চলচ্চিত্রে কাতিনের গণহত্যা

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৬/০৪/২০১২ - ৪:২৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১৯৩৯ সালের কথা। মধ্য ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডের উপরে হঠাৎ করেই দুই দিক থেকে চড়াও হল জার্মানির হিটলারের নাৎসী বাহিনী এবং স্ট্যালিনের লাল বাহিনী (সোভিয়েত সাম্যবাদের ঝান্ডা উড়িয়ে), দখল করে নিল তারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ড কেবলমাত্র আগ্রাসনের কারণে। আর আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই আক্রমণের জন্য সেই দুই সরকারের মধ্যে চুক্তি পর্যন্ত সাক্ষরিত হয়েছিল! সাধারণ বিশ্ব জেনে অবাক হয়ে গিয়েছিল এই জেনে যে কি করে মানুষের অধিকারের লড়াইয়ের কথা বলা সোভিয়েত ইউনিয়ন চরম ফ্যাসিবাদী নাৎসিদের সাথে হাত মিলায় !

যাক গে সেই ন্যাক্কারজনক ইতিহাসের কথা, কিন্তু সেই আক্রমণের পরপরই ঘটে আরেক লজ্জাজনক অধ্যায়, পোল্যান্ডের ২২,০০০ নাগরিককে বিনা বিচারে, আত্নপক্ষ সমর্থনের বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে কেবল মাত্র তাদের পিতৃভূমির সেনবাহিনী ও পুলিশের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার অপরাধে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়ে কাতিনের বনাঞ্চলে। বড়ই করুণ সেই কাহিনী, সারি সারি মানুষকে একের পর এক নিস্তব্ধ করে দেয়া হয়ে ছিল খুলির ভিতরে ধাতব বুলেট পুরে। কিন্তু কারা করেছিল এই পাশবিক কাজ, ইতিহাস কি বলে?

katyn5_opt

এই ক্ষেত্রে ইতিহাস নীরব, সে বলতে পারে না, কারণ জয়ীরাই সর্বদাই মানবজাতির ইতিহাস লেখে, সেখানে নিরপক্ষ কিছুর ঠাই পাওয়া বড় কঠিন।

ইতিহাসের সেই নিকষ কালো আঁধারে ঘেরা অধায়ের দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতেই যেন ২০০৭ সালে অনারিরি অস্কার বিজয়ী পোলিশ পরিচালক আন্দ্রে ভাইদা ( আন্দ্রে ওয়াইদা) নির্মাণ করেন কাতিন চলচ্চিত্র। জান্তব নিষ্ঠুরতার বাস্তবচিত্র তিনি তুলে ধরেন সেলুলয়েডের ফিতেয়, জানান বিশ্বাবাসীকে কি হয়েছিল কাতিনের বনে। এইখানে চলচ্চিত্রের কয়েকটি চরিত্রের কথা গৌণ হয়ে আসে কাহিনীর স্বার্থে, মূল প্রবাহে সবসময়ই মিশে থাকে একটাই প্রশ্ন কারা করল এই গণহত্যা আর কেন করল।

dvd_katyn_2105JID_ad

আসলে সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্দেশে সেই নিরপরাধ পোলিশদের অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছিল যুদ্ধবন্দি হিসেবে, এর পরে ১৯৪০ সালে উচ্চপর্যায় থেকে হুকুম আসায় (জানা যায় স্ট্যালিনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এর পেছনে) একের পর এক বন্দীকে নির্মম ভাবে হত্যা করে ২২,০০০ লাশ সেই বনের মাটির নিচে পুতে বুলডোজার দিয়ে ভূমি সমান করে গুম করার চেষ্টা চালায় সোভিয়েত বাহিনী! হারিয়ে যায় সেই সব দেশপ্রেমীরা চিরতরে তাদের আপন দেশ থেকে, তাদের আপনজনদের মন থেকে!

কিন্তু বাহিরের বিশ্ব জানতে পারে না এই নিয়ে কিছু, পরবর্তীতে নাৎসিরা যখন ভোল পাল্টে রাশানদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পোল্যান্ড থেকে হটিয়ে দিল, এই গণহত্যার প্রমাণ পেয়ে তারা যুদ্ধকালীন প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করতে থাকল সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট ব্লকের সদস্য রাষ্ট্রে পরিণত হয় পোল্যান্ড, সম্পূর্ণ ভাবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় এখানে যুদ্ধকালীন সময়ে সোভিয়েত আগ্রাসনের স্মৃতি। কাতিন হয়ে যায় অনুচ্চারিত শব্দ। উল্টো সোভিয়েতরা সেই বর্বরতম গণহত্যার দায় চাপিয়ে দেয় পরাজিত জার্মানির কাঁধে, তারা প্রমাণ করে ছাড়ে এই জঘন্য ঘটনার পিছনে নাৎসিরাই দায়ী। এই নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জলঘোলা হয় অনেক কিন্তু কেউ এই অপরাধের দায় স্বীকার করে না। বরং জনমনে দিন দিন এই ধারণাই অধিষ্ঠিত হয় নাৎসিরাই এর জন্য দায়ী।

অবশেষে ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণার মুহূর্তে মিখাইল গর্বাচেভ স্বীকার করে কাতিন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদদে। পরবর্তীতে বরিস ইয়েলেৎসিন এই ব্যাপারে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আসল নথিপত্র জনগণের সামনে নিয়ে আসে। উম্মোচিত হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক করুন নিষ্ঠুর অধ্যায়।

কিংবদন্তীর পরিচালক আন্দ্রে ভাইদার পোলিশ ভাষায় নির্মিত কাতিন চলচ্চিত্রে দুয়েকটা পারিপার্শ্বিক ঘটনার সাথে সাথে ১১৫ মিনিটের এই করুন আলেখ্যে মূলত দেখিয়েছেন সেই জান্তব আক্রোশের বাস্তবায়নের করুন কাহিনী।

Katyn_movie_poster


মন্তব্য

কল্যাণ এর ছবি

বদমাইশিতে এরাতো কেউ কম যায় না দেখি!

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

তারেক অণু এর ছবি

শিশিরকণা এর ছবি

বলতে চেয়েছিলাম, নারীরা পৃথিবী শাসন করলে হয়তো নিষ্ঠুরতা অনেক কম দেখতে হতো, কিন্তু হাসিনা আর খালেদা বুড়ি আর সেই কথা বলার মত মুখ রাখেন নাই। মন খারাপ

কারণ জয়ীরাই সর্বদাই মানবজাতির ইতিহাস লেখে, সেখানে নিরপক্ষ কিছুর ঠাই পাওয়া বড় কঠিন।

চলুক
পুবদিকে মুখ ফিরিয়ে সূর্যোদয়ের ছবি তুলতে থাকলে পশ্চিমে দাউ দাউ করা জ্বলা আগুনের কিছুই সেই ছবি দেখে ঠাহর করা যাবে না। ইতিহাসের সংরক্ষণে তাই ৩-ডি এপ্রোচ দরকার।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

তারেক অণু এর ছবি

খালেদা-হাসিনা ! এরা কে ?

শিশিরকণা এর ছবি

যাদের ভয়ে আপনি দেশে দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ফ্যা ফ্যা করে। দেঁতো হাসি

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

অচল  এর ছবি

দুর্বলের শাসন বড় ভয়ঙ্কর। উদাহরণ চোখের সামনে

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

পশুগুলো পোলিশদের একজন একজন করে মাথার পিছে গুলি করে মারে পোলিশ ‘বুর্জোয়া শ্রেণী’ ধ্বংস করার জন্য। পিস্তল দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি লেভেলের লাশ উৎপাদন কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছিলো তারা। আর কী অভাগা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। কতো দেশ মুক্ত হলো। আর পোল্যান্ড গিয়ে পড়লো সেই লাল বাহিনীরই খপ্পড়ে। ছবিটাতে দেখায় কীভাবে পোলিশদের অনেকে গণহত্যার মূল হোতা কে জানার পরও কোনো প্রকার উচ্চবাচ্য করতে পারে নি, বরং লাল বাহিনীকে মান্য করতে হয়েছে তাদের।

তারেক অণু এর ছবি

সেই, নাৎসীরা ছিল ৬ বছর, লাল বাহিনী থাকল ৫০ বছর !

মামুন এর ছবি

আর এই কাতিন হত্যাযজ্ঞের ৭০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে স্মলস্কিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে ২০১০ এর ১০ এপ্রিলে ঘটে আরও একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি স্ত্রী এবং ঊর্ধতন কর্মকর্তাসহ ৭০ জনের এক বহর নিয়ে আসেন সেখানে কাতিন হত্যাযজ্ঞের শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস! শ্রদ্ধা জানাতে এসে তাঁরা সকলে নিজেরা সেখানে বিমান দুর্ঘটনায় হারিয়ে যান চিরতরে।

তারেক অণু এর ছবি

মনে আছে, কি দুঃখজনক।

atithi lekhok এর ছবি

ভালো হয়েছে:-)

তারেক অণু এর ছবি
পরী এর ছবি

ইতিহাসের কাল অধ্যায়ের আরেকটি। মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করলেই সেই বীভৎস দৃশ্যটা ভেসে উঠছে। মন খারাপ

তারেক অণু এর ছবি
শান্ত এর ছবি

এই ছবিটা দেখা হয়নি। অবশ্যই দেখতে হবে।

__________
সুপ্রিয় দেব শান্ত

তারেক অণু এর ছবি

খুব কষ্টের আলেখ্য।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

পোল্যান্ড আক্রমন পুরাটাই হিটলার আর স্টালিনের পূর্বপরিকল্পিত ছিল। পশ্চিম থেকে জার্মান বাহিনী আর পূর্ব থেকে সোভিয়েত লাল বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমন করে।


