“মায়ের দোয়া”র শিকড় সন্ধানে : তৃতীয় পর্ব

সোহেল ইমাম এর ছবি
লিখেছেন সোহেল ইমাম [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ৩১/০৫/২০১৮ - ৪:৪৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমাদের সেই আদিম যুগের সমাজেও জন্মদানের সাথে পুরুষদের সম্পর্ক আবিস্কৃত হয়নি বলেই মা’ই সব সম্পর্কের কেন্দ্রভূমি হয়ে দাঁড়ায়। বংশধারা মায়ের সূত্রেই প্রবাহিত হতে থাকে। পিতা সম্পর্কিত কোন ধারণাই সে সময় জন্মাবার কথা নয়। সমাজের নেতৃত্ব পুরুষের হাতে থাকলেও সন্তানের রক্ত সম্পর্কিত অধিকারটা মায়ের সাথেই ছিলো। তাছাড়া নারীর সন্তান জন্মদানের ঘটনাতেও নারী বিশিষ্ট হয়েছিলো। পুরুষরা আরেকটা মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনা কিন্তু নারী পারে। এই বিস্ময়কর ক্ষমতা নারীদের অনন্য করে তুলে ছিলো। নারীর ঋতুশ্রাবও পুরুষের মনে বাস্তবাতিরিক্ত একটা অলৌকিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে তোলে। পুরুষের শরীর থেকে রক্তপাত হয় যখন দৃশ্যমান কোন শত্রু দ্বারা বা দুর্ঘটনায় সে আঘাত পায়, কিন্তু নারী রক্তাক্ত হচ্ছে কোন দৃশ্যমান, বোধগম্য আঘাত ছাড়াই। তবে কি কোন অদৃশ্য শত্রু তাকে আঘাত করছে। অদৃশ্য ও অজানা কোন জগতের সাথে যেন নারীর যোগসূত্র রয়েছে, সেখান থেকেই সে আরেকটা মানব সন্তান নিজের শরীরের মাধ্যমে এ জগতে নিয়ে আসে। এ একেবারেই পুরুষের ক্ষমতার বাইরের চৌহদ্দি। ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধার এই অনুভব থেকেই নারীকে ঘিরে কিছু অলৌকিক বিশ্বাসের জন্মও এখান থেকেই। নারী রজঃস্বলা হবার পরই যেহেতু সন্তানবতী হয়ে ওঠে তাই নারীর রজঃশ্রাবও যাদুমিশ্রিত একটা ভয়, বিস্ময় আর শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলে পুরুষের মনে। নারীর প্রকৃতির মধ্যের এই উর্বরতা শক্তি শিকারের পশুর আর পারিপার্শ্বিক বনভূমিতে ফলমূলের যোগানও বাড়িয়ে দিতে পারে এই বিশ্বাসটাও ক্রমে শিকড় গেঁড়ে বসতে থাকে। শিকারের দল দূর দূরান্তে বেরিয়ে পড়লে আবাস স্থলের কাছেই নারীদের বড় একটা অংশ ছোট মাটি খোঁড়ার লাঠি দিয়ে আশপাশের গাছের গোড়া খুঁচিয়ে খাবার যোগ্য মূল-কন্দ তুলে আনতো। আশপাশের ফল-পাকুড়ের সংগ্রহটাও মেয়েদেরই কাজ ছিলো। আর এসব ফলের বীজ থেকে গাছ সৃষ্টির বিষয়টাও সম্ভবত মেয়েরাই প্রথম খেয়াল করে। যেদিন শিকার পাওয়া যেতোনা সেদিন আশপাশের ঝোপঝাড় খুঁজে মেয়েদের এই তুলে আনা মূল-কন্দই হতো প্রধান খাদ্য। ফলে খাদ্য সংগ্রহের আর জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে মেয়েদের অবদানটাকে অস্বীকার করা চলতোনা।

আধুনিক যুগে আবিস্কৃত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের আদিবাসীদের সমাজেও নারীর এই উর্বরতা কেন্দ্রিক যাদুবিশ্বাসের উপস্থিতিই প্রমাণ করে আমাদের পূর্বসুরীদের সমাজেও এভাবেই এই যাদুবিশ্বাস মূলক আচারের সৃষ্টি হয়েছিলো। আদিম চিন্তা অনুসারে, মেয়েরা যে সার্থকভাবে কৃষিকাজের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে তার কারণ মেয়েদের মধ্যে একটি অদ্ভুত শক্তি লুকোনো আছে; এই শক্তির দরুনই মেয়েরা সন্তানবতী হয় এবং এই শক্তির প্রভাবে তারা পৃথিবীকেও ফলপ্রসূ করে। আমেরিকার ওরিনোকো বলে রেড-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে দেখা যায়, প্রখর রোদে মেয়েরা ছেলে কোলে ক্ষেতের কাজ করছে। এই নিয়ে জনৈক খৃষ্টান পাদ্রী দলের পুরুষদের ভর্ৎসনা করলে জবাব পান, “এসব ব্যাপার আপনি বোঝেননা বলেই অমন বিরক্ত হচ্ছেন। আপনিতো জানেন, একমাত্র মেয়েরাই সন্তানের জন্ম দিতে পারে; আমরা পুরুষরা তা পারিনা। তাই মেয়েরা যখন বীজ বোনে তখন জনার-ক্ষেতে প্রতি ডাঁটায় দুটো – এমন কি তিনটে করে শিষ গজায়, ম্যানিওক ক্ষেতে প্রতিটি গাছ থেকে দু’তিন ঝুড়ি করে মূল পাওয়া যায়। কেন? কেননা, মেয়েরা জানে কেমন করে সন্তানের জন্ম দেওয়া যায় এবং সেইভাবেই ওরা ক্ষেতের ফসলকেও অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। বীজ বোনার পর তা থেকে কী করে শস্য উদ্গম হবে তা শুধু ওরাই জানে। তাই বীজ বোনার কাজটা ওদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। এসব ব্যাপারে আমাদের চেয়ে ওরা ঢের ভালো জানে” (দেবীপ্রসাদ,১৩৬৩;পৃ:৩৭২)। ব্যাভেরিয়া আর অষ্ট্রিয়ার চাষীরা এখনো বিশ্বাস করে যে, অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে গাছের প্রথম ফলটি খাওয়ানো গেলে পরের বছর সেই গাছ থেকে অজস্র বেশি ফল পাওয়া যাবে। স্যার জেমস ফ্রেজার বলছেন, এর থেকেই বোঝা যায়, প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার আশায় নারীর ফলপ্রসূতার উপযোগিতায় কতোখানি বিশ্বাস তাদের ছিলো। আবার উগাণ্ডায় সাধারণের বিশ্বাস, বন্ধ্যা স্ত্রী ক্ষেতের পক্ষে ক্ষতিকর, বহুসন্তানবতী স্ত্রীর দরুন ক্ষেত থেকেও বহুলভাবে ফসল পাওয়া যায়। নিউজিল্যাণ্ডে দেখা যায় অন্তঃসত্ত্বা নারী সম্বন্ধে যে-সব বিধি নিষেধের ব্যবস্থা আছে, ঠিক সেই বিধিনিষেধই রাঙালুর চাষ করবার সময় কর্মরত মেয়েদের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে। ব্রিফল্ট দেখাচ্ছেন, এমন কি আজকের ইয়োরোপে চাষীদের মধ্যে এই ধরনের বিশ্বাসের রেশ দেখা যায়। যেমন দক্ষিণ ইতালিতে কৃষকেরা মনে করে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মেয়েরা যদি বীজ বোনে তাহলে গর্ভস্থ ভ্রূণের অনুপাতেই গাছটি বড়ো হবে (দেবীপ্রসাদ, ১৩৬৩;পৃ:৩৭২)।

রবার্ট ব্রিফল্ট একের পর এক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন মেয়েরাই যে কৃষিকাজ আবিস্কার করেছিলো তার স্মৃতি নানান দেশের আদিম মানুষদের নানা উপকথায় আজো টিকে আছে। চেরোকি জাতির লোকেরা এখনো বিশ্বাস করে, পৃথিবীর প্রথম নারীই বনের মধ্যে শস্য আবিস্কার করেছিলো, মারা যাবার সময় সেই নারী নির্দেশ দিয়ে যায় যে, মাটির উপর দিয়ে তার শবদেহ টেনে নিয়ে বেড়াতে হবে – জমি সেই শবদেহের স্পর্শে শস্যশ্যামল হয়ে ওঠে। চেইন্নেসদের মধ্যেও বিশ্বাস যে, একজন মেয়েই প্রথম শস্য আবিস্কার করেছিলো। ব্রাজিলে টুপিসদের উপকথায় আছে, একটি কুমারী মেয়ে একবার অন্তঃসত্ত্বা হয় আর তার গর্ভজাত শিশুটির মৃতদেহ থেকেই পৃথিবীর প্রথম শস্য জন্মায়। আফ্রিকার দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলে নানা আদিবাসীদেরও বিশ্বাস, শস্য আবিস্কার করেছিলো পৃথিবীর এক আদি-নারী (দেবীপ্রসাদ,১৩৬৩;পৃ: ৩১১)।

ভিলরা ফসল বোনবার আগে ক্ষেতের একটি পাথরের গায়ে সিঁদুর মাখায়। এ হলো ক্ষেতকে রজঃস্বলা করবার একটা নকল তোলা। পিছিয়ে পড়া পর্যায়ের মানুষদের ধারণায় ওই ঋতুরজই প্রজননের প্রধানতম উপকরণ (দেবীপ্রসাদ,১৩৬৩;পৃ: ৩৪৮)। তন্ত্রের সাধনরীতিতে পদ্মচিহ্নের সঙ্গে পূর্ণঘট প্রতিষ্ঠার যে বিধি রয়েছে, সেটি বাঙালির ঘরে ব্রতাচারেও পালিত হয়। গর্ভবতী নারীর প্রতীক রূপেই যে জলপূর্ণ মঙ্গলঘট প্রতিষ্ঠা করা হয় তার গায়ে ‘পুত্তলী’ এঁকে এবং ওপরে শিস সমেত ডাব (সেও গর্ভবতী নারীর মধ্যদেশের সংকেতবাহী) রেখে, এ তো তাঁদের অজানা নয়। তাহলে বাঙালি মেয়ের ব্রতাচারের মধ্যেও প্রচ্ছন্ন রয়েছে, সেই মাতৃকা উপাসনার আদিম ধারাটিই (পল্লব সেনগুপ্ত, ২০০১;পৃ:৬৮)। বহু সময়েই ব্রতের আরাধ্যা দেবী বড় বা ছোট একটি ঘটের প্রতীকে গৃহীতা হন যে, তার মধ্যেও একটি আদিম সংস্কার সক্রিয় হয়ে আছে। ঘট আদিম কাল থেকেই অন্তর্বত্নী নারীর সংকেতবহ রূপে গণ্য। বড় জালা জাতীয় পাত্রের মধ্যে মৃতদেহকে (ভ্রূণরূপে পুনর্জন্মের জন্য?) বিন্যস্ত করে সমাধি দেবার রীতির মধ্যে ঐ ধারনার প্রমাণ মেলে। চণ্ডী, মনসা, ইতু ইত্যাদি ব্রতদেবীরা তো ঘটের মাধ্যমেই প্রতীকায়ত হন, বহু ক্ষেত্রেই লক্ষ্মীর এবং ষষ্ঠীর প্রতীকও ঐ ঘটই। বটের ডাল, মনসার ডাল, অশ্বত্থের ডাল, আমের ডাল ইত্যাদিও ঘটের সঙ্গে অতি প্রয়োজনীয় উপচার হিশেবে যে ব্যবহৃত হয়, তার পিছনে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক বৃক্ষপূজার ধারা। কলাগাছের ব্যবহারের পিছনে একটি কারণ উর্বরতার প্রতীকপূজা বটে, কিন্তু বৃক্ষোপাসনার উত্তরসরণও অন্যতর হেতু। মোচ, মোচার খোলা, থোড়, দুর্বা, হলুদ প্রভৃতি অনুরূপ ভাবনা সঞ্জাত (পল্লব সেনগুপ্ত, ২০০১;পৃ:১০১-১০২)। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ও আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এখন যে সিংহবাহিনী দশভুজা দুর্গার প্রতিমা গড়িয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বর্ষ পূর্বে ঠিক এমনভাবের প্রতিমা বাংলার করিকর গড়িতনা। গোড়ায় যখন সিংহবাহিনীর মৃন্ময়ী মূর্তির পূজা এদেশে প্রচলিত হয়, তখন কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী, কেহই ছিলেননা।আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময়ে যে প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডীমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে উৎসব করিয়া থাকি, সে উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয়না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণ ঘটের, দেবীকে আহ্বান করিতে হয় যন্ত্রে ও ঘটে (দেবীপ্রসাদ,১৩৬৩;পৃ:৪০৩)।

নারীর উর্বরতা শক্তি সংক্রান্ত এই যাদুবিশ্বাসই যে আমাদের এই মানব সভ্যতার পূর্বসুরিদের মাতৃকা পূজায় উৎসাহিত করেছিলো তার প্রত্ন নিদর্শনও যথেষ্টই পাওয়া গেছে। প্রত্ন-প্রস্তরকালের ছোট ছোট যে সমস্ত আদিম ভাস্কর্যের নিদর্শন আমরা পেয়েছি, তাদের সব কটিই কৃষির আবিস্কারের বহু হাজার বছর আগের শিল্পীদের সৃষ্টি। এই মূর্তিগুলি আদিম মানুষের মাতৃতান্ত্রিক চেতনার লব্ধফল যে সে বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। অবয়বগত ভাবে অন্যান্য সব কিছুর সুস্থিত বিন্যাসের পরিবর্তে, মূর্তিগুলির শুধুমাত্র স্ত্রী-বৈশিষ্ট্য সমূহ এমনভাবেই প্রকটিত করা হয়েছে এবং প্রতিটি মূর্তিকেই গর্ভবতী জননী হিসেবে তৈরী করা হয়েছে যে এর থেকেই ঐ কথার সমর্থনে যুক্তি মিলবে। এই সমস্ত মাতৃকামূর্তি, প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় যাদের নাম ‘ভেনাস ফিগারাইনস’, নির্মিত হয়েছিল কমবেশি ২৫,০০০বছর আগে তো বটেই : অর্থাৎ, প্রত্নপ্রস্তর যুগের শেষদিকে; অন্তত পক্ষে শেষ তুষারাচ্ছন্ন পর্বের মধ্য লগ্নে। অস্ট্রিয়ার ভিলানডর্ফে পাওয়া ভেনাস, ফ্রান্সের ল্যাসেলে পাওয়া ভেনাস এবং ইতালির সাভিন্যানোতে আবিস্কৃত ভেনাস- মাত্র এই তিনটি নিদর্শের মধ্যেই শুধু প্রত্ন-প্রস্তর যুগের মাতৃতান্ত্রিকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে, এমন নয়; এ ধরনের অজস্র মূর্তি মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ, প্রাক্তন দক্ষিণ-পশ্চম সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র, উত্তর-পশ্চিম মেসোপোটেমিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে আবিস্কৃত হয়েছে। তবে মাতৃকাতন্ত্রের ভৌগোলিক ব্যাপ্তি প্রায় সারা পৃথিবী জুড়েই ঘটেছিল; অত প্রাচীন প্রত্ন নিদর্শ সর্বত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি বটে (অথবা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খোঁজা হয়নি; যেমন এদেশে), কিন্তু পরবর্তীকালীন ধর্মচেতনার বিকাশে, লোকপুরাণের বিবর্তন এবং লোকায়ত বিশ্বাসের ধারা ইত্যাদি বিষয় বিচার ও বিশ্লেষণ করে দেখলে সেই প্রসঙ্গে একটুও সন্দেহ থাকেনা (পল্লব সেনগুপ্ত, ২০০১;পৃ: ৬৩-৬৪)।

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পাওয়া প্রাচীন মাতৃকা দেবতা

এই মাতৃকাপূজার নিদর্শন যে ভারতবর্ষেও পাওয়া গেছে সে সম্পর্কে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, মোহেনজোদারো ও হরপ্পায় খুঁজে পাওয়া গেলো প্রাক-আর্য যুগের বাস্তব কীর্তি। এই প্রসঙ্গে প্রাক-আর্য যুগের যে বাস্তব কীর্তিগুলিকে স্যার জন মার্সাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান মনে করলেন তা হলো অজস্র পোড়া মাটির ছোটো ছোটো নারীমূর্তি। এই জাতীয় নারী মূর্তি হরপ্পা এবং মোহেনজোদারো উভয় স্থানেই পাওয়া গেলো – শুধু তাই নয়, বেলুচিস্তানের স্থান বিশেষেও প্রত্নতত্ত্বমূলক খনন কাজের ফলে এই জাতীয় বহু মূর্তি আবিস্কৃত হয়েছে। স্যার জন অনুমান করছেন, এগুলির মধ্যে কয়েকরকম মূর্তিকে হয়তো নিছক খেলার পুতুল মনে করা যেতে পারে; কিন্তু সবগুলিকে পুতুলমাত্র মনে করার অবকাশ নেই। এগুলির মধ্যে কয়েক রকম মূর্তির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্যার জন উল্লেখ করছেন, একরকম নারীমূর্তির কোলে সন্তান, আর এক রকম নারীমূর্তির গর্ভে সন্তান। স্যার জন মনে করেন এই মাতৃমূর্তি গুলির সঙ্গে সন্তান কামনা ও ফসল কামনা মূলক জাদুবিশ্বাসের যোগাযোগ থাকা খুবই সম্ভব (দেবীপ্রসাদ,১৩৬৩;পৃ:৩৭৯-৩৮০)।

সন্তান কোলে সিন্ধুসভ্যতার মাতৃকামূর্তি

মানব সমাজের সেই আদিম পর্বে নারীদের উর্বরতামূলক যাদুবিশ্বাসের আচার অনুষ্ঠান তাই খাদ্য আহরণের সাথেই ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িয়ে গিয়েছিলো। এবং এটাই অনুমান করা যুক্তিসঙ্গত প্রথমটা এই যাদুবিশ্বাস মূলক আচারের দায়িত্ব মেয়েদের উপরই ন্যাস্ত ছিলো। নারীর অলৌকিক শক্তি যা পুরুষ ঠিক মত বুঝে উঠতে পারেনা তা নারীদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ও তন্ত্রধর্মের আলোচনায় দেখাতে চেয়েছেন আদি কালে নারীর উর্বরতা কেন্দ্রিক এই আচার নারীদের দ্বারাই অনুষ্ঠিত হতো। তন্ত্রে যেমন আছে বামা ভুত্বা যজেৎ পরাম – পরাশক্তিকে বামা হয়ে পূজা করতে হবে। এবং একথা শুধুমাত্র আচারভেদ তন্ত্রের কথা নয়, তন্ত্রের প্রধানতম কথা। তাই স্যার ভাণ্ডারকর বলছেন: এই সম্প্রদায়ের নিষ্ঠাবান অনুসারকের উচ্চাকাঙ্খা হলো, ত্রিপুরাসুন্দরীর সঙ্গে অদ্বৈতভাব স্থাপন করা এবং এই সাধনপদ্ধতির একটি অঙ্গ হলো নিজেকে নারী জ্ঞান করতে অভ্যস্ত হওয়া। অতএব, শাক্ত সম্প্রদায়ের অনুগামীরা নিজেদের পদবীটিকে এই বলে ব্যাখ্যা করেন যে, ঈশ্বর নারীই এবং নারীত্বই সকলের আদর্শ। তন্ত্র সাধকেরা এই রকম নারীভাবে সাধনা করার চেষ্টা করেন কেন? এ প্রশ্নের একটিই বৈজ্ঞানিক উত্তর সম্ভবপর: তন্ত্রসাধনা আদিতে নারীদেরই সাধন পদ্ধতি ছিলো – নারীভাবে সাধনা তারই স্মারক (দেবীপ্রসাদ, ১৩৬৩;পৃ: ৩৫৪-৩৫৫)।

সুতরাং খাদ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে চাইলে, জীবিকাকে অবিচ্ছিন্ন রাখতে চাইলে নারীর উপরেই নির্ভর করতে হবে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাটা সম্মানটা বজায় রাখতে হবে, নারীর কৃপাদৃষ্টিতে থাকতে হবে। কিন্তু আদিম যুগটাও অনড় হয়ে বসে ছিলোনা, সেই সময়টাও পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছিলো। আর জীবিকার হাতিয়ারের উন্নতি হতে থাকলে গাছের ডাল বা সেই ডালের ভারি অংশ দিয়ে তৈরী করা মুগুরের জায়গায় পাথরের ধারালো ফলার বর্শা, তীর-ধনুক আবিস্কারের সঙ্গে সঙ্গে শিকারও বাড়তে থাকলো। আরো পরে মেয়েদের বীজ থেকে গাছ জন্মানোর শিক্ষাটা থেকে কৃষির প্রচলন হলে সমাজে ক্রমান্বয়ে প্রথমে উদ্বৃত্ত খাদ্য ও পরে তা-ই সম্পত্তির জন্ম দেয়। আর স্বাভাবিক ভাবেই ‍পুরুষ প্রধান নেতৃত্ব সেই সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে। এই যে সম্পত্তির মালিকানা অর্জন এটা পুরুষদের মনে অপরিমিত আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এখান থেকেই তারা ভাবতে শুরু করে নারীদের আচার গুলোর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই চলে আসা উচিত। নারীর আচারটা রইলো কিন্তু তা এখন থেকে অনুষ্ঠিত হতে থাকলো পুরুষদের হাতে । কিন্তু নারীর অলৌকিক উর্বরতা শক্তিতে বিশ্বাসের রেশ তখনও কেটে যায়নি। শুধু সম্পত্তির মালিকানাই নয় পুরুষরা চাইলো নারীর যে প্রভাব সমাজে তখনও রয়ে গেছে তাকে খর্ব করে সেটাও করায়ত্ব করতে। নারীকে তখন থেকেই দুর্বল, কোমল, অশক্ত দেখানোর একটা প্রবণতার শুরু। ক্রমে নারীর এই প্রভাবকে খর্ব করতে নারীকেও সম্পত্তির অংশে পরিণত করবার প্রয়াসও শুরু হয়ে যায়। সমাজে তখন সম্পত্তির মালিকানার ফলেই শ্রেণিভেদ দেখা দিয়েছে যা এর আগে সৃষ্টি হতেই পারেনি। পরে এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রশক্তির জন্ম হয়। আর এই সময়টা থেকেই নারীর সামাজিক প্রভাবও ক্রমান্বয়ে ক্ষুন্ন হতে শুরু করে। যাদুবিশ্বাস মূলক আচারের সাথে দেবপূজা যুক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যুগের মাতৃকা মূর্তিগুলো যা উর্বরতা কেন্দ্রিক যাদুবিশ্বাসমূলক আচারেই ব্যবহৃত হতো সেগুলোও দেবী চরিত্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজ যখন শোষণ, শাসনে সমাজের বৃহৎ একটা অংশকে বঞ্চিত করে একটা শোষক শ্রেণির জন্ম দেয় তখন পুরুষ দেবতারা আগের নারীদেবতাদের সরিয়ে প্রধান হয়ে উঠতে শুরু করে। আগের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী নারী দেবতারা তখন পুরুষদেবতার নিস্ক্রিয় পত্নীতে পর্যবসিত হয়। বৈদিক সাহিত্যে তাই আমরা কোন শক্তিশালী দেবী মূর্তি পাইনা, সেখানে সবই পুরুষদেবতারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর্যরা তাদের বৈদিক সভ্যতা নিয়ে ভারতবর্ষে যতই এগিয়েছে, আধিপত্য বিস্তার করেছে ততই ভারতীয় আর্যশাস্ত্রে পুরুষ দেবতারাই প্রধান হয়ে উঠলো। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এই ত্রিমূর্তির ভেতরে কোন নারী দেবতার স্থান হয়নি। দেবাদিদেব বলতে, পরমেশ্বর বলতে কেবল পুরুষ দেবতাদেরই বুঝিয়েছে।
(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ
১. লোকায়ত দর্শন : দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ১৩৬৩ ব.। নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
২. পূজা পার্বণের উৎসকথা : পল্লব সেনগুপ্ত, ২০০১। পুস্তক বিপনি; কলকাতা। তৃতীয় সংস্করণ ।

ছবির লিঙ্ক :
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পাওয়া প্রাচীন মাতৃকা দেবতা
সন্তান কোলে সিন্ধুসভ্যতার মাতৃকামূর্তি

আগের পর্বের লেখার লিঙ্ক :
“মায়ের দোয়া”র শিকড় সন্ধানে : প্রথম পর্ব
“মায়ের দোয়া”র শিকড় সন্ধানে : দ্বিতীয় পর্ব


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

সিরিজটার শুরুতে কিছুটা আঁচ করেছিলাম আপনি কোথায় নিয়ে যাবেন আমাদের। আপনার হাত ধরে এই ভ্রমণটা দুর্দান্ত যে কোন পাঠকের জন্য।

--- মোখলেস হোসেন

সোহেল ইমাম এর ছবি

ধন্যবাদ মোখলেস ভাই। ভ্রমণটা কতখানি দুর্দান্ত হবে ঠিক জানিনা, কিছু জিজ্ঞাসা মনে জেগেছে বলেই এই অনুসন্ধান।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

হিমু এর ছবি

কয়েক হপ্তা আগে ‌এক প্রবন্ধ সংকলনে পল্লব সেনগুপ্ত আর হাইনৎস মোডের দুটো প্রবন্ধ পড়ে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলাম। যদিও খুবই ভিন্ন প্রসঙ্গে, তারপরও আরো কিছু উৎস থেকে যোগ করে বলি। আদি ভারতবর্ষে (অর্থাৎ যখন পশ্চিম ভারতে সিন্ধুর সাতটি শাখাই বেগবতী ছিলো) সিংহ ছিলো না। সিংহ থাকে শুকনো অঞ্চলে, যেমন এখন গুজরাটের মরুময় এলাকায় আছে। এ সিংহগুলো এ অঞ্চলে এসেছে অনেক পরে। কিন্তু ভারতীয় দেবকল্পনায় সিংহকে প্রায়ই একটি অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা যায়, যেমন দুর্গার বাহন সিংহ। অথচ ভারতবর্ষের যে "স্থানীয়" দুটি নৃশিকারী পশু, বাঘ আর চিতাবাঘ, কুশীলব হিসেবে এদের খুব একটা দেখা যায় না আর। দেশী বাঘের এই অনুপস্থিতি আর ভিনদেশী সিংহের উপস্থিতি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার। একটা অনুমান এমন, সিংহ মূলত ঊষর মধ্যপ্রাচ্যের কৃষিকেন্দ্রিক মাতৃকাশক্তিপূজারী প্রাকসাম্রাজ্যের প্রতীক। এই মাতৃকাশক্তি র ধারণাটি আবার পূর্ব দিকে গিয়ে ভারতবর্ষেও শেকড় পেয়ে যায় (আরবিসহ বেশ কিছু মধ্যপ্রাচ্য ভাষায় মা-কে বলা হয় উম্মু, যেটি প্রায় অবিকৃত অবস্থায় উমা নামে দুর্গা/পার্বতীকে নির্দেশ করে)। হরপ্পা-মহেঞ্জোদোরোর বেশ কিছু চিত্রে কেমন করে মানুষের হাতে অরণ্য সাফ হওয়ার পর স্থানীয় অরণ্যনির্ভর বাঘ সেখান থেকে "চলে" গেলো, সেটা দেখানো আছে। এই হরপ্পা সমাজে বাঘ আর মহিষ ছিলো দুটি ভিন্ন গোষ্ঠীর কুলকেতু, যার মাঝে বাঘগোষ্ঠীরা কোনো এক মাতৃকাশক্তির পূজারী ছিলো, আর মহিষগোষ্ঠীরা ছিলো আদি ভারতের আটবিক দেবতা শিবের পূজারী। এ দুয়ের মাঝে সংঘর্ষে মহিষগোষ্ঠী বাঘগোষ্ঠীর হাতে কাবু হয়, যেটিকে পরে ব্যাঘ্রবাহিনী মাতৃকাশক্তির হাতে মহিষরূপী অসুরের পরাজয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখান থেকেই দুর্গা-মহিষাসুর ছাঁচটির উদ্ভব। পরবর্তীতে বৈদিক আর্যদের চারণসমাজ যখন হরপ্পার কৃষিসমাজকে পরাভূত এবং গ্রাস করে, এবং পশ্চিম থেকে প্রাকসাম্রাজ্যের ধারণাটি এসে এই ধারাটির সাথে মিশে যায়, তখন এই ছবিটি থেকে বাঘকে সরিয়ে সিংহ বসানো শুরু হয় (সিংহ শব্দটিও রাজশক্তির নানা প্রতীকের সাথে যুক্ত, যেমন সিংহদুয়ার, সিংহাসন), কারণ বাঘ এই নতুন সমাজে মাতৃকাশক্তির মতোই আটবিক অনার্য শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে (যেমন আটবিক দেবতা শিবকে বাঘছালের ওপর আসীন কল্পনা করা হয়)। প্রথমেই বাঘকে সরাসরি বাদ দেওয়া হয়নি, তাকে পেছনে ঠেলে সিংহকে সামনে আনা হয়েছে। তারপর সময়ের সাথে বাঘ এক সময় পুরোপুরি হাপিস হয়ে যায়। একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলো কোচবিহার, যার রাজশক্তি বরাবর অনার্য ছিলো। কোচবিহার থেকে পাওয়া প্রাচীন এবং নবীন দুর্গা সিংহবাহিনী নয়, তার বাহন বাঘ।

চলুক, পরের পর্বের অপেক্ষায় আছি।

সোহেল ইমাম এর ছবি

লেখাটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ হিমু ভাই। খুবই আকর্ষনীয় একটা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন মন্তব্যে। সিংহটা সত্যিই বারবার মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মসংস্কৃতির কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এ বিষয়ে আপনি আবার নতুন আগ্রহ জন্মিয়ে দিলেন। পল্লব সেনগুপ্ত আর হাইনৎস মোডের প্রবন্ধ দু’টো কি ঐ একই প্রবন্ধ সংকলনের মধ্যে আছে। সংকলনটা পড়তে ইচ্ছে করছে হিমু ভাই।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

হিমু এর ছবি

আপনার হাতে পৌঁছানো যায় কি না দেখছি। এই সিরিজটা চলুক সেই অবসরে।

লীন এর ছবি

ভারতে পশ্চিম বাংলা ছাড়া অন্য অঞ্চলে, যেমন - মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দিল্লী ইত্যাদি জায়গায় কিন্তু ব্যাঘ্রবাহিনী নব দুর্গার পূজা হয় দেখেছি। যেখানে দূর্গার আট হাত।দূর্গার সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি শুধু বাঙালি পূজা গুলোতে দেখেছি। কেন অঞ্চল ভেদে দূর্গার আলাদা আলাদা রূপের পূজা হয় সেইটা জানা নেই।

হিমু এর ছবি

হয়তো বাঘ ওখানে ছোটো-বড় পকেটে টিকে গিয়ে আবার ছড়িয়ে পড়েছে? এ নিয়ে দেখি আরো কিছু পড়তে পাই কি না।

হাসনাইন মেহেদী  এর ছবি

শেরাওয়ালী মা?

সোহেল ইমাম এর ছবি

এই বাঘবাহন বিশিষ্ট দুর্গা প্রতিমা ঠিক কতদিন যাবত তৈরী করা হচ্ছে সেটাও দেখার বিষয়। এমন হতে পারে এই বাঘবাহন বিশিষ্ট দুর্গা মূর্তি গুলো আধুনিক যুগেই তৈরী হচ্ছে হয়তো আগে হতোনা। মূর্তিতত্বের ইতিহাসেও একবার ঘেঁটে দেখা যায়।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক এর ছবি

প্রবন্ধ সঙ্কলনের নামটা জানাবেন কি?

Emran

হিমু এর ছবি

নাআআআ। সোহেল ইমামকে দিই, উনি তারপর রয়েসয়ে লিখবেন। ধজ্জি ধরেন।

সোহেল ইমাম এর ছবি

হাসি

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক এর ছবি

নাম না জানানো আপনার অধিকার। আমি যেখানে থাকি, সেখানে বই সংগ্রহ করা কঠিন। আমার এক ভারতীয় সহকর্মী বর্তমানে ছুটিতে কলকাতায় আছেন, দুই সপ্তাহ পরে ফিরবেন। বাংলা বই হলে তাঁকে কলকাতা থেকে নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করতে পারতাম। যাই হোক, আশা করি সোহেল ইমাম দুই সপ্তাহের মধ্যে বই পড়ে তাঁর লেখা লিখতে পারবেন।

Emran

তুলিরেখা এর ছবি

ব্যাঘ্রবাহিনী দেবী জগদ্ধাত্রীও আছেন, পূজিতা হন দুর্গাপূজা ও কালিপূজার পর যে শুক্লপক্ষ আসে, সেই শুক্লপক্ষে।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

সোহেল ইমাম এর ছবি

যত জানছি ততই আরো চমতকৃত হচ্ছি। এই ব্যাঘ্রবাহিনী দেবী জগদ্ধাত্রীর পুজো কি বাংলার পরিমণ্ডলেই হয়?

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

তুলিরেখা এর ছবি

পশ্চিমবঙ্গে চন্দননগরের আর কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রীপূজা বিখ্যাত। রিষড়ারও। খোঁজখবর করে দেখলাম ওড়িশাতেও জগদ্ধাত্রীপূজা হয়।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

লীন এর ছবি

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী কিন্তু সিংহবাহিনী, অন্তত আমি যতগুলো দেখেছি। হাসি প্রথমে হাতি, তার ওপরে সিংহ আর সিংহের পিঠে জগদ্ধাত্রী বসেন। দেবী জগদ্ধাত্রীর চার হাত। কৃষ্ণনগর আর ওড়িশার টাতে কি বাহন জানি না।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

জগদ্ধাত্রী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা (শঙ্খ-চক্র-ধনু-বাণ), সিংহবাহিনী। প্রথমে যে হাতির কথা বললেন সেটা হচ্ছে 'করীন্দ্রাসুর'। তার পিঠে সিংহ আর সিংহের পিঠে দেবী। একটু লক্ষ করলে দেখবেন জগদ্ধাত্রী দেবীর মধ্যে দুর্গা ও কালী উভয় দেবীর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। জগদ্ধাত্রী পূজার আচার অনুষ্ঠানেও পূর্বোক্ত উভয় পূজার বৈশিষ্ট্য প্রবলভাবে বিদ্যমান। সুতরাং অঞ্চলভেদে দেবীর বাহন কোথাও কোথাও পালটে যাওয়াটা মনে হয় বিচিত্র কিছু না।

পূর্ববঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে জগদ্ধাত্রী পূজার ইতিহাস হাজার বছরের বেশি। সুতরাং বঙ্গোপসাগরের অন্য পাড়ের উৎকল, কোশল অঞ্চলে এই পূজা হবে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। সেখানে তিনি সিংহবাহিনী বলে জানি। বালাসোর, ময়ুরভঞ্জ এলাকার জগদ্ধাত্রী পূজা বেশ জাঁক করে করা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের কোন কোন জায়গাতেও জগদ্ধাত্রী পূজা হয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

লীন এর ছবি

ধন্যবাদ তথ্য গুলোর জন্য চলুক

তুলিরেখা এর ছবি

জগদ্ধাত্রীপূজা নিয়ে ইমেজ সার্চ করলাম, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাহন সিংহ দেখলাম, কিছু ক্ষেত্রে মনে হল বাঘ। যেমন এই নিচের ছবিটিতে মনে হচ্ছে বাহন বাঘ।
http://www.clickingphotos.com/2014/10/jagadhatri-puja-of-chandannagar.html

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দক্ষিণ রায়, বনবিবি এদের বাহন বাঘ। এদের আর্য্য নাম কী?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তুলিরেখা এর ছবি

দক্ষিণ রায় নিজেই বাঘ না? মাঝে মাঝে মনুষ্যরূপ ধারণ করেন?

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

হিমু এর ছবি

দক্ষিণ রায় আর বনবিবি দু'জনই দক্ষিণবঙ্গের লৌকিক দেবতা, আর্যবলয়ের বাইরে এদের উদ্ভব আর বিকাশ। বয়সও বেশি না। অনুমান করা হয় দক্ষিণ রায় প্রতাপাদিত্যের সময়ের একজন সেনাপতি ছিলেন, মৃত্যুর পর ইনি অনার্য পুরাণকারদের (মিথোগ্রাফার) কল্যাণে আদি আটবিকদের বারামুণ্ড দেবতার সাথে মিশ খেয়ে বাদা অঞ্চলের দেবতা বনে যান। বনবিবি দক্ষিণ বঙ্গে মুসলিম প্রভাব বিস্তারের পরবর্তী সময়ের দেবচরিত্র।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দক্ষিণ রায়ের একজন মুসলিম কাউন্টারপার্ট আছেন - গাজী কালু। আবার বনবিবি'র একজন হিন্দু কাউন্টারপার্ট আছেন - বনদেবী। এরা কেউই বাঘ নন্‌, বাঘ এদের বাহন/সৈনিক/আজ্ঞাবহ। ঊপকূলীয় বনাঞ্চলে নদী-সমুদ্র-জোয়ারভাটা-জলোচ্ছ্বাস গুরুত্বপূর্ণ বলে খোয়াজ খিজিরও ইসলামী ব্যাখ্যার পরিসরের বাইরে একজন লৌকিক দেবতা। তার বাহন মাছ (কিন্তু তিনি মাহীসওয়ার নন্‌), কুমীর।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

এক লহমা এর ছবি

এইবারের পর্বে আপনার নিজের লেখাটি ত বটেই, সেই সাথে মন্তব্যগুলো জুড়ে এই পোস্টটা খুব আনন্দ দিয়েছে। কতকাল বাদে যে এইসব নিয়ে লেখা পড়ছি।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সোহেল ইমাম এর ছবি

লেখাটা পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ এক লহমা। অনেকদিন হলো কিছু লিখছেননা আপনি, কলম খুলেন ভাই এবার।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

আয়নামতি এর ছবি

এ পর্বটা দারুণ উপভোগ্য হয়েছে ভ্রাত। বর্ণনায়, মন্তব্যে, চমৎকার যুগলবন্দী যেন! হাসি

সোহেল ইমাম এর ছবি

সময় নিয়ে পড়েছেন বলে অশেষ কৃতজ্ঞতা আয়নামতি।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA