আমেরিকার কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান (শেষ পর্ব)

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৪/০৪/২০১৯ - ১১:২৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

তাঁর কবিতার এত প্রসারে হুইটম্যান হয়তো খুশীই হতেন কিন্তু আমি জানি যে কবিতার কাছে পৌঁছাতে শুধু একটি বই আর মোটেলের কক্ষই যথেষ্ট না। আমার একজন ইংরেজি শিক্ষকের দরকার ছিল, ১৯৮৯ সালে বিখ্যাত চলচ্চিত্র Dead Poet’s Societyর রবিন উইলিয়ামসের মত একজনকে, যে তার ছাত্রদের নিজস্ব চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে বলে কবিতার বইয়ের সূচনা কথা ছিঁড়ে ফেলতে বলে কবিতার রোমান্সে হুইটম্যানের প্রবল অস্তিত্বকে ব্ল্যাকবোর্ডে ধরার চেষ্টা করতে বলেছিল
I sound my barbaric YAWP over the rooftops of the world

যে শিক্ষকের ভূমিকায় রবিন উইলিইয়ামস অভিনয় করেছিলেন সেই স্যাম পিকারিং বললেন সিনেমাটি আসলেই বাস্তবঘেষা, ১৯৬৫ সালে আমার বয়স ছিল ২৪, যখন টেনেসির ন্যাসভিলে মন্টগোমারি বেল অ্যাকাডেমিতে ১৫ বছরের ছাত্রদের পড়াচ্ছিলাম, আর আমি ছিলাম প্রবল উৎসাহী। আমার ছাত্রদের কেউ একজন পরে ক্লাসের ঘটনাগুলো মুভির স্ক্রিনপ্লেতে ব্যবহার করেছে।

পিকারিং এর সাথে যখন আমার ফোনে কথা হচ্ছিল তখন তিনি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে, ইউনিভার্সিটি অফ কানেক্টিকাট থেকে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে হিসেবে গেছেন। তাঁর কণ্ঠস্বরই প্রমাণ করছিল তিনি সেই ধরনের মানুষ যারা প্রবল ভাবে সব কিছু থেকেই আনন্দের সন্ধান করেন।

আমার কৌতূহল ছিল যে সিনেমার রবিন উইলিয়ামসের মতো তিনিও টেবিলের উপরে দাড়িয়ে কবিতা বলেছিলেন কিনা। তিনি জানালেন ‘ অবশ্যই, এটা করার কারণ ছিল যেন তারা একটি জিনিসকে নানা আঙ্গিকে দেখতে শিখে। যদি আপনি ক্লাসের মাঝে টেবিলের উপরে উঠে দাড়ান, তার মানে আপনি নিশ্চিত যে আপনার কিছু একটা বলার আছেই। আরেক পুরো ক্লাস আমি টেবিলের নিচে বসে থেকে পড়িয়েছি, যেখানে তারা আমাকে দেখতে পাচ্ছিল না। এটিও চমৎকার ভাবে কাজ করেছিল, যদিও ২০ মিনিট পরেই আমার পিঠ ব্যথা শুরু হয়ে গেছিল।‘

পিকারিং এই ৫৩ বছর বয়সে এসে জানালেন যে হুইটম্যানের গর্জনের এর চেয়ে টেনিসনের ছন্দময় ঘুমপাড়ানি Lotos-Eaters তাঁর বেশি প্রিয়। নিত্যদিনের রুটিন হিসেবে জানালেন ‘ আমি কোন কাজ করিনা। আমি মুগ্ধতাবোধে আক্রান্ত এক আগন্তক। আমি নগরের রাস্তায় হাটি বা কাছের ঝোপের কাছে আতশ কাঁচ হাতে অভিযানে যাই। আমি প্রতিটি গাছ, ফুল, পতঙ্গ নিয়ে জানতে চাই যেন আমি তাদের অস্তিত্বের মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারি, ও অন্যদের সাথেও সেই উপলব্ধি ভাগাভাগি করতে পারি।

তিনি আমার মনের কথা বুঝতে পেরে সাথে সাথে বললেন, ‘আমি জানি এটা শুনতে হুইটম্যানের কথার মতোই লাগছে। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম যারা হুইটম্যানকে খুঁজে পেতে চান , তাদের জন্য যদি কিছু বলতেন।

‘মনে রেখো হুইটম্যান সেই জিনিসগুলো নিয়ে মহান সব কবিতা লিখে গেছেন, যাদের একেবারেই কাব্যিক মনে করা হতো না। চারপাশের জগতকে বোঝার জন্য একটু সময় দাও। দেখবে, সাধারণের মাঝেও কত কত অসাধারণত্ব। ‘

তাকে আমার ইংরেজিতের ‘সি’গ্রেড নিয়ে জানালে এক গাল হেসে বললেন, আমিও ‘সি গ্রেড’ পাওয়া, কিন্তু হাল ছাড়ি নাই তো!