পোল্যান্ড দখলের পর জার্মান আগ্রাসীত পোল্যান্ড আর সোভিয়েত লাল বাহিনী আগ্রাসীত পোল্যান্ড সীমান্তে কুশল বিনিময় করছে জার্মান ও সোভিয়েত লাল বাহিনী অফিসার।

স্টালিন নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন এই গণহত্যার আদেশপত্রে। সোভিয়েত লাল বাহিনী এই গণহত্যা করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত-পোল্যান্ডের প্রশাসক জেনারেল সিরকুস্কি লেনিনের সাথে দেখা করে, ২০,০০০ পোলিশ-এর একটি মিসিং তালিকা দেন, যাদেরকে পোল্যান্ড দখলের সময় রেড আর্মি বন্দী করে। লেনিন বিষয়টি বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না।


লেনিনের হাতে জেনারেল সিরকোস্কির দেয়া ২০,০০০ পোলিশের মিসিং ফাইল।

১৯৯২ সালে রুশ-ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েৎসিন সে সময়ের পোলিশ প্রেসিডেন্ট লেখবালাইসাকে কাতিন গণহত্যার সোভিয়েত নথি হস্তান্তর করেন। এতে দেখা যায়, স্টালিন নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন পোলিশ গণহত্যার আদেশপত্রে এবং লেনিনের সরাসরি আদেশে সোভিয়েত লাল বাহিনী এই গণহত্যা করে।

সবচেয়ে দু:খজনক বিষয় হল: যাদের হত্যা করা হয়েছে, তারা সবাই পোলিশ জাতির মাথা ছিল। আমি বাংলার ১৪ ডিসেম্বরের গণহত্যার সাথে কাতিনের গণহত্যার মিল পাই; দুটোর উদ্দেশ্য ছিল একই: একটি জাতিকে মেধাশূণ্য করা।

এই ছিল কথিত সাম্যবাদের(!) কান্ডারী সোভিয়েতের আসল চেহারা: সাম্যবাদ(!) ধারণার আড়ালে আগ্রাসী সোভিয়েত রাশিয়া।
----
পোস্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

হাসান মোরশেদ এর ছবি

লেনিন বিষয়টি বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না।

স্ট্যালিন হবে, তাইনা?

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

দু:খিত। অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে গেল।

স্টালিন হবে।

হাসান মোরশেদ এর ছবি

ব্যাপার না হাসি

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

আমার করা উপরের মন্তব্যে কয়েক স্থানে লেনিনের নামটি ভুল করে লিখে ফেলেছি।

লেনিন না হয়ে স্ট্যালিন হবে।

কল্যাণ এর ছবি

আমিও একটু ধন্দে ছিলাম লেনিনের আগমনে। কিন্তু বটম্লাইন হলো তথ্যবহুল মন্তব্য, দারুণ চলুক

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি
তারেক অণু এর ছবি

ধন্যবাদ চমৎকার তথ্যপূর্ণ মন্তব্যের জন্য।

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

ক্ষমতা বড় বিষম বস্তু ভাইয়া।

কিন্তু এই গণহত্যার কারণ কী?
ক্ষমতার উদযাপন? ভবিষ্যতের প্রতিবাদ সম্ভাবনার নির্মূলীকরণ?
নাকি যাস্ট 'এমনি এমনি মারা ' !!

তারেক অণু এর ছবি

শক্তি আছে, মারব ! মারতে চাইলে আবার কারণ কি দরকার মানসিক ভাবে অসুস্থদের!

স্যাম এর ছবি

চলুক

তারেক অণু এর ছবি
মহাস্থবির জাতক এর ছবি

কাতিন গণহত্যা সম্পর্কে প্রথম জানি ব্লগ থেকেই। জেনে স্রেফ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এও সম্ভব! প্রগতির নানা বইয়ের নানা চরিত্র পোলদের প্রচুর গালি দিতো, তারাস বুলবা পড়ে 'অভিজাত' পোলদের ওপর ঘেন্না ধরা স্বাভাবিক। কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে সেটা জাতিবৈরিতায় রূপ নিয়েছিলো কি না এবং পোলদের 'অপর' হিসেবে গণ্য করার উদাহরণ সেসব জায়গায় ছড়িয়ে ছিলো কি না।

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

রব এর ছবি

আপনি মোক্ষম জায়গায় আলো ফেললেন, বস। বিরাট সম্ভাবনা।

তারেক অণু এর ছবি

অনেক জটিল হয়ত উত্তর, কিন্তু কিছু মানুষের উপর রাগ থেকে এমনটা কখনোই করা যায় না। এটা স্রেফ অসুস্থতা।

