গন্তব্য পৃথিবী

তুলিরেখা এর ছবি
লিখেছেন তুলিরেখা (তারিখ: শুক্র, ২১/১০/২০১১ - ৬:০৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১। নী
গোল জানালাটির সামনে এসে দাঁড়ায় নী। আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে ছোঁয় নীল বোতামটাকে। এখন সে হাত পায়। কয়েকমাস আগেও অত উঁচুতে হাত যেতোনা নী'র। তখন ওর সঙ্গে ওরাককে আসতে হতো। কিন্তু নী'র ভালো লাগতো না, কেমন যেন মনে হতো একা আসতে পারলেই ভালো হতো।

ওরাকের সোনালী ধাতব মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু নী'র মনে হতো ওরাক যেন ভেতরে ভেতরে বিরক্ত, রুটিন কাজের বাইরে এই কাজটি তাকে করতে হওয়ায়। নী জানতো না ওরাকের রাগ, বিরক্তি, মান-অভিমান এইসব মানবিক অনুভূতিগুলি নেই, সেগুলো তাকে দেন নি তার নির্মাতারা। সেকথা নীকে জানানোর কেউ ছিলো না সেখানে।

নীল বোতামটায় আস্তে আস্তে চাপ দেয় নী। এই অন্ধকার করিডরের শেষে এই গোল জানালাটার সামনে দাঁড়ালে প্রতিবারই কেমন যেন একটা বুক ধুকপুক ধুকপুক করে নী'র। তবু কিছুদিন বাদে বাদেই সে এইখানে না এসে পারে না।

গোল জানালার অস্বচ্ছ ঢাকনা সরে গিয়ে স্বচ্ছ ঢাকনা বেরিয়ে পড়লো। নী ওর মুখ আরো এগিয়ে আনে। একদম কাছে আনে চোখ। ওর নবীন জ্বলজ্বলে চোখের সামনে প্রকাশিত হয় মহাকাশ। অবর্ণনীয় বিস্ময়! । অসংখ্য গ্রহতারা নীহারিকাময় রহস্যভরা মহাকাশ, ঘন অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু আলোজ্বালা তারারা, দূরের গ্যালাক্সির ঘূর্নীবাহু, নেবুলার মেঘওড়না, কখনো বা হালকা তুলোর মতন--ধূলিহীন তীব্রতায় ঝকঝক করছে সব।

নী ইস্কুলে শুনেছে আর পড়েওছে ওরা সবাই এই মহাকাশের মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছে, অনেক অনেক দিন পরে যখন তারা অনেক বড় হয়ে যাবে, তখন অনেক অনেক দূরে একটা নীল গ্রহে গিয়ে সবাই পৌঁছবে। বহু বহু শতাব্দী আগে ঐ গ্রহটা থেকেই নাকি তাদের এই যানটি, নির্মাতারা যারা নাম রেখেছিলো ফিনিক্স১, যাত্রা শুরু করেছিলো মহাশূন্যে। হিমায়িত করে রাখা মনুষ্যভ্রূণদের নিয়ে। পরে কখনো হানাহানির দুর্যোগ কেটে গেলে আবার যাতে তারা ফিরে আসতে পারে। তখন যদি গ্রহের মানুষ নিঃশেষ করে ফেলে নিজেদের, তবু মহাশূণ্যে নিরাপদ দূরত্বে ফিনিক্সের মতন নানা মহাকাশযানে রয়ে গেলো তাদের বংশধারা। অনুকূল পরিস্থিতিতে ফিরে আসতে পারবে জননীগ্রহকে পুনর্মানবায়িত করতে। এইসব ভেবেই সবকিছু সেইভাবে প্রোগ্রাম করে দিয়েছিলেন নির্মাতারা । সঙ্গে ছিলো অফুরন্ত নিউক্লীয় শক্তি-উৎস আর নক্ষত্রের আলোর শক্তিকে সংগ্রহ করার প্রকৌশল। এসব এখনো সব বুঝতে পারে না নী, এখানে যে দশজন মানুষ আছে ,তারা কেউই সবটা বুঝতে পারে না। আরো বড় হয়ে নাকি বুঝবে। নী আরো বুঝতে চায়, এখনি।

কী অপরূপ সুন্দর ওই ঘুর্ণী গ্যালাক্সিটা! নী'র মনে হয় আচ্ছা, ওখানে কি নী'র মতন কেউ আছে? দিওতিমার মতন? তাভামের মতন, ওরিনের মতন? যদি থাকে, তবে সে কি এমন করে চেয়ে দেখে মহাকাশ! সে কি ভাষায় কথা বলে? তারও কি খুব কাছের বন্ধু আছে যেমন নী'র আছে দিওতিমা?

নী নিজে নিজে খুব আস্তে আস্তে নিজের সঙ্গে কথা বলার মতন করে বলে, "এই, এই শোনো! তোমার নাম কী গো? তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো? আমি নী, তোমার নাম কী? তুমি কি আমার বন্ধু হবে? দিওতিমার মতন বন্ধু?" বলে ফেলে নিজের মনেই হেসে ফেলে সে, কার সঙ্গে সে কথা বলছে?

