বিজনেস ডিসিশন

তাসনীম এর ছবি
লিখেছেন তাসনীম (তারিখ: শনি, ০৯/০৩/২০১৯ - ৮:৪৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমার অফিসে স্যান্ড্রা নামে একজন মহিলা ছিলেন। তিনি অনেক উঁচু পদে ছিলেন। বিচিত্র এক কারণে তিনি সবার পিছনে লাগতেন। যাদের পেছনে লাগতেন তারা কেউই তার সমতুল্য না, মানে অফিসে চুনোপুঁটিদের তিনি নানান ঝামেলাতে ফেলতেন। আমরা কুমির কুমির খেলার মতো স্যান্ড্রা থেকে যতদূরের সম্ভব তত দূরেই থাকতাম। কিন্তু একবার আমি ঝামেলাতে পড়ে গেলাম। স্যান্ড্রা আমার উপর ক্ষেপে গেলেন।

আমার মোটামুটি জীবন অতিষ্ট হয়ে গেল। মিশুকের পেছনে যেমন লেখা থাকে আমি ছোট আমাকে মারবেন না - তেমনি আমারও ইচ্ছে ছিল স্যান্ড্রাকে এই কথাটা বলা। একদিন স্যান্ড্রা আমাকে নানান উপদেশ দিলেন সাথে সাথে চাকরি নট করে দেওয়ার কিছু প্রচ্ছন্ন হুমকি দিলেন। আমি একটু মৃদু প্রতিবাদ করলাম। জানালাম - চাকরি নট হওয়ার মতো কিছু করিনি আমি। স্যান্ড্রা আমাকে গম্ভীরভাবে কিছু কথা বললেন - যার মূল বক্তব্য হল - চাকরি নট করে দেওয়া একটা বিজনেস ডিসিশন। এতে পার্সোনাল কিছুই থাকে না। প্রতিদিন শত শত যে বিজনেস ডিসিশন নেওয়া সেরকম একটা। উই ক্যান নট ডু এনি থিং হোয়েন দেয়ার ইজ আ বিজনেস নিড। বিজনেস ডিসিশন নিয়ে রাগ বা দুঃখের কোন অবকাশ নেই।

কার্যত মার্কিন দেশে এরচেয়ে বেটার কোন উপদেশ হতে পারে না। এইদেশ আসলেই বেনিয়া দেশ। বিজনেস নিডের জন্য অন্য দেশে বোমা পড়ে, সরকার বদল হয়, মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হয়। এই বিজনেস নিডের জন্যই নিজের দেশে মানুষ বিনা চিকিৎসাতে মারা যায়, মানুষজন উচ্চশিক্ষা পায় না। ছোটবেলাতে আমার ধারণা ছিল গর্ভনমেন্ট একটা গম্ভীর টাইপের মানুষ, এই দেশে এসে আমার ধারণা হল "বিজনেস" একটা খতরনাক টাইপের মানুষ। শোলে সিনেমার গব্বর সিং এর মতো কেউ। আমি যতখানি সম্ভব ততখানি দূরত্ব রাখার চেষ্টা করি যাবতীয় বিজনেস থেকে।

এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে আমাদের কোম্পানিতে বড় লে-অফ শুরু হল। লে-অফ হচ্ছে চাকরি নটের বিজনেস পরিভাষা। আমরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছি লে-অফ হচ্ছে বিজনেস ডিসিশন - ঈশ্বরের বাণীর মতো এই ডিসিশন নিয়ে কোন প্রশ্ন চলে না। কোম্পানিগুলো কিছুদিন পর পরই ছাঁটাইয়ের পথ ধরে, মানুষের অনুচ্চ আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়। নিজের বাসাতে বিজনেস ডিসিশন নেওয়া সম্ভব না - বড় ছেলেকে ডেকে কী বলা যায় - সান ইয়োর সার্ভিস ইজ নো লংগার নিডেড, হাউএভার আই গ্রেটলি এপ্রিশিয়েট দ্য ওয়ার্ক্স ইউ হ্যাভ ডান হিয়ার।

এই দেশে চাকরি জীবন ভিডিও গেইমের মতো - ছোট, বড়, মাঝারি - নানান লে-অফ আমি পাড়ি দিয়েছি - কিন্তু জানা ছিল একদিন না একদিন ধরা পড়তে হবে। আমি বাক্স টাক্স গুছিয়ে প্রস্তুত। দুপুরে ক্যাফেটেরিয়াতে খেতে গিয়ে স্যান্ড্রার সাথে দেখা। এক গাল হেসে জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছে...সে আমার দিকে হিংস্র একটা চাউনি দিল। আমার মনে হল এরপরে খামচি বা কামড় দিতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি নিজের রুমে চলে আসলাম। একটু পরেই খবর পেলাম যে স্যান্ড্রারও চাকরি নট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এই জিনিস নিয়ে সে বিস্তর হইচই করেছে। নিজের অজান্তেই স্যান্ড্রা আমাকে দ্বিতীয় শিক্ষাটা দিলেন। বিজনেস ডিসিশন যখন নিজের পশ্চাতদেশে এসে লাগে, সেটা আর বিজনেস ডিসিশন থাকে না, ব্যক্তিগত ক্রোধের কারণ হয়। এই গল্পটা আমি বহু লোককে বলেছি - সম্প্রতি আমার নিজের অফিসে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাতে আমার বস আমাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন নার্থি পার্সোনাল, ওনলি বিজনেস...ইত্যাদি ইত্যাদি বলে, তাকেও বলেছি ব্যাপারটা।

এটাও বলা দরকার যে লে-অফের পরে আমাদের অফিস অনেক কিছু করেছিল আমাদের জন্য। আমাদেরকে একটা অফিস স্পেস দেওয়া হয়েছিল, সেখানে বসে আমরা জব সার্চ, চাকরির জন্য এপ্লিকেশন ইত্যাদি করতে পারতাম। চাকরি নটদের অফিস স্পেসের নাম দিয়েছিলাম সর্বহারা পার্টির অফিস। সেই অফিসে স্পেসে স্যান্ড্রার সাথে দেখা হত। এইবার আমার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল। আমি এক অত্যন্ত অমায়িক, বন্ধুত্বপূর্ণ স্যান্ড্রাকে দেখতে পেলাম। অতীতে কোম্পানির ডিরেক্টর হলেও বর্তমানে আমরা দু'জনেই সর্বহারা। আমার জীবনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও স্যান্ড্রার থেকে আসলো। পশ্চাতদেশে গরম গদী থাকলে সে উষ্ণতা মাথাতে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। মন্ত্রী আর এম্পিদের বাড়াবাড়ির কারণগুলো ব্যাখ্যা যোগ্য। শ্রেনী আর অর্থনৈতিক বৈষম্য না থাকলে মানুষ অনেক সহজে একে অন্যের বন্ধু হতে পারে।

এই ঘটনার কয়েকমাস পরের ঘটনা। আমি আবার নতুন চাকরি শুরু করেছি। স্যান্ড্রাও অন্যখানে কাজ শুরু করেছে। আমাকে হঠাৎ মেসেজ পাঠালো, ওর কোম্পানিতে আমি কাজ করতে আগ্রহী কিনা? লিংকডইনে আমি চেক করে দেখলাম তার সিটটা কতখানি গরম।

নাহ্‌, আমি নতুন স্কিল শিখছি কিছু - বিজনেস ডিসিশন নিতে যাতে সুবিধা হয় - স্যান্ড্রাকে মানা করে দিলাম। একজন লোককে একবারের বেশি ক্ষতি করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াটা বলদামি। চতুর্থ শিক্ষাটাও তার কাছ থেকে পাওয়া।

###


মন্তব্য

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

হাহাহা। অনেক শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায়, কেউ ক্ষমতায় থাকলে বা নতুন করে ক্ষমতা পেলে সেটার "প্রয়োগ" খুব পছন্দ করে, যাবতীয় প্রটোকল এবং মাঝেমাঝে শিষ্টাচারের বাইরে যেয়ে। আর সামাজিক স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য, পরিবারে নিজের উঁচু পদ বা নিজের ক্ষমতাবান ইমেজ জাহির করার জন্য অফিসের নানান রিসোর্স অপব্যবহারের একটা প্রবণতাও দেখা যায় কিছুটা।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

দুনিয়ার সবখানেই বিজনেস ডিসিশানের ছড়াছড়ি! কাছাকাছি কিছু শিক্ষা আমি প্রথমবার প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে পেয়েছিলাম দেঁতো হাসি

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

সত্যপীর এর ছবি

আমার আপিসে বছর সাতেক হয়ে গেল, দুইটা বড় লে অফ কানের পাশ দিয়ে গেছে। দান দান তিন দান আসতেছে সম্ভবত।

বস লেভেলে স্যান্ড্রা ক্যাসান্ড্রা দুই পক্ষই আমার আছে। স্যান্ড্রাপক্ষ কয় এরে দিয়া সিনিয়র লিডারশীপ হবে নাহ, এরে কাটায় দেয়া যাক। ক্যাসান্ড্রা পক্ষ তখন কয় নাহ এ বলদের মত খাটে, এরে কাটায় দিলে জনা দুই নতুন লোক লাগবে। থাকুক। এইভাবে নানা বিজনেছ ডিসিশন কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে মুমিন। অফিস অফিস খেলা।

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

নাহ এ বলদের মত খাটে

ও! তাইলে এই হইল ব্যাপার! এখন বুঝলাম সচলে লেখার চালান আসতে এত লেট হয় ক্যানো!

অবনীল এর ছবি

পশ্চাতদেশে গরম গদী থাকলে সে উষ্ণতা মাথাতে গিয়ে পৌঁছাতে পারে।

একজন লোককে একবারের বেশি ক্ষতি করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াটা বলদামি।

উত্তম জাঝা!

___________________________________
ঈশ্বরের মত, ভবঘুরে স্বপ্নগুলো।

তাসনীম এর ছবি

ধন্যবাদ।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে বিজনেস ডিসিশন -

১। চাকুরি চলে যাওয়াঃ নিজের দোষে/ মালিকপক্ষের পছন্দ হলো না/ কোম্পানিটাই বসে গেলো/ সহকর্মীদের রাজনীতিতে পড়া - এর সবই কপালের কোপ। বিজনেস ডিসিশনের দোহাই দিলেও এখানে খাটে না।

২। নিজের গায়ে এসে পড়াঃ এটা স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সত্য।

৩। গদির গরমঃ বাংলাদেশে যে কোন সময়ে একটা সরকারি দলের কর্মী আর একটা বিরোধী দলের কর্মীকে পাশাপাশি দেখলে সব ফক্‌ফকা হয়ে যাবে।

৪। বার বার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধানঃ যে দেশে চাকুরি একটা সোনার হরিণ সেখানে লোকে বার বার মারা খাবে জেনেও একই ফাঁদে পা দেয় - জেনে বুঝে, নিরুপায় হয়েই দেয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তাসনীম এর ছবি

বিজনেস ব্যাপারটা গোটা দুনিয়াতে একই নিয়মে চলে।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

মেঘলা মানুষ এর ছবি

দেখা গেল কোয়ার্টারলি আর্নিং এ সিইও কনফারেন্স কল এ বলে বসলেন, "আমরা আগের বছরের চেয়ে কোনরকমে ভালো করেছি। তবে যাতে আরও ভালো করা যায় সেজন্য আমি মোট কর্মবলের ১০ শতাংশ কমিয়ে আনবো।" ইয়ে, মানে... কিছু কিছু যায়গায় গাছ ডালের গোড়া থেকে কাটা পড়ে।

লেখা ভালো লাগলো। এরকম মানুষের পেছনে অকারণে লেগে থাকা লোকরা কেন এই কাজটা করে সেটা একটা রহস্য বটে।

ধন্যবাদ হাসি

তাসনীম এর ছবি

আপনাকেও ধনব্যাদ।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

কনফুসিয়াস এর ছবি

ভালো করেছেন একদম! হাসি

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

তাসনীম এর ছবি

ধন্যবাদ হাসি

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

শাব্দিক এর ছবি

দুনিয়াডাই বেনিয়া!

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।