অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো

তুলিরেখা এর ছবি
লিখেছেন তুলিরেখা (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৫/০৩/২০১৫ - ২:০৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সেটা ছিল এক আশ্চর্য তুষাররাত্রি। অজস্র অসংখ্য অগণ্য তুষারকণা ঝাঁপিয়ে নামছিল মেঘেভরা আকাশ থেকে, সাদা ধবধবে ঝুরো তুষারে ঢেকে যাচ্ছিল মাটি, পাথর, পথ, ঘাট, মাঠ, বাগান-সব কিছু। ঐ ঝরে পড়তে থাকা, বাতাসে উড়তে থাকা তুষারকণাদের দিকে চেয়ে থাকলে মনে হয় বাস্তব দুনিয়া নয়, চলে গেছি কোনো স্বপ্নের দেশে, অণু পরমাণুর জগতে, যেখানে কোটি কোটি অর্বুদ অর্বুদ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা অক্লান্ত নৃত্য করে চলছে অনন্তকাল।

কিন্তু কড়া ঠান্ডা হাওয়া ঝাপ্টা দেয় চোখেমুখে, বাইরে থাকা যায় না, উষ্ণ আশ্রয়ে ফিরতে হয়। রাতও অনেক হয়েছিল। ঘরের সব বাতি নিভিয়েও দেখি আলো আসে! কোথা থেকে? বাইরে থেকে জানালার ব্লাইন্ডারের ফাঁকগুলো দিয়ে। তুষারকণাদের থেকে প্রতিফলিত আলো রাত্রিকে স্নিগ্ধ জ্যোতির্ময়ী করে রেখেছে। ঘুম আসে না। চোখ বুজে চোখমুখের উপরে চাদর টেনে নিই, ঘুমোবার চেষ্টা করি। একসময় ঘুমে তলিয়ে যাই। কিন্তু স্বপ্নে সেই নৃত্যপরা তুষারকণাদের অপরূপ রূপ আবার আবার ফিরে আসে।

পরদিন রাশি রাশি সাদা বরফে মাঠঘাট-পথ-পাহাড় সব ঢেকে আছে, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া বইছে। কর্মস্থলে ছুটি, কারণ লোকে আসতে পারছে না পাহাড়প্রমাণ বরফ ঠেলে। শুধু রাস্তাগুলোকে মোটামুটি ঠিক রাখার জন্য বেরিয়েছে পথ পরিষ্কারের গাড়ী, বরফ চেঁছে দিচ্ছে।

জানালার পাশে বসেই নেট খুললাম ফেসবুক দেখার জন্য, অমনি এমন এক সংবাদ আছড়ে পড়লো আমার চোখে, যা দেখে স্থানু হয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ। মাথা কাজ করে না। লেখক এবং ব্লগার অভিজিৎ রা্য় নিহত, কুপিয়ে মারা হয়েছে তাঁকে।

অকলঙ্ক শুভ্র তুষার আমার চোখের সামনে লাল হয়ে ওঠে, টকটকে লাল। রক্তাক্ত সেই বরফের উপর দিয়ে চলতে থাকে চেনা অচেনা মানুষেরা, কেউ বা কৈশোর পার হয় নি, কেউ বা যৌবনের চৌকাঠে, কেউ প্রৌঢ়ত্বে, কেউ বার্ধক্যে। সবাই রক্তাক্ত, সাদা তুষার রক্তে ভাসিয়ে চলে যেতে থাকে কুয়াশা দিগন্তের দিকে। ওদের কারুকে আমি একদম কাছ থেকে চিনতাম। কারুকে শুধু চিনতাম নামে অর্থাৎ নাম শুনেছিলাম আর ভাসা ভাসা কিছু শুনেছিলাম তাদের সম্বন্ধে। আজকে সবাই তাদের মৃত্যু-সময়ের চেহারা বয়স মুখচোখ নিয়ে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, যেতে যেতে প্রশ্ন করে যাচ্ছে নীরবে। কেন, কেন, কেন? প্রশ্ন করে যাচ্ছে দীপ্ত তীক্ষ্ণ চোখের ভাষায়, যে ভাষায় আওয়াজ নেই কিন্তু যে ভাষার কথাগুলো বুকের মধ্যে গেঁথে গেঁথে গেঁথে গেঁথে যায়।

কেমন যেন লাগে, যেন আমাকে ঘিরে অদ্ভুত একটা অন্ধকার, কথাগুলো সব যেন কেমন থম মেরে আছে, হাতে যেন গিঁট লেগেছে। সমস্ত রকম লেখালিখি ছেড়েছুড়ে দিয়ে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে যেখানে নিরপরাধ অনুসন্ধিৎসু যুক্তিবাদীর হত্যার খবর পৌঁছবে না। কিন্তু কোথায় পালাবো? সেরকম জায়গা তো নেই দুনিয়ায়।

আমি নিতান্ত সাধারণ ব্লগার, গাছপালা ফুল লতা পাতা পাখি গ্রহ উপগ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সি প্রোটন নিউট্রন ইলেক্ট্রন কোয়ার্ক অ্যান্টিকোয়ার্ক ইত্যাদি প্রভৃতি এইসব সহজসরল জিনিস নিয়ে লেখালিখি করি। হয়তো বা কখনো একটা আধটা সরলসোজা গল্প বা কয়েক লাইন কবিতা। আদতে আমি ভীরু আর সীমিতবুদ্ধির মানুষ, জটিল আলোচনায় খেই পাই না। এক একটা বাক্যের নানা ঘোরালো প্যাঁচালো তিন চার রকম অর্থ, এসব ব্যাপার বড়ই হালে পানি না পাওয়া ব্যাপার আমার কাছে।

নিতান্ত যা দেখা যায়, শোনা যায় সেইসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে আমার লেখালিখির সামান্য কারবার। ঐ যে সূর্য আকাশে জ্বলে, সেটার মধ্যে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়ার ফিউশন হয়ে কেমন করে শক্তি তৈরী হয়, সেটুকু জানতে পেরে ভালো লাগে, ভাগ করে নিতে চাই। আমাদের মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল এক মহাবিস্ফোরণে, তারপরেই ছড়িয়েছে বিপুল ক্রমত্বরান্বিত হারে যাকে বলে ইনফ্লেশন, এইসব চমকপ্রদ অথচ নিতান্ত সত্য ঘটনা, যেগুলো কিনা গণিত আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে যাচাই করে নেওয়া যায়-সেগুলো জেনে ভালো লাগে, সেই আনন্দটুকু লিখে ভাগ করে নিতে চাই। অথবা হয়তো কোনো নতুন দৃশ্য, নতুন কোনো ঘটনা আশ্চর্য কোনো অভিজ্ঞতা মনকে নাড়া দিয়ে যায়, তাই নিয়ে সামান্য ব্লগরব্লগর করে যাই।

তাই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি যখন শুনি একজন মানুষ মহাবিশ্ব নিয়ে লিখতেন, গ্রহনক্ষত্র গ্যালাক্সি ব্ল্যাক-হোল বিগ ব্যাং নিয়ে লিখতেন, লিখতেন বিবর্তন নিয়ে, লিখতেন যুক্তিবাদের কথা, লিখতেন অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের কথা-সেই মানুষকে হত্যা করা হলো অজস্র মানুষের চোখের সামনে। এ কি হতে পারে? আলো হাতে চলা যাত্রীকে এইভাবে থামিয়ে দেবে অন্ধকারের শক্তি?

অভিজিৎ রায়ের বইয়ের নামটা মনে করছি, "আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী" আর চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "মুক্তধারা" নাটকটা আমার খুব প্রিয় একটা লেখা, মাঝে মাঝেই পড়ি। সেখানের অভিজিৎকে মনে পড়ছে, সেও তো মুক্তধারা ঝর্ণাকে মুক্ত করতে গিয়েই নিজে চলে গেল চিরদিনের মতন।

কিন্তু সত্যিই কি চলে গেল? মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে আমাদের সকলের জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত, সে মহা-মৃত্যুঞ্জয়।

গভীর মহাকাশের নীল নক্ষত্র অভিজিৎ আলো পাঠায় আমার চেতনায়, আবার অন্ধকার হাল্কা হয়ে যায়, আবার শুনতে পাই কথা, সুর, গান, অনির্বাণ সেই অনন্ত বীণার ধ্বনি।

*******


মন্তব্য

মাসুদ সজীব এর ছবি

চলুক

আমি শুধু ভাবি কত বড় আলোকিত নক্ষত্রটাকে আমরা সরিয়ে দিলাম তা কি আমরা বুঝে উঠতে পেরেছি? কোনদিন পারবো কি?

-------------------------------------------
আমার কোন অতীত নেই, আমার কোন ভবিষ্যত নেই, আমি জন্ম হতেই বর্তমান।
আমি অতীত হবো মৃত্যুতে, আমি ভবিষ্যত হবো আমার রক্তকোষের দ্বি-বিভাজনে।

তুলিরেখা এর ছবি

সেটাই। আমাদের যে কী হারালো, কতখানি হারালো, সে বুঝতে বুঝতেই হয়তো কেটে যাবে কতকাল!

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

রানা মেহের এর ছবি

মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে আমাদের সকলের জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত, সে মহা-মৃত্যুঞ্জয়।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

তুলিরেখা এর ছবি

ঠিক। আমাদের হৃদয়ে তাঁর নিত্য অভিষেক।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অতিথি লেখক এর ছবি

নক্ষত্রও নিভে যায়, মুছে যায় পৃথিবীর পুরাতন পথ
শেষ হয় কমলার ফুল, বন- বনের পর্বত
তবু মানুষের মনে
যে সৌন্দর্য্য জন্ম লয়, শুকনো পাতার মত ঝরে নাকো বনে
ঝরে নাকো বনে

তুলিরেখা এর ছবি

মানুষের মনের শক্তি ও সৌন্দর্য একদিন সব অন্ধকার দূর করবে, এই আশাতেই থাকি।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অতিথি লেখক এর ছবি

"গভীর মহাকাশের নীল নক্ষত্র অভিজিত আলো পাঠায় আমার চেতনায়, আবার অন্ধকার হাল্কা হয়ে যায়, আবার শুনতে পাই কথা, সুর, গান, অনির্বাণ সেই অনন্ত বীণার ধ্বনি।"

এতটা আঘাত পেয়েও আপনি খুব সুন্দর একটা লেখা লেখেছেন , ধন্যবাদ আপনাকে ।

"কোন ভীরুকে ভয় দেখাবি , আধার তোমার সবই মিছে" রবি ঠাকুরের কথাটা উপহার দিলাম ।
আধারের পথে আলো নিয়ে তো আপনাদেরই হাটতে হবে ।

-------------
রাধাকান্ত

তুলিরেখা এর ছবি

আপনাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমার আরেকটা লেখাতে আপনার সেদিনের কমেন্ট অনেক শক্তি যুগিয়েছে হতাশার মধ্যে।
ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

আয়নামতি এর ছবি

মন খারাপ

তুলিরেখা এর ছবি

কী আর বলবো। শুধু অসহায় রাগ হয় আর হয় দু:খ। মন খারাপ

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অতিথি লেখক এর ছবি

সেখানের অভিজিৎকে মনে পড়ছে, সেও তো মুক্তধারা ঝর্ণাকে মুক্ত করতে গিয়েই নিজে চলে গেল চিরদিনের মতন।

অভিজিৎরা এমনি, তারা প্রথাভাঙ্গার লড়াইয়ে সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে চলে একসময় শূন্যে বিলীন হয়ে যান! না হলে, দেখুন তো তুলিদি, যাদুকরী লেখার হাত দিয়ে তিনি কত বড় সাহিত্যিকই না হতে পারতেন, অথবা বিজ্ঞান গবেষনায় নিয়োগ করে হতে পারতেন নামজাদা বিজ্ঞানি! তা না করে, তিনি তাদের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে নামলেন, যারা শুধু সংখ্যাতেই অগনিত নয়, তাদের আছে ঢাল-তলোয়ারও!

অন্ধকূপ

তুলিরেখা এর ছবি

মুক্তধারা নাটকের অভিজিৎ বলতো সুন্দরকে ভালো লেগেছে বলেই অন্ধকারের বিরূদ্ধে লড়াই করতে যেতে ভয় নেই তার।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

গভীর মহাকাশের নীল নক্ষত্র অভিজিৎ আলো পাঠায় আমার চেতনায়, আবার অন্ধকার হাল্কা হয়ে যায়, আবার শুনতে পাই কথা, সুর, গান, অনির্বাণ সেই অনন্ত বীণার ধ্বনি।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

তুলিরেখা এর ছবি

সেই আলোই সব, সেই আলোই আশা, সেই আলোই শক্তি।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

এক লহমা এর ছবি

চলুক
যে দেখতে চায় অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো, তার কাছে সে নক্ষত্র দূরদূরান্তের, যুগ-যুগান্তরের বার্তা বয়ে আনে। কিন্তু যে চোখ বন্ধ করে রাখে, তার কাছে সে আলো অর্থহীন হয়ে যায়! যে মানুষগুলোর হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানে-গরিমায় অগ্রপথিক, তারাই আজ এক মৃত্যু-উপত্যকার অন্ধকারের প্রতিপালক। আলো হাতে চলা আঁধারের যাত্রীদের আলোটা নিভিয়ে দেওয়াতেই তাদের উল্লাস, তাদের সার্থকতা। তাদের সে নিরন্তর আক্রমণ ছাপিয়ে ঐ নক্ষত্রের আলো এক উজ্জ্বল ভোরের প্রতীক্ষায় অন্ধকারে চলতে থাকা মানুষগুলোর প্রাণে ভরসা যোগাবে, যোগাবেই।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

তুলিরেখা এর ছবি

সেইটুকুই আশা। আলোর আশায় বিপুল অন্ধকারের ভিতর দিয়ে চলতে থাকা।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।