ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি...০১৩

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি
লিখেছেন জোহরা ফেরদৌসী (তারিখ: রবি, ২৬/০৫/২০১৩ - ১২:০৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বাতাসে শীতের গন্ধ । প্রকৃতিতে রংয়ের উৎসব শেষ করে পাতাদের ঝরে পড়াও শেষ । বাদামী রংয়ের শুকনো পাতা মাড়িয়ে বাড়ি ফেরার পথে কোথা থেকে ভেসে এল অনেক দিন আগের এই রকম শীতের কোন ইউক্যালিপটাসের শুকনো পাতার গন্ধ...নজরুলের সমাধির পাশে লাইব্রেরীর গেইটে লাল রঙ্গা বাস থেকে নেমে কলা ভবন পর্যন্ত হেঁটে আসতে আসতে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিতাম ইউক্যালিপটাসের শুকনো পাতা । একটু ছিড়লেই সেই পাতা থেকে বের হ’ত অদ্ভুত এক সৌরভ...কোথা হতে ভেসে এলো ফেলে আসা দিনের গায়ে লেগে থাকা সেই সৌরভ...আর তার হাত ধরে চলে এল বন্ধুর মত বন্ধুদের স্মৃতিরা...

... ...

এই সব অদরকারী স্মৃতির কোন পরম্পরা নেই । তবু যদি কারুর আগ্রহ থাকে, আগের পর্বগুলোঃ , , , , , , , , , ১০, ১১১২ এখানে ।
... ...

৪৬.

তখনও স্কুলে পড়ি। খুব সম্ভবত: ক্লাস এইটে। সিম্মি আর আমি এক সঙ্গে পড়তে শুরু করলাম আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজি – প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা ও বকুলকথা। ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলের তিন প্রজন্মের নারীর জীবনালেখ্য। সত্যবতীর কন্যা সুবর্ণলতা, সুবর্ণলতার কন্যা বকুল। গল্পের শুরু গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সত্যবতীকে দিয়ে। পরে সেই গল্প চলেছে গ্রাম থেকে কোলকাতার গলিতে। সত্যবতী তার সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া এক নারী। পরোপকারী, গুরুগম্ভীর, সফল কবিরাজ রামকালীর এক মাত্র কন্যা সত্যবতী। স্নেহান্ধ পিতার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকও অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, চারপাশের কারুর সাথে মেলানো যায় না এই বালিকাকে। না তার বাল্যবিধবা সংস্কারাচ্ছন্য পিসি মোক্ষদা, না তার স্তিমিত “অনুসারী” স্বভাবের জননী ভুবনেশ্বরী, না পিত্রালয়ের অন্য কোন নারীর সঙ্গে। ভেতরে তার এক অদ্ভুত আগুন। সে আগুনের শিখাটি শুধু নিজের মাথাটি উঁচু করে বাঁচার ইচ্ছার মত স্বার্থান্ধতার আগুন না। চারপাশের সকল নারীর “মানুষের” মর্যাদা নিয়ে বাঁচার ইচ্ছের মত এক তেড়ে ফুঁড়ে ওঠা অগ্নিশিখা। সেই দুর্বিনীত আগুন সইবে কেন সেই কবেকার কোন পল্লী গ্রামের জীবন, সমাজ? সে রকম নারী তো তারা আগে কখনও দেখেনি! দেখেছে বাল্য বিধবার শুচিবায়ুতা, দেখেছে সংস্কারের মোড়কের আশ্রয়ে নারীর অহর্নিশি অবমাননা। আর দেখেছে, ক্ষমতার “আধার” পুরুষের পূজা করে করে সেই ক্ষমতার ভাগীদার হতে চাওয়া নারীকে। মিনমিন করে কথা বলা “অনুসারী” নারী কিংবা পুরুষকে তোষণের মোহন মায়ায় ভুলিয়ে নিজের স্বার্থ আদায় করা মেয়েদেরকে বোঝা যায়। কখনো কখনো করুণার মত করে প্রশ্রয়ও দেয়া যায়। কিন্তু সত্যবতী তো সেই ধারার মেয়েই নয়! সে চায় ন্যায্য অধিকার। তাও শুধু নিজের একার জন্য নয়, সকলের জন্য। এমনকি যে শাশুড়ি তাকে অহর্নিশি সংসারের যাঁতাকলে পিষছে, সেই শাশুড়ির জন্যও সে চায় সম্মান। যে দিন সে জানতে পারে, তার শ্বশুর রাত্রিবাস করে অন্য নারীর শয্যায়, সেদিন থেকে শ্বশুরকে প্রাত্যহিক ভোরের প্রণাম দিতে অস্বীকৃতি জানায় সে। সত্যবতীর এই চরম “দুঃসাহসে” সবচেয়ে বেশী আহত হয় তার শাশুড়ি। এমন তেড়ে ফুঁড়ে ওঠা সত্যবতীকে নিয়ে বিপদে পড়ে যায় সমাজ, সংসার।

তবে এক অর্থে সত্যবতী অনেক ভাগ্যবতী। পিত্রালয়ে সে পেয়েছে পিতার অবিমিশ্র স্নেহ ও প্রশ্রয়, বিবাহিত জীবনে সে পেয়েছে স্বামীর “ভয়মিশ্রিত” বিস্ময়। সত্যবতীর স্বামী তেমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন পুরুষ নয়। সত্যবতীকে বুঝতে যা প্রয়োজন, তা তার চরিত্রে ছিল না। সেও স্বার্থান্ধ মানুষ, তবে দুর্বিনীত নয়। সত্যবতীকে না বুঝেই এক ধরনের শ্রদ্ধা বোধ তার ছিল, যদিও কখনো কখনো তারও অক্ষম পৌরুষে আঘাত লাগে।

নিজে পড়াশোনার সুযোগ না পাওয়া সত্যবতী একমাত্র কন্যা সুবর্ণলতাকে কোলকাতার ইশকুলে ভর্তি করে। কিন্তু সংসারের নিয়মে শাশুড়ির মরণ কামড়ের কাছে হেরে যায় সত্যবতী। গ্রামের পাট চুকিয়ে কোলকাতায় সংসার পাতা সত্যবতী ছেলেদের বিয়ের আয়োজনের আগাম প্রস্তুতি নিতে স্বামী নবকুমারকে পাঠায় শ্বশুড়ালয়ে। সঙ্গে যায় সত্যবতীর আট বছরের কন্যা সুবর্ণলতা। সত্যবতীর অনুপস্থিতির সুযোগে সত্যবতীর শাশুড়ি এলোকেশী সত্যবতীর স্বপ্নটিকে সমূলে উৎপাটন করে। চিরকাল এক “উদ্ভট” স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করে করে নবকুমার জীবনে সেই প্রথম মায়ের প্ররোচনায় একটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। কিন্তু ফলাফল ভাল হয় না। কোলকাতা থেকে “কারুর অসুখ হয়েছে” সংবাদে রোদে তেতে পুড়ে গরুর গাড়িতে চড়ে সত্যবতী ছুটে আসে গ্রামের শ্বশুড়ালয়ে। প্রখর রৌদ্র যেমন ক্লান্ত অবসন্ন পথিককে মরীচিকার মত বিভ্রমে ফেলে দেয়, তেমন করেই সত্যবতীর জন্য অপেক্ষায় ছিল এক মহা বিভ্রম । মরীচিকার মতই মিলিয়ে যায় তার একমাত্র কন্যাটিকে শিক্ষিত করার স্বপ্নটি। বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসা উৎকণ্ঠিত সত্যবতীর সামনে প্রতিবেশীরা ঠেলে দেয় এ কাকে? এ যে লাল চেলী পরা বাসী বিয়ের কণে সুবর্ণলতা! বলির পাঠার মত কাঁপছে সে।

সেই মুহূর্তে সংসার ত্যাগ করে সত্যবতী। এত বড় প্রতারণার পরে টুটে যায় সংসারের সব বাঁধন। না কি দীর্ঘ দিনের “সংসার” নামের বিভ্রমটি? কে জানে! গরুর গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে তীর্থভূমি কাশীর উদ্দেশ্যে রওনা করে সত্যবতী। দূর্বলচিত্ত, অক্ষম স্বামীর আকুতি তাকে ফেরাতে পারে না। আকুতি এক সময়ে অভিশাপে পরিণত হয়। কিন্তু তাতেও কিছু হয় না। এইখানে হেরে যায় প্রথাগত “পৌরুষ”। যে সত্যবতীকে চিনতে পারেনি তার সময় ও সমাজ, সেই সত্যবতীর তখন কেটে গিয়েছে জীবনের মোহমায়া। তাকে আর সংস্কারের অভিশাপের ভয় দেখিয়ে কী হবে? শ্বশুর বাড়িতে দূর সম্পর্কের স্বামী পরিত্যক্তা ননদ সৌদামিনীই শুধু বুঝেছিল সত্যবতীকে। সেই সৌদামিনী যখন বলে, “এ তো মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা...কিন্তু সুবর্ণকে মানুষ করে তোলার যে বড্ড আশা ছিল তোমার!” তার জবাবে আকাশের বুকে “হারিয়ে যাওয়া” সুবর্ণর মুখের তালাশ করে সত্যবতী, “সুবর্ণ যদি মানুষ হবার মালমশলা নিয়ে জন্মে থাকে ঠাকুরঝি, হবে মানুষ ...নিজের জোরেই হবে। তার মাকে বুঝবে। ” কী যে এক হাহাকার মিশে থাকে সত্যবতীর কণ্ঠে! থাকে এক অদ্ভুত দৃঢ়তাও...সত্যিই যদি থাকে অন্তরের শক্তি, সেই শক্তি পথ খুঁজে পাবেই কোন না কোনভাবে...নারীর প্রথাসিদ্ধ মূর্তি ভাঙ্গার সেই প্রথম প্রতিশ্রুতি...

৪৭.

মায়ের কথা সত্যি করে দিয়ে সুবর্ণলতা পেয়ে যায় মানুষ হওয়ার মাল মশলা। কিন্তু মায়ের ভাগ্যের ছিটেফোঁটাও পায় না সে। তাই কোলকাতার এক গলির অন্তঃপুরে জীবনের পদে পদে শাশুড়ি, জা, ননদ, ভাসুর, দেবর, আত্মীয়-পরিজন সকলের কাছে নিগৃহীত হতে হয় তাকে। সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত হতে হয় স্বামী প্রবোধের কাছে। সুবর্ণলতার জানালা খুলে একটু মুক্ত আকাশ দেখার ইচ্ছেটাকে তার মনে হয় আদিখ্যেতা, পাশের বাড়ির বকুল ফুলের কাছ থেকে লুকিয়ে এনে বই পড়ার অভ্যাসটিকে মনে হয় অসভ্যতা। এই রকম হাজারো দোষের আকর সুবর্ণকে তাই প্রবোধ শুধু কথার আঘাতেই মারে না, পৌরুষের অধিকারে চুলের মুঠি ধরেও মারে। তারইবা দোষ কোথায়, পুরুষ মানুষ না সে? সুবর্ণ তার “অদ্ভুত” মায়ের “অদ্ভুত” মেয়ে। সে শাড়ী- গয়নার জন্য বায়নাক্কা করে না, নিজে যেচে ঘরকন্নার কাজের বেশীটাই করে, দেবর ভাসুরের ছেলে-মেয়েদেরকে নিজের ছেলে-মেয়েদের মতই স্নেহ করে। কিন্তু সুবর্ণর প্রাণ কেঁদে বেড়ায় একটু খোলা হাওয়ার জন্য। শাশুড়ি, ভাসুর, স্বামীর কাছে সুবর্ণ চায় ছাদের সিঁড়ি, একটু বারান্দা। স্বামী প্রবোধের কাছে এর একটাই অর্থ, প্রতিবেশী পুরুষদের আগ্রহী দৃষ্টির প্রতি সুবর্ণর আকর্ষণ।

এমনই জীবন সুবর্ণর। সেই বদ্ধ জীবনের মধ্যেও সুবর্ণ বারেবারে অতিক্রম করে যায় তার সময়কে, পরিপার্শ্বকে। এরই মধ্যে সুবর্ণর কাছে আসে স্বদেশী আন্দোলনের খবর। চার দেয়ালের মধ্যেও উদ্বেলিত হয়ে উঠে সুবর্ণ, যেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিয়ে আসবে এক নতুন ভোর। বদলে যাবে সুবর্ণদের জীবন। স্বাধীনতা বদলে দেবে সবকিছু, এমন কি প্রবোধকেও। সে আর অন্ধ পৌরুষের অহংকারে স্ত্রীকে আঘাত করবে না। কে জানে হয়তোবা শোবার ঘরের লাগোয়া একটা বারান্দা কিংবা ছাদে যাওয়ার একটা সিঁড়িই করে দেবে!

সিম্মি আর আমি পড়ছি আর অবাক বিস্ময়ে ভাবছি, সুবর্ণর জীবনটা এমন কেন? স্বামী প্রবোধের পক্ষেই বা এমন হওয়া কী করে সম্ভব? নতুন বাড়ি বানানোর পুরোটা সময় সে সুবর্ণকে একটা বারান্দার স্বপ্ন দেখায়। গৃহপ্রবেশের দিনে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজে সুবর্ণ...কী ভীষণ বেদনায় চুরমার হয়ে যায় সুবর্ণর মন...সারা বাড়ীর কোথাও নেই সেই স্বপ্নের বারান্দা!

রুদ্ধশ্বাসে পড়তে পড়তে সিম্মি আর আমি বেদনার্ত হয়েছিলাম...কী হ’ত একটা বারান্দা বানালে?...একটু মুক্ত বাতাসের ইচ্ছেকে কেন এমন করে হত্যা করা? স্বার্থপরের মত হাঁপ ছেড়েও বেঁচেছিলাম। এখন বদলে গিয়েছে সময়, বদলে গিয়েছে জীবন। সুবর্ণদের সাথে আর দেখা হবে না। হায় কী ভীষণ ভুল ভেবেছিলাম আমরা! জীবনের বাঁকে বাঁকে কত বার দেখা হয়ে গেল কত সুবর্ণলতার সাথে!

৪৮.

তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। রবীন্দ্রনাথের “স্ত্রীর পত্র” পড়া হয়ে গিয়েছে। তসলিমা নাসরীনের মেয়েবেলার কবিতাও কিছু পড়ে ফেলেছি। বিটিভির নাট্য ব্যক্তিত্ব সাঈদ আহমেদের কল্যাণে জানা হয়ে গিয়েছে ইবসেনের “ডল’স হাউজ”এর নোরাকেও। এই সময়ে যে দোতলা বাড়িটাতে থাকতাম, তার দেয়ালের ওপারেই ছিল একটা খালি জমি। সেখানে থাকতো রেহেনারা। রেহানার বাবা জমিটার কেয়ারটেকার। রেহেনারা তিন বোন- রেহেনা, সুহানা, আন্না (“আর না”র অপভ্রংশ)। তারপর এক ভাই- বাদশা। তিন মেয়ের পরে ছেলে হলে, তার নামতো বাদশাই হতে হয়। রেহেনার মা পাড়ার বাড়ী বাড়ী ঠিকা ঝিয়ের কাজ করে। রেহেনার বাবা ঠেলা গাড়ী চালায় আর সামনের খালি জমিটাতে লাউ, মুলা, বেগুনের আবাদ করে। শীতকাল এলেই জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যেত রেহেনার বাবা খুড়পি দিয়ে চারা গাছের মাটি নিড়িয়ে দিচ্ছে।

সেই রেহেনার বাবা একদিন হঠাৎ নিখোঁজ। পড়ে আছে তার ঠেলা গাড়ী, খুড়পি, সংসার। সংসারে তার তিন মেয়ে, এক ছেলে, স্ত্রী, বুড়ো মা। একদিন ক্লাস ফেরত আমি শুনতে পাই, রেহেনার মা ঘর মুছতে মুছতে আমার মাকে তার দুঃখের কথা বলছে, “খালাম্মা, কন্‌ তো আমি এখন কী করি? সংসারে এতগুলান মানুষ, আমি ক্যাম্‌নে চালাই?”

আমার মা জিজ্ঞেস করেন, “কী হইছিলো? তুমি কিছু বলছো?”

“বলার মধ্যে বলছি, কাম কাজ না করলে ক্যাম্‌নে চলবে? কামের কতায় খালি জ্বর আসে তাইনের। আমি একলা ক্যামনে চালাই, কন্‌? পাঁচ বাসার কাম করি। দুধের বাচ্চা কোলে নিয়াও কাম করি। তানি চান খালি আমি একলাই কাম করি। কন্‌ দেখি খালাম্মা। আমি খারাপ কি বলছি যে তানি কিছু না বইলা বাড়ি ছাইড়া চইলা গেলেন? ”

আমি মুখ ফসকে বলে উঠি, “যদি শুনেন উনি আরেকটা বিয়ে করেছেন, কী করবেন?”

তেড়েফুঁড়ে উঠেন রেহেনার মা, “জীবনেও আর তার মুখ দেখুম না।”

আমি আবার বলি, “রেহেনার দাদী কি বলে? তাকে এখন কে দেখবে?”

“আফায় যে কি কন্‌! আন্ধা বুড়িরে কই ফালামু? আমার পুলাপানরে তো দেইখা রাখে বুড়ি।”

কয়েক মাস গত হয়ে যায়। রেহেনার বাবার নতুন সংসারের খবর আসে। আবার একদিন দেখি রেহেনার মা আমার মাকে গেরস্থালীর কাজে সাহায্য করতে করতে চোখ মুছতে মুছতে বলে, “খালাম্মা, মাইয়া তিনডা আগে হইলো। পুলাডা অইলো শ্যাষে। পুলাডা আগে হইলে কি আর এমন করত? পুলার মায়াই আলাদা। আমারই পোড়া কপাল...”

নারীর সেই আদিম অপরাধ বোধ। মাতৃ জঠর থেকে সাথে নিয়ে আসা অপরাধ বোধ। নারী হয়ে জন্মানোর অপরাধ বোধ। সব কিছুতে নারী দেখে তারই অপরাধ।

আরও কয়েক মাস পরে হঠাৎ একদিন দেখি রেহেনার বাবা ফিরে এসেছে। খুড়পি দিয়ে নিড়ানি দিচ্ছে মুলা ক্ষেতে। হাতের মুঠোতে ভেঙ্গে গুড়ি গুড়ি হচ্ছে নরোম মাটির দলা। ন্যাংটো বাদশার পেটের ওপর কালো সুতোয় ঝুলছে তাবিজ। বাদশা বাবার পিঠের ওপর ঝুলে আছে। রেহেনা, সুহানা, আন্নারা বাবাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে ওদের কথা শোনা যায় না, কিন্তু ওদের মুখের খুশী দেখা যায়।

আমি অপেক্ষায় থাকি কখন রেহেনার মা কাজে আসবে। বেলা গড়িয়ে গেলে রেহেনার মা আসে। আমার মা রেহেনার মাকে সেদিনের কাজের কথা বলে বই হাতে তুলে নিয়েছেন। উত্তাপে টগবগ আমি তাঁতিয়ে উঠি, “রেহেনার বাবা ফিরে আসছে? আপনি তাকে ঘরে জায়গা দিলেন?”

রেহেনার মার পরনে কমলা রঙ্গের সুতির একটা নতুন শাড়ী। সে লজ্জিত মুখ করে জবাব দেয়, “আফায় যে কী কন্‌। স্বামী না? স্বামীর দোষ ধরতে আছে?”

আমার হতবাক চোখের সামনে দিয়ে রেহেনার মা চলে যায়। আমার মা বই থেকে মুখ তুলেন না। আমি আহত গলায় তাঁকে জিজ্ঞেস করি, “মা, তুমিও তো কিছু বললে না? এই লোকটা এত বড় একটা অন্যায় করলো!”

মা বই থেকে চোখ না তুলেই বলেন, “কী বলব? বললে কী হবে?”

আমি রেগে মেগে বলি, “রেহেনার মাইবা কেমন? কেন সে এত বড় অন্যায়ের পরেও...”

এইবারে আমার মা বই বন্ধ করে আমার দিকে তাকান, “রেহেনার মাকে বোঝার শক্তি তোর এখন হবে না। দু’পাতা বই পড়া বিদ্যে দিয়ে রেহেনার মাকে তুই বুঝবি না। তবে, মেয়ে হয়ে জন্মেছিস যখন, একদিন বুঝবি। ” বলেই আবার হাতে বই তুলে নেন।

আমি সেদিন জানতাম না, আমার মায়ের দিব্য দৃষ্টি ছিল।

৪৯.

হৈমন্তী। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প। কলেজে বাংলা সাহিত্যের পাঠ্য। হৈমন্তী আর আমার দু’জনেরই বয়স তখন সতের।

“আমি ছিলাম বর”, হৈমন্তীর বর প্রথম পুরুষে বলছে হৈমন্তীর গল্প। শৈশবে মাতৃহীন হৈমন্তী বেড়ে উঠেছে “অসংসারী” বাবার অকৃত্রিম স্নেহে। পিতা ও কন্যার মধ্যে এক নির্মল বন্ধুত্ব। বাবা তাকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, সত্য বলতে শিখিয়েছেন। কিন্তু হৈমন্তীর বাবা মেয়েকে সংসারের কঠিন অরণ্যের অন্ধকারের খবরটি দেননি। নিজেও হয়তো তিনি তা জানতেন না। পাহাড়ের গিরি শৈলী এক রাজ্যের বিদ্যানিকেতনের অধ্যাপনায় নিমগ্ন মানুষটি বেঁচে গিয়েছিলেন কোনভাবে। কিন্তু হৈমন্তীকে বাঁচাতে পারেননি।

উদাসীন বাবার চোখের সামনে মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায়। বাবা বুঝেন না। না কি হৈমন্তীর বাবা একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে নিঃসঙ্গ হয়ে যাবেন, এই ভয়ে ইচ্ছে করেই চোখ বুজে ছিলেন? কে জানে! তারপরেও এক সময় ঘটক লাগিয়ে হৈমন্তীর বিয়ে হয়। হৈমন্তীর শাশুড়ি উৎসুক নারী মহলে পুত্রবধূর বয়স কমিয়ে বলেন। কিন্তু সংসার সম্পর্কে নির্বোধ হৈমন্তী নিজেই তার বয়স বলে দেয় আর নাকাল হয় শাশুড়ির কাছে। এই রকম সংসারের নানান কঠিন নিয়মের প্রাচীরে হৈমন্তীর প্রাণ শুকিয়ে আসে। হৈমন্তী এক সময় মারা যায়। অভিমানী হৈমন্তীর চোখের নীরব বেদনার অশ্রু শীতের শিশিরের মত ঝরে পড়তে দেখেছে তার স্বামী, কিন্তু প্রথা ভাঙ্গার সাহস তার হয়নি।

রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী অন্তঃসলিলা এক গভীর বেদনাবোধের গল্প। এই গল্প পড়তে পড়তে বেদনার্ত হই। বিস্মিতও হই এক নতুন রবীন্দ্রনাথকে দেখে। কী অদ্ভুত মমতায় তুলে আনেন তিনি নারীর গভীর দুঃখবোধকে! দীর্ঘদিন বাবার দেখা না পাওয়া, শ্বশুড় বাড়িতে নিত্য নিগৃহীত হওয়া কোমল হৈমন্তীর বেদনাবোধ কেমন করে বুঝেছিলেন পুরুষ রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ? হৈমন্তীর স্বামীর জবানীতে রবীন্দ্রনাথ যখন বলে উঠেন,

আমাকে তো কিছুই ছাড়িতে হয় নাই। না আত্মীয়, না অভ্যাস, না কিছু। হৈম যে সমস্ত ফেলিয়া আমার কাছে আসিয়াছে। সেটা কতখানি তাহা আমি ভালো করিয়া ভাবি নাই। আমাদের সংসারে অপমানের কণ্টকশয়নে সে বসিয়া; সে শয়ন আমিও তাহার সঙ্গে ভাগ করিয়া লইয়াছি। সেই দুঃখে হৈমর সঙ্গে আমার যোগ ছিল, তাহাতে আমাদিগকে পৃথক করে নাই।

তখন বুঝে যাই, লেখক রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের মতই দেখেন অন্তঃপুরের আড়ালে পলে পলে দগ্ধে মরা হৈমন্তীদেরকে, ছুঁয়ে যান সেই বেদনার ক্ষত। এইখানেই লেখকরা অতিক্রম করে যান “দেখা না দেখার” সীমানাকে।

কোন একটি অদ্ভুত কারণে হৈমন্তীকে আমার খুব ঈর্ষাও হয়। এই গল্পে হৈমন্তীর স্বামী তার বিয়ের সময়কার অনুভূতির বর্ণনা দিচ্ছে এভাবে,

বিবাহসভায় চারি দিকে হট্টগোল ; তাহারই মাঝখানে কন্যার কোমল হাতখানি আমার হাতের উপর পড়িল। এমন আশ্চর্য আর কী আছে। আমার মন বারবার করিয়া বলিতে লাগিল, ‘ আমি পাইলাম , আমি ইহাকে পাইলাম। '

...

অধিকাংশ লোকে স্ত্রীকে বিবাহমাত্র করে , পায় না, এবং জানেও না যে পায় নাই; তাহাদের স্ত্রীর কাছেও আমৃত্যুকাল এ খবর ধরা পড়ে না। কিন্তু , সে যে আমার সাধনার ধন ছিল; সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ।”

জগত সংসারে কত লোকইতো বিবাহ করে, ক’জন এমন করে “পাইতে” চায়, কিংবা বিবাহ লব্ধ স্ত্রীকে “সম্পদ” মনে করে?

________

পাদটীকা: অনেক দিন পর আবার লিখতে ইচ্ছে হ’ল ভাঙ্গা ভাঙ্গির এই অর্থহীন স্মৃতির কথা। শীতের শুরুতে শুরু করেছিলাম। শীত পেরিয়ে শরতকাল, শরতকাল পেরিয়ে গ্রীষ্ম চলে এসেছে উত্তরের এই দেশে। ব্যাকইয়ার্ডের ঝাঁকড়া গাছটা নবজাতক সবুজ পাতায় পল্লবিত হয়ে উঠেছে...

দেখা যাক, কারুর পড়ার আগ্রহ অবশিষ্ট আছে কি না!


মন্তব্য

মেঘলা আকাশ  এর ছবি

আপা, এই কয়েকদিন আগে আবারও পড়লাম 'সুবর্ণলতা'। সেই কিশোরী বেলা থেকে এই মধ্য বয়সেও এ জাতীয় লেখা পড়লেই গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে থাকে। আমার মনে হয় এই উপমহাদেশের মেয়েরা এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজের ছায়া দেখতে পায়, ভাবে একি! লেখক তো দেখি আমার কথাও লিখেছে! আর রবীন্দ্রনাথ 'গল্পগুচ্ছ' রেখে গেছেন আমার মত কিছু অপদার্থের 'জীয়নকাঠি' হিসাবে।

সময় পেরিয়েছে শুধু, রেহানার মা-দের জীবন একি জায়গায় ঠায় দাড়িয়ে আছে।

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

সময় পেরিয়েছে শুধু, রেহানার মা-দের জীবন একি জায়গায় ঠায় দাড়িয়ে আছে।

ঠিক বলেছেন। রেহেনার মায়েদের জীবনকে বদলাতে হলে যে অনেক কিছুই বদলাতে হয়!

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

দারুণ পর্যালোচনা ও স্মৃতিচারণ ! চলুক

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

ধন্যবাদ প্রৌঢ় ভাবনা।

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

তিথীডোর এর ছবি

চলুক চলুক চলুক
ইয়ে, চমৎকার শব্দটা মন্তব্যে বারবার ব্যবহার করলে কি মডুদাদারা বকবে? হাসি

মেয়ে হয়ে জন্মানো একটা বাজে ব্যাপার!
নইলে সরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করেও ডাঃ শাহজাদী আপসাকে জামাই পদধারী একটা জানোয়ারের হাতে চোখনাক বুঁজে মার খেতে হয়...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

আরে তিথী বোনডি যে!

মেয়ে হয়ে জন্মানো একটা বাজে ব্যাপার!

কেনু কেনু কেনু...

তবে আশায় আছি, “এই দিন দিন না, আরো দিন আছে/ এই দিনেরে নিবো আমরা...

দেখছো না প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, স্পিকার, সব আমরা। তারপরেও শাহিনারা মরে যায়...

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

আশালতা এর ছবি

আশাপূর্ণার নারী চরিত্রগুলো আসলেই অনেক ভাবনার খোরাক দেয়। কিন্তু উনার লেখা পড়ে আমি কেন যেন কখনও মুগ্ধ হতে পারিনি। পাঠকের খামতি থাকতেই পারে। এখন আবার পড়ে দেখলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

আজকাল পাঠক এবং কমেন্টক হিসেবেও ফাঁকি দেয়া শুরু করলেও এই সিরিজটা চোখে পড়লে ঘুরে ফিরে পড়িই। তাতে আপনার লেখার একটা ব্যাপার চোখে পড়ে, সেটা হল লেখার মানের একরৈখিকতা। অন্যদের [নিজেরও বটে] লেখা যেমন মাঝে মধ্যে এক আধটু ঝুলে যায়, আপনার বেলায় সেটা নেই। এটা খুব চমৎকার একটা ব্যাপার। হাসি

----------------
স্বপ্ন হোক শক্তি

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

এহেম, প্রশংসা ও বিনয় দু’টোই একটু বেশী হয়ে গেল না লইজ্জা লাগে ? আপনার খোয়াবনামা’র মত লেখা কিন্তু আমার পড়া চোখ টিপি

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

আশালতা এর ছবি

নাহ্‌ কোনটাই বেশি হয়নি। বানিয়ে টানিয়ে যাহোক একটা তৈলাক্ত কথা বলা আমার ধাতে নেই। আমার যেমন যেমন মনে হয় তেমনটাই বলি। আপনার যতগুলো লেখা পড়েছি সবগুলোতেই এই ব্যাপারটা আসলেই চোখে পড়ার মত।

----------------
স্বপ্ন হোক শক্তি

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

ওক্কে আশালতা, আপনার প্রশংসা আমি মাথা পেতে নিলাম। ভালো থাকুন, বোন, ভালো থাকুন সব সময়।

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

সুমিমা ইয়াসমিন এর ছবি

লেখা চলুক

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

হিজিবিজবিজ এর ছবি

বাকরহিত

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

কেনু কেনু কেনু?

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

এক লহমা এর ছবি

আশাপূর্ণাদেবীর লেখার মতোই তোমার এইরকম লেখাগুলোর-ও আমি মুগ্ধ পাঠক। নানা পাকে জড়িয়ে পড়ে তোমা লেখাদের পড়া হয়নি বেশ কিছুকাল। আবার পড়তে শুরু করতে হবে।

তারিক এর ছবি

দয়াকরে চালি‌য়ে যান।

মর্ম এর ছবি

নানা লিংকঘাট ঘুরে এ ঘাটে আটকে গেলাম। মনে পড়ল- আশাপূর্ণা দেবীর এ অপূর্ব ট্রিলজি'র কথা জানা ছিল না আমার, এ লেখার প্রথম ক'লাইন পড়ে বইটা পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল, পাছে পড়ার আনন্দ মাঠে ঘতে ঘুরতে বেরোয়, এ লেখাটাই আর পড়িনি তখন।

ট্রিলজি পড়লাম খালার বাসায় হঠাৎ তিনটে বই-ই পেয়ে, টানা তিনদিনে শেষ হল, আমার শেষ হতে না হতেই বইয়ের হাতবদল হয়ে আম্মু, আব্বু, খালা, খালাতো বোন, ছোট ভাই এভাবে ঘুরতে থাকল! সে ট্রিলজি আবার উৎপত্তিস্থল খালামনি'র বুকশেলফে পৌঁছেছে, বেশ অনেকজনের কাছে নিজেকে পৌঁছে দিয়ে।

এ লেখাটা না পড়লে হয়ত তিনটে চমৎকার বই পড়ার ইচ্ছে তৈরি হত না- সে কথাটা জানাতে ইচ্ছা হল।

আপনই ভাল থাকুন, আর অনেকদিন পড়িনি- কাজেই নতুন লেখা দিন হাসি

~~~~~~~~~~~~~~~~
আমার লেখা কইবে কথা যখন আমি থাকবোনা...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।