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

এই লিংকটাও দেখতে পারেন।

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

তারেক অণু এর ছবি

ধন্যবাদ দাদা।

অরফিয়াস এর ছবি

পোলিশ অভিজাত শ্রেনীর প্রতি বলশেভিকদের ঘৃনা কাজ করতো সে সময়টাতে, এটা বিভিন্ন আত্মজীবনীমূলক বইগুলো পড়লে বোঝা যায়। সেই ক্ষোভ জাতিবিদ্বেষে পরিনত হওয়াটা ছিলো সময়ের ব্যাপার মাত্র|

যুদ্ধে জার্মানি ঠিক যেরকম অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছিল, রেড আর্মি বার্লিন দখল করার সময়টাতেও দেখা যায় প্রায় একই ধরনের নির্যাতন চালিয়েছিল, এর পেছনে ক্ষোভ এর ভূমিকাটাই আসল|

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

রব এর ছবি

A Woman in Berlin এর কথা মনে পড়লো। বর্বর নাৎসিদের পতনের পরে বিজিত জার্মানিতে সাম্যবাদীরা ধর্ষণের কী উৎসবই না করেছে!

অরফিয়াস এর ছবি

একটু সমস্যা আছে, এই জায়গায় "সাম্যবাদী" শব্দটি ব্যাঙ্গার্থে ব্যবহার করলে প্রসঙ্গটা ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

জার্মান সৈন্যবাহিনী রাশিয়াতে যে পরিমান হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ-ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রাশিয়াকে ভূখন্ডে মিশিয়ে দিয়েছিলো, সেখানে ক্ষোভ জিনিসটা প্রাসঙ্গিক। আর যেকোনো যুদ্ধেই ধর্ষণকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, এটি মনস্তাত্ত্বিক একটি মারণাস্ত্র। নারী ও শিশু যুদ্ধে সব থেকে বেশি ক্ষতির শিকার হয়, এখানে স্বাভাবিক ভাবেই দোষটা সাম্যবাদী সমাজের উপর দেয়া যায়না, তাহলে রেড আর্মির মানসিক অবস্থা ও জিঘাংসার ব্যাখ্যা হয়না। প্রতিহিংসা ছিলো রেড আর্মির এই কর্মকান্ডের পেছনের কারণ, এখানে সাম্যবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রের কোনো ভূমিকা নেই, এটি বিচার করতে গেলে আপনাকে মানুষের মনস্তত্ত্ব বিবেচনা করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক কিংবা সামরিক বিবেচনা এখানে আনলে জিনিসটি একপাক্ষিক হয়ে যাবে।

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

ক্ষোভ ছিল বলে রেইপ করছে, এমনটাই কি বলতে চাইলা নাকি?

অরফিয়াস এর ছবি

এখন হয়তো জিনিসটা আমাদের চোখে বিবেচনা করলে যেরকম অমানুষিক মনে হচ্ছে, ওই সময় সেই বিবেচনাবোধ থাকার মতো পরিস্থিতি ছিলো বলে মনে হয়না, জিঘাংসা/প্রতিহিংসা মানুষের জ্ঞান লোপ করার জন্য যথেষ্ট। এর জন্য কি সাম্যবাদকে দায়ী করবো?

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

সোভিয়েত বাহিনীর অপকর্মগুলোর জন্য আমি জার্মানদের উপর ওদের ক্ষোভকে দায়ী করব না, সাম্যবাদকে তো নয়ই। সোভিয়েতদের এসব কাজের পিছনে রয়েছে অমানবিক প্রবৃত্তি। স্ট্যালিন প্রশাসনের আদেশে যে ওরা জার্মানদের জাতিগত ধোলাই দিতে চায়নি, একথা হলফ করে কে বলবে?
সাম্যবাদের বুলি কপচানো সোভিয়েতদের এসব কর্মকান্ড প্রমাণ করে, কমুনিজ্যম শুধু একটা লেবাস ছিল ওদের কাছে।

তারেক অণু এর ছবি

হুমম, এই নিয়ে বড় একটা লেখায় হাত দিব দিব করছি কয়েক মাস ধরে, এবার দিতেই হবে।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

তারেক অণু এর ছবি

হে, হে, দিব দাদা, হাতের গুলো শেষ করেই, ।

মন মাঝি এর ছবি

ঠাণ্ডামাথায় গণহত্যার পিছনে মনস্তাত্ত্বিক কারন নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং নতুন ব্যাখ্যা আছে, যার নাম দেয়া হয়েছে - 'সিনড্রোম ই' । এর সাথে নাৎসী, খেমার-রুজ আর স্তালিনীয় অপকর্মগুলি দারুনভাবে মিলে যায়। 'সিনড্রোম ই' -র একটা সংজ্ঞা এভাবে দেয়া হয়েছে -

"The transformation of groups of previously nonviolent individuals into repetitive killers of defenceless members of society has been a recurring phenomenon throughout history. This transformation is characterised by a set of symptoms and signs suggesting a common syndrome--Syndrome E. Affected individuals show obsessive ideation, compulsive repetition, rapid desensitisation to violence, diminished affective reactivity, hyperarousal, environmental dependency, group contagion, and failure to adapt to changing stimulus-reinforcement associations. Yet memory, language, planning, and problem-solving skills remain intact."
তবে.....
"Syndrome E is a specific set of symptoms and signs. It is not a general syndrome of human aggression and should not be confused with the behaviour of individuals who carry out repetitive homicidal acts alone. These individuals constitute a very small proportion of the population... Neither should Syndrome E be confused with the usual manifestations of war or group combat. These conflicts often lead to atrocities, carried out by individuals in the frenzy of battle. Such behaviour, however, lacks most of the features described above and is characterised by inverse symptomatology: emotional reactivity rather than dulling, and incidental, sporadic violence rather than perseveration and systematic repetition."

'সিন্ড্রোম ই'-তে আক্রান্ত লোকের একটা বৈশিষ্ট্য হল, নন-ভায়োলেন্ট এবং অন্যবিধভাবে অন্তত আপাতদৃষ্টে সুস্থ লোকজনও এতে আক্রান্ত হতে পারে এবং আক্রান্ত হওয়ার পরও অন্যবিধভাবে (আদারওয়াইজ) অত্যন্ত সুস্থ ও বুদ্ধিদীপ্ত (এমনকি সহানুভূতিময়) জীবনযাপন করতে সক্ষম হতে পারেন তারা কম্পার্টমেন্টালাইজেশনের মাধ্যম (Individuals conduct activities calling for seemingly conflicting cognitive states. They may lead a normal family life, while in parallel engaging in killing of families.)। ফলে তাদেরকে (বা তাদের অসুস্থতাকে) চেনা অনেকসময় খুব দুরূহ হয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে তারা যদি উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে বা পরিস্থিতিতে কোন রাজনৈতিক নেতা হন - কিম্বা অন্যবিধভাবে কোন মহৎ আদর্শের ধ্বজাধারী সুবক্তা, দক্ষ বিতার্কিক বা নেতৃস্থানীয় বা জনপ্রিয় কোন ব্যক্তি হন। আপাতদৃষ্টে অত্যন্ত আদর্শবাদী, নীতিবাদী, যুক্তিবাদী, দেশপ্রেমিক বা সেসবের ছত্রছায়াগ্রস্ত লোকও সিনড্রোম-ই -তে আক্রান্ত হতে পারেন, যা অনেকসময় চরম পরিস্থিতি ছাড়া হয়তো ধরা পড়ে না। এসব ক্ষেত্রে আস্তিক-নাস্তিক-ধনবাদী-সাম্যবাদী সহ নানা-'বাদী' তত্ত্বকথা বা মতাদর্শে কিছু আসে যায় না, বরং সাধারণ মানুষের তাতে আরো বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিম্বা, উলটে এইসব অসুস্থ লোকেরাই অনেক পোটেনশিয়ালি মহান আদর্শকে নিজেদের গোপন মানসিক অসুস্থতাবশত নিজেদের মত করে টুইস্ট দিয়ে বারোটা বাজিয়ে দেয় এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে অত্যন্ত সফলভাবে। সোভিয়েত সাম্যবাদের ক্ষেত্রেও মনে হয় অনেকটা এমন কিছুই ঘটেছিল। আর এজন্যেই, দানব স্টালিনের অনুসারীর অভাব ছিলনা বিশ্বজুড়ে এবং এখনো তার অনেক সুশীল-দুঃশীল ভক্ত আছে!

যাজ্ঞে, এই সিনড্রোম-ই নিয়ে দারুন ইন্টারেস্টিং ছোট্ট দুটি লেখা পড়তে পারেন এখানে - । হয়তো আপনার ঐ লেখায় কাজে দিবে হাসি

****************************************

কল্যাণ এর ছবি

চলুক

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

রব এর ছবি

সাম্যবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রের ভূমিকা যে নেই- তা জানি। সাম্যবাদের কথিত কান্ডারীদের এমন আচরণে বিস্মিত হই বলেই ঐ বাক্যটি লিখেছি। কাতিনের মত বার্লিনের ধর্ষণ-উৎসবের অনুমোদনও এসেছিলো একেবারে শীর্ষ থেকে। তবে, হ্যাঁ, ওখানে উদ্ধরণ চিহ্ন ব্যবহার করলে ভালো হত।

ক্ষোভ, রেড আর্মির মানসিক অবস্থা-মনস্তত্ত্ব এসব ভেবেও আমি তাদের অন্যায়কে কম করে দেখতে রাজি নই। আগে ও বিশেষ করে ৭১ এ বিহারিরা যা করেছে আমরা কিন্তু তাদের উপর ধর্ষণ ও কচুকাটা-উৎসব চালাইনি। উলটো স্বাধীনতার পর আমাদের সেনাশক্তির অর্ধেক বিহারীদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলো। তাও যদি প্রতিশোধমত্ততায় নিরীহ কারো উপর অন্যায় হয়ে থাকে আমরা তারও ন্যায়বিচারই চাই। অন্যদিকে, সুযোগ যদি আসতও রামদা ও উত্থিত-শিশ্ন নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চড়াও হওয়া অন্যায়ই হত।

আর বিস্ময়ের ব্যাপার হলেও সোভিয়েত ভূখন্ডে নাৎসি-লাল যুদ্ধে পোড়ামাটি নীতি নিয়েছিলো লালেরাই। যুদ্ধের প্রথম দিকে পশ্চাদপসারনের সময় তারাই লোকালয়-কৃষিক্ষেত নষ্ট করে করে পিছিয়ে যাচ্ছিলো যাতে এগিয়ে যাওয়ার পথে নাৎসিরা যথাসম্ভব কম রসদ সংগ্রহ করতে পারে। তবুও নাৎসিরাই যুদ্ধ শুরু করেছিলো বলে এই ক্ষতির দায় তাদের ঘাড়েই পড়ে। তবে, নাৎসিরা কোন খুন-ক্ষয় করেনি- তা কিন্তু বলছিনা। হাসি

তারেক অণু এর ছবি

কয়েকটা বইয়ের নাম দিয়েন এমন।

জাতিগত বিদ্বেষ সবচেয়ে ভয়ানক ভাইরাস।

অরফিয়াস এর ছবি

এখনই যেটার কথা মনে পড়ছে তা হলো "ইস্পাত", যতদুর মনে আছে এর ভূমিকা থেকেই পোলিশ অভিজাত শ্রেনীর প্রতি লেখকের বেশ ভালো রকম বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছিলো।

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

তারেক অণু এর ছবি

ইস্পাতকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা একটু মুশকিল, সেটি আমারও খুব প্রিয় বই ছিল, কিন্তু বড় বেশী একপেশে।

তানিম এহসান এর ছবি

ইতিহাস সত্যটাকেই গ্রহণ করে একদিন, যতই বিজয়ীরা লিখুক না কেন। এই ভরসাতেই বেঁচে থাকি মনে হয় আমরা হাসি

তারেক অণু এর ছবি

আশা করি--

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

জী, পড়লাম। আপনি তখন কোন শহরে পর্যটনবাজী করছিলেন? চলুক

তারেক অণু এর ছবি

তখন! জন্ম হয় নি তো !

রব এর ছবি

এক কাতিন পোলিশদের ২টা ক্ষতের কারণ মন খারাপ

ছক্কাজন্মা অণুদার পোস্টে চলুক

তারেক অণু এর ছবি

ক্রিকেট খুব একটা খেলতাম না রে ভাই !

তাপস শর্মা এর ছবি
তারেক অণু এর ছবি
ami_bonna এর ছবি

মুভিটি দেখা হয়নি। দেখি সংগ্রহ করে দেখে ফেলব। খুব ভাল লেগেছে আপনার লেখাটি।

তারেক অণু এর ছবি

দেখে ফেলেন সময় করে।

লুৎফর রহমান রিটন এর ছবি

তোমার পোস্ট পড়ার পর কাতিন মুভিটার কিছু অংশ দেখলাম। নৃশংসতা বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারি না বলে থামলাম আপাতত।

ইতিহাস কখনোই মিথ্যাকে ধারণ করে না। ইতিহাসের সত্য আজ হোক কাল হোক প্রকাশিত হবেই হবে।

ধন্যবাদ তোমাকে অণু।

হাবু বেশ বড়সড়,গাবুটা তো পিচ্চি
হেরে গিয়ে হাবু বলে--উৎসাহ দিচ্ছি!

তারেক অণু এর ছবি

খুব বেশী নির্মম, আমিও একটানা দেখতে পারি নি।

আনোয়ার এর ছবি

চলুক

তারেক অণু এর ছবি
রাগিব এর ছবি

কাতিনের কথা প্রথম পড়েছিলাম আশির দশকে প্রকাশিত রিডার্স ডাইজেস্টের একটি সংখ্যাতে। তখনো সরকারীভাবে সোভিয়েত ইউইয়ন স্বীকার করেনি এই হত্যাকাণ্ডের কথা।

আমার মনে কৌতুহল এটাই - বাংলাদেশের বামপন্থী-রুশপন্থী-সমাজতন্ত্রীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের এরকম ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে কী বলেন। "ইহা ছহী সমাজতন্ত্র নহে" - টাইপের চাপাবাজির উর্ধ্বে উঠে কি তারা কখনো স্ট্যালিনীয়, লেনিনীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সমালোচনায় কোনো কথা বলেছেন?

----------------
গণক মিস্তিরি
জাদুনগর, আম্রিকা
ওয়েবসাইট | শিক্ষক.কম | যন্ত্রগণক.কম

রব এর ছবি

আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, স্ট্যালিন-লেনিনের 'বদনাম' ত দূর, ভিন্ন মূল্যায়ন শুনলেই তারা ক্ষেপে যান। ভিন্নমতাবলম্বীদের নিধন তাদের কাছে যৌক্তিক। এইসব কাতিন-টাতিন নাকি সফল এক সমাজতন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা।

বাংলার শুরুর দিকের কমিউনিস্টদের ইতিহাস, ত্যাগ-তিতিক্ষা নিয়ে আপ্লুত একজনকে একবার প্রসঙ্গক্রমে স্ট্যালিনের হাতে পূর্ববঙ্গের প্রথম বাঙালি মুসলিম কমিউনিস্ট পাবনা-সিরাজগঞ্জের গোলাম আম্বিয়া খান লোহানীর মৃত্যুর ব্যাপারে বলেছিলাম। বিশ্বাস না করায় এই লিংকটিও দিয়েছিলাম। ভদ্রলোক পরে আমার সাথে কথাবার্তার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলেন।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রথম বাঙালী কমিউনিস্ট কমরেড মোজাফ্ফর নয় কি?

রব এর ছবি

আমি বিভিন্ন জায়গায় পূর্ববঙ্গের প্রথম বাঙালি 'মুসলিম' কমিউনিস্ট হিসেবে উনার নামই পড়েছি। উপরের লিংকের লেখাতেও তাই লেখা। যদিও এই তথ্যটা নেই, এই পোস্টে পান্ডবদার মন্তব্যগুলোতে লোহানীর প্রসংগ এসেছে। দেখতে পারেন।

তারেক অণু এর ছবি

বলে নাই, তারাও অনেক ভুল জানত এবং এখনো জানে। সত্যটা জানার চেষ্টাও করে নি এবং করে না ।

কল্যাণ এর ছবি

ওনাদের মস্তিষ্ক প্রক্ষালন ব্যবস্থায় সতর্কতার সাথে এগুলো বাদ দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট কিছু থাকলেও সেগুলো সুবিধামত চুনকাম করে নেয়া আছে নিশ্চয়ই।

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

তারেক অণু এর ছবি

হ, ভেজাল বেশীর ভাগ জায়গাতেই।

শারেক শহিদ এর ছবি

আপনার লেখা দেখে হুমায়ূন আজাদ অসামান্য একটা প্রবচন মনে পড়ে গেল, "ইতিহাস হচ্ছে বিজয়ীর হাতে রচিত বিজীতের নামে একরাস কুৎসা ।"

তারেক অণু এর ছবি

হুমম, দুঃখজনক আর ইতিহাসে আমজনতার স্থান হয় না সাধারণত।

মন মাঝি এর ছবি

কাতিনে ২২,০০০ পোলের ম্যাসাকার নৃশংস ঘটনা সন্দেহ নেই, কিন্তু স্টালিন আর সোভিয়েত রাশিয়ার সামগ্রিক নৃশংসতার লম্বা তালিকায় এটা, শুনতে খারাপ লাগলেও, সমুদ্রের বুকে বারিবিন্দুসম প্রায়। সাম্যবাদের নামে, ধর্মের আফিমের নেশা ছাড়ানোর নামে, বুর্জোয়া-পুঁজিবাদীদের শোধনের নামে, শ্রেনী-বৈষম্য দূরীকরণের নামে, রাজনৈতিক পূণঃশিক্ষার নামে, জাতিগত সমস্যা দূরীকরনের নামে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার বানানো অভিযোগে সামষ্টিক/জাতিগত শাস্তির নামে, পূর্বপুরুষকৃত অপরাধের জাতিগত শাস্তির নামে (হ্যাঁ, এটাও!!) সারাদেশ জুড়ে (নিজদেশে) তারা যে অবিশ্বাস্য নৃশংসতা, বর্বরতা আর পৈশাচিকতার রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল দীর্ঘকাল ধরে, সেসবের কাহিনি পড়তে গেলে এখনো রক্ত হিম হয়ে যায় !!

শুধু পোলিশ না, এমন যে আরও বহু জাতিগোষ্ঠীর উপর দমনপীড়ন আর নৃশংস নির্যাতনের স্টীমরোলার নেমে এসেছিল সে খবর আজ আমরা অনেকেই হয়তো রাখি না। সাম্প্রতিক ইতিহাসে চেচেনদের কথা আমরা শুনেছি তাদের রক্তাক্ত বিদ্রোহের কারনে। অনেকেই চেচেন যুদ্ধের কারনে এদের এখন 'সন্ত্রাসবাদী' হিসাবে চেনেন - কিন্তু এটা কি জানেন যে, স্টালিন একজন-দুজন নয় - নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুসহ আস্ত চেচেন আর ইঙ্গুশ জাতি দু'টিকে ককেশাসে তাদের নিজভূমি থেকে মধ্য-এশিয়া আর সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করেছিল জাতিগত শোধন ও শাস্তিপ্রদান হিসেবে? সেসময়ে প্রায় ৫ লক্ষ জনসংখ্যার চেচেন জাতির এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেকই নির্মম ভাবে মারা পড়েছিল 'অপারেশন লেন্টিল' (সার্চলাইটের কথা মনে পড়ে যায়) নামের ঐ এথনিক-ক্লিনসিং অপারেশনে। অর্থাৎ, প্রায় দেড়-থেকে-আড়াই লাখ?! সেই ভয়াবহ স্মৃতি চেচেনদের স্মৃতিতে এখনো অক্ষয় হয়ে আছে। আর শুধু স্ট্যালিন বা পুতিনই নয়, গত কয়েক শত বছর ধরেই ককেশাস আর মধ্য-এশিয়া জুড়েই রাশানদের এই একই নীতি। তাদের সাহিত্যেও এই অঞ্চলের লোকদের প্রতি তাদের অপরিসীম ঘৃণা লক্ষনীয় (উদাঃ লার্মন্তভ)।

শুধু চেচেন নয়, ইঙ্গুশ-তাতার-জর্জিয়ান মুসলমানসহ আরও বহু-বহু জাতিগোষ্ঠিকে এই ধরণের ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে স্টালিন আমলে। আর মিলিওন মিলিওন লোক মারা গেছে তাতে! এক হিসাবে বলপ্রয়োগপূর্বক জাতিগত ডিপোর্টেশন বা এথনিক-ক্লিনসিঙ্গের অধীনে প্রায় ৬০ লক্ষ লোককে সোভিয়েত আমলে নির্বাসনদণ্ড দেয়া হয়েছে। আর এতে কমপক্ষে ২০ লক্ষ লোক শুধু মারাই গেছে! আর যারা জীবিত ছিল তাদের ব্যক্তিগত-দৈহিক-মনস্তাত্ত্বিক-সামাজিক-পারিবারিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-জাতিগতভাবে যে অকল্পনীয়-অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে হিসাব কি এই ২০ লক্ষকে হাজার দিয়ে গুন দিলেও ধরা পড়বে ?? হিটলার কি রাশানদের থেকে খুব একটা ভাল ছিল?

এগুলি নিয়ে কবে ছবি হবে তাই ভাবছি। নাকি ছবিটবি শুধু ইহুদী আর সাদা ইউরোপীয়রা যখন 'রঙ এন্ড অফ দ্য স্টিক' পায়, শুধু তখনই বরাদ্দ হয়?

কয়েকটা ইন্টারেস্টিং লিঙ্ক দিলামঃ--

উইকি থেকে
১। সোভিয়েত ইউনিয়নে গণস্থানান্তরন ও গণনির্বাসন
২। ক্রাইমিয়ান তাতারদের গণনির্বাসন
৩। [url=http://en.wikipedia.org/wiki/Operation_Lentil_(Caucasus)]অপারেশন লেন্টিল[/url] (চেচেন নির্বাসন)

'অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়া অফ মাস ভায়োলেন্স' থেকে
১। ক্রাইমিয়ান তাতার গণনির্বাসনঃ কেস স্টাডি (৮ পৃষ্ঠা)
২। চেচেন জাতির জাতিগত গণনির্বাসন - কেন ও কিভাবেঃ কেস স্টাডি (৯ পৃষ্ঠা)
৩। জর্জিয়ার মুসলমানদের গণনির্বাসনঃ কেস স্টাডি (৭ পৃষ্ঠা)
৪। স্টালিন-আমলের গণঅপরাধ (১৯৩০-১৯৫৩): কালানুক্রমিক নির্ঘন্ট (৯ পৃষ্ঠা)
৫। সোভিয়েত আমলের গণনির্বাসনের সংক্ষিপ্ত ক্রোনোলজি (৪ পৃষ্ঠা)
৬। সকল অপছন্দনীয় শোধন

এছাড়াও
১। চেচেনিয়ার বর্তমান ও অতীত (পিবিএস.অর্গ)
২। স্টালিনের গননির্বাসনের স্মৃতি (বিবিসি)

****************************************

কল্যাণ এর ছবি

চলুক গুরু গুরু

যাই পড়া শুরু করি।

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

তারেক অণু এর ছবি

ধন্যবাদ, যাযাবরদেরও বলগা হরিণ চালানো বাদ দিয়ে ঘরে বন্দী করা হয়েছিল! মঙ্গোলিয়ান ভাষার মত ক্ষতি আজ পর্যন্ত কোন ভাষার হয় নি, যেটা হয়েছিল রাশানদের দ্বারা। সাবেক সোভিয়েত সদস্য কিছু দেশে ঘুরে বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা হয়েছে, আস্তে আস্তে লিখে ফেলতে হবে।

প্রখর-রোদ্দুর এর ছবি

চলুক
এমন ইতিহাস এর জন্য অফ যা
আচ্ছা ভাবছিলাম যে আমাদের দেশের এইসব মিসিং কেস এর তালিকা কে কার হাতে কবে কোথায় তুলে দিবে?

তারেক অণু এর ছবি

আমাদেরই করতে হবে এই কাজ, আমাদেরই দায়িত্ব।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।