বিবর্তন ৫: চোখের সামনে ঘটতে থাকা মানুষের বিবর্তন

সজীব ওসমান এর ছবি
লিখেছেন সজীব ওসমান (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৩/০২/২০১৭ - ৯:২৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মানুষের বিবর্তনকে গ্রহণ না করতে চাওয়ার প্রবণতাটা প্রায় সবক্ষেত্রেই ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্মানুসারী হিসেবে যে ধারণা কেউ পোষণ করেন সেটা প্রচণ্ডভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় যখন জীববিজ্ঞানকে বুঝতে চেষ্টা করেন, আধুনিক জীববৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলি নিয়ে কাজ করেন এবং বুঝতে পারেন যে জীববিজ্ঞানের সবকিছুই একটা সুতোয় গাঁথা চলে একটা বৈজ্ঞানিক ধারণার আঁচলে। যে প্রসঙ্গে বলছি সেটা নিয়ে ডবঝনস্কি গুরুর বিখ্যাত উক্তি - "Nothing in Biology Makes Sense Except in the Light of Evolution"। ডারউইনের চিন্তার বিশেষত্ব এ জায়গাতেই। পৃথিবীর অন্য কোন বৈজ্ঞানিক ধারণা কি আছে যা দিয়ে পৃথিবীর জীববৈজ্ঞানিক ইতিহাসকে একসাথে বেঁধে ফেলা চলে?

বিজ্ঞানগবেষক হিসেবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দিয়ে করা এবং প্রমাণ হাজির, তাকে ব্যাখ্যা করা ইত্যাদি কারও খুব নিয়মিত কাজ। এই সংঘাতটা বিজ্ঞানকর্মী হিসেবে মানুষের বাঁধতে পারে যখন আপনার মনের কোণে অন্য কোন প্রমাণহীন ধারণা বদ্ধমূল হয়ে বসে থাকে যাকে সরানোর কথা কল্পনাতে আনতেই কষ্টবোধ করেন। ফলে যে দ্বন্দ্ব দেখা যায় তা হলো - একটা ধারণা আপনি বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলি দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করেন, কিন্তু আরেকটা ধারণা শ'খানেক বছরের লক্ষ বছরব্যাপি প্রমাণ থাকার পরেও গ্রহণ করতে কষ্ট হয়। বিবর্তন ধারণার সেই চেষ্টা আপনি বিজ্ঞান সমাজে প্রকাশও করতে পারেন না, তুমুলভাবে হেনস্থা হবেন ভেবে! কারণ বিজ্ঞানে উন্নত দেশগুলি বহু আগেই বিজ্ঞানক্ষেত্রে জৈববিবর্তনকে ফ্যাক্ট বা সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে অন্য একটা মানসিক দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি হয় ধর্মবিশ্বাসী মানসিক মনে।

ঝামেলাটা আসলে তখনই হয় যখন কোন একটা একক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করার চেষ্টা আপনি করেন যা আপনাকে সত্য বা পৃথিবীর বাস্তব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে প্রমাণসহ সাহায্য করবে এমন ব্যবস্থা নিয়ে আস্থা বা অনাস্থা প্রকাশের। বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য জানার আসলে একটাই ব্যাবস্থা আছে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণে। গত প্রায় দেড়শ বছরে লক্ষখানেক বিজ্ঞানী লক্ষখানেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে মানুষসহ পৃথিবীর সকল জীব জৈববিবর্তনের ফসল। এই জায়গায় হাজারো প্রমাণ উপেক্ষা করে ভাবতে ভালোবাসেন যে মানুষের বিবর্তন হয়নি, অন্যকিছুর হতে পারে। 'ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তন ঠিকাছে, কিন্তু মানুষের বিবর্তনের প্রমাণ আমি গ্রহণ করিনা' প্রস্তাব কতটুকু গ্রহণযোগ্য বলেন?

মানুষের বিবর্তন যে ঘটছে সেটা কোন গোপন বিষয় নয়, বোঝাটা কষ্টকরও নয়। আপনার শুধু একটা বিজ্ঞানমনষ্ক, উদার, সত্য এবং বাস্তবতাকে গ্রহণ করার মত মন থাকতে হবে। মানুষের উদ্ভবই হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে। সেটা নিয়ে আগেও একটা লেখায় উদাহরণ দিয়েছিলাম। এবার আমি মানুষের ক্রমাগত ঘটে যাওয়া কিছু বিবর্তনের উদাহরণ এখানে দেখাচ্ছি।

মাত্র আজকেই একটা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে American Journal of Physical Anthropology তে, যা দেখাচ্ছি দক্ষিণ আমেরিকার এক মানবসমাজ পানিতে থাকা ক্ষতিকর মাত্রার আর্সেনিকের বিরুদ্ধে দৈহিক প্রতিরোধ করে তুলেছে।

চিলির Quebrada Camarones এলাকার মরুভূমিতে গোত্রটি আসে ৭ হাজার বছর আগে, যেখানে পানির অভাবই শুধু নাই, আছে আর্সেনিকের বিষাক্ততাও। এই মরুভূমিতে কিছু নদী বা পুকুরের মতো পানির উৎস থাকলেও তাতে আছে ক্ষতিকর মাত্রার আর্সেনিক, যা বহু ধরনের অসুখ তৈরি করতে পারে। ১ মাইক্রোগ্রাম প্রতি লিটারে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি! এই এলাকায় এই বিষাক্ততা বিহীন আর কোন পানির উৎস নাই, কিন্তু এর মধ্যেও মানুষ হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে। কিভাবে?

এখানের মানুষ কি কোনভাবে নিজেদের অভিযোজন করে নিয়েছেন নিজেদের? কোন প্রাকৃতিক নির্বাচন চাপ কি প্রভাব ফেলেছে আর্সেনিক-প্রতিরোধী দেহের ব্যবস্থাসহ মানুষের উদ্ভবের? সাম্প্রতিক পরীক্ষাটি বলছে, হ্যাঁ!

AS3MT নামক এক উৎসেচক আমাদের দেহে আর্সেনিককে দুইটা জটিল অণুতে পরিবর্তন করে - monomethylarsonic (MMA) acid এবং dimethylarsinic (DMA) acid। যেসব মানুষ বেশি দক্ষতার সাথে আর্সেনিককে বিপাক করতে পারে তাদের দেহে আর্সেনিক বেশিরভাগই DMA তে পরিণত হয়, যা কম বিষাক্ত এবং খুব সহজেই দেহ থেকে বেরিয়ে যায়।

চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক খুঁজে পেয়েছেন যে এই মরুভূমি অঞ্চলের মানুষের দেহে AS3MT এর এক ভিন্ন প্রতিরূপ রয়েছে যা আর্সেনিক বিপাককে অতিদক্ষতায় বাড়িয়ে তোলে। এর আগেও ভিয়েতনাম ইত্যাদি এলাকার মানুষের দেহে একইরকম পরিব্যক্তসহ AS3MT জিনটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো। অর্থাৎ মানুষের দেহ পরিবর্তিত পরিবেশে অভিযোজিত এবং প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আর্সেনিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ব্যবস্থা খুঁজে পেয়েছে।

একইরকম বিবর্তনের আরও বহু উদাহরণ উল্লেখ করা চলে। নিচের আলোচনাটুকু অনুসরণ করতে পারেন।

ক. সংস্কৃতি কিভাবে মানুষের জিনেটিক্স কে প্রভাবিত করেছে

প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের দুধ খেতে পারার কথা নয়। আপনার পূর্বসূরীদেরও না। মাত্র ৯০০০ বছর আগে থেকে একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ দুধ খেয়ে হজম করতে পারছে, অসুস্থ না হয়েই। শিশুরা সবসময়েই এটা করতে পারতো, কিন্তু যখন থেকে আমরা দুগ্ধখামার শুরু করেছি কেবলমাত্র তখন থেকেই প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ দুধ হজমের ক্ষমতা অর্জন করেছে। এমনটা দেখা গিয়েছে যে যেসব সংস্কৃতির মানুষ দুগ্ধখামার তৈরি করেছিল এবং নিয়মিত দুধ পান করেছিল তাদের দেহে অন্য এলাকার মানুষের চেয়ে বেশি মাত্রায় ল্যাকটোজ হজম বা সহ্য করার এবং এ সংক্রান্ত অন্য জিন আছে।

ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ কিভাবে মানুষের বিবর্তনকে প্রভাবিত করতে পারে তার শুধুমাত্র একটি উদাহরণ হল এই দুধ পানের ইতিহাস। সংস্কৃতি এবং জিনেটিক্সকে প্রায়ই দুইটি ভিন্ন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু গবেষকগণ দিন দিন এই দুটি বিষয়ের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্কের বিষয়টি বুঝতে পারছেন, যেখানে একটি আরেকটির প্রাকৃতিক প্রগতিকে প্রভাবিত করছে। জিনতত্ত্ববিদেরা একে বলছেন ‘জিন-সংস্কৃতি সহ-বিবর্তন’। কিন্তু কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ? যদি আমরা খুঁজে পাই কিভাবে সংস্কৃতি আমাদের জিনেটিক গঠনকে প্রভাবিত করেছে- এবং কিভাবে একই প্রক্রিয়া অন্য জীবের জন্যও খাটে- তবে আমরা ভালভাবে বুঝতে পারবো কিভাবে আমাদের সামাজিক আচরণ আমদের ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করে।

সংস্কৃতি দ্বারা জিন প্রভাবিত হওয়ার আরেকটি উদাহরণ হল মিষ্টিআলু চাষ এবং ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের সম্পর্ক। পুরো আফ্রিকাজুড়ে মানুষ ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, CDC রিপোর্ট অনুযায়ী (www.cdc.gov/malaria) ২০১০ সালে প্রায় ২২ কোটি ম্যালেরিয়ার ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং ৬ লক্ষ ৬৬ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে, যার মধ্যে ৯০ শতাংশই হল আফ্রিকাতে।

কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা আছে। তাদের লোহিত রক্তকণিকা সাধারণ চাকতির আকৃতি ধারন না করে কাস্তে বা ঈদের চাঁদের মত আকৃতি নিয়েছে। এই অদ্ভুদাকৃতির রক্তকণিকার কারণে সিকেল সেল রোগ (কাস্তে কোষ রোগ বলা যায়?) হয় এবং এভাবে কোন রক্তনালীতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এবং ব্যথা এবং অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। সাধারণ অবস্থায়, বিবর্তন আমাদেরকে সিকেল সেল রোগ থেকে দূরে রাখে, কারন রোগটি ক্ষতিকর এবং মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয়। কিন্তু একটি জীববৈজজ্ঞানিক উদ্ভট উপায়ে সিকেল সেল জিন ম্যালেরিয়া থেকে আমাদের প্রতিরক্ষা করে। তাই, যেসব স্থানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ খুব বেশি, যেমন আফ্রিকায়, সেখানে প্রাকৃতিক নিবার্চন কাস্তে-আকৃতির কোষকে বরঞ্চ পছন্দ করে। জীবনের জুয়া খেলায় সিকেল সেল রোগে ভোগার দাম দিয়েও ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধটাই আসলে পছন্দসই উপায়।

কিন্তু মজার বিষয়টি হল এই জায়গায়: যেসব জায়গাতে মিষ্টিআলু চাষ হয় বেশি বেশি সেসব এলাকার মানুষদের মধ্যে আশেপাশের অন্যধরনের চাষাবাদের মানুষদের চেয়ে বেশি মাত্রায় সিকেল জিন থাকতে দেখা গিয়েছে। মিষ্টিআলু চাষ করতে গেলে বড় বড় গাছগুলিকে কেটে ফেলতে হয়। ‘গাছ উপড়ে ফেলাটা অবশ্যম্ভাবীভাবেই বৃষ্টি হলে স্থিতপানির (পুকুর, ডোবা, বিল ইত্যাদি) পরিমান বাড়িয়ে দেবে, যেটা ম্যালেরিয়া-বহনকারী মশার বংশবিস্তারের জায়গা তৈরি করবে,’ নেচার রিভিউতে লিখছেন সেইন্ট এন্ড্রু জীববিজ্ঞানী কেভিন ল্যাল্যান্ড। অধিক মশা মানেই অধিক ম্যালেরিয়া, যেটা এই এলাকার মানুষের মধ্যে কাস্তে-আকৃতির কোষকে বেশি অভিযোজিত করতে সাহায্য করবে।

তাই দেখা যাচ্ছে সিকেল সেল রোগের ম্যালেরিয়াকে প্রতিরোধ করাটা একটি অনন্য মনুষ্য আচরণের ফল- মিষ্টিআলুর চাষ- যেটা বিবর্তনকে কাজ করতে সাহায্য করেছে।

এমন জিন-সংস্কৃতির সহ-বিবর্তনের সবগুলি উদাহরণই ঠিক উপকারী হয়নি। যেমন, পলিনেশিয়ানদের অতিমাত্রায় টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ভুগতে দেখা যায়। এই হার পৃথিবীতে সর্বোচ্চ, এমনকি আশেপাশের মনুষ্যগোষ্ঠির চেয়েও বেশি। একটি গবেষকদল খুঁজে পেয়েছেন যে পলিনেশিয়ানদের মধ্যে PPARGC1A নামক একটি জিন খুব বেশি হারে দেখা যায়, এবং সম্ভবত এই হারই কিয়দাংশে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগের উচ্চহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কেন তারা এই রোগ দ্বারা এত বেশি আক্রান্ত? গবেষকরা ভাবলেন নিশ্চয়ই এর সঙ্গে অধিবাসীদের পূর্বসূরীদের সংস্কৃতি-আচারের কোন সম্পর্ক আছে। যখন পলিনেশিয়ানরা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলিতে বসতি গড়লো তখন তাদেরকে দীর্ঘসময় ধরে সমুদ্র পাড়ি দিতে হত এবং সেসময় দীর্ঘ শীত এবং ক্ষুধার কষ্ট পোহাতে হত। এই অবস্থাগুলি তাদের পরিপাক এবং পাঁচনকে ‘শক্তিশালী’ করে দিলো এমনভাবে যে খাবার গ্রহণের সাথেই দ্রুত চর্বি জমা হত শরীরে। প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্ভবত এর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনের প্রকারগুলির হারকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের পরিপাকের অভিযোজন হয়তো পূর্বের এই অঞ্চলটির মানুষদের ভ্রমণকে সাহা্য্য করেছে এবং প্রতিকূলতা কাটাতে সাহায্য করেছে; কিন্তু আধুনিক সংস্কৃতিতে, যেখানে পুষ্টির উপাদান সহজেই পাওয়া যায়, সেখানে এই পরিপাক প্রক্রিয়া আধুনিক পলিনেশিয়ানদেরকে স্থুলকায় করে তোলা এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃ্দ্ধিতে সাহায্য করেছে। তাই পলিনেশিয়ান মানুষদের খাদ্যরীতি বা জীবনপদ্ধতি হয়তো তাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে খুব বেশি সম্পর্কিত নয়, বরং এমনটা হয়েছে কারন তাদের পূর্বপুরুষেরা নৌকায় চড়েছিলেন এবং পৃথিবী ভ্রমণে বেড়িয়েছিলেন বলেই।

উপরের সবগুলিই জিন-সংস্কৃতি সহ-বিবর্তনের অসাধারণ কিছু উদাহরণ; বিজ্ঞানীরা আরও এমন কিছু উদাহরণ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, চাষাবাদের প্রচলন আমাদের মধ্যে এমন কিছু জিনকে কার্যকর করেছে যারা আমরা খাই এমন উদ্ভিদে থাকা কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিককে নিষ্ক্রিয় করে দিতে আমাদের দেহকে সাহায্য করে। নতুন নতুন জায়গা ভ্রমণ এবং অজানা পরিবেশের সম্মুখীন হওয়া আমাদের মধ্যে এমন কিছু জিনকে কার্যকর করেছে যার ফলে আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের চেয়ে বেশি চরম গরম বা শীতকে সহ্য করতে পারছি। রান্নার আবিষ্কার আমাদের চোয়ালে পেশী এবং দাঁতের এনামেলের বিবর্তনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। ভাষার উদ্ভাবন এবং জটিল সামাজিক ক্রিয়াগুলি আমাদের মস্তিষ্কের গড়ে ওঠা এবং স্নায়ু ব্যাবস্থার প্রাকৃতিক নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে।

সাংস্কৃতিক প্রভাব শুধু মানুষেই ঘটেছে এমনটা খুব সহজেই ভেবে নিতে পারি। কিন্তু কিছু কিছু প্রাণী খুবই প্রাথমিক সাংস্কৃতিক আচরণ দেখায় এবং এটা ভেবে নেয়া বোকামী হবে যে এসব আচরণ তাদের জিনেটিক্সে কোন প্রভাব ফেলেনা। যেমনটা হয়তো ঘটছে অষ্ট্রেলিয়ার শার্ক বে’র ডলফিনদের মধ্যে।

নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্ব্যালয়ের এনা কপস পরিচালিত একটি গবেষকদল বোতলনাসা ডলফিনদের (bottlenose dolphin) নিয়ে গবেষণা করছেন। আমাদের পরিচিত একধরনের খাদ্যানুসন্ধানের নাম হল ‘স্পঞ্জিং’, যেখানে ডলফিনেরা খাবার খোঁজার সময় একধরনের স্পঞ্জ তাদের মুখে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় যেন সমু্দ্র তলদেশে ঘষা খেয়ে মুখে আঘাত না পায়। এটা শুধুমাত্র প্রাণীদের দ্বারা কোন বস্তুর ব্যবহারের আরেকটি অসাধারণ উদাহরণই নয়, বরং এটা সংস্কৃতি ছড়ানোর একটি উদাহরণও বটে। কপস বলছেন, এই আচরণ ‘সামাজিক আচরণ হিসেবে সন্দেহাতীতভাবে মায়ের কাছ থেকে সন্তানে পরিবাহিত হয়’। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এই আচরণের সঙ্গে নবীন ডলফিনদের জেনোমের সম্পর্ক আছে যেটা মায়ের কাছ থেকে তাদের মধ্যে এসেছে।

এই যোগাযোগ অবশ্য এমন প্রমাণ দেয়না যে কোন সাংস্কৃতিক আচরণ জেনেটিক পদার্থকে পরিবর্তন করে দেয়, যেমনটা ল্যাকটোজ সহ্যক্ষমতা, ম্যলেরিয়া প্রতিরোধ এবং শক্তিশালী পরিপাকের উদাহরণগুলির ক্ষেত্রে ঘটেছিল। কিন্তু ডলফিনের এই আচরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে এর বাইরেও আরও কিছু আছে, যেমন এটা এমন একটি আভাস দেয় যা থেকে বোঝা যায় যে তাদের সাংস্কৃতিক আচরণ হয়তো প্রাকৃতিক নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করেছিল।

বর্তমান সময়েও আমাদের বিবর্তনে সাংস্কৃতিক প্রভাব ঘটে চলেছে, কিন্তু এই প্রভাব কিভাবে বিবর্তনে ভূমিকা রাখবে সেটা এখনই সঠিকভাবে বলে দেয়া প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তিগত সংস্কৃতি আমাদের জিনেটিক অভিযোজনে কী ভূমিকা রাখবে? এই অভিযোজন কী পুরো মানবজাতিতে ঘটবে নাকি শুধু অল্প কিছু মানুষের মধ্যে ঘটবে? কিভাবে মানুষ-যন্ত্র ইন্টারফেইস, যেমন রোবোটিক কৃত্রিম অঙ্গ বা স্নায়বিক ইমপ্ল্যান্ট, আমাদের জিনগোষ্ঠিকে প্রভাবিত করবে? কোন কোন সংস্কৃতির শারীরিক আক্রমণজনিত বা হিংস্র খেলা কি মাথায় আঘাত পাওয়া প্রতিরোধী কোন অভিযোজনের সূত্রপাত ঘটাবে? এবং আর কী কী প্রশ্ন আমাদের জিজ্ঞেস করা উচিত যেগুলি আমরা এমনকি বুঝছিও না যে এসময় গুরুত্বপূর্ণ হবে?

জিনেটিক্স এবং সংস্কৃতি- দুইটি বিষয়কে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চিন্তা করার আর কোন অবকাশ নেই। কঠিন বিষয় হল কোন একটি বিষয় আরেকটিকে কিভাবে প্রভাবিত করছে সেটা খুঁজে বের করা। ল্যাল্যান্ড বলছেন, ‘এটাই হল জিন-সংস্কৃতি সহ-বিবর্তন বিষয়টির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও, সবচেয়ে বেশি গবেষণা যেই বিষয়টির উপর হয়েছে, ল্যাকটোজ সহ্য করতে পারার ক্ষমতা, সেটি শুধু আমাদেরকে এটিই দেখায়নি যে জিন-সংস্কৃতি সহ-বিবর্তন ঘটে, বরং এটাও দেখিয়েছে কিভাবে এমন সম্পর্ক প্রমাণ করা যায়।’

খ. সংস্কৃতি, মানুষের বিবর্তনের আরেকটি শক্তি

অন্যান্য জীবপ্রজাতির মতই মানব প্রজাতিও দুর্ভিক্ষ, রোগ এবং আবহাওয়ার মত সাধারণ প্রাকৃতিক নির্বাচন শক্তিগুলি (natural selection force, এর চেয়ে ভাল বাংলা খুঁজে পেলাম না) দিয়ে প্রভাবিত হয়ে তার বর্তমান রূপ পেয়েছে। সম্প্রতি, এরকম আরেকটি নতুন নির্বাচন শক্তি আমাদের গোচরে আসছে। চমৎকার এই ধারণাটি হল- গত প্রায় ২০,000 বছর ধরে মানুষ তার অগোচরেই নিজেদের বিবর্তনকে রূপ দিচ্ছে।

মানুষের সংস্কৃতি, বৃহদাকারে ব্যাখ্যা করতে চাইলে বলা যায় অর্জিত আচরণ, এমনকি প্রযুক্তিও আমাদের বিবর্তনের নির্বাচনিক শক্তি। এই শক্তির উপস্থিতির প্রমাণ একটু আশ্চর্যজনক, কারন অনেকদিন থেকেই ভাবা হত যে সংস্কৃতির ভূমিকা মানব বিবর্তনে ঠিক উল্টো। জীববিজ্ঞানীরা ভাবতেন যে অন্যান্য প্রাকৃতিক নির্বাচনিক চাপের পূর্ণশক্তি থেকে মানুষকে আড়াল করে রেখেছে মানুষের সংস্কৃতি; যেখানে জামাকাপড় এবং আশ্রয়স্থল ঠাণ্ডার প্রকোপ প্রশমিত করে এবং চাষাবাদ সঞ্চয়ের পথ খুলে দিয়ে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচায়।

এমনটাই ভাবা হত যে- এই বাফারিং প্রক্রিয়ার (বিভিন্ন বিবর্তনিক শক্তি নিষ্ক্রিয় করে দেয়া অর্থে বোঝানো) কারণে সংস্কৃতি মানুষের বিবর্তনের গতিকে ভোঁতা করে দিয়েছিল, এমনকি অদূর অতীতে পুরোপুরি বন্ধও করে দিয়েছিল। বহু জীববিজ্ঞানীই ইদানিং সংস্কৃতির ভূমিকাকে অন্য আলোয় দেখছেন।

যদিও সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ আসলেই মানুষকে অন্য নির্বাচনিক শক্তিগুলি থেকে আড়াল করে রাখে, তারপরও সংস্কৃতি নিজেই একটি জোড়ালো নির্বাচনিক শক্তি। মানুষ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, যেমন নতুন ধরনের খাদ্যাভাসকে জিনগতভাবে গ্রহণ করেছে, মানে সেই অনুযায়ী অভিযোজিত হয়েছে। এই জিন-সংস্কৃতি সম্পর্ক অন্যান্য নির্বাচন শক্তির চেয়ে দ্রুততায় বিবর্তনে কাজ করে, ‘জিন-সংস্কৃতি সহ-বিবর্তন মানুষের বিবর্তনের সবচেয়ে জোড়ালো শক্তি, এমনটাই ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন কিছু জীববিজ্ঞানী’, নেচার রিভিউ পত্রিকায় বলছেন কেভিন ল্যাল্যান্ড এবং সহযোগীগণ। ড. ল্যাল্যান্ড স্কটল্যান্ড এর সেইন্ট এন্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন বিজ্ঞানী।

জিন এবং সংস্কৃতির সহ-বিবর্তনের ধারণাটি প্রায় কয়েক দশক ধরেই বিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন, কিন্তু সম্প্রতি এর পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি দেয়া সম্ভব হয়েছে। দুইজন প্রধান চিন্তাবিদ, লস এঞ্জেলস ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট বয়েড এবং ডেভিস ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিটার রিচার্ডসন অনেক বছর ধরেই বলছেন যে মানব বিবর্তনে জিন এবং সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ড. বয়েড বলছেন, ‘এমন না যে আমরা অবহেলিত ছিলাম, কিন্তু আমাদের ধারণাটি অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর এধারণার পক্ষে তথ্য-উপাত্তের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।’

ড. বয়েড এবং ড. রিচার্ডসনের কাছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট যেই প্রমাণটি আছে সেটি হল উত্তর ইউরোপের বহু মানুষের মধ্যে ল্যাকটোজ সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি করা সাংস্কৃতিক নির্বাচন শক্তি। সিংহভাগ মানুষই বড় হওয়ার পরে তাদের ল্যাকটোজ ভাঙার জিনটির প্রকাশ, অর্থাৎ জিনটি থেকে আর প্রোটিন তৈরি হয়না, তবে উত্তর ইউরোপের মানুষেরা ব্যতীত। আদি গোখামার কেন্দ্রিক সংস্কৃতি লালনকারী উত্তরাধীকারীগণ ইউরোপের এই এলাকায় বসতি গড়েছিলেন প্রায় ৬,০০০ বছর আগে- তাদের দেহে জিন টি কার্যকরী থেকে যায় বড় হওয়ার পরেও।

এখন ল্যাকটোজ সহ্যক্ষমতাকে সাংস্কৃতিক আচার, যেমন দুধ পান, দ্বারা মানুষের জেনোমের বিবর্তনিক পরিবর্তনের উৎকৃষ্টভাবে চিহ্নিত করার উপায় হিসেবে দেখা হয়। সম্ভবত এই বাড়তি পুষ্টি মানুষের জন্য এতটাই সুবিধাজনক ছিল যে প্রাপ্তবয়ষ্কগণ অধিক পরিমাণে সন্তানসন্ততি জন্ম দিতেন এবং এরাই পরে মূল জনগোষ্ঠিতে পরিণত হয়েছেন।

এই জিন-সংস্কৃতি আন্ত:সম্পর্কের ঘটনাটি অতি অনন্য। গত কয়েক বছরে, বিজ্ঞানীরা পুরো মানব জেনোম খুঁজে (জেনোম স্ক্যান) এমন কিছু জিন বের করতে পেরেছেন যারা বর্তমানে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেসব মানুষ বেশি বেশি সন্তানসন্ততি তৈরি করছেন তাদের ক্ষেত্রে যদি কোন জিনের একটি প্রকরণের যায়গায় আরেকটি প্রকরণ বেশি হারে নির্বাচিত হচ্ছে হয় তবে বোঝা যায় যে এই জিনগুলি প্রাকৃতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং এমন চিহ্ন দিয়েই বোঝা যায় যে তারা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এইরকম জিন খোঁজার প্রক্রিয়ায় এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে মানুষের জেনোমের ১০ শতাংশ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ২,০০০ জিন, নির্বাচনের চাপের মধ্যে আছে।

বিবর্তনিকভাবে এই সবগুলি নির্বাচন চাপই সাম্প্রতিক- জার্মানির লিপজিগ এর ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলুশনারি এনথ্রোপলজির জিনতত্ত্ববিদ মার্ক স্টোনকিং এর মতে মাত্র ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ বছর আগেকার নির্বাচনিক চাপ এগুলো।বিজ্ঞানীরা নির্বাচন চাপগুলির কারন অনুসন্ধান করতে পারেন যদি বুঝতে পারেন যেই জিনগুলির উপর নির্বাচন ক্রিয়া করছে তাদের কাজটা কী। মানুষের জেনোমে থাকা প্রায় ২০,০০০ এর মত জিন এর বেশিরভাগের কাজকেই আমরা খুব ভালভাবে বুঝতে পারিনি এখনও; কিন্তু বড় পরিসরে বোঝার জন্য এসব জিন হতে প্রোটিনের কী ধরনের গঠন তৈরি হয় সেটা কে নির্দিষ্ট করতে পারি।

এই হিসেবে, অনেকগুলি জিন সাধারণ নির্বাচন চাপগুলিতে সাড়া দিচ্ছে। কিছু কিছু দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নিযুক্ত, এবং রোগ থেকে বাঁচার উপায়ের জন্য সম্ভবত এসব জিনের উপস্থিতিই বেশি। যেসব জিন ইউরোপিয় এবং এশিয়দের মধ্যে ত্বকের ফ্যাকাশে (ফর্সা অর্থে) রঙের জন্য দায়ী তারা আবহাওয়া এবং ভৌগলিক অবস্থানের প্রভাবের প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু অন্য জিনগুলি সম্ভবত সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য সুবিধা পাচ্ছে। এসবের মধ্যে আছে এমন অনেকগুলি জিন যারা খাদ্যাভাস এবং পরিপাকের সঙ্গে যুক্ত; আর সম্ভবত এরা ১০,০০০ বছর আগে যখন মানুষ কৃষিকাজের সূত্রপাত ঘটালো তখনকার খাদ্যাভাসের প্রধান পরিবর্তনকে অনেকখানিই প্রতিফলিত করে।

আমাদের লালার মধ্যে অ্যামাইলেজ নামক একধরনের এনজাইম আছে যারা শর্করা ভেঙে ফেলে। যেসব মানুষ কৃষিপ্রধান সমাজে বসবাস করে তারা বেশি শর্করা খায় এবং তাদের মধ্যে শিকারপ্রধান (প্রাণী এবং মৎস) সমাজের মানুষের চেয়ে বেশি অ্যামাইলেজ জিনের কপি আছে। ল্যাকটোজ সহ্যের জন্য জিনেটিক পরিবর্তন শুধু ইউরোপেই দেখা যায়নি, বরং আফ্রিকার ৩টি রাখাল সমাজেও দেখা গিয়েছে। এই প্রত্যেকটি সমাজের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন মিউটেশান (জিন বিন্যাসে পরিবর্তন) সম্পর্কিত, কিন্তু সবগুলির ফলাফল একটাই- ল্যাকটোজ ভাঙার জিনটি প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পরও বন্ধ না হয়ে যাওয়া।

নির্বাচন চাপ এমনকি আমাদের স্বাদগ্রহণ এবং ঘ্রাণের জিনগুলোকেও প্রভাবিত করেছে বলে আভাস পাওয়া গিয়েছে; এটা সম্ভবত মানুষ যখন যাযাবর থেকে এক জায়গায় থিতু হতে শিখেছে তখনকার জীবনযাত্রার পরিবর্তনের লক্ষণ। আরেকটি নির্বাচন চাপের দ্বারা প্রভাবিত জিনের উদাহরণ হল যারা হাড় বৃদ্ধিতে নিয়োজিত। এই প্রভাব সম্ভবত প্রায় ১৫,০০০ বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে যখন মানুষ থিতু হতে শিখেছে এবং তার ওজন কমতে শুরু করেছে, ফলে হাড়কে কম ভার বহন করতে হত।

প্রভাবিত জিনের তৃতীয় দলটি হল যারা মস্তিষ্কের কাজে অংশগ্রহণ করে। এই জিনগুলির ভূমিকা অজানা, কিন্তু যখন মানুষ ছোট ছোট শখানেক মানুষের দলভূক্ত সমাজে বসবাস ছেড়ে বড় বড় হাজারখানেক মানুষের গ্রামে থাকা রপ্ত করেছে এবং এর ফলে একধরনে নির্বাচন চাপ তৈরি হয়েছে তার ফলস্বরূপই জিনগুলির মধ্যে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছে। ড. ল্যাল্যান্ড বলছেন, ‘এটা খুবই সম্ভব যে কিছু কিছু পরিবর্তন বৃহৎ সমাজে থাকা মানুষের হিংস্রতার প্রভাবে ঘটেছে’।

যদিও জেনোম স্ক্যান নিশ্চিতভাবেই জানাচ্ছে যে সাংস্কৃতিক প্রভাবে আমাদের জিন প্রভাবিত হয়েছে, তারপরও এটা প্রমাণের পরীক্ষাগুলি পুরোপুরিই পরিসংখ্যানিক- কোন জিন কতটুকু গতানুগতিক সেটার উপর নির্ভর করে হিসাব করা। তাই, কোন জিন আসলেই নির্বাচনিক চাপে আছে কিনা সেটা বোঝার জন্য জীববিজ্ঞানীদের এমন পরীক্ষা করতে হবে যেখানে নির্বাচিত এবং অনির্বাচিত জিনের ধরনের পার্থক্যগুলি পরিমাপ করা যায়।

ড. স্টোনকিং এবং তার দল আসলে এমনই কিছু পরীক্ষা করেছেন ৩টি জিনের উপর যারা পরিসংখ্যানিক পরীক্ষায় সাংস্কৃতিক প্রভাবে নির্বাচনে ভালভাবে প্রমাণিত। এদের মধ্যে একটি জিনের নাম হল EDAR জিন, মানুষের চুলের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় যেটা কাজ করে। EDAR জিনের একটি ধরন পূর্ব এশিয় এবং নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে অনেক পাওয়া যায়, এবং সম্ভবত এসব এলাকার মানুষদের মধ্যে ইউরোপিয়ান বা আফ্রিকানদের চেয়ে স্থুল চুলের অধিকারী হওয়ার পেছনে এই জিনটি কাজ করে।

EDAR জিনটি এমনই কিছু সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছে সেটা অবশ্য এখন পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়নি। সম্ভবত স্থুল চুল থাকাটা এমনিতেই একটি সুবিধা, সাইবেরিয় পরিবেশে তাপ ধরে রাখার জন্য। অথবা এটা যৌন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যেখানে স্থুল চুলের অধিকারীরা সঙ্গী হিসেবে বেশি নির্বাচিত হয়েছে।

অথবা একটি তৃতীয় সম্ভাবনা থাকতে পারে এই ঘটনার পেছনে- এই জিনটি একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে এমন একটি নিয়ন্ত্রক জিনকে চালু করে দেয় যেটা চুলের বৃদ্ধিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। তাহলে, এই জিনটি সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারন হতে পারে এর রোগ প্রতিরোধী ভূমিকার কারণে, যেখানে স্থুল চুল একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এসেছে। অথবা তিনটা সম্ভাবনার সবগুলিই একসাথে কাজ করতে পারে। ড. স্টোনকিং বলছেন, ‘এটি এমন একটি ঘটনা যেটা নিয়ে আমরা অনেক কিছুই জানি, কিন্তু আবার অনেক কিছুই জানতে বাকি।’

এই জিনের ব্যাপারটি দিয়েই বোঝা যায় জীববিজ্ঞানীরা জেনোম স্ক্যানের মাধ্যমে নির্বাচন ইঙ্গিতের অর্থ বোঝার জন্য খুবই সতর্ক থাকেন। তবে কিভাবে আদি মানুষ আধুনিক মানুষে পরিনত হল, যেমন উত্তরপূর্ব এশিয়ার মানুষ কিভাবে নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিল, সেসব বিষয়ে আলোকপাত করে উপরের উদাহরণ। ড. স্টোনকিং এর মতে, ‘এটাই আসল উদ্দেশ্য। আমি নৃতাত্ত্বিক অবস্থান থেকে দেখছি, এবং আমরা পুরো গল্পটা জানতে চাই।’

প্রাচীন মানুষের সংস্কৃতি খুব শ্লথ গতিতে পরিবর্তিত হয়েছে। ওল্ডোয়ান নামক একধরনের প্রস্তর যন্ত্র ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে থেকে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তারপর ১ মিলিয়ন বছরে তেমন কোন পরিবর্তনই হয়নি এর ধরনে। আর এরপরে একিউলিয়ান যন্ত্র আসে যেটা ১.৫ মিলিয়ন বছর ধরে চলেছে। কিন্তু, গত ৫০,০০০ বছরে, আচরণগতভাবে আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে বহুধরনের এবং বহুমাত্রার সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে। এ থেকে এমন সম্ভাবনাই আমরা খুঁজে পাই যে সাম্প্রতিক সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের দ্রুত গতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মানব বিবর্তন অনেক উচ্চহারে ঘটছে।

যদিও কিছু জীববিজ্ঞানী এটাকে একটা সম্ভাবনা ভাবেন, কিন্তু এর পেছনে প্রমাণ প্রয়োজন। জেনোম স্ক্যানের বড়সড় সীমাবদ্ধতা আছে। তারা আদি নির্বাচনের চিহ্নগুলি দেখতে পায়না, যেগুলি নতুন মিউটেশানের আগমণের ফলে হারিয়ে যায় জেনোম থেকে; ফলে এমন কোন প্রমাণিত যুক্তি নাই যেটা বলতে পারে যে আগের চেয়ে এখন মানুষ বেশি পরিমাণে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আবার যেসব জিন কে সুবিধাপ্রাপ্ত হিসেবে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে তারা অনেকগুলিই ফল্স পজিটিভ বা ভুল ফলাফলের দ্বারা প্রাপ্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, স্ক্যানগুলি দিয়ে দূর্বলভাবে নির্বাচিত জিনগুলিকে সনাক্ত করাও কঠিন। তাই, তারা হয়তো শুধুমাত্র জেনোমের একটি ভগ্নাংশকে খুঁজে বের করছে যা সম্প্রতি প্রভাবিত হয়েছে। জিন-সংস্কৃতি সম্পর্কের গাণিতিক মডেল আমাদেরকে জানাচ্ছে যে এই ধরনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন অত্যন্ত দ্রুতগতির হয়। সংস্কৃতি প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি শক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে, আর এটা যদি মূল শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয় তবে মানুষের বিবর্তনের গতি দ্রুততর হচ্ছে, কারন মানুষ তার নিজের উদ্ভাবনের চাপে অভিযোজিত হচ্ছে।

গ. উপকারী পরিব্যক্তি: Apolipoprotein AI-Milano

হৃদরোগ শিল্পোন্নত দেশগুলির একটি প্রধান স্বাস্থ্যসমস্যা। আমাদের বিবর্তনিক ইতিহাস আমাদেরকে শক্তিসমৃদ্ধ চর্বিজাতীয় খাবার খেতে উৎসাহী করে, যা পুরানো কোন কালের জীবনব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল; কিন্তু এখনকার পরিবর্তিত জীবনব্যবস্থায় এই চর্বি খাবার আমাদের ধমনীকে বন্ধ করে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু বিবর্তনকে এর জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে সেটা নিয়ে আমাদের সামনে উদাহরণ আছে!

সব মানুষেই Apolipoprotein AI নামের এক জিন আছে যা রক্তস্রোতে কোলেস্টেরল প্রবাহে সাহায্য করে। Apo-AI হলো একধরনের HDLs, যা ধমনীর দেয়াল থেকে কোলেস্টেরলকে সরাতে সাহায্য করে। কিন্তু ইতালীর এক ছোট সমাজের মধ্যে এই জিনটির একটি প্রতিরূপ বা পরিব্যক্ত রূপ (mutant version) আছে, নাম Apolipoprotein AI-Milano (বা Apo-AIM)। এই Apo-AIM হলো Apo-AI এর চেয়েও বেশি কার্যকরী প্রোটিন যা ধমনীর চর্বি বা কোলেস্টেরলকে আরও বেশি দক্ষতার সাথে সরিয়ে দিতে পারে, ধমনী বন্ধ হওয়া প্লাককে দ্রবীভূত করতে পারে এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে আরও কিছু দৈহিক সুবিধা দিতে পারে। যেসব মানুষের এই Apo-AIM প্রতিরূপটি আছে তাদের সাধারণ মানুষের চেয়ে হৃৎপিন্ড বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা স্ট্রোকের মতো রোগগুলি লক্ষণীয়রকম কম হয়। সেজন্য, কিছু ঔষধ কোম্পানি এই প্রোটিনটির একটি কৃত্রিমরূপ তৈরি করতে চাচ্ছে যা ঔষধ হিসেবে কাজ করবে।

ঘ. উপকারী পরিব্যক্তি: হাড়ের ঘনত্ব বাড়া

হাড়ের ঘনত্বকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি জিনের নাম low-density lipoprotein receptor-related protein 5, অথবা সংক্ষেপে LRP5। এই জিনের একধরনের মিউটেশান বা পরিব্যক্তি হাড়ের রোগ অস্টিওপরোসিস (osteoporosis) নামক এক রোগের কারণ। কিন্তু অন্যধরনেরপরিব্যক্তি জিনটির কার্যক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে, যা মানুষের অন্যতম অদ্ভুত পরিব্যক্তির কারণ!

এক অদ্ভুত ঘটনা থেকে পরিব্যক্তিটি সম্বন্ধে আমরা জানতে পারি। একদিন বেশ মারাত্মক এক গাড়ি দূর্ঘটনা থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন এক ভদ্রলোক। X-ray পরীক্ষায় দেখা যায় ভদ্রলোকটি এবং তার আত্মীয়স্বজনদের দেহে সাধারণ মানুষের তুলনা শক্তিশালী এবং বেশী ঘনত্বের হাড় রয়েছে! ৩ থেকে ৯৩ বছর বয়স্ক এই মানুষগুলির কোনদিনই কোন হাড় ভাঙেনাই। শুধু তাই না, দূর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি তাদের হাড় বয়সের কারণে ক্ষয়ে যাওয়া থেকেও রক্ষা পেয়েছে।

ঙ. উপকারী পরিব্যক্তি: চতুর্বর্ণসংবেদী (Tetrachromatic) দৃষ্টি

বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীরই বর্ণসংবেদী দৃষ্টি দূর্বল হয়, কারন তাদের চোখে মাত্র দুইধরনের কোন (cone) কোষ থাকে, কোন কোষ থাকে রেটিনাতে, যারা বিভিন্ন রঙে সংবেদনশীল এবং রঙ দেখতে সাহায্য করে। মানুষের রেটিনাতে তিন ধরনের কোন কোষ থাকে (ত্রিবর্ণসংবেদী দৃষ্টি) বলে মানুষের বর্ণসংবেদীতা অন্যান্য বেশিরভাগ স্তন্যপায়ীর চেয়ে ভালো। এই গুণ মানুষকে আদিম কালে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে, কারণ রঙিন এবং পাকা ফল ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া আমাদের জন্য সহজ ছিলো।

এররকম নীল রঙের প্রতি সবচেয়ে সংবেদনশীল কোনটির জন্য দায়ী জিনটি আমাদের ৭ নম্বর ক্রোমোজমে থাকে। বাকি দুইটি লাল এবং সবুজ, এদের দুটি জিনই থাকে এক্স ক্রোমোজমে। আমরা জানি পুরুষের থাকে মাত্র একটি এক্স ক্রোমোজম, ফলে এদের কোন তৈরির যেকোন একটি জিনে পরিব্যক্তি হলে পুরুষটি হয় লাল বা সবুজ, যেকোন একটি রঙের বর্ণকানা হয়। নারীর সে সমস্যা নাই, কারণ নারীর দুইটি এক্স ক্রোমোজমের কপি থাকে। সেজন্য বর্ণান্ধতা প্রায় সবক্ষেত্রেই শুধুমাত্র পুরুষেরই দেখা যায়।

কিন্তু এই লাল বা সবুজ জিনে যদি উল্টা পরিব্যক্তি হয়, অর্থাৎ, জিনটি অকেজো না হয়ে গিয়ে অন্য রঙ সংবেদনশীল হয়ে ওঠে তবে পুরুষের কোন পরিবর্তন হয়তো হবেনা, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে হবে। যেমন মনে করি তার একটা জিন নীল, বাকি দুইটা জিন একটা এক্স ক্রোমোজমে লাল এবং সবুজ, আর পরিব্যক্তির ফলে অন্য একটা ক্রোমোজমে একটা ভিন্ন জিন। ফলে যেটা হবে উক্ত নারী, পাখি বা কাছিমের মতো, তিনটার যায়গায় ৪টা রঙে সংবেদনশীল হবেন, অর্থাৎ চতুর্বর্ণসংবেদী। তাত্ত্বিকভাবে যারা তিনটি রঙ ছাড়াও চতুর্থত কোন রঙের ছাপ বা ছায়াকে (shades) নির্দিষ্ট করতে পারেন। যা সাধারণ মানুষ পারেন না। তাঁরা কিধরনের বর্ণ দেখতে পারেন তা নিয়ে এখনও খুব ভালোভাবে বোঝা না গেলেও চতুর্বর্ণসংবেদী মানুষের প্রমাণ বিজ্ঞান প্রকাশনাতে হাজির করা হয়েছে।

বিবর্তন সিরিজের আগের পর্ব:

১। কেন সবারই বিবর্তনতত্ত্ব শেখা উচিত
২। বিবর্তন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার তথ্যচিত্র
৩। কিভাবে মানুষ হলাম?
৪। চোখের সামনে নতুন প্রজাতির উদ্ভব

(এই লেখার কিছু অংশ বিজ্ঞানব্লগেও প্রকাশিত হয়েছিল।)

সূত্রঃ
https://www.newscientist.com/article/mg23331144-200-desert-people-evolve-to-drink-water-poisoned-with-deadly-arsenic
http://www.talkorigins.org/faqs/information/apolipoprotein.html
http://www.nejm.org/doi/full/10.1056/NEJMoa013444#t=article
http://jov.arvojournals.org/article.aspx?articleid=2191517
http://bigthink.com/daylight-atheism/evolution-is-still-happening-beneficial-mutations-in-humans?utm_campaign=Echobox&utm_medium
http://www.bbc.com/future/story/20140410-can-we-drive-our-own-evolution
http://www.nytimes.com/2010/03/02/science/02evo.html?pagewanted=2&_r=0&adxnnl=1&ref=science&adxnnlx=1397332911-LB%20ANsI94DyL8OEeKc2p4g

কিছু নির্দিষ্ট তথ্যের রেফারেন্স, মূল বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ ইত্যাদি উপরে উল্লেখিত লিংকগুলিতে দেয়া আছে।

‌ছবিসূত্রঃ
http://www.npr.org/


মন্তব্য

শুভ্র  এর ছবি

চমৎকার লেখা।
তবে দৈর্ঘ্যে বেশ বড়। মাঝামাঝি গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলার ব্যাপার চলে আসে। কিছু প্রাসঙ্গিক গ্রাফিক্স কি অ্যাড করা সম্ভব মাঝে দিয়ে? তাহলে এইগুলা একেকটা মেন্টাল পজ হিসেবে কাজ করে।
সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত।

সজীব ওসমান এর ছবি

হেহে.. বেশি বেশি ছবি দেয়ার আমার এমনিতেই বদনাম আছে।

অতিথি লেখক এর ছবি

সম্ভব হলে ছবিটা পাল্টান, লেখার সাথে একেবারে যায় না। এই ক্লিন শেভড, Faux Fur Fabric-এর জামা পরা পূর্বপুরুষকে দেখলে Alfredo Castelli’র কমিকের চরিত্র ‘জাভা দ্য কেভম্যান’ বলে মনে হয়।

স্থুল চুল, পরিব্যক্তি – এই শব্দগুলোর ইংলিশ কী?

natural selection force = প্রাকৃতিক নির্বাচনী বল

বর্ণান্ধতার বাস্তবতাকে অস্বীকার না করেই একটা ভিন্ন কথা বলা যায়। অনেক বর্ণ আমরা দেখতে পাই না বলে মনে হলেও সেগুলো আমরা আসলে দেখতে পাই, কিন্তু ভিন্ন বর্ণ বলে সনাক্ত না করে নিকটস্থ অন্য কোন বর্ণের ভিন্ন shade (এর বাংলা কী হতে পারে?) হিসেবে চিহ্নিত করি। এইখানে এই ব্যাপারে একটা আগ্রহোদ্দীপক আলোচনা আছে।

এই লেখায় ব্যবহৃত ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি হয় খুব ব্যাপকার্থে অথবা কিছুটা অস্পষ্টতাসহ বর্ণিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত অবস্থান ভিন্নরূপ। জীবনধারণের তাগিদে মানুষ বা ভিন্ন কোন জীব যে নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা করেছে; একটা লম্বা সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মে তার জীনে তদানুযায়ী বিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। আরও পরে পরিবেশ-পরিস্থিতির উন্নয়ন বা ভিন্ন প্রকারের পরিবর্তন ঘটলে জীনগুলোতে সংঘটিত বিবর্তনের রেশ থেকে যায়। এই রেশ কাটতে বা নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ হতে হয়তো আরো একটা লম্বা সময় বা অনেকগুলো প্রজন্মের দরকার হবে। এখন এই নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপটিকে কী বলবো, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন? সময়ের সাথে সাথে (আসলে প্রয়োজনের সাথে সাথে) আচরণ, জীবনাভ্যাস ইত্যাদিতে যে পরিবর্তন আসে তা অবশ্যই সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু পরিবর্তনের চাপটিও কি সংস্কৃতির অংশ? মনে হচ্ছে না। গাছের ডাল বেশি উঁচুতে থাকায় উপরের দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে তিন হাজার বছরে আমার জাতির মানুষের হাত লম্বা হয়ে গেলো – এই বিবর্তনটিতে লম্বা হাত হচ্ছে পরিবর্তিত জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, হাত উপরে তুলে ফল পাড়াটা হচ্ছে সংস্কৃতি (যেখানে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ ঢিল ছুঁড়ে বা তীর মেরে ফল পাড়ে), আর গাছের ডাল বেশি উঁচুতে থাকা হচ্ছে ‘প্রতিবেশিক চাপ’ বা ‘প্রতিবেশিক বিবর্তনীয় চাপ’। অর্থাৎ, প্রতিবেশিক বিবর্তনীয় চাপের ফলে সংঘটিত জেনেটিক পরিবর্তন হচ্ছে বিবর্তন আর আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে সংস্কৃতি।

সজীব ওসমান এর ছবি

ছবিটা সম্বন্ধে আমি বোধ করি আপনি ভুল ধারণা পোষণ করছেন। সামনের মানুষটিকে একজন নারী হিসেবে দেখলেই দেখবেন ঠিক ঠিক মনে হচ্ছে। সবাইকে পুরুষ হতে হবে এমন কোন কথা কি আছে? এটা আসলে নিয়ান্ডারথাল মানুষদের ছবি, একই ছবি বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা নেচারও ব্যবহার করেছে।

বাকিগুলা ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট।

অতিথি লেখক এর ছবি

'নেচার' পত্রিকায় ছাপা হলেই যে তা অভ্রান্ত হবে তা নয়। আবার আমার জানার সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে। ক্লিন শেভড জনকে যদি নারী ধরি তাহলেও কয়েকটা প্রশ্ন থেকে যায়। এক, পেছনের পুরুষ দুজনের জামা দেখলে মনে হয় সেলাই করা, নারীটির পোশাকের মতো দুপাশে খোলা নয়। কিন্তু নিয়ান্ডার্থালরা কি সেলাই করতে জানতো? এখনো পর্যন্ত তাদের সেলাই করার কোন 'টুল' উদঘাটিত হয়নি, বা তারা সেলাই করতে পারতো অমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই, একজন পুরুষের পায়ে বেশ ভালো মানের জুতা দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে নিয়ান্ডার্থালরা কি জুতা পরতো - অন্তত এই মানের জুতা যেখানে চামড়া সেলাই করা এবং 'সোল' লাগানোর মতো ব্যাপার আছে! তিন, এদের হাতের বাটি দেখা যাচ্ছে বেশ উন্নত মানের এবং নিয়মিত আকৃতির। নিয়ান্ডার্থালরা প্লেটে করে খাবার খেতো কিনা এই প্রশ্ন তো থাকেই, সাথে এই মানের প্লেট বানাতে পারতো কিনা সেই প্রশ্নও থাকে। নিয়ান্ডার্থালদের শিকারের অস্ত্র যথেষ্ট 'ফাইন', তার মানে এই না যে তাদের তৈজসপত্র যথেষ্ট 'ফাইন' ছিল। এরা একটা ভালো মানের পাথরের বা কাদার চুলা বানাতে সক্ষম ছিল না। সুতরাং এদের রান্নার সামগ্রী যথেষ্ট 'প্রিমিটিভ' হবার কথা (মানে কোন কিছুতে গেঁথে বা ঝুলিয়ে)। আর যাদের হাড়িকুড়ি'র অবস্থা খারাপ তাদের থালাবাসনের অবস্থা আরও খারাপ হবার কথা।

বলতে পারেন এই ছবিটা নিয়ে আমি এতো কথা কেন বলছি। প্রথমত, ভুল (যদি হয়ে থাকে) সেটা ভুলই - তা আমার হোক আর 'নেচার'-এর হোক। সম্ভব হলে সেটা মিটিয়ে ফেলা ভালো। দ্বিতীয়ত, এই সুবাদে নিয়ান্ডার্থালদের নিয়ে যদি একটু আলোচনা হয় তাহলে মন্দ কি! তাদের ডিএনএ আর আমাদের ডিএনএ যেখানে প্রায় ছুঁই ছুঁই সেখানে তাদের ক্ষেত্রেও অমন পরিবর্তনগুলো লক্ষ করা গেছে কিনা সেটাও জানতে ইচ্ছে করে।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

চলুক

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেক দিন থেকেই পড়ব পড়ব করেও সময় পাচ্ছিলামনা। এবার এক বৈঠকেই পড়ে ফেলা গেলো। খুব ভালো লাগলো। লেখাটা বড় বলে হাফিয়ে উঠিনি। এই সিরিজটা আরো চলুক।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সজীব ওসমান এর ছবি

চলুক

সজীব ওসমান এর ছবি

চলুক

নীড় সন্ধানী এর ছবি

কোথাও পড়েছিলাম কোলেস্টেরল ফ্যাট এসব নিয়ে একটা গবেষণা করতে গিয়ে দেখা গিয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের চেয়ে কম, যদিও ওই এলাকায় মানুষের খাদ্য তালিকায় পাম অয়েল এবং নারিকেল তেলের উপস্থিতি অনেক বেশী। সারা দুনিয়াতে এই তেলকে স্বাস্থ্যঝুঁকির উপাদান মনে করা হলেও ওই অঞ্চলে তা কোন হুমকি হিসেবে কাজ করে না। এটা অভিযোজনের ছোট্ট একটা উদাহরণ মাত্র। এরকম লক্ষ কোটি উদাহরণ ছড়িয়ে আছে পৃথিবীতে।

আপনার সিরিজের সবগুলো লেখা সংগ্রহে রাখার মতো। আশা করি মুদ্রিত বই আকারে পেয়ে যাবো একদিন।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

সজীব ওসমান এর ছবি

হুমম। অনেক ধন্যবাদ উৎসাহের জন্য।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

কি উগ্র একটা লেখা! উত্তম জাঝা!

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

শামীম এর ছবি

চমৎকার লেখার জন্য ধন্যবাদ।

কিছুদুর পড়েই এই মন্তব্য লিখছি কারণ আমার মনে হল আর্সেনিকের মাত্রা নিয়ে একটু সংশোধনের প্রয়োজন আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা হল ১০পিপিবি। পিপিবি = পার্টস পার বিলিয়ন। বাংলাদেশের স্ট্যান্ডার্ডে এই মাত্রা হল ৫০ পিপিবি = ০.০৫ মিগ্রা/লিটার।
১ পিপিবি = ১/১বিলিয়ন = ১ মাইক্রোগ্রাম / ১ বিলিয়ন মাইক্রোগ্রাম = ১ মাইক্রোগ্রাম / ১ মিলিয়ন মিলিগ্রাম = ১ মাইক্রোগ্রাম / ১ হাজার গ্রাম =১ মাইক্রোগ্রাম / ১ কেজি = ১ মাইক্রোগ্রাম / ১ লিটার

সেই হিসেবে লিটারে এক মাইক্রোগ্রাম থাকাটা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মাত্রার চেয়ে অনেক কম।

-- শামীম।

শামীম এর ছবি

(আমার আগের মন্তব্যের সাথে, লেজ হিসেবে এটা যুক্ত হতে পারে)
লেখার শেষে দেয়া সোর্সে আর্সেনিকের মাত্রা ১ মিলিগ্রাম/লিটার বলা আছে। অর্থাৎ ১০০০ মাইক্রোগ্রাম/লিটার যা নিঃসন্দেহে ডব্লিউ এইচ ও'র নির্ধারিত ১০ পিপিবি (মাইক্রোগ্রাম/লিটার) অপেক্ষা ১০০ গুন বেশি।

-- শামীম।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA