমুদ্রনীল তোর শাড়ী, তাতে তারার চুমকি বসানো। আমি ঠিক চিনতে পারবো দেখিস। তোর চোখের মধ্যে যে আকাশ লুকানো, আমি ঠিক তোকে চিনে নেবো দেখিস। আমার ভুল হবে না। এই পাথরকঠিন খোলসের ভিতরে আমি লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আমার পরশমাণিক, সেখানে পৌঁছে তোকে তা দেবো।" সে ফিরে আসে বিছানায়, শান্ত ঘুমের ওমের মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করে।

২।

আশ্বিনের রোদে খুশী হয়ে আছে পৃথিবী, শুধু জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে মিতিন । সে তার ঠাকুমার চৌকিতে শুয়ে আছে, জানালার বাইরে থেকে শিউলির সুঘ্রাণ আসছে তার নাকে। পুজো এসে গেল। তাকে বোর্ডিং এ পাঠিয়ে দিতে চায় তার মা-বাবা, পুজোর পরে পরীক্ষা হয়ে যাবে, রেজাল্ট বেরোলে তারপরে নতুন বছরে নতুন স্কুল। তার ঠাকুমা রাজি না, বলে, "না না। মেয়েরে দেখতে পারে না মায়ে, তাই বোর্ডিং এ দিতে চায়।"

গতকাল তার সঙ্গে খেলতে খেলতে ভাই পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলো, তাই মা রাগ করে মিতিনকে ধাক্কা দিয়ে খোয়াভাঙার উপরে ফেললো। হাঁটু ছড়ে গেল, ঠোঁট খুব কেটে গেলো, রক্ত বন্ধ হয় না দেখে চিনি দিলো মা। খুব জ্বর হয়েছে রাত থেকে, সে ভাবে আহ, মরে গেলেই ঐ দিগন্তপারের বাপমায়ের কাছে যাবো। "না না তুমি না তুমি না .... " প্রলাপের ঘোরে হাত সরিয়ে দেয় সে, কে যেন তার কপালে বরফঠান্ডা হাত রেখেছিলো!

কার এলানো চুলের রাশি উড়ে এসে পড়ে, হাল্কা কমলা রেশমী শাড়ীর আঁচলা, শিউরে উঠে সে মুখ রাখে তার কাঁধে। এমন শিউরানো অনুভূতি আর কখনো তো তার হয় না ! সে সোনালী হাতে জড়িয়ে ধরে মিতিনকে, মিতিনের সমস্ত পার্থিব মলিনত্ব সত্বেও। আহ, আহ, কি মধুর এ অনুভূতি, কি স্নিগ্ধ ওর হাত দু'খানা! প্রথমে আস্তে, তারপরে জোরে সে চেপে ধরে তার বাহু, আনন্দে জ্বরের মতো কাঁপুনি ওঠে মিতিনের সমস্ত ইহলোক পরলোক জুড়ে।

পরদিন সে চুপ করে শুয়ে আছে চৌকিতে। খুব শ্বাসকষ্ট, খুব জ্বর। সারারাত শ্বাসকষ্ট চলেছে। সকালে ডাক্তারকে খবর দিতে গেছে বাবা। সে অর্ধ আচ্ছন্ন চোখে ঘর দেখে, আর কতক্ষণ দেখবে? আর কতক্ষণ পরে হে সোনালী আলোর মা, নেবে তাকে তোমার কাছে? শ্বাসকষ্ট রাতে যখন খুব বেড়েছিলো, সে ভেবেছিল রাত্রেই তাকে টেনে নেবে। কই নিলো না তো! কারা যেন কাঁদছিলো রাতে, কারা? তার ঠাকুমা, মা নাকি অন্য কেউ? হয়তো কেউ না, জ্বরের ঘোরে ভুল শুনেছে সে।

তার ঘরে দক্ষিণের হাওয়া খেলে, দক্ষিণে খোলা মাঠ একেবারে ঐ অতদূর অবধি, উত্তরের জানালা খুলে দিলেও সেদিকে মাঠ, খেজুরগাছ, তারপরে পড়শীদের বাড়ী। আধো ঘুমে আধো জাগরণে স্বপ্ন-স্বপ্ন লাগে জগৎখানি, আর ওর থাকতে ইচ্ছে করে না এখানে। তবু যেন কি রয়েছে, কোনো চেনা রঙ, চেনা গন্ধ, চেনা আকার, কি এক অদ্ভুত মায়ায় তার ফিরে ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে একবার দুইবার আবার আবার!

মাথা ধুয়ে দিচ্ছে কে যেন, কানের কাছে জল লাগলে খুব বিশ্রী লাগে,সে কি যেন বলছে জ্বরের মুখে, মুখ জুড়ে কেমন করোলা ভাজার স্বাদ! মুছে দিচ্ছে মাথা, হাওয়া করছে গোল হাতপাখা দিয়ে। কে করছে এসব, তার মা? আহ,কে কাঁদছে বিছানায় বসে? সে কষ্টে চোখ মেলে, ঐ তো পায়ের দিকে বসে আছে তার মা, মুখে আঁচল চেপে আছে। লবণজলের মতন অভিমান তার চোখমুখঠোঁটজিভ ভরে ফেলে, সে দ্রুত চোখ বুজে ফেলে, সোনালী আলোর সেই মা কখন নেবে তাকে ?

ডাক্তার এসে গেলো, জাগিয়ে দেখে ওষুধপত্তর দিয়ে বিদায় নিলো। ট্যাবলেট গিলতে পারেনা সে, কাপে ট্যাবলেট নিয়ে চূর্ণ করে জল দিয়ে গুলে দিচ্ছে তার মা। মিতিনের ইচ্ছে করে না ওষুধ খেতে, তবু খায়, তার খুব শ্বাসকষ্ট, জ্বরও অনেক। তার বিরক্ত লাগে, এদের কত অসুবিধা হচ্ছে এদিকে! কোনো মানে হয়!

