শৈশবের জাদুবাস্তবতাঃ প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলি

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ০১/০৭/২০২০ - ১১:৪৫পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমাদের স্কুল ছিলো এক আজব মজার জায়গা। শিক্ষকদের মাঝে বৈচিত্রপূর্ণ চরিত্রের যেমন অভাব ছিল না। ছাত্ররাও ছিল তেমনি রঙিন বাহারের। তাদের মেধাদীপ্ত কর্মকান্ড লিখতে গেলে সপ্তকান্ড রামায়ণের প্রায় সমান হয়ে যাবে। তাই বিস্তারিত প্রসঙ্গ থাক। আজ শুধু মোটাদাগে স্কুলের কিছু বিষয়ের টুকিটাকি।

স্কুলভবনের সারল্য

আমাদের স্কুলের নামটাই ছিলো অদ্ভুত ধরণেরঃ পরীক্ষণ বিদ্যালয়। কি যে পরীক্ষা করা হতো তা স্বয়ং শিক্ষকরাও জানতেন কিনা সন্দেহ। এখন আমার ক্ষীণ সন্দেহ হয়, আমরাই ল্যাবরেটরির গিনিপিগ ছিলাম কিনা। পরবর্তীতে নানারকম শিক্ষানীতির চাপে দিগভ্রান্ত হয়ে সেই সন্দেহ আরো দৃঢ় হয়। যাহোক, স্কুলটি ছিল আদপে এক স্থানীয় জমিদারের বাঈজীমহল। সেই মহলের মূল ভবন পাশে রেখে স্কুলের একতলা টানা সাদা ভবন। বাঈজীমহল প্রাচীন হলেও, স্কুলভবন অর্বাচীন। মানে এটা অনেক পরে তৈরী। সারি সারি ক্লাসরুমের সামনে টানা বারান্দা। ক্লাসের সময় নিরব, আর টিফিন পিরিয়ডে মুখর। এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে উত্তীর্ণ হবার ব্যাপারটি একেবারে সরলরেখায় সাজানো। স্কুলভবনের মুখোমুখি দাঁড়ালে সবচেয়ে ডানে ক্লাস ওয়ান, তার বামে ক্লাস টু, তার বামে ক্লাস থ্রি – এভাবে সবচেয়ে বামে ক্লাস টেন। ক্লাস ফাইভ আর সিক্সের মাঝে একপাশে টিচার্স রূম আর অন্যপাশে মেয়েদের ‘বায়তুল-খারে- আম’ মানে শৌচাগার আর কি। ছেলেদের ‘ছোট/বড় বাইরে’র ব্যবস্থা আক্ষরিক অর্থেই স্কুল ভবনের বাইরে ছিলো।

আপদের নামঃ কো-এডুকেশন

পাঠক বুঝতেই পারছেন, আমাদের সেই স্কুল ছিলো কো-এডুকেশন। তার মানে ছেলে-মেয়ে এক ক্লাসে পড়তো। পাঠকের মাথায় বাংলা/হিন্দি সিনেমার মতো কোন ‘কাফ-লাভ’ বা ‘শৈশব-প্রেম’ মার্কা প্লট আসার আগেই বলে রাখা ভালো, আমাদের ক্লাসের প্রায় ৯৯% ছেলে (যার মাঝে লেখকও আছেন) কেউই ক্লাসের মেয়েদের সাথে স্বাভাবিক কোন কথাবার্তা কোনদিন বলতে পারেনি। লেখাপড়ায় যে যেমনই সফলতা পাক, এই বিষয়ে ছেলেরা ছিলো, যাকে বলে একবারে ‘উচ্চ সাফল্যের সাথে ব্যর্থ’। কেন পারেনি, সেটা সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হতে পারে। এটা কি কোন মফস্বলীয় সামাজিক ঘেরাটোপ, নাকি আমাদের নিজস্ব জড়তা, নাকি স্কুলের কোন এনভায়রনমেন্টাল এক্সপেরিমেন্ট (স্কুলের নাম খেয়াল আছে তো!), তা আজও বের করতে পারিনি। ছেলেদের মাঝে যে দু’য়েকজন আল্ট্রা-স্মার্ট বীরপুঙ্গব সহপাঠিনীদের সাথে কথা বলতো, আমাদের চোখে তারা ছিলো আক্ষরিক অর্থেই জেমস বন্ড মার্কা সাহসী ছেলে।

