“মায়ের দোয়া”র শিকড় সন্ধানে : প্রথম পর্ব

সোহেল ইমাম এর ছবি
লিখেছেন সোহেল ইমাম [অতিথি] (তারিখ: রবি, ০৬/০৫/২০১৮ - ৮:৩০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বেশিরভাগই দেখা যেতো রিকশার পেছনে, কখনও কখনও টেম্পো কিংবা স্বল্প পাল্লার বাস গুলোর গায়েও লেখা থাকতো “মায়ের দোয়া”। রিকশার পেছনে ছবির সঙ্গে কিংবা ছবি ছাড়াই শ্রেফ “মায়ের দোয়া” দেখা যেতো। কেউ কেউ রিকশার পেছনের প্যানেলে ধর্মীয় বাণীও লিখে রাখতো, তবে “মায়ের দোয়া”র সঙ্গে কারো প্রতিযোগিতা চলতোনা। মনে হতো একরকম রক্ষাকবচের মত লেখাটা রিকশার জন্য একটা আবশ্যিক পূর্বশর্ত হয়ে উঠেছিলো। যেখানে রিকশার পেছনের প্যানেলে এ কথাটা লেখা নেই সেখানে আবার দেখা যেতো হুডের রাবার-প্লাস্টিকের কারুকাজে সেলাই করে লেখা আছে “মা”। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক আসার পরও ছবিটা বহুদিনএকই থেকেছে । এখানেও বাহনের রেক্সিন বা ক্যানভাসের আবরণের ওপর দেখা যায় “মায়ের দোয়া”, কখনও গাড়িটার নামেই দেখি মা-পরিবহন বা মা-এন্টারপ্রাইজ।

যানবাহন ছাড়াও চোখে পড়ে বিস্তর দোকানের নামে এই একই শব্দাবলী। এ দোকান গুলো সব যে একই ধরণের ব্যবসা নিয়ে আছে তা নয়। কেউ ওষুধের দোকানের নাম রেখেছে ‘মায়ের দোয়া ফার্মেসি’ আবার কেউ রেস্তোরার নাম রেখেছে ‘মায়ের দোয়া বিরিয়ানি হাউজ’। মা-কম্পিউটারস্, মা-ভ্যারাইটি স্টোর তো অলিতে গলিতে চোখে পড়ে। বাংলাদেশের সব গুলো জেলাতেই এরকম নামের দোকান অবধারিত ভাবেই চোখে পড়বে। কেউ একটু আগ্রহ নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে এই ধরনের দোকানের নাম সংগ্রহ করতে চাইলে তাকে নিরাশ হতে হবেনা। মায়েরদোয়া জেনারেল স্টোর, মায়েরদোয়া ফার্মেসি, মায়েরদোয়া স্টোর, মায়েরদোয়া সেলুন, মায়েরদোয়া কনফেকশনারি, মায়েরদোয়া টেলিকম এন্ড ভিডিও সেন্টার, মেসার্স মায়েরদোয়া ক্রোকারিজ ইটালিয়ানো, মায়েরদোয়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, মায়েরদোয়া বেডিং এণ্ড ক্লথ স্টোর, মায়েরদোয়া টি স্টোর, মায়েরদোয়া ফ্যাশান হাউজ — তারপরও বোধহয় তালিকাটা শেষ হবেনা। এর পাশেই রয়েছে কেবল মা বা জননী দিয়ে দোকানের বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামকরণ, এগুলোও সেই একই গোত্রের। এসব দেখে এমনটাও মনে হতে পারে আমাদের মত মাতৃভক্ত জাতি বোধহয় আর দুটি নেই। কিন্তু নারীর প্রতি ঘরে, পথে বা কর্মক্ষেত্রে অসম্মান, অত্যাচার, প্রায়ই নৃশংসতা আর নারীর অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে জাতীয় অনীহা এসব দেখে এই ভক্তি সম্পর্কে যে সন্দেহ জন্মায় তাও ফেলে দেবার মত নয়।

এই যে এধরণের নামকরণের সার্বজনীন অনুভব এটা কিন্তু আমাদের সমাজ মানসেরই ফল। অর্থাৎ একটা সামাজিক বিশ্বাসের ফলশ্রুতিতেই আমরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এধরনের নামকরণ করি এবং সমাজের আর দশজনের চোখেও তা প্রশংসাই কুড়োয়। অনেক দিন থেকেই আমাদের দেশে এই বিশ্বাস প্রচলিত আছে মায়ের দোয়া পেলে যে কেউই জীবনে সাফল্য লাভ করতে পারে। ব্যক্তিগত শিক্ষা-দীক্ষা বা বিশেষ কর্মদক্ষতা, চরিত্রের নিস্কলুষতা, ধার্মিক জীবনে নিষ্ঠা এসব ছাড়াও কেবল মায়ের দোয়ার উপর নির্ভর করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। এই যে সাফল্য বা প্রতিষ্ঠা এ কিন্তু পার্থিব ও একান্ত বৈষয়িক সাফল্যকেই বোঝাচ্ছে। কেউ একজন বিরাট কবি বা চিত্রশিল্পী হয়ে উঠলেন কিন্তু দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, এমন মানুষকে অন্তত আমাদের সমাজে কেউ সফল বলবেনা। এমনতর সাফল্যের পেছনে মায়েরদোয়ার হাত আছে এমনটা বলতেও শোনা যায়না। কিন্তু পড়াশোনা করে বড় অফিসার হয়েছেন বা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বিস্তর অর্থকড়ি কামাচ্ছেন আমাদের সমাজে সাফল্য বলতে এই এবং এসব ক্ষেত্রেই লোকে বলে সফল ব্যক্তিটির মায়েরদোয়া ছিলো তাই এরকম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিশ্বাসটি সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যুক্ত হয়েই গৃহীত হয়েছে এবং লালিতও হচ্ছে। গর্ভধারিণী মা যে আত্মত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভাবে সন্তান জন্মের কায়ক্লেশ অবলীলায় সয়ে যান আবার সন্তান লালনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘকাল নিজেকে উজাড় করে দেন এ হেন ব্যক্তিটির দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল না হয়েই যায়না। এই মা যদি সন্তানের বৈষয়িক সাফল্যের জন্য দোয়া করেন তবে সাফল্য অবধারিত। মা যেমন নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে বিপদ থেকে বাঁচাতে চান, তাকে সর্বক্ষণ আগলে রাখেন, অপরিসীম মমতায় তার পুষ্টি যোগান মায়ের দোয়াও তার প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের বৈষয়িক ব্যাপার গুলো ঠিক তেমনি সুরক্ষিত করে রাখে। বৈষয়িক ক্ষতি, জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই তাই মায়ের দোয়া অব্যর্থ ও অপরিহার্য একটা রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। কিন্তু শ্রেফ মা কেন? আল্লাহতো চরম দারিদ্র্য পীড়িত মানুষের দোয়াও কবুল করেন বলে শোনা যায়, অথবা কঠিন রোগে ভুগে অবর্ণনীয় কষ্ট পাচ্ছে এরকম মানুষেরও নাকি শহীদের মর্যাদা সুতরাং এদের দোয়ার কার্যকারিতাও তো যথেষ্ট শক্তিশালী থাকার কথা। এদের কষ্টতো অনেক সময়ই মায়ের সন্তানজন্ম বা লালনের সাময়িক কষ্টকেও অতিক্রম করে যায় কিন্তু এদের দোয়াকে তাবিজ-কবচের মত আমরা রিকশায় বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ঝুলতে দেখিনা যা দেখি তা কেবল “মায়ের দোয়া”।

“মায়েরদোয়া”য় এই দোয়া শব্দটিতেই একটা সূত্র পাওয়া যাচ্ছে এ বিশ্বাস ইসলাম ধর্ম সম্ভূত হতে পারে। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই যেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী সেখানে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাসে ইসলাম ধর্মের প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত — এ কথাটির মধ্যেও যেন সেই সুর। আবার একটা হাদিস পাচ্ছি যেখানে বলা হচ্ছে,

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলছেন, একদা জনৈক ব্যক্তি নবী করীম (সঃ) এর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করলো, হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমার কাছে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা (বোখারী,৫৫৪৬, পৃ:৮৯৬)।

কিন্তু বেশিরভাগ হাদিসেই মা-বাবার উভয়ের প্রতি একত্রে কর্তব্য পালন করতে উৎসাহিত করলেও কেবল মায়ের বিশেষ সম্মান বা মর্যাদার ব্যাপারে বেশি হাদিস কিন্তু নেই। বিশেষ করে আমরা মায়েরদোয়া’র বিশিষ্ট ক্ষমতা সম্পন্ন মাকে এখানে পাচ্ছিনা। প্রায় সর্বত্রই মা-বাবাকে একসঙ্গে উল্লেখ করেই সুরা কিংবা হাদিস রচিত হয়েছে। কেবল মায়ের দোয়াকে অবলম্বন করে বৈষয়িক সাফল্য অর্জনের ইঙ্গিতটি কিন্তু ইসলাম ধর্মীয় বিধানে তেমন প্রকটভাবে দেখা যায়না। আবার ধরা যাক মায়ের পায়ের নিচে বেহেস্ত সংক্রান্ত কথাটি, এখানে লক্ষণীয় বেহেস্ত কিন্তু ইহলৌকিক অর্জন নয়, পার্থিব বৈষয়িক সাফল্যের ক্ষেত্রে বেহেস্তকে ধরা যায়না। ইসলাম ধর্মের মূল ধারায় বৈষয়িক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা না হলেও পার্থিব অর্থনৈতিক উন্নতিকে ঠিক পরমার্থ বলে কখনওই উল্লেখ করা হয়নি। ইহলোককে পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য সজাগ থাকবার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সূত্রেও মায়েরদোয়া সংক্রান্ত প্রচলিত বিশ্বাসের বিশেষ সমর্থন আমরা অন্তত ইসলামের ধর্মীয় বিধান থেকে পাচ্ছিনা।

অতিসাম্প্রতিক কালে রিকশা এবং ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক গুলোতেও “মায়েরদোয়ার” পরিবর্তে লেখা দেখা যাচ্ছে “মা-বাবার দোয়া”। মোটামুটি বছরতিনেক আগেও কেবল “মায়েরদোয়া”ই চোখে পড়তো ‘বাবার’ উল্লেখ একরকম ছিলোনা বললেই চলে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলোয় “মা-বাবার দোয়া”ই বহুল হারে দেখা যাচ্ছে। নতুন রিকশা বা ইজিবাইকের পেছনে এখনও “মায়েরদোয়া” দেখা গেলেও আগের তুলনায় অনেক কম। তবে দোকান বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামের ক্ষেত্রে “মা-বাবার দোয়া” এখনও “মায়ের দোয়া”কে পরাস্ত করতে পারেনি। এই যে গণপরিবহনে মা ও বাবার উভয়ের দোয়ার একত্রে উল্লেখ এই পরিবর্তনটা সম্ভবত ইসলাম ধর্মের প্রভাবেই এসেছে। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মকর্ম পালনের প্রতি দেশে মানুষের উৎসাহ বেড়েছে। ছেলেদের দাড়িরাখা, মেয়েদের বোরখা বা হিজাব পরিধান করা থেকে শুরু করে ওয়াজমাহফিল আয়োজনের হিড়িক এসব থেকেই তার কতকটা আন্দাজ করা যায়। ইদানীং ধর্মীয় আচার আচরণের কতটা সত্যিকারের ইসলাম ধর্ম সম্মত আর কতটা তা নয় এসব নিয়েও সাধারণ মানুষ ভাবছে। তথ্য-প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে আধুনিক হয়ে ওঠার দিকে যথেষ্ট উৎসাহ থাকলেও মানুষ ইদানীং চিন্তা চেতনায় আধুনিক হয়ে ওঠার পরিবর্তে ধর্মের দিকেই ঝুঁকে পড়ছে। “মায়েরদোয়া”কে সরিয়ে “মা-বাবার দোয়া”র জনপ্রিয়তা সেই পরিবর্তনটারই ফলশ্রুতি। এতে অন্তত একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে সত্যিকার অর্থে “মায়েরদোয়া” সংক্রান্ত এই বিশ্বাসটির শিকড় ইসলাম ধর্ম থেকে উত্থিত হয়নি বা ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে এর খুব একটা সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছেনা।

এই সিদ্ধান্তটা আরো সমর্থন পায় এই তথ্য থেকে যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও গণপরিবহনে ঠিক এভাবেই “মায়ের আশীর্বাদ” কথাটা এখনও চোখে পড়ে। দোকানের নামের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই মায়ের বিশিষ্ট নামেই দোকানের নামকরণের ব্যাপারটিও যথেষ্ট প্রচলিত, অর্থাৎ “ননীবালা বস্ত্র ভাণ্ডার”। হিন্দু সম্প্রদায় প্রধান পশ্চিমবঙ্গেও যখন মায়েরদোয়ার চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে তখন ইসলাম ধর্মের চেয়ে বরং ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসের ক্ষেত্রেই এই অনুসন্ধান চালানোটা বেশি যুক্তিযুক্ত। তাছাড়া শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয় ভারতের অন্য প্রদেশেও মায়েরদোয়া সংক্রান্ত এই বিশ্বাসটির প্রচলন দেখেও মনে হয় এর শিকড় ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে না থেকেই পারেনা। এবং খুব সম্ভব ধর্মীয় মোড়কে বিশ্বাসটি সমাজ মানসে লালিত হলেও এর মূল চরিত্রটা একান্ত লৌকিক। ইসলাম ধর্ম হোক কিংবা হিন্দু ধর্ম দু’টো ক্ষেত্রেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ বা পরমেশ্বর তাদের খুশিমতই ভক্তের আরজ পূর্ণ করেন। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কাউকে অনুগ্রহ করবেন কি করবেননা এ বিষয়টা নিজের হাতে রেখে দেন। আগে থেকে কেউই বলতে পারেনা ঈশ্বর তার দোয়া কবুল করবেন কিনা। কিন্তু “মায়ের দোয়া”য় যে সাফল্যের প্রত্যাশা তা শর্তহীন, মা যদি খুশি হয়ে দোয়া করেন তবে বৈষয়িক সাফল্য আসবেই, ব্যবসায়িক সাফল্য ক্ষতির মুখে পড়বেনা। এই বিশ্বাসের মধ্যে একটা নিশ্চিতির সুর আছে তাই এর মধ্যে ধর্মীয় উপাদানের চেয়ে যেন আদিম কালের মানুষের যাদুবিশ্বাসের ছোঁয়ার প্রভাবটাই বেশি।

ধর্মীয় আচার আর যাদুবিশ্বাস মূলক আচারের মধ্যে পার্থক্য আছে। বৃষ্টির প্রত্যাশায় যখন অনেক মানুষ একত্রে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গাছের উপর পানির পাত্র ঝুলিয়ে তা থেকে ফোটা ফোটা পানি ফেলে বৃষ্টির নকল করে বৃষ্টি আনতে চায় তখন তা যাদুবিশ্বাস মূলক আচার। আর যখন বৃষ্টির জন্য কোন দেবতার কাছে উপহার সামগ্রী নিবেদন করে, তার স্তুতি-স্তবন করে বৃষ্টির প্রার্থনা জানানো হয় তখন তা ধর্মীয় আচার। “গোল্ডেন বাও” বইতে স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজার বলছেন ধর্মীয় আচারের আগে আদিম মানুষ যাদুবিশ্বাস মূলক আচারের উদ্ভব ঘটেছিলো। এই যাদুবিশ্বাস মূলক আচারে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের ঘটনাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করবার প্রয়াসটাই মূল। অনেকটা সাদৃশ্যের ভাবনা থেকেই মানুষ এই যাদুবিশ্বাস মূলক আচার উদ্ভাবন করতো। বৃষ্টি চাইলে বৃষ্টির নকল করে বৃষ্টি আনা অথবা বড় সড় পশু শিকার করতে চাইলে পশু শিকারের দৃশ্য গুহার দেয়ালে বা মাটিতে এঁকে তার পরে শিকারেরে উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া এভাবেই এই আচার গুলোকে তারা উদ্ভাবন করে নিয়েছে। একেবারে আদিম কালে মানুষের মনে দেবতার ভাবনা বিকশিত হয়ে ওঠেনি নিজেদের অনুকূলে কোন ঘটনা ঘটাতে চাইলে তাই তারা এই যাদুবিশ্বাস মূলক আচারেরই সাহায্য নিতো। পরের পর্যায়ে দেব ভাবনার উৎপত্তি হলেও সেই দেবপূজার আচারেও এই আগের পর্বের যাদুবিশ্বাস মূলক আচার গুলোও যুক্ত হয়েছিলো। আমরা এই মায়েরদোয়ার মধ্যে কিছুটা হলেও সেই যাদুবিশ্বাস মূলক বৈশিষ্ট্যই যেন দেখতে পাচ্ছি। আমাদের এই অনুসন্ধানে মায়েরদোয়ার এই লৌকিক চরিত্রটার কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে।

বাংলা বা ভারতীয় সংস্কৃতিই শুধু নয় সারা বিশ্বের মানব সম্প্রদায়ের মধ্যেই গর্ভধারিনীর সম্মান ও মর্যাদা আবশ্যিক ভাবেই একটা বিশেষ স্থান জুড়ে আছে। সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের যে অমানুষিক কায়ক্লেশের মধ্যে দিয়ে জননীকে অতিক্রম করতে হয় তা-ই তাকে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করে রেখেছে। সভ্যতা যত এগিয়েছে মায়ের সম্মানও সে হারে বেড়েছে বললে মিথ্যে বলা হবেনা। সেই মায়ের কাছে সন্তানেরতো বটেই সমাজের ও সম্প্রদায়ের ঋণটিও অস্বীকার করাবার জো নেই। কিন্তু প্রশ্নটা ওঠে কেন এই অখণ্ড বাংলায় মায়ের আশীর্বাদটা ব্যবসা বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডের সাথেই এভাবে সম্পৃক্ত হয়ে রইলো। ব্যবসা বা বাণিজ্যিক উদ্যোগটা যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে, যেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতির মুখে পড়ে জীবিকা বন্ধ না হয়ে যায় তারই রক্ষাকবচের মতই প্রতিষ্ঠানের নামকরণে মায়েরদোয়া বা মায়ের আশীর্বাদ প্রচলিত হয়ে এসেছে এতোদিন ধরে। আবার একই সাথে মা যে নারী, সেই নারী হিসেবে তার মানবিক অধিকারটিকে অনেকাংশে অস্বীকার করতে কিন্তু এই সমাজই বিব্রত বোধ করেনা। পৃথিবীর সব দেশে, সমস্ত সভ্যতাতেই জন্মদায়িনী মাকে নিয়ে আবেগ বাহুল্য আছে কিন্তু কয়টা দেশে এরকম ব্যবসা-বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সাথে মায়ের আশীর্বাদকে যুক্ত করে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়। এই অসঙ্গতিই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয় আর তার উত্তর খোঁজার প্রয়াসেই এই অনুসন্ধানের অবতারণা।
(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ

সহীহ্ বোখারী শরীফ : ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল, ২০১১। অনুবাদ: শায়খুল হাদীস মাওলানা মোহাম্মদ আজীজুল হক। সোলেমানিয়া বুক হাউস, ঢাকা,(অখণ্ড সংস্করণ)।






মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

চলুক।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

কর্ণজয় এর ছবি

সামাজিক ইতিহাস উঠে এসেছে সুন্দর করে।।।।
আমি জানি না, কিন্তু আমার ধারণা, মায়ের দোয়া’র বিষয়টা ভারতীয় সংস্কৃতির বাইরেও অন্যান্য অঞ্চলেও খুঁজে পাওয়া যাবে।।।। পৃথিবী জুড়েই -

সোহেল ইমাম এর ছবি

লেখাটা পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনি ঠিক বলেছেন, বিষয়টা মনে হয় পৃথিবীর অনেক সংস্কৃতিতেই পাওয়া যাবে কিন্তু আমাদের এখানে যেমন ভাবে এই আধুনিক যুগ অবধি একটা টুকরো বিশ্বাস হয়ে টিকে আছে তেমনটা কি কোথাও দেখা যায়। আপনার জানা থাকলে জানাবেন।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

আয়নামতি এর ছবি

আমার মনে হয় কী জানেন? এসব বন্দনা এক ধরনের স্বার্থপর চিন্তা থেকে আগত। যেমনটা জন্মভূমিকে মায়ের সাথে তুলনা হয়ে আসছে।কেন? না মা বীরের জন্ম দেবেন তবেই না দেশ বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে। নারী কেবলই উপলক্ষ্য। মা মা করে মুখে ফেনা তোলা এই আমাদের গালিগুলোও বেশির ভাগই মা বা নারী কেন্দ্রিক। কী কিউট ব্যাপার! পৃথিবীর নানান দেশে মায়ের প্রতি সম্মান বা আবেগ প্রদর্শনের রীতি কমবেশি থাকলেও এই উপমহাদেশের মত তাকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সেভাবে ব্যবহার করা হয় বলে জানা নেই। জানতে আগ্রহী।

সোহেল ইমাম এর ছবি

আপনার সাথে সহমত আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অনুসন্ধানটা চালাতে চাইছি। অনেক ধন্যবাদ লেখাটা পড়ার জন্য।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মন মাঝি এর ছবি

একটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন - বেশির ভাগ ইন্দো-ইউরোপীয় আর অনেক আফ্রিকান ভাষাতেই 'মা' বোঝাতে যে শব্দটা ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে আক্ষরিক এবং প্রায় অবধারিত ভাবেই এই 'মা' অংশটুকু কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই আছে? ইটাইমোলজি ঘাটলে এইসব শব্দের অতীত রূপগুলির মধ্যেও একই রকম সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। 'মা' শব্দটা প্রায় ইউনিভার্সাল। অথচ এটা সহজেই একেক ভাষায় একেক রকম হতে পারত। অদ্ভূত না?

****************************************

সোহেল ইমাম এর ছবি

অদ্ভুত, সত্যি অদ্ভুত। খুবই আগ্রহোদ্দীপক একটা বিষয় এটা।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA