বিক্রমপুরের ভূঁইয়া

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: মঙ্গল, ২৭/০২/২০১৮ - ৪:৫৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইতিহাস গবেষণায় যে সব বড় বাধা আছে তার মধ্যে তথ্যের অপ্রতুলতা ও বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের অসঙ্গতি অন্যতম। এই দুটোর কারণে চাইলেও একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে গুছানো রচনা কঠিন হয়ে পড়ে। এর বাইরে সম্ভাব্য আকরের নাগাল না পাওয়া মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবু একটি প্রচেষ্টা থেকে যা কিছু পাওয়া যায় তা একত্রে প্রকাশ করে রাখলে ভবিষ্যতে কোন গবেষক একই বিষয়ে আগ্রহী হলে তার জন্য পরিশ্রম কিছুটা লাঘব হয়।

**************************************

ষোড়শ শতক থেকে সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলা ছিল (বারো+এক) বড় ভূস্বামী বা ভূঁইয়াদের ফেডারেশন। এই ভূঁইয়া’দের মধ্যে বিক্রমপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায় অন্যতম। এই দুই রায়নন্দন সম্পর্কে খোঁজ নিলে ইতিহাসের পাঠে প্রথমে যে কথাটি বলা হয় তা হচ্ছে —

পঞ্চদশ শতকের শুরুর দিকে নিম রায় নামক কর্ণাটকের জনৈক কায়স্থ বিক্রমপুরের আরা ফুলবাড়িয়াতে বসতি স্থাপন করেন।”

এই বর্ণনাটি কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রথমত, কায়স্থদের ইতিহাস যত পুরনো হোক আর তাদের বিস্তৃতি দুনিয়াজোড়া হোক, পঞ্চদশ শতকে কর্ণাটকে কায়স্থরা খুব সুলভ হবার কথা না। কারণ, নবম শতকেই কায়স্থরা বর্তমান মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের কিয়দংশ, উত্তর প্রদেশ, বিহার, ওড়িষ্যা ও বাংলাতে থানা গেড়েছিল। তার পরেও যেহেতু পঞ্চদশ শতকে কর্ণাটকে কায়স্থদের থাকাটা অসম্ভব কিছু নয় তাই ‘কর্ণাটকী কায়স্থ’ বিষয়টি মেনে নেয়া যায়। কিন্তু একজন কর্ণাটকী কায়স্থের পদবী কি ‘রায়’ হতে পারে? এর একটা সহজ উত্তর হচ্ছে কারো নামে ‘রায়’ থাকার মানে এই না যে তার পদবী ‘রায়’। কারণ, উপাধী-খেতাব-প্রশাসনিক পদ হিসাবে কৃতী ব্যক্তির নামের পেছনে ‘রায়’ যুক্ত হতে পারে এবং পরবর্তীতে কৃতী ব্যক্তির অকৃতী বংশধরেরা নামের শেষে ‘রায়’কে পদবী হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। এই হিসাবে কর্ণাটকী ‘নিম’ বর্ণে কায়স্থ, পদবীতে রায় হতে পারেন। সমস্যাটি হচ্ছে কর্ণাটক থেকে কম করে হলেও সাড়ে ছয়শ/সাতশো ক্রোশ দূরে কঠিন জলজংলার দেশ বিক্রমপুরে নিম রায় ঠাঁই খুঁজতে যাবেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর নেই। চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে পঞ্চদশ শতকের প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত কর্ণাটকের শাসনক্ষমতা ছিল সঙ্গম রাজবংশর হাতে। এদের রাজাদের নামের শেষে ‘রায়’ থাকলেও সেটা পদবী নয়, এবং তারা বর্ণে কায়স্থ ছিলেন না। কর্ণাটকে বড় আকারে মুসলিম রাজবংশগুলোর হামলা শুরু হতে তখনো অনেক সময় বাকি; সুতরাং ঐ আমলে নিম রায় কোন দুঃখে দেশ ছেড়েছিলেন সেটা পরিষ্কার নয়।

নিম রায়ের সাথে সময়কালের পার্থক্য (প্রায় ২০০ বছর) থেকে ধারণা করা যায় চাঁদ রায়, কেদার রায় নিম রায়ের অধঃস্তন পঞ্চম থেকে সপ্তম পুরুষের কোন এক প্রজন্ম। ইতিহাসের পাঠে চাঁদ রায়কে বিক্রমপুরের আর কেদার রায়কে শ্রীপুরের ভূঁইয়া বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের মানচিত্রে বিক্রমপুর নামে এখন আর কোন জায়গা নেই। ইতিহাসের বিক্রমপুর নামের জায়গাটা মুন্সীগঞ্জ জেলার অধীনে শ্রীনগর, লৌহজং ও সিরাজদিখান উপজেলায় (মহকুমার সমতুল) বিভক্ত হয়ে গেছে।

এখনকার মুন্সীগঞ্জ জেলায় শ্রীনগর থাকলেও শ্রীপুর নেই। শ্রীপুর নামে একটা উপজেলা আছে গাজীপুর জেলায়। এদিকে ইতিহাসের বর্ণনায় শ্রীপুরকে বলা হয়েছে কালীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত; কিন্তু এখনকার মুন্সীগঞ্জে কালীগঙ্গা নদী বলেও কিছু নেই। কালীগঙ্গা নামে এখন একটা নদী আছে যা মানিকগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ঢাকার কেরাণীগঞ্জের উত্তর-পশ্চিমাংশে ধলেশ্বরীতেই বিলীন হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা মানিকগঞ্জ-ঢাকার কালীগঙ্গা নদী থেকে কম করে হলেও বিশ ক্রোশ দূরে অবস্থিত। জেমস রেনেলের ১৭৭৬ সালের এই অঞ্চলের মানচিত্রে Callygonga বলে পদ্মা আর মেঘনাকে সংযোগকারী একটা ছোট নদী দেখা যায়, তার পাড়ে Chiddypor নামে একটা জায়গার নামও দেখা যায়। সুতরাং বৃহত্তর বিক্রমপুরে শ্রীপুর নামের জায়গা ও তার পাশে কালীগঙ্গা নদীর ঐতিহাসিক অস্তিত্ত্ব প্রমাণিত হয়।

বিভিন্ন জনের ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো থেকে যোগ করলে শ্রীপুর পরগণাটিতে বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড়, কামারখাড়া, সরিষাবন ও শিলই ইউনিয়ন, এবং মাদারীপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে হয়। ১৮৬৯ সাল নাগাদ পদ্মার গতিপথে কিছু পরিবর্তন হলে কালীগঙ্গা নদী পদ্মাতে বিলুপ্ত হয়, মূল শ্রীপুর পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, এবং কেদারপুর পদ্মার দক্ষিণ তীরে চলে যায়।

নিম রায়ের বংশধর চাঁদ রায় আর কেদার রায়ের মধ্যে সম্পর্ক কী? কেউ বলেন চাঁদ রায় কেদার রায়ের পিতা, কেউ বলেন পিতৃব্য, কেউ বলেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, এমনকি কেউ বলেন পুত্র। বেশির ভাগ বর্ণনায় বলা হয়েছে কেদার রায় হচ্ছেন যাদব রায়ের পুত্র, কিন্তু চাঁদ রায়ের পিতার নাম উল্লেখ নেই। আরও যা জানা যায় না তা হচ্ছে এরা দুই জন কবে এবং কীভাবে বিক্রমপুর আর শ্রীপুরের অধিপতি হলেন।

**************************************

১৫৬৪ সালে কররাণী আমলে ঈসা খাঁ সোনারগাঁ আর মহেশ্বরী পরগণার প্রশাসক বা ভূঁইয়া নিযুক্ত হন। ১৫৭৫ সালে দাউদ খান কররাণী ঈসা খাঁকে বারো ভূঁইয়াদের প্রধান (মসনদ-ই-আ’লা) বানান। ১৫৭৬ সালে কররাণী রাজবংশের পতন হলে ভূঁইয়ারা কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়েন এবং ঈসা খাঁ তাদের প্রধান বনে যান। ১৫৭৮ সালে বাংলার মুঘল সুবাদার হুসাইন কুলী বেগ (প্রথম খান জাহান) ঈসা খাঁর রাজত্ব আক্রমণ করলে ঈসা খাঁ তাদেরকে মেঘনার পশ্চিম পাড়ে মোকাবেলা করেন। যুদ্ধে ঈসা খাঁ হেরে ত্রিপুরার রাজা অমর মাণিক্যের আশ্রয় নেন। অমর মাণিক্য ঈসা খাঁকে ৫২,০০০ সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন (এই সংখ্যাটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে)। ত্রিপুরার সাহায্যপ্রাপ্ত ঈসা খাঁ’র বাহিনী যথাস্থানে পৌঁছানোর আগেই জমিদার প্রতাপ মজলিশ আর দিলওয়ার মজলিশের বাহিনী হঠাৎ আক্রমণ করে মুঘলদের পরাজিত করেন। ফলে ঈসা খাঁ নিজের রাজত্ব ফিরে পান। এই সময়ে ঈসা খাঁ দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করেন। ঈসা খাঁ’র প্রথম স্ত্রীর নাম ফাতিমা খান, দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম স্বর্ণময়ী দেবী ওরফে সোনা বিবি। কেউ কেউ বলেন সোনা বিবির নাম থেকে ঈসা খাঁ’র রাজধানীর সোনারগাঁ নামকরণ করা হয়েছে — এটি সঠিক নয়। এই অঞ্চলটি কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর ধরে সুবর্ণগ্রাম নামে পরিচিত। সুবর্ণগ্রাম থেকে সোনারগাঁ নাম হওয়াটাই যৌক্তিক।

স্বর্ণময়ী দেবীর পিতা ত্রিপুরা রাজ্যের এক ভূস্বামী – নাম চাঁদ রায়; এবং এই চাঁদ রায়ের ভাইয়ের নাম কেদার রায়। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে চাঁদ রায় ও কেদার রায় দুই ভাই এবং মেঘনার পশ্চিম তীরস্থ বিক্রমপুর-শ্রীপুর ঐ সময়ে ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের শাসনাধীন ছিল — যা পরবর্তীতে টেকেনি। আরও ধারণা করা যাচ্ছে রায় ভ্রাতৃদ্বয় ১৫৭৮ সালের আগে থেকেই বিক্রমপুর-শ্রীপুরের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই বিয়ের সময়ে ঈসা খাঁ’র বয়স প্রায় ৫০, তখন স্বর্ণময়ীর পিতা চাঁদ রায়ের বয়স সম্ভবত ঈসা খাঁর কাছাকাছি। এই বিয়েটা আকবরের রাজপুত রাজকুমারী বিয়ে করার মতো কৌশলগত ব্যাপার যাতে মুঘলদের আক্রমণ ঠেকাতে ঈসা খাঁ এই দুই ভাইয়ের সাহায্য পান। কিন্তু ঈসা খাঁর রাজ্য সম্প্রসারণনীতির কারণে শেষ রক্ষা হয়নি, ১৫৮৮ সালে ঈশা খাঁ চাঁদ রায় ও কেদার রায় উভয়ের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

১৫৮৬ সালে রাণী প্রথম এলিজাবেথের দূত রাল্‌ফ ফিচ শ্রীপুরে কেদার রায়কে সাক্ষাত করেন। রাল্‌ফ তাকে আকবরের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিসাবে অভিহিত করেছেন। তার মানে বিক্রমপুরের ভূঁইয়ারা একই সাথে মুঘলদের এবং মসনদ-ই-আ’লাকে বিরোধীতা করে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ত্ব বজায় রেখেছিলেন। মুঘলদের আক্রমণ বিক্রমপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হলে চাঁদ রায় ও কেদার রায়কে ক্রমাগতভাবে মুঘল আক্রমণ ঠেকিয়ে যেতে হয়েছে; কিন্তু চারদিক দিয়ে নদী দিয়ে ঘেরা বিক্রমপুর-শ্রীপুরে মুঘলদের পক্ষে জোরালো আক্রমণ করা সম্ভব হয়নি। তখনো মুঘলরা তুলনামূলকভাবে নৌশক্তিতে দুর্বল ছিল; পক্ষান্তরে চাঁদ রায়-কেদার রায় পর্তুগীজদের সহায়তায় শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। কেদার রায়ের নৌবাহিনীর এক সেনাপতি ছিলেন বহুল আলোচিত পর্তুগীজ জলদস্যু দোমিঙ্গো কারভালো (Domingo Carvalho)।

১৫৭৬ সালে কররাণী রাজবংশের পতনের পর বাংলার আফগানরা কুতলু খান লোহানীর অধীনে ঘোড়াঘাটকে কেন্দ্র করে সমবেত হয়। কুতলু বর্তমান বিহার ও ওড়িষ্যার বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হন। ১৫৯০ সালে কুতলু পরলোক গমন করলে তার ভাই ঈসা খান লোহানী কুতলুর নাবালক পুত্র নাসির খান লোহানীকে হঠিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা সংহত করতে ঈসা খান লোহানী মুঘলদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন। ঈসা খান লোহানী নিজ পুত্র খাজা উসমান লোহানীকে বাংলার ফতেহাবাদ (বর্তমান ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরিয়তপুর জেলার অধিকাংশ) পরগণার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ফতেহাবাদের পার্শ্ববর্তী পরগণা ভূষণা (বর্তমান ফরিদপুরের মধুখালী উপজেয়ালার কিয়দংশ ও বর্তমান মাগুরা জেলা) ছিল মুঘলদের অনুগত মুকুন্দরাম রায়ের অধীনে। ঈসা খান লোহানীর মৃত্যুর পর খাজা উসমান লোহানীর সাথে মুঘলদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ফলে তার সাথে মুঘলদের ও মুকুন্দরামের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

মুঘল বিরোধিতার কারণে খাজা উসমান লোহানীর সাথে চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের সুসম্পর্ক ছিল। ১৫৯৩ সালে চাঁদ রায়, কেদার রায় ও খাজা উসমানের ভাই খাজা সুলাইমান লোহানী সম্মিলিতভাবে মধুমতী নদীর তীরস্থ ভূষণা দুর্গ আক্রমণ করেন। মুঘল সহায়তায় ভূষণা তখন দুর্ভেদ্য এক দুর্গ। অবরোধের প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধে ১৫৯৩ সালের এগারোই ফেব্রুয়ারী চাঁদ রায় নিহত হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেদার রায়-খাজা সুলাইমানের সম্মিলিত বাহিনী মুকুন্দরামকে পরাস্ত করে ভূষণা দুর্গ অধিকার করে। ১৫৯৬ সাল পর্যন্ত ভূষণা দুর্গ কেদার রায়ের অধিকারে থাকে। ওই বছর জুন মাসে রাজা মান সিহের পুত্র দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে মুঘলরা ভূষণা দুর্গ আক্রমণ করে। মুঘলদের অবরোধ চলাকালে কামানের গোলা বিস্ফোরণে দুর্গের ভেতরেই খাজা সুলাইমান নিহত এবং কেদার রায় আহত হন। বর্ণনাগুলো থেকে এটা স্পষ্ট নয় সুলাইমান মুঘল কামানের গোলায় নিহত হয়েছিলেন নাকি নিজেদের গোলা বিস্ফোরিত হয়ে নিহত হয়েছিলেন। মুঘলদের হাতে ভূষণা দুর্গের পতন ঘটে এবং আহত কেদার রায় খিজিরপুর-কত্রাভূতে ঈসা খাঁর কাছে পালিয়ে যান। ১৫৯৮ সালের শেষ দিকে মুকুন্দরামের পুত্র সত্যজিৎ রায় মুঘল সেনাপতি রাজা টোডর মলের সহায়তায় সম্পূর্ণ ভূষণা পরগণা পুনরাধিকার করেন।

চাঁদ রায়ের মৃত্যুর পর বিক্রমপুর-শ্রীপুর কার্যত কেদার রায়ের অধীনে চলে আসে। মুঘলদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কেদার রায়ের ঈসা খাঁ’র সাথে মিত্রতা প্রয়োজনীয় ছিল। তাছাড়া মুঘল আক্রমণে আহত হলে ঈসা খাঁ তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাই এই সুযোগে ঈসা খাঁ বিক্রমপুরের কিছু অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। ১৬০২ সালে রাজা মান সিংহের নেতৃত্বে মুঘলদের বিশাল বাহিনী বিক্রমপুর আক্রমণ করে কেদার রায়কে মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য করেন।

১৬০৩ সালের মার্চ মাসে আরাকানী জলদস্যুরা ঢাকার নিকটস্থ ত্রিমোহনীতে মুঘল দুর্গ আক্রমণ করে। মুঘলদের পালটা আক্রমণে আরাকানীরা পিছু হঠে তাদের জাহাজে উঠতে বাধ্য হয়। জাহাজে উঠে আরাকানীরা কামান আর মাস্কেট দিয়ে আক্রমণ করে; কিন্তু মুঘলরা পাল্টা আক্রমণে কয়েকটা আরাকানী যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে সমর্থ হয়।

মুঘলদের আক্রান্ত হতে দেখে কেদার রায় শ্রীনগরে অবস্থিত মুঘল চৌকি আক্রমণ করেন। তুমুল যুদ্ধে কেদার রায় কামানের গোলায় মারাত্মক আহত হন। অধিপতিকে আহত হতে দেখে কেদার রায়ের বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে, তিনি মুঘলদের হাতে বন্দী হন। মুমূর্ষু অবস্থায় কেদার রায়কে রাজা মান সিংহের সামনে হাজির করার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর সাথে সাথে বিক্রমপুরে ভূঁইয়াদের শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

**************************************

বিক্রমপুরের ভূঁইয়াদের উত্থান ও পতনের সাথে দেশের আরও এগারো জন ভূঁইয়ার জীবনের মিল আছে; কিন্তু কিছু বিষয়ে বিক্রমপুরের ভূঁইয়ারা, বিশেষত কেদার রায়, অন্যদের থেকে আলাদা। যেমন, পর্তুগীজদের সাথে সম্পর্ক, শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলা, ওড়িষ্যার আফগানদের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের ভাষ্য পর্যালোচনা করলে সেটা স্পষ্ট হয়। এই ভাষ্যগুলোতে কিছু অসঙ্গতিও পরিলক্ষিত হয়, এখানে তার কিছু আলোচিত হলো।

**************************************

ফাদার পিয়াহে দ্যু জাহেকি (Pierre de Jarric) তার “Histoire des choses plus memorables advenues tant ez Indes orientales, que autres païs de la descouverte des Portugois”-এ জানাচ্ছেন, ১৫৯০ সালে কেদার রায় পর্তুগীজ শাসক আন্তোনিও দে সো’জা গোজিনো (Antonio de Souza Godinho)-কে হঠিয়ে সন্দ্বীপ দখল করে সন্দ্বীপের লবণের ব্যবসায় হস্তগত করেন। তখন সন্দ্বীপ থেকে বছরে দুইশত জাহাজ লবণ বাংলায় সরবরাহ করা হতো। পিয়াহের এই কথাটিতে বিশেষ ভরসা করা যাচ্ছে না এই জন্য যে, সন্দ্বীপ বিক্রমপুর থেকে জলপথে সত্তর ক্রোশেরও বেশি দূরে বঙ্গোপসাগরের একটা দ্বীপ। এই পুরো পথটা পাড়ি দিতে হলে কেদার রায়ের নৌবহরকে পদ্মা-মেঘনা সঙ্গমের কাছাকাছি থেকে মেঘনার মোহনা অবধি অন্য অনেকগুলো রাজ্য পার হতে হবে যার মধ্যে ত্রিপুরা, চন্দ্রদ্বীপের মতো শক্তিশালী রাজ্য ছিল। এই গোটা পথজুড়ে আরাকানী আর পর্তুগীজ জলদস্যুদের যথেচ্ছ আক্রমণের ব্যাপারতো ছিলই সাথে কেদার রায়ের জাহাজগুলোর সমুদ্রে চলার উপযুক্ততা এবং তার নাবিকদের সমুদ্রে চলার ব্যাপারে দক্ষতা আবশ্যক ছিল। সুতরাং কেদার রায়ের পক্ষে সন্দ্বীপে অভিযান চালানো ও সন্দ্বীপ অধিকার করার ব্যপারে সন্দেহ পোষণ করার যথেষ্ট কারণ আছে। সম্ভবত দোমিঙ্গো নিজেই সন্দ্বীপ আক্রমণ করেছিলেন, এবং সেখানে কেদার রায়ের নৌসেনা ও অন্যান্য সাহায্য ছিল; এবং এই সাহায্যটা ছিল ১৫৮৮ সালে ঈসা খাঁ’র সাথে যুদ্ধে দোমিঙ্গো’র সহায়তার প্রতিদান।

পিয়াহে আরও জানাচ্ছেন, মুঘলরা বাংলা বিজয়ের পর কেদার রায়কে সন্দ্বীপ থেকে উৎখাত করেন এবং ১৬০২ সালে মুঘলদের হঠিয়ে দোমিঙ্গো সন্দ্বীপের একচ্ছত্র অধিপতি হন। পিয়েরের এই কথাটিতেও বিশেষ ভরসা করা যাচ্ছে না। ১৫৮২ সালে মুঘলরা বাংলাকে ১৯টি সরকার ও ৬৮২টি মহাল বা পরগণায় বিভক্ত করে। ফতেহাবাদ সরকারের অধীনে ৩১টি মহালের মধ্যে একটি মহাল ছিল সন্দ্বীপ যা সন্দ্বীপ, হাতিয়া, বামনী ও সাগরডিহী নামের চারটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। মুঘলদের এই ভাগাভাগি ছিল নিতান্তই কাগজে-কলমে — বাংলার বৃহদাংশ তখন বারো ভূঁইয়াদের শাসনাধীন, মেঘনা নদীর পূর্ব তীর পর্যন্ত মূলত ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাদের অধীন এবং চট্টগ্রাম আরাকানের ম্রাউক উ রাজাদের অধীন। চার্লস স্টুয়ার্ট তার “The History of Bengal”-এ জানাচ্ছেন,ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্তুগীজরা সন্দ্বীপ দখল করে। জোয়াকিম জোজেফি আ কাম্পোস (Joachim Joseph A. Campos) তার “History of The Portuguese in Bengal”-এ জানাচ্ছেন ১৫৩৭ সালে পর্তুগীজরা চট্টগ্রামে বসবাস ও বাণিজ্যের অনুমতি পায়।

১৬০২ সালে পর্তুগীজ সরকার ইমানুয়েল দ্যু মাতুস (Emanuel de Matos)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্দ্বীপের দায়িত্ব দিলে দোমিঙ্গোকে বাধ্য হয়ে তার সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হয়। এই সময়ে আরাকানের ম্রাউক উ রাজা মিন রাযাগি ওরফে সালিম শাহ্‌ বার বার সন্দ্বীপ আক্রমণ করে দখল করার চেষ্টা করছিলেন। যুদ্ধে পর্তুগীজরা প্রথম দিকে জয় পেলেও গোয়া, কোচি বা শ্রীলঙ্কার পর্তুগীজ কলোনীগুলো থেকে কোন সহযোগিতার ব্যবস্থা না থাকায় তারা ক্রমশ হীনবল হয়ে পড়ছিল। তাছাড়া দোমিঙ্গো ও ইমানুয়েলের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় দোমিঙ্গো কেদার রায়ের সহায়তা পাওয়ার আশায় ৩০টি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে তার কাছে আসেন; কিন্তু ততদিনে রাজা মান সিংহের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনীর আক্রমণে হেরে কেদার রায় মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করছেন। তার সামরিক শক্তি ও ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে; ফলে দোমিঙ্গোকে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়।

১৬১৫ সালে পর্তুগীজদের সাথে আরাকানের যুদ্ধ বাঁধলে পর্তুগীজ সেনাপতি ইমানুয়েল দ্যু মাতুস ২০০ জন সৈন্যসহ নিহত হন। আরাকানী আক্রমণ তীব্রতর হলে পর্তুগীজরা সন্দ্বীপ ছাড়তে থাকে এবং ১৬১৬ সালে সন্দ্বীপ পুরোপুরি আরাকানের অধিকারে আসে। আরাকানীরা ‘দিলওয়ার’ নামক একজন স্থানীয় ব্যক্তিকে সন্দ্বীপের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। দিলওয়ার আরাকানী আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে মূলত স্বাধীন অধিপতি হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপ শাসন করেন। ১৬৫৮ সালে আওরঙ্গযিব মুঘল সম্রাটের পদে অধিষ্ঠিত হবার পর বাংলায় রাজ্যের সীমানা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেন। ১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হলে চট্টগ্রাম আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। ড. মুহম্মদ আব্দুল করিম তার “বাংলাদেশের ইতিহাস — মগ বিতাড়ন ও চট্টগ্রাম জয়”-এ জানাচ্ছেন, ১৬৬৫ সালের নভেম্বরে ৩০০ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মুঘল বাহিনী চট্টগ্রাম আক্রমণ করে। এই দফা তাদের সাথে ৪০টি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে পর্তুগীজরা এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নৌসেনারা যোগ দেয়। ১৬৬৬ সালের সাতাশে জানুয়ারী আরাকানীদেরকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে মুঘলরা চট্টগ্রাম অধিকার করে। যুদ্ধে সন্দ্বীপও আক্রান্ত হয় এবং মুঘলদের কাছে পরাস্ত হয়। সন্দ্বীপের পরাজিত শাসক দিলওয়ারকে বন্দী করে ঢাকায় এনে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। দিলওয়ার কারাগারেই মারা যান অথবা কারাগারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এখান থেকে এটা স্পষ্ট যে, ১৬০২ সালে কেদার রায় বিক্রমপুর-শ্রীপুরে মুঘল বশ্যতা স্বীকার করলেও সন্দ্বীপ তখনও পর্তুগীজদের হাতেই ছিল। সুতরাং দোমিঙ্গোর পক্ষে ঐসময়ে মুঘলদের হারিয়ে সন্দ্বীপ দখলের গল্প বিশ্বাসযোগ্য নয়।

পিয়াহের বর্ণনায় আরও কিছু অসঙ্গতি লক্ষণীয়। বিক্রমপুরে বসে থেকে প্রতিনিয়ত আরাকানী আক্রমণের মুখে থাকা এবং কার্যত পর্তুগীজ দখলে থাকা সন্দ্বীপে রাজত্ব করা বা দুইশ’ জাহাজের লবণের ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। লবণের ব্যবসায়টি আসলে পর্তুগীজদের দখলেই ছিল। সপ্তদশ শতকের শুরুতে মুঘলরা যখন কেদার রায়কে বিক্রমপুর থেকে উৎখাতের চেষ্টা করছিল, সন্দ্বীপ তখনও মুঘলদের বিবেচনায় ছিল না। দোমিঙ্গো যদি ১৬০২ সালে সন্দ্বীপ থেকে মুঘলদের হঠিয়ে থাকেন তাহলে মুঘলরা তারও আগে সেখান থেকে কেদার রায়কে হঠিয়েছিল। ঐ সময়কালে কেদার রায়ের সাথে মুঘলদের যুদ্ধ চলেছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা অন্যত্র, সন্দ্বীপে নয়। বাস্তব বিবেচনা বলে, কেদার রায়ের সহযোগিতায় আন্তোনিও’কে হঠানোর পর থেকেই দোমিঙ্গো সন্দ্বীপের অধিপতি হয়ে পড়েন। জোয়াকিম জোজেফি আ কাম্পোস, ফাদার নিকোলাউ পিমেন্তা (Father Nicolau Pimenta), ফাদার পিয়াহে দ্যু জাহেকিদের মতো পর্তুগীজ ভাষ্যকারেরা আসলে দোমিঙ্গোকে আন্তোনিওকে উৎখাত করা ভ্রাতৃঘাতী হিসেবে না দেখিয়ে যুদ্ধে মুঘলদের হারানো বীর বানাবার চেষ্টায় এই প্রকার গল্প বানানোর চেষ্টা করেছেন।

**************************************

পর্তুগীজ ভিন্ন ইতিহাসের অন্য ভাষ্যকারদের বর্ণনাতেও এই সময়কালটির কথনে অসঙ্গতি লক্ষণীয়। অধ্যাপক রাধাকুমুদ মুখার্জী তার "Indian Shipping"-এ জানাচ্ছেন,হিন্দু নৌ কার্যকলাপের কেন্দ্র ছিল বর্তমান বাকেরগঞ্জ জেলার দক্ষিণ-পূর্বের শ্রীপুর, বাকলা, চন্দ্রদ্বীপ এবং চান্দিকান (সাগরদ্বীপ)। শ্রীপুরের অধিপতি ছিলেন কেদার রায়। তিনি ছিলেন নৌ বিষয়ে এক প্রতিভা কিন্তু তার সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তার নৌবাহিনী ছিল সদাপ্রস্তুত। ১৬০২ সালে তিনি মুঘলদের কাছ থেকে সন্দ্বীপ উদ্ধার করে দোমিঙ্গো কারভালোর নেতৃত্বে পর্তুগীজদের অধীনে ন্যস্ত করেন। এতে আরাকানরাজ ক্ষিপ্ত হয়ে সন্দ্বীপ দখল করতে ১৫০টি যুদ্ধজাহাজ পাঠান। কেদার রায়ও পর্তুগীজদের সাহায্যার্থে ১০০ যুদ্ধজাহাজ পাঠান। যুদ্ধে পর্তুগীজরা জয়লাভ করে ও আরাকানীদের ১৪৯টি যুদ্ধজাহাজ অধিকারে সমর্থ হয়। দ্বিতীয় দফায় আরাকানরাজ ১,০০০ যুদ্ধজাহাজ পাঠান। কিন্তু এই দফাতেও কেদার রায়ের সাহায্যে পর্তুগীজরা জয়লাভ করে। একই সময়ে কেদার রায়কে অন্য দিক থেকে মুঘল সেনাপতি মান সিংহের আক্রমণ ঠেকাতে হচ্ছিল। মান সিংহ প্রথমে ১০০ যুদ্ধজাহাজ দিয়ে মান্দা রায়কে পাঠান। কিন্তু মান্দা রায় যুদ্ধে কেদার রায়ের কাছে পরাজিত ও নিহত হন। ১৬০৪ সালে মান সিংহ দ্বিতীয় দফায় আরও শক্তিশালী আক্রমণ করে কেদার রায়কে পরাজিত করেন। কেদার রায় ৫০০ যোদ্ধা নিয়ে শ্রীনগরে মুঘল সেনাধ্যক্ষ কিলমাককে অবরুদ্ধ করেন, কিন্তু নিজে কামানের গোলার আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মুঘলদের কাছে ধরা পড়েন। আহত কেদার রায়কে মান সিংহের কাছে আনার পর পরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্থানের নাম ও অবস্থানের জন্য অধ্যাপক রাধাকুমুদ মুখার্জী ফন দে ব্রউক (Van de Brook)-এর ১৬৬০ সালের বাংলার মানচিত্রের সাহায্য নিয়েছেন; এবং তিনি বলছেন মানচিত্রে উল্লেখিত 'Carpoor Firingi'-ই কেদার রায়ের শ্রীপুর। মানচিত্রটি লক্ষ করলে শ্রীপুরের অবস্থান সঠিক সেটা বোঝা যায় যদিও মানচিত্রে প্রদর্শিত দূরত্বগুলো বাস্তাবানুগ নয়। তবে এই মানচিত্রেও শ্রীপুর বাকেরগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্বে নয়, উত্তর-পূর্বে।

রাধাকুমুদের বর্ণনাতেও ১৬০২ সালে মুঘলদের হঠিয়ে কেদার রায়ের সন্দ্বীপ জয়ের কথা বলা হয়েছে — যার বিভ্রান্তি নিয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে। এই বর্ণনাটি ভালো করে লক্ষ করলে এর ত্রুটিগুলো বোঝা যায়। প্রথম দফায় যদি ১৫০টি যুদ্ধজাহাজের ১৪৯টি শত্রুর অধিকারে যায় তাহলে বলতে হবে আরাকানীরা আদতে কোন যুদ্ধ না করে পর্তুগীজদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু আরাকানীরা প্রথম দফায় এমন বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেছিল কেন? আরাকানরাজের পক্ষে দ্বিতীয় দফায় ১,০০০ যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়তো সম্ভব, কিন্তু সন্দ্বীপের পর্তুগীজদের পক্ষে সেগুলোকে কি হারানো সম্ভব? সেক্ষেত্রে সন্দ্বীপের পর্তুগীজদের যুদ্ধজাহাজ ও কেদার রায়ের পাঠানো যুদ্ধজাহাজের সম্মিলিত নৌশক্তির আকার আরাকানীদের অনুরূপ হতে হবে যেটা বাস্তবে সম্ভব ছিল না। যদি কেদার রায়ের যদি অমন বিশাল নৌবাহিনী ও যুদ্ধজাহাজের বহর থেকেই থাকতো তাহলে তিনি বাক্‌লা, চন্দ্রদ্বীপ, ফতেহপুরের মতো ধারে কাছের রাজ্যগুলো জয়ের চেষ্টার বদলে দূরের সন্দ্বীপের দিকে হাত বাড়াতে যাবেন কেন? তাকে ডিঙিয়ে আরাকানীরা কীভাবে ঢাকা আক্রমণ করে? তিনিই বা কেন সেসময়ে আরাকানীদের সাথে হাত মেলাতে যাবেন?

আরাকানরাজের সাথে যুদ্ধের বর্ণনায় অধ্যাপক রাধাকুমুদ মুখার্জী স্যার এইচ. এম. এলিয়টের ‘The History of India’-তে বর্ণিত ইনায়েৎউল্লাহ্‌’র ‘তাকমিলা-এ-আকবরনামা’র সাহায্য নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এলিয়টের বইয়ে তাকমিলার যে অংশ উল্লেখিত আছে তাতে আরাকানরাজের ঢাকা আক্রমণের কথা আছে, সন্দ্বীপ আক্রমণের নয়। ঢাকা আক্রমণের বর্ণনাতে বলা হচ্ছে, আরাকানরাজ কৌশলে কেদার রায়কে দলে টেনে সোনারগাঁওয়ের কাছের এক দুর্গ আক্রমণ করেন। গভর্নর সুলতান কুলী খান তাকে প্রতিহত করেন। আহমাদ নামের আরেক বিদ্রোহী আরাকানরাজের সাথে নিজের বাহিনীসহ যোগ দিলে সুলতান কুলী খান তাদেরকে আবারও প্রতিহত করেন। বিদ্রোহ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় রাজা মান সিংহ ইব্রাহিম আক্‌তা, রঘু দাস ও দলপৎ রায়কে তাদের বাহিনীসহ পাঠান। সম্মিলিত মুঘল বাহিনী আরাকানরাজকে চরমভাবে পরাস্ত করে এবং তাদের ১০০ যুদ্ধজাহাজ হস্তগত করে। কেদার রায় ৫০০ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে কিলমাকের অধীনস্থ শ্রীনগর চৌকি আক্রমণ করেন। কিলমাক তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখেন। আরাকানরাজকে পরাজিত করে মুঘল বাহিনী কিলমাকের সাহায্যার্থে আসে। মুঘল বাহিনীর ব্যাপক গোলাবর্ষণে কেদার রায়ের বাহিনী পর্যদুস্থ হয় এবং কেদার রায় নিজে মারাত্মক আহত অবস্থায় ধৃত হন। তাকে রাজা মান সিংহের কাছে আনার পর পর মারা যান।

সুতরাং কেদার রায়ের সন্দ্বীপ জয়ের ব্যাপারে রাধাকুমুদ মুখার্জীর বর্ণনার তথ্যের উৎস জানা গেলো না।

**************************************

স্যার যদুনাথ সরকারের "History of Bengal"-এ বলা হচ্ছে, ১৬০৩ সালের অগাস্ট মাসে আরাকানী জলদস্যুদের একটি নৌবহর ঢাকার জলসীমায় প্রবেশ করে ত্রিমোহনীতে অবস্থিত মুঘল দুর্গ আক্রমণ করে। দুর্গাধিপতি সুলতান কুলি কালমাগের সাথে দুর্গের কাশ্মীরী সৈন্যদের বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে সুলতান কুলি আহত হলে রাতের অন্ধকারে দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে যান। আরাকানীরা প্রবল আক্রমণ করে পথিমধ্যস্থ মুঘল চৌকিগুলো দখল করে। আরাকানীদের মোকাবেলা করতে রাজা মান সিংহ একটি বাহিনী পাঠান। মুঘলরা আরাকানীদের ওপর পালটা হামলা চালিয়ে অনেক আরাকানীকে হত্যা করতে সমর্থ হয়। আরাকানীরা পিছু হঠে নিজেদের জাহাজে আশ্রয় নেয় এবং জাহাজ থেকে কামান ও মাস্কেট দিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে পালটা আক্রমণ চালাতে থাকে; কিন্তু মুঘলরা আরাকানীদের কিছু যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে সমর্থ হয়। কেদার রায় আরাকানীদের পক্ষাবলম্বন করে তার শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে শ্রীনগরে মুঘল চৌকিতে হামলা করেন। বিক্রমপুরের কাছে উভয়পক্ষের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ বাঁধে। যুদ্ধে কেদার রায়ের পক্ষের অনেক পর্তুগীজ ও বাঙালী নিহত হন, কেদার রায় নিজে আহত ও ধৃত হন। তাকে মান সিংহের কাছে আনার পর তিনি মারা যান। আরাকানীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মান সিংহ খাজা উসমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন, কিন্তু উসমান যুদ্ধ না করে পালিয়ে যান। এই সাথে বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলে মুঘলবিরোধী ভূঁইয়াদের শাসনের অবসান ঘটে। স্যার যদুনাথ কেদার রায়ের ভূষণা অভিযান সম্পর্কে বললেও তার সন্দ্বীপ অভিযান সম্পর্কে কিছু বলেননি। তিনি চাঁদ রায়কে কেদার রায়ের পুত্র হিসাবে অভিহিত করেছেন। বস্তুত তার বর্ণনায় কেদার রায় সম্পর্কে খুব বেশি কিছু নেই। সম্ভবত তিনি অন্য ভাষ্যকারদের ভাষ্যে অসঙ্গতি লক্ষ করে সেগুলো বর্জন করেছেন।

**************************************

মোটের ওপর যা জানা গেলো তাতে বোঝা যাচ্ছে, ষোড়শ শতকের শেষ ভাগ থেকে সপ্তদশ শতকের শুরু পর্যন্ত বিক্রমপুরের কেদার রায় স্বাধীন নৃপতি হিসাবে টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন। আফগান ও পর্তুগীজদের সাথে তার মিত্রতা এবং মুঘলদের সাথে তার শত্রুতা ছিল। খিজিরপুর-কত্রাভূর ভূঁইয়া ঈসা খাঁ’র সাথে তার কখনো কৌশলগত মিত্রতা থাকলেও মূলত শত্রুতাই ছিল। আরাকানীদের সাথে তার সাময়িক কৌশলগত মিত্রতা ছিল। বাংলার ভূঁইয়াদের মধ্যে তার শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল যারা অন্তত মধ্য ও দক্ষিণ বঙ্গের নৌপথের যুদ্ধে দক্ষ ছিল। মুঘলদের সাথে কেদার রায়ের আমৃত্যু লড়াই অব্যাহত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের গোলাতেই তার জীবনাবসান ঘটে। বহিরাগত মুঘলদের আগ্রাসনের বিপক্ষে ‘বাঙালী’ কেদার রায় এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, সাহসী বীর। বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে ঈসা খাঁ’র গুণগান গাইতে গাইতে ক্লান্ত ঐতিহাসিকদের মনোযোগ না পাওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ‘বাঙালী’ শাসক।

**************************************

দোহাইঃ

পুস্তক —

1. Beveridge, H; The Akbarnama of Abu’l Fazal; The Asiatic Society; Calcutta; February 2000
2. Campos, J. J. A.; History of the Portuguese in Bengal; Butterworth and Company (India) Limited; Calcutta; 1919
3. Elliot, Sir H. M.; The History of India; as told by its own Historians; Trübner and Company; London; 1875
4. Ghosh, Jamini Mohan; Magh Raiders in Bengal; Bookland Private Limited; Calcutta; 1960
5. Mookerji, Radhakumud; Indian Shipping — A History of the Sea-borne Trade and Maritime activity of the Indians from the earliest time; Longmans, Green and Company; Bombay; 1912
6. Sarkar, Sir Jadunath; The History of Bengal; B R Publishing Corporation; Delhi; 2003
7. Stewart; Charles; The History of Bengal: From the First Mohammedan Invasion until the Virtual Conquest of that Country by the English AD 1757; Cambridge University Press; March 28, 2013
8. করিম, ড.মুহম্মদ আব্দুল; বাংলাদেশের ইতিহাস — মগ বিতাড়ন ও চট্টগ্রাম জয়; জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশ

অভিসন্দর্ভ —

1. Galen, Stephan Egbert Arie Van; Arakan and Bengal: the rise and decline of the Mrauk U Kingdom (Burma) from the fifteenth to the seventeenth century AD; Research school CNWS, Faculty of Arts, Leiden University; March 13, 2008
2. Khondker, Kamrun Nessa; Mughal River Forts in Bangladesh (1575-1688) — An Archaeological Appraisal; School of History; Archaeology and Religion; Cardiff University; December 2012

নিবন্ধ —

1. Subrahmanyam, Sanjay; Notes on the sixteenth century Bengal trade; Indian Economic & Social History Review; 24; 3; 1987

মানচিত্র —

1. 1660 Van de Brook’s map
2. 1776 Rennell - Dury wall map of Bihar and Bengal, India


মন্তব্য

মন মাঝি এর ছবি

চলুক

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

তথ্য বহুল রচনার জন্য ধন্যবাদ! কেদার রায় সম্পর্কে বাংলাদেশে প্রচলিত একাডেমিক ইতিহাস বইগুলি থেকে খুব বেশী কিছু জানার উপায় নেই!

বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে ঈসা খাঁ’র গুণগান গাইতে গাইতে ক্লান্ত ঐতিহাসিকদের

মুসলমান হওয়ার এই হল উপকারিতা!

বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে মুঘল বিরোধিতায় ঈসা খাঁ’র বিশেষত্ব কী? ঈসা খাঁ’র প্রতি অতিমনোযোগ কি কেবল বাংলাদেশের ঐতিহাসিকদের মধ্যেই দেখা যায়, নাকি পশ্চিমবঙ্গ এবং পশ্চিমের ঐতিহাসিকদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়?

Emran

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ঈসা খাঁ'র ওপরে এতো আলো পড়ার কারণ কী? আমার ধারণা অনুযায়ী -
১। কররাণী আমল থেকে দক্ষ সেনাপতি হিসাবে খ্যাতি
২। কররাণীদের কাছ থেকে অন্য ভূঁইয়াদের ওপর মাতব্বরী করার লাইসেন্স, যদিও বড় ভূঁইয়ারা তার থোড়াই পরওয়া করতেন
৩। রাজ্যের সাইজ বড়
৪। নিয়মিতভাবে অন্য ভূঁইয়াদের রাজ্য আক্রমণ
৫। মান সিংহের সাথে ঐতিহাসিক ডুয়েল

বারো ভূঁইয়া নিয়ে সাহেবরা দূরে থাক, মুঘল আমলের অন্য ভাষ্যকারদের কথাবার্তাও কম। আমার এই কথা বলার ভিত্তি ইংলিশে লেখা বই পড়ে। ফারসী জানলে কথাটা আরও জোর দিয়ে বলতে পারতাম, অথবা উলটো কথাটা বলতাম।

ইতিহাস রচনায় গুরুত্ব দেবার ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিভাজন এবং ভাষ্যকারের দৃষ্টিভঙ্গী অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাস বইগুলোতে খড়্গ, রাত, দেব (হিন্দু), দেব (বৌদ্ধ) রাজবংশের কোন কথা নেই। আরও কথা নেই ম্রাউক উ, কাচারী বা ত্রিপুরা রাজদের আগ্রাসণের কথা।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সত্যপীর এর ছবি

ভেরি গুড!

এইবার হিরু প্রতাপাদিত্য নিয়া লেখেন। তিনিও ফাইট দিছিলেন মোগলের সাথে কিন্তু আসলে নাকি সেই ফাইট খাতির জমাইতে না পারার বেদনার সাইড এফেক্ট। খোলাসা কইরা লেখেন চা নিয়া বসলাম।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে লেখার চান্স কম। আমি বারো ভূঁইয়া আসলে কারা সেটা নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছি। 'আকবরনামেহ্‌' অনুযায়ী ঈসা খাঁ পর্যায়ের বারো ভূঁইয়ারা (১২+১) হচ্ছেন -
১। ঈসা খাঁ
২। ইবরাহিম নরল
৩। করিমদাদ মুসাজাই
৪। দিলওয়ার মজলিশ
৫। প্রতাপ মজলিশ
৬। কেদার রায়
৭। শের খাঁ
৮। বাহাদুর গাজী
৯। তিলা গাজী
১০। চাঁদ গাজী
১১। সুলতান গাজী
১২। সেলিম গাজী
১৩। কাসিম গাজী

আরেক সোর্স বলছে -
১। ঈসা খাঁ
২। প্রতাপাদিত্য
৩। চাঁদ রায়-কেদার রায়
৪। কন্দর্প রায়-রামচন্দ্র রায়
৫। লক্ষ্মণমাণিক্য
৬। মুকুন্দরাম রায়
৭। ফজল গাজী
৮। হামীর মল্ল
৯। কংস নারায়ণ
১০। রামকৃষ্ণ
১১। পীতাম্বর-নীলম্বর
১২। ঈসা খান লোহানী

দুই তালিকাতে কেবল ঈসা খাঁ আর কেদার রায় কমন। কিন্তু বাকিদের কাউকে আমি বাদ দেবার যৌক্তিকতা দেখি না। তার মানে ১৫৯৯ সালের আগেই ভূঁইয়ার সংখ্যা ২৩! এদিকে 'বাহারিস্তান-ই-গায়েবী' বলছে পোস্ট ঈসা খাঁ আমলে, অর্থাৎ তৎপুত্র মুসা খাঁ'র আমলে বারো ভূঁইয়া হচ্ছেন এনারা -

১। মুসা খাঁ
২। আলাউল খাঁ
৩। আবদুল্লাহ খাঁ
৪। মাহমুদ খাঁ
৫। বাহাদুর গাজী
৬। সোনা গাজী
৭। আনোয়ার গাজী
৮। শেখ পীর
৯। মির্জা মুনিম
১০। মাধব রায়
১১। বিনোদ রায়
১২। পাহলওয়ান
১৩ হাজী শামসুদ্দীন বাগদাদী

এই ১৩ জন নতুন কাস্ট। তার মানে দুই সময়ে মিলিয়ে ভূঁইয়ার সংখ্যা ৩৬, সরকারের সংখ্যা কমপক্ষে ২৩; যদিও মুঘলদের ডিমার্কেশন অনুযায়ী সরকারের সংখ্যা ১৯ হবার কথা। এখন এই দাদখানি চাল, মসুরের ডালের হিসাব মিলাই কী করে!

একটা অসমর্থিত সূত্র বলছে মুসা খাঁ'র আমলের ভূঁইয়া মাহমুদ খাঁ (উপরের তৃতীয় তালিকার চতুর্থ জন) নাকি এসেছিলেন রাশিয়ার আস্ত্রাখান থেকে। আইসক্রীম দে ভেনিয়া কাশকিনকে!! এই তথ্য কোথা থেকে যাচাই করি?!?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

এক লহমা এর ছবি

চাঁদ রায়-কেদার রায় - ঈসা খাঁ - স্বর্ণময়ী দেবী ওরফে সোনা বিবি --> আমাদের কৈশোরে যাত্রা-পালার জনপ্রিয় বিষয় ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য তেমন কিছু জানতাম না। ভাল লাগল এই তথ্যগুলি জেনে। আর ভূঁইয়াদের নিয়ে আপনার মূল্যায়ন ও যথার্থ মনে হয়েছে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ঈসা খাঁ - স্বর্ণময়ী দেবী সংক্রান্ত গল্পটা নাটক আকারে বাংলাদেশ বেতারে (তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ) শুনেছিলাম সেই বাহারিস্তান-ই-গায়েবী আমলে। গল্পটাকে তখনই ইসমাইল হোসেন সিরাজীর 'রায়নন্দিনী' বা শেখ ইদ্রিস আলীর 'বঙ্কিমদুহিতা' টাইপ গল্প বলে মনে হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দুর্গেশনন্দিনী'কে কাউন্টার করে লেখা উক্ত দুই উপন্যাসের সাহিত্যমূল্য যেমন দুর্গেশনন্দিনীর সাহিত্যমূল্যের তুলনায় প্রায় শূন্য, ঐ রেডিও নাটকটার সাহিত্যমূল্যও পরম বিবেচনায় প্রায় শূন্য ছিল। পতিত সামরিক স্বৈরাচারের আমলের সরকারি বেতারের নাটক প্রপাগান্ডামূলক হলে মানায়, কিন্তু ইতিহাসকে তা হলে কি আর চলে!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

ইসমাইল হোসেন সিরাজীর 'রায়নন্দিনী' বা শেখ ইদ্রিস আলীর 'বঙ্কিমদুহিতা' টাইপ গল্প বলে মনে হয়েছিল।

ইসমাইল হোসেন সিরাজী এবং শেখ ইদ্রিস আলী অন্ততঃ উপন্যাসের নামকরণের ক্ষেত্রে আরেকটু বেশী সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারতেন!

Emran

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

উনারা তো সৃজনশীল রচনার উদ্দেশ্যে উপন্যাস লেখেননি, দুর্গেশনন্দিনীকে কাউন্টার করার জন্য লিখেছেন। সুতরাং সৃজনশীলতা প্রদর্শনের কোন দায় উনাদের ছিল না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

১.
ইতিহাসের তথ্যসুত্রসমূহের পারস্পরিক অসঙ্গতির কারণে এদেশে ত্রুটিমুক্ত কোন ঐতিহাসিক পুস্তক রচনা অসম্ভব বলে আমার স্থির বিশ্বাস। লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিকদের মধ্যেই যে রকম তথ্যবিরোধ দেখা যায় তা দেখে নবীন লেখকের পক্ষে সেই বিষয়ে লিখতে চাওয়াকে ধৃষ্ঠতা মনে হয়। চট্টগ্রামের ইতিহাস বিষয়ে ছোট একটি কাজ করতে গিয়েই এমন হাঁসফাস অবস্থায় পড়েছি যে কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে- ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। সত্যি বলতে কি কোন ইতিহাস পুস্তকে 'হয়তো', 'সম্ভবত' এসব শব্দ যদি বিপুল পরিমানে ব্যবহার করতে হয় সে পুস্তক পাঠকের পক্ষে সহজপাচ্য হয় না। অথচ সেটা না করে একদম সহি করে কিছু বলার উপায় নেই। সব ইতিহাস লেখককেই পূর্বতন কোন কোন কোন বইয়ের সুত্র ব্যবহার করতে হয়। সেই সুত্রগুলো যে শুদ্ধ ছিল তার কোন নিশ্চয়তা নেই। একদম প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ নিলেও দেখা যায় তার ঐতিহাসিক পক্ষপাত সেখানে নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে চার্লস স্টুয়ার্টকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধরা হয়, চার্লস স্টুয়ার্টের মূল সুত্র আবার রিয়াজ উস সালাতিন। রিয়াজের গোলাম হোসেন আবার ইংরেজপুস্ট লেখক, সুতরাং সেই ইতিহাসে ইংরেজদের স্বার্থবিরোধী কিছু থাকবে না বলে ধারণা করা যায়। একইভাবে মোগল আমলে লিখিত সব ঐতিহাসিক কোন না কোন রাজরাজড়ার সাথে জড়িত ছিলেন অর্থাৎ রাজার অর্থপুষ্ট হয়ে ইতিহাস লিখেছেন। সম্ভবত মির্জা নাথানের বাহারিস্তান বোধহয় তার একটু ব্যতিক্রম। যদিও তাঁর পিতাও একজন রাজ আমাত্য ছিলেন। ইতিহাস সুত্রের এসব পক্ষপাতের কারণে পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকদের মধ্যেও বিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুখময় মুখোপাধ্যায় কিংবা আবদুল করিমের মতো ঐতিহাসিকগন একই বিষয় নিয়ে বিভিন্নমুখী মতামত দিয়েছেন। ফলে আমরা যারা শখের ইতিহাস পাঠক, তারা খুব সহজে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। সেই ইতিহাস থেকে জ্ঞান চর্বন করতে গিয়ে গলায় কাঁটার আঘাতে বারবার থেমে যেতে হয়।

মনোবেদনাটা দীর্ঘ হয়ে গেল। ক্ষোভ জমে ছিল একটু। আপনার সূচনার অংশটুকু পড়ে ঝেড়ে নিলাম খানিক। আপনি যে সকল তথ্যবিভ্রাটের কথা উল্লেখ করেছেন, আমি নিজেও তার কিছুটা ভুক্তভোগী কিনা।

২.
১৬১৫ সালে আরাকান-পর্তুগীজ যুদ্ধের সময় দ্য মাতোস জীবিত ছিল কিনা আমি নিশ্চিত নই। দেয়াঙ দুর্গ অধিকার নিয়ে যে যুদ্ধ হয়েছিল ১৬০৩ সালে তাতে সে মারাত্মক আহত হয়েছিল বলে পড়েছিলাম। তাছাড়া ১৬১৫ সালে সন্দ্বীপ ছিল গনজালেসের অধীনে। কার্ভালহোর মৃত্যুর পর গনজালেস সন্দ্বীপ অধিকার করেছিল আরাকানীদের কাছ থেকে। ১৬১৭ সালে আরাকানীদের হাতে চুড়ান্ত পরাজয়ের আগ পর্যন্ত সেই ছিল সর্বেসর্বা।

৩.
এখানে একটা তথ্যের বিষয়ে আবদার করি। ডোমিঙ্গো কার্ভালহোর মৃত্যু হয়েছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে। কিন্তু ঘটনাটির বিস্তারিত পাইনি কোথাও। আপনার যদি ঘটনাটি কোথাও পড়া হয়ে থাকে, তাহলে একটু লিখতে পারেন।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

১।
আমি মূলত বাংলার ইতিহাসের ব্যাপারে আগ্রহী। এই ব্যাপারে আকর গ্রন্থ খুব কম। বাংলা আর ইংলিশ ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানি না বলে অন্য ভাষায় লেখা ভাষ্যগুলো জানতে পারি না। বেশির ভাগ ভাষ্যের উৎস খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত যেখানে পৌঁছানো যায় সেটার সত্যতা নিয়ে বিশেষ ভরসা করা যায় না। মীর্জা নাথান নিজে মুঘল সেনাপতি ছিলেন এবং বারো ভূঁইয়াদের কারো কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধে অধিনায়কত্বও করেছেন। এমন মানুষ ইতিহাসের ভাষ্যকার হলে সেই ভাষ্যে কতটুকু কী সত্য থাকবে সেটা বোধগম্য।

প্রাপ্ত সকল ভাষ্যের একটা বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এখানে নিম্নবর্গের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন বা তাদের ভাষ্য উঠে আসেনি।

এই লেখাটা লেখার সময় আমার বার বার মনে হয়েছে আপনার সাহায্যপ্রার্থী হই। পরে ভাবলাম আমার বোঝা আমি নিজেই টানি। ভুলভ্রান্তি কিছু থাকলে সেটা লেখা প্রকাশিত হলে আপনার চোখে পড়বে - তখন সংশোধন করে নেয়া যাবে।

২।
সন্দ্বীপে ১৬০২ থেকে ১৬১৬ সাল পর্যন্ত পর্তুগীজদের শাসন আসলে এক প্রকার দ্বৈত শাসন - পর্তুগীজ সরকারের প্রতিনিধি ইমানুয়েল আর ডাকাতদের প্রতিনিধি দোমিঙ্গো অথবা সেবাস্টিয়ান। সুতরাং ১৬১৫ সালের যুদ্ধে ইমানুয়েল মারা যাওয়ার যে বিবরণ পড়েছি সেটা সত্য হতে পারে। দোমিঙ্গো মারা যাবার পর থেকে সেবাস্টিয়ান সন্দ্বীপে তার ক্ষমতা সংহত করতে থাকে। ১৬০৭ এর দিকেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে আসে।

৩।
কেদার রায়ের বিষয়ে পড়তে গেলে অবধারিতভাবে দোমিঙ্গোর প্রসঙ্গ চলে আসবে। দোমিঙ্গোর দক্ষিণবঙ্গ বা যশোহর অভিযান সম্পর্কে অল্পস্বল্প পড়েছি এবং তা মাথায় নেইনি। বিষয়টি নিয়ে লিখতে গেলে আমাকে এই গন্ধমাদন আবার ঘাঁটতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

প্রাপ্ত সকল ভাষ্যের একটা বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এখানে নিম্নবর্গের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন বা তাদের ভাষ্য উঠে আসেনি।

ইতিহাসে কখনোই নিন্মবর্গের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকে না। তাই সামাজিক বিবর্তনের অনেক কিছুই আমাদের জানা হয় না। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে যুক্ত ঘটনা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের কথা যা কিছু মেলে সেটা পুঁথিপত্রেই সীমাবদ্ধ। পুঁথিপত্র সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা ছিল না বলে কালের বিবর্তন, ঝড়বাদল কিংবা উইপোকার হাত থেকে যা রক্ষা পেয়েছে তা খুব অল্প। অতীতের বিশাল অংশ আমাদের কাছে অন্ধকারই থেকে যাবে।

পর্তুগীজ সরকারের প্রতিনিধি ইমানুয়েল আর ডাকাতদের প্রতিনিধি দোমিঙ্গো অথবা সেবাস্টিয়ান।

এখানে একটু তথ্যযোগ করি। চট্টগ্রাম এলাকার সব পর্তুগীজই তখন ডাকাত ছিল। সরকারীভাবে গোয়া ছাড়া আর কেউ স্বীকৃত ছিল না। তবে পর্তুগীজ রাজার স্বীকৃতি একবারই এসেছিল। সন্দ্বীপ দখলে কেদার রায়ের সেই যুদ্ধে। ক্যাম্পোসের বিবরণ অনুযায়ী - কেদার রায়ের নৌ বাহিনীর একজন সেনাপতি ছিল ডোমিঙ্গো কার্ভালহো। কার্ভালহো কেদার রায়ের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সন্দ্বীপ দখল করে নিলেও সন্দ্বীপের স্থানীয় অধিবাসীরা কার্ভালহোর আধিপত্য মেনে নিল না। তাদেরকে ঠেকানোর জন্য কার্ভালহো চট্টগ্রামের পর্তুগীজদের সাহায্য কামনা করেছিল। তখন চট্টগ্রাম থেকে ম্যানুয়েল দ্য মেটোসকে সন্দ্বীপ পাঠানো হয় ৪০০ সৈন্যের এক বাহিনী দিয়ে। সেই বাহিনী কঠোরভাবে স্থানীয় প্রতিরোধ গুড়িয়ে সন্দ্বীপ দখল করে নিল। । এই অর্জনকে সম্মানিত করা হয়েছেল পর্তুগাল রাজার পক্ষ থেকে। সন্দ্বীপের উপর এই কতৃত্ব অর্জনের জন্য পর্তুগালের রাজার কাছ থেকে কার্ভালহো আর মেটোসকে বিশেষ সম্মাননা Order of Christ প্রদান করা হয়েছিল। এটা ১৬০২ সালের ঘটনা। এখান থেকেই সন্দ্বীপে পর্তুগীজদের আধিপত্য বিস্তার শুরু। তবে শুরু থেকেই সন্দ্বীপের এই পর্তুগীজদের উপর গোয়ার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

সপ্তদশ শতকের শুরুতে বঙ্গোপসাগর এলাকার পর্তুগীজদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ডোমিঙ্গো, তারপর ১৬০৯ থেকে গনজালেস। মাতোস ভদ্রলোকই ছিল এদের তুলনায়। গনজালেসের শেষ পরিণতিটা যেন স্পষ্ট না, একাধিক মত পাওয়া গেছে তার ব্যাপারে। তবে ডোমিঙ্গোর মৃত্যুটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল। সে কারণে ওটার খোঁজ করছিলাম।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

অতীতের সবকিছু আমরা জানতে পারবো না সে কথা সত্য। তবে অনেক কিছু জানা সম্ভব। ইতিহাসের 'স্পনসরড ভাষ্য' থেকে 'বিটুইন দ্য লাইন' পড়ে কিছু বোঝা যায়, লোক সাহিত্য থেকে কিছু সত্য বোঝা যায়। আর নতুন ভাষ্যকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোন থেকে দেখা শুরু করলে অনেক আবর্জনা দূর হয়ে যাবে।

দোমিঙ্গো, ইমানুয়েল আর সেবাস্টিয়ানকে নিয়ে আপনার সংযোজন সঠিক। বাংলার পর্তুগীজদের নিয়ে স্থানীয় ভাষ্যকারদের রচনা প্রায় বিরল। যা কিছু আছে তা বিচ্ছিন্ন, এবং তার উৎস মূলত পর্তুগীজদের লেখা। দক্ষিণবঙ্গ আর উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে দেড়শ' বছরের বেশি সময় ধরে চলা পর্তুগীজদের আনাগোনা, দুঃশাসন, লুটপাট, অত্যাচার, গণহত্যা নিয়ে সত্যগুলো তাই চাপা পড়ে আছে। স্থানীয়দের সাথে পর্তুগীজদের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা জনগোষ্ঠী (তপন রায়চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী 'কালা ফিরিঙ্গী' আর 'রোমাই কার্তিক') নিয়েও আমরা পুরোপুরি অজ্ঞ।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

Sohel Lehos এর ছবি

আমি আসলে নীরব পাঠক। পড়ি কিন্তু কমেন্ট করা হয় না। আপনার তথ্যবহুল লেখা অনেক ভাল লেগেছে তাই মন্তব্য না করে পারলাম না চলুক

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পড়া আর মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ সোহেল। আপনার গল্পও আমার ভালো লাগে, তাই সেটাও জানানোর চেষ্টা করি।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA