যমুনা অথবা সালসাবিলের তীরে

সত্যপীর এর ছবি
লিখেছেন সত্যপীর (তারিখ: সোম, ২৮/০১/২০১৯ - ১২:০৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব

মনে করেন পরকালের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্নিগ্ধ সালসাবিল ঝর্ণার তীরে গাছের ছায়ায় মাদুর পেতে দাদু-নাতি বাবুর আকবর বসে। কাছেই শুয়ে টাল বাদশা হুমায়ুন। পোড়া ভুট্টা খেতে খেতে ধীরকণ্ঠে পিতামহ বাবুর বলছেন, নাতিরে, বহোৎখুব। তিমুরিদ বংশের নাম উজ্জ্বল করেছিস রে বেটা। এমনকি ঘাড়ত্যাড়া রাজপুতগুলোকেও বশ করতে পেরেছিলি শুনলাম। উত্তম, অতি উত্তম। আকবর তখন বলবেন, হাঁ দাদুভাই। গুজরাতের বন্দর দরকারি জিনিস তাই রাজপুতানা কব্জা করে নিলাম। কেবল সিসোদিয়ার বাচ্চা প্রতাপ বড় যন্ত্রণা দিয়েছে।

গম্ভীর মুখে বাবুর বলবেন, সিসোদিয়ারা বেঈমান। প্রতাপের দাদা সংগ্রাম দিল্লীর গদি লোদিমুক্ত করার জন্য আমাকে কাবুলে খবর ভেজে পরে বিলকুল কথা পাল্টে ফেলে। বেঈমান কাঁহিকা।

এমন সময় পাশে ঘাসে শুয়ে থাকা হুমায়ূন ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠে বলবেন আব্বা আব্বাগো। ওদের রাণী কর্ণবতী দূর বাংলায় আমাকে রাখি পাঠিয়েছিল কিন্তুক আমি তো সেই বইনের জন্য কিছুই করতে পারলাম না গো আব্বা। ভেউ ভেউ…

আধপোড়া ভুট্টা নিয়ে এই জমজমাট আলোচনায় অংশ নেবার আগে পাঠক আপনাকে জানতে হবে, হোয়াট ইজ সিসোদিয়া।

আপাতত ঝর্ণা থেকে সরে সিএঞ্জি চেপে চলুন স্বর্গের যমুনা নদীর তীরে। সেইখানে বেঞ্চিতে বসে শিকারি মাসের ঝোলে ডুবিয়ে কচুরি চাবাচ্ছেন আরেক দাদু-নাতি মহারানা সংগ্রাম এবং মহারানা প্রতাপ। নিবাস রাজপুতানার মেওয়াড়, বংশ সিসোদিয়া। রানা অর্থাৎ রাজা। রাণী পুং। হেথায় আগলস কচুরি চাবাতে চাবাতে প্রশ্ন করুন হে মহারানা সিনিয়র। সালসাবিলের তীরে জহিরুদ্দিন বাবুর বলতেছেন আপনি কাবুলে লোক পাঠিয়ে বলেছিলেন ল যাইগা। কিন্তু পরে আর যান নাই। ঘটনা কি সত্য?

রানা সংগ্রাম সিংহ বিরক্ত হয়ে কইবেন বাবুর,হু দিস? আমি সংগ্রাম সিংহ। গুজরাত মালওয়ার সুলতানেরা তখন এমনিই আমার প্রায় বশীভূত, ইব্রাহীম লোদিকে ছাগলের লাদি বানাতে আমার বৈদেশি সাহায্যের প্রয়োজন কবে থেকে রে ময়না? বরঞ্চ তোর তৈমুরি বংশধর বাবুরই লোক পাঠায় আমার কাছে সাহায্য চেয়ে।

তাহলে, আপনি ভাবলেন, বাবুর যে বললেন মহারানা সংগ্রাম সিং বেঈমান? একটু ঘুঁটে দেখতে হচ্ছে। আপনি একটু সরে গিয়ে অদূরে আমগাছের ছায়ায় বাবুরকে মুবাইলে কল দিয়ে সমস্ত খুলে বলুন। বাদশা বাহাদুর, রানা সংগ্রাম সিং বলতেছেন ফেইক নিউজ। আপনিই নাকি কাবুল থেকে তার কাছে লোক পাঠায় সাহায্য চেয়েছিলেন।

অসহিষ্ণু বাবুর গলা চড়িয়ে কইবেন কক্ষনো নয় অর্থাৎ কাভি নেহি। বেঈমান সিসোদিয়া আজ ভুলে গেছে সে-ই সাহায্য চেয়ে লোক পাঠিয়েছিল কাবুলে। আমার পরিষ্কার মনে আছে একফালি তরমুজ খেতে খেতে আমি রাজপুত দূতকে বলে পাঠাই রানা সংগ্রাম যেন আগ্রা হামলা করে আর আমি দিল্লী কব্জা করব। আমি ঠিকই পানিপতে লোদিকে পরাজিত করে দিল্লীকা লাড্ডু ছিনিয়ে নেই কিন্তু রানা সংগ্রাম ফোরোফোর নট ফাউন্ড। কাপুরুষ। কথার খিলাফকারী। ডরপুক। মুখের জবানের দাম নাই দুই পইসা! দুই পইসা!!

বাবুরকে স্পিকারফোনে দিবেননা যেন, এই দুই পইসা দুই পইসা মহারানা সংগ্রাম সিং কিম্বা তার মাথা গরম নাতি প্রতাপ শুনলে খাণ্ডা তলোয়ার দিয়ে মুবাইল দুই টুকরা করে ফেলতে পারে। ধীরে। দুইজনের ভাষ্য তো শুনলাম, এখন ভূ-রাজনীতি কিঞ্চিৎ বুঝার চেষ্টা করি যাতে করে বিষয়টা আরেকটু ঘোলা হয়।

এস্থলে মানসিক ভূগোল শিক্ষা। চোখ বন্ধ করে (আসলে চোখ খুলে, নইলে লেখা পড়া মুস্কিল) ভারতের মানচিত্র কল্পনা করুন। রাজপুতানা বা রাজস্থান যদি আপনার কেন্দ্র হয়, তবে কাবুল আপনার মাথার উপরে বাঁয়ে। ইলেভেন ও’ ক্লক। পাঞ্জাবের লাহোর সরাসরি মাথার উপর, টুয়েলভ ও’ ক্লক। দিল্লী কোনাকুনি ডাইনে, ওয়ান ও’ ক্লক। আগ্রা সরাসরি ডাইনে থ্রি ও’ ক্লক। ঠিকাছে? ঠিকাছে। সুতরাং বাবুরের বিবিধ খুঁটি কাবুল-লাহোর-দিল্লী-আগ্রা এলাকা রাজস্থান উপরদিকে ঘেরাও করে আছে। চারিদিকে শত্রুজ।

অন্যান্য দিক কে ঘেরাও করে আছে? বাবুর আসার সময় দিয়ে গুজরাতের সুলতান (এইট ও’ ক্লক) এবং মালওয়ার সুলতান (ফোর থার্টি) রাজপুতদের সাথে গিয়াঞ্জামে মত্ত ছিল, তদুপরি দিল্লীর সুলতান লোদি তো ছিলই। এই তিন সুলতানের সাথে খুচরা মারপিটে ব্যস্ত থাকার সময় বাবুরের ভাষ্যমতে রানা সংগ্রাম সিং কাবুলে খবর পাঠান আর রানা সংগ্রামের ভাষ্যমতে বাবুর তার কাছে চিতোরগড়ে সাহায্য চেয়ে পাঠান।

কোন তথ্য সঠিক সে প্রশ্ন অবান্তর। মোঙ্গলিয়া/ চীন/ মধ্য এশিয়ার মঙ্গল জাতি তাদের তিনশ বছরের ইতিহাসে কখনো ভারত “দখল” করতে আসেনি, কেবল ছুটকাছাটকা আক্রমণ করে লুট নিয়ে চলে গেছে। রানা সংগ্রামের হয়তো ধারণা ছিল এই উজবেক বাবুর তার পূর্বপুরুষ আমীর তৈমুরের মতন লুট নিয়ে ভেগে যাবে, এখানে থানা গাড়বে না। সেই ফাঁকে লোদি মারামারি করে দুর্বল হয়ে পড়বে আর তিনি সেখানে ছড়ি ঘুরাবেন।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। থিঙ্ক ওয়ান হ্যাপেন্স এনাদার। লোদি যখন পানিপতে হেরে গেলেন আর বাবুর সমস্ত লুট করে কাবুলপানে ফিরে যাবার তেমন কথা পাড়লেন না, রানা সংগ্রাম তখন বাবুরের বিরুদ্ধে খাণ্ডা তলোয়ার ধরলেন। রানার নেতৃত্বে বিবিধ রাজপুত রাজা, মাহমুদ লোদি (প্রয়াত ইব্রাহীম লোদির ভাই) ইত্যাদি লোকজন যুদ্ধের আঞ্জাম করে। কিন্তু বাবুর ছিলেন এক মস্ত জেনারেল, রানা সংগ্রাম সিংহ যত বড় বীরই হোন না কেন বাবুরের কৌশল ও অভিজ্ঞতার কাছে তাকে আটকে যেতে হয়। লোদি পানিপতে যেসব কারণে ধরা খেয়েছিলেন (দুর্বল ঘোড়সওয়ার দল, কামানের অভাব এবং কামানের বিপক্ষে লড়বার অনভিজ্ঞতা, কৌশলের বদলে গায়ের জোরে জেতার চেষ্টা করা) সেই একই সব কারণে রাজপুত কোয়ালিশন ফোর্সও বাবুরের কাছে মার খেয়ে যায়। খানওয়ার যুদ্ধ, ১৫২৭ সাল।

