চন্দ্রালোকে চন্দ্রাহত

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: বিষ্যুদ, ১০/০৩/২০১৬ - ১০:২৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ভোর চারটা, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬- সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ের গোলাবাড়িতে নোঙর করা মাদারশিপ থেকে আমাদের ছোট্ট নৌকা খাল দিয়ে ঢুঁকে পড়েছে লেচুয়ামারা বিলে, পশ্চিম দিগন্তে বিশাল এক মরচেরঙা চাঁদ, তার ভুতুড়ে কম্পমান ছায়া পড়েছে হাওড়ের আঁধার জলে। তখন কাকচক্ষু জল এতই কালো যে মনে হচ্ছে আমরা যেন শূন্যে ভেসে পাড়ি দিচ্ছি কাঠের নৌকায়, আমাদের গন্তব্য বুঝি ঐ দূরের চাঁদ, যা আজ নেমে এসেছে হাওড়ের কাছাকাছি। দূরে যেখানে ঐ আপাত অদৃশ্য জলের শেষ, সেখানে আঁধারেরা জমে জমেই বুঝি বা মেঘালয়ের পাহাড়ের আবছা রূপ নিয়ে দাড়িয়ে আছে পরাবাস্তবতার দূত হয়ে।

বাতাসে বেশ হিম, তার চেয়েও ঠাণ্ডা হাওড়ের জল, তার মাঝেই নেমে পড়ি আমরা কজন, কোমর গভীরতায় নানা ধরনের ধারালো জলজ উদ্ভিদ এবং সেখানের বাসিন্দা লাখো লাখো জোঁকের তোয়াক্কা না করে বরং অশেষ আনন্দে ভাসিয়ে, কারণ আমরা মানেই তো অনেক জোঁকের খাদ্য জুটে গেল বেশ কিছু দিনের জন্য! কিন্তু সত্যি বলতে এখন গড়গড় করে লিখে চলেছি এইসব খুঁটিনাটি, কিন্তু তখন কেবল মাত্র খেয়াল করেছিলাম একটাই মাত্র জিনিস- বিশ্ব চরাচর ছাপিয়ে ওঠা, হাওড় প্লাবিত জোছনা।

ঠিক আগের ভরা পূর্ণিমায় টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ছিলাম আমরা, বেশ রাত হয়েছিল পৌঁছাতে, তাঁবু পাতার যাও বা ইচ্ছা ছিল, নৌকার ভাঙ্গা ছইয়ের ফাঁকফোকর দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়া রূপো রূপো জোছনা নিমিষের মধ্যে সেই ইচ্ছাকে দূর অস্ত করে ঘোষণা দিয়েই নিল যেন দস্তয়েভস্কির নিশিতে পাওয়া রূপালি রাতের নায়কের মত ‘যতই ঠাণ্ডা হোক, আমরা আজ এই ছইয়ের মধ্যেই থাকব’। থাকলাম, এবং ভিজলাম চন্দ্রকিরণে।

আবার পরের পূর্ণিমাতে যেন জোছনার আকর্ষণেই জীবনের সবচেয়ে জ্যোছনাময় সপ্তাহ কাটালাম হাওড়ে। মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিযায়ী হাঁসদের পায়ে রিং পরানো এবং তাদের লালা সহ কিছু উপাত্ত সংগ্রহ করে বার্ড ফ্লু গবেষণার কাজে ব্যবহার করা। এই ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতায় ছিল আই ইউ সি এন, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। সে এক ঘোর লাগা সময়, দিন রাত কাজ করে চলেছি সবাই বুনোহাঁস এবং অন্য পাখিদের নিয়ে, ভোরে যখন যাত্রা শুরু করি আকাশে এত্ত বড় এক চাঁদ থাকে, শীঘ্রই চাঁদ অন্য ভুবনে চলে যায়, কিন্তু পূর্ব দিকে রেখে যায় এক রক্ত লাল সূর্যকে। আবার সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে সূর্যদেব বিশ্রাম নেবার আগে আগেই রূপা চাঁদ উঁকি দিয়ে আকাশের বিপরীত প্রান্তে।

সন্ধ্যায় ডেরায় ফিরে চাঁদের আলোতে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে দূরে স্নানও সারা হয় জোছনা মেশানো রূপো জলে, কখনো বা সেই জাদুময় চাঁদকে আলিঙ্গনের মতলবে পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে যখন ঝরঝর করে জল ফিরে হাওড়েরই বুকে, রেখে যায় এক অলীক সজীবতা, জীবনটাকে বড্ড মায়াবী বলে বোধ হয়।

পাশেই হিজল আর করজের সারি, নিচে ঝরা পাতার স্তূপ। ভরা পূর্ণিমার আলোতে পাতা ছাড়া ডালগুলো যেন সব রূপকথার রাজ্যে সোনার পাতা- রূপোর ডাল- হীরের ফুলে পরিণত হয়। শনশন হাওয়া বইলে সেই আধাভৌতিক আলোছায়ায় আসলে ভয় নয়, রোমাঞ্চ অনুভূত হত ভীষণ ভাবে, বেঁচে থাকার রোমাঞ্চ! এই অপূর্ব ভুবনে জীবনকে ছুঁয়ে, ছেনে দেখার তীব্র আনন্দ।

মাঝে মাঝে মধ্যরাতে দুই নৌকা এক করে ভাসমান ষ্টেশন বানিয়ে পাখি রিং করার কাজ চলত, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী পরিণত হত চাঁদের নরম কিরণ প্লাবিত এক অচেনা ভুবনে। সেই রূপের মুগ্ধতায় আমরা যথাসম্ভব কাজ শেষ করে আবারও ফিরে ফিরে তাকাতাম রূপা চাঁদটার দিকে। আর চারপাশের জলজ জগত তখন পরিণত এক অলৌকিক বিশ্বে, যার আদি নেই, অন্ত নেই, আছে শুধু বর্তমান, আছে শুধু জোছনা, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধু মনের এক গহীন প্রকোষ্ঠে অসীম ভালোবাসায় জিইয়ে রাখা যায় কল্পলোকের স্বপ্ন রূপে।

আর সেই সারা সপ্তাহের জোছনার স্মৃতি নিয়ে আমরা কজন থেকে যায় চন্দ্রাহত হয়ে।

( চাঁদের তো আলো হয় না, হয় কিরণ। ঠিক তেমন চন্দ্রালোক মনে হয় চাঁদে গেলে তবেই বলে যায়, তবে কিনা সেই কয় দিন টাঙ্গুয়ার হাওড়ই পরিণত হয়েছিল এক অপূর্ব চন্দ্রালোকে, চাঁদের দেশে। তাই ভালোবেসে 'চন্দ্রালোকে চন্দ্রাহত' নামই রাখলাম।

জোছনা শিকারি বেশ কজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে আমরা, যারা সামান্য চাঁদের আলো দেখলেও উপর পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে

‘অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক,
জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই’

তাদের মধ্যে মানজুরা খান পলি একই সাথে পূর্ণিমা এবং অমাবস্যাকে ভালবাসার ক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে, আমরা যখন টাঙ্গুয়ার হাওড়ে জোছনায় মুগ্ধ অপলক সময় কাটাচ্ছি সে তখন একা ট্রেকিং করে নেপালের এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে, তাঁবুর সামনে বসে দেখছিল সেই একই চাঁদ।

এই পোষ্টটা তোর জন্য পলি, জীবনে আরও অনেক বেস ক্যাম্প ও অনেক অসাধারণ স্থানে তোর পা পড়ুক, সাথে থাকুক পূর্ণিমার রূপো চাঁদ কিংবা অমাবস্যার অনন্ত নক্ষত্রবীথি। )


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

চন্দ্রালোকে নিজেও মাতাল হয়েছেন, আমাদেরও মাতাল করে ছাড়ছেন। আপনার বর্ণনা দিনকে দিন অসাধারন হয়ে উঠছে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল দারুন একটা উপন্যাস শুরু হলো বুঝি।

সোহেল ইমাম

তারেক অণু এর ছবি

বিস্তীর্ণ এলাকায় চাঁদের জাদুই আলাদা। একবার পদ্মার চরে পূর্ণিমা উদযাপন করতে হবে-

অতিথি লেখক এর ছবি

" আর চারপাশের জলজ জগত তখন পরিণত এক অলৌকিক বিশ্বে, যার আদি নেই, অন্ত নেই, আছে শুধু বর্তমান, আছে শুধু জোছনা, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধু মনের এক গহীন প্রকোষ্ঠে অসীম ভালোবাসায় জিইয়ে রাখা যায় কল্পলোকের স্বপ্ন রূপে। "
এ্যানি মাসুদ

তারেক অণু এর ছবি
আয়নামতি এর ছবি

চমৎকার লাগলো পড়তে! পাখিদের পায়ে রিং পরানো কর্মসূচী শেষ নাকি?
আচ্ছা ওদের লালা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটা ঠিক কেম্নে করা হয়? ঠোক্কর টোট্টর দিয়ে বসেনা?
মনজুরা খান পলি'র জন্য অনেক অনেক শুভকামনা থাকলো।

তারেক অণু এর ছবি

ঠোক্কর বলে ঠোক্কর ! এইবার তো পাতি-কুটেরা খবর করে দিয়েছিল। আর একাধিক পাখি আছে, আছে নেওয়া মানেই মানুষের রক্তপাত ঘটবে! লিখব একবার এই নিয়ে-

আয়নামতি এর ছবি

ঠোক্কর সমূহ আসুক তবে দেঁতো হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

কী করেছেন!!! আপনাকে অন্যভাবে পেলাম, এটাকে ব্যাপকভাবে বললেই বোধ হয় ভালো হবে। এটা চলুক না। এত ভালো লেখাটা বড় অল্পেতে শেষ হয়ে গেল যেন।
================
ইচ্ছে মত লিখি
http://icchemotolikhi.blogspot.in/

তারেক অণু এর ছবি

থাকুক অল্পতেই আপাতত।

অতিথি লেখক এর ছবি

লোভ লাগায়ে দিলেন গো লোভ লাগায়ে দিলেন । শেষ মনে পড়ে নানার বাড়িতে বিলের মাঝখানে নৌকায় শুয়ে জোসনা দেখছিলাম । সে কত বছর আগের কথা ।

মামুনুর রশীদ [ ভবঘুরে শুয়োপোকা ]
=============================
হাজার মানুষের ভিড়ে আমি মানুষেরেই খুজে ফিরি

তারেক অণু এর ছবি

সে যে কী এক অভিজ্ঞতা !

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

"হাওড় প্লাবিত জোছনা"-- আহা মনের মাঝে একটা স্বপ্ন জাগিয়ে তুললেন

তারেক অণু এর ছবি

স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে

অতিথি লেখক এর ছবি

হাওরের নিস্তরঙ্গ জলে চন্দ্রালোকের প্রতিফলনের সৌন্দর্য কেবল সেই বুঝবে যে কি না সেই সৌন্দর্য আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছে। এই ভাগ্য কয়েকবার হয়েছে তাই জানি কেমন এই সৌন্দর্যে মনের ভিতর কেমন হাহাকার করে উঠে। চমৎকার বর্ণনা ভাইয়া।

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

তারেক অণু এর ছবি

এখন তো ইচ্ছে করে প্রতি পূর্ণিমাতেই কোন না কোন নিসর্গে যেতে

নজরুল এর ছবি

পরিবেশ প্রকৃতি, ভ্রমন নিয়ে আপনার লেখা, কাজ সবই দারুন লাগে। পাখি নিয়ে যে কাজগুলো করছেন অসাধারণ, নিঃসন্দেহে!
কিন্তু আপনাকে কখনো দেখলাম না সুন্দরবন নিয়ে কিছু বলতে। আপনি কি রাজনৈতিকভাবে সাউন্ড এবং নিউট্রাল থাকতে পছন্দ করেন?
আপনি হয়তো বলতে পারেন, আমি তো আমার মতো করে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

কিন্তু আমি, আপনি যদি না বলি কে বলবে? আপনার কি মনে হয় না সুন্দরবন থেকে মাত্র বারো কিমি দূরে তাপবিদ্যুতকেন্দ্রটি ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে? আপনাকে বলতে বলছি কারন বাংলাদেশের অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমি তরুন-তরুনী আপনাকে ভালোবাসে। একটু একটু করে আমাদের গলার জোরটি বড় হবে। এভাবে চুপ করে থাকবেন না, প্লিজ!

ভুল না বুঝলে অনেক খুশী হবো!

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

এটাকে যদি আপনার প্রতিবাদ মনে হয়ে থাকে...
কেননা, কখনো না দেখাটা বিশাল ব্যাপার!

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নজরুল এর ছবি

না, কেন জানি মনে হচ্ছে আমরা কেউই যথেষ্ট করছি না। অথবা যথেষ্ট করি নি। নাহয় এই প্রকল্পটি ঠেকানো যেতো। আমরা কেন জানি মেনে নিয়ে চলেছি সবকিছু, এই নির্বিকার চাহনী ভয়াবহ। সবার ভেতরে যতই প্রতিবাদ আর ঘৃনাই থাকুক, প্রতিবাদ ছাইচাপা আগুনের মত নীরবে নিভে যাচ্ছে। জ্বলে উঠতে পারছেনা কোন কারনে। হয়তো সবই নষ্টদের অধিকারে, তবে এই দায় আমাদের নিতেই হবে। আমি নিজেকেও কাঠগড়ায় দাড় করাচ্ছি সবার আগে।
কোন ব্যক্তিগত আক্রমন এর ইচ্ছা নেই, ছিল না। একজন দুর্বল মানুষ আর কিছু করতে না পেরে কয়েক শব্দ কি-বোর্ডে চেপে মৃত চিৎকার করে গেলাম বলতে পারেন।
জগতের সকল প্রানী সুখী হোক আর না হোক, মানুষ সুখী হোক। সব ধ্বংস করে হলেও সুখী হোক!

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

'কখনো' থেকে 'যথেষ্ট' তে আসাটা ইন্টারেস্টিং।
আর, ব্যাক্তিগত আক্রমণের কথা বলেছি কি? অ্যাঁ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

তাহসিন রেজা এর ছবি

সুন্দরবনে পূর্ণিমা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে এ অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

নীড় সন্ধানী এর ছবি

লোভ লাগিয়ে দিলেন। পড়েই চন্দ্রাহত হলাম লইজ্জা লাগে

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

মুস্তাফিজ এর ছবি

আহারে চন্দ্রস্নান!

...........................
Every Picture Tells a Story

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

গতকাল পূর্ণিমা ছিল। এই পোস্ট দেখে আবার চন্দ্রানুভূতিতে আঘাত পাইলাম। মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA