মনসবদার জায়গিরদার

সত্যপীর এর ছবি
লিখেছেন সত্যপীর (তারিখ: রবি, ০৬/০৮/২০১৭ - ১:০৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মনে করেন মোগল আমল। ঝিরিঝিরি বাতাস। বড় চাচা দূর কাবুল থেকে সফর শেষ করে এসে মাথায় হাত বুলায় কইলেন এই নাও বাছা মিষ্টি খাও। আখরোট খাও। কতদিন পরে দেখা। পড়াশোনা কেমন চলছে? বড় হয়ে কি হবে ঠিক কি করেছ?

আপনি কি বলবেন... ডাক্তার হতে চাই? আশিব্বাদ করেন চাচাজান যেন সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে পারি? ধুর না। আপনি কইবেন বড় মানুষ হইতে চাই। নামজাদা ব্যক্তি। চার মহলা দালান। শুক্রবারে খাসির বিরিয়ানি। পায়ের উপর পা তুলে সুখে বসবাস। অতএব আপনি বলবেন মনসবদার হতে চাই। জায়গিরদার হতে চাই চাচা দোয়া রাইখেন।

চলেন পাঠক আজ তাহলে মনসবদারি জায়গিরদারি ফানাফানা করে দেখি। তারা কি সত্যই চার মহলা দালানে থাকত এবং শুক্রবারে খাসির বিরিয়ানি খেত? তাদের জমা-হাসিল গরমিল কি কারণে? জাট এবং সওয়ার কি বস্তু? মাশরুত খায় না মাথায় দেয়? চৌধুরী আর কানুনগো কে?

মাথায় কত প্রশ্ন আসে দিচ্ছে না কেউ জবাব তার। বিষম চিন্তা।

মনসবদারি নিয়ে লেখাপড়া করতে গেলে সর্বপ্রথমে যে কথাটা আসে তা হল “মহামতি আকবর, মোগল দুনিয়ার ভালবাসার ধন, মনসবদারির প্রচলন করেন।” কথাটা পুরো সত্য নয়, আকবর হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দাঁত খিলাল করতে করতে মনসবদারি প্রচলন করেননি। মনসবদারি একটি ধীরে ধীরে প্রচলিত পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। আকবর এর প্রচুর সংস্কার করেছিলেন সময়ের প্রয়োজনে। পরবর্তী মোগল শাসকেরা তার কিছু রেখেছে আর কিছু পরিবর্তন করেছে। আওরঙ্গজেবের জমানার শেষদিকে এবং তার মৃত্যুর পরের মোগল শাসকদের আমলে মনসবদারি মোটামুটি লাটে উঠেছে।

কিন্তু সেসব তত্ত্বকথার কচকচি। বাদ দেন। যথাসময়ে আসবে। মূল কথায় আসেন। আপনি বাদশা, নিজের মত করে দেশ চালাবেন। মনসবদার দিয়ে আপনার কি প্রয়োজন?

প্রয়োজন অতি গভীর। আপনি মোগল বাদশা হন আর রাশান জার হন আর হ্যাবসবার্গের রাজা হন যেই হন, আপনার চারটা সমস্যা। টাকা, জমি, সিপাই এবং নারী। আপনি দুষ্ট লোক তাই নারী কেন সমস্যা সেই খোলাসায় উপস্থিত গেলাম না। সে আপনি আমি দুজনেই বুঝি। অন্য তিনটায় মন দেই। টাকা, জমি এবং সিপাই। জমি দরকার টাকার জন্য। টাকা দরকার সিপাই ভাড়া করার উদ্দেশ্যে যারা আরও জমি দখলে সাহায্য করবে। আরও জমি আরও টাকা আরও সিপাই আরও জমি আরও টাকা…

আচ্ছা। মোগল আমলের আগে দিল্লিতে সুলতানের রাজত্ব। মনে করেন আপনি দিল্লির সুলতান বয়তল খাঁ। কাল যদি যুদ্ধ লাগে, তবে যুদ্ধ করবে কে? আপনার নিয়মিত বাহিনী আছে, যুদ্ধ লাগুক আর নাই লাগুক তাদের বসন্ত। তারা নিয়মিত বেতন পায়। আর যদি আরও বড় বাহিনী দরকার হয় তবে নগদ পয়সার বিনিময়ে আপনাকে ভাড়াখাটা সিপাই ও তাদের নেতাকে যোগাড় করতে হবে। ভাড়াখাটা দলটি তাদের সামর্থ্য অনুসারে নগদ পয়সা চাইবে কিংবা লুটপাটের অংশ চাইবে।

নিয়মিত বাহিনীর দিকে ফিরুন, যারা সারাবছর আপনার বেতন পাচ্ছে। নিয়মিত বাহিনীর “বেতন” নগদ দেয়া হতনা সাধারণতঃ (এই অ-নগদ ব্যবস্থা কড়া নজরে রাখেন পাঠক। মহামতি আকবর ও তার ছানাপোনার মনসবদারের বেতনও নগদ ছিলনা। মনসবদার ব্যবস্থার বিবর্তন খেয়াল রাখেন)। বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা পেত “ইক্তা”। তাদের ডাকা হত ইক্তাদার।

ইক্তাদার মনসবদারের দূর সম্পর্কের ফুপা। মনসবদারের কথায় একটু পরে আসছি। ইক্তাদার খোলাসা করি। আপনি যদি ইক্তাদার হন, আপনাকে ধানি জমি দেওয়া হবে। সেই জমির পয়সায় আপনি দালান তুলবেন, সিপাইদের বেতন দিবেন (যদি তাদের নিজস্ব জায়গির না থাকে), ঘোড়া পালবেন ইত্যাদি। আপনি সেই জমির সারাজীবনের মালিক, বুইড়া কদু হয়ে গেলেও সুলতানের দেওয়া জমি আপনার ভোগে আসবে যদিও আপনি সুলতানের যুদ্ধে কোন কাজেই আর আসবেন না। আর আপনি সহি সালামতে পটল তুললে আপনার ছেলে ইক্তাদার হবেঃ তা সে যুদ্ধে পটু হোক আর না হোক। তবে সুলতান চাইলে অবশ্য যেকোন সময় আপনার ইক্তা নিয়ে যেতে পারেন। নয়া সুলতান আসলে আপনি যদি তার সৎ নজরে না থাকেন তবে ইক্তাকে বলুন খোদা হাফেয ইক্তা নাইস টু মিট ইউ।

তবে ইক্তা জায়গির ইত্যাদি পেতে হলে সুলতানের সাথে যুদ্ধে যেতেই হবে তার কোন কড়াকড়ি বিধান নাই। সুলতানের দরবারে সভাকোবি হিসাবে কায়কাউসের ছেলে শীর্ষক কোবিতা লিখে নজর কাড়লেও তিনি আপনাকে জায়গির মনসব দিয়ে দিতে পারেন। তখন আপনি বসে বসে আরও কোবিতা গান লিখবেন আর জায়গিরের আয় উপভোগ করবেন, যুদ্ধমুদ্ধের গিয়াঞ্জাম নাই।

মোগল সাম্রাজ্যের ফাউণ্ডার প্রেসিডেন্ট বাবুর ছিলেন মধ্য এশিয়ার লোক। ভারতে যে কয়বছর তিনি ছড়ি ঘুরিয়েছেন সেই সময় তার রাজধানী ছিল কাবুল। বাবুরের বাহিনীর অধিকাংশই মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন গোত্রের যোদ্ধা, ভারতীয় যোদ্ধার সেখানে তেমন বেইল নাই। বাবুর নিজেও ভারত ও ভারতীয় দের বেশি উঁচু নজরে দেখতেন না। বাবুর পুত্র হুমায়ূন জীবনের অর্ধেক কাটিয়েছেন ধাওয়া খেয়ে আর বাকি সময় আকাশের তারা দেখে আর আফিং টেনে। তারও ভিত্তি মোটামুটি ছিল আফগানিস্তান, যদিও পিতার কাবুল তাকে দখল নিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কাবুল তখন হুমায়ূনের ভাই কামরানের দখলে। কামরান তার ভাইকে দেখতেই পারত না। হুমায়ূন শের শাহ সুরির সাথে মারপিট করছে শুনে কামরান নিতান্তই অনিচ্ছা সহকারে তিন হাজার ঘোড়সওয়ার পাঠায় ভাইয়ের সাহায্যে (তার মোট ঘোড়া ছিল কুড়ি হাজার)। হুমায়ূনের ইয়ারদোস্তেরা তার কানভারি করেছিল কামরানের সানডে মানডে ক্লোজ করে দেবার জন্য। কিন্তু পিতা বাবুর মারা যাবার পূর্বে বড় ছেলে হুমায়ুনকে বলে গিয়েছিলেন হে হুমায়ূন। ভাইদের সহিত গিয়াঞ্জাম করিও না। পিতাভক্ত হুমায়ূনের তাই কামরানকে খুন করা হয়নি।

সে যাক। তিন নম্বর বাদশা আকবর আসতে আসতে আমু দরিয়া দিয়ে প্রচুর কুলুকুলু পানি বয়ে গেছে। পিতা ও পিতামহের মত কাবুল তার রাজধানী ছিলনা, আকবর গেঁড়ে বসেছিলেন উত্তর ভারতে। চাইলেই বিবিধ মধ্য এশিয়া বা মঙ্গোল গোত্রের যোদ্ধা তিনি পেতেননা বাবুর হুমায়ূনের মত। তাকে ভারতে মনোনিবেশ করতে হল সিপাই জড়ো করার উদ্দেশ্যে। এইবার তিনি মনসবদারি ঘষেমেজে জামা থেকে বের করে ধরলেন।

ধরেন আপনি এক রাজপুত নেতা। আকবর আপনাকে চিঠি পাঠালেন হে রাজপুত নেতা গরম সিং। শুন। চিতোরগড় দখলে যাচ্ছি। তোমার বাড়ি হইতে সওয়া দেড় সপ্তার পথ। আমার সাথে আইস নেতা গরম সিং। যুদ্ধের পৌনে দুই শতাংশ লুটের ভাগ তোমার। এছাড়া মনসবদারি দিব। ১২০০ জাট ও ৯০০ সওয়ার। আইস।

১২০০ জাট আর ৯০০ সওয়ার মানে কি?

গুড কোশ্চেন। জাট ও সওয়ার হল দ্বৈতপদমর্যাদা। ডুয়াল র‍্যাঙ্ক। একে একে ভাঙি। প্রথমে জাট। জাট হল দরবারে আপনার অবস্থাসূচক। মনে করেন নওরোজ। আকবর বাদশা আপনাকে আগ্রাতে দাওয়াত দিয়েছেন বিরিয়ানি খাওয়ার। দরবারে দেখা হল আপনার সাথে আরেক রাজপুত নেতা চরম সিং রান্ধাওয়ার। আপনি বললেন, হে চরম, তোমার জাট কত। চরম বলল, গরম, আমার জাট ৬০০।

অর্থাৎ আপনার জাট তার চেয়ে বেশি। দ্বিগুণ সত্যি কথা বলতে। আপনার ১২০০ তার ৬০০। সুতরাং দরবারে আপনি চরম সিং এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আপনি সারিতে সামনে থাকবেন, বাদশার দেওয়া খিলাত (সম্মানসূচক জামা) আপনাকে আগে পরানো হবে, বাদশার জুতায় আপনি পয়লা চুমা খাবেন ইত্যাদি। জাট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এইবার বেতন। আগেই বলেছি মনসবদারেরা নগদ বেতন পেতনা, তাদের দেওয়া হত জমি। জায়গির। মনসবদারেরা জায়গির পেত। জায়গিরের বিতং এ একটু পর আসছি, তবে সংজ্ঞা দেওয়াটা জরুরী। ১২০০ জাটের নজরানা হিসাবে আপনি মনে করেন পেলেন উত্তর বুন্দেলাখণ্ডে জায়গির। তার মানে এই নয় যে জমিটা আপনার। জায়গিরের জমি থেকে যে আয় সেই আয় আপনার। জমি সরকারের।

এখন চরম সিং রান্ধাওয়া, যে কিনা ৬০০ জাট, তারও জায়গির আছে। এখন আপনার প্রশ্ন, যেহেতু সে ৬০০ আর আমি ১২০০ জাট, আমার বেতন নিচ্চয় চরম সিং এর দ্বিগুণ? কারণ ছয় দুগুণে বারো। আমি পাবো আরও!

না, পাবেন না। আরও পাবেন, তবে দ্বিগুণ পাবেন না। জাটের ওঠানামা আর বেতনের ওঠানামা সমানুপাতিক নয়। আপনি চরম সিং এর চেয়ে কত বেশি পাবেন সেইটা বাদশার ফরমান অনুযায়ী ঠিক হবে। তারা কেউই সমানুপাতিক নয়। এমনকি এমনও হতে পারে যে আপনার থেকে কম জাট (ধরেন ১১০০ জাট) আপনার চেয়ে বেশি তনখা টানছে। খেয়াল রাখা চাই বেতন নগদ আসছে না খাজাঞ্চিখানা থেকে, বেতন আসছে বরাদ্দকৃত জায়গির থেকে। জায়গিরের হাসিল কত তার উপরে নির্ভর করবে আপনার আয়। জমা-হাসিলের বিশদে আসছি একটু পর। তার আগে সওয়ার নিয়ে বলি।

আকবরের চিঠিতে ফিরত যান। তিনি কয়েছেন আপনি ১২০০ জাট আর ৯০০ সওয়ার। ১২০০ জাট তো বুঝলেন। এখন ৯০০ সওয়ার মানে কিতা।

আকবরের আমলে সাধারণত আপনাকে প্রতি দশ সওয়ারের জন্য বিশটা ঘোড়া রাখতে হত। অর্থাৎ ৯০০ সওয়ার মানে আপনাকে ১৮০০ ঘোড়া পালতে হবে। বাদশা যুদ্ধে ডাকলে আপনাকে কমপক্ষে ৯০০ ঘোড়া নিয়ে হাজির হতে হবে, তাই আপনার সওয়ার র‍্যাঙ্ক ৯০০। ঘোড়া মাঝপথে মরে গেলে বা অসুস্থ হলে যেন তবু আপনি অন্তত ৯০০ ঘোড়া নিয়ে হাজির হতে পারেন সেইজন্য এই ব্যবস্থা। মোগল আমলে এই ব্যবস্থার নাম ছিল দাহ-বিস্তিঃ দশ - বিশ। প্রতি দশ সওয়ারে বিশটা ঘোড়া। তিনটা তিন ঘোড়ার দল (৩X৩), চারটা দুই ঘোড়ার দল (৪X২), তিনটা এক ঘোড়ার দল (৩X১) = মোট বিশটা ঘোড়া। একেক গ্রুপের ঘোড়ার জাত আলাদা আলাদা, তাদের জন্য বেতনও আলাদা।

ঘোড়া পালার জন্য আপনি নিয়মিত বেতন পাবেন, কেননা টেকনিক্যালি ঘোড়ার মালিক সরকার। আপনি কেবল এর দেখভাল করছেন। রাজপুত হিসাবে আপনি পাবেন প্রতি তিন ঘোড়ার জন্য ২০ রূপি আর প্রতি দুই ঘোড়ার জন্য ১৫ রূপি। এক ঘোড়ার জন্য সম্ভবত ১২ রুপি। এখন আপনি যদি রাজপুত না হয়ে আফগান বা ভারতীয় মুসলিম হতেন, তবে একই দাহ-বিস্তির জন্য আপনাকে একটু বেশী টাকা দেয়া হত। প্রতি তিন ঘোড়ায় ২৫ রূপি, দুই ঘোড়ায় ২০ রূপি, এক ঘোড়ায় ১৫ রূপি।

রাজপুতের এই কম বেতনের কথায় যদি আপনি জাতের অপমানের কথা ভেবে খাপ্পা হয়ে খাণ্ডা তলোয়ার বের করে চিক্কুর দিয়া বলেন লিবার্টি ইকুয়ালিটি ইটার্নিটি এট সেটেরা এট সেটেরা, আমি বলব কাম ডাউন। চিল; বেইবি গরম সিং। দুনিয়া বেইনসাফ। আকবরের এই নিয়ম রাজপুতদের প্রতি বৈষম্যমূলক কারণে হতে পারে, তবে তার চেয়ে অন্য আরেকটা কারণ হয়ে থাকতে পারে মনসবদারিতে আফগান তুরান ভারতীয় ইত্যাদি মুসলমানদের আকৃষ্ট করা।

সওয়ার অনুযায়ী যে টাকা আপনি পাচ্ছেন তার পাঁচ শতাংশ আপনার নিজের জন্য, বাকিটা ঘোড়া পালার পয়সা। সুতরাং আপনার মনসবদারির মোট বেতন হবে এমন একটা জায়গির থেকে আয়, যে আয় আপনার জাট বেতন আর সওয়ার বেতন দিতে সক্ষম।

সুতরাং মনসবদার হিসাবে আপনি একটা জায়গির পাবেন, কিছু ঘোড়া (এবং হাতি, গাধা ইত্যাদি যদি আপনার সওয়ার বেশি হয়ে থাকে) পালতে হবে এবং জায়গিরের জমির আয় থেকে আপনার বেতন এবং ঘোড়ার খোরাকি জোগাড় হবে। আগেই বলেছি জমি কিন্তু আপনার নয়, জমি সরকার বাহাদুরের। জমির আয় আপনার।

আপনি ভাবলেন বেশ। ওরে কে আছিস, তামুক সাজা। জায়গিরে একটু আরাম করে বসি। এই চাকর, গোয়ালঘর বসা পূবদিকে। সত্তুর গরু কিনব ভাবছি। সারাটা জীবন ঘরে পালা গরুর লস্যি খেয়ে কাটিয়ে দেব বটে।

উঁহু সে হচ্ছে না। জায়গীর প্রতি তিন বছর পর পর বদলি হয়। অর্থাৎ আপনি গেঁড়ে বসবেন এক জায়গায় আর নবাবি করবেন সে হচ্ছে না। আপনি দুষ্টপ্রকৃতির লোক। বাদশা আপনাকে বিশ্বাস করেন না। তিন বছর পর পর বদলি মানে হচ্ছে আপনি আশপাশের নেতাদের সাথে জড়িয়ে বাদশার বিপক্ষে কিছু করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

ইক্তাদারের কথা মনে আছে, দিল্লির সুলতানাত আমলের ইক্তাদার? তারা কিন্তু বদলি হতনা। সম্ভবত চালু ছেলে আকবর ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন মনসবদারদের দৌড়ের উপর রেখে। মনসবদারের ছেলে মনসবদার নয়, যদিনা বাদশা বলেন। মনসবদার নিয়মিত বদলি হবে, যদিনা বাদশা বলেন। বাদশা ঠিক করেন কাকে মনসব দেবেন, কত জাট কত সওয়ার হবে, এবং কখন কার মনসব কেড়ে নেয়া হবে।

আচ্ছা বেশ। জায়গির তো পেলেন। ভাবছেন কোথায় সে জায়গির, যাই গিয়ে দেখে আসি কাল।

উঁহু সে ও হবার নয়। ভেবেছেন করবেন চালাকি, নিজের বাড়ির পিছনের জমি জায়গির নিয়ে নিজের এলাকা বাড়াবেন? জায়গির কোথায় হবে সে ফরমান আসবে মোগল দেওয়ান (রাজস্ব কর্মকর্তা) আপিস থেকে। তারা ঠিক করবে কোথায় আপনার জায়গির। কিভাবে তারা ঠিক করবে? সে অনেক হাঙ্গাম। আগে হিসেব করে দেখতে হবে, আপনি কোথায় কোথায় নেই , তার পর হিসেব করে দেখতে হবে,আপনি কোথায় কোথায় থাকতে পারেন, তার পর দেখতে হবে, আপনি এখন কোথায় আছেন। তার পর দেখতে হবে—

গেছোদাদা সিস্টেম। মোট কথা, আপনার বাড়ি থেকে দূরে আপনার অপরিচিত বা স্বল্পপরিচিত এলাকায় জায়গির পাবেন। এতে আপনার নেটওয়ার্ক বাড়বে, নতুন বন্ধু হবে, নয়া ভাষা শিখবেন, নতুন খাবারের রেসিপি শিখবেন, আর সবচাইতে বড় কথা, জায়গা চিনতে চিনতে বদলি হয়ে যাবার সময় হয়ে যাবে আর আপনি কারো সাথে শলা করে নিজের শক্তি বাড়াতে পারবেন না।

মহান বাদশা আপনাকে মনসব দেবার সময় কিছু কাগজপত্র দিবে, তাতে জাট সওয়ার নম্বর ইত্যাদি আর জায়গিরের বিশদ। জায়গিরের কাগজটা খুলে পড়ুন। লেখা জমা এত আর আনুমানিক হাসিল এত।

জমা হাসিল কিতা?

দেওয়ান আপিস তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে মোটা মোটা পুঁথি লিখে রাখে। সেইখানে জমির খতিয়ান, বার্ষিক আয়ের অনুমান, খরচের হিসাব, আবহাওয়া, ফসলের হিসাব ইত্যাদি বিতং লেখা। তারা আপনার জাট সওয়ার পদমর্যাদা দেখে হিসাব করে কইবে ঠিকাছে একে বুন্দেলাখণ্ডে এই জমি জায়গির দেয়া যাক। জমা বারো লাখ, ওতে গরম সিং এর হয়ে যাবে।

জমা বারো লাখ অর্থ সেই জমি থেকে মোগল সরকারের অনুমান বারো লাখ রূপি আয় হবে। আপনার জাট সওয়ার অনুযায়ী বারো লাখ আপনার প্রাপ্য, অতএব দুয়ে দুয়ে বাইশ।

জায়গির নিয়ে কিঞ্চিৎ কচকচি করা যাক, কেননা এরপর আমরা মনসবদারির শুভংকরের ফাঁকি নিয়ে কথা বলব। তার আগে জায়গির কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি বলে নেয়া ভালো।

জায়গির চার প্রকারঃ

১। জায়গির এ তনখা
২। মাশরুত জায়গির
৩। ইনাম জায়গির
৪। ওয়াতান জায়গির

শেষ থেকে শুরু করি। ওয়াতান জায়গির। কোন রাজা বা জমিদার যদি মনসবদার হন, তবে তিনি একটা জায়গির পান (জায়গির এ তনখা)। এবং তার পাশাপাশি, তার নিজের জমিদারি বা রাজত্বের যে জমি, সেই জমিটা হয়ে যায় ওয়াতান জায়গির। ওয়াতান জায়গির বংশপরম্পরায় তাদের হয়, বদলিটদলি নাই যদি না বাদশা কোন কারণে নাখোশ হয়ে থাকেন। আওরঙ্গজেব একবার যোধপুরের এক ওয়াতান জায়গির উত্তরাধিকার বাতিল করে দিলে সেখানে ব্যাপক মারামারি কাটাকাটি লেগে যায়। যাক সে ভিন্ন গল্প।

মাশরুত জায়গির হল সাময়িক জায়গির। ধরেন আপনার পাশের এলাকায় যুদ্ধমুদ্ধ লেগে হয়রান। দিল্লি থেকে তার আসল রুলার ইল কাম শার্প। গিয়ে বিদ্রোহ ঠেকাও আমরা আসছি। অর্থাৎ আপনাকে তলব করা হল যুদ্ধে। কিন্তু ধরেন যুদ্ধ আনুমানিক চলবে বহু মাস এবং আপনার আরও অনেক সিপাই টাকা ঘোড়া প্রয়োজন। তখন দিল্লি আপনাকে সাময়িক একটা মাশরুত জায়গির দিবে। আপনার ৯০০ সওয়ার কিন্তু সেই জায়গিরের আয় দিয়ে ১৫০০ সওয়ারের বেতন হয় মনে করেন। যুদ্ধ যতদিন চলবে ততদিন বড় মাশরুত জায়গির আপনার, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আপনি আবার আপনার পুরাতন ছোট জায়গিরে ফেরত চলে যাবেন। মাশরুত জায়গির অর্থাৎ সাময়িক।

ইনাম জায়গির পায় তারা যাদের উপর বাদশা খুশি হন। কায়কাউসের ছেলে লিখে কোবি ইনাম জায়গির পেতে পারেন, জামে মসজিদে নমাজ পড়িয়ে ইমামসায়েব ইনাম জায়গির পেতে পারেন, বাদশার পাতলা পায়খানা হলে সুরের রাজা তানসেন গান গেয়ে তার মন ভাল করে দিয়ে ইনাম জায়গির পেতে পারেন। বাদশার মনমর্জিমাফিক। ইনাম জায়গির সাধারণত চিরস্থায়ী, তাদের কোন জাট সওয়ার পদমর্যাদা নাই। তারা মারা গেলে জায়গির ফিরত যায় সরকারি মালিকানায়। জমির আয়ে কোন করও নাই, পুরা আয়ই আপনার।

জায়গির এ তনখা হইল আপনি যা পেয়েছেন বাদশার কাছ থেকে। মনসবদারির বেতন হিসাবে জাট আর সওয়ার মিলায়ে আপনার যত বেতন পাওনা, সেই টাকা আসবে জায়গির এ তনখা হতে। আজকের লেখায় জায়গির নিয়ে যত কথা হচ্ছে তা সকলই জায়গির এ তনখা।

জায়গিরদার হিসাবে আপনার কিছু দায়িত্ব আছে। জায়গিরের কর্মকর্তাদের সাথে মিলেমিশে আপনার সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। আসেন আপনার সেই দায়িত্ব কি কি সেইটা দেখি। জায়গিরদার হিসাবে আপনার সাফল্য ঠিক করে দিবে মনসবদার হিসাবে আপনি কতটা সফল হতে পারবেন।

প্রথম আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে কে কানুনগো আর কে চৌধুরী। এরা দুই ব্যক্তি জায়গিরের চিরস্থায়ী কর্মকর্তা, বছর তিন পর পর তারা বদলি হয়না। কানুনগো সাধারাণত কায়স্থ বা ক্ষত্রিয়। তারা অঙ্কে ব্যাপক দড়। বাংলায় বেশীরভাগ কানুনগোই ছিলেন কায়স্থ। কানুনগোর কাজ সহজঃ যাবতীয় নথি টুকে রাখা। জমি দৈর্ঘ্যে কত প্রস্থে কত, তার মাটি কিরূপ, তাতে চাউল ফলে না ডাইল ধরে, তার কতখানি আবাদি কতখানি অনাবাদি, তাতে নালা কতটুকু আর জঙ্গল কতখানি ইত্যাদি বিশদ লিপিবদ্ধ করে রাখা কানুনগোর কাজ।

চৌধুরীর কাজ হল রাজস্ব আদায় করা। বংশপরম্পরায় চৌধুরীরা চৌধুরীই থাকে, যদিনা বাদশা তাকে লাথি দিয়ে বের করে দেন। মনসবদার হিসাবে আপনার যদি চৌধুরীর বাঁকা কথা পছন্দ না হয় তাতে তার দুই পয়সাও কিছু এসে যায় না, জমির আয় আপনার হলেও জমি সরকারি এবং চৌধুরী সরকারি কর্মচারি। চৌধুরী হলেন জামিনদার (Surety), এলাকার সকল ছোটখাট জমিদারেরা ঠিকমত কর না দিলে বাদশার ফৌজ গিয়ে ক্যাঁক করে ধরবে চৌধুরীর গলা (জমিদারের নয়)।

বেশ, আপনার নতুন বন্ধু চৌধুরী আর কানুনগোর সাথে পরিচয় হলত? এবার তাদের জিজ্ঞাসা করেন জায়গিরের হাসিল কত।

হাসিল কিতা?

হাসিল হল প্রকৃত রাজস্ব। মনসবদারির কাগজে জমা লিখা ছিল মনে আছে? আনুমানিক আয়? যে এই জমির জমা বারো লাখ? হাসিল হল প্রকৃত আয়। এইবার আপনি আঁৎকে উঠবেন হাসিল দেখে, বলবেন ও মা গো এবং বলবেন কোজ্জাবো মা। কেননা হাসিল মোটে নয় লাখ! আপনি বারো লাখ বেতনের হাতি ঘোড়া সরঞ্জাম পুষবেন বলে দস্তখৎ দিয়ে এলেন কিন্তু আপনার প্রকৃত আয় আরও তিন লাখ কম।

মনসবদারের জটিল আর্থিক জীবনে স্বাগতম। ভেবেছিলেন চার মহলা দালানে সারাটি জীবন কাটিয়ে দিবেন আর প্রতি শুক্রবারে খাবেন খাসির বিরিয়ানি। সে হচ্ছেনা। অর্থসঙ্কট। খরচ কমান বা আয় বাড়ান।

আপনি ঠিক করলেন লিচ্চয়। ওরে চৌধুরী, কর বাড়িয়ে তিন ডবল করে দে। চৌধুরী মাথা নেড়ে তখন বলবে না সে হবে না। জমিদার কত টাকা দেবে সেইটা সরকার ঠিক করবে, এর বেশি এক পয়সাও আমি আদায় করব না। আপনি হুঙ্কার দিয়ে কইবেন তবে রে। জমির এই হালৎ কেন, আগের মনসবদার কি ঘাস খেত? সে পানির ঠিকঠাক ব্যবস্থা করে যায়নি কেন?

মুচকি হেসে চৌধুরী বলবে তার কি ঠেকা, সে তো জানেই তিন বছর পর তার বদলি হবে আর জমির আয় সে ঘরে তুলবে না। তাই সে আর কোন নজর দেয়নি ফসল বাড়ানোর দিকে।

সুতরাং তিন লাখ টাকা শর্ট। আপনি ঘোড়া চেপে দিল্লি গিয়ে লুটিয়ে পড়ে বলবেন আলমপানা, আমি যে আর পারলাম না। বারো লাখের জায়গিরে হাসিল মোটে নয় লাখ, আমি কিভাবে ৯০০ সওয়ার রাখব আর শুক্রবার খাসির বিরিয়ানি খাব? আমার জাট আরেকটু বাড়িয়ে দিন আলমপানা।

এই কথা শুনে বাদশার দরবারে রুষ্ট হয়ে আরেক মনসবদার বেপরোয়া সিং কইবে, হে গরম সিং। চক্ষুলজ্জাহীন বেতমিজ রাজপুত। দুইদিনের মনসবদার এখনই প্রমোশন চাও? আর আমরা বাইশ বছর বসে বসে কি চালডা ফেললাম? ১৬০০ জাট পেতে আমার কয় বছর অপেক্ষা করা লেগেছে জানো? বিয়াদপ। জমা হাসিলের গরমিল কি তোমার একার? বি এ ম্যান, ডু দ্য রাইট থিং (রাসেল পিটার্স স্টাইলে)।

করলাম তো হাসাহাসি। কিন্তু এইটা কঠিন সমস্যা। জমা হাসিল প্রায় কোনকালেই মিলত না, কিন্তু বাদশার কঠিন আদেশ চাহিবামাত্র সওয়ার প্রদানে মনসবদার বাধ্য থাকিবে। সুতরাং কার্যকালে মনসবদারেরা (নিজের অক্ষমতার কারণেই হোক আর জমির স্বল্প আয়ের কারণেই হোক) প্রায় কখনই প্রয়োজনীয় ঘোড়া বা সিপাই সরঞ্জাম আনতে পারত না। তারা অভাবে অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরত তা নয়, কিন্তু চরম বড়লোক অল্প কিছু মনসবদারেরাই ছিলেন।

এই জমা হাসিল গরমিল মিটানোর জন্য বাদশা শাজাহান নতুন বুদ্ধি করেন। তিনি কইলেন আচ্ছা প্রিয় মনসবদারেরা আমার। আমি তোমাদের বেতনের ব্যবস্থা করছি। কেউ প্রতি তিন মাসে একটা বেতন পাইবা, কেউ প্রতি ছয় মাসে একটা বেতন পাইবা, কেউ প্রতি আট মাসে একটা বেতন পাইবা ইত্যাদি। চার্ট দিচ্ছি দেখ। আর সওয়ার প্রতি ঘোড়ার হিসাব কমায়ে দিচ্ছি।

আপনি বললেন বেশ। কত টাকা বেতন তবে? শাজাহানের টেবিলে ধরেন প্রতি আট মাসে ৪০ রূপি, যে প্রতি দশ মাসে বেতন পাবে সে পাবে ৩৮ রূপি, আর যে প্রতি নয় মাস পরপর বেতন পাবে সে পাবে ৩২ রূপি।

কি আজগুবি নিয়ম রে বাবা, আপনি ভাবলেন। কথা সত্য। জাট পদমর্যাদায় এক পদের সাথে আরেক পদের কোন সমানুপাতিক যোগসূত্র নাই আসলে। কে কত পাবে তা নথিতে লিপিবদ্ধ করা আছে, সেই মোতাবেক বেতন হবে। শাজাহানের হিসাবমতে সওয়ারপ্রতি বেতনও কমিয়ে আনা হল, আর সওয়ারপ্রতি কত ঘোড়া রাখতে হবে তাও কমিয়ে আনা হল, সুতরাং অল্প হাসিলেও একই সওয়ার পালা সহজতর হয়ে আসল।

তারপর শাজাহান বুড়া হয়ে আসলে তাকে জেলের পুলাউ খাওয়ায় রাখলেন ছেলে আওরঙ্গজেব এবং মনসবদারি ব্যবস্থার খুঁটিনাটিতে মন দিলেন। পিতা শাজাহানের সংস্কার তিনি বহাল রাখেন, এবং সওয়ারপ্রতি বেতন আরও কমে আসে। কিন্তু, তিনি আরেকটা বড় ধরনের সংস্কার করেন যেইটা আগে কোন মোগল বাদশা করে দেখাননি। তিনি সওয়ারের নম্বর জাটের নম্বর থেকে বাড়ানোর অনুমতি দেন।

খোলাসা করি। আপনি গরম সিং, আপনার জাট ১২০০ সওয়ার ৯০০। আপনার বন্ধু চরম সিং রান্ধাওয়া, জাট ৬০০ সওয়ার ২০০। আরেক রাজপুত বেপরোয়া সিং এর জাট ১৬০০ আর সওয়ার ১২০০। খেয়াল করেছেন সওয়ার নম্বর জাটের থেকে সবসময় কম? আওরঙ্গজেব এর আমল পর্যন্ত নিয়ম ছিল সওয়ার নম্বর হবে জাটের সমান বা জাটের কম। সুতরাং ১২০০ জাট নিয়ে আপনি সর্বোচ্চ ১২০০ সওয়ার হতে পারবেন, এর বেশি সওয়ার চাইলে আপনাকে জাট বাড়াতে হবে। কিন্তু জাট বাড়ানোর আবদার করলে দরবারে কিরকম হাউকাউ লাগে তা তো আমরা একটু আগে দেখলামই।

সুতরাং আওরঙ্গজেব কইলেন ঠিক আছে। গরম সিং আইস। তোমাকে প্রমোশন দিলাম ১২০০ জাট এবং ১৪০০ সওয়ার। ট্র্যাডিশনের গুলি মারি। যেহেতু বেশি সওয়ার, এখন তুমি বেশী বেতন পাবে। বড় জায়গিরের ব্যবস্থা করছি খাড়াও।

দরবারের বাকিরাও তখন খামোশ খেয়ে থাকবে, কেননা সওয়ার বাড়া মানে দায়িত্বও বাড়া। ১৪০০ সওয়ার মানে বেশি ঘোড়া কিন্তু টাকার বেশীরভাগই ঘোড়া পালতে চলে যাবে। আর আপনার জাট বাড়েনি, সুতরাং দরবারে সম্মান আগের মতই আছে বাড়েনি কিছু। বাকিরা কেন রাগ করতে যাবে। এইভাবে আওরঙ্গজেব সাপও মারিলেন লাঠিও ভাঙ্গিলেন না।

ব্যস এইতো সব শিখে গেছেন।মনসবদার ওয়ান ও ওয়ান কমপ্লিট। এখন করেন মনসবদারি থাকেন সুখে জায়গিরে। শুক্কুরবার শুক্কুরবার খাসির বিরিয়ানি। আমারেও একদিন খাওয়ায় দিয়েন নজরানা বাবদ। সে কথাই রইল।

খুদাপেজ।

সূত্র
কৌশিক রায়, ফ্রম মামলুকস টু দ্য মনসবদারসঃ এ সোশ্যাল হিস্টোরি অফ সাউথ এশিয়া ১৫০০ - ১৬৫০
সতীশ চন্দ্র, মেডিভাল ইন্ডিয়াঃ ফ্রম সুলতানাত টু দ্য মুঘলস পার্ট টু
ইরফান হাবীব, দ্য মনসব সিস্টেম ১৫৯৫ - ১৬৯৭
কৃষ্ণজী নাগেশরাও, মেডিভাল ইন্ডিয়ান হিস্টোরি।


মন্তব্য

সোহেল ইমাম এর ছবি

হায়রে, ছোটবেলায় আপনার মত ইতিহাসের মাস্টার পেলে এতোদিন ইতিহাসে গন্ডাখানেক পিএইচডি করে ফেলতাম। গুরু গুরু

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সত্যপীর এর ছবি

ভাবতেছি ট্রাম্প ইনিভার্সিটির মত পীর ইনভার্সিটি খুলব। আলিম কাবিল ফাজিল ডিগ্রি থাকবে। শুক্কুরবার বিরিয়ানি খাওয়াইলে এসাইনমেন্টে বিশেষ ছাড়। এক গণ্ডা ডিগ্রি নিলে পীর এ সালামত খিলাত পাইবেন সম্মানসূচক। সমস্যা সমাধান।

..................................................................
#Banshibir.

সোহেল ইমাম এর ছবি

দারুন খবর, মাশাল্লা বলবো না ইনশাল্লা - আনন্দে লাফিয়ে ওঠার আবেগে কি বলতে হয় পীরসাহেব?

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সত্যপীর এর ছবি

আনন্দে লাফিয়ে ওঠার সময় লুঙ্গির খুঁট ধরে রাখা জরুরী। প্রায়োরিটি।

..................................................................
#Banshibir.

সোহেল ইমাম এর ছবি

দেঁতো হাসি

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

আলতাইর এর ছবি

হ... আনন্দে বেশী লাফাইতে গেলে মাশাল্লাহ'র বদলে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে হইতে পারে! দেঁতো হাসি

নজমুল আলবাব এর ছবি

শুক্করবারে বিরিয়ানি খাইতে হইলে সওয়ার (লেখা) বাড়াইতে হইবে জনাব

সত্যপীর এর ছবি

সাব্বাস! তাইলে মডুরে বইলা আমার নিক পাল্টায় দেন। সত্যপীর ২০ জাট ১২ সওয়ার, অর্থাৎ বছরে অন্তত ১২টা লেখা দিমু। জায়গিরের জমা পতি শুক্কুরবার খাসির বিরিয়ানি।

জীবন সুন্দর।

..................................................................
#Banshibir.

মাহবুব লীলেন এর ছবি

তো আমাগো অত অত দোস্ত যে নামের শেষে জায়গিরদার লেখে তারা কি সকলে কায়কাউস লিখে ইনাম জায়গির পাওয়া কোবিদের বংশধর?

সত্যপীর এর ছবি

ইনাম জায়গির হেরেডিটারি না তো, কায়কাউস কবি পটল তুললে তার ছেলে বেড়ায় হেসে খেলে। জায়গির ফের তখন সরকারি দখলে, বংশধরের কপালে আণ্ডা। জায়গিরদারি খতম।

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

এই জিনিস পড়সিলাম প্রায় বিশ বছর আগেঃ ভারতীয় এবং ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য। জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার অভাব নাকি মধ্যযুগীয় ভারতের কৃষিতে পুঁজিবাদ না ঢুকার অন্যতম কারণ। পুরানো কথা মনে করায়ে দিলেন!

তবে একটা ব্যাপার খোলাসা হইল না। একবার বল্লেনঃ

আগেই বলেছি, জমি কিন্তু আপনার নয়, জমি সরকার বাহাদুরের। জমির আয় আপনার।

তারপর আবার বল্লেনঃ

মুচকি হেসে চৌধুরী বলবে, তার কি ঠেকা, সে তো জানেই তিন বছর পরে সে বদলি হবে, আর ফসলের আয় সে ঘরে তুলবে না।

এইখানে "জমির আয়" আর "ফসলের আয়"-এর মধ্যে পার্থক্য কী?

"চৌধুরী"-র রহস্য জানলাম! আমি তো ভাবতাম ঐটা "চৌরদ্ধরণিক" (চোর ধরার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী) শব্দের অপভ্রংশ।

Emran

সত্যপীর এর ছবি

"ফসলের" পালটে "জমির" করে দিলাম। ধন্যবাদ। মোটকথা আপনার নামে জায়গিরের জমির আয় বরাদ্দ হবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কিছু কিছু জায়গীরে জমিও ছিলনা, যেমন সুরাটের বন্দর জায়গির। শাজাহান কন্যা জাহানারাকে এই জায়গির প্রদান করেছিলেন (বলা হয়ে থাকে সেই জায়গির নাকি ছিল তার "পান খরচ" দেঁতো হাসি), বন্দরের কাস্টমস ডিউটি ছিল এই জায়গিরের আয়। জমিটমি নাই, বন্দর জায়গির। সুতরাং দিনশেষে আপনার জায়গির কোন না কোনভাবে আয় করবে, এবং সেই আয় আপনার।

চৌধুরীর আরও জন্মরহস্য থাকতে পারে, আমি সঠিক জানি না। আমি যা পড়লাম এই চৌধুরী (সরকারি কর্মচারি কাম জামিনদার কাম স্থানীয় রাজস্ব কালেক্টর কাম বিয়াদপ) পদ নাকি পঞ্চদশ শতাব্দী না চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত ট্রেস করা গেছে। খতিয়ে দেখিনাই অবশ্য।

ভারতীয় এবং ইয়োরোপীয় সমাজতন্ত্রের পার্থক্য বিষয়ে কিছুই কইতে পারলাম না। পড়ে দেখিনাই কখনও। তবে কিঞ্চিৎ পড়ছিলাম ভারতীয় এবং ইয়োরোপীয় সামরিক শ্রমবাজারের পার্থক্য। ইউরোপে যেসময় রাজাগজারা নিয়মিত নিজস্ব মিলিটারি পুষত আর ট্রেনিং দিত সেই সময়ে বা কাছাকাছি সময়ে ভারতে রাজাগজারা ছোট একটা নিয়মিত বাহিনী রাখতেন (আহাদি) আর যুদ্ধ লাগলে ভাড়াখাটা অনিয়মিত বাহিনীর ডাক পড়ত, কিংবা মনসবদার বাহিনীর মত "রিজার্ভ ফোর্স" রাখা হইত (কোন রকম সেন্ট্রাল ট্রেনিং ছাড়া) তাদের ডাকা হইত। কারণটা কি। নানা থিউরি আছে। এক জায়গায় আছে ১৭শ শতাব্দীর শেষে স্পেনের ইংল্যান্ডের জনসংখ্যা ৪ মিলিয়ন, স্পেনের ৭ মিলিয়ন, ফ্রান্সে ১৪ মিলিয়ন। ১৭০০ সালের দিকে আস্ত ইয়োরোপের জনসংখ্যা ১২০ মিলিয়ন। আর ভারতে ১৬০১ সালে জনসংখ্যা ১৪৫ মিলিয়ন!! সাপ্লাই ডিমান্ড থিউরি। হাত বাড়ালেই সিপাই পাওয়া এত সহজ যে ভারতে নিয়মিত রাজকীয় বাহিনী রাখার দরকার পড়েনাই। ইন্টারেস্টিং থিউরি।

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

আচ্ছা, দেখি আমি বুঝলাম কিনা! জমি থেকে একটা ইনকাম হবে; আর হাতি-ঘোড়া পালার জন্য সেই ইনকামের সিংহভাগ খরচ হবে। এই খরচ বাদ দিয়ে যা থাকবে, সেইটা দিয়ে মনসবদার তার নিজের আর পরিবারের খাই-খরচা মেটাবে। অর্থাৎ সেভিংসের সম্ভাবনা খুবই কম। আর ট্যাক্স বসানোর মালিক সরকার; তার মানে ট্যাক্সের টাকাও মনসবদারের পকেটে ঢুকবে না, ঢুকবে সরকারের পকেটেই। মূল কথা হইল, জমির মালিক = সরকার (= বাদশা), আর মনসবদার = কেয়ারটেকার। কেয়ারটেকার হিসেবে সে তার মিনিমাম ডিউটি পালন করে। মিনিমামের উপরে গেলে যা লাভ, সেইটা যেহেতু আলটিমেটলি সরকারের পকেটেই যাবে, সেহেতু
মিনিমামের বেশী কিছু করার কোন মোটিভেশন মনসবদারের নাই। বুঝা কি ঠিক আছে মনে হয়?

ভারতবর্ষে নিয়মিত সেনাবাহিনীর আকার ছোট রাখার ব্যাপারে আমার নিজের একটা ধারণা আছে। শাসকের দুর্বলতার সুযোগে বৃহদাকারের নিয়মিত সেনাবাহিনীর অধিনায়করা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারে - এই সম্ভাবনা রোধ করার জন্যও হয়ত নিয়মিত বাহিনীর আকার ছোট রাখা হত।

নীরদচন্দ্র চৌধুরীর এক লেখায় পড়েছিলাম (খুব সম্ভবতঃ আমার দেবোত্তর সম্পত্তি) "চতুর্ধুরী" (জমির চার দিক ধরে অথবা মাপে যে) থেকে "চৌধুরী" শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে "চৌধুরী"-রা ছিল রাজস্ব বিভাগের নিম্নপদস্থ কর্মচারী। বিবর্তনের ধারায় আমাদের দেশে কিভাবে এটা উচ্চপদস্থ পদবীতে রূপ নিল, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে!

Emran

সত্যপীর এর ছবি

ট্যাক্স বসানোর মালিক সরকার; তার মানে ট্যাক্সের টাকাও মনসবদারের পকেটে ঢুকবে না, ঢুকবে সরকারের পকেটেই।

বুঝতে একটু ভুল হচ্ছে কোথাও বস। ট্যাক্স বসানোর মালিক সরকার, কিন্তু সেই ট্যাক্স সরকারি কোষাগারে যাবেনা। সেইটা বেতন হিসাবে ঢুকবে মনসবদারের পকেটে। মনসবদারের জন্য প্রদত্ত জায়গির সরকারের ভূমিআয়ের উৎস নয়। সরকার ভূমিআয় করে নিজস্ব খালিসা জমি থেকে।

উদাহরণ দেখি আসেন। আপনি গরম সিং। জাট ১২০০ সওয়ার ৯০০। এর অর্থ আপনি সরকারের বেতনভুক সামরিক কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সরকার যেরকম কর্ণেলকে বেতন দেয় মাসে মাসে, সেইরকম মোগল সরকার মনসবদার গরম সিং কে তালিকাভুক্ত করল তার রিজার্ভ ফোর্সে। কিন্তু তারা বেতনের বদলে একটা জায়গিরের কর আপনার বেতন হিসাবে মঞ্জুর করবে।

আচ্ছা। এইবার নথি খুলে দেখেন ১২০০ জাট কত বেতন পাবে আর ৯০০ সওয়ারের খোরাকি কত হওয়ার কথা। মোগল দেওয়ান অফিসের নথিতে তা পরিষ্কার লিখা আছে। তর্কের খাতিরে ধরি মোট বেতন (জাট সওয়ারি মিলিয়ে) বারো লাখ। আপনাকে জায়গির দেয়া হল বুন্দেলাখণ্ডে। জায়গিরপত্রে জমা আয় লেখা বারো লাখ। আয়করের পরিমাণ ৩০ শতাংশ। তার মানে জমিদারেরা পুরো এলাকা থেকে সেইখানে আয় করে চল্লিশ লাখ, তার ৩০ শতাংশ হল বারো লাখ আপনার ইনকাম। এইখানে সরকার টাকা নিচ্ছে না, সরকার কেবল আপনার বেতনের ব্যবস্থা করে দিল।

এখন, ৩০% সরকারি রেট। যদি কোন বছরে কম ফলন হয় (কিংবা সরকারি নথিতে ভুলভাল জমার অনুমান থাকে) আর জমির প্রকৃত আয় হয় তিরিশ লাখ, তাহলে আপনার হাসিল তিরিশ লাখের তিরিশ শতাংশ = ৯ লাখ। তিন লাখ শর্ট। আপনি চাইলেও চৌধুরী ৩০% এর এক পয়সা বেশী রাজস্ব আদায় করবে না, আপনি শর্ট না ওভার তাতে তার কিছু এসে যায় না।

মিনিমামের উপরে গেলে যা লাভ, সেইটা যেহেতু আলটিমেটলি সরকারের পকেটেই যাবে, সেহেতু
মিনিমামের বেশী কিছু করার কোন মোটিভেশন মনসবদারের নাই।

আপনি আপনার মনসবদারি তে উন্নত জাতের অর্গানিক আলু টমেটো লাগায় তিনগুণ ফলনের ব্যবস্থা করতে পারেন, তাতে যদি পয়সা বেশী হয় তো সেটা আপনারই ইনকাম। কিন্তু সাধারণত টাকা আসে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিলে, কিন্তু আপনি মাত্র তিনবছর পরেই ফুট। তাই মনসবদারেরা সাধারণত জায়গির চুক্তির শেষ বছর তেমন ফসলের যত্ন নিত না। সেই মোটিভেশন নাই বুঝাতে চেয়েছি।

ইনকাম বাড়িয়ে দেড়গুণ করার আরেকটা ছোট সমস্যা আছে, খুবই রেয়ার যদিও। দিল্লির দেওয়ান আপিস যদি স্থানীয় নথি থেকে খবর পায় যে হাসিল জমার থেকে অনেক বেশী, তারা তুরন্ত তাদের নথির জমাদাম আপডেট করবে এবং কইবে ওকে এই জমির হাসিল পনেরো লাখ কিন্তু তুমি গরম সিং বারো লাখের জমা পাওয়ার কথা, যাও করলাম তুমায় ট্রান্সফার। এই জমিতে ১৪০০ জাটের মনসবদার আসবে।

ইন্সাফ নাই।

জমির মালিক = সরকার (= বাদশা), আর মনসবদার = কেয়ারটেকার।

প্রথম ভাগ ঠিক আছে। জমির মালিক সরকার। দ্বিতীয় ভাগ সবসময় ঠিক নাই। বাদশার ছেলেমেয়েরা ছিল মনসবদার। মন্ত্রী মিনিস্টার মনসবদার। সভাকবি মনসবদার। নামজাদা রাজাগজারা মনসবদার। তারা জায়গির ঠিক কেয়ারটেকার অর্থে নিত না। বিশেষত ৫০০ জাটের উপরের লোক। মনসবদারি মনে করেন বাদশার মনে জায়গা পাওয়ার সুচক। আকবর দেখলেন তার রাজপুত সাহায্য দরকার, গণহারে রাজপুত মনসবদারি অফার করা হতে থাকল। আওরঙ্গজেব দেখলেন পাহাড়ের ইঁদুর শিবাজি অ্যান্ড কোম্পানিকে ঢিঁট করা চাই, আর তাতে সাহায্য করতে পারে অন্যান্য মারাঠা লিডার (যাদের সাথে কিনা আবার শিবাজির গিয়াঞ্জাম)। অতএব আওরঙ্গজেব মারাঠাদের মনসবদারি দিতে থাকলেন। মনসব হইল মিলিটারি র‍্যাঙ্ক। আপনি ১০ জাটের ছোট অফিসার হইতে পারেন (ধরেন কর্পোরাল লেভেলের) আবার ৭০০০ জাটের বিরাট অফিসার হইতে পারেন (জেনারেল র‍্যাঙ্কের)। কিন্তু দুইজনেই মোগল সাম্রাজ্যের বেতনভুক সামরিক কর্মকর্তা। জায়গির সিস্টেম তার বেতন দেওয়ার পন্থা।

উল্টা উদাহরণ ও আছে। আকবরের দরবারের লেখক বাদাউনি ছিলেন বিরাট কাঠমোল্লা। তার ধারণা ছিল আকবরের লুজ ধর্মনীতির কারণে দেশে ইসলাম উচ্ছনে যাইতেছে। তিনি আকবরের মনসবের অফার ফিরায় দেন। এক ধরনের ইম্পিরিয়াল ফাক ইউ জেসচার কইতে পারেন হাসি

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

এখন বুঝলাম! অসংখ্য আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

Emran

সমাচার  এর ছবি

১। খালিসা জমি ছাড়া অন্যান্য রাজ্য থেকে সরাসরি রাজকীয় তহবিলে কি কোন রাজস্ব আসত না?
২। জমির মালিক যে সরকার, সেটা বদলিযোগ্য জায়গীরওয়ালা মনসবদারদের জন্য সত্য হলেও ওয়াতন জায়গীরদারদের ক্ষেত্রে মালিকানার একরকম মৌন স্বীকৃতি ছিল না? আসলে মালিকানা বলতে তো ভোগদখলের অধিকার, হস্তান্তরযোগ্যতা, উত্তরাধিকার ইত্যাদির সম্মিলন বোঝায়।

সত্যপীর এর ছবি

২। ওয়াতান জায়গিরের মালিকও সরকার। উত্তরাধিকার সূত্রে জায়গির একই পরিবারে থাকবে না তা খালিসা জমিতে রূপান্তরিত হবে (কিংবা অন্য মনসবদারের জায়গির হয়ে যাবে) তা ঠিক করবে সরকার। অর্থাৎ ওয়াতান জায়গিরদার হিসাবে আপনার পিতা মারা গেলে আপনার নামে ওয়াতান জায়গির লিখে দেওয়া হবে কিনা সেইটার জন্য আপনাকে সরকারি অনুমতির অপেক্ষা করতে হবে। ভোগদখলের অধিকার, হস্তান্তরযোগ্যতা, উত্তরাধিকার ইত্যাদি সকল কিছুর জন্য সরকারি সই লাগবে।

১। অন্যান্য ভূমিরাজস্বের কথা হচ্ছে? নাকি ভূমিরাজস্ব ছাড়া অন্যান্য কী রাজস্ব তহবিলে আসত তার কথা?

অন্যান্য ভূমিসংক্রান্ত রাজস্ব (বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে ভূমিপুত্রের উপর অন্যান্য রাজস্ব) ছিল বেশ কিছু। তার যেকটার কথা আমরা জানি তার মধ্যে খরায়জি (আপনি যদি চারণভূমি রাখেন তবে মহিষপ্রতি ৬ দাম এবং গরুপ্রতি ৩ দাম) কর, সরদখতি (ফলের বাগানের উপর ধার্য্য কর), আওরঙ্গজেবের আমলে জিজিয়া কর (অমুসলমান দের উপর ধার্য্য), বেওয়ারিশ জমির উপর ধার্য্য কর অনকোরা। এছাড়া আনফিশিয়ালি কিছু কর চাপানো হত যা দিল্লি পর্যন্ত যেত না কিন্তু চাষীরা দিতে বাধ্য হত। যেমন জবিতানা (রাজস্ব আদায়কারী দলের খরচ), সালামি বা বাধ্যতামূলক উপহার, বালাদস্তি বা ঘুষ। ইরফান হাবীবের "মুঘল ভারতের কৃষিব্যবস্থা" বইয়ের ভূমিরাজস্ব চ্যাপ্টারে বিশদ দেখতে পারেন।

ভূমিরাজস্ব ছাড়া অন্যান্য রাজস্বের উৎস ছিল টাকশালের ফী (সাধারণতঃ ৫ শতাংশ), রাহাদারি ইত্যাদি সড়ক টোল, বন্দরে কাস্টমস ডিউটি, বাজারে পণ্যের উপর কর ইত্যাদি।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

যতদূর জানি চৌধুরীরা রাজস্ব বিভাগের নয় স্থানীয় সরকার বিভাগের লোক ছিল। তারা মূল শহরের বাইরের উপশহরের মহল্লা বা শহরের গা-লাগোয়া বস্তির সরদার/মাতব্বর ছিল। তারা রাজস্ব আদায় বা উন্নয়ন ব্যয় করতো না। মোটামুটি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, ছোট মাপের সালিশ, উপরমহল থেকে দেয়া কোন নির্দেশ পালন, কোন কাজের জন্য লোক জড়ো করা এসবই ছিল তাদের মূল কাজ। এই পদবীটা (যদিও এটা কোন পদবী নয়) হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সব ধর্মের লোকেদের মধ্যে দেখা যায়।

চৌধুরী পদবী হিসেবে জাতে ওঠে ব্রিটিশ আমলে, যখন সেটা খেতাব হিসেবে ব্রিটিশদের নেটিভ বশংবদদের দেয়া হতো (রায়চৌধুরী/খানচৌধুরী)। একই সময়ে বা এর আগে কেউ কেউ নিজের পদবীর সাথে চৌধুরী যোগ করে নিয়েছিল (যথা, পালচৌধুরী)। চৌধুরীকে ঊচ্চকোটির পদবী ধরা হয় পূর্ববঙ্গে, তাও আবার গত শতকের আগে নয়। বিষয়টার পালে বাতাস দিয়েছে পূর্ববঙ্গীয় সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র। ঊচ্চকোটির ধারণাটাই ভুয়া!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সত্যপীর এর ছবি

চৌধুরী পদবী হিসেবে জাতে ওঠে ব্রিটিশ আমলে, যখন সেটা খেতাব হিসেবে ব্রিটিশদের নেটিভ বশংবদদের দেয়া হতো (রায়চৌধুরী/খানচৌধুরী)।

বিটিশ আমলে ভূমিরাজস্বের অনেক পরিবর্তন আসে দেখলাম। মালিকানা, রাজস্ব হার, আদায় পদ্ধতি সবকিছুই কিঞ্চিৎ পাল্টে যায়। আমি আপাতত মোগল সমসাময়িক সময়ের ভূমিরাজস্ব নিয়ে পড়তেছি (ধরেন মোগলের আধা বন্ধু রাজ্য অযোধ্যা/বাংলার ভূমিরাজস্ব, কিংবা মোগলের দুশমন মহারাষ্ট্র বা বিজাপুরের ভূমিরাজস্ব ইত্যাদি)। উপযুক্ত মালমশলা পেলে আরেকটা বা দুইটা কিস্তি রাজস্ব/প্রশাসনিক বিষয়ে লেখা দিব। তারপর তেল থাকলে বিটিশ সিস্টেম, না হইলে ব্যাক টু আফিম বিজিনেছ আর কবুতর ফারুক। দোয়া খায়ের কইরেন।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সত্যি বলতে কি কোন আমলে (মামলুক/সুলতানী/মুঘল/ব্রিটিশ/মারাঠা ইত্যাদি ইত্যাদি) ভারতবর্ষের সর্বত্র এক প্রকারের রাজস্ব এবং ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি একই আমলের বিভিন্ন শাসকদের মধ্যে সেটাতে হেরফের আছে। ব্রিটিশদের আমলে বৃহত্তর ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে রাজস্ব/ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা একটা পার্টিকুলার সময়ে একটা পার্টিকুলার রকমের ছিল। কিন্তু ঐ পার্টিকুলার সময়েও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ভেতরে থাকা কয়েকশ' দেশীয় রাজ্যে আরও কয়েক ডজন রকমের রাজস্ব/ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশরা রাজস্ব/ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থাতে বার বার একটু একটু পরিবর্তন করে একে মোটামুটি আধুনিক একটা ফর্মে এনেছিল। সেই সাথে এর আনুভূমিক বিস্তার, দক্ষতা এসবও বাড়িয়েছিল। ভারতবর্ষের ভূমি/ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার সবচে' জটিল ও আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে 'খাস' ও 'চাকরান'।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

বদলিটদলি নাই যদি না বাদশা কোন কারণে খামোশ হয়ে থাকেন

এখানে মনে হয়

নাখোশ

হবে, নাকি?

ইতিহাসের মধ্যে হালকা-পাতলা গণিত প্রবেশ করায়া তো ঝামেলা করে ফেললেন হালকা।

সে যাই হোক, লেখার স্বাদ খাসির বিরিয়ানীর চেয়ে কোন অংশে কম না। চলুক সুস্বাদু ইতিহাস পাঠ।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

সত্যপীর এর ছবি

খামোশ ও ঠিকাছে। সমস্যা নাই

সংযোজন: আপনি সঠিক। খামোশ হবে না। ঠিক করে দিচ্ছি।

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

খুব একটা নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারছি না। আপনি তো খালি র‍্যাঙ্ক(জাট) আর ঘোড়ার(সওয়ার) হিসাব দিলেন, ফৌজের হিসাব কই? সৈন্য পোষার খরচ আসবে কোথা থেকে? মসনবদারি টারি নিয়া শেষে কল্লাটা হারাইতে হবে নাতো?

সত্যপীর এর ছবি

হাসিলের টাকা থেকেই সিপাইর বেতন দিবেন। কুড়ায় বাড়ায় হয়ে যাবে।

মনসবদার হইছেন, কল্লার ভয় করে লাভ আছে? যুদ্ধ তো লাগবই আজ কিম্বা কাল। হিমু ভাইর কোটেশন ধার করে কইতে হয়: তুফানে বেঁধেছেন লুঙ্গি বাতাসে কি ভয়?

(জাট আর সওয়ার দুইটাই কিন্তু র‍্যাঙ্ক)

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

হাসিল যদি ভাগমত না হয় তো আমি হালায় বেতন বাকী রাখমু, যা আছে কপালে। এমনেও জানের ভরসা নাই, অমনেও নাই। ফৌজেরা খেপলে বাদশা নামদারের উপরে খেপবো, আমার কি? কি কন?

সত্যপীর এর ছবি

রাতের বেলা ছোরা নিয়া ঘুমায়েন। সদর খিড়কির ঐপাশে বল্লম হাতে সিপাই যারে আপনি বেতন দেননাই। গুড লাক।

..................................................................
#Banshibir.

মন মাঝি এর ছবি

এহ্‌হে, শখ কত্ত! এইসব ধান্ধাবাজি ছাড়েন, বুঝছেন? আমার বেতন না দিয়া আপনি যাইবেন কই? এত্ত সোজা নাকি! কুথায় বাদশা, কুথায় কে, কুথায় আমি পামু তারে!!! এইসব চালবাজি বাকতাল্লা কইরা লাভ নাই। আপনিই আমারে চাকরি দিছেন হুজুর, আপনিই আমার বেতন না দেওয়ার ধান্ধা করতাসেন - আর হ্যাঁ, আপনিই আমার হাতের নাগালে আছেন। এখন আপনিই কন হুজুর, কার কল্লা আমি সবার আগে কাটুম? রাত্রি বেলা খোলা জানালার বাইর থিকা অন্ধকার ঘরে বিছানার উপর চাঁদের আলো পড়া আপনার ঘুমন্ত নধর কল্লাটা দেইখা রাগে আমার হাতে বল্লম আর কোমরের খঞ্জর নিশপিশ করতাসে। দিমু নাকি কুচুৎ কইরা নামায়া? দেঁতো হাসি

****************************************

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আপনের চাকরি নট। সিপাইয়ের চাকরি বাদ দিয়া মসনবদার হন গিয়া যান।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

এত্ত এত্ত ঝামেলা নেবার চাইতে বৈরাগী হইয়া যাওয়া মনে হয় ভালো হইতো। তার উপর, বাদশা নামদার যখন তখন নাখোশ হইয়া যা ইচ্ছা করতে পারে।

আচ্ছা, বাদশা কেনু 'নামদার'? এর মানেটা কি?

শুভেচ্ছা হাসি

সত্যপীর এর ছবি

নামদার মানে বিখ্যাত। বাদশা নামদার অর্থাৎ বিখ্যাত বাদশা। আমির নামদার মানে বিখ্যাত শাসক। শায়েরানে নামদার মানে বিখ্যাত কবি। মেঘলা মানুষ নামদার মানে বিখ্যাত মেঘলা মানুষ। এই হইল ঘটনা।

..................................................................
#Banshibir.

মন মাঝি এর ছবি

পীর নামদার মানে সত্যপীর।

****************************************

সত্যপীর এর ছবি

..................................................................
#Banshibir.

মেঘলা মানুষ এর ছবি

ভেবেছিলাম চুপচাপ থাকবো, সেটা আর হলো কই? "নামদার" মানুষ

মন মাঝি এর ছবি

****************************************

মন মাঝি এর ছবি

via GIPHY

****************************************

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

'খুদাপেজ' মানে কি 'চলবে' না কি? ইয়ে, মানে...

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সত্যপীর এর ছবি

খুদাপেজ মানে চলবে না। ফুলিশটপ।

মারাঠা রাজস্ব চৌথ সরদেশমুখী হাবিজাবি নিয়া লেখা নামামু কিনা ভাবতেছি। শুক্কুরবার বিরিয়ানি খাওয়ান ভাইবা দেখি।

..................................................................
#Banshibir.

স্পর্শ এর ছবি

অনেক কিছু জানলাম।

এইবার একটা বাংলার গেইম অফ থ্রোনস। মানে সিংহাসনের খেলা নামিয়ে ফেলেন।


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

সত্যপীর এর ছবি

লিচ্চয়। মারাঠা সিংহাসনের খেলা। পাহাড়ের ইঁদুর শিবাজীর পুলা শম্ভুজীর উপর হু লেট দ্য ডগ আউট? হু হু হু? তদুপরি শম্ভুর পুলা শাহুজি কেন মোগল জামাই আদরে? বাহাদুর শা তারে রিলিজ করায় শম্ভুর ভাবীজান তারাবাঈ লবেজান। চৌথ পাইব ক্যাডা আর সরদেশমুখীর অধিকার কার, জিগান বাদশা ফররুখশিয়ারের পাপেটিয়ার সৈয়দ ব্রাদার্স ইউনিয়নরে।

লেখা আসতেছে। শুক্কুরবার বিরিয়ানি রেডি করেন।

..................................................................
#Banshibir.

আলতাইর এর ছবি

ইয়ে মানে।।। ছুটূবেলা থিকাই আমি অংকে এট্টু দুব্বল। তিন চাইর বার পড়তে হইছে। যা ঝামেলা দেখলাম, এর থিকা মনসবদারের এলাকায় ডকাতি করা আরো সহজ। ট্যক্সটুক্সের ঝামেলা নাই। যা বুঝতেছি ওই আমলেও মন্ত্রীসভায় মালের অভাব ছিলো না।

অফটপিকে যাই। ভাইদের সাথে গিয়াঞ্জাম সংক্রান্ত নীতিমালা নাকি স্বয়ং তৈমুর এর জারি করা? রাদারফোর্ডের বইতে এইরাম কি একটাই জানি পাইছিলাম। এবং মুঘল বংশে সেই নীতির প্রথম লঙ্ঘনকারী নাকি প্রেমিক প্রুষ শাজাহান সাহেব? কথা কি সইত্য?

সত্যপীর এর ছবি

(রাদার্ফোর্ড পড়িনাই)। তিমুরিদ বংশে ভাইসংক্রান্ত কোন নীতিমালা দেখিনাই কোথাও।

আকবরের খুনখারাবি করার মত গুরুত্বপূর্ণ কোন ভাই ছিলনা। জাহাঙ্গীরের মাতাল চাতাল ভাইগুলান ছিল তার চাইতেও বড় বয়তল। তাই তাদের ভাই খুন করা হয়নাই। জাহাঙ্গীর তার নিজের পুলার চক্ষু উৎপাটন করাইছেন গদির দাবীজনিত কারণে, সুতরাং ভাইদের ছাইড়া দেওয়ার তার কোন কারণ নাই। দারা পুত্র পরিবার তুমি কার্কেতুমার।

(আকবরের সমসাময়িক সময়ে ওসমানি সুলতান তিন নম্বর মাহমুদ গদিতে উইঠা তার উনিশ ভাইদের হত্যা করেন: এই খবরে মহামতি আকবর ব্যাপক ছ্যা ছ্যা করেন এবং বলেন ই কি ইৎরামী ইত্যাদি। তার নিজের উনিশ ভাই থাকলে তিনি তাদের সাথে টেরম টেরম যুদ্ধে যাইতেন কিনা তা আমাদের আর জানার উপায় নাই)

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

যতদূর জানি, তৈমুরিদ বংশে উত্তরাধিকারের কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না; সম্রাটের পুত্রদের মধ্যে যে সবচেয়ে শক্তিশালী, সে ক্ষমতা দখল করত। ১৭শ শতক পর্যন্ত ওসমানিয়া সুলতানেরাও এই নীতি মেনে চলত। তবে সম্রাট ১ম আহমদ থেকে এই নীতির পরিবর্তন শুরু হয়; পিতা-থেকে-পুত্রের উত্তরাধিকারের বদলে পুত্ররা নিজেদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সিংহাসনে বসতে শুরু করে। বর্তমান সৌদি রাজবংশেও এই নীতি প্রচলিত।

শাহজাদা খুররম কিন্তু নিজের কোন ভাইকে জীবিত রাখেন নাই। খসরুর চোখ অন্ধ করা হয় জাহাঙ্গীরের নির্দেশে; কিন্তু খসরু (এবং জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠতম পুত্র শাহরিয়ার, এবং খুররমের প্রায় সব ভাতিজা)-কে শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয় খুররমের নির্দেশেই।

Emran

আলতাইর  এর ছবি

তাও বটে...
এক বাবা খুররম বাদে আর জাহাঙ্গীর এর আর কুনো পোলার কুনো এচিভমেন্ট ই নাই। আমার বাপ হইলে ডেইলি কানমলা দিতো। অবশ্য নুরজাহান বেগম এর মতো হারেম পলিটিশিয়ান থাকলে এম্নিতেই পুলাপাইন এর কিছু করার থাকে না। উদাহরণ : রাহুল গান্ধী!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA