সন্তানের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক হোন!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: শনি, ২৬/০২/২০২২ - ১২:২৫পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আপনার সন্তানের বয়স নূন্যতম ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত আইনত সে শিশু হিসাবে গণ্য হবে। ১৮ বছরের পরেও যদি তার মানসিক বিকাশ যথাযথ না হয়ে থাকে তাহলে তাকে শিশু হিসাবে গণ্য করুন। আপনার সন্তান যতদিন পর্যন্ত শিশু থাকছে ততদিন পর্যন্ত এইসব বিষয়ে সতর্ক থাকুন। এখানে ‘ব্যক্তি’, ‘মানুষ’, ‘কেউ’, ‘আত্মীয়’, ‘অনাত্মীয়’, ‘বন্ধু’ ইত্যাদি বলতে পুরুষ এবং নারী উভয়কে বোঝানো হচ্ছে। শিশুদেরকে যৌন হয়রানী ও নির্যাতন কেবল পুরুষেরাই নয়, নারীরাও করে থাকে।

1. কোন ব্যক্তির সাথে আপনার সম্পর্ক যাই হোক না কেন আপনার সন্তানকে (ছেলে বা মেয়ে) তার কোলে বসতে দেবেন না। তিনি নিকটাত্মীয় হলেও নয়, কোন যানবাহনে যাতায়ত করার কালেও নয়। তাদের দ্বারা শিশুদেরকে জোরে চাপাচাপি করা, টেপাটেপি করা, মুখমণ্ডলে চুমু খাওয়া, গায়ে গা ঘষাও প্রতিহত করুন। এইসব ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবেন না।

2. আপনার সন্তানের বয়স ২ (দুই) বছরের বেশি হলে তার সামনে পোশাক পাল্টানো এড়িয়ে চলুন। কথাটা নারী ও পুরুষ অভিভাবক, উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। সন্তানের সাথে একসঙ্গে স্নান করাও এড়িয়ে চলুন। তারমানে এই নয় যে আপনি আপনার স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ করা বন্ধ করে দেবেন; বরং সন্তানের সামনে সঠিকভাবে দেখান যে আপনারা পরস্পরকে আসলেই ভালোবাসেন, পরস্পরের ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করেন, এবং আপনারা একে অন্যের প্রতি যত্নশীল।

3. যে কোনো বয়সী কাউকে কখনো আপনার সন্তানকে তার বউ/স্ত্রী অথবা জামাই/বর/স্বামী হিসাবে উল্লেখ করতে দেবেন না। পরিহাসের ছলেও এটি করতে দেবেন না। শুরু থেকে খুব শক্ত হাতে এটি প্রতিরোধ করুন। আমাদের সংস্কৃতিতে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা দেখানোর বিষয় থাকায় অনেক মা-বাবা এটি নিষেধ করতে পারেন না। বাস্তবে মানুষ তাঁর আচরণ ও কর্মের কারণে শ্রদ্ধার যোগ্য হন, বয়সের কারণে নয়। নিজের সন্তানের ভালোর কথা ভেবে ভুল চর্চ্চাকে প্রশ্রয় দেবেন না। আপনি এসব বিষয়ে কঠোর হোন, তাতে আপনার সন্তান উপকৃত হবে।

4. শিশুদের মাঝে যৌনানন্দের অনুভূতি ২ (দুই) বছর বা কাছাকাছি সময় থেকে শুরু হতে পারে। এই সময় তাদের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করলে তাদের এক ধরনের ভালো লাগে — যদিও শিশুরা বুঝতে পারে না যে সেটা আসলে যৌন অনুভূতি। এটি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রবৃত্তি, কিন্তু কোনোরূপে এটি যেন বিকৃতভাবে বিকশিত না হয়, এবং কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ যেন এর সুযোগ গ্রহন করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

5. আপনার সন্তান যখন অন্যদের সাথে খেলতে যায়, এমনকি যখন নিজের ভাইবোনের সাথেও খেলে তখন তারা কী ধরনের খেলা খেলে সেটা সতর্কতার সাথে লক্ষ করুন। অল্পবয়সীদের মধ্যেও জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে অন্য শিশুকে যৌন নির্যাতন করার ঘটনা ঘটে থাকে — এটি নতুন কিছু নয়। এটি ছেলে বা মেয়ে উভয় শিশুর জন্য সত্যি।

6. অনেকের বাসায় প্রাপ্তবয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহসহায়তাকারী (ছেলে বা মেয়ে) কাজ করে থাকে। তাদের কেউ যদি আপনাকে জানায় যে আপনার সন্তান, ভাই/বোন, স্বামী/স্ত্রী, পিতা/মাতা বা অন্য কোনো আত্মীয় (পুরুষ বা নারী), বন্ধু, প্রতিবেশী বা অপরিচিত ব্যক্তি তাদের প্রতি যৌন আচরণ করছে তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখুন। বিষয়টি ঐ পর্যায়েই নির্মূল করার জন্য যৌনঅসদাচারণকারী ব্যক্তিকে শাসন করুন, সতর্ক করুন। উক্ত ব্যক্তির সাথে আপনার সম্পর্ক যাই হোক না কেন এই ব্যাপারে কোনো নমনীয়তা দেখাবেন না, কোনো ছাড় দেবেন না।

7. অনেকেই প্রাপ্তবয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহসহায়তাকারীদের (ছেলে বা মেয়ে) দিয়ে গা-হাত-পা টেপান, মাথা-পিঠ চুলকান, মালিশ করান। এগুলো আসলে এক প্রকারের যৌন নিপীড়ন। এই প্রকার আচরণ থেকে বিরত থাকুন। পরিবারের অন্য কাউকে দিয়েও এসব কাজ করাবেন না।

8. অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহসহায়তাকারী (ছেলে বা মেয়ে) বা আপনার নিজের শিশু সন্তানকে (ছেলে বা মেয়ে) দোকানে, বাজারে, কোনো আত্মীয়ের বাসায় বা দূরে কোথাও একা একা পাঠাবেন না।

9. আপনার সন্তানকে কোনো ‘বেবিসিটার’, আত্মীয় বা প্রতিবেশীর-এর কাছে রাখতে বাধ্য হলে খুব সতর্কতার সাথে জানার চেষ্টা করুন সেখানে সে কারো দ্বারা যৌন বা অন্য কোনো প্রকারের হয়রানীর শিকার হচ্ছে কিনা। একই কথা আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা আপনার সন্তানটির জন্যও প্রযোজ্য।

10. বয়স্ক পুরুষ বা নারী কর্তৃক পুরুষ শিশুর প্যান্ট খুলে ফেলা, তার ব্যক্তিগত অঙ্গসমূহ (private parts) হাতানো বা ঘষা, খৎনা (circumcision) না করা শিশুর লিঙ্গের অগ্রত্বক (foreskin) জোর করে উলটে দেয়া, তার সাথে পায়ুকাম (anal sex) করা, তাকে দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অঙ্গসমূহ হাতানো বা ঘষা, তাকে দিয়ে মুখকাম (oral sex) করানো বা তারটা করা এমনসব ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটে থাকে কিন্তু আমরা এগুলো নিয়ে কথা বলি না। সাধারণত এগুলো নিয়ে অভিভাবককে অভিযোগ করলে উলটো মার খেতে হয়, অপমানিত হতে হয়, অপদস্থ (bullied) হতে হয়। বয়স্ক নারীদের দ্বারা পুরুষ শিশুকে 'আমারে বিয়া করবি?' বা 'আমার জামাই' ইত্যাদি বলে হেনস্থা করাটা মোটামুটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। অথচ এসবের প্রত্যেকটি জঘন্য যৌন হয়রানী ও অপরাধ। এসব অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করুন। মনে রাখবেন আপনার নারী শিশুটির মতো আপনার পুরুষ শিশুটিও ধর্ষকামী মানুষের সহজ শিকার। তাকে সমানভাবে রক্ষা করুন।

11. আপনার কাছের কোনো আত্মীয় যদি আপনার সন্তানকে জন্মাতেও দেখে থাকেন, তারমানে এই নয় তার কাছে আপনার সন্তান নিরাপদে থাকবে। আপনার সন্তানকে এমন কারো কাছে নিয়ে যাবেন না যার সাথে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এমন কেউ আপনার বাসায় আসলে আপনার সন্তানকে তার কাছে যেতে জোর করবেন না। আপনার সন্তান কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিশেষ ভক্ত হয়ে উঠছে কিনা সেটি লক্ষ রাখুন, এবং এই ব্যাপারে সতর্ক হোন। আপনাদের অগোচরে তারা কী বিষয় নিয়ে আলাপ করে এবং কী করে সেটি জানার চেষ্টা করুন। যেহেতু আমাদের সমাজে বিবাহ-বহির্ভূত শারিরীক সম্পর্ক মারাত্মক অপরাধ বলে গণ্য হয় তাই সুযোগের অভাবে বিষমকামীদের মধ্যেও কখনো কখনো সমকাম চর্চ্চার ব্যাপার ঘটে থাকে। বিষমকামী নারী বা পুরুষদের মধ্যে অনিয়মিত বা হঠাৎ দুয়েকবার সমকাম চর্চ্চা ঘটতে পারে। এই কারণে শিশুরা সমলিঙ্গের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে নিরাপদ নাও হতে পারে।

12. ধর্ম বা অন্য যে কোনো বিষয়ের গৃহশিক্ষকদের কাছে আপনার সন্তানকে একা ঘরে পড়তে পাঠাবেন না। খোলা জায়গায় বা খাবার ঘরে পড়ানোর ব্যবস্থা করুন।

13. বিদ্যালয়ের বড়ো ভাই বা বোনেরা হঠাৎ করে আপনার সন্তানের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হলে, বেশি মেলামেশা বা ঘোরাঘুরি করলে, রাতে একঘরে ঘুমাতে চাইলে এসব বিষয়ে সতর্ক হোন।

14. আপনার হাসিখুশি চঞ্চল সন্তানটি যদি হঠাৎ করে লাজুক হয়ে পড়ে, বা নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়, বা অকারণে ভয় পেতে শুরু করে তাহলে খুব সতর্কতা আর ধৈর্য্যের সাথে তার পেছনের কারণটি জানার চেষ্টা করুন। তার সাথে সহৃদয়তা ও নম্রতার সাথে আলোচনা করে আস্তে আস্তে জানুন কী হয়েছিল? তার কীসের ভয় বা লজ্জা। জানার পর সেই ব্যাপারে তাকে অভয় দিন এবং এমন ব্যবস্থা গ্রহন করুন যাতে ভবিষ্যতে তাকে কখনো অনুরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। এই বিষয়টি কোনোভাবে উপেক্ষা করবেন না।

15. আমাদের দেশে যৌননিপীড়নের শিকার হওয়া শিশুদের অভিভাবকেরা তাদেরকে কপাল খারাপ, অশুচি, বিয়ে হবেনা, মেয়েলী ছেলে ইত্যাদি কথা বলে থাকেন। যৌননিপীড়নের শিকার শিশুকে এটা বোঝান যে এটি একটি দুর্ঘটনা। তাকে এটি ভুলে আর সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হবে এবং জীবনে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে সেই সাথে সতর্ক হতে হবে যেন ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।

16. আপনার সন্তানকে এটি বোঝান যে সবসময় দুঃসাহস দেখানো বোকামী। যে বিষয়ের সম্ভাব্য পরিণতি খারাপ হতে পারে তা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

17. লক্ষ রাখুন আপনার সন্তান কারো দ্বারা মানসিক চাপ বা ব্ল্যাকমেইলিং-এর শিকার হচ্ছে কিনা। এমন কিছু সন্দেহ করলে তার সাথে সহৃদয়তা ও নম্রতার সাথে মিশে সত্যটি জানার চেষ্টা করুন এবং তাকে বিপদটি থেকে বের হয়ে আসতে সহায়তা করুন।

18. আপনার সন্তান হঠাৎ করে নির্জীব, ঘুমকাতুরে, নির্জনতাপ্রিয় হয়ে পড়ছে কিনা লক্ষ করুন। এগুলো মাদকাসক্তিজনিত কারণে হতে পারে।

19. যাতায়তের ব্যয়, খাবার-পানীয় কেনা, অন্যান্য ছোটখাট কেনাকাটা ইত্যাদির প্রয়োজনে আপনার সন্তানকে অতিরিক্ত নয়, যৌক্তিক পরিমাণে টাকা দিন। দিন শেষ তার কাছ থেকে ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিন। এটি আপনার সন্তানের মধ্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা তৈরি করবে, সেইসাথে ভুল পথে ব্যয়ের প্রবণতা হ্রাস করবে। পরিকল্পনা করে, সঠিকভাবে ব্যয় করা শেখানোর পাশাপাশি তাকে সঞ্চয়ের ব্যাপারে আগ্রহী ও অভ্যস্থ করে তুলুন। ছোটবেলা থেকে সঞ্চয়ের অভ্যাস আপনার সন্তানকে পরবর্তী জীবনে অনেক বিপদের হাত থেক্বে রক্ষা করবে।

20. আপনার সন্তান হঠাৎ করে বেশি টাকা খরচ করলে, অথবা টাকার জন্য অসদুপায় অবলম্বন করলে, অথবা মিথ্যা অজুহাতে টাকা চাইলে সতর্ক হোন। এটি মাদকাসক্তি বা জঙ্গীবাদে সম্পৃক্ততাজনিত কারণে হতে পারে।

21. আপনার সন্তানটি হঠাৎ করে ব্যাপক ধর্মকর্ম করা শুরু করলে এবং এই ব্যাপারে সবার সাথে কঠোর আচরণ শুরু করলে, অথবা আপনার অপরিচিত লোকজনের সাথে মেলামেশা শুরু করলে সতর্ক হোন। এটি জঙ্গীবাদে সম্পৃক্ততাজনিত কারণে হতে পারে।

22. আপনার সন্তানকে বয়ঃসন্ধি, শারিরীক ও মানসিক পরিবর্তন এবং যৌনতার বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দিন এবং এই ব্যাপারে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে তা জানান। তার আগে আপনি নিজে যৌনতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিন। বিয়ে করে সন্তান উৎপাদন করলেই যৌনতা সম্পর্কে তাবৎ জ্ঞান লাভ হয়ে যায় না। যৌন বিষয়ক বাজার চলতি বই পড়লে, অথবা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত যৌনাত্মক চলচ্চিত্র দেখলে যৌনতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ও অদ্ভুত ধারণা সৃষ্টি হয় কিন্তু জ্ঞান অর্জিত হয় না। এই ব্যাপারে নিজে যথাযথ শিক্ষা গ্রহন করুন এবং সন্তানকে শিক্ষা দিন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে চিন্তা করুন যৌনতা বিষয়ে আপনার সন্তানের কী কী জ্ঞান থাকা উচিত। এই কাজটি যদি আপনি না করেন তাহলে সে অন্যের কাছ থেকে ভুল ও বিকৃত শিক্ষা পেতে পারে। আপনার সঙ্কোচ বা লজ্জা আপনার সন্তানের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

23. আপনার সন্তানকে (ছেলে বা মেয়ে) ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন সম্পর্কে ধারণা দিন এবং কী করে নিজেকে ধর্ষিত হওয়া থেকে বা যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করা যাবে তা শিক্ষা দিন।

24. কাউকে যৌন নির্যাতন করা বা যৌন হয়রানী করা কতোটা জঘন্য ও হীন অপরাধ আপনার সন্তানকে, বিশেষত পুত্রকে সেই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিন। আপনার পুত্রকে এটা শেখান যে নারী নির্যাতন করা, কাউকে ধর্ষণ করা, ইভটিজিং করা, শিশুদেরকে যৌন হয়রানী করা, যে কোনো বয়সী কাউকে শারিরীক বা মানসিকভাবে আঘাত করা, অশ্লীল গালাগালি করা পৌরুষের পরিচয় নয়। বরং এসবে বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটাকে পৌরুষ বলা যেতে পারে।

25. আপনার সন্তানকে কোনো বই, ছবি, গান, চলচ্চিত্র, কার্টু্‌ন, ভিডিও গেমস ইত্যাদি দেবার আগে নিজে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন সেটি তার বয়সের উপযুক্ত কিনা। প্রয়োজনে তাকে ঐ সম্পর্কে সঠিক বিষয়টি অবগত করুন।

26. আপনার বাসায় যে সকল ডিভাইসে ইন্টারনেট বা কেবল টেলিভিশন চলে সেসবের যেগুলো আপনার সন্তানও ব্যবহার করে থাকে সেগুলোর ব্যাপারে লক্ষ রাখুন যেন এমন কোনো কিছু আপনার সন্তানের সামনে উপস্থাপিত না হয় যা তার জন্য উপযুক্ত নয়। আপনার সন্তান যেসব বাসায় নিয়মিত যাতায়ত করে সেসব বাসার অভিভাবকদেরকেও এই ব্যাপারে সতর্ক করুন।

27. আপনার সন্তানকে ‘ভালো স্পর্শ’ ও ‘খারাপ স্পর্শ’র ব্যাপারে শেখান। কেউ তাকে খারাপ স্পর্শ করলে সেটার প্রতিবাদ করতে এবং অবিলম্বে আপনাকে জানাতে শেখান। এই ব্যাপারে তাকে গালমন্দ না করে বরং তার সৎসাহসের জন্য বাহবা দিন।

28. আপনার সন্তানের বয়স ৩ (তিন) বছর হয়ে গেলে তাকে নিজে নিজে শৌচ করতে, স্নান করতে, নিজের শরীর মুছতে এবং পোশাক পাল্টাতে শেখান। এসব ব্যাপারে যা যা সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন তা শেখান। অন্য কেউ তাকে এসব কাজ করে দিতে গেলে তা বাধা দিতে এবং সেই ব্যাপারে আপনাকে জানাতে শেখান।

29. আপনার সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, অথবা আপনার সন্তান পছন্দ করছে না বা ভয় পাচ্ছে এমন যে কোন দ্রব্য, ছবি, শব্দ বা সঙ্গীত, চলচ্চিত্র বা কার্টুন, আবহ, আত্মীয় বা অনাত্মীয় ব্যক্তির কাছ থেকে তাকে দূরে রাখুন। আপনার বাসায় এমন কোনো কিছু থাকলে তা যত মূল্যবান হোক তা দূর করে দিন। অমন ব্যক্তি আপনার যত ঘনিষ্ঠ হোক আপনার সন্তানকে তার সামনে যেতে দেবেন না।

30. আপনার সন্তান একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করলে চুপ করে থাকবেন না বা তা উপেক্ষা করবেন না। বিষয়টি ভালোভাবে জানুন এবং এই ব্যাপারে সঠিক পদক্ষেপ নিন। কোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তথাকথিত সম্মান রক্ষার্থে আপনার সন্তানকে মিথ্যুক বলবেন না বা তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবেন না।

31. বিদ্যালয়ে, প্রাইভেট শিক্ষকের বাসায়, কোচিং সেন্টারে, নাচ-গানের স্কুলে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষালয়ে আপনার সন্তান যেতে না চাইলে তাকে শাসন না করে বরং জিজ্ঞেস করে জানুন আসলে কী কারণে সে সেখানে যেতে চাইছে না।

32. আপনার শিশুকে ক্রীড়া, শরীরচর্চ্চা, মার্শাল আর্ট, সৃজনশীল কাজ, সমাজ সেবা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত করুন, উৎসাহিত করুন। তাকে মুক্ত চিন্তার, মানবিক, উদার এবং প্রগ্রতিশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলুন। তাহলে সে ভবিষ্যতে অনেক বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে।

33. অনেকে পুরুষদের দৃষ্টি ফেরাতে তাদের নারী শিশুকে চুল ছোট করে কেটে, ছেলেদের পোশাক পরিয়ে ‘টম বয়’ বানিয়ে রাখেন। বাস্তবে এটা কোনো কাজে দেয় না, বরং নারী শিশুকে ‘টম বয়’ বানালে সে ধর্ষকামী নারীদের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশে কেউ (নারী বা পুরুষ) কোনো নারী কর্তৃক ধর্ষণ বা যৌন হয়রানীর শিকার হলেও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবার সরাসরি উপায় নেই। কারণ, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র একজন পুরুষকে ধর্ষণকারী বা যৌন হয়রানীকারী ব্যক্তি হিসাবে অভিযুক্ত করা যাবে।

34. আপনার শিশুকে কোন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীর সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে দেবেন না। ৫(পাঁচ) বছরের বেশি বয়সী শিশুকে নিজ ভাইবোনের সাথেও এক বিছানায় ঘুমাতে দেবেন না। সমলিঙ্গের মানুষ হলেই তার সাথে এক বিছানায় ঘুমানো নিরাপদ - বাস্তবে এমনটা নাও হতে পারে। যেহেতু আমাদের সমাজে একজন মানুষ প্রকাশ্যে সমকামী বা উভয়কামী হিসাবে জীবন কাটাতে পারে না তাই তাদেরকে বিপরীত লিঙ্গের একজনকে বিবাহ করে সংসার করতে হয়। এই মানুষগুলো সুযোগ পেলে নিজের পছন্দের সমলিঙ্গের মানুষের সাথে শারিরীক ও মানসিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে থাকে। এদের মধ্যে যারা ধর্ষকামী তারা সমলিঙ্গের অল্পবয়সী বা দুর্বল কাউকে ধর্ষণের বা যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করে থাকে। লুক্কায়িত সমকামী বা উভয়কামী আত্মীয়ের সাথে শিশুকে এক বিছানায় ঘুমাতে দিলে তাদের ধর্ষিত হবার বা যৌন নিপীড়নের শিকার হবার সম্ভাবনা আছে।

35. আপনার সন্তান সামাজিক মাধ্যম (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, রীল, টিকটক ইত্যাদি) ও যোগাযোগ মাধ্যমে (মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, স্ন্যাপচ্যাট ইত্যাদি) কী করছে তা লক্ষ রাখুন। সেখানে সে কাদের সাথে মিশছে সেটা জানার চেষ্টা করুন। এসব মাধ্যমের বিপদগুলো সম্পর্কে তাকে সতর্ক করুন। বিশেষ করে ছবি, ভিডিও শেয়ার করা এবং চ্যাট করার ক্ষেত্রে সতর্কতা গ্রহন না করলে কী কী বিপদ হতে পারে তা তাকে জানান। এসব ব্যাপারে দেশের বিদ্যমান আইন কতোটা কঠিন সেই সম্পর্কেও তাকে সতর্ক করুন।

36. আপনার সন্তান ইউটিউব, টিকটক ইত্যাদির মাধ্যমে রাতারাতি বিখ্যাত হবার চেষ্টায় ঝুঁকিপূর্ণ, বিপদজনক, অসামাজিক, বেআইনী, অসংবেদনশীল বা অমানবিক কোন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে কিনা তা লক্ষ রাখুন। এসকল ক্ষেত্রে লোভের ফাঁদে পড়া কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা তাকে বোঝান। আপনার সন্তান কখনোই যেন মজা করে, বা নিজের জন্য, বা বন্ধুদের জন্য, বা প্রেমিক/প্রেমিকার জন্য নিজের নগ্ন ছবি বা ভিডিও না তোলে অথবা কাউকে তুলতে না দেয় সে ব্যাপারে খুব ভালোভাবে সতর্ক করুন। এই সতর্কতা আপনার সন্তানকে এবং আপনাকে ব্ল্যাকমেইলিং-এর শিকার হওয়া, সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়া, আইনী জটিলতায় পড়া, এবং মানসিকভাবে ধ্বসে পড়া থেকে রক্ষা করবে।

মনে রাখবেন, আমরা যেমন মাতা-পিতা, আমাদের সন্তান যাদেরকে আমরা বড় করছি তারাও তেমন ভবিষ্যতে মাতা-পিতা হবে। সুতরাং তাদেরকে সতর্কতার সাথে বড় করতে হবে। সন্তানকে বড় করা কেবল মাতা বা কেবল পিতার একার দায়িত্ব নয়, এই ব্যাপারে উভয়কে সক্রিয়ভাবে, সহৃদয়তার সাথে অংশ নিতে হবে। মনে রাখবেন মানসিক ক্ষতি একটি স্থায়ী ব্যাপার যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। নিজের সন্তানের কোনো মানসিক ক্ষতি হবার সুযোগ দেবেন না।

দোহাইঃ
‘Time For Learning’-এর ৪ঠা জানুয়ারি, ২০২২-এর ফেসবুক পোস্ট পড়ার পর সেটি বাংলায় অনুবাদ করার তাগিদ অনুভব করি। বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে অনুভব করি লেখাটি আমাদের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া যেমন প্রয়োজন তেমন আমাদের সমাজের বাস্তবতায় আরও কিছু বিষয় যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। ফলে তাদের লেখা ১২ পয়েন্টের পোস্ট এখানে ৩৬ পয়েন্টের পোস্ট হয়ে গেল।

মূল পোস্টের সন্ধান দেয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি পয়েন্ট ধরে আলোচনা করা, দফায় দফায় এই পোস্টটি সম্পাদনা করা, পয়েন্ট সংযোজন-বিয়োজন করে ঠিকঠাক করার কাজটি করেছেন সচল বর্ষা। আমার হিসাবে তিনি এই পোস্টের সহলেখকও বটে, কিন্তু তাঁর আপত্তির মুখে এখানে লেখক হিসাবে তাঁর নাম উল্লেখ করা গেলো না।


মন্তব্য

নৈ ছৈ এর ছবি

অত্যন্ত কাজের লেখা। শিশুকালে যৌন নিপিড়নের শিকার হওয়ার কারণে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি আমি খুবই গুরুত্বের সাথে দেখি। মেয়ে শিশুরাই শুধু নয়, আমরা ভুলে যাই যে ছেলে শিশুরাও পুরুষ এবং নারী উভয়ের দ্বারাই যৌন নিপিড়নের শিকার হয়। দুই নম্বর পয়েন্টের সাথে পুরোপুরি একমত নই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের মা আমাদের সামনে নি:সংকোচে পোশাক পরিবর্তন করতেন দেখে হয়তো তার ছেলের নারী দেহের প্রতি কোন বিশেষ বা অযচিৎ উৎসাহ বা আকর্ষণ তৈরী হয়নি। তাছাড়া ইউরোপের অনেক দেশেই সৈকতে বা পুলে সাঁতার কেটে সন্তানকে সাথে নিয়ে অন্য মানুষের মধ্যে স্নান করা এবং সন্তানের সামনে পোশাক পাল্টানোর চল দেখেছি।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বিস্তারিত মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

দুই নাম্বার পয়েন্টের ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যাঃ মা-বাবা সন্তানের সামনে পোশাক পাল্টালে বাচ্চাদের মনে এমন একটা ধারণা তৈরি হতে পারে যে, যে কারো সামনে পোশাক পালটানো যায়। এতে সে নিজে যেমন অন্য যে কারো সামনে পোশাক পাল্টাতে পারে (যা তার নিজের ক্ষতির কারণ হতে পারে) অথবা সে অন্যের পোশাক পাল্টানোর সময় হাজির হতে পারে (যা অন্যের বিরক্তি/ক্রোধের কারণ হতে পারে) ।

অন্য দেশ/মহাদেশে চর্চ্চিত বিষয় আমাদের দেশে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। এখানে সাংস্কৃতিক ব্যবধান আছে। শিক্ষা ও অন্যান্য বিষয়ের কথা আর নাই বা বলি। পশ্চিমে লকার রুমে সবাই (সমলিঙ্গের মানুষ) সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পোশাক পাল্টান - এটা খারাপ কিছু নয়, আবার প্রয়োজনীয় কিছুও নয়। আমাদের দেশে লকার রুমে সবাই (সমলিঙ্গের মানুষ) নূন্যতম পোশাকের আড়াল রেখে অথবা পর্দার আড়ালে পোশাক পালতান - এটা খারাপ কিছু নয়, আবার অপ্রয়োজনীয় কিছুও নয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

অনেক দেরিতে পড়লাম লেখাটা।

খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সম্ভব হলে আমার চেনা পরিচিত প্রতিটি পরিবারে একটি করে ছাপিয়ে দিয়ে আসবো। মুখে অনেক কথা বলা হয় না আমাদের, লিখিত থাকায় সুবিধা হলো। বিশ ত্রিশ বছর আগের বাস্তবতায় শিশুদের জন্য বিপদ থাকলেও বর্তমান সময়ের মতো এতটা নাজুক ছিল না। এর প্রধান কারণ ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির উন্নতি। আগে যেসব খারাপ কাজ কানে শুনে ছেলেপেলে নষ্ট হতো, এখন তার প্রত্যক্ষদর্শী ওরা। ডিভাইসের প্রতি শিশুদের আসক্তি এই অবস্থাকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। শিশু মনস্তত্ব বুঝতে অনেক পরিবারকেই অসচেতন দেখেছি। বড়দের অসচেতনতাই বিপদকে ডেকে আনে। শিশুদের সঙ্গত নয় এমন অনেক বিষয়ে উৎসাহ দিতে দেখি বড়দের। খুব তুচ্ছ অজুহাতে শিশুদের হাতে ডিভাইস তুলে দেয় বাবা মা। তারপর তারা সেখানে কী কী করছে তার ওপর নজর দেয়ার প্রয়োজনও মনে করে না। যখন নেশাটা প্রবল হয়ে ওঠে তখন বিপদ থামাতে গিয়ে দেখে খেলা হাতছাড়া হয়ে গেছে।

আমি সবাইকে একটি পরামর্শই দেই। প্রতিটি বাবা মার উচিত শিশুদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা। যাতে যে কোন ধরণের অসঙ্গতি নিপীড়নের ব্যাপার তারা নিশ্চিন্তে বাবা মাকে বলতে পারে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।