পিকারিংএর উপদেশ ছিল বাস্তবিকই আমোদে ভরা। আমার দরজার বাহিরে পড়ে থেকে কয়েকটা বস্তুই যেন ছিল হুইটম্যানের দিকে যাত্রার শুরুয়াদ। কারো জন্য অপেক্ষার সময় খবরের কাগজ পড়ার পরিবর্তে আমি আগন্তকদের সাথে আলাপ করা আরম্ভ করলাম। আমরা ভীষণ ভাবে অগুরুত্বপূর্ণ কিন্ত একই ভাবে সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যেমন রাস্তার খানাখন্দ আর বাড়ির অতিথিদের নিয়ে আলাপ করতাম। পরের দিন নাস্তার সময় এক ভীড়ময় রেস্তোরাঁর মাঝে বসে বরাবরের মত অন্যদের কথাবার্তা উপেক্ষা না করে বরং শুন্যে উড়ে যাওয়া শব্দের টুকরোগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পর মনে হল এই মুহূর্তগুলো আমাকে ধীরে ধীরে হুইটম্যানকে বুঝতে সাহায্য করছে।

প্যাচ অ্যাডামস নামের এক ৪৯ বছর বয়স্ক সার্কাসের পেশাদার ভাড় আমাকে দেখালো কেন হুইটম্যানকে খুঁজে পেতে আরো অনেক বেশি সাধনার প্রয়োজন। ভার্জিনিয়ার আরলিংটনের বাড়ীতে ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার পরিপাটি করে ছাঁটা নিখুঁত পাকানো গোঁফের ও লম্বা পনি-টেইলের মালিক সেদিন পরেছিলেন ভেল্ভেটের ধূসর জ্যাকেট, একটা হলুদ ও একটা কমলা মোজা, খয়েরি শার্ট, সবুজ ব্যাগী পান্ট, যেটা তাঁর বুক পর্যন্ত টানলেই হাফপ্যান্ট হয়ে যায়, মাথায় একটি চারকোণা হ্যাট, যার মধ্যে একটি গুপ্ত পকেটে তাঁর নকল নাকটা লুকানো আছে!

অ্যাডামের মেডিক্যাল ডিপ্লোমার বেসমেন্টে ১২ হাজার বইয়ের সাথে কোথাও আছে। জানো’ আমি উল্লাস নিয়ে খুবই নিবেদিত , এবং হুইটম্যানই আমাকে এই পথ দেখিয়েছেন। কতজন সাহিত্যিক এই উল্লাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, সবাইই তো সমস্যার আকার-আকৃতি নির্ধারণেই ব্যস্ত। হুইটম্যান এই সমস্যার সমুদ্রে বাতিঘরের মতো। তাঁর সেই বাণী আমি সাধ্যমত সবখানে ছড়ানোর চেষ্টা করি।‘ বিশালদেহী মানুষটা খুব নরম, পরিচিত কণ্ঠে বলে যান, তাঁর কথার বলে যেন আর বেশি কিছুই বলার বাকী নেই।

ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মর্গান টাউনে বিমানযাত্রার সময় অ্যাডামের পরনে ছিল তাঁর ভাড়ের পোশাক। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ব-বিদ্যালয়ের ছাত্র সংস্থার হলরুমে প্রায় ২০০ জন স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীরা যোগদান করেছিলেন ‘উল্লাস’-এর উপরে আয়োজিত একটি কর্মশালায়। সেখানে এক পর্যায়ে অ্যাডাম আমাদের চোখ বন্ধ অবস্থায় বসে আমাদের প্রত্যেকের দেহকে অন্তত ৪ জন আগন্তককে স্পর্শ করতে বলেন, যে সময়ে আমরা চিন্তা করছিলাম যে জিনিসগুলো আমাদের জীবনে সুখী করেছে সত্যিকারের, সেগুলো নিয়ে ভাবা এবং চিৎকার করে সেগুলো বলে যাওয়া। সেই হলরুম তখন যেন পরিণত হয়েছিল হুইটম্যানের এক সরব কবিতায়।

অ্যাডামের অধিকাংশ বার্তাই হুইটম্যানের প্রতিধ্বনি- তোমার দেহ সুন্দর- কেবল তুমিই তোমার আকাঙ্ক্ষা কমাতে পারো- জাজমেন্টাল হবার পরিবর্তে কৌতূহলী হও- অন্তদৃষ্টি দিয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করো-, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই খোলা পথের ডাক শোনা যাকে কবি open road বলতেন। সকলের সামনেই সেই খোলা পথটা থাকে কিন্তু, তুমি তোমার অংশটা খুঁজে নাও, নিজ স্বপ্নকে তাড়া করো।

এর পর অ্যাডামস ‘Song of the Open Road’ পড়া শুরু করেন,

Afoot and light-hearted I take to the open road,
Healthy, free, the world before me,
The long brown path before me leading wherever I choose

বজ্রকণ্ঠ থেকে আচম্বিতে ফিসফিসিয়ে এইসব অমৃত বাণী পড়তে পড়তে আমাদের সম্মোহনের ইন্দ্রজালে আবিষ্ট করে ফেলেন তিনি,
Henceforth I ask not good-fortune, I myself am good fortune,
Henceforth I whimper no more, postpone no more, need nothing.

