মূল্য-ছাড় এ মধ্যবিত্ত

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ২৭/১২/২০১৩ - ১০:৩৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমি নিজে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। ছোট বেলা থেকে মধ্যবিত্তদের নানান সমস্যার কথা শুনে শুনে বড় হয়েছি। ‘মিডল্‌ ক্লাস মেন্টালিটি’ নামের জনপ্রিয় একটা গালিই তো প্রচলিত আছে। সেই গালিটা অবশ্য আমরা মিডল্‌ ক্লাসরাই সবচেয়ে গম্ভীরভাবে নিজের আনন্দ ঢেকে রেখে আরেকজন মধ্যবিত্তের উপর সবচেয়ে বেশি ব্যাবহার করে থাকি। আমি নিজেই যে কতবার ভুরু কুঁচকে আরেকজনকে “মিডল্‌-ক্লাস-মেন্টালিটি” গালি দিয়ে মনে মনে হেসেছি তার হিসেব নেই। তা যাই হোক, প্রবাসে কোন দোকানে মূল্য-ছাড় চলাকালীন সময় এই মিডল্‌-ক্লাস-মেন্টালিটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মনে করেন পঞ্চাশ ডলার মূল্যের একটা জিনিসের দাম যখন বিশাল মূল্য-ছাড়ের পর আটচল্লিশ ডলার করা হয়, তখন সেই জিনিসটা কেনার জন্য মানুষ পাগল হয়ে যায়। ভাই আমার নিজের সাড়ে চার বছরের দোকানদারির অভিজ্ঞতা আছে। আমি মোটেই বাড়িয়ে বলছি না। আমি নিজে এমন কাস্টমার দেখেছি যে কি না মাত্র ১৫ পয়সা (সেন্টস্‌) বাঁচানোর জন্য পাঁচ ডলার গাড়ির তেল খরচ করে আমার দোকানে এসেছে।

বক্সিং ডে (ক্রিস্টমাসের পরের দিন) এই মূল্য-ছাড়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। মানুষ ভোর পাঁচটা থেকে নিজের পছন্দের দোকানের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মুল্য-ছাড়ে জিনিস কেনার জন্য। আমি নিজেও এবার অনেক প্রিপারেশন নিয়ে বক্সিং ডে’র শপিং এ বের হয়েছিলাম। গত দু’মাস ধরে এই দিনের জন্য টাকা জমিয়েছি। মূল্য-ছাড়ের প্রতি আমারও যে সহজাত আকর্ষণ রয়েছে। আমিও যে মধ্যবিত্ত।

যাই হোক আমি এবার সাহস করে বিলাস বহুল ব্র্যান্ডের একটা জ্যাকেট এর দোকানে ঢুকে পড়লাম। একটা জ্যাকেট খুবই পছন্দ হলো। দারুণ একটা জিনিস। পঞ্চাশ শতাংশ মূল্য ছাড়ের পরেও জ্যাকেটটা’র দাম দেড় শ’ ডলার। দাম যতই হোক জিনিসটা আজকে কিনবোই। আগামীকালই এই জিনিসের দাম আবার তিন শ’ ডলার হয়ে যাবে। তখন এই জিনিসের দিকে ‘হা’ করে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। ডিস্‌প্লেতে ঝুলানো জ্যাকেট টা আমার সাইজের না। দোকানের কর্মচারী আমার সাইজেরটা স্টক থেকে নিয়ে আসতে গিয়েছেন। এদিকে আমি তিনশ ডলারের জ্যাকেট দেড় শ’ ডলারে পেয়ে যাওয়ার খুশিতে ডগমগ করছি। বাঁধভাঙ্গা সেই খুশির সাথে ছোট একটু দুশ্চিন্তা মনে উঁকি দিচ্ছে। দেড় শ’ ডলার দিয়ে জ্যাকেট কেনা মানে হলো আমার পুরা সপ্তাহের বাসা ভাড়া একটা জ্যাকেট এর পেছনে খরচ করা। কিন্তু তিন শ’ ডলারের জ্যাকেট দেড় শ’ ডলারে কেনার খুশিটা সেই দুশ্চিন্তাটাকে একেবারে ক্লীন বোল্ড আউট করে দিলো। আমি যখন খুশিতে ফুর ফুর করে উড়ে বেড়াচ্ছি ঠিক তখনই দোকানের কর্মচারী এসে আমাকে জানালেন যে আমার সাইজটা উনাদের স্টকে নেই। তাঁর কথা শুনে আমার বুকটা............ আমার বুকটা............... আবার আনন্দে নেচে উঠলো দেঁতো হাসি । আমি আবার খুশিতে ফুর ফুর করে উড়তে লাগলাম। এই খুশি আমার দেড় শ’ ডলার বেঁচে যাবার খুশি। এইবার এই আনন্দ আমার তিন শ’ ডলারের জ্যাকেট দেড় শ’ ডলারে কিনতে না পারার বেদনাকে একেবারে ক্লীন বোল্ড আউট করে দিলো।

আমার ধারণা আমরা মধ্যবিত্তরা সব সময় সুখী থাকি। পেয়েও সুখী, না পেয়েও সুখী। জয় আনন্দের, জয় মধ্যবিত্ত-মানসিকতার!!! দেঁতো হাসি

লিখেছেন; নাঈম অঙ্কন


মন্তব্য

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

মূল্য-ছাড় একটা গিমিক। জ্যাকেটের দাম দেড়শই। মার্কেটিং টেকনিক এটা।

দীনহিন এর ছবি

ছোট্র এই লেখাটি দারুণ লাগল। খুব সাদাসিধে ভাষায় মধ্যবিত্তের রোদ-বৃষ্টি তুলে ধরার প্রয়াস ছিল।

আমি নিজে এমন কাস্টমার দেখেছি যে কি না মাত্র ১৫ পয়সা (সেন্টস্‌) বাঁচানোর জন্য পাঁচ ডলার গাড়ির তেল খরচ করে আমার দোকানে এসেছে।

এইটা বোধহয় সার্বজনীন। আমাদের দেশে, এমনকি আমিও ত মূল্যছাড়ের সুযোগ নেয়ার জন্য পাগল হয়ে যাই, আর প্রায়ই নেট লস গুনে বাড়ি ফিরি।

.............................
তুমি কষে ধর হাল
আমি তুলে বাঁধি পাল

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হু, ছাত্রজীবনে বাটা আর আজিজের ছাড়ের কিংবা ক্লিয়ারেন্স সেলগুলার জন্য আমরা হা করে থাকতাম... না লাগলেও জুতা কিনে রেখে দিয়েছি মনে পড়ে... দেঁতো হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

চলুক

মাসুদ সজীব

অতিথি লেখক এর ছবি

এটাই আসলে আমাদের মতো প্রায় সব মধ্যবিত্তের সাতকাহন। আয় আর ব্যয়ের হিসাব আমাদের জীবনেও যেন মিলবে না এটা যেন এক পরম সত্য। রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া দামি গাড়ির দিকে থাকালে অনেক ভালো লাগে। কিন্তু যখন নিচের দিকে তাকাই ক্ষয়ে যাওয়া চাকার নিজের বাইসাইকেল টা হয়তো মনে মনে টিটকারি দেয়। এটাই আসলে জীবন। অনেক পাওয়া না পাওয়ার সুখ আর বেদনার মাঝেও বেঁচে থাক আমাদের এই মধ্যবিত্ত জীবন, এই মধ্যবিত্ত মানসিকতা। - জেগে উঠার দিন

রকিবুল ইসলাম কমল এর ছবি

আমরা মধ্যবিত্তরা সব সময় সুখী থাকি। পেয়েও সুখী, না পেয়েও সুখী।

চলুক

তিথীডোর এর ছবি

আমি খুঁতখুঁতে কিসিমের নিম্নবিত্ত, ছাড়ে কিছু কিনিটিনি না। চোখ টিপি
তবে বিজ্ঞাপন জিনিসটা সাংঘাতিক শক্তিশালী মাধ্যম, সেটা মানতেই হয়।
আরো লিখুন। হাসি

[ ছবিটা কেন জুড়েছেন, বুঝতে পারিনি। ]

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

বিজ্ঞাপন জিনিসটা সাংঘাতিক শক্তিশালী মাধ্যম

মানছেন, আর বলছেন-

ছবিটা কেন জুড়েছেন, বুঝতে পারিনি

খাইছে

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

তিথীডোর এর ছবি

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা! হো হো হো হো হো হো
এই অ্যাঙ্গেল তো আমার মাথাতেই আসেনি।

নাহ, সম্ভবত লেখক পোস্টের নিচে ছবি যুক্ত করুন অপশনটা বাধ্যতামূলক ভেবে নিয়েছিলেন। ব্যাপার না।
সচল থাকুন, সচল রাখুন। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

খাইছে, এই এঙ্গেল আবার আমার মাথায় আসেনি ইয়ে, মানে...
ব্যাপার্না তিথীপ্পু, রাজহংসদেব বলেছেন নাঃ যত মত, তত পথ দেঁতো হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

কল্যাণ এর ছবি

ছবি কো অ্যাঁ

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

নাঈম অঙ্কন এর ছবি

আমার অতিথী-পরিচয় দেখে বুঝতেই পারছেন যে আমি এখনও সচলায়তনে নতুন। আমি ভেবেছিলাম যে লেখার সাথে নিজের ছবি দিতে হয়। হাস্যকর এই ভুল করার জন্য এখন লজ্জাবোধ করছি। হাসি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

জাস্ট মজা করলাম নাইম অঙ্কন ভাই,

[ সচলে আমরা এই রকমই,
খোঁচাখুঁচি না করে আবার থাকে কেম্নে মানুষ? চিন্তিত
সচলের অন্যতম বড় দুইটা অমানুষকে দেখেন না- একজনের পিছে আরেকজন লেগেই আছে শয়তানী হাসি ]
সচলায়তন, সমমনাদের বিশাল বড় একটা যৌথ পরিবার দেঁতো হাসি
আপনার লেখা সাবলীল, সাথে থাকুন, আরও লিখুন হাসি
কোলাকুলি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

রকিবুল ইসলাম কমল এর ছবি

আপনিই প্রথম না যে এই `ফাঁদে` পা দিয়েছেন! এর আগেও কেউ কেউ এই ভুল করেছেন। লজ্জিত হবার মত কিছু হয়নি। হাসি

মেঘলা মানুষ এর ছবি

আপনি একদিক থেকে ভাগ্যবান যে আগে থেকেই মন ঠিক করে গিয়েছিলেন যে জ্যাকেট কিনত যাবেন।

মাঝে মাঝে (যেমন, গরমের শেষে গরম কাপড়, বা যেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে শীতের কাপড়) যখন চোখের সামনে দামী জিনিসএ সস্তা ট্যাগ দেখি তখন বড় দোটানায় পড়ে যায় মন। আগে থেকে এর জন্য বাজেট করা নেই, অন্য দিকে এখন কিনে রাখলে ৬ মাস পরে ব্যবহার করতে পারব, যখন দাম বেশি থাকবে। এককথায় মার্কেটে গিয়ে অপ্রত্যাশিত মূল্যছাড় মনের উপর অনেক চাপ ফেলে। অনেক জিনিস হাতে নিয়ে ১০-১৫ মিনিট ভেবেছি: "নেব, না থাক। নাকি নিয়েই নেব।"

সচলে লেখা ছাপা হওয়ায় শুভেচ্ছা হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

এই মূল্য-ছাড় জিনিসটা বড় খারাপ। গত বছরের শুরুর দিকে যখন প্রথম এই দেশে আসলাম, এই হেভি সেলের খপ্পরে পড়ে জ্যাকেট, স্নো-শু কিনেছিলাম, এখন আর ওদিকে তাকাতেই ইচ্ছা করেনা। স্নিকার পড়েই শেষ উইন্টার পার করেছি আর ওই জ্যাকেট এখনও গায়ে উঠেনি, হুদাই কতগুলো টাকা নষ্ট। অথচ তখন মনে হয়েছিল এগুলো না কিনলে মনে হয় সারাজীবনের সেরা মিস টা হয়ে যাবে!! মন খারাপ

-নিহাদ

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

ঐ জ্যাকেটটা এখনো ঝুলে থাকলে, দামটা দেখে আসতে পারেন হাসি

তানিম এহসান এর ছবি

লেখাটাতে একটা কেমন যেন উচ্ছলতা আছে, ভাল লাগলো।

অতিথি লেখক এর ছবি

দেঁতো হাসি মূল্যছাড় বেঁচে থাক, আমরা মধ্যবিত্তরাও বেঁচে থাকি ছাড়ের আশায়...

দেবদ্যুতি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।