এর এক বছর পর রানা সংগ্রাম সিং এবং তিন বছর পর বাদশা বাবুর ইন্নালিল্লা করেন। গদিতে আসেন যথাক্রমে রতন সিং আর হুমায়ুন। এইখানে ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত জটিল, আমরা সংক্ষেপে সারব কেননা যেহেতু ব্যাটল অফ দাদুজ বাবুর বনাম সংগ্রাম সমাপ্ত, আমাদের দ্রুত ব্যাটল অফ নাতিজ এ যেতে হবে। আকবর বনাম প্রতাপ। তার আগে পটভূমি বিশ্লেষণ।

গুজরাতের কথা মনে আছে, এইট ও' ক্লক? সেইখানের সুলতান ছিলেন জনৈক বাহাদুর শা। এই বাহাদুর শা কে ১৫৩৭ এ নিজেদের জাহাজে আমন্ত্রণ জানিয়ে পিটিয়ে মারে তৎকালীন পর্তুগীজ ভাইসরয়, এ নিয়ে আকবরনামায় বিখ্যাত একটা ছবিও আছে। যাক সে ভিন্ন গল্প। বাহাদুর শা সিসোদিয়ার পুরাতন শত্রু, ১৫৩৫ এ মেওয়াড়ের রাজধানী চিতোরগড় দূর্গ তিনি আক্রমণ করেন। দূর্গে তখন দাদি অর্থাৎ রানা সংগ্রামের বউ রাণী কর্ণবতী। সিসোদিয়ার ক্ষমতা তখন কিঞ্চিৎ দুব্বল, তিনি বাকি হিন্দু রাজপুত রাজাদের এবং মুসলমান বাদশা হুমায়ুনের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। রাখিবন্ধন। হুমায়ুনের সাথে বাহাদুর শা এর তখন গিয়াঞ্জাম চলছে, দূর বাংলায় শের শা সুরির সাথে ফাইটিং করছিলেন তখন হুমায়ুন। রাখি পেয়ে হুমায়ুন কইলেন বইনডি। ডিয়ার সিছটার। আমি আইসছি। তবে যে কোন কারণেই হোক তিনি সময়মত আসতে পারেননি, চিতোর পতনের সময় তিনি গোয়ালিয়রের কাছে (টু-থার্টি)। রাজপুত নারীরা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করত দূর্গ পতন ঘটলে, হুমায়ুন বা আর কেউ সাহায্যে আসেনি তাই বাহাদুর শা দূর্গ দখলে নিয়ে নেন আর রাণী কর্ণবতী বিষ খেয়ে যান মরে।

এস্থলে পাঠক হুমায়ুনকে একখান টেক্সট মেসেজ করেন। বলেন হে হুমায়ুন, সত্যপীর বলতেছে রাণী কর্ণবতীর রাখি পাওয়ার পর দূর্গ পতনের সুমায় আপনি গোয়ালিয়র তক আসছিলেন। টু থার্টি। একথা কি সত্য যে আপনি আসার সুমায় পাননাই আর দেরি হয়ে গেছিল, নাকি শেষ মুহুর্তে কেউ কানপড়া দিছিল যে কাফির নারীর সাহায্যে অপর মুসলমান সুলতানের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরতে নাই?

আচ্ছা না থাক এই টেক্সট পাঠানোর কাজ নাই। সে টাল হয়ে ঝর্ণার তীরে আপনমনে শুয়ে আছে থাক। খুঁচায় কাজ নাই। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদানা চাবাতে ভালোবাসে। বাদ দেন। অন্য কথা পাড়ি।

১৫৪০, ১৫৪২, ১৫৫০। দশ বছরের ব্যবধানে এই তিন সালে উপমহাদেশে তিনটে বাচ্চা জন্ম নেয়। বড় হয়ে এরা হবে যথাক্রমে মহারানা প্রতাপ, বাদশা আকবর, রাজা মান সিংহ। রাজপুত, মোগল, রাজপুত। সিসোদিয়া, তিমুরিদ, কাছওয়া। মেওয়াড়, আগ্রা, জয়পুর। টেরম, টেরম, যুদ্ধ।

ফাস্ট ফরোয়ার্ড আকবরের আমল। তিনি রাজস্থান দখলকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিলেন। আগ্রা হতে গুজরাত বন্দর এলাকা (কিম্বা মালওয়া হয়ে দাক্ষিণাত্যের পথ) প্রয়োজনীয় বাণিজ্য ও যুদ্ধপথ, এছাড়া সামগ্রীকভাবে আস্ত দেশটা কব্জা করার অংশ হিসাবে রাজস্থান দখল ছিল জরুরি। আকবর রাজপুতানা দখলের নীতি ছিল সহজ ও কার্যকরীঃ বউ দে মনসব নে নইলে যুদ্ধ। বদেমনেনযু। তিনি বিভিন্ন রাজপুত রাজাদের খবর পাঠালেন হে রাজপুত, বদেমনেনযু। প্রায় সকলেই মেয়ে/বোনকে বউ করে দিল আর মনসব নিল। ভগবন্ত দাস নামে কাছওয়া রাজা আকবরকে তার বোনকে দিলেন বউ হিসাবে। মনসব নিলেন পাঁচ হাজার জাট। তার ছেলে মান সিংহও মনসব পেলেন। যুদ্ধ হলনা। এইরকম আরো বেশ কিছু রাজপুত রাজারা বদেমনেনযু মেনে নিলেন।

সিসোদিয়ারা মানেনি। তাদের কথা হল আমাদের হিঁদুবাড়ির কন্যা মোছলমানের হেরেমে ঢুকবে কাভি নেহি। বউ দিবনা মনসবের পুটুমারি যুদ্ধ হৌক। বদিমপুযুহৌ।এই বদেমনেনযু বনাম বদিমপুযুহৌ এর মধ্যে আকবর মেওয়াড়ের রাজধানী চিতোর দখলে গেলেন। ১৫৬৭ সাল, মহারানা প্রতাপ গদিতে বসার পাঁচ বছর আগের ঘটনা। কঠিন দূর্গ চিতোর, মাস চারেক আকবরের কামানের মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ চলে আর সাথে অবরোধ। সিসোদিয়ারা শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিল কিন্তু শেষতক ১৫৬৮ এর ফেব্রুয়ারিতে দূর্গের পতন ঘটে। সকল নারী প্রথা অনুযায়ী বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। দূর্গের হাজার তিরিশ বেসামরিক লোকের কল্লা নামিয়ে দেয়া হয় আকবরের আদেশে। শত্রুর মাথা দিয়ে দূর দূর পর্যন্ত বিজয় মিনার খাড়া করিয়ে দেয়া হয়। বদিমপুযুহৌ এর মায়েরে খালা। চিতোরকে মোগল সরকারি প্রদেশ বানিয়ে আকবর আগ্রা ফিরে গেলেন।

প্রচুর তত্ত্বের পকপক হল। এবার যমুনার তীরে মালপোয়ার দোকানের সামনে বসে থাকা মহারানা প্রতাপের কাছে ফিরে যাওয়া যাক। মুন্নি সাহা টাইপ প্রশ্ন করুন তাকে, হে মহারানা। আপনি যখন ১৫৭২ সালে গদিতে বসেন তখন চিতোর, মান্দালগড়সহ আপনার বাপদাদার বড় বড় দূর্গ মোগলের হাতে। তদুপরি মেওয়াড় তিনদিক থেকে মোগল অথবা মোগলের বশ রাজপুতের এলাকা দিয়ে ঘেরা। এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি?

মালপোয়া মুখে দিয়ে ধীরকণ্ঠে মহারানা প্রতাপ বলবেন, হে পাঠক। জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয়। নো বেড অফ রোজেস। এক মারওয়াড়ের রাও চন্দ্রসেন ছাড়া বাকি সবাই তখন আকবরের পাজামায় চুমা খাচ্ছে। রাজপুতানার আকাশে ঘনঘটা। অম্বর, বিকানের, জয়সলমীর সমস্তই মোগলের বশ। এমনকি আমার পরিবারেও একই অবস্থা। সৎ তথাপি অসৎ ভ্রাতা জগমল আকবরের তনখা টানে, ছি ছি।

আপনিও মাথা দুলিয়ে স্বীকার যাবেন ছি ছি তো বটেই।

হাঁ, অবশ্যই ছি ছি। জাহাজপুরে তার জায়গীর ছিল, মোগল নৌকর শালা হারামী। আমার অন্যান্য ভ্রাতা সাগর আর শক্তি সিং এরাও একেকটা বয়তল। তারাও মোগলের পাছা চাটত। ওইযে চন্দ্রসেন রাঠোর দাঁড়িয়ে লস্যি খাচ্ছে, হলদে পাগড়ি, বাম থেকে দ্বিতীয়, তার দুষ্ট ভ্রাতাদ্বয় রাম আর উদয়ও মোগল নৌকর ছিল। লজ্জা।

আপনি তাকিয়ে দেখবেন অদূরে দাঁড়িয়ে কতিপয় রাজপুত, তাদেরই একজন রাও চন্দ্রসেন রাঠোর। এই ভদ্রলোকও আকবরকে দৌড়ের উপর রেখেছিলেন। আপনি ভাববেন আচ্ছা উনার সাথে একটু কথা বলা যাক, কিন্তু এমন সময় আপনার মুবাইল ফোন বেজে উঠবে। বাদশা আকবর লম্বা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছেনঃ "যমুনার তীরে আমার ফারযান্দ মান সিংহ তোমাকে দেখেছে বলল। মহারানা প্রতাপ একটি গোঁয়ার, চামার ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তুমি আসার পথে মান সিংহের সাথে দেখা করে এসো, সে তোমাকে সঠিক তথ্য দিবে। ইতি পাদশায়ে গাজী, জালালুদ্দিন আকবর।”

বেশ বেশ। ফারযান্দ মান সিংহ। ফারযান্দ অর্থাৎ পুত্রসম। বাংলায় মান সিং ঈসা খাঁ সায়েবের সাথে মারামারি করে তলোয়ার ভেঙে ফেলেছিলেন মনে আছে না? তার পর মহানুভবতা আলিঙ্গন ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সেই মান সিংহ। জাতে কাছওয়া রাজপুত। নিবাস অম্বর বা জয়পুর। জয়পুর গেছেন না? দিল্লীর কাছেই। দিল্লী থেকে মেওয়াড় যেতে হলে জয়পুর হয়ে যেতে হয়। মোগল আমলে সূত্র ছিল যে রাজপুত রাজ্য দিল্লীর যত কাছে তারা তত দ্রুত মোগলের বশ। তাদের মেয়েরা তত দ্রুত মোগলের শয্যাশায়ী। তাদের পুরুষেরা তত দ্রুত মোগলের পিয়ারা মনসবদার। তাদের খাবারে তত দ্রুত পুলাউ কিসমিসের আগমন। দূরত্ব একটা বিষয় বটে। পড়িলে মোগলের হাতে। মারা খেতে হবে সাথে।

কাছওয়া রাজা মান সিংহ বদেমনেনযু মেনে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আকবরের এলিট টীম নবরত্নের অংশ। সিসোদিয়া রাজা প্রতাপ মানেননি, তিনি ছিলেন বদিমপুযুহৌ ঘরাণা। তাই দুষ্ট মহারানা প্রতাপ সিংহের সাথে ভালো রাজা মান সিংহকে লড়াই করতে পাঠিয়েছিলেন কুটিল আকবর। মির্চ কে বদলা মির্চ। রাজপুত জেনারেল বনাম রাজপুত জেনারেল। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। কাঁটে কাঁট্যং।

কিন্তু খাড়ান পাঠক। তিষ্ঠান। কাছওয়াপাড়ায় মান সিংহের সাক্ষাৎকার একসময় হবেনে। লাইনে থাকেন। আপাতত রানা প্রতাপের সাথে গপে ফিরে যান বরং। জিজ্ঞাসা করেন হে মহারানা। কিন্তু তারপর?

হাঁ। তারপর। বেঈমান বুরবক এই রাজপুত জাতি। কোথাকার বহিরাগত মোসলমান রাজা এসে আমাদের মেয়েদের জাত মেরে দিচ্ছে আর দেশ দখল করে নিচ্ছে, সেইদিকে নজর না রেখে নিজের স্বার্থ দেখল সব। কারো একটা মাথায় বুদ্ধি নাই আর কলিজায় তাগৎ নাই! চশমখোর রাজা ভগবন্ত দাস, তার ছেলে মান সিংহ আর আরেক রাজপুত উল্লুক টোডর মল এসেছিল আকবরের হয়ে আমার কাছে। ১৫৭৩/৭৪ এর কথা। আমি সাফ কয়ে দিলাম আমার বংশের মেয়ে হেরেমে দিব না, আর সত্যই শান্তি চাইলে আমার রাজধানী চিতোরগড় ফিরিয়ে দাউ। কিন্তু আকবর একজন ধূর্ত, কুটিল, মাগিবাজ এবং ভণ্ড। সে আমাকে দূত মারফত কইল চিতোরগড় দিবনা তবে একটা খিলাত দিতেছি। সম্মানসূচক জামা। সাথে মনসব। আসবি? আমি উত্তর দিলাম খিলাত মনসবের মায়েরে #%!* শালা। ফোট!

উত্তেজিত রানা প্রতাপকে একগ্লাস লস্যি বাড়িয়ে দিন। শান্ত হবার সময় দিন একটি মিনিট। আর প্রশ্ন করুন, শুনেছি এরপর হলদেঘাটে ব্যাপক যুদ্ধ হয় আপনার সাথে আকবরের সিপাইদের? তাদের জেনারেল ছিলেন মান সিংহ? সেই যুদ্ধের ব্যাপারে আপনার অনুভূতি?

আচমকা আপনাকে আশ্চর্য করে দিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে মহারানা প্রতাপ কইবেন, হলদেঘাট। হায় চেতক! হায় চেতক!! হায় মহান সাহসী মান সিং ঝালা। হায়!

চেতক? মান সিং ঝালা? হাঁ পাঠক, ঘটনা গভীর। মরার আগে রানা প্রতাপ কি মোগলের সাথে সন্ধি করেছিলেন? আকবরের পরবর্তী বাদশা আমলে বদেমনেনযু বদিমপুযুহৌ কেমন চলেছিল? আওরঙ্গজেব বাদশা নাকি রাজপুতদের দুই চক্ষে দেখতে পারতেন না, কিন্তু কেন মাগার কিঁউ?

সকলই জানতে হলে চোখ রাখুন সচলায়তনে। মোগল রাজপুত কামড়াকামড়ি বিস্তারিত আসিতেছে। ব্যান্ডার্স্ন্যাচ স্টাইলে আপনিও এখন ঠিক করতে পারেন এই সিরিজের ভবিষ্যত। নিচে ভোট দিন পরের পর্বে কি চাই জানিয়ে, ভোটে যে বিষয় জয়যুক্ত হবে পরের পর্বে আপনাদের খিদমতগার সত্যপীর তা-ই নিয়ে হাজির হবে।

বলেন মাশাল্লা!

ভোটঃ

অলঙ্করণ কৃতজ্ঞতাঃ হিমু ভাই
কৈফিয়তঃ ৯৫% লেখা মোবাইল ফোনে। বানান ভুল ধরিয়ে দিন!


মন্তব্য

হিমু এর ছবি
সত্যপীর এর ছবি

মূল পোস্টে যোগ করতে পারি বস?

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

আলবাৎ।

এই কোডখান এস্তেমাল করলে ছবিটা সবসময় পোস্টের প্রস্থের সমান থাকবে। মানে নীড়পাতায় দেখাবে নীড়পাতার সমান চওড়া, আবার পোস্ট খুললে পোস্টের সমান চওড়া।

সত্যপীর এর ছবি

ও বুঝছি।

..................................................................
#Banshibir.

এক লহমা এর ছবি

আমি চাইঃ একটা কিছু হইলেই হইল কেননা সত্যপীর রকছ। দেঁতো হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সত্যপীর এর ছবি

আপাততঃ উনিশখান ভুট পড়ছে, ৮৯.৫% কইছেন আমি রকছ। সাব্বাস, আমার কাজ সহজ হয়া গেছে কৈতারেন।

আরও হপ্তাখানেক পর ভুট বন্ধ কইরে পরের পর্বে হাত দিমু। আপাতত ঠেস দিয়া বাতাস খাইতেছি।

... ... ...
৩১/১/২০১৯ আপডেটঃ চুয়াল্লিশখান মন্তব্য পড়ছে। চৌতিরিশ কইছেন আমি রকছ যা দিমু তাই। সামনের সপ্তায় চানাচুর ভাজা নিয়া পরের পর্বে হাত দিতেছি, কিঞ্চিৎ আকবর-প্রতাপ তারপর ফাস্ট ফরোয়ার্ড আওরঙ্গজেব। বলেন মাশাল্লা।

..................................................................
#Banshibir.

নীড় সন্ধানী এর ছবি

কৈফিয়তঃ ৯৫% লেখা মোবাইল ফোনে। বানান ভুল ধরিয়ে দিন!

সত্যপীরের লেখার স্টাইলে বানান ভুল ধরা ঠিক হবে না। শুধু পানিপতকে পানিপথ করে দিতে পারেন, স্কুল বয়স থেকে পানিপথ দেখে অভ্যস্ত আমরা বাঙালী।

একবার পড়লাম। ফিরে এসে আরেকবার পড়া লাগবে মনে হচ্ছে। হাসি

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

সত্যপীর এর ছবি

ভালোমত পইড়া সমস্ত বইলা যান। লুঙ্গিতে গিঁট দিয়া বসলাম।

আমি পানিপতই লিখি, বিবিধ ডকুমেন্টারিতে স্থানীয় লোকজন যখন পানিপত উচ্চারণ করে আমি খেয়াল করলে শুনি তারা বলতেছে "পা-নিপৎ", অর্থাৎ পা আর নি এর মধ্যে ছোট বিরতি তারপর একশ্বাসে "পৎ"। পথ উচ্চারণ শুনিনা, তারা পথ বুঝায়ও নাই ধারণা করি। পানিপতই রেখে দিলাম আপাতত বস।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পাণ্ডবপ্রস্থ > পানাপ্রস্থ > পানিপত। হরিয়ানভী উচ্চারণে 'পাহ্‌নীপহ্‌ত্‌'।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তারেক অণু এর ছবি

গত ২ দিন ধরে শের শাহের উপর পড়তেছি, সামনে গ্রান্ড টাঙ্ক রোডের কিছু অংশে হাঁটুমও, অনুরোধ থাকল শের শাহের উপরে লেখার জন্য, প্লাস হুমায়নী কূটকচালি।

সত্যপীর এর ছবি

রাজপুত শেষ করে (দুই বা তিন পর্ব হবে এইটা) মারাঠা ধরব ভাবছিলাম। আফগান মালের মেটেরিয়াল কম। তবে অনুরোধের আসরে তারেকাণুর রিকুয়েষ্ট রাখা হৈল, শের শাহের ঘোড়ার ডাক ইত্যাদি লিচ্চয় আনব বস।

..................................................................
#Banshibir.

তারেক অণু এর ছবি

অপেক্ষায় !

সত্যপীর এর ছবি

শের শাহঘটিত ছবি পুস্ট দিবেন তো? শুঞ্ছি বড়ভাই নাকি শাহ রাহে আজম তথা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড পুনঃতৈয়ার করার সাথে সাথে রাস্তাঘাটে মস্তানি রাহাজানি কমায় আনছিলেন আর শুল্ক নিয়া দুই নম্বরি থামাইছিলেন। শের শাহের আগে নাকি মাঠে ঘাটে শুল্ক আদায় হইত, আর বড়ভাই হুকুম দেন শুল্ক কর ইত্যাদি আদায় করা হবে কেবল সীমান্তে আর বাজারে বিক্রয়ের সুমায়। মাঠেঘাটে নয়। সত্য হইলে খুবই উত্তম কাজ করছিলেন কিন্তু।

যা যা জানেন ছবিসহ পুস্ট দেন।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

যথাস্থানের ও যথাকালের একখানা মানচিত্র সংযুক্ত করুন। বেয়ারিং দিয়ে রেফারেন্স পয়েন্ট থেকে বাকি পয়েন্ট নির্দেশ করাটা পরীক্ষিত ভালো পদ্ধতি। তাতে কেউ ঐ জায়গাগুলোর নাম জীবনে প্রথম বার শুনলেও আপেক্ষিক অবস্থানগুলো বুঝতে পারেন। তবে ইতিহাসটা ঠিকঠাক বোঝার জন্য যথাকালের মানচিত্রটা জরুরী। ঢাকা থেকে দুইটা বাজে শিলচর আর তিনটা বাজে আগরতলা বললে ঢাকার সাপেক্ষে শিলচর কোনদিকে আর আগরতলা কোনদিকে (θ) বোঝা গেলো, কিন্তু কোনটা কতটুকু দূর (r) সেটা বোঝা গেলো না। তাহলে সিলেটী আর ত্রিপুরীদের মধ্যে কারা ঢাকার জন্য বেশি থ্রেট সেটা বোঝা যাবে না। তাছাড়া কয়টা নদী পাড়ি দিতে হবে, পথিমধ্যে পাহাড়-জঙ্গল-মরুভূমি পড়ছে কিনা সেসবও জানা থাকতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সত্যপীর এর ছবি

মানচিত্র দেওয়া যাইত, তবে মানসিক ভূগোল শিক্ষায় কাজ হয় কিনা টেশ করে দেখলাম। চারিদিকে শত্রুজ এইটা বুঝলেই চলব।

পরের পর্বে দেখি মানচিত্রসুদ্ধাই মানসিক ভূগোল শিক্ষা দিব আপনের থিটা গামা পদ্ধতিতে।

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

কতোগুলো পাইকারি মোগল, রাজপুত, মারাঠা, পাঠান চরিত্র আঁকা গেলে ভালো হতো। পোস্টের শুরুতেই মর্টাল কম্ব‍্যাটের মতো অমুক বনাম তমুক করে মুখোমুখি বসিয়ে প্রচ্ছদ বানানো যেতো।

সত্যপীর এর ছবি

ভালো বুদ্ধি। এইটা বানাইলাম বইসা বইসা।

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি
সত্যপীর এর ছবি

ভোটগ্রহণ সমাপৎ। পরের পর্বে কিঞ্চিৎ আকবর হয়ে পিয়ারা আওরঙ্গজেবের আমলে রাজপুতানা...

..................................................................
#Banshibir.

আয়নামতি এর ছবি

বরাবরের মতোই দারুণ সুখপাঠ্য লেখা। ভুট দিতারলামনা এট্টুর জন্ন...তবে বিজয়ী দলেই আছি দেঁতো হাসি

ইশশ সঞ্জয়বনশালী ভাই রানা রতন সিংহ, সুলতাল আলাউদ্দিন খিলজি আর পদ্মাবতী নিয়ে ইরাম ছবি বানাইলেন, আর আপনি তাগের তেমুন বেইল দিলেন না! কেনু, কেনু

হলদিঘাট যুদ্ধের পকৃত বিজয়ী কেডায় সেই রহস্য জানতে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতেছি।

সত্যপীর এর ছবি

রানা রতন সিং নাকি রাওয়াল রতন সিং? সঞ্জয়বনশালি দেখি নাইক্কা, তবে রতন সিং সায়েবের টাইটেল রানা হওয়ার কথা না।

সে যাউক, রাওয়াল রতন গুহিলা গোত্র, সিসোদিয়া না। মহারানা সংগ্রাম আর প্রতাপ ছিলেন সিসোদিয়া। সূত্র হইলঃ সকল সিসোদিয়াই গুহিলা কিন্তু সকল গুহিলা সিসোদিয়া নয়। সুতরাং মহারানা প্রতাপ সিসোদিয়া ইজিকোল্টু গুহিলা, কিন্তু রাওয়াল রতন গুহিলা নটিকোল্টু সিসোদিয়া। বুঝতে হবে। যমুনার তীরে কচুরি খাইতেছেন সিসোদিয়া রানা প্রতাপ, সেই গপ পাড়লাম। ১৩০৩ সালে গুহিলা (নটিকোল্টু সিসোদিয়া) রাওয়াল রতনের কী হইছিল সেইটা ভিন্ন রামায়ণ। লাইনে আসুন।

..................................................................
#Banshibir.

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেকদিন পর আসলাম পীরের দরগায় সালাম না করেই চলে যাবো, তাকি হয়। আপনার মোগলাই পরোটার লোভেই আপনার মুরিদ হয়ে গেলাম পীরসাহেব। হাসি

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।