ক্লাসে মেয়েরা বসতো একপাশ ঘেঁষে, আর ছেলেরা অন্যপাশে। মাঝে বেশ চওড়া স্পেস। অনেকটা ‘এই কূলে আমরা আর ওই কূলে তোমরা’র মতো ব্যাপার আর কি। শিক্ষকদের কেউ কেউ পড়াতে গিয়ে মাঝের সেই স্পেস দিয়ে হাঁটতেন আর ক্লাস নিতেন। আর পরীক্ষার সময় সব শিক্ষকদের পবিত্র কাজ ছিলো সেই স্পেস দিয়ে হাঁটা। আর থেকে থেকে সিসিটিভির মতো মাথাটাকে ঘোরানো।

আপনারা (বিশেষতঃ পাঠকদের মাঝে যারা আদ্যপান্ত বয়েজ স্কুলে পড়েছেন) মেয়েদের সাথে পড়াটাকে যতোটা আকর্ষণীয় এডভেঞ্চার বলে ভাবছেন, ব্যাপারটা আদপে মোটেও তেমন ছিলো না। বরং সেটা ছিলো আমাদের জন্যে সার্বক্ষণিক এক টেনশন আর আতংকের বিষয়। বাগধারা অনুযায়ী ‘শিরে সংক্রান্তি’ বা সংক্ষেপে আপদ বিশেষ। কেন, সেটা বুঝিয়ে বলছি।

আপদের ভিসেরা রিপোর্ট

প্রথমতঃ শাস্তির ব্যাপারটা ধরা যাক। একেবারে মৌলিক একটি বিষয়। ভেবে দেখুন, বয়েজ স্কুলের পরিবেশ। সব ছেলেদের মাঝে আপনি অপমানিত বা নির্যাতিত হচ্ছেন। শাস্তি চলমান অবস্থায় যাই মনে হোক, দিনশেষে এটি আসলে কোন ব্যাপার না। কারণ চারপাশে তো সবাই ছেলে! বড়জোর আর কি হেনস্থা হবেন! কানমলা খেতে খেতে দেখবেন আপনার বন্ধু দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ভাবখানা এই, “কালই স্কেলিং করিয়ে এসেছি, কেমন লাগছে রে!” অথবা বেত খেয়ে নিজের জায়গায় এসে বসার পর, আপনার সহপাঠী নিচু স্বরে (কারণ তখনও ক্লাসে শিক্ষক আছেন) বলবে, “কি রে! মজা পেলি?” এরপর টিফিন পিরিয়ডে মৃদু হাসাহাসি। ব্যস এইখানেই ব্যপারটা শেষ। এ সমস্ত অপমানের একটা সীমা আছে। দুটি কারণে। প্রথমতঃ টিভির মেগাসিরিয়ালের মতো এরপরই আবার কেউ না কেউ শাস্তি পাবে। সেটার আলোচনায় আপনার ব্যাপার ধামচাপা পড়ে যাবে। দ্বিতীয়তঃ এক্ষেত্রে আপনার ইজ্জতের(!) পুনরুদ্ধার সম্ভব। কারণ এইসব পিঞ্চিং বা হুল ফোটানোর জবাব আপনি সময়মতো ঠিকই দিয়ে দিতে পারবেন। সেটা ক্রিকেটের আউটে বা স্কোরে চুরি করে হোক, কিংবা ‘বোম-বাস্টিং’ খেলায় (পাঠক জানেন তো এই খেলার কথা?) টেপ-টেনিসের আদর(!) দিয়ে হোক। মোটকথা, আপনার পৌরুষের পুনরুদ্ধার সহজে সুসম্পন্ন।

কিন্তু কো-এডুকেশন সিস্টেমে, যেমনঃ আমদের স্কুলে, ক্লাসে শাস্তি পাওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। ছেলেদের জন্যে সেটা এক দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অত্যাচারের অন্য নাম। একে তো অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে কেউ সহসা শাস্তি পায় না। কালেভদ্রে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তাই তার স্মৃতি দীর্ঘ সময়জুড়ে সবার মনে সজীব থাকে। আর এখানে ইজ্জতের(!) পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। কেন? ধরুণ কোন মহতী(!) কাজের ফলস্বরূপ কোন ছেলেকে ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। আর কান ধরে দাঁড়াতে হল তো সর্বনাশের ষোলকলা। ক্লাসের সব মেয়েরা আড়ে আড়ে সেই দৃশ্য দেখে ঠোঁটের ফাঁকে হাসছে। স্রেফ স্বগোত্রজনিত সমমর্মিতার কারণেই আমরা ছেলেরা কেউ সেই দৃশ্য উপভোগ করতে পারতাম না। মানবিকতা তো আর পৃথিবী থেকে একেবারে উঠে যায়নি।

এতো গেল স্বল্পমেয়াদী প্রভাব। দীর্ঘমেয়াদের ব্যাপার এই যে, ক্লাস শেষে যেখানেই দেখা হোক, ক্লাসের মেয়েরা সেই আসামীকে দেখে মুচকি হাসবেই। জানি এটা স্বাভাবিক, সহপাঠী বলে কথা। কিন্তু সেই ছেলেটির অবস্থা পাঠক একবার ভাবুন তো! একে তো ক্লাসে ‘মেয়েদের সামনে’ অপমানের চূড়ান্ত অবস্থা। তার সাথে কিছু বলতে না পারার অসহায়ত্ব। কারণ মেয়েদের আপনি কিভাবে কিছু বলবেন? কোন রকম ‘হিউম্যান কমিউনিকেশন’ই তো নাই। খেলায় চুরি বা বোম-বাস্টিং তো দূর কি বাত। আর পারিবারিক সুশিক্ষা, মেয়েদের কিছু বলা যাবে না। তো শিভালরির দাম চোকাতে গিয়ে, সেইসব বিদ্রুপ নীরবে সহ্য করে যেতে হতো। এখন সেই হাসি যতই কাঁচভাঙা/গজদন্তী/সুললিত হোক না কেন, এরপর কি আর মনে কোন ভালোলাগা আসে? (সম্মানিত পাঠিকাগণ, বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, প্লিজ)। তখন বরং মনে গান বেজে ওঠেঃ “এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে!” সাধে কি আর পাওলো কোয়েলহো বলেছেনঃ তরবারিতে তৈরি ক্ষতের দাগ, আঘাতের চেয়ে বেশি বাঙ্ময়।

দ্বিতীয় আপদ ছিলো, ক্লাসের পড়ায় আপডেট থাকার নিরলস পরিশ্রম। হিসেবটা খুব সহজ। ক্লাসে শাস্তি পাওয়া যেহেতু ‘নো অপশন’, তাই উপায় একটাইঃ পড়া বা হোমওয়ার্কে ভীষণভাবে ‘মেটিকুলাস’ থাকতে হবে। বাকি বয়েজ স্কুলের ছেলেরা যেখানে খেলা বা আড্ডায় রাজা-উজির মেরে বেড়াচ্ছে, আমরা তখন গ্রন্থকীট হয়ে ঘরে বসে আছি। বাবা মায়েরা তো খুশি যে, ছেলে কোনকিছু না বলাতেই পড়ে যাচ্ছে। তারা যদি ঘুণাক্ষরেও এই আপাত ভালো আচরণের পেছনে থাকা নিদারুণ আতংকের কথা জানতে পারতেন, কি হতো বলা যায় না।

প্রতিটি বিষয়ের আমাদের খাতা ছিলো দু’টি। একটি নীরস ক্লাস ওয়ার্কের। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো, আরেকটি হোম ওয়ার্কের। আমাদের শৈশবের লেখাপড়া সম্পর্কিত কিছু কিছু বিষয় আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি। যেমনঃ সারা দিনের কাজ শেষে একজন কর্মজীবী বাসায় ফেরেন বিনোদন বা বিশ্রামের জন্যে। আর সারাদিনের স্কুলশেষে আমরা বাসায় ফিরতাম হোম ওয়ার্কের অত্যাচার সহ্য করার জন্যে। শিশুনির্যাতন বিষয়ক আইনগুলো যে তখন কেমন ছিলো, বা আদৌ ছিলো কিনা, কে জানে!
আমাদের স্কুলে তৃতীয় আরেক আতংকের নাম ছিলো ‘সাংস্কৃতিক ক্লাস’। যতদূর মনে পড়ে প্রতি বৃহস্পতিবার এটি ছিলো শেষ পিরিয়ডের ক্লাস। এই ক্লাসে আমার মতো যারা ‘অসাংস্কৃতিক’ মানুষ তারা কন্টকিত হয়ে বসে থাকতাম। মেয়েরা বেণী দুলিয়ে, হেসে হেসে গান গাইতো বা কবিতা আবৃত্তি করে যেতো। আত্মবিশ্বাস ঈর্ষণীয়ভাবে চোখে পড়ার মতো। আর ‘আনকালচার্ড’ আমরা অতি সহজে বধ্য হরিণশাবকের মতো নিরবে বসে থাকতাম। ব্যাক্তিগতভাবে আমি তখন তবলা শিখি। কিন্তু জীবনের প্রথম প্রেমপত্রের মতো বিষয়টিকে স্কুলের সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলাম। এর পেছনে একটি মর্মান্তিক ঘটনা আছে।

ক্লাসের গুটিকয় ছেলে তখন গান শিখতো। ভালোই গাইতো। এমনই একজনের সঙ্গীতচর্চার কথা স্কুলে জানাজানি হয়ে গেল। আর যায় কোথায়। এরপরের ক্লাসেই তার প্রতি টিচারের হুকুম হলো গান গাইবার। মেয়েরা অবাক। তাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, চিড়িয়াখানার বাঁদরকে কলা ছেড়ে কাঁটাচামচ দিয়ে পাপড় খেতে দেখছে। এর মাঝে আমাদের সেই বন্ধু গান গাইতে যাচ্ছে। চেহারা দন্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামী মতো। চিবুক ঠেকে আছে বুকের কাছে। মুখ শুকনো। পাশ দিয়ে যাবার সময়, বন্ধুবর দুর্ধর্ষ মিজান (কেন এই টাইটেল, তা পরে কোনসময় লিখবো) খুব নিচু স্বরে বললোঃ “খবরদার, মাইয়াগো দিকে তাকাবি না।” আমাদের ছেলেদেরও সবার মাথা নিচু। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছি না। আসন্ন বিপদের চিন্তায় সবাই আতংকিত। কেউ কেউ নিঃশব্দে দোয়া পড়ছে। পোডিয়ামে গিয়েও গায়কের মাথা নিচু। সুখের কথা, গানের শুরুটা ভালোই হলো। আমরা ছেলেরা সবাই মাথা নিচু করে শুনে যাচ্ছিলাম। কিন্তু অন্তরাতে গিয়ে শুনি, গান হঠাৎ থেমে গেল। আমরা ছেলেরা সবাই একযোগে চোখ তুলে দেখি, যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হয়েছে। মিজানের সতর্কবাণী কোন কাজে আসেনি। গাইতে গাইতে আমাদের গায়ক বন্ধুর চোখ হঠাৎ করে মেয়েদের সারির দিকে চলে যায়। কি দেখেছিলো কে জানে! সাথে সাথে চোখ বিস্ফারিত, কন্ঠ রুদ্ধ, গান বন্ধ! ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’ নামক বিষয়টির সাথে সেই আমাদের প্রথম পরিচয়। যাকে বলে একেবারে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন! গান আর হলো না। এরপরের ঘটনা সেই আগের মতোই। হৃদয়হীন (পাঠক, পড়ুন হৃদয়হীনাদের) ফিচেল হাসির নিদারুণ নির্যাতন বহু মাসজুড়ে সেই ব্যর্থ গায়ককে তাড়া করেছিলো। আবারো বলছি, সহপাঠীদের এইরকম প্রকাশ্যে হেনস্থা হওয়া নিয়ে হাসাহাসি করাটা হয়তো একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্লাসের সেই সময়কার সহপাঠিনীরা কোনদিন জানতেও পারেননি, তাদের সেই নিরীহ আচরণের কি দুঃসহ প্রতিক্রিয়া হতো আমাদের ভেতর।

শেষ হইয়াও হইল না শেষ...

ক্লাস ফাইভে চলে এলাম আমাদের জেলার ‘জিলা স্কুলে’। সম্পূর্ণ বয়েজ স্কুলের পরিবেশ। স্বস্তির নিঃশ্বাস কত বড় হয়েছিলো আজ আর মনে নেই। তবে বিশাল ভারমুক্ত লেগেছিলো তো বটেই। আগের স্কুলের চেয়ে এর পরিধিও অনেক বড়। আমরা ভিড়ে গেলাম নতুন পরিবেশের ঘটনাস্রোতে। আমরা সবাই রাজা আমাদের সেই রাজার রাজত্বে।

আমার সাথে আরো কিছু সহপাঠী জিলা স্কুলে চলে এসেছিলো। তাদেরই একজনের সাথে একদিন কথা হচ্ছিল। তখন আমরা ক্লাস এইটে। সময় শেষ বিকেল। আবেগাক্রান্ত হবার জন্যে মারাত্মক সময়। কোচিং থেকে বাসায় ফিরছি সবাই। হঠাৎ আগের স্কুলের কথা উঠলো। মুহূর্তে স্মৃতিমেদুর হয়ে গেলাম সবাই। কে কে স্কুলের কি কি বিষয় মিস করে, সেটা বলে যেতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমাদের সবচেয়ে নিরব আর গম্ভীর বন্ধুটি বলে উঠলো, সে স্কুলের মেইন রাস্তাটা খুব মিস করে। আমরা অবাক। রাস্তা আবার মিস করার বিষয় হলো! কারণ জানতে চাইলাম। উদাস স্বরে জবাব এলো, ওই রাস্তা ধরেই তো আমরা সবাই মিলে যাতায়াত করতাম। বুঝলাম সবাই মানে সবমিলিয়েই সবাই। স্বল্পবাক বন্ধুর এমন অকপট স্বীকারোক্তিতে আমরাও চুপ থেকে সায় দিলাম।

ভেবে বুঝলাম, মনের মুকুরে সেদিন সেই স্কুলের কোন সহপাঠী আর ‘মেয়ে’ বা ‘ছেলে’ পদবাচ্য ছিলো না। আমাদের অজান্তে সবাই কি করে যেন শুধুই ‘বন্ধু’ হয়ে গিয়েছিলাম। এরপরে যখনি স্কুলের কারো সাথে দেখা হয়েছে, শৈশবের প্রবল অস্বস্তির প্রাথমিক রেশ কাটিয়ে দ্বিধাহীনভাবে বলে উঠেছিঃ বন্ধু, কি খবর বল।

স্বরূপ-সন্ধানী
---------------------------------------
অন্ধকারে সব-চেয়ে সে-শরণ ভালো
যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো।


মন্তব্য

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

স্বরূপের সন্ধান জারি থাকুক! পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

স্বরূপ সন্ধানী এর ছবি

সাক্ষী সত্যানন্দ,

ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি ভাগ করে নেয়ার জন্যে পোস্ট দিয়েছি। আপনার উৎসাহ পেয়ে খুব ভালো লাগলো। এ সুযোগে জানিয়ে রাখি, আমি আপনার ‘তাক থেকে নামিয়ে’ সিরিজের মুগ্ধ পাঠক। নিত্যনতুন বইয়ের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে কৃতজ্ঞতা। আর অনুরোধ থাকবে ‘বিজ্ঞানময় কিতাব’ সিরিজটিতে আবার প্রাণসঞ্চারের।
লেখায় মন্তব্য করার জন্যে আন্তরিক ধন্যবাদ।

শুভকামনায়...

স্বরূপ-সন্ধানী
---------------------------------------------
অন্ধকারে সব-চেয়ে সে শরণ ভালো
যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

ধন্যবাদ। আপনার শৈশবভ্রমণ জারি থাকুক। অবসর পেলে তাক থেকে আরো কিছু নামাতে চেষ্টা করব।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নীলকমলিনী এর ছবি

ভাল লাগলো। আরো লিখুন।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ। অনুপ্রেরণার জন্যে অশেষ কৃতজ্ঞতা। ভালো থাকবেন।

সোহেল ইমাম এর ছবি

চমৎকার স্মৃতিচারণা। আরো লেখা আশা করছি। গত বছরের শেষের দিকে আমাদের স্কুলের ৫০ বছর পূর্তির একটা সুযোগে আমাদের ক্লাসের প্রায় সবাই (দুই একজন আসতে পারেনি) একসাথে হয়েছিলাম। শৈশবের বন্ধুদের সাথে দিনতিনেকের জোর আড্ডাটা দারুণ ছিলো। ভাবতে পারিনি ওদের সবার সাথে দেখা হয়ে এতোখানি ভালো লাগবে।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

স্বরূপ-সন্ধানী এর ছবি

আপনার স্মৃতিচারণের ও সেই হারানো দিনের সাথীদের মিলনমেলার কথা শুনে রবিবাবুর লাইনটি মনে পড়ে গেলঃ পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে, হায় ও সে। সে যে কি, তা তো আর মুখে বলা যায় না, শুধু অনুভবে থেকে যায়। ভালো থাকবেন সতত।

এক লহমা এর ছবি

আরো আসুক।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

স্বরূপ-সন্ধানী এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ, উৎসাহের জন্যে। চেষ্টা করে যাবো, কথা দিলাম। কৃতজ্ঞতা জানবেন।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।