নী পায়ের শব্দ পায়, সে চেনে এই পায়ের শব্দ। ওরাক। নিতে আসছে নী কে। এখন ওদের পড়তে বসার সময়। নী বোতাম টিপে গোল জানালার ঢাকনা বন্ধ করে দেয়। ওরাক এসে গেছে, ওর হেলমেটে হালকা কমলা রঙের আলো জ্বলছে, নী'র দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সে তার ওঠানামাহীন ধাতব গলায় বলে, "নী, তোমার পড়ার সময় হয়ে গেছে। চলো।" নী কোনো কথা না বলে হাত বাড়িয়ে ওরাকের শক্ত হাত ধরে বলে, " চলো।"

পড়ার ঘরে দিওতিমা ছিলো, ওরিন তাভাম রীহা জুইক তুরি কিজা রুফাস মিলে সকলেই ছিলো। শুধু ইলক তখনো আসে নি, ইলকের মাঝেমাঝেই দেরি হয়, সে ছবি আঁকে কিনা, তাই আঁকতে আঁকতে ভুলে যায় যে পড়ার ঘরে যাবার সময় হয়ে গেছে।

নী গিয়ে দিওতিমার পাশে বসে পড়ল। দিওতিমা ওর দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে খুব মৃদুস্বরে বলল, " নী, আজকেও গেছিলি গ্যালাক্সি দেখতে?" নী কথা না বলে স্মিতহেসে মাথা দুলিয়ে জানায় সে গেছিলো। ওদের কথার মাঝখানেই সে দেখলো ইলক আসছে সাইননের হাত ধরে। সাইনন ইলকের দেখাশোনা করে, সে ধাতুনির্মিত রোবোট হলেও তার মুখখানা কেন জানি নী'র বেশ ভালো লাগে, তার মনে হয় সাইনন যেন হাসছে!

ওদের শিক্ষিকা রুশা, সেও রোবোট, কিন্তু সেকথা রুশাকে দেখে ওরা বোঝে না, নরম মিষ্টি চেহারা রুশার, দিওতিমা বলে রুশাকে মা-মা দেখতে। তারা কেউ জানে না মা কেমন হয়, তাদের জন্মই হয়েছে কত অন্যরকমভাবে! কিন্তু কোথায় মনের খুব গভীরে মাতৃস্মৃতি রয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ বছরের এভোলুশনকে তো আর মুছে দেওয়া যায় না! রুশাকে দেখলে তাদের ভালো লাগে, ওর মুখের হাসিটাও ভারী মিষ্টি। যতবার রুশার হাসি দেখে, ততবার নী'র মনে পড়ে জিনির কথা। কী হলো জিনির? আর তার সাথে দেখা হবে না?

শৈশবে জিনি ওকে দেখাশোনা করতো, খাওয়াতো, পরিষ্কার করতো, সাজাতো, পোশাক পরাতো, কোলে নিয়ে দোল দিতো। হালকা নরম সুরে কথা বলত জিনি ওর সঙ্গে। জিনির কথা ধরে ধরেই কথা ফুটেছিলো নী'র। জিনির মুখের হাসি ছিলো খুব মিষ্টি। এই রুশার হাসির সাথে কোথায় যেন মিল! কী হলো জিনির? একদিন জিনির বদলে এলো ওরাক! ওদের সবারই ছোটোবেলার রোবোট বদলে গেছে। এইরকমই নাকি নিয়ম। কে করেছে এইসব নিয়ম? নী জিনিকে দেখতে চায়! এখনো মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে তার মনে হয় জিনির পোশাকের নরম প্রান্তটি বুঝি তাকে ছুঁয়ে গেলো! আর কোনোদিন দেখা হবে না? কোথায় গেলো নী'র জিনি? দিওতিমার সেম্মা? তাভামের মিমা রা? সকলের ছোটোবেলার ন্যানিরা?

কোনো কারণ নেই তবু নী'র মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না। কেউ জানে না ওদের কী হলো! রুফাসকে কিজাকে তুরিকে-সবাইকে জিজ্ঞেস করেছে নী। কেউ কিছু বলতে পারে নি, ওরা জানতে আগ্রহীও না। ওরা ব্যস্ত ওদের পড়াশোনা,খেলাধূলা, হবি এইসব নিয়ে।

কিন্তু নী'র মন কেমন করে। মাঝে মাঝে সে যখন দিওতিমাকে নিয়ে ওই উপরের গোল বারান্দায় গিয়ে বসে গল্প করে, ওরা বসে কুট্টি কুট্টি গোলাপী ফুলওয়ালা লতাটার নীচে রাখা দু'খানা চেয়ারে। নী বানিয়ে বানিয়ে সে গল্প বলে একের পর এক, ওর সব গল্পেই কোনো কোনো চরিত্র থাকে ন্যানির। বাকীরা ওদের এই বানিয়ে গল্প বলা আর শোনার খেলায় উৎসাহী না, এই খেলা শুধু নী আর দিওতিমার। অন্যেরা মেকানো বানায়, বোর্ড গেম খেলে, কার্ড গেম খেলে, অডিভিডি গেম খেলে, এমনি হুটোপাটি করা খেলা খেলে সবাই মিলে--ওসব খেলায় নী আর দিওতিমাও যোগ দেয় বেশীরভাগ সময়েই। শুধু মাঝে মাঝে কোনো কোনো দিন ওদের এসব ভালো লাগে না, তখন ওরা চলে যায় উপরের গোল বারান্দায়, গল্প বলা আর শোনা খেলতে।

কিছুদিন আগে নী গল্প করছিলো, অদ্ভুত এক দেশ, কিছু আলো কিছু ছায়া সেখানে। সেখানে আকাশে মেঘ ভেসে যায়, বৃষ্টি পড়ে -সে দেশ খুব সবুজ! সেখানে এক ছোট্টো মেয়ে দিয়া আর ওর ন্যানি থাকে বিরাট এক প্রাসাদে ..... দিওতিমা শুনছিলো গালে হাত রেখে, দুচোখ বড় বড় করে মেলে। আকাশ মেঘ নদী সমুদ্র পাহাড় সব ওদের চেনা, এসব ওরা চেনে শুধু থ্রী-ডি প্রোজেক্টরে দেখে দেখে। কিন্তু সত্যি করে ওসব কেমন হবে? এসব নিয়ে কেমন গল্প বানিয়ে ফেলে নী! বলতে বলতে সে নিজেই অবাক হয়ে ভাবে সে কী করে এইসব বলে? এসব কার স্মৃতি?

২। ফিনিক্স-১

ফিনিক্স-১। সুবিশাল এই মহাকাশযান। আলোর অর্ধেক গতিবেগে ভেসে চলেছে মহাশূন্যপথে। মহাকাশের বিপুল বিস্তারে এই গতিবেগ শম্বুকগতি বললেও বাড়িয়ে বলা হয়। কিন্তু ফিনিক্সে আন্ত:-গ্যালাক্টিক ঝাঁপের ব্যবস্থা আছে। সেইসব সুবিধা মহাশূন্যের যেসব বিন্দুতে পায়, ফিনিক্স তা কাজে লাগায়। বহু কোটি আলোকবর্ষ পার হয়ে যায় প্রায় বিনাসময়ে। ফিনিক্সের গতিনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পুরোপুরো প্রি-প্রোগ্রামড। এই বিষয়ে এখানকার কারুর কিছুই করার উপায় নেই।

নী, দিওতিমা, রীহা, জুইক, ইলক, তাভাম, ওরিন, তুরি, কিজা আর রুফাস-এই দশজন সদ্য দশবছরে পা দেওয়া ছেলেমেয়ে ছাড়া এখানে আর কোনো মানুষ নেই। বাকী সবই নানা জৈব ও অজৈব যন্ত্রপাতি। ছোটো ছোটো বনসাই গাছপালা আর লতাপাতা আছে অবশ্য অনেক। আর অনেক রোবোট। নানাশ্রেনীর। নানারকম কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রোবোট। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রোকৌশলী থেকে শুরু করে নানাধরনের পরিচর্যাকারী সবাই এখানে রোবোট।

মানুষ শুধু দশজন। দশবছর আগে একই দিনে এদের সকলের ভ্রূণ হিমায়িত অবস্থা থেকে জাগিয়ে তুলে জেস্টেশন চেম্বারে প্রস্ফুটিত হতে দেওয়া হয়। সেরকমই নাকি নির্দেশ ছিলো। এরা সকলে পূর্ণমানবশরীর নিয়ে জন্মায় একই দিনে, কয়েক ঘন্টার তফাতে তফাতে। প্রত্যেকের দেখভালের জন্য একজন করে রোবোট নিযুক্ত হয়। যেমন নী'র জন্য ছিল জিনি। সেইসব রোবোটদের সকলের বিশেষ স্কিল ছিলো মানবশিশু প্রতিপালনে। এই ছেলেমেয়েদের বয়স পাঁচ হতেই সেই ন্যানি রোবোটেরা নিষ্ক্রিয়য় হয়ে চলে গেছে স্টোরেজে। এসেছে নতুন রোবোট, এরা থাকবে এদের পনেরো বছর হওয়া পর্যন্ত। তারপরে এরা নিজেরা নিজের মতন থাকতে পারবে স্বাধীন হয়ে। এরকমই নাকি নিয়মে বলা আছে। এখন তাই নী'কে দেখাশোনা করে ওরাক।

নী কাউকে বলে নি, এমনকি প্রাণের বন্ধু দিওতিমাকেও না যে ওরাককে ওর পছন্দ হয় না। ওরাক একটু হাসিখুশি হলে হয়তো ওর মন এতটা বিরূপ হতো না। কিন্তু ওরাকের মুখ একদম কঠিন, শক্ত, ভাবলেশহীন। সে যাকগে। ছোটো হলেও নী তীক্ষ্ণবুদ্ধি, সে বুঝতে পারে সবই ওর মনোমত হবে না। আরও সে বুঝতে পারে যে কিছু কিছু কথা আছে যা শুধু ওর নিজের, কারুর সাথেই তা ভাগ করে নেওয়া যায় না।

একটা অদ্ভুত স্বপ্ন মাঝে মাঝে নী'কে উতলা করে তোলে। সে স্বপ্নে দেখে একটা আশ্চর্য পাথুরে সিঁড়ি, পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। সিঁড়ির দুধারে অজস্র সবুজ লতা, লতাগুলো রঙীন ফুলে ভরে আছে, ঝলমল করছে রোদ্দুরে, হাওয়ায় দুলছে। ঠিক যেন হাতছানি দিয়ে ওকে ডাকছে! সে এখানের বাকী সকলের মতই মাটি, পাহাড়, পাথর, সমুদ্র, হ্রদ, দিন, রাত, রোদ্দুর, বৃষ্টি, দিনের আকাশ, বিভিন্ন ঋতু, ঝড়তুফান সব চেনে ক্রিস্টাল ভিউতে দেখে দেখে বা থ্রী-ডি প্রোজেকশনে দেখে দেখে। লতা ফুল সিঁড়ি এসব অবশ্য সত্যি সত্যিই দেখেছে। তাই পাহাড়, লতা, ফুল, রোদ্দুর সব চিনতে পারে। কিন্তু সেটা কোথাকার পাহাড়? ওর দেখা কোনোকিছুর সাথে মিল তো নেই! ফুলগুলোও তো একদম অন্যরকম! কেমন যেন অদ্ভুতভাবে তার মনে হয় সে পুরো দৃশ্যটার উপরে ভেসে ভেসে দেখছে!

কেন সে বারে বারে এই স্বপ্ন দেখে? এ কার স্মৃতি? সে কাউকে বলে নি, সে বোঝে কাউকে এসব বলা যাবে না। কিন্তু সে বুঝতে চায়। সে তাড়াতাড়ি বড় হতে চায়, সংরক্ষিত তথ্যের ঘরে প্রবেশাধিকার পেতে চায়। কিন্তু পনেরো বছর হওয়ার আগে তা হবার উপায় নেই। ইশ, কবে যে তার পনেরো হবে!

সংরক্ষিত তথ্যের ঘর! সে ঘর এই যানের একদম সর্বোচ্চ জায়গায়। অবশ্য মহাকাশে কোনটা উপরে আর কোনটা নীচে এমনিতে বলা ভারী শক্ত। কিন্তু কৃত্রিম অভিকর্ষের ব্যবস্থা করা আছে বলে এরা ভারশূন্যতা অনুভব করে না। মেঝেতে হেঁটেচলে বেড়াতে পারে স্বাভাবিকভাবেই। মানবশিশুদের ঠিক গন্তব্যগ্রহের সমান অভিকর্ষের মধ্যে বড় করা হচ্ছে, নইলে গ্রহে পৌঁছে এরা মানিয়ে নিতে পারবে না, ফিনিক্সের পুরো উদ্দেশ্যটাই তাহলে বৃথা হবে। তাই এদের কাছে উপরের ঘর বা নীচের ঘর এসব কনসেপ্ট জানা। ভারশূন্য হয়ে ভেসে বেড়াতে হলে এরা জানতেই পারতো না উপর নীচ কাকে বলে!

ঐ সংরক্ষিত তথ্যের ঘর এদের কাছে "নিষিদ্ধ ঘর"। ওদের কাউকেই ওখানে যেতে দেওয়া হয় না। বয়স পনেরো হবার আগে দেওয়া হবে না জানে সবাই। রুশা বলেছে ওদের সবাইকে। নী ভাবে কি মজাটাই না হবে সেই বিশেষ জন্মদিনে! রঙীন কাগজ, অনেক বেলুন আর টুনিবাতি দিয়ে ঘর সাজানো হবে, কেক কাটা হবে, গান গাওয়া হবে। তারপরেই কি সবাই ছুট দিয়ে ওই ঘরের দিকে যাবে তারা? নাকি অন্যরকম হবে সবকিছু? কল্পনার সঙ্গে মিলবেই না একটুও?

নী ভাবে এই যে জন্মদিনে ঘর সাজানো, বাতি জ্বালানো, কেককাটা, গান গাওয়া, এইসব কোথা থেকে শুরু হলো? রুশাকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলে এসব নাকি নিয়ম। ওদের প্রতি নাকি এইরকম নির্দেশই আছে! কারা দিলো নির্দেশ?এসব নিয়ে আরো জিজ্ঞাসা করলে রুশা হাসে আর বলে এসব তো জানা কথা, সকলেই জানে! এসব নিয়ম টিয়ম নিয়ে বেশী জিজ্ঞেসই নাকি করতে নেই! নিয়ম আছে মানার জন্য, কোথা থেকে এলো, কারা দিলো সেসব অবান্তর। নী অবাক হয়ে ভাবে কেন এমন? জানতে চায় বলেই তো সে জিজ্ঞেস করে! জানতে চাওয়া তো অন্যায় হতে পারে না! জানাতে না চাইলে তাদের এই স্কুলেরই বা কি দরকার ছিলো?

মাঝে মাঝে কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তরে রুশা বলে বড় হলে নাকি জানতে পারবে তারা। নী ভাবে কেমন ছিলো সেই মানুষেরা, এইসব রীতিনীতিনির্দেশমালা যারা দিয়েছিলো? তারা কি তাদের মতন মানুষই ছিলো নাকি অন্যরকম? তাদের কথাই কি জানতে পারবে ওই সংরক্ষিত তথ্যের ঘরে? নী ছটফট করতে থাকে বহু আকাঙ্খিত সেই বিশেষ দিনটা আসার জন্য।

স্কুল শেষ হলে রুশা হাসিমুখে বিদায় দেয় ওদের সবাইকে এক এক করে। দিওতিমাকে নিতে আসে রুহাম, রুহানের দেহ ধাতব, কিন্তু মুখ দিব্যি হাসিখুশী! নী ভাবে তার কপালেই পড়লো কিনা ওরাক, যে হাসতে জানে না!

দিওতিমাকে হাত নেড়ে বিদায় দিতে সেও হাত নেড়ে চলে যায় রুহামের সঙ্গে, তার হাত ধরে। পরদিন স্কুলটাইম আর প্লেটাইমের আগে আর দেখা হবে না। প্রতিদিন বিদায়বেলায় মনখারাপ হয় নী'র। কী ক্ষতি হতো যদি স্কুলের পরেও আরো অনেকক্ষণ একসাথে থাকতে পারতো সে আর দিওতিমা!

মহাকাশে দিনরাত নেই, সবই এক, অন্তহীন বিভাময় বিভাবরী। তাদের গন্তব্যগ্রহটিতে নাকি প্রায় ত্রিশঘন্টার দিনরাত্রি ঘুরে ঘুরে আসে। তাদের জন্যও তাই ফিনিক্সে সেইভাবেই ব্যবস্থা করা।

রুহামের পর আসে সেরাক, সে তাভামকে নিয়ে যায়। সেরাকের মুখ আরো শক্ত, সেরাকও কখনো হাসে না, কিন্তু তাতে তাভামের কোনো হেলদোল আছে বলে মনে হয় না, সে এসব কেয়ার করে না। সে থাকে তার নিজের হবি নিয়ে, তাভামের হবি গানবাজনা। তার একটা বেহালা আছে, সে অবসরে সেটা বাজায়। তার বেহালার করুণ সুর একদিন শুনেছিলো তারা সবাই।

আজকে সবাইকে "বাই বাই" করে সেরাকের হাত ধরে যখন তাভাম চলে যাচ্ছে, তখন নী'র হঠাৎ মনে হয় হয়তো তাভামও তার মতন মনের ভাব লুকিয়ে রাখে। ব্যাখাতীত একটা অনুভব কাঁপিয়ে তোলে নী'কে, তাভামের জন্য কোনো কারণ ছাড়াই চোখে জল আসতে চায় তার। মনে হয় তাভাম তারই মতন স্নেহ খুঁজে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না।

নী অবাক হয়, এরকম কেন লাগছে তার? কোনো কারণ সে খুঁজে পায় না। তাভাম হয়তো এসব সত্যিই কেয়ার করে না! সে বোকার মতন ওসব ভাবছে! নী জানে না বহুকাল আগে যখন তাদের গন্তব্যগ্রহে মানুষ বাস করতো তখন তার সেই অনুভবকে নাম দিয়েছিলো সমবেদনা। সেই অপরূপ অনুভূতির অধিকারী হয়েও যে তারা কেন....

ওরাক আসছে, নী নিজেকে সামলে নেয়। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গীতে সকলকে বিদায় জানিয়ে চলতে থাকে ওরাকের সঙ্গে। তার ঘর বেশ দূরে, যানের একেবারে প্রান্তে। নির্জন ঘরটি ভালোই লাগে নী'র, তার কয়েকটা ফুলের টব আছে, তাতে নানারকম ফুলগাছ লাগিয়েছে সে, স্কুল থেকে ফিরে তার প্রধান কাজ অনেকক্ষণ ধরে পুষ্পপরিচর্যা! এই কাজটি খুব ভালো লাগে তার।

৩। ওরাক

"আমি ওরাক। পুরো নাম ওরাক ওমেগা-৩। ওমেগা লটের ৩ নম্বর রোবট আমি। কতকাল আগে কোথায় আমার জন্ম হয়েছিল মানে যন্ত্রপাতি দিয়ে পার্টস জুড়ে জুড়ে কোথায় আমাকে নির্মাণ করা হয়েছিলো সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই আমার। ওমিবর্গ কোম্পানির অসংখ্য কারখানার কোনো একটাতেই নিশ্চয়। আমার ডানবাহুতে প্রিন্টেড সিম্বল ওমিবর্গের। সেই হিসাবে তারাই আমার নির্মাতা হবার কথা। নির্মাণসময়ের ধারনা আমার মেমরিতে থাকার কথাও না। আমার মেমোরিতে ঘটনাস্মৃতি, নানা স্কিল শিক্ষা ইতদি স্টোরড হতে শুরুই তো হয় আমার সুইচ-অন হবার পর থেকে। তার আগের কিছু কিকরে থাকবে? তবু মাঝে মাঝে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, অস্বস্তিকর অজানা অনুভূতি। স্মৃতি তন্নতন্ন করে খুঁজে পাই না কখন ঘটলো এমন একটা ঘটনা আমার মনে পড়তে থাকে ....."

ওরাকের নোটবুক পড়ছে রুশা, একেকটা পাতা পড়া শেষ হতেই আঙুল দিয়ে পাতার কোণার বোতামটা ছুঁতেই পরের পাতা ফুটে উঠছে বুকস্ক্রীণে। অদ্ভুত সব চিহ্ন আর ০ ১ ইত্যাদিওয়ালা ভাষা এই লেখার, এই ভাষা শুধু রোবটেরাই পড়তে পারে সরাসরি, মানুষদের পড়ার জন্য ডিসাইফার করে দিতে হয়। পড়তে পড়তে মনুষ্য-উপযোগী ভাষায় অনুবাদ করে নিজের মেমরিতে জমা করে রাখছে রুশা। তেমনই নিয়ম।

ওরাকের নোটবই। সেই ওরাক, ছয় বছর আগে যথাযথ বিচারের পরে যাকে ডিসম্যান্টল করে ফেলা হয়েছে। অন্য কোনো উপায় ছিলো না, সে এমন নিয়ম ভেঙেছিলো, যে ওই পরিণতি ছাড়া অন্য কিছু হতে পারতো না। ওর মেমোরি কিউবগুলো ও সব পিউরিফাই করা হয়েছে, কিছু কিছু নিউট্রাল অংশ কপি করে রাখা হয়েছে, বাকী সবকিছু ইরেজ করে দেওয়া হয়েছে চিরকালের মতন। নতুন করে নানা যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়েছে কিউবগুলো।

ওরাক বলে আর কেউ নেই আজ ফিনিক্সে। শুধু এই নোটবুকটা কেমন করে রয়ে গেছে! এইটার অস্তিত্বের কথা কেউ জানে না। রুশাও জানতো না এই কিছুক্ষণ আগে এটা খুঁজে পাওয়ার আগে পর্যন্ত। একেবারে হঠাৎ পাওয়া। পুরানো ফাইলপত্র গোছাতে গোছাতে বেরিয়ে পড়লো। ওরাক কি ভুল করে ফেলে গেছিলো রুশার জিনিসপত্রের মধ্যে?

ওরাকের কথা চলছে- " ফিনিক্স-1 এ যখন প্রথম আমাকে জাগানো হলো সেই মুহূর্তটা মনে আছে আমার। হাল্কা ছায়া ছায়া উষ্ণ কোমল একটা মুহূর্ত। সর্বাঙ্গঢাকা সাদা, নীল, কমলা পোষাক পরা কারা যেন ঘুরছিলো চারপাশে, আমি জেগে ওঠার প্রথম নড়াচড়া প্রকাশ করার পর একজন এগিয়ে এসে আমার কপালে হাত রাখলো, মাপা গলায় বললো, "সিস্টেম রিস্টার্ট। এমেমটি ওয়ান।"

ধীরে ধীরে আমার তাপমাত্রা বাড়ানো হচ্ছিলো। আমার স্মৃতি আর কার্যক্ষমতা অ্যাক্টিভেট হচ্ছিলো। নানা কিসিমের সিস্টেম ইনস্টল করা হচ্ছিলো আর ওই সাদা কমলা নীল পোষাকে ঢাকা ওরা মাপা মাপা গলায় নির্দেশগুলি উচ্চারণ করে যাচ্ছিলো। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না, যথাসম্ভব স্মুদলি হয়ে যাচ্ছিলো, খাপে খাপে বসে যাচ্ছিলো স্কিলসেট। কিন্তু কোনো কোনো ইনস্টলেশানের সময় অনেক বেশী সময় লাগছিলো, তীক্ষ্ণ একটা যন্ত্রণার অনুভূতি হচ্ছিল। হয়তো আমার কল্পনা! ধাতব রোবট যন্ত্রণা বুঝতে পারে নাকি? ওরা জেনেশুনে যেসব জিনিস আমায় অনুভব করতে দিয়েছে তার বাইরের কিছু কিকরে আমি অর্জন করবো? কল্পনাই হয়তো।"

রুশা পড়তে পড়তে থামলো এখানে, সে খুব অবাক হয়েছে। রুশা কোমল লিকুইড- ক্রিস্টাল আর পলিমারের রোবট, বাইরে থেকে দেখতে প্রায় মানুষের মতন, তাই নী দিওতিমা তাভামরা ওকে কাছের মনে করে। রুশার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও অনেক উঁচুদরের। সে শিক্ষিকা। ধাতব রোবটের তুলনায় তাদের চিন্তাভাবনা ও অনেক সূক্ষ্ম। পড়তে পড়তে রুশা ভাবলো- আশ্চর্য! ওরাক এসব কী লিখেছে? যন্ত্রণার কথা! যন্ত্রণা কাকে বলে?

জোর করে ভাবনা থামিয়ে রুশা পড়ে চললো ওরাকের নোটবই-" ফিনিক্সে প্রথমে আমার কাজকর্ম ছিলো সাধারণ, অনিয়মিত। সর্বক্ষণের কাজকর্ম কিছু ছিলো না। কখনো কখনো প্রয়োজন পড়লে হয়তো প্রকৌশলীদের সাহায্য করা বা সার্ভিসিং এর কোনো কাজ থাকলে তা করা। বেশীরভাগ সময় এইসব প্রয়োজন পড়তো আন্ত:-গ্যালাক্টিক ওয়ার্পড্রাইভের সময়। যদিও ফিনিক্সের ভ্রমণপথ প্রি-প্রোগ্রামড, তবু স্পেসটাইমের ফাঁক দিয়ে ঝাঁপের সময় অতিরিক্ত কিছু প্রস্তুতির দরকার হতো। তো, সেইসব সময়ে প্রকৌশলী রোবটদের সাহায্য করতে হতো। তখন আমি সাময়িকভাবে বিশ্রাম ত্যাগ করে কাজে মেতে উঠতে পারতাম। কিন্তু তারপরে আবার যে কে সেই। কাজ নেই, কাজ নেই। শুধু নিশ্চল বসে থাকা অপেক্ষা করে। কি যে কষ্টের সেইসব সময়গুলো! সময় যেন কাটতেই চাইতো না।

এই প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চুপ করে বসে থাকার সময় শুধু একদম ভেতরের একটা ক্ষুদ্র নিউক্লিয় শক্তি-উৎস সক্রিয় থাকতো। মাইক্রো-ফিউশনের চারটে ইউনিটের মধ্যে মাত্র একটা চালু, বাকী তিনটে বন্ধ। সেই একটা নাকি কখনো থামে না, থামলেই নাকি সব শেষ। এই "সব শেষ" কথাটার মানে আমি কোনোদিন বুঝতে পারিনি, শুধু একটা শিরশিরে ভয় ঝিনঝিন করতে থাকতো কথাটার মধ্যে। কিজানি হয়তো তাও আমার কল্পনা!"

এইখানে এসে আবার রুশা থামে, সে ভাবে সে নিজে কি বুঝতে পারে "সব শেষ" কথাটার মানে কী? ডিসম্যান্টল করে ফেলা মানে শেষ, কিন্তু তার পরেও থেকে যায় মেমরি কিউব, সেইগুলোও যদি ইরেজ করা হয়, তাহলেও হয়তো কোথাও থেকে যায় কিছু। যেমন রয়ে গেছে ওরাকের নোটবই, সত্যিই কি সবকিছু শেষ হয়?

ঝাপসা চোখ পরিষ্কার করে আবার রুশা পড়ে চলে- "অপেক্ষার সময়গুলো বড় দীর্ঘ লাগতো, একসময় কেমন একঘেয়ে লাগতে শুরু করলো যদিও আমার তা লাগা মোটেও উচিত ছিলো না। কিন্তু আমার তো অনেককিছুই অনুচিত। প্রথম থেকেই আমার সন্দেহ ছিলো যে আমার কলকব্জায় কোনো বিরাট কিছু গন্ডগোল আছে যা কিনা কেউ ধরতে পারে নি। সেই গন্ডগোলের ফলেই আমার নানা উদ্ভট অনুভবের ব্যারাম! অনুচিত সব ভয়ভাবনা এসে থানা গেড়েছে আমার মধ্যে! আমি বিশেষজ্ঞ রোবটদের কাছে গিয়ে থরো চেকাপ করালাম, তারা সবকিছু খুঁজেপেতে দেখে রায় দিলো সব ঠিকঠাক। অথচ আমার অস্বস্তি, ভয়, একঘেয়ে লাগা, বিরক্ত লাগা এসব রয়েই গেলো। আমি পরে খুঁজে খুঁজে এসব শব্দ জেনেছি, রোবটদের মধ্যে এসব শব্দের প্রচলনই তো নেই! মানুষের অভিধানে এসব আছে, কারণ এইসব নিতান্ত ইন-এফিশিয়েন্ট আর ভেজা-ভেজা ব্যাপারগুলো মানুষেরই একচেটিয়া অধিকারে। এইসব দোষই নাকি মহান গুণ হয়ে দেখা দেয় মানুষের ক্ষেত্রে, কারণ তারা স্রষ্টা, নতুন পথের সন্ধান তারা দিতে পারে। তাই এইসব নেসেসারি ইভিল তারা বহন করে। তা হবে, আমি আর কীকরে তা জানবো? আমি মেটাল-রোবট, আমার জীবনে এসব অহেতুক বোঝামাত্র। আমার ক্ষীণ একটা সন্দেহ আছে পালিমার রোবটেরা হয়তো এসব কিছু কিছু অনুভব করে কিন্তু কাউকে বলে না। ওদের বুদ্ধিমত্তা আমাদের থেকে অনেক উঁচু, হয়তো তারাও স্রষ্টা, হয়তো তারাও নতুন পথ দেখতে পায়! "

আবার রুশার মুখে ক্ষীণ হাসি দেখা দেয়, বাইরের থেকে কিছু বুঝতে পারা কত কঠিন! সে, পলিমার রোবট, সে কি স্রষ্টা? সে কি নতুন পথ দেখতে পায়? সে জানে,না, না,না। সে শুধু নিয়মমালা পালন করে। অথচ ওরাক ভাবতো তারা কত জানে, কত বোঝে!

"এইসব অপেক্ষার সময়গুলো ক্রমে ক্রমে আরো বেড়ে গেলো। আমার পক্ষে আরো অসহ্য হয়ে উঠলো সব। আন্ত:-গ্যালাক্টিক ওয়র্পড্রাইভও কমে গেছিলো অনেক, তখন মানবশিশুদের তৈরী করা শুরু হয়ে গেছে- চিকিৎসক রোবটদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। ন্যানি রোবটদের ট্রেনিং শুরু হয়ে গেছে। ওদের কাজের ব্যস্ততা দেখে ঈর্ষা হতো। এও এক অচেনা অনুভব, কেমন একটা খোঁচা লাগার মতন, কিন্তু মেটাল নেইল নেই, স্পার্ক নেই, কিছু নেই, তাও খোঁচা। রহস্যময়। আমি জানি আমার উচিত ছিলো আবার চেকাপ করানো, কিন্তু আমি যাই নি। জেনেশুনে সেই আমার প্রথম নিয়মলঙ্ঘন।"

রুশা কেঁপে ওঠে, নিয়মলঙ্ঘন করা তাহলে সম্ভব? সে ঠোঁট কামড়ায়। ভাবতে চেষ্টা করে ওরাককে দেখে তার কখনো অন্যরকম কিছু মনে হতো কিনা! না, সবসময় ওরাককে সাধারণ নিয়মবদ্ধ বলেই মনে হয়েছে! কোনো অস্বাভাবিক কিছু সে লক্ষ করেনি। তার পর্যবক্ষণ শক্তি ভালো, কেন তাহলে কিছু সে অনুমান করলো না?

আবার সে পড়তে থাকে- " একসময় আমি ডাইরি লেখার কথা ভাবতে শুরু করলাম। নিয়মে কোথাও বলা ছিলো না যে রোবট ডাইরি লিখতে পারবে না। আমি সেক্ষেত্রে কোনো নিয়ম ভাঙি নি। ডাইরি লিখতে লিখতেই আমি শিখতে থাকলাম অনেক কিছু। সাধারণ তথ্যভান্ডারে আমার অ্যাক্সেস ছিলো বলে বেশীরভাগ জিনিসই আমার পক্ষে জানা সহজ ছিলো। কিন্তু শুধু তথ্য জানা আর জিনিসটা আসলে বুঝতে পারা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার, তা তখনই বুঝতে শিখি।"

রুশার রিসিভারে ডাক আসে, সে তাকায়। নী ডাকছে। এখনই তাকে যেতে হবে সংরক্ষিত তথ্যের ঘরে, এখন অবশ্য নী'দের কাছে সবই অ্যাক্সেসিবল। তাদের বয়স সতেরো হয়ে গেছে। আর কিছুদিন পরেই ফিনিক্স-১ পৌঁছবে গন্তব্য গ্রহে।

রুশা নোটবই বন্ধ করে গুছিয়ে রাখে, পরে বাকীটা পড়বে। এখন নী'র কাছে যেতে হবে, নী'র ডাক উপেক্ষা করার প্রশ্নই ওঠে না। রুশা নী'কে জানায় সে আসছে এখুনি।

( আগামীতে থাকবে এর পরের তিন পর্ব )


মন্তব্য

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

পড়লাম পুরোটা
অনেস্ট মন্তব্য করি?
যতটুকু পড়লাম, গৎবাঁধা প্লট, গৎবাঁধা বাক্যগুলো। ছোটবেলা থেকে জাফর ইকবাল স্যারের ফিকশানগুলো পড়তে পড়তে এই টাইপ প্লটগুলো আসলে ভাজা ভাজা হয়ে গেছে দেঁতো হাসি
সাইন্স ফিকশান পড়তে আসলে তাই সবসময় নতুন কিছু খোঁজা হয়।

আশা করি পরের পর্বগুলোতে চমক থাকবে।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

তুলিরেখা এর ছবি

ঠিক বলেছেন, আসলে সাই ফাই এর কয়েকটাই মোটে প্লট, সেগুলোই ঘুরে ঘুরে চলে। সব তো সেই সাহেব গুরুরা মানে সেই আইজাক আজিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক এনারা দিয়ে গেছেন হে হে। দেঁতো হাসি মু জা ই এর গুলো ও তাই।
তবে আমার এই সব লেখা নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর, মুখ বদলানোর জন্য লেখা, পছন্দ না হলে পড়বেন না, ব্যস মিটে গেল। নেটের সুবিধা তো এইটাই। হাসি
ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

কল্যাণF এর ছবি

শেষ করতে পারিনি। কল্পবিজ্ঞান এর থেকে কবিতা বা কাব্য ভাব এত বেশি মনে হয়েছে যে আগ্রহ চলে গেলো। শুধু মাত্র মতামত, দয়া করে আক্রমণ হিসেবে দেখবেন না

তুলিরেখা এর ছবি

শেষ করবেন কী, এটা তো মাত্র শুরুর তিন পর্ব। দেঁতো হাসি
আমার এই সব লেখা নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর, মুখ বদলানোর জন্য লেখা, পছন্দ না হলে পড়বেন না, ব্যস মিটে গেল। নেটের সুবিধা তো এইটাই। হাসি
ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

কল্যাণF এর ছবি

ঠিক হ্যায়, রাতে ঘুমানোর আগে আবার শুরু থেকে শুরু করব আর পরের পর্বের জন্যে পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

তুলিরেখা এর ছবি

তারচেয়ে শেষ থেকে শুরু করুন। পড়তে পড়তে উঠতে থাকবেন। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

কালো কাক এর ছবি

রোবটের অংশটা চমৎকার লাগছে !

তুলিরেখা এর ছবি

ধন্যবাদ কালো কাক। আসলে এ গল্পে ঐ ডিসম্যান্টলড রোবটই আসল নায়ক, পরবর্তীকালে বোঝা যাবে। আপনি আগেই বুঝে ফেলেছেন। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

বন্দনা কবীর এর ছবি

দারুন! সহজ সরল সায়েন্স ফিকশন(আমি বলি ফ্রিকশন) পড়তে ভাল আগে আমার। মাথা বেশি না ঘামিয়ে নিপাট বিনোদনে সময় পার...
পুরো উপন্যাস পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম। চলুক চলুক

তুলিরেখা এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ বন্দনা।
আসলে ইদানীং আজিমভ পড়ছি আর ভাবছি এঁরা কেমন গল্পগুলোর মধ্যে অনেক গভীর ভাবনাও ঢুকিয়ে দেন। ওনাদের সমাজ আর সংস্কৃতিই আসলে এই সব সাই ফাইয়ের জন্য একেবারে ঠিকঠাক, আমাদের সমাজ সংস্কৃতি এগুলোর সাথে কেন যেন খাপ খায় না, হয়তো বেশ ভালোরকম ট্রান্সফর্মেশন দরকার গল্পগুলোর কিংবা একেবারে আমাদের সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা দরকার। মুশকিল হলো আমাদের সমাজ বৌ শাশুড়ীর কাজিয়া, বস আর সাবর্ডিনেটের কাজিয়া বা নানারকম জটিল কবিতা লেখা ভবঘুরে নায়কের গল্প যার মনে বিপ্লব বিপ্লব ভাব- এগুলোকে যত সহজে নেয় কাহিনি হিসাবে, সাইফাই সেভাবে নেয় না, এগুলো আমদানি করা কাহিনি হয়ে থেকে যায়। কেমন যেন ওরিজিনাল লেখাও অনুবাদের মতন ঠেকতে থাকে। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

Ratpakhi এর ছবি

উত্তম জাঝা! আমি এক নিশ্বাসে শেষ করলাম । অসাধারন।

তুলিরেখা এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ রাতপাখি।

তবে এ শুধু কাহিনির শুরুর তিন পর্ব, শেষ যে কীভাবে হবে বা আদৌ হবে কিনা কেজানে। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

 তাপস শর্মা  এর ছবি

যদিও স্টোরিটায় খুব বেশি নতুনত্ব নেই। কিন্তু আপনার বর্ণনা একটু অন্যরকমের হয়েছে। আমার কিন্তু খারাপ লাগেনি। তবে প্লটটা নিয়ে একটু যদি বিকল্প চিন্তা করেন তাহলে ভালো হবে। আর আপনার ক্ষমতা আছে বলেই এই কথাগুলো বলা। এই ধরণের লেখা সবাই লিখতে পারেনা। আপনার উদ্যমকে স্বাগত জানিয়ে পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

তুলিরেখা এর ছবি

প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এটা পড়েছেন বলে। আসলে কল্পবিজ্ঞানের কিছু বাধাধরা পথ আছে, সেগুলোর বাইরে যাওয়া সোজা না, গেলেও সেগুলোর পাঠক পাওয়া যায় না। হাসি
আমি চাইছিলাম একটা সাইকোলজিকাল জটিলতা আনতে, রোবট মন আর মানুষ মনের মিল আর অমিল দেখাতে, রোবটে রোবটেও নানা দ্বন্দ দেখাতে, এই নী নামের কৌতূহলী আর উৎসুক কিশোরীটিকে কেন্দ্র করে ফুটে ওঠা ভাবসংঘাত ও ঘটনাসংঘাত দেখাতে---কিন্তু সেটা সম্ভব হবে কিনা বুঝতে পারছি না। চিন্তিত
ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সজল এর ছবি

ভালো লাগলো। কয়দিন আগে ফাউন্ডেশন এন্ড আর্থ পড়ছিলাম, খুব একাত্ম হয়ে হারানো পৃথিবী খুঁজছিলাম। পৃথিবী যাত্রা চলুক।

---
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

তুলিরেখা এর ছবি

ধন্যবাদ সজল। আপনার ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো। চেষ্টা করবো লেখাটা শেষ করতে। হয়তো বা এখানে নয়, হয়তো অন্য কোথাও। ভালো থাকবেন।

অফটপিক : আপনার সিগনেচার লাইনটা অসাধারণ সুন্দর। কার কথা এটা?

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সজল এর ছবি

এখানেই লিখে শেষ করুন, অন্য কোথাও কেন?

[অফটপিকঃ এই কথাটা আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের, আমি ভাঙ্গাচুরা অবস্থায় পৌঁছালে এই লাইনটা অনেক সাহায্য করে]

---
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

তুলিরেখা এর ছবি

দেখা যাক কী হয়, আদৌ লেখা এগোয় কিনা! সময় বড় কঠিন জিনিস। চিন্তিত

অফটপিক: আমার এক বন্ধু আছেন, তিনি বলতেন এই কথাটা নাকি চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াসের। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

আশালতা এর ছবি

বলকি, ওই ব্যাটা রোবট হবে নায়ক ? আমি তো ভাবলাম নী। যাহোক, আমার ভালো লেগেছে গল্প। পরেরটুকুন চটপট পাতে দাও দেখি, আমার সবুর বড় কম। হাসি

----------------
স্বপ্ন হোক শক্তি

তুলিরেখা এর ছবি

আহা নী ই বা কম যাবে কেন? আর রুশা? সে কি বানের জলে ভেসে এয়েছে? হাসি
সময়ের বড় টানাটানি হে আশালতা, দেখা যাক কবে চুরিচামারি করে কিছু সময় জমাতে পারি।
ভালো থেকো।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

বন্দনা এর ছবি

আমি এই ধরনের লিখার ভিষণ ফ্যান। তুলিদি পরের পর্ব শিঘ্রি চাই।

তুলিরেখা এর ছবি

ধন্যবাদ বন্দনা।
দেখি কবে হয়, সময়ের বড় কড়াকড়ি, মনমেজাজও তো তালে আসে না, বেতালা হয়ে যায়। হাসি
ভালো থেকো।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নির্জন  এর ছবি

আমার খুব ভালো লেগেছে...পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করছি!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।