আমার জন্য এটাই ছিল সেই অলৌকিক হঠাত আলোর ঝলকানির মুহূর্ত, Whitmanseque হতে হলে আসলে কাব্যিক হবার দরকার নেই, এখানে দরকার সেই খোলা পথে নামা, এবং সামনের যেটাই আসুক সেটাকে উপভোগ করা।

কবিতাপাঠের সময় অ্যাডামের আলোয় উদ্ভাসিত মুখ দেখে আমি বুঝতে পারি আমার নিজের পড়ার সময় কোন জিনিসটা ঘাটতি ছিলো, কবিতা জোরে জোরে পড়ুন বা আস্তে, আপনার অবশ্যইই একাত্ম হতে হবে। এই জগতে ক্ষণিকের অতিথি হিসেবে প্রবেশ করা যায় না, হুইটম্যান কবিতাপাঠ ঠিক একটি গড়গড় করে উপন্যাস পড়া বা সিনেমা দেখা নয়। কবিতার শব্দে আপনি নড়েচড়ে বসবেন, ছন্দ ও অনুভূতি অবশ্যই কবি ও পাঠক দুইজনের ভিতর থেকেই আসতে হবে যে আপনাকে এনে দেবে আশা, হতাশা, ভয়। এবং আপনি তখন শিল্পের একটি অংশে পরিণত হয়েছেন।

অনেক ভাবেই আমার তীর্থযাত্রা সমাপ্য হলো। ‘লীভস অফ গ্রাস’-এর অমৃত কুম্ভের সন্ধান পেলাম অবশেষে, যা অতি ব্যক্তিগত আত্মার আত্মীয়, প্রগাঢ় এক অনুভূতি। আর হুইটম্যানকেও খুঁজে পেলাম। কেউই বলতে পারেনা কখন সেই কবির শেষ আর সৃষ্টির শুরু, তারা যেন অঙ্গাঙ্গী ভাবেই আছে। তিনি আমার সঙ্গী সবসময়ের জন্য, তিনি আলাপ করেন সময়ে-অসময়ে। অন্যদের সাথে কথা বলার সময় মাঝে মাঝে আমিই হুইটম্যান বনে যাই। কোন কোন সন্ধ্যায় মাত্র ৫ মিনিটের জন্য তাঁর লাইনগুলোতে চোখ বুলিয়ে যাই, এবং সেটাও আমাকে উদ্বেলিত মাতাল করে ফেলে।
যদিও ১৮৫০ এ খুব কম লোকই ‘লীভস অফ গ্রাস’কে ৫ মিনিট সময় দিয়েছিল, তবুও কবি নিজেকে নিয়োজিত করে ছিলেন নব নব কবিতা রচনায়। ব্রডওয়ে গমন আগের মতই চলতে থাকে, বিশেষ করে সেখানে ব্লিকারের উত্তর পাশে প্লাফের বীয়ারের পানশালায় নিত্য সন্ধ্যায় আড্ডা, এখন যেটাকে ‘সোহো’ বলা হয়। প্লাফের বিশাল টেবিলে নিউইয়র্কের সাহিত্যপ্রেমীরা কবিতা, তর্ক ও আড্ডায় পেতে থাকতো বিয়ার এআর টুকটাক নাস্তা পরিবেশনে ফাঁকে। শ্রোতাদের উল্লাস ধ্বনি ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য কবিতা পাঠের সেই মোচ্ছব প্রায়ই চলে দিনের আলোর শেষ উপস্থিতি পর্যন্ত।

হ্যাটা মাথায়, বুক খোলা শার্টে হুইটম্যান আড্ডার এক পাশে থাকতেন, উপস্থিত প্লাফের জনতা তাকে জিনিয়াস বলেই মনে করতো, তাকে উদাত্ত কণ্ঠে কবিতা আবৃতি করতে বলতো। কবি প্রায়শই শ্রমিকদের পানশালাতেও যেতেন, যাদের জন্য লিখছেন বলেই তিনি মনে করতেন আত্মার গভীরে।

যে ভবনে প্লাফ ছিলো, সেখানে এখন এক ছোট খাবারের দোকান। সেখানে গিয়ে তাদের সেলারে সেই দারুণ ইতিহাসে জানানোর চেষ্টার সময়ই তারা বিন্দুমাত্র উৎসাহ না দেখিয়ে বলে উঠল, “ আপনি কি কিছু কিনবেন?’, আমাদের আলাপের সেখানেই ইতি।

প্লাফের কাছেই ব্রডওয়েতে একদিন হাঁটার সময় খবরের কাগজ বিলি করা ছোকরাদের চিৎকার কবি জানতে পারলেন সুমটের দুর্গে কনফেদারেটদের আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের সূচনা করেছে, তাঁর প্রিয় স্বদেশের গণতন্ত্র আজ হুমকি সম্মুখীন। দেশের আমজনতার কাতারে দাড়িয়ে কবিও নানা কৃচ্ছসাধন চালু রাখলেন, কিছুটা ত্যাগস্বীকারের চেষ্টায়।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ২ মাস চলার পরে ১৮৬২র ডিসেম্বরে কবি খবরের কাগজে জানলেন যে তাঁর ভাই ৫১ নিউইয়র্ক রেজিমেন্টের সৈনিক জর্জ হুইটম্যান ভার্জিনিয়ার ফ্রেড্রেরিকসবার্গের যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন। যদিও হুইটম্যান পরিবারের সাথে খুব একটা একাত্ন বোধ করতেন না, মনে করতেন শুধু মাত্র রক্তের সম্পর্কের কারণেই কেউ তোমার ভাই হতে পারে না, তবুও পরিবারের প্রতি তিনি দায়িত্বশীল ছিলেন সবসময়ই, এবং সেই মুহূর্তেই আহত ভাইয়ের সন্ধানে রওনা দেন।

আমি তাঁর পদক্ষেপ অনুসরণ করতে থাকি। ওয়াশিংটন ডিসির দক্ষিণ থেকে কবি নৌকা আর ট্রেনে করে খামার বাড়ি, টিলাময় প্রান্তর, ছোট ছোট জনপদ পেরোতে থাকেন। ওয়াশিংটন ডিসি আর কনফেডারেট রাজধানী রিচমন্ডের মধ্যে প্রাকৃতিক সবচেয়ে বড় বাধা ছিলো রাপ্পাহ্যান্নক নদী। নদীর নিকটে যেয়ে সেখানের ভূমিরগঠন দেখেই বোঝা যায় কিভাবে ভূপ্রকৃতি মিলিটারির পরিকল্পনার উপরে চরম প্রভাব বিস্তার করে। যার কারণে ইউনিয়ন সেনাদলে সবচেয়ে সহজ জায়গাতেই নদী পেরোবার চেষ্টা করে, আর সেটা ছিল ফ্রেডেরিক্সবার্গ।

ফ্রেডেরিক্সবার্গ ক্রসিং দেখা যায় এমন এক খামার বাড়ি চ্যাথাম হাউজে ইউনিয়ন কমান্ডারদের সদরদপ্তর ছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর কবি জানতে পারেন যে তাঁর ভাইয়ের গালে সামান্য একটু আঁচড়ই লেগেছে। আশ্বস্ত হয়েও কবি উদ্বিগ্ন হয়ে দেখলেন মেজর জেনারেল অ্যামব্রোস বার্নসাইডের তার সেনাদের চড়াই বেয়ে পাথরের দেয়ালের সুরক্ষায় থাকা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ফলাফল।

যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ১৩০০ মৃত সৈন্য ছিল। হাজার হাজার আহত সৈন্যরা প্রান্তরের তুষার আচ্ছাদিত করে ফেলেছিল। অনেকেই ৫ দিন ধরে খোলা আকাশেই নিচেই আছে, সৌভাগ্যবানরা পাইনের পরে থাকা ডালের উপরে থেকে সামান্য রেহাই পেয়েছে হিমভূমি থেকে। যে সার্জনেরা আহতদের হাত ও পা আলাদা করে ফেলার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তারা তখনো কাজ করেই যাচ্ছেন। স্তূপীকৃত কাটা হাত আর পায় জানান দিচ্ছিল যে সেখানে আউটডোর সার্জারি চলছে।

এত বছর পরেই, এই ডিসেম্বরের শীতেও স্থানটি পর্যটকে ভরা , তারা সেখানে কালাপা গাছের এবং চ্যাথাম হাউজের নিড়ানো লনের সৌন্দর্য দেখে কাছের শহরে ফিরে যান সেই গৃহযুদ্ধের সময়কার বুলেট কিনতে, যার প্রতিটির মূল্য ৭৫ সেন্স!

কবি যা কিছুই চাক্ষুষ করে থাকুন, এটা তাকে চিরদিনের মত বদলে দেয়। তিনি যুদ্ধাহতদের সাথে ওয়াশিংটন ডিসি ফিরে আসেন, যেখানে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা সেখানের ১৮৫০ সালে মোট জনসংখ্যার চাইতেও বেশী ছিল। এক কক্ষে ভাড়া করার পর একটা সাময়িক চাকরিও নিলেন কাগজের লেখা কপি করার, যা এখনের দিকে জিরক্স মেশিন করে থাকে। দুই বছর পর একটা পাকাপাকি চাকরি পেলেন সরকারী কেরানি হিসেবে, যা মূলত সেই সরকারী কর্মকর্তাদের বদৌলতে হল যারা কবির কবিতা পছন্দ করতেন। তাঁর এক ভাইকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ আমি এক জীবনকে খুব সহজ ভাবেই নিয়েছি। নিয়ম হচ্ছে সকাল ৯টায় আসো আর বিকেল ৪টায় যাও, কিন্তু আমি সকাল ৯টায় আসি না, এবং ৪টা অবধি তখনই থাকি যখন আমি থাকতে চাই।‘

তাঁর ভাড়া করা কক্ষে ছিল একটা বিছানা, পাইন কাঠের টেবিল আর ধাতব এক চুল্লি। তিনি ছোট কেটলীতে চা বানাতেন, ছিল একটি গামলা, একটি চামচ, আর ছেঁড়াখোঁড়া বাদামি কাগজ, যা পরে পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। ফুরসৎ পেলেই মিলিটারি হাসপাতালে যেতেন। আহত, অসুস্থ সৈন্যরা রক্তমাখা ব্যান্ডেজের স্তুপের পাশে যেখানে নোংরা কম্বলের উপরে শুয়ে থাকতেন। কাটা, হাঁ হয়ে থাকে চেরা ক্ষত ছিল নিত্যকার ঘটনা। মানুষের আর্তনাদ আর চাপা গোঙানিতে এলাকার ভরে থাকত। কেউ কেউ ১৫ বছরের কিশোরদের মৃত্যু উপেক্ষা করে কৌতুকও করত মাঝে মাঝে।
কবির মতে তিনি সেই হাসপাতালের আহত সৈন্যদের মাঝে এক বিশালাকায় বুনো মহিষের মত বিচরণ করতেন। ধূসর স্যুট পরিহিত, মাথায় চওরা সমব্রেরো হ্যাট, পরিচ্ছন্ন ফুলেল শার্ট, আর্মি বুটজুতা, মরোক্কান চামড়ার। মূলত তিনিই কথা বলতেন, মাঝে মাঝে সারারাত ধরে। মা কে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন ‘ আহত সৈন্যরা সামান্য মনোযোগের আশায় এতটাই তৃষ্ণার্ত থাকতো, যে সেটা ছাড়া তাদের কাছে পৌঁছাবার আর কোন উপায় জানা ছিল না।‘ অনেক একাকী, হোমসিক সৈন্যদের কাছে হুইটম্যানের সঙ্গ আর চাঙ্গা করা কথাবার্তা ডাক্তারের চেয়েও বেশী উপকারী ছিল।
সেখানে কবির কোন সরকারী পদ ছিল না। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ব্রিটিশদের লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকেই সৈন্যদের জন্য প্রয়োজনীয় নার্সিং সহযোগিতা দিচ্ছিল কয়েকটি সিভিলিয়ান সংস্থা। তাদের অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবীই ছিলো মাঝবয়সী বা বয়স্ক মহিলারা। তাদের মতই হুইটম্যানের চারপাশেই তখন টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্য সব রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি। মানসিক রোগের ঝুঁকিও ছিল খুব বেশি। কবি রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতেন না, মাথায় সব শোকাবহ ভারী অভিজ্ঞতার বোঝা নিয়ে চলতে চলতে তাঁর ওজন বেড়ে যায় ৩০ পাউন্ড আর সেই সময়ে তিনি লিখতে পারেন নি কিছুই।

আব্রাহাম লিংকনের দৃশ্যপটে আশার অনেক আগেই হুইটম্যান এখন উদ্ধারকর্তা রাষ্ট্রপতির অপেক্ষায় এক কবিতা লিখেছিলেন ‘যে আসবে আসল বুনো পশ্চিম থেকে, প্রেইরি, বন, উমুক্ত প্রান্তর, কাঠের কেবিন থেকে। তাঁর এই আহ্বানের প্রতি উত্তরেই যেন লিংকনের আগমন। উনাদের কোনদিনই সাক্ষাৎ হয় নি। সেই উম্মাতাল সময়ে কবি, ঠিক লিংকনের মতই ভারমন্ট অ্যাভিনিউ আর এল স্ট্রিটের কোণায় ২৫ বা ৩০ জন্য অশ্বারোহী সৈনিকদের সাথে ঘোড়ায় চেপে হোয়াইট হাউজ থেকে সৈন্যদের ব্যারাকে পৌঁছান, যেখানে রাষ্ট্রপতি ঘুমাতেন। কবির মতে, লিংকনের মুখমণ্ডলের গভীর, প্রায় ধরাছোঁয়ার বাহিরের নৈর্বক্তিক আবেগ কোন শিল্পী আর আলোকচিত্রই ধরতে পারে নি। এখানে ছবির বাহিরের আরও অন্য বিষয় ছিল। দুই-তিন শতাব্দী আগের সেরা চিত্রকরদের প্রয়োজন ছিল সেই আবহ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার জন্য। তাঁর মুখ ছিল এক একালের মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, এতই অদ্ভুত ধরনের কুৎসিত যে তা হয়ে যেত অনিন্দ্য সুন্দর।

ওয়াশিংটনের রাস্তাঘাটে আমি হুইটম্যানের সেই থাকার ঘর আর কাজ করার হাসপাতালের সন্ধানে ঘুরঘুর করতে থাকি। কেবলমাত্র একটি ভবন, যা বর্তমানে আমেরিকান চিত্রকলার জাদুঘর এবং ন্যাশনাল পোট্রেট গ্যালারি, এখনো বর্তমান। ১৮৮৮ সাল পর্যন্ত এটা পেটেন্ট অফিস ছিল, যেখানে আমজনতা ১২ ফুট উচ্চতার কাঁচের শোকেসে জিনিশগুলোর মডেল দেখতে পেতো। কবি এই ভবনটির নিওক্ল্যাসিকাল ধাঁচ বড্ড পছন্দ করতেন, অনেকটা এথেন্সের পার্থেননের মতো এটাকে বলতেন রাজধানীর মহত্তম সৌকর্যময় ভবন।

যুদ্ধের সময় আহত সৈন্যরা সারি বেধে মার্বেলের মেঝেতে পড়ে থাকতেন।। তিন তলার একটা কক্ষ ঠিক হুইটম্যান যেমন দেখেছিলেন, তেমনি আছে এখনো। মর্মর স্তম্ভ আর বাঁকানো ২৮ ফুট ছাদের মাঝে । এই কক্ষেই ১৮৬৫র ৬ মার্চ লিংকনের দ্বিতীয় দফায় শপথগ্রহণের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সেদিন নিয়ে লিখেছিলেন কবি, ‘আজ রাতে সুন্দরী রমণী, সুগন্ধি, বেহালার মিষ্টতা, POLKA আর ওয়াল্টজ, কিন্তু তার পরপরই অপারেশন, যন্ত্রণায় নীল মুখ, গোঙ্গানি, মৃত্যু পথযাত্রীর কাঁচের মত চকচকে চোখ, ক্ষতবিক্ষত কার্পেট, ক্ষত আর রক্তের ঘ্রাণ, এবং অনেক মায়ের সন্তান থাকবে আগন্তকদের ভীড়ে।

যদি কবি আজও বেঁচে থাকতেন, তাকে হয়তো আমরা আজও পেতাম সেই মৃত পথ যাত্রীদের সাথে আগন্তকদের মাঝে, যেমন যারা এইডস আক্রান্তদের সেবা করেন। চারপাশের শব্দেরা – টেলিভিশন, চিৎকার, কাশি, বিছানা পাতার, কণ্ঠ। বাতাসে ঘূর্ণায়মান বাসী গন্ধেরা, ঔষধ, তামাক। রোগীদের কক্ষে সূর্যকিরণ, ঘড়ি, নেইল কাটার, ক্যান্ডি, ছবি, ধাঁধাঁ, বিস্কিটের টিন, বই, টিস্যু, জুতা, হাতের ক্রিম আর টিভি গাইড।

পর্দা দিয়ে বিছানাগুলো আলাদা আলাদা করা। হলওয়েতে দুই তরুণ দাড়িয়ে চেহারার যত্ন নিচ্ছিল। দুই লোক সিগারেট চাইলো। অনেক রোগীই সারা দিন বিছানায় পড়ে থেকে খোলা চোখে স্থাণু তাকিয়েই থাকে। অন্যরা সারারাত সিনেমা দেখে। ফ্রাংকি, যে জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে ধীরে, বুকে চিবুক ঠেকিয়ে নার্স ষ্টেশনের কাছে হুইল চেয়ারে ঘুমে নিমগ্ন, তার হাতে একটি খেলনা ভালুক, আর মাথায় বেসবল টুপি!

সবচেয়ে নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে দেখা যায় তারাই আসে যাদে কাছেই কেউ এইডসের কারণে হারিয়ে গেছেন। কিন্তু কেন আসে এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সবাইই বলে ‘ জানা নেই!’

সেখানে এক নিশিরাতের মত হতক্লান্ত আমি সেই কাজটাই করি যে কবি করেছিলেন, একাকী বাহিরে হাঁটতে যেয়ে আকাশের জ্বলজ্বলে তারাদের দিকে তাকিয়ে আওড়ায়, ‘ এত উজ্জল, এত শান্ত, এত নীরব ভাবে প্রবল প্রকাশমান, এত মনোরম।‘

যুদ্ধের পর কবি নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করেন। ঘুমশুন্যতা এবং উদ্বিগ্নতা তাকে সেই অবস্থায় নিয়ে গেছিল যে অবস্থায় তাকে আমরা এখন বলি Post-traumatic stress disorder। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তাকে দেখাতো একজন বয়স্ক লোকের মতো। পরে একবার লিখেছিলেন,আমি নিজের চোখের জলেই অন্ধ হয়ে হয়ে লিখব হয়তো।‘

সেই একই সময়ে ইংরেজ কবি লর্ড অ্যালফ্রেড টেনিসন, যার সাথে হুইটম্যানের যোগাযোগ ছিল, যুদ্ধ নিয়ে বিখ্যাত সব কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু হুইটম্যান সত্যিকারের যুদ্ধ কোন সময়ই বইতে আনা সম্ভব না , যুদ্ধ হচ্ছে nine hundres and ninety-nine parts diarrhea

যুদ্ধে নিষ্ঠুরতা নিয়ে সত্য ঘটনাগুলো বলার জন্য কবি সরল গদ্যের আশ্রয় নিলেন। যেমন Specimen Days তে লিখলেন টেনিসির কলম্বিয়ার যুদ্ধের পরে প্রতিপক্ষ অনেক অনেক আহত যোদ্ধাদের মাঠে রেখেই পিছু হটে গেল, যারা আমাদের গুলির সীমানার মধ্যেই ছিল। সেই আহতরা যখন সামান্য নড়াচড়ার চেষ্টা করত, মূলত হামাগুড়ি দিয়ে সরার চেষ্টা চালাতো তখনই আমাদের কেউ না কেউ তাকে গুলি করত। কাউকেই তারা হামাগুরি দিয়ে চলে যেয়ে দেয় নি।

এই ফাঁকে হুইটম্যান ‘লীভস অফ গ্রাস’এ আরও নতুন নতুন কবিতা যোগ করতে থাকেন, পুরনো কবিতাও ঘষেমেজে নতুন ভাবে যোগ করেন, এবং চারপাশে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে নিজেই নিজেই প্রচারণা চালাতে থাকেন। ১৮৭২ সালে ডার্টমাউথ কলেজে কবিতা পড়ার পর এক সংবাদপত্র বেনামী আলোচক কবিকে হোমার ও শেক্সপীয়ারের সাথে তুলনা করেন। জী, আপনি ঠিকই ধরেছেন, হুইটম্যান নিজেই সেই গল্প লিখেছিলেন!

১৮৭৩ সালে ৫৩ বছর বয়সে একটা স্ট্রোকের ধকল সামলে কবি নিউজার্সির ক্যামডেনে ভাই জর্জ ও ভাইয়ের স্ত্রী লুইসার সাথে থাকার জন্য যান। জর্জ তখন ক্যামডেনের নানা যান্ত্রিক কাজকর্মের একজন পাইপ পরিদর্শক ছিলেন। ক্যামডেন তখন ফিলাডেলফিয়ার এক ব্যস্ত শিল্পপ্রধান এলাকা ছিল, যেখানে আরেক হুইটম্যান পরিবারও থাকতো, যারা ১৮৪২ থেলে হুইটম্যান চকলেটের জন্য বিখ্যাত ছিলো। আমাদের কবির সাথে তাদের কোন সাক্ষাৎ হয় নি।

পরবর্তী কয়েক বছর কবির আরো কয়েকটি স্ট্রোকের আক্রমণ হয়, এবং হাঁটাচলাতেও সমস্যা দেখা দেয়। যন্ত্রণাময় যক্ষ্মার সংক্রমণ তাঁর হাড়ে ছড়িয়ে পরে। কাছের টিম্বার ক্রিকের কাছে কবি নিজের সারিয়ে তোলার শপথ নেন। এখন সারিসারি বাড়ী আর রাস্তার মাঝে খালটি প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই গন্তব্যে আমি ঠিকই পৌছালাম যেখানে হুইটম্যান তাঁর সমস্ত কাপড় দূরে রেখে, কাঁদায় নিজেকে আবৃত করে ওকের নগ্ন গুড়ির সাথে যুঝে প্রশ্ন করছিলেন, ব্যবসা, রাজনীতি, সহমত , প্রেম সব কিছুর সাথে ক্লান্ত হবার পর তুমি যখন দেখ যে কোনকিছুই পূর্ণ তৃপ্তি এনে দিচ্ছে না, তখন কী থাকে?’- তখন প্রকৃতি থাকে।

সারাজীবনের লেখালেখি থেকে কবি কয়েক হাজার ডলার পেয়েছিলেন। ‘লীভস অফ গ্রাস’এর কম কাটতিও সেটার উপর সেন্সরের কাচি চালানো কমায় নি! ১৮৮২ সালে বোস্টনের ডিস্ট্রিক্ট অ্যার্টনি তাকে বই থেকে ‘ A woman waits for me, To a common prostitute, The dalliance of the Eagles’ এর অন্যান্য কবিতার আরও কয়েকটি লাইন মুছে ফেলতে বলেন। কবি সেটা করতে রাজি নয় নাই, বলেছিলেন, সবচেয়ে আপত্তিজনক বই হচ্ছে বাঁধার মুখে লেখা মুছে ছাপানো বইতাঁর সারা জীবনেই আলোচক এবং সেন্সর অসমকামে কামগন্ধী কিছু লাইনের উপরে আলোকপাতের চেষ্টা করে গেছে, বিশেষ করে I turn the bridegroom out of te bed and stay with the bride myself । এমিলি ডিকিনসন এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে তিনি কোনদিনই হুইটম্যানের লেখা পড়েন নাই, কিন্তু শুনেছেন যে সেগুলো খুবই আপত্তিজনক। হুইটম্যানের নানা চিঠি ও কবিতার লাইন তাঁর সমকামের প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করে। যে অংশটা আলোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এবং পাঠকেরাও কবির লাইনের মাধ্যমে বুঝতে পারে যে তারা তাকে অনুভবই করছেন।

হুইটম্যানের যৌনজীবন নিয়ে মানুষের এখনো ব্যাপক আগ্রহ। মাইকেল এঞ্জেলো বা মার্ক টোয়েন কাকে ভালোবাসতেন? তা নিয়ে খুব কম জানেন, বা কারো আগ্রহ আছে জানার। কিন্তু হুইটম্যানে ক্ষেত্রে ব্যাপারটিই আলাদা। ক্যামডেনের ওয়াটার ফ্রন্টের এক পানশালায় উঁকি দিতে গেছিলাম, যে ধরনের জায়গাগুলোতে কবি নিজেও যেতেন, ভিতরে বেশ ভিড়ই ছিলো। চলে আসার সময় বারটেন্ডার গ্লাস মোছা থামিয়ে বলে উঠল, তুমি নিশ্চয়ই হুইটম্যানকে সমকামী বলবে না, তাই তো? আমি তাঁর কবিতা পছন্দ করি, এবং চাই না কেউ তাকে সেটা বলুক।

সেই আমলের সেন্সরশীপ নিয়ে তর্কবিতর্ক হুইটম্যানকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে, এবং সাহিত্যিকরাও তাঁর বই নিয়ে মুল্যায়ন অব্যাহত রাখেন। ট্রেজার আইল্যান্ড প্রকাশিত হবার কিছুদিন পরেই লেখা রবার্ট লুই স্টিভেনশন জানান লীভস অফ গ্রাস পড়ে তাঁর জানা জগত সম্পূর্ণ পালটে গেছে। স্টারি নাইট আকার সময় ভিনসেন্ট ভ্যানগগ লীভস অফ গ্রাস-এর একটা ফরাসি সংস্করণ পড়েন। ভিনসেন্ট তাঁর বোনকে লেখেন, ‘ জগত জোড়া সুস্থ, জৈবিক প্রেম, সবল ও সাবলীল বন্ধুত্ব, কর্ম সবই যেন স্বর্গের এক নক্ষত্রময় ভল্টে হাজির, এটা তোমাকে সুখী করবে, এগুলো এতই খাঁটি এআর সাবলীল।

কিন্তু কবি মূলত যাদের জন্য লিখতেন, সেই সাধারণ মানুষ তাঁর কবিতা পড়ত না। লিংকনের মৃত্যুর পর লেখা ‘ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন’ ছিল কবির জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তা পাওয়া গুটিকয় কবিতার একটি।
O captain, my captain! Our fearful trip is done,
The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won. এবং এটি লীভস অফ গ্রাসের মাত্র দুটি ছন্দকবিতার একটি। এর সাফল্যের চেয়ে প্রচলিত ধারণার উপরে লেখা বলেই কবি বেশি চিন্তিত ছিলেন, তিনি বলেছিলেন ‘এই কবিতা তিনি সম্ভবত লিখতে চান নি’।

কবির চোখ দুটো সবসময়ই খুব সম্মোহক। কোন ক্রোধ বা ভয় সেখানে দেখা যায় না। তিনি একজন আশাবাদী ছিলেন। লীভস অফ গ্রাসএর পরিপূর্ণ সংস্করণের শেষ লাইন ছিল the strongest and sweetest songs yet remain to be sung/ দেহ যখন ক্রমেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল the strange inertia falling pall-like over me,
তিনি তাঁর গর্জন হারিয়ে ফেললেও বোধ হারান নি,
Have you not learn’d lessons only of those who admired you and were tender you u?
তাঁর প্রশ্ন ছিল have you not learned lessons from those who reject you, and brace themselves against you?

মানবতার জয়গান গাইলেও হুইটম্যান তাঁর কালকে অস্বীকার করতে পারেন নি। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের তিনি পূর্ণ নাগরিক হিসাবে গ্রহণের জন্য প্রচারণা চালান নি। সারা জীবন এই বিশ্বাস নিয়েই চলেছেন যে আমাদের মগজের আকৃতিই আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দেয়। ১৮৯২ সালে ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুর পড়ে তাঁর মগজ ফিলাডেলফিয়ার Anthropometic সোসাইটিতে পাঠানো হয়, এই আশায় যে পরীক্ষার পর জানা যাবে কেন তিনি এট অসাধারণ ছিলেন।

তৎক্ষণাৎ পরীক্ষায় দেখা যায় যে তাঁর মগজ একটু ক্ষুদ্রাকৃতিরই ছিলো। তারপর এক ল্যাবরেটরি কর্মীর হাত থেকে দুর্ঘটনাবশত এটি পড়ে যায়, কবির মগজটি এর পর ফেলেই দেয়া হয়।

১৮৮০র দিকে কবি বুঝতে পারেন তাঁর জীবদ্দশায় লীভস অফ গ্রাস গণমানুষের কাছে বিপুল ভাবে জায়গা করে নিতে পারবে না। তিনি ভবিষ্যতের উপরেই আস্থা রাখেন। কবি মনে করতেন, আসল বোঝার স্বাদ আসতে শতবর্ষ লাগে।

শত বছর পেরিয়ে গেছে। হুইটম্যানের প্রভাব অনন্য। তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, অবহেলিতের প্রতি বন্ধুত্ব, সমতার জয়গান, নিসর্গ প্রেম- সবই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্য ইভুলুশন অফ ওয়াল্ট হুইটম্যান গ্রন্থের লেখক, সরবোর্ণ প্রফেসর রজার অ্যাসেলিনিউ মনে করেন ‘ অধিকাংশ মার্কিনীর চিন্তারও বাহিরে যে হুইটম্যান কতটা গুরুত্বপূর্ণ।‘ প্যারিসের লেফট ব্যাংকের এক ক্যাফেতে আলাপের সময় সে বলে ওঠে ‘ হুইটম্যানের ভিতরে ছাত্ররা সেই বিশেষ উপমাটার সন্ধান পায় যার ফলে তারা সেটা পড়তে পারে যেটা তাদের প্রয়োজন। নারীর সমঅধিকার। যৌনতার স্বাধীনতা। অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা।‘

যদিও কবি হুইটম্যান চাইতেন আমজনতার পকেটে পকেটে তাঁর বই থাকবে, আমাদের খবরের কাগজের দোকানে এ থাকবে, সেই দিকে দিয়ে কবি এখনো ব্যর্থ।

এই ব্যর্থতা আমাদের। বাহিরে যাও, জোরে জোরে কবিতা পড়। অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষমান। আপনি হয়তো নিজের সেই অংশের সন্ধান পাবেন, যেটা অস্তিত্বের অনুপস্থিতি আপনি জানতেও না।

মূল লেখা - জোয়েল এল.সোয়ের্ডলো
(১৯৯৪র ডিসেম্বরে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে ছাপা হয়েছিল)

২য় পর্ব

১ম পর্ব


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

শেষ পর্যন্ত শেষ করে ওঠা গেল। গতানুগতিক কিন্তু ক্রমাগত বেড়ে চলা ব্যস্ততার মাঝে এই রকমের পাঠগুলো আমাদের একটা ভারসাম্যতায় পৌঁছে দেয়। ধন্যবাদ অণু-দাদা!

বড্ড কম লেখো তুমি আজকাল! কিন্তু, এত বড় লেখাটা, সব কটা পর্ব ধরে বেশ বড়, পাঠকের কাছে উপহার দেয়ার জন্য অভিনন্দন!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

তারেক অণু এর ছবি

অনেক অনেক লেখার প্ল্যান করেছি গো এই বছর, দেখা যাক!

সত্যপীর এর ছবি

সাব্বাস!

..................................................................
#Banshibir.

তারেক অণু এর ছবি

এই পীরবাবা, বললাম না নবাব সিরাজ নিয়ে আসল কিছু লেখা দেন, আবার যাব তো মুর্শিদাবাদ

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

‘ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন’ এসএসসি তে আমাদের পাঠ্য ছিল। মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে এখনও। সেই কবি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে খুব ভাল লাগলো। আপনাকে ধন্যবাদ!

মন মাঝি এর ছবি

মনে পড়ে আমারও পাঠ্য ছিল ---

****************************************

হিমু এর ছবি

আব্দুল কাইয়ুম খানের বিটারসুইট ভিক্টরি: আ ফ্রিডম ফাইটার'স টেইল বইটাতে ক‍্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বীরশ্রেষ্ঠের অন্তিম লড়াইয়ের মর্মস্পর্শী বর্ণনা আছে। এই কবিতাটা কেন কালজয়ী, বইয়ের সে অংশ পড়তে গিয়ে আরেকবার টের পেয়েছিলাম।

তারেক অণু এর ছবি

ধন্যবাদ হিমু ভাই, বইটা পড়া হয় নি, পড়ে ফেলব আশা করছি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।