বুলগেরিয়ার গল্প-০৬

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: শনি, ২৫/০৭/২০২০ - ১১:১৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইব্রিয়াম-আলী

ইব্রিয়াম-আলী যে সত্যিকারের মানুষ ছিল এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই! হ্যাঁ, সে ডাকাত ছিল, কিন্তু সেই সাথে একজন চমৎকার মানুষও ছিল বটে। ইব্রিয়াম তার দস্যু নাম, আসল নাম আলী। কেউ কেউ দুটোকে মিলিয়ে ইব্রিয়াম-আলী বলত। আমার সাথে আলীর ভালো সম্পর্ক ছিল। আমাদের মোটামুটি নিয়মিত দেখা হতো, কথা হতো। সে সাধারণত আমাকে তার ভেড়ার খোঁয়ারে ডাকত, রুটি নিয়ে আসত। আমি তাকে যত দেখতাম, ততই মুগ্ধ হতাম। তাকে মনে হতো যেন একটা লড়াইয়ের মোরগ। সে গুঁড়ি মেরে এমন নিঃশব্দে আসত যে কেউ তাকে ডিঙ্গিয়ে গেলেও টের পেত না। এমনকি কুকুরগুলো পর্যন্ত তার ঘ্রাণ পেত না। দেলিসিভকো তার বাড়ি পাহারা দেবার জন্য চারজনকে রেখেছিল, কিন্তু আলী ঠিকই তার আঙিনায় ঢুকে, শোবার ঘরে বেয়ে ওঠে যায়। তারপর চুলার গনগনে লাল গরম লোহার তেঠ্যাঙা তার মাথায় চেপে ধরে। পাহারার লোকগুলো একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারেনি। এই ব্যর্থতার জন্য দেলিসিভকো তাদেরকে শিকল দিয়ে বেঁধে তার দোনলা বন্দুক দিয়ে গুলি করে মারে। আমি আলীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা কেমন করে করলে যে কুকুরগুলো পর্যন্ত টের পেলো না’?
‘আমি পাঁঠার বিচি বেটে সারা গায়ে লাগিয়ে নিয়েছিলাম। এতে অন্য সব গন্ধ মরে যায়’।

সে কি সত্য কথা বলেছিল নাকি আমার সাথে মজা করেছিল তা বলতে পারব না, কারণ কথাগুলো বলার সময় সে একটুও হাসেনি। সে যে কখন মজা করছে আর কখন করছে না সেটা কেউই বলতে পারত না। সব সময় তার অভিব্যক্তি একই রকমের ভাবলেশহীন থাকত। কেবল একবার তার অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ দেখেছিলাম – যেদিন সে প্রথম বারের মত ধরা পড়ে। সেদিন আলীর মাকে জোর করা হচ্ছিল যেন সে দেলিসিভকোর পাওনা টাকা নিয়ে তার বাড়িতে যায়। আলীর মা সেটা করতে অস্বীকার করায় রাখাল ফান্দুকলি তার বেণী চেপে ধরে ঘুষি মারে। সেখানে আলীও ছিল, তবে হাত-পা বাঁধা ছিল। সেই অবস্থাতেই সে এক ঝটকায় তিনজন পুলিশকে মাটিতে ফেলে দেয় আর হাঁটুর এক ধাক্কায় রাখালকে ঘরের আরেক কোণে পাঠিয়ে দেয়। লোকে বলে, আলীকে থানায় নিয়ে যাবার পর রাখাল নাকি খড়ের মুঠোয় আগুন দিয়ে তার গলা পুড়িয়ে দিয়েছিল আর চ্যালা কাঠ দিয়ে পিটিয়ে তার পা ভেঙে দেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এতসব কিছু কীসের জন্য? মোটে দশ তুর্কী লিরার জন্য!

আলী ছিল দেলিসিভকোর খামারে্র কামলা। একদিন দেলিসিভকো বলল, আলী নাকি তার দশ লিরা চুরি করেছে। পুলিশ আলীকে থানাতে নিয়ে পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে নিয়েছিল। শুধু পেটানো না, তিন সপ্তাহ ধরে আলীকে এক থানা থেকে আরেক থানায় চালান করেছে। একদিন নদীর পাড়ি দিয়ে আরেক থানাতে নেবার সময় সাথের পাহারাদারকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে আলী পাহাড়ে পালিয়ে যায়।

আলীকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবার পরে আবিষ্কৃত হয় আসলে দেলিসিভকোর বড় ছেলে মারিন টাকাটা চুরি করে শুঁড়িখানার গায়িকাকে নিয়ে পালিয়েছে। টাকা ফুরালে মারিন বাড়ি ফিরে এসে সব ঘটনা জানার পর মরদের মতো বাপের কাছে গিয়ে স্বীকার করে – আসলে সেই টাকাটা চুরি করেছিল। আলী তখনো থানায় আটক। দেলিসিভকো যে অমার্জনীয় ভুলটা করল সেটা হচ্ছে আলীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে তার কাছে মাফ চাইবার বদলে মারিনকে বললো চুপ করে থাকতে।

আলীর প্রথম শিকার ছিল রাখাল ফান্দুকলি, যে তার পা ভাঙতে চেয়েছিল। আলী তাকে ভেড়া চরানোর সময় ধরে মেরে ফেলল। আলী লিখতে জানত না বলে কাঠুরেকে দিয়ে একটা চিঠি লেখালো, ‘কেবল অপেক্ষা করো’। লেখার নিচে নিজের আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে একটা ক্রস চিহ্ন এঁকে চিঠিটা দেলিসিভকোকে পাঠাল। এই চিঠির মানে কী দেলিসিভকো সেটা ঠিকই বুঝেছিল। কিন্তু সে ধনী মানুষ, প্রভাবশালী লোকজনের সাথে তার ওঠাবসা তাই আলীকে খুঁজে বের করতে গোটা পুলিশ বাহিনীকে লাগিয়ে দিল। পুলিশ যখন আলীকে খুঁজে পেল না, তখন তার মাকে ধরে নিয়ে আসল। তারা আলীর মাকে যথেচ্ছ নির্যাতন করল, কিন্তু তার মুখ থেকে আলীর খোঁজ সম্পর্কে কোন কথাই বের করতে পারল না। অত্যাচারের চোটে এক পর্যায়ে সে মারা গেল। যদি আলীর মাকে তারা মেরে না ফেলত তাহলে আলী হয়তো দেলিসিভকোর সাথে একটা রফাতে পৌঁছাত। আলীর মা মারা যাওয়ায় দুনিয়ার সাথে আলীর সম্পর্কের শেষ সুতোটা ছিঁড়ে গেল। আলী নেকড়ের মতো বন্য, বেপরোয়া হয়ে উঠল। সে দেভিসিভকোর শস্যের গোলায় আগুন দিল, ভেড়ার খোঁয়াড় পুড়িয়ে ফেলল, রাখালদেরকে পেটালো আর তার পনীর বানানোর কারখানাটা ধ্বংস করে দিল, এবং দেভিসিভকোর দুইশ ভেড়া নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তুরস্কে চলে গেল। এর পর থেকে সে প্রায়ই সীমান্তের অপর পার থেকে এসে লুটপাট করত, কিন্তু গরিবের কিছু কেড়ে নিত না। তার কারণে রাস্তাঘাটে চলাচল আর নিরাপদ রইল না। সরকারের কর্তারা হতবুদ্ধি হয়ে গেল কী করবে সেটা ভেবে। শেষে আলীর মাথার মূল্য পাঁচ হাজার বুলগেরিয়ান লেভ বলে ঘোষণা করা হল। সেই আমলে পাঁচ হাজার লেভ অনেক টাকা।

সরকারের পুরস্কারের সাথে দেলিসিভকো আরও এক হাজার লেভ যোগ করল। এর পরেও কেউ আলীকে ধরার সাহস দেখাল না। কিন্তু কারাকাচানি টাকার লোভে পড়ে প্রতারণা করে আলীকে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করল। আলী তার চাল ধরে ফেললে তাকে ছুরি দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করে পিঁপড়ের গাদায় ফেলে দিল। পিঁপড়েরা কারাকাচানিকে জ্যান্ত খেয়ে ফেলল। এক পর্যায়ে আলীকে খাবার দেবার অপরাধে আমাকেও দায়ী করা হল। সে যখন পাহাড়ে আমার গলায় ছুরি ঠেকিয়ে রুটি দাবি করেছিল তখন আমার কিইবা করার ছিল! হয় আমাকে তার কথা শুনতে হতো, অথবা মরতে হতো। তাছাড়া আমরা তো জানি যে সে আসলে দস্যু না, দেভিসিভকো তার এই অবস্থা করেছে।

আলীর গানের গলা ছিল চমৎকার! আলী যে গান গাইত আর কেউই তার মত করে সেই গান গাইতে পারত না, বিশেষ করে ‘রুফিঙ্কা অসুখে পড়ে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে’ গানটা। এই গানটা সে যখন খোলা গলায় গেয়ে উঠত তখন তার দরাজ গলা মাঠে আর চারণভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত। কাস্তে ফেলে দিয়ে কিষানরা ফসল কাটা আর ঘেসুড়েরা ঘাস কাটা বন্ধ করে দিত যেন গানটা ঠিকঠাক শোনা যায়। সেই গান শুনে অনেকের হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত, তাদের মধ্যে একজন ছিল কোযলুকের জিঙ্কোর মেয়ে ফাত্‌মা। ফাত্‌মা আলীর বউ হতে রাজী ছিল, কিন্তু তার বাবা কামলার সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজী ছিল না। ফাত্‌মা আলীর সাথে পালিয়ে যেতেও রাজী ছিল। এমনকি তারা কবে কোথা থেকে একসাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে সেটাও ঠিক করে ফেলেছিল। কিন্তু বিধি বাম! আলীর কপালে কালো চোখের তুষার-ধবল ফর্সা ফাত্‌মার বদলে পুলিশের পিটুনি ছিল।

আলী এভাবে দস্যু হয়ে গেল। পুলিশ আর দেলিসিভকোর লোকজন তাকে খুঁজতে পাহাড়ের প্রত্যেকটা ঘাস আর খড় চষে ফেলেছিল। এমন দৌড়ের ওপর থেকেও সে গান ভোলেনি। লোকে তাকে বিরান পাহাড়ের ঢালে গান গাইতে শুনত। বেলিৎসার বনরক্ষক দাবি করল, সে একদিন আলীর গানের পিছু নিয়ে তাকে জখম করেছিল। হয়ত মেরেই ফেলেছিল। প্রমাণস্বরূপ বনরক্ষক রক্তের দাগ লাগানো, নীল পুঁতি বসানো একটা চামড়ার ব্যাগ দেখিয়েছিল যার ভেতরে ত্রিশটা নেপোলিয়নের সোনার মোহর ছিল। আলীর কখনো অমন ব্যাগ নিয়ে ঘোরার কথা না, যদি না তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে থাকে। যাই হোক, লোকে বনরক্ষকের কথা বিশ্বাস করেছিল। বুড়ো শেয়াল দেলিসিভকোও সেকথা বিশ্বাস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। প্রতিশ্রুতি মত সে প্রধান বনরক্ষককে এক হাজার লেভ পুরস্কার দিয়ে শান্তিতে জীবন যাপন করতে লাগল। সে আবার বাইরে বের হতে লাগল, গীর্জায় যাওয়া শুরু করল, লম্বা ফারের কোট পরে গ্রামের সরাইখানায় হাজির হতে লাগল, এবং কামলাদেরকে আগের মত এমনভাবে বকাঝকা শুরু করল যেন কিছুই হয়নি। যেহেতু কোন মেষপালক বা কাঠুরে আলীকে আর দেখতে পায়নি তাই সবাই একটু একটু করে বিশ্বাস করতে লাগল সে সত্যি সত্যি জখম হয়ে মারা গেছে।

সবকিছু এভাবেই যাচ্ছিল, তবু এক সকালে শোনা গেল আগের রাতে আলীকে দেলিসিভকোর বাড়িতে দেখা গেছে। সেখানে সে যে কী করেছে তার কিছুই জানা গেল না। দেলিসিভকোকে সে আঘাত করেছিল বলে মনে হয় না। কারণ এর সপ্তাহ দুয়েক পরে আমি স্বচক্ষে দেলিসিভকোকে তার উঠোনে সোজা হয়ে হাঁটতে দেখেছি। একটু খোঁড়াচ্ছিল না, গোঁঙাচ্ছিল না, কাতরাচ্ছিল না, কিন্তু মাটি থেকে চোখ সরাচ্ছিল না, আর আগের মতো চেঁচিয়ে গালাগাল করছিল না। এক মাস ধরে দেলিসিভকো তিনজন পাহারাদার নিয়ে একটা ঘরে বন্দী থাকল। দুইজন পাহারাদার নজর রাখত আর একজন পালা করে ঘুমাতো, কিন্তু পুরোটা সময় জুড়ে সে নিজে এক ফোঁটাও ঘুমাল না। তার চোখ একটু লেগে আসলে আবার ধরমর করে জেগে উঠত। সে বিছানা থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে হামা দিতে দিতে কেঁদে কেঁদে বলতে,
‘ঐ তো সে! ঐ যে আসছে’!
পরিচারকরা বলত, ‘কেউ নেই হুজুর! কেউ আসছে না’!
তবু সে বলতেই থাকত, ‘ঐ তো সে! ঐ যে আসছে’!
এক সন্ধ্যায় দেলিসিভকো পরিচারকদের এক মুহূর্তের জন্য ঘরের বাইরে যেতে বলল যেন পরনের কাপড় পালটাতে পারে। যখন তারা ঘরে ফিরে আসল, দেখলে সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

দেলিসিভকোর অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হবার সপ্তাহখানেক পরে এক বড়সড় রাহাজানির ঘটনা ঘটে যাতে ইব্রিয়াম-আলী দ্বিতীয় বারের মত আহত হয়। পাদ্রী বাসিলের ছেলে কেচো সেখানে ছিল। আমি তার মুখ থেকে ঘটনাটা শুনি। কেচো আরও জনা দশেক গরুর ব্যাপারী কারামুশিৎসার হাটে যাচ্ছিল। তারা কারাকৌলাসে পৌঁছাতে পানি পানের জন্য থামে। এমন সময় লাল স্কার্ফ দিয়ে মুখঢাকা দুজন হাজির হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
‘হাত তোলো! নড়লেই মরবে’!
তাদের একজনের হাতে পিস্তল আরেক জনের হাতে গ্রেনেড। পিস্তল হাতের জন স্বয়ং আলী, সে হুকুম দিল,
‘সবাই পিছু হঠো, আর টাকাপয়সা যা আছে সব আমার পায়ের কাছে ছুঁড়ে মারো। এগুলো গরিবের টাকা। তাদের গরু-ছাগল নিয়ে যে সামান্য টাকা তাদেরকে দাও তা আসলে ডাকাতি ছাড়া কিছু না’!
প্রথমে দুজন ব্যাপারী পিছু হঠলো, তার পর আরও তিনজন। কিন্তু ছয় নম্বর ব্যাপারী তার টাকার গেঁজে বের করার বদলে একটা লম্বা ছুরি বের করে আলীর উপরে লাফিয়ে পড়ল। দুজনের মধ্যে মরণপণ লড়াই শুরু হয়ে গেল, কিন্তু বাকিরা তাতে জড়ানোর কোন চেষ্টা করল না। গরুর ব্যাপারীরা গ্রেনেডের ভয়ে আগালো না, আর গ্রেনেডধারী ব্যাপারীদের ভয়ে। সুতরাং সবাই অপেক্ষা করতে লাগল কখন ঐ দুজনের একজন মরে। ব্যাপারী ছুরির এক পোঁচে আলীর কোমরের বেল্ট কেটে দিতে আলী গ্রেনেডধারীর দিকে চেঁচিয়ে বলল,
‘ছুঁড়ে মার! আরে আমি মরলেও ছুঁড়ে মার’!
লোকটা আলীদের দুজনের দিকে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারল। বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া কেটে যেতে দেখা গেল ব্যাপারী মরে পড়ে আছে আর আলী খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল একটা স্প্লিন্টার তার উরুতে লেগেছে।

এর দিন দশেক পরে আমি যখন সেই স্প্লিন্টারের ক্ষত দেখতে পাই তাতে বেশ ঘাবড়ে যাই। সেদিন আমি ভেড়ার দুধ দুইয়ে সেগুলোকে রাতের জন্য খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে, আমার রাতের খাবারের জন্য দুধ জ্বাল দিতে দিয়ে কুঁড়েঘরের বাইরে বসেছিলাম। এমন সময় কে যেন আমায় ডাকলঃ
‘বেচু-উ-উ-উ’!
আমি উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালাম – কেউ নেই! ভাবলাম, নিশ্চয়ই কানে ভুল শুনেছি। আমি চুলার পাশে গিয়ে বসতে না বসতে আবার শুনলামঃ
‘বেচু’!
আমি ঘরের ভেতর ঢুকে দেখলাম যদি কেউ সেখানে লুকিয়ে থাকে। না, কেউ নেই সেখানে। আমি আবার চারপাশে তাকালাম – তখনো চারপাশ অন্ধকার হয়নি – তবু কাউকে দেখতে পেলাম না। ভেড়াগুলো যথারীতি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাহারা কুকুরগুলো চারপাশের দুনিয়ার ব্যাপারে নির্বিকার ভঙ্গীতে খাপড়া থেকে খাবার চাটছে। বলতে লজ্জা নেই, আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। এমন সময় আমার মাথার উপরে খচরমচর একটা শব্দ হল এবং মোটামুটি অদৃশ্য থেকে ইব্রিয়াম-আলী আমার সামনে লাফিয়ে পড়ল। তার কোমরে পেতলের বাকল্‌ওয়ালা চওড়া চামড়ার বেল্টে দুই তিনটা ছুরি গোঁজা, মাথায় বুননো টুপি, একজোড়া হলদে বাদামী পাকানো গোঁফ ঠোঁটের দুপাশ থেকে ঝুলে প্রায় থুতনী ছুঁয়েছে। তার কাঁধ থেকে একটা ছোট শিকল দিয়ে পিস্তল ঝোলানো আর কোমরে রিভলবার গোঁজা। সে আগের চেয়ে শুকিয়ে গেছে, আর মুখ পুড়ে বাদামী হয়ে গেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি একটু লাফিয়ে উঠলাম। তাকে সম্ভাষণ করার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
‘তোমাকে মনে হয় একটু ঘাবড়ে দিয়েছি’, আলী বলল।
‘তোমার কী মনে হয়, আকাশ থেকে কেউ লাফিয়ে নামলে লোকে ঘাবড়াবে না’!
‘তুমি কি পাইন গাছকে আকাশ বলছ! তুমি যখন দুধ জ্বাল দেবার জন্য চুলায় আগুন দিচ্ছিলে তখন কি দেখতে পাওনি আমি পাইন গাছের উপরে’?
আমার প্রায় জীভের ডগায় এসে গিয়েছিল যে, আমি তো ভেড়া চরাই, তোমার মতো ডাকাত না, গাছের ডগায় খোঁজ করা আমার কাজ না। কিন্তু সেটা না বলে চুপ করে থাকলাম।
‘আমাকে একটু দুধ দিতে পারো’?
আমি তাকে এক জগ দুধ দিলাম। সে আমার দিকে পিস্তল তাক করে বলল,
‘আমার জন্য একটা মর্দ্দা ভেড়া ধর’।
‘ঠিক আছে দিচ্ছি, এর জন্য তোমাকে আমার দিকে ওটা তাক করতে হবে না’।
‘এটা তোমার ভালোর জন্য করা। কারণ, কাল সন্ধ্যায় তুমি যখন গ্রামের সরাইখানায় যাবে তখন এটা বলতে পারবে যে আমি তোমাকে ভেড়াটা দেবার জন্য জোর করেছিলাম। নয়তো ওরা আমাকে সাহায্য করার জন্য তোমাআকে দায়ী করবে। আমার জন্য তোমার বিপদে পড়ার কোন মানে নেই’।

রাতে আমরা ভেড়াটা দিয়ে কাবাব বানালাম, মর্দ্দা আর মাদী ভেড়ার নানা বিষয়ে আলাপ করলাম। সে আমাকে ভেড়ার ঘণ্টার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল, কোথা থেকে কিনি, কোনটা ভালো বাজে ইত্যাদি। এক পর্যায়ে সে আমাকে উপদেশ দেয়া শুরু করল, কোন কোন ঘণ্টা পালটানো দরকার, কোনটার আওয়াজ অন্যগুলোর সাথে মেলে না, কোনটা একটু হাতুড়ি পিটিয়ে ঠিক করা দরকার এমনসব। যখন পাইন গাছে লুকিয়ে ছিল তখন নাকি সে সবগুলো ঘণ্টার আওয়াজ শুনে শুনে বুঝেছে ঠিকঠাক আওয়াজের জন্য কোনটাকে কী করতে হবে।
‘তোমার আসলে দুটো নতুন ঘণ্টা দরকার – একটা গম্ভীর খাদের পড়া ‘ডং’ আওয়াজের জন্য আরেকটা এক ফোঁটা রূপো দেয়া আনন্দের ‘টিং’ আওয়াজের জন্য। ঐ দুটোর আওয়াজ একটা আরেকটার সাথে মিলে মাতিয়ে তুলবে। একই সাথে সেটা একটা কাজের কাজও করবে। আমি যদি বিপদে পড়ি তাহলে বড় মর্দ্দা ভেড়াটার গলায় বড় ঘণ্টাটা বেঁধে তার পেটে বিছুটি পাতা ঘষে দেবে। এতে সে জোরে জোরে পেট ঘষতে থাকবে আর তার ঘণ্টার আওয়াজে আমি বুঝে যাব যে দূরে সরে যেতে হবে। যদি শুনি যে দুটো ঘণ্টাই বাজছে তখন বুঝব বিপদ কেটে গেছে। আর যদি তোমার আমাকে দরকার হয় তখন ছোট ঘণ্টাটা খচ্চরটার গলায় বেঁধে ওটাতে চেপে দ্রুত এখান থেকে চামজার দিকে চলে যাবে। তখন আমি যদি জীবিত থাকি তাহলে তোমার ডাকে অবশ্যই সাড়া দেব’।
‘তোমার কাছে কি দস্যু হওয়াটা কঠিন বলে মনে হচ্ছে’?
‘এটা অতটা খারাপ না। কেবল যদি আমি যখন খুশি তখন গান গাইতে পারতাম। এরচেয়ে এসো আমরা এখন আস্তে আস্তে কিছু গাই’।

এবং সে গাইতে শুরু করল। সে যখন কঠিন, কঠোর, পাথরের মত চোখে কারো দিকে তাকাত তখন যার দিকে তাকাত তার মনে হত কেউ বুঝি কাঁচি গিয়ে তার পেট কেটে ফেলছে। অথচ সে যখন গাইতে শুরু করত তখন তার চোখ কোমল, করুণায় আর্দ্র হয়ে যেত – যেন জলপাইয়ের তেলের মত মসৃণ। সে বলল,
‘এভাবে আস্তে আস্তে গান গাওয়া হচ্ছে একটা সুন্দরী নারীর হাতে হাত জড়িয়ে পাশাপাশি শুয়ে থাকার মত ব্যাপার’।
এটা ছিল তার শেষ কথা। পাশের বনে কিছু একটা নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া যেতে সে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি গ্রামের কাউকে তার ব্যাপারে কিছু বলিনি, কিন্তু ঘণ্টা দুটোর ব্যাপারে সে যা বলেছিল তা করেছিলাম। সে যেমনটা বলেছিল ওগুলো ঠিক সেভাবেই বাজত। আমি তাকে ঘণ্টার সংকেত দিতাম – সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু আলী আর কখনো ফিরে আসেনি। কেউ কেউ বলত আলী নাকি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে গ্রীসে চলে গিয়েছিল, তারপর সেখানেই কোথাও খুন হয়েছে।

আমি জানি, সে ছিল একটা দস্যু, কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই আমি তার জন্য এক প্রকার মর্মযাতনা অনুভব করতাম। সুতরাং আমি বড় মর্দ্দা ভেড়াটার গলায় বড় ঘণ্টাটা বেঁধে, তার পেটে বিছুটি ঘষে দড়ি আলগা করে দিলাম। ভেড়াটা এক পাহাড় থেকে আরেকটাতে ছুটতে লাগল আর তার ঘণ্টার ‘ডিং ডিং’ আওয়াজ পাহাড় থেকে পাহাড়ে, পাহাড়ের ঢালের চারণভূমিতে, জঙ্গলে, খাঁড়া খাদে ছড়িয়ে পড়তে লাগল –কখনো জোরে, কখনো আস্তে গীর্জার ঘণ্টার মত সারা দিন ধরে। সারা পাহাড় আর জঙ্গল জেনে গেল ইব্রিয়াম-আলী সারা জীবনের জন্য হারিয়ে গেছে।

এরপর আমার বিপদের শুরু হল। প্রথমে ১৯২৩-এর অভ্যুত্থান। যখন অভ্যুত্থানকারীরা খোলা তরবারী হাতে আসল, তারা আমাকে নির্মমভাবে পেটালো। পরের ধাপে যখন একটা ভেড়ার চামড়ার কোটের দাম একটা ভেড়ার চেয়ে বেশি হয়ে গেল তখন আমি সব ভেড়া বেচে দিয়ে দুইটা খচ্চর আর গাড়ি কিনে ভাড়ায় চালাতে লাগলাম। আমি কাঠের তক্তার চালান নিয়ে যেতাম, লবণ আর মোমের চালান নিয়ে ফিরতাম। এক শনিবার ‘সানলাইট’ সাবানের চালান আনার জন্য স্তানিমাকা ট্রেন স্টেশনে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের যেন বলতে পারি ট্রেন দেখতে কেমন এজন্য অপেক্ষা করছিলাম। ট্রেন আসল, শৌখিন টুপিপরা একদল সুবেশী নারী নামল – সববয়সী। তাদের দেখে আমি হতবিহবল হয়ে গেলাম। ঠিক তখনই আমার কাঁধে কারো হাত অনুভব করলাম। ঘুরে তাকাতে দেখি আস্ত্রাখান টুপি আর লাল আলখাল্লা পরা, সেই পাকানো ঝোলানো গোঁফ আর পাথরের মত চোখের মানুষটি।
‘একটা শব্দও না! এই স্টেশনে কী করছ? ‘সানলাইট’ নিতে? ভালো, তোমার খচ্চরগুলো জোত। চল যাওয়া যাক’।
আমি তার জামা স্পর্শ করলাম, না এটা কল্পনা নয়, বাস্তব! আমি তার মুখের দিকে তাকালাম – হ্যাঁ, এটা ইব্রিয়াম-আলী!
আমরা যখন শহরের প্রান্তে পৌঁছে গেলাম তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
‘তুমি মৃত্যুর ওপার থেকে এভাবে ফিরে আসলে কী করে’?
‘এখন চুপ করে চল। আমি তোমাকে পরে বলছি’।
‘কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়’?
‘চেপেল্লি’।
চেপেল্লি মানে হচ্ছে আমাদের গাঁয়ে। মনে হল আমার কলিজায় কেউ বুঝি ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে।
‘সেখানে তোমাকে লোকে চিনে ফেলবে না’?
‘এক মিনিট, এখানে দাঁড়াও আর এদিকে তাকিও না’।

সে খচ্চর থেকে নেমে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে কী হচ্ছে সেটা দেখার জন্য যখন ঘুরে তাকালাম তখন দেখি একজন বলিষ্ঠ দেহের বিশালাকৃতি লোক, কালো দাড়ি, মাথায় বুননো টুপি। আমি হতবাক হয়ে গেলাম, এই লোকটা আসলো কোথা থেকে!
‘তুমি কে’?
‘ইব্রিয়াম’!
ইব্রিয়াম বলার সময় যখন সে হেসে উঠল তখন বুঝতে পারলাম এটা সত্যি সত্যি আলী। এবং যখন সে দাড়িটা খুলে নিল তখন নিশ্চিত হওয়া গেল। আসলে আমি কী করে জানব যে দোকানে নকল দাড়িও বিক্রি করে!
‘এই পোশাকে, এই চেহারায় যদি তুমি চেপেল্লি যাও তাহলে ঠিক আছে। এমনকি তুমি পাশমাকলির থানাতে গিয়ে কমান্ড্যান্টের সাথে কফিও খেতে পার। কেউই বুঝতে পারবে না যে এটা তুমি’।

সে দাড়িটা একটা বড় ঝোলায় ঢুকিয়ে রাখল। আমরা যখন চেপেল্লির কাছে এসে পড়লাম তখন সে দাড়িটা আবার পরে নিল। আসতে আসতে আলী বলছিল সে অদ্রিন থেকে ট্রেনে করে এসেছে। সে আগে তুরস্কে ছিল, তারও আগে গ্রীসে। বার বার বলছিল এটা এক ভাগ্যের ব্যাপার যে স্টেশনে তার আমার সাথে দেখা হয়ে গেল, যখন তার এমন একজনের সাহায্য দরকার ছিল যাকে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করা যায়। আমি বললাম,
‘দাঁড়াও, মনে রেখ, কোন রক্তারক্তি না’!
‘আমি কেবল একটা কাজ করতে চাই। আমাকে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দাও। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমি কে, তাহলে বলবে আমি শুমনাতিৎসা’র স্তয়কোলু’র খামারের প্রধান মেষপালক। আমার পায়ে ব্যথা তাই তোমার খচ্চর ভাড়া করে এখানে এসেছি। আমার বেশি সময় লাগবে না এবং এখানে রক্তারক্তির কোন ব্যাপার নেই’।
‘তুমি কি আমার বাড়িতে আসবে’?
‘না, তোমার বাড়ি তোমার বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনদের বেড়ানোর জন্য। আমাকে গাঁয়ের সরাইখানার কাছে নামিয়ে দিলেই চলবে’।
আমরা যখন কয়েকটা বড় গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম আলী তখন বীচ গাছের কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে চিবাতে লাগল।
‘এখানকার পাতার স্বাদ ভেড়ার রোস্টের চেয়ে সুস্বাদু। আনাতোলিয়াতে তুমি একটা গাছের পাতাও দেখতে পাবে না। সেখানকার পানির স্বাদ শুয়োরের খাবার ফ্যানের চেয়েও খারাপ’!

যখনই আমরা কোন ঝরণার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখনই বলছিল,
‘এখানে দাঁড়াও, আসো একটু পানি খেয়ে নেই’।
সে খচ্চর থেকে নেমে পানি পান করে, ঝরণার ধারার নিচে মাথা পেতে দেয়, আঁজলা ভরে পানি নিয়ে মুখে ছিটায়। আমরা যখন একটা পাইন বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম এক জায়গায় থেমে সে একটা গাছের গায়ে আদরের হাত বুলালো, তারপর গাছটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললঃ
‘আমার পাইন! আমার গাছ! তুমি ছিলে পাহাড়ের চূড়ায় আর আমি সমুদ্রের তলায়’!
আমি গাঁয়ে পৌঁছে সরাইখানার দিকে গেলাম। সে দাড়ি লাগিয়ে, বুননো টুপি পরে খচ্চর থেকে নেমে শান্ত সমাহিতভাবে হেঁটে চলে গেল। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাল না। ঐ আমলে প্রচুর লোকের দাড়ি ছিল আর গাঁয়ের প্রায় অর্ধেক লোকে বুননো টুপি পরতো। সুতরাং আমরা যেমনটা ভেবেছিলাম সেভাবে কোন ঝামেলা ছাড়াই গুরিৎসার সরাইখানায় পৌঁছে গেলাম।
‘তুমি বাড়ি গিয়ে খচ্চরগুলোর ব্যবস্থা কর। সন্ধ্যার সময় সরাইয়ে ফিরে এসে আমার সাথে রাতের খাবার খেয়ো’।

আমি বাড়ি ফিরে গেলাম, খচ্চরগুলোকে দানাপানি দিলাম, বউকে বললাম একা একা খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়তে। এরপর সরাইয়ে ফিরে আসলাম। তখন সরাইভর্তি লোক, প্রচুর চীৎকার, হল্লা, উজ্জ্বল আলো। আমি বললাম,
‘ইব্রিয়াম, আমার মনে হয় ভেতরে না যাওয়াটা ভালো হবে। আমি বরং রুটি আর পনীর নিয়ে আসি। ভেতরের চেয়ে এখান থেকে বরং ভালো দেখা যাবে’।
আমি এমনভাবে কথা বলছিলাম যেন আমি দেয়ালের সাথে কথা বলছি। তবু সে ভেতরে যেতে লাগলে তার পিছু নিলাম। ভেতরটা ছিল গরম আর ধোঁয়ায় ভরা। মাংসের কাবাব বানানো হচ্ছে, কেউ ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে, তার সুরে অনেকে গান গাইছে। একজন একটা বুনো শুয়োর শিকার করেছে। সেটার মাংস ঝলসানো হচ্ছিল, সে কারণে হল্লাটা বেশি হচ্ছিল। লোকে খাচ্ছে, গান গাইছে, লেভোচেভো’র দ্রৌল্যু ব্যাগপাইপ বাজাতে লাগলে অনেকে তাকে ঘিরে দাঁড়াল।

আমরা কোণার একটা টেবিলে বসলাম। আলী মটরশুঁটি সেদ্ধ আর নোনা মাংস অর্ডার করল। আমরা খেতে শুরু করতে গান শুরু হয়ে গেল। দ্রৌল্যু আমাদের জানা সব গান বাজাতে লাগল, সাথে সবাই গাইতে লাগল। আমি নিশ্চিত না কথাটা কে বলেছিল, কিন্তু ভীড়ের মধ্যে কেউ একজন বলে উঠলো,
‘দ্রৌল্যু! এবারে ‘রুফিঙ্কা’ বাজাও’!
দ্রৌল্যু রুফিঙ্কা বাজাতে শুরু করল, বোরৌশিৎলা গানটা গাওয়া শুরু করতে তার সাথে আরও তিন-চারজন গলা মেলাতে লাগল। সরাইয়ের ছাদ যেন কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। জানালার পাল্লাগুলো করতালের মত বেজে উঠল। গুরিৎসা একটা বোতল থেকে মদ ঢালছিল কিন্তু সে খেয়ালও করছিল না কখন সেটা ফুরিয়ে গেছে। আগুনে মাংস পুড়ে কয়লা হয়ে গেল, কাঠুরেরা এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকল যেন তাদের পায়ে শেকড় গজিয়ে গেছে। গানটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে কেউ নড়াচড়া পর্যন্ত করছিল না।

আলী তার খাবারের প্লেট সরিয়ে দিয়ে মদের গ্লাস তুলে নিল। কিন্তু না সে পান করছিল, না সে গ্লাস নামিয়ে রাখছিল। গ্লাসে তার আঙুলগুলো চাপতে চাপতে নীল হয়ে গেল। তার মুখ পাথরের মত। তার কানের পেছনে একটা নীল শিরা দপ্‌ দপ্‌ করছিল। লোকে যত দীর্ঘ লয়ে গানটি গাইছিল তার শিরাটি তত দ্রুত লাফিয়ে উঠছিল। তার দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ। সে চারদিকে তাকাচ্ছিল, কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল না। আমি আঁচ করলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা বুঝে ওঠার আগেই আলী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। সে এমনভাবে দাঁড়াল যেন একটা ঘুর্ণিঝড় তাকে ঠেলে দাঁড় করিয়েছে। সে সোজা গায়কদের কাছে চলে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে গলার সমস্ত জোর দিয়ে গাইতে লাগল –
‘রুফিঙ্কা অসুখে পড়ে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে
ঊঁচু পাহাড়ের চূড়ায় .......’
প্রত্যেকে থেমে গেল এবং বরফের মত জমে গেল। শুধু দ্রৌল্যু তার ব্যাগপাইপ বাজিয়ে যেতে লাগল। আলী চীৎকার করে বলল,
‘সবার জন্য এক বোতল করে মদ’!
গুরিৎসা মদের জন্য দৌড়ে গেল। বোতলের টুংটাং, ছিপি খোলার ফস্‌ ফস্‌ শব্দের মধ্যে আলী গেয়ে চলল। সে গেয়ে গেল আর দ্রৌল্যু বাজিয়ে গেল। সবাই গান শুনল, আলীকে দেখল আর নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল।

আমি দেখতে পাচ্ছিলাম পরিস্থিতি আমাদের আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। সুতরাং আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং বাড়ি চলে গেলাম। আমি বাড়ি ফিরতেই আমার স্ত্রী জানাল যে, সারা গ্রাম জানে ইব্রিয়াম-আলী ফিরে এসেছে। আমি শুয়ে পড়লাম ঠিকই কিন্তু কোন একটা কিছু আমাকে কেবল খোঁচাচ্ছিল – ‘যাও, গিয়ে তাকে বল, সবাই তাকে চিনে ফেলেছে। যাও, তাকে বাঁচাও’!
আমি সরাইয়ে ফিরে যাবার জন্য শোয়া থেকে উঠলাম। আমার স্ত্রী চাইছিল না আমি সেখানে ফিরে যাই। সে যেন চেঁচাতে না পারে সেজন্য তার মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করে আমি সরাইয়ে গিয়ে আলীর কানে কানে বললামঃ
‘সবাই তোমাকে চিনে ফেলেছে’!
‘আমার এখন গান গাইতে ইচ্ছে করছে, সুতরাং কেউ এখন আমাকে থামাতে পারবে না। তারা যদি আমাকে গ্রেফতার করতে চায় তাহলে করুক’।
সে একটা বোতল আমার মুখে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘খাও’। এরপর গুরিৎসাকে চেঁচিয়ে বললঃ
‘মদের একটা পিঁপে নিয়ে এস, দাম আমি দেব, আর দরজা বন্ধ করে দাও’!

এর পরে কী ঘটেছিল তা খুব স্পষ্ট নয়। প্রচুর মদ খাওয়া আর গান গাওয়া হল। আমরা সবাই মাতাল হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকলাম। আলী যখন উঠে দাঁড়িয়ে বিল শোধ করছিল তখন বাইরে ভোরের আলো ফুটছিল। সে বললঃ
‘যাও তোমার খচ্চরগুলো নিয়ে এস, এখন যাবার সময় হয়েছে’!
যদিও তখন আমি যথেষ্ট মাতাল কিন্তু আমার দিকে গুরিৎসার চাহনী দেখে বুঝে ফেললাম সে কী বলতে চাইছে। এখন যদি আমি আলীকে নিয়ে যাই তাহলে সে পুলিশের কাছে আমার নামে রিপোর্ট করবে। সেক্ষেত্রে আমার পক্ষে আর কখনো গ্রামে ফেরা সম্ভব হবে না। নিজেকে বাঁচাতে আমি নীচতা দেখিয়ে বললামঃ
‘আমি তোমাকে চিনি না, আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারব না’!
আলী সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে পিস্তল বের করে তাক করে বললঃ
‘আগাও, নয়তো গুলি করে তোমার খুলি উড়িয়ে দেব’।
‘ঠিক আছে, আমি তর্ক করব না’।

আমরা খচ্চরগুলোতে চড়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমি সামনে আর সে পেছনে। গাঁয়ের মাঝখান দিয়ে যাবার সময় আমরা দুজনে একটা কথাও বললাম না। আমরা যখন গ্রামটা পেরিয়ে এলাম তখন আলী তার খচ্চরটাকে চাবুক মেরে আমার পাশাপাশি নিয়ে এসে বললঃ
‘তখন তুমি যে আমাকে নিয়ে যেতে অস্বীকার করলে সেটা কি সত্যি সত্যি নাকি একটা অজুহাত দাঁড় করানোর জন্য’?
সত্যটা স্বীকার করতে আমার লজ্জা হল এবং মিথ্যা করে বললামঃ
‘ওটা অজুহাত নয়, আমি সত্যি সত্যি বলেছি’।
‘এদিকে এসো, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল’।
ততক্ষণে চারদিক আলোয় ভরে গেছে। সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় আমি তার চোখের দিকে কী করে চাইব?
‘তার মানে, তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলেছ। তাই না’?
তখন আমি সত্যটা স্বীকার করলামঃ
‘হ্যাঁ, আমি তখন মিথ্যা বলেছি। কারণ, আমি যদি সত্যি বলতাম তাহলে তুমি হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে আর আমাকে এক রক্তাক্ত পরিণতি বরণ করতে হতো। কসম, এটাই হচ্ছে সত্য। যাকগে, তুমি কী ভেবে গান গাওয়া শুরু করেছিলে’?
‘বুঝলাম। কিন্তু তুমি সে কথা প্রথমেই বললে না কেন? পথের সাথী হিসাবে তুমি বেশ ভালো। আমি ভাবছিলাম যে সোনার লিরাগুলো লুকিয়ে রেখেছি সেগুলো তোমার সাথে ভাগ করে নেব। যদি তুমি ভয় পেয়ে থাক, তাহলে এখনো সময় আছে তুমি এখান থেকে চলে যাও। আমাকে সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য তোমাকে দরকার নেই। তোমার খচ্চর ঘুরিয়ে চলে যাও। ভয় নেই, আমি কারো পিঠে গুলি করি না’!
আমি যা কিছু করেছি তার জন্য মনে মনে নিজেকে অভিশাপ দিলাম। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এটা তার লুকানো স্বর্ণের জন্য না, তার নোংরা লিরার জন্য না। অভিশাপ দিলাম আমি নিজে নিজের আত্মাকে কলুষিত করেছি বলে, মিথ্যা কথা বলেছি বলে।
‘আলী, তোমার যদি দরকার হয় তাহলে আমি তোমার সাথে যেতে পারি। কসম! আমি এটা সত্যি সত্যি বলছি’।
‘লিরার জন্য, হুঁহ’?

আমি থমকে গেলাম। মনে হল আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি নিজের খচ্চরটাকে থামিয়ে ফিরে যাবার জন্য মুখ ঘুরালাম। অন্য খচ্চরটা আলীর জন্য ছেড়ে দিলাম। যাবার আগে বললামঃ
‘যাবার আগে দুটো কথা বলে যাই। বিশ্বাস কর, আমি মন থেকে বলছি। সারা গ্রাম জানে যে তুমি এখানে, আর তোমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। গুরিৎসা পুলিশের চর। তাছাড়া সরাইয়ে যে রাখাল তোমার পা ভাঙার চেষ্টা করেছিল সেই ফান্দুকলির বড় ছেলে ফেভযিকে দেখেছি। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালাও আলী! রাস্তা থেকে দূরে থাক’।
আলী খেঁকিয়ে উঠল, ‘ভাগো’!

আমি আর পিছু ফিরে না চেয়ে চলে গেলাম। যখন আমি গাঁয়ের প্রান্তের চারণভূমিতে পৌঁছলাম তখন গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। নিজে নিজেকে বললাম, ‘হুম! তাহলে তাই হল’। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, তাই ঘরে না ফিরে সরাইয়ে গেলাম। আমাকে দেখে গুরিৎসা জিজ্ঞেস করলঃ
‘দস্যুটা কই’?
‘চলে গেছে’।
‘আর তুমি’?
‘আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে’।
‘তার মানে, তুমি ওর সাথে যেতে চেয়েছিলে, তাই না’?
‘হ্যাঁ, আমি তাই চেয়েছিলাম। তাতে তোর কী! হারামজাদা, সে আমাকে সাথে নেয়নি। দস্যু হতে গেলে তেজী হতে হয়, তোর আমার মত ভয়ে কাপড় ভিজিয়ে ফেলা হলে হয় না। বুঝেছিস হতভাগা’! একথা বলেই আমি হাতের চাবুকটা এত জোরে ওর মুখ বরাবর হাঁকালাম যে ওটা গুরিৎসার গলায় পেঁচিয়ে গেল। আমরা দুজন দুজনের গলা চেপে ধরে যুঝতে লাগলাম। লোকজন এসে জোর করে আমাদেরকে ছাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই সরায়ের বাইরে একদল মানুষের আবির্ভাব হল। কী ঘটছে সেটা বোঝার আগেই আমার অন্য খচ্চরটা দেখতে পেলাম। খচ্চরটার সাথে একটা কাঠের ঠেলা জোতা, সেটাতে ইব্রিয়াম শক্ত করে বাঁধা। তার সাদা শার্ট রক্তের দাগে ভরা। এই দাগের জন্য আলী মারা যাবার পর তার নাম হয়ে যায় ‘দাগী আলী’। ঠেলাটার পেছনে বন্দুক হাতে পুলিশ আর ফান্দুকলির ছেলে ফেযভি। তারা সরাইয়ের আঙিনাতে থামতে আমি দৌড়ে আলীর কাছে গেলাম।
‘তোমার জখমটা কি খুব খারাপ’?

আলীর চোখ ততক্ষণে ঘোলাটে হয়ে আসছে। ‘আর খারাপ! এখন সব শেষ! এটা ভেবে ভালো লাগছে যে আমার গাঁয়ের মাটিতে আমার দাফন হবে .....’
তার মুখ দিয়ে রক্তাক্ত ফেনা বের হতে লাগল। তার কথা ঠোঁটেই আটকে গেল।
‘আলী! আলী! ফিরে এসো’!
আলী আমার দুহাতে এলিয়ে পড়ল, তার মাথা সামনে ঝুঁকে পড়ল। এবং সে এভাবে চলে গেল। আমি ফেযভিকে বললামঃ
‘তুমি নিশ্চয়ই ওকে বাঁধার চেষ্টা করনি’!
‘কী যায় আসে, তার মাথার দাম বেঁচে থাকলে যা, মরে গেলেও তা’।

এরপরে মিলিশিয়া আসল, পুলিশ আসল, ডাক্তার আসল। জেরা, জিজ্ঞাসাবাদ চলল। তারা এমনকি আলীর বুক চিরে দেখল তার দুটো হৃদপিণ্ড ছিল কিনা। কেউ বুঝতে পারল না একজন মানুষ বুকে দুই দুইটা গুলি খেয়ে কী করে দেড় ঘন্টা বেঁচে থাকে – এমনকি তাকে সরাই পর্যন্ত টেনে আনার পরও। আইনী আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবার পর ওরা আলীর লাশ আমাকে হস্তান্তর করল। আমি ওকে আমাদের গাঁয়ের মাটিতে দাফন করলাম। তার কবরে একটা পাথরের ফলক লাগিয়ে ফুল দিলাম।

এর পরে এত বছর পার হয়ে গেছে তবু আমি বুকের ভেতর একই প্রকার বেদনা অনুভব করি। ভাবি, কী হতো যদি আমি আলীর সাথে যেতাম? তাহলে কি তার এই পরিণতি হতো? এটাই কি হতো? এই বেদনা যখন অসহ্যকর হয়ে পড়ে তখন আমি গাঁয়ের মাস্টারমশায়ের কাছে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করিঃ
‘মাস্টারমশায়! সত্যি করে বলুন তো, আসলেই কি মানুষের জীবনে ভাগ্য বলে কিছু আছে’?
‘আমি কতবার তোমাকে এই একই কথা বলব? জীবনে অবশ্যই ভাগ্য বলে কিছু আছে। এটা মানুষের বাইরের কিছু না, বরং তার ভেতরের কিছু। এই আলীর কথা ধরো, সে যদি ঐদিন বোকার মত গান গাওয়া শুরু না করত তাহলে কে তাকে চিনত? কে তাকে দেখিয়ে দিতে পারত? সে ছিল কঠিন, ভয়ঙ্কর, তবু সেই গানটা তার চেয়েও শক্তিশালী ছিল ......’

মূল গল্পঃ নিকোলাই হেইতভ

কতিপয় বাহুল্যঃ

১। ‘রুফিঙ্কা’ গানের লিঙ্ক

২। ‘ইব্রিয়াম-আলী’ নিয়ে মিলেন নিকোলভের চলচ্চিত্র ‘Краят на песента’ (গানের অন্ত) (১৯৭১)


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

"জীবনে অবশ্যই ভাগ্য বলে কিছু আছে। এটা মানুষের বাইরের কিছু না, বরং তার ভেতরের কিছু।"

প্রথমপাতায় উত্তর-পূর্ব কোণে একটা চেনা ছবি দেখলে কি ভাল যে লাগে! হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

নিয়মিত লিখতে তো ইচ্ছে করেই। সম্ভব হলে কেবল লিখতামই। কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারি না। হয়তো মনটাও কিছুটা মরে গেছে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হাসিব এর ছবি

আমার কাছে লেখাটা সরাসরি ইংরেজির (বা অন্য ভাষার) থেকে অনুবাদ - এরকম মনে হয়েছে। যৌগিক বাক্যগুলো সম্ভবত সে কারণে এসেছে। এ কারণে পড়তে হোঁচট খেতে হয়েছে।
যেমন ধরা যাক,

আপনি লিখেছেন, এভাবে -

সে কি সত্য কথা বলেছিল নাকি আমার সাথে মজা করেছিল তা বলতে পারব না, কারণ কথাগুলো বলার সময় সে একটুও হাসেনি। সে যে কখন মজা করছে আর কখন করছে না সেটা কেউই বলতে পারত না। সব সময় তার অভিব্যক্তি একই রকমের ভাবলেশহীন থাকত। কেবল একবার তার অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ দেখেছিলাম – যেদিন সে প্রথম বারের মত ধরা পড়ে।

এটা এভাবে লিখলে পড়তে ঝরঝরে হতো -

ইব্রিয়াম সত্য কথা বলছিল নাকি মজা করছিল সেটা বলা মুশকিল। তার ভাবলেশহীন চাহনির কারণ সে মজা করছে নাকি সেটা কেউ সবসময় বুঝতে পারতো না। কেবল একবার তাকে এই নির্বিকার চাহনির বদলে সত্যিকার অনুভূতি প্রকাশ করতে দেখেছিলাম।

আমি ফিকশন লেখক নই। ফিকশন লেখার অভ্যেস থাকলে আর ভাল করে লিখতে পারতাম লাইনগুলো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক। অনুবাদ করার ক্ষেত্রে আমার চেষ্টা থাকে সরাসরি অনুবাদ না করে রূপান্তর করার। এক্ষেত্রে সেটা হয়নি। উচিত ছিল গল্পটা অনুবাদ করার পরে বাংলা ভাষার উপযোগী রূপান্তর করার। তাহলে এমন হোঁচট খেতে হতো না।

এই গল্পটা রূপান্তরের ইচ্ছা বহুকালের, তাই এই দফা অনুবাদ করলাম। কাজটা করতে গিয়ে দেখলাম আগের ধৈর্য্য অবশিষ্ট নেই। এ'কারণে পাঠকের ওপর বাড়তি চাপ হয়ে গেছে। দুঃখিত।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।