গান নিয়ে কিছু কথা--

অনিকেত এর ছবি
লিখেছেন অনিকেত (তারিখ: মঙ্গল, ২৯/১১/২০১৬ - ১০:৩৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সব জিনিস সবার জন্য না।

একজন মানুষকে সব জিনিস বুঝতে হবে, উপভোগ করতে পারতে হবে--এমন মাথার দিব্যি কেউ কাউকে দেয়নি। কেউ কেউ জন্মসূত্রে কিছু পারঙ্গমতা নিয়ে আসে-- কিছু বিশেষ জিনিস ভাল করে বুঝতে পারার ক্ষমতা থাকে তাদের। এইজন্যে হয়ত কারো কাছে অংক বিভীষিকা হয়ে ধরা দেয়--কারো কাছে আবার এইটেই নেশার মতন। আমি নিজে অঙ্ক নিয়ে এক সময় আতঙ্কে ভুগতাম। এই শেষ বয়েসে এসে সেটা অনেকটুকু কাটিয়ে উঠেছি হয়ত। কিন্তু ছোটবেলায় আমার অনেক বন্ধুকেই দেখতাম অনেক জিনিস চটপট ধরে ফেলতে --যেটা আমার ধরতে সময় লাগত।

ঠিক তেমনি ব্যাপার হচ্ছে শিল্পকলা নিয়েও। কারো কারো ধমনীতে বইছে সঙ্গীতের সুরা---আর কেউ কেউ হয়ত আমার মত--সাধনা করে উপলব্ধিতে পৌঁছায়। আমার যেমন ক্লাসিকাল মিউজিক ( যেটা প্রাচ্য হোক বা পাশ্চাত্য হোক) খুব ভাল লাগে। সেটার জন্যে আমার কান ছোটবেলা তৈরী হয়ে গেছে। একটা ভাল লাগা, বুঁদ হয়ে থাকার ব্যাপার---আমাকে কষ্ট করে অর্জন করতে হয় নি। আমি স্বীকার করি--ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের মাঝেও যে চটকদার বিষয় আছে-- যেমন গানের মাঝের সাপাট তান, পঞ্জাবী ঘরানার ওস্তাদদের সরগমের কাজ (বিশেষ করে সালামাত ও নজাকত আলীর গান শুনলে বুঝতে পারবেন কী ভীষন সুর আর ছন্দের খেলা সেখানে---এক একেক্টা সরগম করছেন অবিশ্বাস্য দ্রুত লয়ে--শুনলে আপনার মনে হবে আসরে যেন অলৌকিক কোন বজ্রপাত হচ্ছে!!), লয়কারি ও মীড়ের কাজ আপনার কানকে প্রথমেই টানবে। কিছুদিন পরে যখন এসব একটু থিতিয়ে আসে --তখন মনের মাঝে আসল অনুভবের সুর্যোদয় হয়। তখন আমির খানের দীর্ঘ আলাপও আপনার কাছে । আপনি তখন শুধু বসে থাকবেন না কখন ওস্তাদজি আলাপ শেষ করে দ্রুত লয়ের অংশে আসবেন।

আমার ক্লাসিকাল গান ভালো লাগলেও আমি চিত্রকলার বোদ্ধা নই। আমি যেমন গান শুনলে বলে দিতে পারব কোনটা ভীমসেন যোশী আর কোনটা বাল মুরলি কৃষ্ণ। কিন্তু আমি ছবি দেখে বলতে পারব না (কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদে) কোনটা ক্লদ মনে আর কোনটা ভ্যান গগ, স্থাপত্য দেখে বলতে পারব না কোনটা ডোনাতেল্লো আর কোনটা রঁদ্যা।
বুঝতে পারিনা দেখে আমি কিন্তু এইটে বলতে যাই না --ও আল্লা, এ কী সব হাবিজাবি এঁকে রেখেছে? কিংবা যেকোন এবস্ট্রাক্ট আর্ট দেখেই বলে ফেলিনা সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে বলে আসা ক্লিশেক্লিন্ন জোক--তেলাপোকার হেটে যাওয়া থেকে তৈরী হয় এসব চিত্রকলা।

আমাদের দেশে যে গান গুলোকে কালোয়াতি গান বলে, বা শুদ্ধতর ভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বলে---সেটা সকল সময়েই উপেক্ষিত এবং বহুল ক্ষেত্রে উপহাসিত একটি ধারা। আমার সত্যি সত্যি মায়া হয় সেইসব লোকদের জন্য যারা আমাদের দেশে এই প্রায় ফসিলত্ব পেয়ে যাওয়া সঙ্গীতের ধারাটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মায়া হয় তাদের চেষ্টা দেখে, উৎসাহ দেখে। আমরা অত্যন্ত সুচারুরূপে এক বিশাল জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছি যাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে জ্ঞান শূন্যের কোঠায়! আমার নিজের জ্ঞান খুব অল্প--তাই এই নিয়ে বেশি বাগাড়ম্বর করা ঠিক হবে না। কিন্তু জ্ঞান কম হলেও আমার মনে এই ধারাটির জন্যে শ্রদ্ধার কোন কমতি নেই।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেসে থেকে পড়াশোনা করছি, তখন মাঝে মাঝে রাতে বিটিভির রাগ-রং অনুষ্ঠান দেখতে যেতাম। আমার মনে হয় সেই সময়ে সুইসাইডাল কোন টেন্ডেন্সি ছিল--নাহলে কেউ ছাত্রদের টিভি রুমে রাতের বেলা রাগ-রং দেখতে যাবার কথা না---একেবারে ঠান্ডা মাথায় আত্মহত্যা করার মত ঘটনা!
বলতেই হবে আমার সাহস ছিল ‘সেইরাম’। আমি রাগ-রং দেখতে যেতাম--আর আমাকে দেখতে যেত আরো অনেক ছাত্র! একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কী করে এইসব শুনে ---এইটা নিজ চক্ষে দেখতে পাবার সুযোগ কেউ মিস করতে চাইত না। আমি প্রথম ব্যাচের ছাত্র বিধায় সিনিয়র মোষ্ট। তাই জুনিয়র পোলাপান আড়ালে আবডালে হাসলেও সামনে কিছু বলত না। সে খামতি পুষিয়ে দিত আমার সমসাময়িক ইয়ারবক্সিরা। আমি কোনভাবেই বুঝতে পারতাম না যে --শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অপছন্দের হতে পারে--কিন্তু এইটা নিয়ে হাসাহাসি করার কী আছে?! ওরা যখন ফিডব্যাক, মাইলস, এলারবি ও অন্যান্য ব্যান্ডের বেসুরো গান, বিকৃত উচ্চারনে শুনে উন্মাতাল হয়--আমার তো হাসি পায় না! বরং কিছু কিছু জিনিস উপেক্ষা করতে পারলে তাদের গানের ভাবনা এবং আবেগটা প্রশংসনীয় মনে হয়েছে।

পরে বুঝতে পেরেছিলাম---মানুষ যখন এমন কোন জিনিসের মুখোমুখি হয় যা তাদের প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসে--মানুষ সেগুলোকে সহজ ভাবে নিতে পারে না। একটা জিনিস দুরূহ, সহজবোধ্য নয় এবং বুঝতে হলে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনার ব্যাপার আছে---এমন জিনিস দেখলেই মানুষ সাধারনত পিছু হটে---এবং যেহেতু তার এক ধরনের পরাজয় ঘটেছে (বুঝতে না পারা, আত্মস্থ করতে না পারা) তাই এই বিষয়গুলোকে সে ‘হাস্যকর’ ভাবে। ভাবে, হেসে তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিতে পারলেই বোধকরি তার পরাজয় ঢাকা পড়বে। এইজন্যে লোকজন বিমূর্ত চিত্রকলা দেখে তেলাপোকার কারিকুরি ভাবে, ক্লাসিকাল গান নিয়ে হাসাহাসি করে।

আমার এবং আমার বোনের গানের শিক্ষক পন্ডিত রামকানাই দাস একবার তার ছোটবেলার গল্প বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে তার সময়ে মাত্র গ্রামোফোন শহরের ধন্যাঢ্য পরিবারের পরিসরে আসতে শুরু করেছে। তখন লোকজন কলকাতা থেকে এক সাথে বেশ কিছু লং প্লে রেকর্ড নিয়ে আসত। তেমনি একটা রেকর্ডে চলে এল রাগ মিয়া কি টোড়ির পরিবেশনা---গেয়েছিলেন বিখ্যাত আফতাব-এ-মৌসিকি ফৈয়াজ খাঁ সাহেব। আমার ওস্তাদজি তখন ছোট মানুষ নিজে। এক বাড়িতে ঐ গান শুনে অভিভূত হয়ে গেলেন! বারবার শুনে গানটা গলায় তোলার চেষ্টা করলেন। সেই সময়ে বাড়ির লোকজন তাদের এই ক্ষুদ্র মানবকটির কর্মকান্ডে খুব আমোদিত---বাইরে থেকে কেউ বেড়াতে এলে তার ডাক পড়ত, ঐ রামকানাই, তোর ঐ ‘কমিক’ গান খানা শুনিয়ে দিয়ে যা তো---ঐ যে ‘আল্লা জানে মওলা জানে--’

আমরা এর পর বহু বছর পাড়ি দিয়েছি---সিলেটের তথা সারা বাংলার সকল নদী দিয়ে কোটি কোটি গ্যালন পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে--কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে মানুষের ধারণা এখনো আগের জায়গাতেই রয়ে গেল---’কমিক’ গান!

ইদানিং শুনি বেঙ্গলের এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বার্ষিক সম্মিলনের কথা। শুনি আর মনে এক ধরনের পুলক অনুভব করি---যাক শেষ পর্যন্ত বোধহয় আমরা একটু হলেও এই বিরলপ্রজ সঙ্গীতের ধারাটির জন্য বোদ্ধা জনগন তৈরী করতে পারছি!!

হাহ্‌, কিসের কি!

শুনতে পেলাম, এই সম্মিলন হয়ে দাঁড়িয়েছে সদ্য কাঁচা পয়সা হাতে আসা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড় বড় এক্সিকিউটিভদের বিশ্রম্ভালাপের জায়গা। মুর্গির ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে, পাশে বসে থাকা প্রেমিকার গা থেকে ভেসে আসা দামী সুগন্ধীর সুবাস নিতে নিতে মাতোয়ারা হওয়া---আর চাই কী?! ট্যাকে অনেক টাকা---কিন্তু তাতে করে জাতে ওঠা যাচ্ছে না। যাই, একটু রাতের বেলা দামী চাদরে গা ঢেকে বেশ একটু বোদ্ধা বোদ্ধা ভাব নিয়ে ঘুরে আসি। সেতার শুনে বলি, বাহ সরোদটা কী বাজালো দেখলি? হাত দেখাই যাচ্ছিল না --এমন স্পীড লোকটার! কী বললি ঐটা সেতার--ধুর! তুই শিওর?! আর দোতারার মত জিনিসটা? ঘ্যাং ঘ্যাং করে আওয়াজ হয় যে--ঐটা সরোদ?! কে বলেছে তোকে। ভাল কথা ‘ডিলটা’ কালকেই ফাইন্যাল করে ফেলিস কিন্তু!

নাহ্‌, আমাদের কোন উন্নতি হয় নি। কিছু লোক জাতে ওঠার জন্যে, কিছু লোক গভীর রাতে প্রেমিকার বাহুলগ্ন হবার জন্যে, কারো কারো গাঁজার কল্কিতে টান দেবার জন্যে, কারো কারো হয়ত আরো অন্য কোন সাধ মেটানোর সুযোগ করে দেবার জন্যে অনেক রাতে চৌরাশিয়া বাঁশীতে সুর তোলেন। চারপাশের বাতাস, আকাশের চাঁদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায় ষড়জে সুর লাগানো শুনে--রাস্তায় ফুটপাতের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়ায় এক লোক বুকে বানভাসী আনন্দ নিয়ে যখন দরবারী কানাড়ার সুরে বিশুদ্ধ বিষাদ প্রপাত হয় আমাদের এই জনারন্যে ----

চারপাশের সহজে চেনা জায়গাটা হঠাৎ করেই অচেনা অপার্থিব মনে হয়!
সকল কিছু তুচ্ছ, তুচ্ছ মনে হয়---


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

হালকা চালে বলা সিরিয়াস কথা। কিছকিছু উপলব্ধির সাথে আমি একমত নই তবে লেখাটি যে সুপাঠ্য সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। একটা জায়গায় যেমন লিখেছেন, "আমি রাগ-রং দেখতে যেতাম--আর আমাকে দেখতে যেত আরো অনেক ছাত্র", আহাহা।