আবার ঘুমঘুম হিমহিম বেলা বয়ে যায়। সে দেখে ধাপকাটা খাড়া সিঁড়ি, পাহাড়ের উপরে মন্দির। নির্জন, খুব নির্জন। এদিকে বেশী লোক আসে না। তাই ভক্তের ভীড় নেই, পাহাড়ে কালীমন্দির। সিঁড়ি দিয়ে সেদিকে উঠে যাচ্ছে দুজন, নতুন বিয়ে হওয়া স্বামীস্ত্রী, হাতে হাত ধরে আছে। ছবিটা মিলিয়ে গেলো। ওষুধে বোধহয় কাজ করতে শুরু করেছে, শ্বাসকষ্ট কমে যাচ্ছে। জ্বরও কমে যাচ্ছে হয়তো, অত শীত করছে না আর মিতিনের। নেবে না, এবারেও নিলো না তাকে। কান্না লুকিয়ে ফেলে সে, সোনালী আলো মিলিয়ে যাচ্ছে, তার খুব ঘুম আসছে, শান্তির ঘুম, জ্বরের ঘোর নেই তাতে।

তারপরে জ্বর সেরে গেছে কবে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা হয়ে গেছে। কেজানে কেন আর বোর্ডিং এ পাঠায় নি তাকে বাবা-মা। তারা বেড়াতে যাচ্ছে ছুটিতে। মিতিনের, মিতিনের ভাই, বাবা, মা। রাতের গাড়ী ছুটে যাচ্ছে দক্ষিণে, কুউউউ ঝিকঝিক্‌ঝিক্। উপরের বাঙ্কে ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত দুলুনি, সমুদ্রের মতন। আড়াইদিন এভাবেই তারা চলমান যানের ভিতরে কখনো দিন কখনো নিকষকালো রাত্রি দেখতে দেখতে পার করে দিচ্ছে যাত্রাপথ। অনেক অনেক পরে, এই শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দ আবার শুনবে সে, এক অদ্ভুত্ শূন্যযানে টানা কুড়িঘন্টা উড়তে উড়তে দিবারাত্রির মালা পার হতে হতে .... ঐ যে বলে ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হয়? কথাটা কি মানুষের জীবনেও সত্য? কোথাও কোনো লুকানো সরল দোলগতি রয়ে গেছে রক্তের লাবনিক স্রোতে?

৩।

এবারে শুধু ছুটি কাটানো, এবারের ছুটিই মিতিনের শেষ ছুটি। অঢেল সময়, দৌড়াদৌড়ি নেই। কতদিন তো শুধু দৌড়াদৌড়িতেই গেল! এবারে শুধু বিশ্রাম। বাবামাকে সে এখনও কিছু বলে নি, ক'দিন পরে তো জানতে পারবেই তারা।

বাড়ীতে শুধু তারা তিনজন এবারে, ভাই দূরের শহরে চলে গেছে চাকরি নিয়ে। মিতিন তার সমস্ত সঞ্চয় ঠিকঠাক সময়ে ট্রানস্ফার করার ব্যবস্থা করেই এসেছে। ভাই জানে, কিন্তু সে ভাইকে না করেছে বাবামাকে কিছু জানাতে। পরে তো.....

মিতিনের প্রিয় লালশাক, বেশী করে ঝাল দেওয়া টোমাটোসর্ষে, নারকেল দেওয়া মুগডাল আর লাউচিংড়ি রেঁধেছিলো মা। সঙ্গে ছিলো গরম ভাতে নতুন আলুসেদ্ধ-কাঁচা মরিচ আর সর্ষের তেল দিয়ে মেখে। আ:, মিতিনের খুব প্রিয়। খুব তৃপ্তি করে খেয়েছে সে। মাছমাংস আর খেতে ইচ্ছে করে না তার, এতদিন নানাকিসিমের মাংসই তো খেয়ে গেছে বিদেশ বিভুঁইয়ে, এখন আবার ছোটোবেলার প্রিয় খাবারগুলো খেতে ইচ্ছে করে তার, সামান্য সব জিনিস, কত অসামান্য আজ! তখন কতকিছু সে চাইতে পারতো না, চাইলে বকুনি খেতে হতো। আজ তাকে এরা কত কী দিতে চায়, আজ সে নিয়ে কী করবে? সময় তো আর নেই!

রাত্তিরে নিজের ঘরে একা একাই শুয়ে ছিলো মিতিন, ঘুমিয়ে পড়েছিলো সে। ঘুম ভেঙে দ্যাখে পাশে মা। মা কি কিছু বুঝতে পেরেছে? মিতিন মায়ের হাত নিয়ে নিজের পিঠের উপরে রাখে, মা বলে," কী রে মিতিন?"

মিতিন ফিসফিস করে বলে,"মা, অনেক আগে তোমার থেকে চুরি করতাম, তোমার ব্যাগ থেকে লুকিয়ে নিতাম টাকা। চাইলে যদি বকো, তাই চুরি করে নিতাম। ট্রেনে বাসে টিকিট কাটতে লাগতো। মাঝে মাঝে দুপুরে খুব খিদেও পেত। দু'টাকার ঝালমুড়ি কিনে খেতাম। টাকা যে নিতাম, তুমি তা জানতে পারোনি তখন, জানলে হয়তো শাস্তি দিতে। দাও, এখন শাস্তি দাও।"

মা আস্তে আস্তে মিতিনের পিঠে হাত বুলায়, বলে, "টাকা তো আমার না মিতিন, আমি কি চাকরি করতাম? সব তোর বাবার টাকা। এমনিতে তো তোকে দেওয়ারই কথা, ট্রেনবাসের জন্য, দুপুরে খাবার জন্য। তুই নিয়েছিস, ঠিকই তো করেছিস।"

মিতিন হাসে, বলে, "তখন জানলে কি এই বলতে? তখন জানলে ডান্ডাপেটা করতে। নাও, এখন মারো।" মায়ের হাত ধরে মিতিন আবার পিঠের উপরে রাখে।

মা মিতিনকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে থাকে, তারপরে চুলে বিলি কেটে দেয়। অনেকক্ষণ। মিতিন শুনতে পায় মায়ের অস্ফুট ফোঁপানি। মা বলে, "কেন রে তুই আমাদের জানাস নি? তোর ভাইকেও বারণ করেছিস? কেন রে মনা? আমরা কি তোর এত পর?"

মিতিন চমকে ওঠে। বলে,"ও তোমাদের বলে দিয়েছে? ইশ, এত করে বারণ করলাম! তবু বলে দিলো? "

মা কাঁদছে, মিতিন চোখ মোছায় মায়ের। বলে, "আর কয়মাস পরে ট্রানস্ফার নিয়ে এই শহরে চলে আসবে ভাই। তখন ওকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করে দিও। আমি ওর বান্ধবীকে দেখেছি মা, খুব ভালো মেয়ে। দেখো, ওরা সুখী হবে। তোমাদের খুব ভালো হবে। ভাইকে আমি কোনোদিন ঈর্ষা করিনি মা, ও ও আমাকে কোনোদিন ঈর্ষা করেনি। এত সুন্দর ছোটোবেলা ছিলো আমাদের! সেই খেলার মাঠ, সেই ধানক্ষেতে লুকোচুরি, সেই বন্ধুরা....."

তরতর কলকল করে বয়ে যায় নদী, অদ্ভুত শব্দ ওঠে তীরে তীরে। অথচ এই কালনদীটি নিত্য বহমানা, তবু কি নি:শব্দ! সেই কী দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ, নদীপারের সিডার গাছটির মতন? চুপচাপ স্থবির হয়ে? খেলা বন্ধ হয়ে গেলো? আর নতুন দিনগুলো হাতের মুঠো বন্ধ করে দুষ্টু দুষ্টু হাসিমুখে বলছে না, "বলো তো কী আছে?"

অথচ মিতিন এখনো কী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এখনো ক্লাস ফোরের সেই নতুন ঘরখানা, দোতলায়, দক্ষিণের জানালায় আমগাছের মাথা, উত্তরে ফাঁকা, পুবের দিকে ছোট্টো মাঠখানা, ঐদিকের জানালার পাশেই ব্ল্যাকবোর্ডখানা রাখা। সদাবিষন্ন পুষ্পাদিদিমণি ক্লাস টিচার। বয়স্ক মহিলা সবসময় সরু পাড়ের সাদা একখানা শাড়ী কুঁচি না দিয়ে সাধারণভাবে পরতেন, মুখে হাসি দেখা ছিলো অত্যন্ত বিরল ঘটনা। উনি অঙ্ক করাতেন মিতিনদের। হাসিবিহীন কঠিন কর্তব্যের মতন বোর্ডে বুঝিয়ে বুঝিয়ে করাতেন পাটিগণিত, ভগ্নাংশ, গুননীয়ক গুণিতক। ঐ তো সে দেখতে পাচ্ছে পশ্চিমের দেয়ালে ঝোলানো অনেক অনেক ছবি, আগের বছরের দাদাদিদিরা দিয়েছিলো।

এখন সেই দিদিরা অনেকেই দুটো মোড় পার হয়ে যে বড়ো হাইস্কুল, সেখানে পড়ে। তারাও যাবে পরের বছর। তাই ঐ ছবিগুলো দেখলেই তাদের ডানার কুঁড়ি চঞ্চল হয়ে ওঠে। যেন দিনবদলের ছাড়পত্রের গন্ধ লেগে থাকে ঐ ছবি ঝোলানো দেয়ালে। অপটু হাতের বালকবালিকাদের জলরঙে বা প্যাস্টেলে আঁকা ছবি, কত যত্ন করে বাঁধিয়ে রেখেছেন দিদিমণিরা। ক্লাসরুমটাই তো একদম নতুন, চালু হোলো মোটে গত বছর। সোমাদির হাতের সৌরজগৎ এর ছবিখানা কি যে আবিষ্ট করে দিতো! অথচ রঙবিহীন জ্যামিতি শুধু। সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো দিয়ে আঁকা সব গ্রহগুলো আর কক্ষপথসমূহ, মাপের ও কোনো ঠিক নেই। অথচ কি যে তার হোতো ও ছবিটার দিকে তাকালে, শিরশির করতো সারা গা। তাই ওটার দিকে সে তাকাতো না ছুটির আগের পিরিয়ডগুলোতে। ছুটির সময় তাকিয়ে নিয়ে বাড়ী ফিরত, আহা ঐ শিরশিরাণিটুকু সঙ্গে লেগে থাকতো পথটুকু জুড়ে।

হাঁটাপথের পাশে পুকুর, মধুফুলের ঝোপ, খাটালে মস্ত মস্ত কালো কালো মোষ, ছোটো একটি গুমটি দোকান, মস্ত পাঁচিলে ঘেরা প্রাসাদের মতন একটি বাড়ী, বাড়ীর নাম নফর ধাম। আহা, অত বড়োলোক কেন নফর হবে? কারই বা নফর সে? এইসব প্রশ্ন ভাবতে ভাবতে দৃশ্যপট বদলে গিয়ে এইবারে এসে যেত বড়োমাঠ, সেখানে তখন কেউ নেই বটে, তবে আরেকটু পরেই বড়ো দাদারা ফুটবল খেলতে আসবে।

এইবারে বাড়ী। বইয়ের ব্যাগ রেখে হাতমুখ ধুয়ে খেলতে যাওয়া, তাদের খেজুরতলার মাঠে। পুতুল, মামণি, পারমিতা, পম্পি, টুম্পারুম্পা দুই টুলটুলে যমজ বোন, মেনেদি, মৌদি, সোনাদি। জয়দা, টুটুনদা সোমেনদা, শিব্রামদা। কত নাম তার আজ মনে পড়ছে। গরমকালের বিকেলগুলোতে অনেক সময় পাওয়া যেতো, টুপ করে সূর্য ডুবে যেতো না তাড়াতাড়ি। অনেকক্ষণ খেলা জমতো। তারপরে ধুলোপায়ে বাড়ী ফিরে কুয়োর ঠান্ডা জলে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা। বেশীরভাগ দিনই লোডশেডিং, তাই হ্যারিকেন লন্ঠনের আলোতে পড়াশুনো।

তবুও কুলকুল করে এসবের আড়ালে আড়ালে বয়ে যায় সময়, মাঝে মাঝেই মিতিনের একা একা লাগতো খুব। কোথায় যেন তীব্র দলছুট তার হৃদয় নির্জন বনে পলাশগাছের নীচে একা দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষুণি যেন কোথা থেকে উড়ে আসবে এক অলৌকিক নীলপাখি, ওর একটি আশ্চর্য পালক উড়ে এসে পড়বে তার ফ্রকের সামনের কুঁচিতে।

৪।

অনু একটু আলাদা রকমের কাছের বন্ধু, বারে বারে ভাব আড়ি ভাব আড়ি করে করে কোথায় যেন মিল হয়ে গেছিলো ওর মনের সঙ্গে মিতিনের। তার অবাক লাগতো, আর কারুর সঙ্গে তো এমন হয় নি!

"ঐ দ্যাখ মিতিন তিনখানা জ্বলজ্বলে তারা একলাইনে, কালপুরুষের কোমরবন্ধ।" বসন্তের সন্ধ্যায় দক্ষিণ আকাশে অঙ্গুলিনির্দেশ করে অনুই তো বলছে, ঐ তো কেমন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে! মানুষের স্মৃতি কি সময়ের নদীর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে? তীরবর্তী সিডার গাছটির মতন?

অগণ্য তারা ছড়ানো নির্মল বাসন্তী সন্ধ্যায় কি এক তরঙ্গ এসে লাগে প্রাণের কোন্ গোপণ গভীর নিশীথবীনায়, যেখানে কে যেন স্তব্ধ হয়ে বসে আছে তার জন্য, নীরব, অন্ধকার, তার মুখ দেখা যায় না। এই কি সেই "ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন/ তলাতল খুঁজলে পাতাল পাবি রে সেই কৃষ্ণধন" ? এই কি সেই, সেই, সেই, সেই?

সে এইবারে অনুকে চেনাচ্ছে সপ্তর্ষি, রাজহংসমন্ডল, অভিজিৎ বলে নীল তারাটি---সে কবে? কতকালের পরে? কত জল বয়ে গেছিলো মাঝে পৃথিবীর সমস্ত নদীতে নদীতে? গঙ্গায় নীলে মিসৌরিতে ওব ইনিসি লেনায়?
"জানিস মিতিন, আমার কাকে সবচেয়ে ভালো লাগে? " অনু বলছে।

"কাকে?" মিতিন জিজ্ঞেস করে।

আবার হাত আকাশে বাড়িয়ে দিয়ে অনু বলে," কালপুরুষকে। "

কালপুরুষের জন্য তীব্র তৃষ্ণা মনে লুকিয়ে রেখে মিতিন ঝট করে বলে দেয়," আমার ভালো লাগে সপ্তর্ষিকে।"

অনুব্রতা হেসে লুটিয়ে পড়ে প্রায়," ওরে বাবা, সাতজনকে একসঙ্গে? "

তার কতকাল পরে, সদ্য বিবাহিতা অনুব্রতা বস্ত্রালংকারে সুসজ্জিতা হয়ে স্বামীর সঙ্গে হাওড়া স্টেশনে এসেছে,পরিজনেরা জিনিসপত্র সমেত তুলে দিলো ওদের কামরায়, ব্যাঙ্গলোরগামী দম্পতির সামনে সন্ধ্যার খোলা জানালায় ঝলমল করে কালপুরুষ। শৈশব-কৈশোর ছেড়ে যাবার বেদনায় অনু নীরবে উঠে চোখে জল দিতে যায়, এক একা কালপুরুষের দিকে চেয়ে ওর আয়ত চোখ দুটি জলে ভরে যায়। পৃথিবীর সংসার কি অয়স্কঠিন! সব স্বপ্ন কেমন শ্যাওলা ধরে যায়,কত তাড়াতাড়ি মিছা হয়ে হয়ে যায়।

নির্বিকার রেলগাড়ী চলে ঝমঝমঝমঝম, সব চেনা কিছু দূরে মিলিয়ে যায়, ঠিক তখন মিতিন সন্ধ্যার ছাদে। কালপুরুষ তার দিকে চেয়ে ভ্রূভঙ্গী করলেন, কতকাল আগে থেকেই তো সবটা রহস্য তিনি জানেন। সে দু'হাত প্রসারিত করে যতটা সম্ভব ততটা আঁকড়ে ধরে ক্ষুদ্র বাহুদ্বয়ে, মুখ গুঁজে দেয় নীহারিকায়।

কালপুরুষের হাতদুটি অস্ত্র মুক্ত হয়ে নেমে এসেছে তার মাথার চুলের উপরে। মিতিনের ঠোঁট নড়ে, সে প্রার্থনা করে, "কখনো কখনো কখনো যেন সংসার না নিতে পারে আমাকে ছিঁড়ে তোমার বুক থেকে।" তার এতকালের সযত্ন সঞ্চিত অশ্রু অঝোরে ঝরে পড়ে অবারিত ভিজিয়ে দিতে থাকে ওর নীল বুক। সে হাসে, ওর থেকে ছিঁড়ে নেবে, এমন সাধ্য কি থাকতে পারে কখনো ক্ষুদ্র পৃথিবীর সংসারের? সময়ের নীলধারার পাশে শান্ত ন্যগ্রোধ বৃক্ষটির মতন পাখিটিকে কোলে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে অজ নিত্য শাশ্বত আলো-অন্ধকারের হৃদয়।

৫।

মায়ের কান্না আরো বেড়েছে, দু'হাতে মায়ের চোখ মোছাতে মোছাতে অশ্রুহীনা মিতিন ঘোরলাগা মানুষের মতন বলে যায়, " এমন জীবনের জন্য আবার আসতে ইচ্ছে করে। কতকিছু দেখা হলো না, সাধ রয়ে গেলো। সেই বিরাট জলপ্রপাত, জলের বিরাট প্রাচীরের মতন ঝরছে-দেখা হলো না। দেখা হলো না প্রশান্ত-মহাসাগরের সেই রঙীন জলমেলা-হাজারে হাজারে রঙীন নৌকা, জলে কোটি কোটি মাছ আর আকাশে লাখ লাখ পাখির ঝাঁক-দেখা হলো না। হাত বোলানো হলো না একটা পোষা ডলফিনের পিঠে--সাধ রয়ে গেলো। আসতে আবার হয়তো হবে, পরজন্মে যদি তোমার কোলেই আসি মা, তখন আমায় তাড়িয়ে দিও না।"

মিতিন নিজেকে দেখতে পাচ্ছে অন্ধকার রাত্রির মাঠে, আকাশমুখী। সেই যে, যে বছর ধূমকেতু নিয়ে ঘোর উন্মাদনা! "ধূমকেতু আসবে ধূমকেতু আসবে, হ্যালীর ধূমকেতু আসবে পঁচাত্তর বছর পরে। সেই এসেছিলো দশ সালে।" তার রক্তের মধ্যে দোলা লাগে, হেসে ওঠে কারা নীল দেয়ালের ওপারে।

শুকতারা পত্রিকায় যত্ন করে লেখা জার্মান চাষী পালিৎসের গল্প- যে নাকি নিজের বানানো টেলিস্কোপে প্রথম দেখেছিলো হ্যালীর ভবিষ্যদ্বানী করা ধূমকেতুটিকে। হ্যালী তখন ইহলোকে নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর কথা, তিনি প্রথম অংক কষে বলে গেছিলেন একটি ধূমকেতুর আসার সময়কাল। সবাই বারণ করেছিলো তাঁকে, তখনো মানুষ অভ্যস্ত হয়নি ভাবতে আকশের বস্তুরা নিয়ম মেনে চলে, তখনো নিউটনের প্রিন্সিপিয়ার গায়ে নতুন-নতুন গন্ধ, সবাই ভয় পেলো যদি না মেলে প্রেডিকশন, হয়তো সবাই হ্যালীকে দুয়ো দেবে, অন্যসব ভালো ভালো কাজগুলোও ভুলে যাবে। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেছিলো, উনি এমন কায়দা করে এক ভবিষ্যদ্বানী করছেন যে তা না মিললেও ওনার গায়ে আঁচড়টি লাগবে না, উনি তো ততদিন আর বাঁচবেন না! এই আশানিরাশার দোলা থেকে উদ্ধার হলো জগৎ, প্রথম যেদিন ধূমকেতুটিকে দেখতে পেয়ে গেলো পালিৎস! হ্যালীর সঙ্গে সঙ্গে সেও শান্তমুখে ঢুকে পড়লো ইতিহাসে।

ধান কেটে নেয়া ক্ষেতের উপরে দাঁড়িয়ে তারা খোঁজে সেই ধূমকেতুটি, কথা দেয়া যে ওর, প্রতি পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর বছর বাদে বাদে আসবে পৃথিবীর কাছে। তাদের চোখে ধরা পড়ে না, উত্তর আকাশে কারখানার আলোয় আলো হয়ে আছে, প্রগাঢ় অন্ধকার নেই।

তারপরে, ধূমকেতুর অনেকদিন পরে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে তারা শরতের শেষরাত্রে যাচ্ছিলো সবাই মিলে, সেই ঘনকালো চন্দ্রছায়ায় অপরূপ সেই সৌরকিরীট দেখার স্মৃতি-সেইসব এত স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে কেন?

সে আবার দেখে সেই গাড়ী, কু উ উ উ ঝিকঝিক করে তাদের গাড়ী রাত্রি ভেদ করে চলেছে দক্ষিণে দক্ষিণে আরো দক্ষিণে, বাঁপাশে রেখে যাচ্ছে বিশাল উপসমুদ্র। স্বপ্নের সোনালী আলোর মায়ের কোলে মুখ রেখে শুয়ে পড়ে সে, মায়ের রেশমী কমলা শাড়ীর মধ্যে কিরকম সুন্দর একটা গন্ধ। মায়ের চুলেও সেই গন্ধ, মা আস্তে আস্তে হাত রাখে মিতিনের মাথার চুলে। সে ঘুমেলা চোখে তাকিয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকে, মায়ের কপালে জ্বলজ্বলে একটা টিপ। দু'হাতে তাকে ধরে আছে মা, সে দুহাত বাড়িয়ে ধরতে যায় মাকে, পায় না। কিছু নেই। কিছু নেই,সব শূন্য। দু'চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে ভিজে যায় বালিশ, স্বপ্ন এত সুখের আর দুখের কেন? যদি পালিয়েই যাবে, তবে কেন কেন কেন সে আসে আরো আরো আরো কষ্ট দিতে? নীল কুয়াশা মিলিয়ে যায়, পুবের অল্প আলো ফোটা দিগন্তের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার।

সত্যি কি কথা দেওয়া আছে, কোথাও, কারো কাছে? ঐ বন্ধু ধূমকেতুটির মতন, যে কিনা ফিরে ফিরে আসে? চোখে যাকে দেখা গেলো না বলে তার নির্জন হৃদয়ে সে চিরস্থান নিয়েছে? ঐ তো প্রথম তাকে বলে গেলো, ..... কী বলে গেলো? মনে পড়ে-পড়ে তবু পড়ে না, অনাদ্যন্ত গায়ত্রীমন্ত্রের মতন অনাহত সুর বেজে যায় নিসর্গে, মৈত্রেয়ীর বিশ্রামতৃপ্ত দুচোখ ভরে ওঠে নোনাজলে, কেন কেন কেন এত অল্প জানে সে?

দক্ষিণের শহরগুলো ভারী পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন। মন্দিরগুলোও। নারকোল প্রসাদ দেয় ওরা, রাত্রে বাতি দিয়ে রোজ নানা আলাদা প্যাটার্নে সাজায় দেবদেবীর মূর্তি ও পারিপার্শ্বিক। একটি পাথুরে শহরে আশ্চর্য এক মন্দির। মন্দিরের এক অংশে কতগুলো পাথরের স্তম্ভ, একটায় কোনো ধাতু দিয়ে ঠুকঠুক করলে সবকটায় অদ্ভুত সুরতরঙ্গ শোনা যায়! থামে কান ঠেকিয়ে অজস্র মুগ্ধ পর্যটক, একজন একটি সিকি দিয়ে ঠুক ঠুক করে অল্প আঘাত করলেন কোণের থামটির গায়ে, মুহূর্তে সব থামে সুরমূর্ছনা!!!!

মৈত্রেয়ী অবাক হয়ে কান চেপে আছে থামের গায়ে, অদ্ভুত শিহরণ সর্বাঙ্গে!! এমন হয়? ঐ অতদূরে ঐ সামান্য আলোড়ন, এই মুহূর্তমধ্যে কিকরে চলে এলো এইখানে? তবে কি এই চেনা জগতের বাইরে অচেনা রহস্যময় কিছু আছে? কী সে?

আলোছায়ার মধ্যে তিন ঘর জুড়ে শুয়ে থাকা বিরাট এক দেবমূর্তি, শায়িত বিষ্ণু। যোগনিদ্রায় আচ্ছন্ন। এই জগত নাকি তার স্বপ্নমাত্র!!! তিনি জেগে উঠলেই সোনালী কুয়াশার মতন মিলিয়ে যাবে সবকিছু। তাঁর স্বপ্নের মধ্যে জেগে উঠেছে ঐ সূর্য, এই পৃথিবী, ঐ কোটি কোটি তারা। জেগে উঠেছি আমরা, জেগে উঠেছে ঐ গাছেরা, কোটি কোটি প্রাণী!

দক্ষিণে বর্ষা দুবার, একবার শীতে, একবার গ্রীষ্মশেষে। এখন শীত, কিন্তু মেঘে মেঘে ছেয়ে গিয়ে শুরু হলো ধারাবর্ষণ। বৃষ্টির শেষে রাত্রির আকাশ ধোয়ামোছা, নিবিড় মধ্যরাত্রিনীলে ফুটে ওঠে অগণ্য তারা! ওপরে ঐ জ্যোতির্লোকের দিকে চেয়ে তার সেই যোগনিদ্রামগ্ন দেবতাকে মনে পড়ে, ঐ সমস্ত নক্ষত্ররাশি, এই বিপুল জগত যাঁর গভীর নিদ্রার স্বপ্ন।

আবার ট্রেন , ঝিকঝিকঝিক, কাবেরী নদীর স্বল্পতোয়া দেহ, রেললাইনের দু"পাশে যেমন হয়, অজস্র মাঠ, ধানক্ষেত, শীতে সোনালী ফসল তোলার মরশুম, মাঠে মাঠে স্তুপ করে রাখা কাটা ধানের গোছা। দেখতে দেখতে একেবারে দক্ষিণতম অংশে চলে এসেছে তারা, একেবারে অন্তরীপে। সম্মুখে শুধু মহাসমুদ্র।

সাগরবেলায় তিনরঙা বালি, হলদেটে সাদা,লাল কালো-পায়ে পায়ে শিরশিরে জলবালি মাড়িয়ে জলের দিকে এগিয়ে যাওয়া, মহাসমুদ্রের হাওয়া চুলগুলি ওড়ায়, সমুদ্র কী গভীর নীল, ঢেউয়ের মাথায় ফেনারা কি দুধেল!

কি আশ্চর্য এই জগত! কি অপূর্ব এইসব গাছেরা, ঐ মহাসমুদ্র, ঐ রঙীন বালুবেলা, ঐ সমুদ্রদিগন্তে ভোরের লাল বলের মতন সূর্যের লাফিয়ে ওঠা! ঢেউ আসে, ঢেউ যায়, বালিতে ঝিনুক পড়ে থাকে। বালিতে অদ্ভুত প্যাটার্ন তৈরী হয় জলের টানে, দেখতে দেখতে অবাক আর খুশী হয়ে ওঠে নতুন কিশোরী, যার আকাশী ফ্রকে সমুদ্র আর আকাশ জেগে থাকে একই সঙ্গে। ঐ তো মিতিন দেখতে পাচ্ছে সে নীচু হয়ে ঝিনুক কুড়িয়ে নেয়, ঝিনুকের গায়ে চিত্রবিচিত্র নকশা!

সমুদ্রে স্নান খুব সুন্দর ব্যাপার। ঢেউ আর বালিতে লুকোচুরি খেলা। খালি চোখে নুন লেগে জ্বালা করে অল্প। অনেক মস্ত মস্ত শিলা সমুদ্রে। একটি দুটি শিলায় বহির্সমুদ্রের ঢেউআটকানো ছোটো অংশে ভোরেরবেলা স্নান করতে এসেছে তারা। জলে লালসবুজ ছোট্টো ছোট্টো মাছ সাঁতরে বেড়ায়। এত বোকা মাছগুলো, ওদের গামছায় ছাঁকা দিয়ে ধরে ফেলা যায়। মিতিনের ভাই সমুদ্রের মাছ পুষতে চায় বাড়ীতে, বাবা হাসে, বলে তা অসম্ভব, কিন্তু ভাই কাঁদে। জলের মগে নেওয়া হয় দু'খানা মাছ। নিয়ে আসা হয় গেস্ট হাউসে, কিন্তু দুপুরে মাছগুলো মরে যায়, ভাইয়ের কান্না থামাতে মিতিনের বাবা কিনে আনে ক্যালাইডোস্কোপ!

চোখের সামনে সেই ম্যাজিক নল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাজার হাজার নক্সা দেখে ভাইবোনে! চৌকো গোল ষড়কোণ অষ্টকোণ সোজা বাঁকা লাল নীল সবুজ চকমকে ম্যাড়মেড়ে কত কত অজস্ররকমের প্যাটার্ণ! কান্না ভুলে গিয়ে মস্ত মস্ত চোখ করে দেখে ভাই। ছোট্টো ভাইটা, সুন্দর নরম ওর শিশুমুখ, মাত্র নার্সারিতে পড়ে ও। ওর গালে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে মিতিনের, কিন্তু মা যদি বকে? গালে হাত বুলিয়ে দেওয়া হয় না, ক্যালাইডোস্কোপ ওর হাতে দিয়ে মিতিন সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় নীচে শিশু নারকেল গছের বাগানে, বিকেলে এখানে পর্দা টাঙিয়ে সিনেমা দেখানো হয়।

সেই অন্তরীপে মিতিনের আর ওর বাবামায়ের নাকি এটা দ্বিতীয়বার, আগে নাকি এসেছিল যখন মিতিনের মাত্র দুইআড়াই বছর। তখনো নাকি এই গেস্ট হাউসেই উঠেছিলো তার বাবামা, তখন নাকি সব খুব অন্যরকম ছিলো। আগেরবারের বেশ কয়েকটা ফোটো দেখেছে সে, মাবাবা তখন কত অল্পবয়সী, কী অন্যরকম দেখতে! দু'জনেই অনেক সুন্দর। মিতিনও অন্যরকম ছবিতে!

নারকেলকুঞ্জে একা একা জলের মতন ঘুরে ঘুরে কথা বলতে ইচ্ছে করে মিতিনের , রোদ্দুরে ছায়ায় হাল্কা মেঘের ওড়াউড়ির খেলায় ডুবে যেতে ইচ্ছে করে! আচ্ছা, কেমন হয় সে যদি একলা একলা কোথাও হারিয়ে যায়? কেউ আর না খুঁজে পায় কোনোদিন? খুব মনে পড়ে অনুকে, তার খেলার সাথী, মনে পড়ে ঠাকুমাকে। ওদের কি মনে পড়বে ওকে?

মা আকুল কান্নায় মেয়েকে সিক্ত করে দিয়ে কত কি বলতে থাকে, আস্তে আস্তে মিতিন বলে, "মা, মাগো, কেন তুমি কাঁদো মা? যেখানে সবাই একদিন যাবে সেখানে আমি আগে আগে যাচ্ছি, এটা কত ভালো হলো তাই না? "

আর বেশী দেরি নেই। শক্ত মাটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে টলটল সমুদ্রে পাড়ি দেবার সময় হয়ে এলো, ঐ তো পালকের নৌকাটি দেখা দিয়েছে দূরে। ঐ তো সেই ছোট্টো মেয়েটা, নৌকার উপরে দাঁড়িয়ে আছে! ঐ তো সে হাসিমুখে হাতছানি দিয়ে ডাকছে মিতিনকে!

" আসছি রে, আসছি, আর দেরি হবে না।" মনে মনে বলে মিতিন।

তখন পুবে ফরসা হয়ে আসছে, তারারা মিলিয়ে যাচ্ছে।

*******


মন্তব্য

অপছন্দনীয় এর ছবি

মন খারাপ

তুলিরেখা এর ছবি

আরে আপনি দু:খ পান কেন? চিন্তিত
গল্প তো!

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অপছন্দনীয় এর ছবি

পছন্দের পোস্টে নিয়ে নিলাম হাসি

আর, ইয়ে, নীচে ষষ্ঠ পান্ডব কি যেন একটা বলেছেন, দেখবেন একটু?

তুলিরেখা এর ছবি

আরে দেখেছি। পান্ডবদা তো বলেই খালাস, এদিকে কুরুক্ষেত্র লেগে গেলে সামলায় কে? চিন্তিত

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অনিকেত এর ছবি

আপনার লেখার গুন বর্ণনা করে করে আমরা সবাই ক্লান্ত-শ্রান্ত। এমন অপূর্ব কাব্যগন্ধী লেখা আপনার --মাঝে মাঝে গদ্য আর কবিতার সীমানাটা ঝাপসা হয়ে যায়।
আমার নিজের লেখাটা যে 'দোষে' দুষ্ট---আপনার লেখার মাঝেও কম বেশি সেই দোষটা আছে।
মন-খারাপী লেখা। আমি খেয়াল করে দেখেছি-- আপনার লেখার মাঝে সব সময়ে কেন জানি এক বিষন্ন বালিকা চুপটি করে ঘুরে ফিরে যায়। মেয়েটার মনটা সব সময়ে এত খারাপ থাকে কেন?
আজকের লেখাটা পড়েও প্রচন্ড এক বিষন্নতায় ডুবলাম----

তুলিরেখা এর ছবি

এই সেরেছে! আপনি কোন দু:খে বিষাদে ভুগলেন???
আরে সেই কীটস না কোলরিজ না মিলটন না কোন সাহেব নাকি বলে গেছিলেন আমাদের মধুরতম গান হোলো
গিয়ে করুণরসের গল্প ? তবে ? তখন তো সাহেবেরে কিছু কন নাই! চিন্তিত

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ফাহিম হাসান এর ছবি

এত ছিমছাম লেখা বড় দুর্লভ। বর্ণনার কারিগরীতে মুগ্ধ হলাম।

তুলিরেখা এর ছবি

ধন্যবাদ ফাহিম হাসান।

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

নিশ্চিতভাবেই সুন্দর লেখা, কিন্তু সাইজ দেখে আপাতত সাহস পেলাম না... মন খারাপ
পরে পড়বো

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

তুলিরেখা এর ছবি

আইচ্ছা। পরে পইড়েন। পইড়া বইলেন কিন্তু সুখ পাইলেন না দুখ পাইলেন।

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

অসাধারণ বর্ণনা, সাতটি তারার তিমির বিলাসী। গল্পের ক্লাইমেক্স যেন ডি সি কারেন্টের মতোন।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

তুলিরেখা এর ছবি

সর্বনাশ কন কী! ক্লাইমেক্স ডাইরেক্ট কারেন্টের মত! চিন্তিত

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ফ্রুলিক্স.. এর ছবি

মন খারাপ
বর্ণনা অনেক অনেক সুন্দর।

তুলিরেখা এর ছবি

আপনেও দেখি দুখী মুখ ইমো দিলেন। চিন্তিত
ভালা থাইকেন, ধইনবাদ।

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

একজন পাঠক এর ছবি

এক কথায় অসাধারন।

রেজওয়ানুর

তুলিরেখা এর ছবি

ধইনাপাতা লন ভাই। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

মনটাই তো খারাপ করে দিলেন! এভাবেও ফিরে আসা যায়! এভাবেই কষ্ট দেওয়া যায়!

একটু ভাগ করে দিলে ভালো হতো বোধহয়।

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

তুলিরেখা এর ছবি

আরে মহাস্থবির, আপনে মহাস্থবির জাতক বইটার বিষয়ে একটা লেখা দিয়েন গো।

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নীড় সন্ধানী এর ছবি

আপনার হাতে শব্দগুলো এরকম সাজে কিভাবে?

আশ্বিনের রোদে খুশী হয়ে আছে পৃথিবী,

ঐ সমুদ্রদিগন্তে ভোরের লাল বলের মতন সূর্যের লাফিয়ে ওঠা! ঢেউ আসে, ঢেউ যায়, বালিতে ঝিনুক পড়ে থাকে। বালিতে অদ্ভুত প্যাটার্ন তৈরী হয় জলের টানে, দেখতে দেখতে অবাক আর খুশী হয়ে ওঠে নতুন কিশোরী, যার আকাশী ফ্রকে সমুদ্র আর আকাশ জেগে থাকে একই সঙ্গে। ঐ তো মিতিন দেখতে পাচ্ছে সে নীচু হয়ে ঝিনুক কুড়িয়ে নেয়, ঝিনুকের গায়ে চিত্রবিচিত্র নকশা!

অপূর্ব সুন্দর প্রকাশ!

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

তুলিরেখা এর ছবি

হাসি আরে শব্দেরা নিজেরা খেলা করতে চাইলে আমি কী করবো? চিন্তিত
আমি চাই ওরা বড় হয়ে উঠুক, ম্যাচিওর হয়ে উঠুক।

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

দারুন একটা লেখা।
মনে থাকবে লেখাটার কথা অনেকদিন।

তুলিরেখা এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ সবুজ পাহাড়ের রাজা।

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

হে AWM! আপনার লেখা পড়ে কতো জন কতো অনুরোধই তো করলেন। এই আমিও কি কম অনুরোধ করেছি! তার কতগুলোই বা মনে রেখেছেন। তবু আজ আরো একটা অনুরোধ করি। হয়তো এটাও রাখবেন না। তবু অনুরোধ করি। হয়তো কখনো মনে পড়বে এই অধম পাণ্ডবের অনুরোধটা। এটা নিশ্চিত ভাবেই একটা উপন্যাস হয় গো দিদি! সেই ছোটবেলায় এখলাস উদ্দিন আহমেদ না কার যেনো একটা উপন্যাস পড়েছিলাম "টাপুর টুপুর"তে - "ঋতু" নাম তার। এই গল্পটা পড়ে সেই উপন্যাসটার কথা মনে পড়লো। আজকাল বড় বড় সাহিত্যিকেরা কিশোরদের জন্য এমন লেখা তো ছেড়ে দিয়েছেন। তাতে নাকি তাদের জাত চলে যায়। আপনার তো আর জাত হারানোর ভয় নেই। আপনি না হয় সেই কুলত্যাগী কাজটা করলেন। এখন অথবা আগামীকাল অথবা আগামী বছর। কোনো একসময়, তবুও উপন্যাসটা লিখুন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তুলিরেখা এর ছবি

পান্ডবদা, কী আর বলবো! উপন্যাস লেখা কি যে সে কথা! তবু অনুরোধ যখন করেছেন তখন চেষ্টা করবো। আগামীবছর। ভালো প্রকাশক পেলেই হয়। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

প্রকাশক নিয়ে ভাবেন কেনো? ঠাক্‌মা না আপনার স্পনসর! তাঁকে বলুন। প্রকাশক যোগাড় করা, বই বের করা সব উনিই করে দেবেন। আপনি শুধু একটু কষ্ট করে উপন্যাসটা লিখে ফেলুন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তুলিরেখা এর ছবি

স্নিগ্ধাজী তো আর দেখাই দেন না! মন খারাপ

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

তুলিরেখা এর ছবি

ষষ্ঠ পান্ডবদা,
"ডানায় সমুদ্রের ঢেউ" নামেই খাতা খুললাম, উপন্যাসের চেষ্টা আরকি একটা। দেখা যাক কদ্দূর কী হয়। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অতিথি লেখক এর ছবি

বিষাদের কথায় অপূর্ব বলি ক্যামনে??? মিতিনরে ধইরা বর্ষায় চুবানো উচিত। ঐ মনে হয় বৃষ্টিতে ভিজেনাই তেমন। তাইলে মনে এত দুক্কু থাকত না। আর এত্ত সুন্দর একটা লেখায় মন খারাপ কইরা দিতনা সে। রেগে টং

অতীত

তুলিরেখা এর ছবি

এমনি বর্ষা না, এমনি বর্ষা না, " আলোর দরিয়া পারে প্রেমবরষায়"
একেবারে নির্বাণের নিদান। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

বইখাতা এর ছবি

অনেক অনেক ভাল লাগলো গল্প।

তুলিরেখা এর ছবি

ধইনাপাতা লন বইখাতা। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

বইখাতা এর ছবি

আহা আবার 'আপনি' করে কেন? 'তুমি'-টাই চলুক না! হাসি

তুলিরেখা এর ছবি

ঠিক আছে, তুমি। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

তিথীডোর এর ছবি

♪♫ 'একটা ঝলসে যাওয়া বিকেলবেলা,
একটা লালচে সাগরতলে..
যায় ভেসে যায় স্বপ্ন বোঝাই, নৌকো আমার... ছেলেবেলার, কাগজের..।' ♪♫
এই গানটা আজ দুপুর থেকে ঘ্যান ঘ্যান করে মাথায় ঘুরছে!' হাসি

গল্পে পুরো তারা। হাততালি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

তুলিরেখা এর ছবি

ধন্যবাদ তিথীডোর।
একদিন গান শুনাবেন ?

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

তিথীডোর এর ছবি

হায় দিদি--
গাইতে তো জানি না.. মন খারাপ
'আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।'

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

অপছন্দনীয় এর ছবি

দেঁতো হাসি

শুরু করলেই শিখে যাবেন...সাথে বাজনা লাগলে বলবেন, পাখোয়াজ সহযোগে সেই খাঁটি

ধত্তেরে কেটে তেড়ে নাগ, ঘুড়ান ঘুড়ান ঘুড়ান
নাগেদেৎ ঘেঘেতেটে ঘেঘেতেটে ঘেঘেতেটে ঘেঘেতেটে... ... (ঝালাপালাঃ সুকুমার রায়)

শুরু করে দেবো

দেঁতো হাসি

তুলিরেখা এর ছবি

গান আর বাজনার আয়োজন করলে আমারে খবর দিয়েন গো। হাসি

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।