--মোখলেস হোসেন

অনিকেত এর ছবি

ধন্যবাদ জনাব মোখলেস হোসেন!
শুভেচ্ছা জানবেন

অতিথি লেখক এর ছবি

বেঙ্গল ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যালের পাঁচটা আসরেই যাবার সুযোগ হয়েছে। এর বাইরে ঢাকার এখানে সেখানে কালেভদ্রে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যেসব অনুষ্ঠান হয় তার খোঁজ এবং অ্যাক্সেস পেলে যাবার চেষ্টা করি। সেসব অনুষ্ঠানে চেক-ইনসর্বস্ব, সেলফিসর্বস্ব, ফোনালাপসর্বস্ব,চ্যাটসর্বস্ব, আড্ডা/গল্পসর্বস্ব, খাদ্যসর্বস্ব লোকজন যা কিছু করে সেগুলো লিখলে আঠারোকাণ্ড মহাভারত হয়ে যাবে। এর বাইরে মোবাইল/ক্যামেরা দিয়ে রেকর্ড করা, সাংবাদিক পরিচয় দেয়া কিছু অশিক্ষিত লোকের নানা প্রকার বাইট নেবার চেষ্টা, ক্ষমতাবান মানুষদের ক্ষমতা দেখানোর প্রতিযোগিতা, অতিজ্ঞানীদের লেকচার এগুলোও আছে। এসব অনুষ্ঠানে যাওয়াটা কিছু মানুষের কাছে প্রেস্টিজ ইস্যু, নিজেকে জাহির করার বিষয়। এসব দেখলে দেশে ৬৩% শিক্ষিত মানুষ থাকার তথ্যটাকে ১০ দিয়ে গুণ করা বলে মনে হয়।

আমি এসব দেখে দেখে, সয়ে সয়ে এখন পাথর হয়ে যাবার চেষ্টা করি। চারপাশের সব কিছুকে উপেক্ষা করে যতদূর সম্ভব সঙ্গীতটা শোনার চেষ্টা করি। এরজন্য কখনো কখনো চোখ বন্ধ করে শুনি। সব সময় যে সফল হই তা নয়। তবে যেটুকু পারি তাতে যা লাভ করি সেটা অমূল্য।

শিল্পের সঠিক রস আস্বাদন করার জন্য শিল্পজ্ঞান থাকতে হয়। তবে শিল্পজ্ঞান না থাকলেও কেউ শিল্পকর্মে মনোযোগ দিলে তার কিছুটা হলেও রস আস্বাদন করতে পারে। যার সেই জ্ঞান অর্জন করার ধৈর্য অথবা মনোযোগ দেবার মানসিকতা নেই তার উচিত শিল্পকর্ম থেকে শত হাত দূরে থাকা। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এখনও এমন সংবেদনশীলতা অর্জন করতে পারেনি। সম্ভবত এটাই স্বাভাবিক।

এতো কিছুর পরেও আমি মনে করি এই ব্যাপারগুলো হোক। গান হোক, অন্য সব সাংস্কৃতিক কর্ম হোক। সেখানে সঙ্গীত-অজ্ঞ লোকেরাও যাক, নিজেকে জাহিরকরা লোকেরাও যাক। এগুলো আর যা কিছু হোক মানুষকে ঘৃণা করা শেখানোর সংস্কৃতি না। এগুলো নিজেকে সবার চেয়ে সেরা আর অন্যেরা অভিশপ্ত এমন ভাবানোর সংস্কৃতি না। এগুলো নিজের মতের বাইরে কেউ গেলে তাকে কুপিয়ে হত্যা করার সংস্কৃতি না।

অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে
জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ

অনিকেত এর ছবি

এতো কিছুর পরেও আমি মনে করি এই ব্যাপারগুলো হোক। গান হোক, অন্য সব সাংস্কৃতিক কর্ম হোক। সেখানে সঙ্গীত-অজ্ঞ লোকেরাও যাক, নিজেকে জাহিরকরা লোকেরাও যাক। এগুলো আর যা কিছু হোক মানুষকে ঘৃণা করা শেখানোর সংস্কৃতি না। এগুলো নিজেকে সবার চেয়ে সেরা আর অন্যেরা অভিশপ্ত এমন ভাবানোর সংস্কৃতি না। এগুলো নিজের মতের বাইরে কেউ গেলে তাকে কুপিয়ে হত্যা করার সংস্কৃতি না।

লাখ কথার এক কথা!
শুভেচ্ছা নিরন্তর!!

অতিথি লেখক এর ছবি

ফ্রি সার্ভিসের বাসে করে যে মানুষটা শেষ বিকেলে গান শুনতে আসেন, সারা রাত গান শুনে আবার ঐ বাসে করেই ভোরে ফেরেন
যে মানুষটা মোবাইল চাওয়ালার কাছ থেকে দুটো মোয়া, এক গ্লাস পানি আর এক কাপ চা খেয়ে সারা রাত গান শোনেন
হিমপড়া রাতে যে মানুষটা মাথায় গামছা পেঁচিয়ে গ্যালারিতে বসে চুপচাপ গান শুনে যান
ঐ মানুষগুলোর একজনকে দেখলেও আমার মনে হয় এই আয়োজনগুলো সার্থক
নামী নামী শিল্পীদের পরিবেশনাগুলোও এইখানে যথার্থতা পেয়ে যায়

অনিকেত এর ছবি

সহমত!!

নীড় সন্ধানী এর ছবি

প্রতিবছর বেঙ্গলের এই অনুষ্ঠানে যাবার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ঢাকার বাইরে থাকার কারনে যাওয়া হয়নি একবারও। মঞ্চে যারা বাজিয়েছেন মুখোমুখি তাঁদের গান কিংবা বাজনা শোনার সৌভাগ্য না হলেও, তাঁদের আমি যুগ যুগ ধরে জানি, তাঁদের সৃষ্টিকে উপভোগ করে আসছি নিজস্ব সময়ে। যদিও ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত জাতীয় বিষয়গুলো আমি চোখ বন্ধ করে নিরিবিলি পরিবেশে উপভোগ করি, তবু সুযোগ পেলে প্রিয় শিল্পীর বাজনা সামনাসামনি শুনতে কে না চায়। তাই যারা যাবার সুযোগ পেয়েছেন তাদের ঈর্ষা করেছি। ঈর্ষা করেও ওই অনুষ্ঠানের দর্শকদের যে অংশটা কেবল জাতে উঠার জন্য হাজিরা দিয়েছে, তাদের জন্য করুণা রাখতে হয়েছে। উপভোগ করি না,এমন কিছুতে নিজেকে জোর করে প্রতিস্থাপন করতে চেষ্টা করা অপ্রতিভের লক্ষণ।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

অনিকেত এর ছবি

যারা যাবার সুযোগ পেয়েছেন তাদের ঈর্ষা করেছি। ঈর্ষা করেও ওই অনুষ্ঠানের দর্শকদের যে অংশটা কেবল জাতে উঠার জন্য হাজিরা দিয়েছে, তাদের জন্য করুণা রাখতে হয়েছে। উপভোগ করি না,এমন কিছুতে নিজেকে জোর করে প্রতিস্থাপন করতে চেষ্টা করা অপ্রতিভের লক্ষণ।

একেবারেই হক কথা নীড়'দা। অসংখ্য ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্যে।

এক লহমা এর ছবি

"চারপাশের সহজে চেনা জায়গাটা হঠাৎ করেই অচেনা অপার্থিব মনে হয়!
সকল কিছু তুচ্ছ, তুচ্ছ মনে হয়---"

সে-ই-ই চলুক

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অনিকেত এর ছবি

শুভেচ্ছা জানবেন দাদা--

সোহেল ইমাম এর ছবি

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বকলম। তবে অবজ্ঞা করবার কথা কখনও মাথাতেই আসেনি। ভেবেছি আমার দুর্ভাগ্য এই রসটা অনুভবে পেলামনা। আপনার লেখার মধ্যে সেই বর্ণময় জগৎটা আরো একবার মন খারাপ করে দিল। এ জীবনে হলোনা, কত নদীতেইনা ডুবতে চেয়েছি কিন্তু হলো কই। দূর থেকে নদী দেখেই হয়তো চলে যেতে হবে। যতক্ষণ লেখাটা পড়ছিলাম ততক্ষণ মনে হচ্ছিল একটা মনিমানিক্য, হীরে জহরৎ ভরা ঘরের বর্ণনা শুনছি। কৃতজ্ঞতা এই সুন্দর লেখাটার জন্য।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অনিকেত এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ সোহেল ইমাম!
নদীস্নানের জন্যে কোন দেরী হয় না ---আপনি নদীটা দেখেছেন, এখন শুধু অবগাহনের অপেক্ষা!
আপনার জীবনটা সঙ্গীতময় হোক---এই কামনা রেখে গেলাম।

শুভেচ্ছা নিরন্তর!

মেঘলা মানুষ এর ছবি

ফেসবুকে চেকইন, সেলফি, স্ট্যাটাস দেবার ব্যবস্থা না থাকলে হয়ত এ অনুষ্ঠানে অর্ধেক দর্শকই যেতেন না (ব্যক্তিগত মত)।

কোন কিছু না বুঝলে সেটা নিয়ে হাসাহাসি করাটা খুব একটা ভালো কাজ না। আমেরিকান ফুটবল (নারকেলের মত বল হাতে নিয়ে দৌড়ানো) বুঝতাম না, ভাবতাম ওটা একরকম মারামারি আর কুস্তি। পরে একজন যখন বুঝিয়ে দিল, তখন বুঝলাম আামর ঐ জানাটাই ভুল ছিল। শারীরিক শক্তির সমান পরিমাণ বুদ্ধি না কাজে লাগালে ঐ ফুটবলে ভালো করা যাবে না।

ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখেছিলাম, যেখানে একজন চারুকলার শিক্ষক বলছিলেন যে, বিমূর্ত ছবি দেখে অনেকেই বলে, "আরেহ এটা তো আমি এমনিই আঁকতে পারি।" তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, "But you didn't. If you can, do it."

শুভেচ্ছা হাসি

অনিকেত এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ চমৎকার মন্তব্যের জন্যে মেঘলা মানুষ।
শুভেচ্ছা নিরন্তর--

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

তখন রেডিওর যুগ, কিশোর বয়সে তথাকথিত আধুনিক গানগুলো হৃদয়ের তন্ত্রীতে ঝংকার তুলে তুলে একেবারে গান পাগল করে তুলছে প্রায়। সেই সময় একদিন শুনলাম ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান নামে অতি গুণী এক শিল্পীর প্রয়ান উপলক্ষে রাত এগারটায় তাঁর বাজানো রেকর্ডকৃত সরোদ পরিবেশন করা হবে। আলাউদ্দিন খানের নাম সেই প্রথম শুনলাম, আর সরোদের আওয়াজ কেমন সে সম্পর্কে কোনই ধারনা নাই। এর আগে সরোদ সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তা শুধুমাত্র শিশুতোষ রহস্য উপন্যাস কুয়াশা সিরিজের বইগুলোতে- সেখানে কুয়াশা স্বয়ং অসাধারণ সরোদ বাদক, তার অপার্থিব সুরের মাদকতায় চারপাশ বিমোহিত হয়ে যায়। বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে রাত এগারটা পর্যন্ত জেগে রইলাম, তারপর কান এবং মনের উপর যে ভয়াবহ উৎপীড়ন চলল তা আর বলার নয়। সঙ্গীত যে এত নীরস হতে পারে সে সম্পর্কে আগে ধারনা ছিল না, অত্যন্ত হতাশ হয়ে রেডিও বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

তারপর এই সুদীর্ঘ সময়ে আমার সঙ্গীত বোধের সামান্য উন্নতি হয়েছে, এখন আর রাগ সঙ্গীত নীরস মনে হয় না। রাগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা নেই, তবুও সময় পেলে নিবিষ্ট হয়ে শুনতে বেশ লাগে। আমার "সঙ্গীত বন্ধু ভাগ্য" ভাল নয়। অনেককেই পেয়েছি, যাদের কথা বার্তা শুনে ধারনা হয় যে সঙ্গীত জ্ঞানে তাঁরা পণ্ডিত শ্রেনীর মানুষ, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কিঞ্চিৎ জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করতেই গোমর ফাঁস হয়ে যায়। যাই হোক, বেঙ্গল ফেস্টিভ্যাল শুরু হওয়ার পর এই ক বছরে অনেক আমন্ত্রণ ও অনুরোধ পেয়েছি, কিন্তু যাবার সাহস করে উঠতে পারি নাই। বোদ্ধা বোদ্ধা ভাব ধরে বসে থাকতে খুব সংকোচ অনুভব করি। আমার পরিচিত পণ্ডিত শ্রেনীর অনেকেই সেখানে রাত্রিযাপন করে এসে তার নানা রকম চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিচ্ছেন। সেসব শুনে প্রথমে ভীষণ রাগ হত, পরে ভেবে দেখেছি যাক না। যেতে যেতেই এক সময় সত্যিকারের একটা বোদ্ধা গোষ্ঠী তৈরি হয়ে যাবে।

অনিকেত এর ছবি

যেতে যেতেই এক সময় সত্যিকারের একটা বোদ্ধা গোষ্ঠী তৈরি হয়ে যাবে।

আশা করছি তেমনই যেন হয়। ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্যে।

শুভেচ্ছা নিরন্তর--

debajyotikajald এর ছবি

ভাল লিখেছ

অনিকেত এর ছবি

ধন্যবাদ

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA