তালাশ - শেষ পর্ব

সত্যপীর এর ছবি
লিখেছেন সত্যপীর (তারিখ: বিষ্যুদ, ৩১/১২/২০২০ - ১২:৫৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(প্রথম পর্বের পর)

মাসখানেক পরের কথা। নিজাম শাহী সেনাপতি মালিক অম্বরের তাঁবু। ভোর।

সূর্য ওঠেনি পুরোপুরি। মশালের আলোয় মাথা ঝুঁকিয়ে ইয়াকুত খাঁ বললেন, পেশওয়াজি। তিমুরি বাহিনী বিজাপুর থেকে সরে গেছে, আর আদিল শাহী সিপাইরাও ভাটওয়াড়িতে মারা পড়েছে সব। দূর্গ দখলের এই ই প্রকৃত সময়!

পাশ থেকে শাহজি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, হাঁ ঠিক কথা। মারাঠা ঘোড়সওয়ার সব প্রস্তুত। কেবল হুকুম দেন, এখুনি বিজাপুর আক্রমণে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

দীর্ঘদেহী মালিক অম্বর অল্প চুপ থাকার পর মাথা এগিয়ে হিসহিসে গলায় বললেন, তার সাথে অন্য কাজ আছে। শুয়োরের বাচ্চা ইব্রাহীমের সাধের নগরী ধুলায় মিশিয়ে দেয়া চাই, কমবখৎ বেঈমান। তিমুরির পা চাটা কুত্তা। গুঁড়িয়ে দে। তার নয়া শহরের একটা ইটও যেন খাড়া না থাকে। একটা গাছের পাতাও যেন বেঁচে না যায়। তার কবি গাতক সবগুলির পাছায় আগুণ দিয়ে বের করে দে। মাটিতে মিশিয়ে দে শহর রাতে। মাটিতে মিশিয়ে দে!

দুই মারাঠা শাহজি ও পরশজি আস্তে চোখাচোখি করলেন মশালের স্বল্প আলোয়। মাথা নেড়ে মালিক ইয়াকুত গম্ভীর স্বরে বললেন, অবশ্যই পেশওয়াজি। অবশ্যই।

… … …
তার কিছুদিন আগের কথা। বিজাপুর প্রাসাদ। সন্ধ্যে।

পায়ের নখে রঙ মাখাতে মাখাতে বীণা বলল, ও মরিয়ম। কি আতর মাখিস বল দেখি। সেই সুদূর ইরান তুরান থেকে তোর ডাক আসে।

একটু অবাক হয়ে মরিয়ম বলল, অ্যাঁ? কিসের ইরান তুরান?

আহা কিছুই জানিসনে। ঢং! সেই কোথাকার কাযভিন নগরী, সেইখান থেকে আফাকি এসে দুইদিনের মধ্যেই জনে জনে জিজ্ঞেস করে বেড়াচ্ছে মরিয়ম কে। সিতারমহলের পিছনে সরাইতে উঠেছে। রাতে যাবি নাকি?

ভুরূ কুঁচকে মরিয়ম বলল, মজাক করিস? কিসের কাযভিন নগরীর আফাকি? চিনি না তো। তার উপর আমি আগা সিরাজির বাঁধা, হুট করে কোন অতিথির কামরায় যাব কোন দুঃখে!

বীণা বলল, আহা সিরাজি। ছেড়ে দাও তার কথা, সে তো শহরেই নেই এখন। যা। ঘুরে আয়। আর কিছু না হোক রাতের খাবারটা বড়িয়া হবে। সিতারমহলের পাক করে এক লাহোরী। তার ঘিয়ে চোবানো নান যে খেয়েছে সে নাকি আর অন্য কোন রুটি জীবনে মুখেই তুলতে পারে না!

চুল বাঁধতে বাঁধতে মরিয়ম ভাবতে থাকল। তেলাভিতে সে সময় কাটিয়েছে অল্পই, বিজাপুর ছাড়া সে দীর্ঘসময় কাটিয়েছে কেবল বাকুতে। সেখানে কাযভিনের কারো সাথে সময় কাটিয়েছে কি? অনেক ভেবেও মনে করতে পারল না মরিয়ম। তার কেবল মনে আছে তাবরিজের ইসমাইল আহমাদিকে। অন্যেরা যখন কিশোরী মরিয়মকে ইচ্ছেমত ব্যথা দিত বিছানায়, ইসমাইল আহমাদি সেখানে খুব দরদ দিয়ে আদর দিত। মাঝেমধ্যে চড় মারত অবশ্য জোরে কিন্তু সেটা কোন বিষয় না। সে যাক, ইসমাইল সে তো তাবরিজের। কাযভিনের কে তার পরিচিত রে বাবা।

কিছুক্ষণ পর খোজা করিম তাকে মশাল দিয়ে এগিয়ে দিয়ে অতিথিশালার কাছে নিয়ে গেল। বড় দরজা। পাল্লায় দুম দুম করে দুইটা বাড়ি দিতেই ভিতর থেকে জামশিদ খাঁ হামাদানি দরজা খুলে দিলেন। খোজা করিমের গলা বসা, সে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, বিবি মরিয়ম!

অল্প হেসে হামাদানি মরিয়মকে ঢুকতে দিলেন। করিম চলে গিয়েছে। দামি গালিচায় বসে হামাদানি বললেন, মরিয়ম। ফার্সি বলতে পারো?

ওড়নার ওপার থেকে চিকন গলায় মরিয়ম বলল, জ্বী।

বেশ বেশ। আরক খাবে? ফিরিঙ্গির আরক। মশলা দেওয়া।

কিছু না বলে মরিয়ম চুপ করে রইল। আধা স্বচ্ছ ওড়নার ভিতর দিয়ে যতদূর দেখা যায় তা মন দিয়ে দেখছিল হামাদানিকে সে। কে এই লোক? মনে পড়ছে না তো।

খাবে না? আচ্ছা। ঢেলে রেখে দেই। পরে ইচ্ছা হলে খেয়ো। এখন একটু কাছে আসো তো সুন্দরী। আর পর্দা সরাও। আমরা আমরাই তো।

ধীর পায়ে মরিয়ম হামাদানির পাশে গিয়ে বসল ওড়না সরিয়ে। হামাদানি বললেন, আহা। বড় খাসা চেহারা। আমাকে এখানে সকলেই বলছিল সিরাজির কপাল কত ভালো, সে কত ফর্সা সুন্দরীকে বাগে পেয়েছে।

চোখ নামিয়ে রেখে মরিয়ম বলল, আপনি আমাকে চেনেন?

মিষ্টি হেসে হামাদানি বললেন, সিরাজির কপাল আসলেই ভালো। কি চমৎকার চেহারা। খুদা বড়ই মেহেরবান কারো কারো প্রতি। সে যাক। তা তুমি যে আমার কামরায় এলে, সিরাজি কান্না করবে না?

এই কথা ফিক করে হেসে দিল মরিয়ম। তারপর বলল, না তিনি তো বাইরে গিয়েছেন। শহরে তো নাই।

এক ঢোঁক পর্তুগীজ আরক পান করে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে হামাদানি বললেন, হাঁ শুনলাম। সে ভেগে গেছে। ভাগার আগের রাতে নাকি কামরায় তুমি ছিলে?

আস্তে আস্তে মুখের রক্ত সরে যেতে থাকল মরিয়মের। কে এই লোক? কি চায় তার কাছে? সতর্ক গলায় সে বলল কই না তো। আমার তো বুখার হয়েছিল, তাই আমি বড়ি খেয়ে রাতে ঘুম দিয়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি তিনি চলে গেছেন।

ছাদের দিকে চেয়ে হামাদানি বললেন, বুখার হয়েছিল? আচ্ছা। বুখার বড় খারাপ জিনিস। মরিয়ম, তুমি প্রকৃতই সুন্দর। অন্য কোন রাতে তোমায় পেলে অবশ্যই তোমার দুই দুধের খাঁজে নাক ডুবিয়ে আমি নিদ্রা যেতাম। এখনো তোমার দুধের থেকে আমার চোখ সরছে না। কিন্তু হায়…

এই বলে খপ করে মরিয়মের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে কাছে এনে অন্য হাতে কোমর থেকে ছুরি বের করে গলায় ধরে হামাদানি ফিসফিস করে বললেন, কিন্তু আজকে আমার অন্য কাজ আছে। আমার সিরাজির খবর চাই। সে কোথায় গেছে? কার সাথে গেছে? হুট করে তার যাবার কারণ কি?

ব্যথা আর ভয়ে মরিয়ম চিৎকার করে উঠতে যাবে, তখন ছুরির ডগা আরেকটু গলায় চেপে হামাদানি বললেন চোপ মাগী! একটা আওয়াজ করেছিস কি কল্লা নামিয়ে দিব। অ্যাকদম চুপ! কথার উত্তর দে। সিরাজি কোথায়? সে কার সাথে?

ঢোঁক গিলে চাপা আর্তনাদের কণ্ঠে মরিয়ম বলল, ও খোদা। মারবেন না গো। মারবেন না। আমি জানিনা সিরাজি কোথায়। সে নওরাসপুরে যেতে নিয়েছিল আগা আবদুল্লাহির সাথে, তারপর আমি আর কিছু জানিনা গো। আমি আর কিছু জানিনা। ছেড়ে দেন পায়ে ধরি। ছেড়ে দেন।

আবদুল্লাহি কে?

ছোরা তরবারি সারায় সে। বিজাপুরেই থাকে। হীরাতের লোক। আমি আর কিছু জানিনা।

মুঠি আলগা করে ছোরা নামিয়ে রাখলেন হামাদানি, আর মরিয়ম কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে থাকল। আস্তে করে তারপর হামাদানি বললেন, সিরাজি পালালো কেন?

জানিনা গো। জানিনা। সকালে একটা চিঠি নিয়ে আসল জিলানি, সেই দেখে তিনি কাপড় গুছিয়ে চলে গেলেন আগা তাহেরির সাথে।

জিলানি। হামাদানি ভাবতে থাকলেন। জিলানি তো খুদাবন্দের সেই চাকরের নাম। হারামজাদা খুদাবন্দই তাহলে সিরাজিকে তালাশের খবর জানিয়ে দিয়েছেন তাহলে। শালা হারামজাদা, দাঁত কিড়মিড় করে ভাবলেন হামাদানি।

আমাকে ছেড়ে দেন গো। আমি আর কিছু জানি না। আর কখনো করব না। ছেড়ে দেন। ও মা গো। হায় খোদা।

নিঃশ্বাস ফেলে এক মুহুর্ত ভাবলেন হামাদানি। তারপর চোখের পলকে ডান হাতে ধরা ছুরি আমূল বসিয়ে দিলেন মরিয়মের বুকে। আঁক শব্দ করে একটা ঝাঁকুনি দিল মরিয়ম, তারপর ঢলে পড়ল পাশে।

রক্তমাখা জামা পাল্টাতে পাল্টাতে হামাদানি ভাবতে থাকলেন।

… … …
কিছুদিন পরের কথা। সঙ্গীত মহলের বাইরের প্রাঙ্গণ, নওরাসপুর।

দেয়ালের পাশে এক সওদাগর আতর বিক্রি করছিল। মহলের ভিতর থেকে গানের মুর্ছনা ভেসে আসছিল অল্প, আর ক্ষীণ নূপুরের আওয়াজ। বুরহান আবদুল্লাহি আতরওলার পাশে পা মুড়ে বসে বললেন, বাস তো বড় ভালো গো সওদাগর। কোথাকার আতর?

এইটা নেন। কাশ্মীরী আতর। কড়া সুবাস। বা এইটা নেন, কাবুলের আতর।

দ্যুৎ কাবুল কাশ্মীর। ওগুলি কে চায়। পশ্চিমের কিছু নাই?

হাঁ হাঁ। আছে তো। এইটা বুখারার। এইটা মিশরের। নেন না।

ব্যাটা মিথ্যা বলছে, ভাবলেন আবদুল্লাহি। দূর মিশরের আতর এই দক্ষিণ ভারতে। কিম্বা কে জানে হতেও পারে, ভাবলেন তিনি। আতর হাতের উল্টো পিঠে মাখিয়ে শুঁকতে শুঁকতে বললেন, বড় সুন্দর বাস ঠিকই। গানের সাথে আরও সুন্দর লাগে কি বল সওদাগর?

মাথা নেড়ে আতরওলা বলল, আর গান। কয়দিন আগে ঈদে নওরাস যখন ছিল তখন যদি আসতেন। দিন নেই রাত নেই কেবল গান আর গান। রাস্তা জুড়ে সওদার বহর। হীরা মোতি, আতর, সিল্কের মিহি জামা কি নাই সেখানে। আর মানুষের কত পয়সা ও খুদা! কত পয়সা। উই রাস্তা দিয়ে জগৎগুরু বাদশা ইব্রাহীম আসছিলেন, আতশ খাঁ র পিঠে সওয়ার হয়ে। কত হাজার মোহর বিলাইলেন পথে, আহা! কী আনন্দে ছিল মানুষ। যুদ্ধ লাগার পরে কোথায় সব পালাইল!

শ্বাস ফেলে আবদুল্লাহি বললেন, তা ঠিক। বিজাপুর আক্রমণের সময় আমি সেখানেই ছিলাম। হাজার হাজার মারাঠা ঘোড়সওয়ার মক্কা আর বাহমনি দরওয়াজার বাহির ভেঙ্গে ঢুকে সে কি তছনছ। তারপর তারা চলে যায় অবশ্য, বেশি ভিতরে ঢোকেনি।

মাথা নেড়ে আতরওলা বলল, সব মালিক অম্বরের শয়তানি। সে খেলায় খেলায় নিয়া গেসে আদিলশাহি আর তিমুরি বাদশার ফৌজরে সেই ভাটওয়াড়ি। বিজাপুরে মারামারির তার কোন মতলবই ছিলনা। ভাটওয়াড়ির পানিতে চুবায় মারল সে সবাইরে।

তাই নাকি, আবদুল্লাহি কৌতূহলী হয়ে বললেন, পানিতে চুবিয়ে মারল কিরকম?

ভাটওয়াড়ি মালিক অম্বরের হাতের তালুর মত পরিচিত জায়গা মনে করেন। পরিন্দা খিড়কির মতই। সেইখানে নদীর ঐপারে গিয়া সে বাঁধ ধসায় দিসে, কেমন হারামী। পুরা এলাকা তলায় গেছে পানিতে, কত ঘোড়া ভাইসা গেল আহারে খোদাগো! বাদশার ফৌজ এত পানি প্যাঁক কাদা জীবনে চোখেই দেখেনাই। তার উপর পত্যেক রাতে কি মাইরটাই না দিসে মারাঠি আর হাবশির দল। উফ!

তুমি মিয়াঁ এত খবর রাখ কেমনে?

আমার পুলা গেছিল ইখলাস খাঁ হাবশির ফৌজের সাথে। সে বড় ভালো পাক করে। তার আস্ত তাম্বু ভাসায় দিছে হাবশির দল, কুনোমতে পলায় আসছে। তার কাসেই শুনলাম গো।

আবদুল্লাহির অজান্তে কখন তাহির সিরাজি এসে দাঁড়িয়েছেন। কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, বুরহান চল। কথা আছে।

আতর না কিনেই উঠে এলেন আবদুল্লাহি। বিকেল। গাছে পাখি ডাকছে। দূরে উড়ছে একটা চিলের মত পাখি। গাছের তলায় এসে এদিকওদিক তাকিয়ে সিরাজি বললেন, হামাদানি মরিয়মকে খুন করেছে।

অ্যাঁ? কি বলছ?

হাঁ। অবস্থা সঙ্গীন, আমার কল্লা না নিয়ে সে যাচ্ছে না। পাকা খবর আছে সে আসছে আজই, সন্ধ্যের দিকে সিকান্দার বুরুজের রাস্তা দিয়ে আসবে। একা। প্রস্তুত থাকো। মনসুরাবাদ কামানের পাশে আঁধার এলাকা আছে, সেইখানে তাকে ধরা যায়।

চিন্তিত মুখে আবদুল্লাহি ভাবতে লাগলেন।

… … …
জামশিদ খাঁ হামাদানি ঘোড়ায় চড়ে আসতে আসতে দূর থেকে একটা কামান দেখে থামলেন। গোলাবারুদ কামান দেখলে তার বড় ভালো লাগে। সারা জীবনটা গোলন্দাজি করেই কাটিয়ে দিলেন তিনি মোটামুটি। সাঁঝের আলো এখনো একটু বাকি আছে, কামানের পাশে লোকজন সিপাই কেউ নেই। ঘোড়া থেকে নেমে হামাদানি কামান দেখতে লাগলেন। বেশ বড় কামান, ভারতের রাজাদের এরকম বড় কামান আছে তার জানা ছিলনা। ঝুঁকে দেখলেন কামানের উপর খোদাই করে লেখা তৈয়ারকারীর নাম, মুহম্মদ বিন হাসান রুমি। স্থান আহমদনগর। সাল হিজরি ৯৫৬। বাহ, বেশ পুরাতন কামান, ভাবলেন হামাদানি। কামানের মাথা চেঁছে হাতীর দাঁতের মত করা, উপরে চোখ। কানের দিকে আংটার মত, সেইটা দিয়ে দড়ি ঢুকিয়ে উঠানামা করে। বারুদ ঢুকানোর জায়গা তুলনামূলকভাবে ছোট, মাথা ঝুঁকিয়ে হামাদানি দেখতে লাগলেন ব্যাপারটা কি।

আচমকা তাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলল বুরহান আবদুল্লাহি, তাহির সিরাজি ও গোলামদাস। এইখানে আক্রমণের জন্য আদৌ প্রস্তুদ ছিলেন না হামাদানি, তিনি হাত দেবার আগেই তার জামার ভেতরে রাখা বাঁকানো ছুরি কেড়ে নিলেন গোলামদাস, আর তিনজনে ধরে পেড়ে ফেললেন হামাদানিকে। সর্বশক্তি দিয়ে হামাদানি একটা ঝটকা দিতে বাকিরা একটু সরে গেলেন, কিন্তু তাকে ছাড়লেন না। কোমরে গোঁজা হাতুড়ি দিয়ে সিরাজি হামাদানির মাথায় দড়াম করে একটা বাড়ি দিতেই তিনি আস্তে ঢলে পড়লেন।

দ্রুত তাকে কামানের পাশের লোহার খাম্বাতে বেঁধে ফেললেন তিনজনে। আধা অচেতন হামাদানির পাগড়ি ফেলে দিয়ে তার চুল মুঠি করে ধরে সিরাজি বললেন, কিরে হারামজাদা জামশিদ। তর বাপ আব্বাস পাঠিয়েছে তোকে আমাকে মারতে?

গোঙ্গানির মত করে একটা আওয়াজ করলেন হামাদানি। তারপর আস্তে করে বললেন, তোর রেহাই নাইরে মশহুদ। আমাকে মারবি মার, কয়জনকে মারবি? আরো লোক আসছে তোর তালাশে।

থু করে হামাদানির মুখে থুতু মেরে সিরাজি বললেন, সবকয়টাকে কুত্তা দিয়ে খাওয়াব। তোর বাপ আব্বাস আমার পাইজামার ফিতা পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না। আর সে তো এখন শাদীশুদা লোক, তার কৈশোরের পিয়ারি যাকে আমি কব্বরে পাঠিয়ে দিয়েছি তার কথা ভেবে আব্বাসের এখনো ধোন চুলকায় সেকথা তার মহারাণী জানে?

আরজু জামশিদ হামাদানির সম্পর্কে খালা হয়। তাকে নিয়ে এইরকম বাজে কথায় তিনি বাঁধা হাত মুঠি করে বললেন, জাহান্নামে মর কুত্তার বাচ্চা। মারবি তো মার বাইশবার ছুরি দিয়ে পোঁচ দিয়েছিলি কেন? শুয়োরের বাচ্চা তুই কি মানুষ না জানোয়ার।

ঠা ঠা করে হেসে তাহির সিরাজি তলোয়ার বের করলেন। পিছনে সরে গেলেন আবদুল্লাহি আর গোলামদাস। দুই হাতে তলোয়ার উঁচু করে ধরলেন সিরাজি এক কোপে হামাদানির কল্লা নামিয়ে দেবার জন্যে।

সাঁই সাঁই সাঁই করে তিনটে তির এসে একে একে বুকে গিয়ে বিঁধল সিরাজি আবদুল্লাহি আর গোলামদাসের। কাটা কলাগাছের মত তিনজন পড়ে গেল, আর দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে সঙ্গী মারাঠা সিপাই সমেত এসে হাজির হলেন পরমজি। অল্প দূরে নওরাসপুর, ইব্রাহীম আদিল শাহের প্রিয় নগরী। এখনো পুরো শেষ হয়নি নগরীপত্তনের কাজ, কিছু দেয়াল অসম্পূর্ণ। মালিক অম্বরের কড়া হুকুমে এই শহর মাটিয়ে মিশিয়ে দেয়া হবে আজ রাতে। কিন্তু কামানে বাঁধা এই লোক কে?

পরমজির ইশারায় হামাদানির হাতের বাঁধন খুলে দিল এক মারাঠা। পরমজি বললেন, কে তুই?

আধা অচেতন জামশিদ হামাদানি সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারছিলেননা কি ঘটে চলেছে। তবে সিরাজি মৃত, অতএব তার কাজ এইখানে সম্পন্ন। ভারতীয় সিপাইর মুখে অদ্ভুত উচ্চারণে ফার্সি প্রশ্ন শুনে তিনি বললেন, আমি জামশিদ হামাদানি। ইস্ফাহানে শাহের খাস সিপাহী।

পরমজি ভুরূ কুঁচকে বললেন, ইস্ফাহানের খাস সিপাহী এইখানে দড়ি বান্ধা কেন? কি করেছিলি?

উদাস গলায় হামাদানি বললেন, কিছু করিনি। কামানের বারুদ পরীক্ষা করছিলাম। এত বড় মুখওয়ালা কামান কিন্তু বারুদের জায়গাটা ছোট। আর পিছনে ঘুরানোর জায়গাটা আলগা। উঠিয়ে ডানদিকে নিতে গেলে বাঁকা হয়ে পড়ে যাবে। তাক হবেনা। সেইটা দেখছিলাম কিভাবে ঠিক করা যায়, আর এরা এসে সন্দেহ করে বেঁধে ফেলল।

পরমজি এর উচ্চারণ আর শব্দচয়ন শুনে ধারণা করলেন এ পুরো মিথ্যে বলছে না। দরবারের কবিদের মতই উচ্চারণ আর গম্ভীর গলা। আর মনে হচ্ছে এ কামান সম্বন্ধে কিছু জানে ও বোঝে। ভাটওয়াড়িতে প্রচুর গোলন্দাজ মারা গেছে। গোলাবারুদ কামান সম্বন্ধে জানা গোলাম কাজে দেবে।

মারাঠিতে পরমজি সিপাইদের বললেন, একে বেঁধে তাঁবুতে নিয়ে যা। খেলজির কাছে রেখে আয়। মাথা দুলিয়ে মারাঠা সিপাইরা তাই করতে থাকল। এমন সময় খটাখট ঘোড়ার খুরের শব্দে মাথা ঘুরিয়ে পরমজি দেখলেন ভাই পরশজি এসেছেন। জিজ্ঞাসু চোখে বললেন, এ ব্যাটা কে?

হাত নেড়ে উড়িয়ে দিয়ে পরমজি বললেন কেউ না। বাদ দে। সবাই প্রস্তুত?

হাঁ, সবাই প্রস্তুত। তিনদিক থেকে ঘেরাও সম্পন্ন, আর হাবশি ইয়াকুবের দল ছদ্মবেশে ভিতরে আছে।

দাঁত বের করে হেসে পরমজি বললেন, সাব্বাস! চল তাহলে।

হাঁ চল!

অল্প কিছুক্ষণ পর দেখা গেল হাজার হাজার মারাঠা আর হাবশি ঘোড়সওয়ার দ্রুত ছুটে চলেছে ইব্রাহীম আদিল শাহের সাধের নতুন নগরী নওরাসপুর গুঁড়িয়ে দিতে। আহমদনগরের হাবশি পেশওয়া মালিক অম্বরের কঠোর আদেশ, শহরের একটা ইটও যেন খাড়া না থাকে। একটা গাছের পাতাও যেন বেঁচে না যায়।

তাই হবে।

(শেষ)


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

সংলাপে ইংরেজি তিমুরিদ শব্দটা বেমানান ঠেকছে। তৈমুর লঙের গোষ্ঠী বা বাহিনীর পরনাম (exonym) ফার্সিতে তৈমুরিয়ান, তাদের আত্মনাম (endonym) পারসিকীকৃত মঙ্গোল ভাষায় গুরকানি

গল্পের এই টুকরায় দেখি জাঙ্গিয়ার জন্য জায়গা বাড়ন্ত। হামাদানিকে ঢ়ৈষূর পৌনেপাৎলুন আর মরিয়মকে স্যাণ্ডোগেঞ্জি-হাপ্পেন পরায় দিবো নাকি?

সত্যপীর এর ছবি

মেরেচে, তিমুরিদ ইংরিজি শব্দ নাকি? আমি কোমল দ দেখে ভাবলাম ফার্সিমার্সি হবে। আপাতত পাল্টে "তিমুরি" করে দিচ্ছি, তিমুরি বা তৈমুরি। যেহেতু কোন মোগল কারো জবান নাই তাই গুরকানি সঠিক মনে হচ্ছেনা এই গল্পে। ভারতীয় ইত্যাদি নন মোগলের জবানে তিমুরি বা তাইমুরি সঠিক মনে হয়।

মরিয়মের গেঞ্জি হাপ্পেনের উপর আধা স্বচ্ছ ওড়না ভুইলেন না।

..................................................................
#Banshibir.

সত্যপীর এর ছবি

ইরা মুখোতি'র বইয়ে এইটা পাইলামঃ

Babur thoroughly loathed his Mongol cousins, the Uzbeks, considering them brutish and uncivilized, and would have been horrified to know that his dynasty would become synonymous with an Anglicized form of Mongols—the Mughals of India.

বিষয়টা নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন আছে। এরকম ভুল আর কি কি আছে আমার পড়ালেখায় সেইটা জানা চাই। মোগল জমানা নিয়ে এত পড়ে কি ফয়দা যদি ডিটেলে গিয়াঞ্জাম থাকে। ধরেন পরবর্তী প্রশ্ন, মোগলাই পরোটা কি আসলে গুর্কানি পরোটা?

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

কক্ষণও না। মোগলাই পরোটা = মোগলাই পরোটা। বাবর চেতলেও মোগলাই পরোটা মোগলাই পরোটা, বাবর না চেতলেও মোগলাই পরোটা মোগলাই পরোটা। পরোটার আগে গু দিয়ে শুরু হয় এমন কোনো শব্দই রাখা উচিত না (গুজরাটি পরোটা, গুটেনবার্গি পরোটা, গুগেনহাইমি পরোটা বলে যেমন কিছু নেইকো)।

ভালো কথা মনে করেছেন। দেখি ফ্রিজ়ে ডিম কয়টা আছে।

সত্যপীর এর ছবি

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি
মন মাঝি এর ছবি

বহুকাল আগে বাবুরের বিশাল টাইটানিক সাইজের আত্নজীবনীটা পড়েছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম বাবুর "চাঘতাই তুর্কি" বংশের লোক ছিলেন বা ঐটা তার মাতৃভাষা ছিল। বাবুর কি তাহলে নিজেকে "তুর্কি" মনে করতেন?

****************************************

সত্যপীর এর ছবি

উপরে হিমু ভাইর কথা শুনে কিছু গুঁতাগুঁতি করে দেখলাম বাবুর নিজেরে ডাকতেছেন গুর্কানি, মঙ্গল শব্দ গুরেগেন এর অপভ্রংশ যার মানে ছিল মেয়ের জামাই। বাবুর ও তার বংশের সকলে তৈমুরের রক্ত নিয়ে গর্বিত, বাবুর নিজেও দিল্লী দখলে আসছিলেন তৈমুর আসছিলেন দেইখা। এখন, তৈমুরের নিজের মঙ্গল রক্ত ছিলনা (সেইজন্য সে নিজের নামে খান টাইটেল জুড়েনাই, বরং নাম নিছেন "আমীর তৈমুর")। তার মঙ্গল বউ ছিল নানাবিধ। তিমুরিদ অনেকেই মঙ্গল রাজকন্যা বিবাহ করছিলেন, তাই গুরেগেন অর্থাৎ মেয়ে জামাই। এখন এই তিমুরি রক্ত নিয়া বড়াই করা আঙ্কল বাবুর নিজেরে তুর্ক না তুর্ক-মঙ্গল ভাবতেন সেইটা সমাধান টানা মুস্কিল। তার আইডল তৈমুর যেহেতু চেঙ্গিজের বংশধরের সাথে যথাসম্ভব নিজের বংশ মিলাইতে চেষ্টা চালায় গেছেন, ধারণা করি তিনি নিজেরে তুর্ক-মঙ্গল ভাবতে ভালোবাসতেন। আপনার কি মনে হয়?

চাঘতাই তুর্কির ব্যাপারে সহমত, সেইটা বাবুরের মাতৃভাষা। কিন্তু দুই পুরুষ পরে সেই ভাষা হারায় গেছে, আকবর জাহাঙ্গীর সেই ভাষা আদৌ জানতেন না ধারণা করি। তারা ফার্সি চালাইলেন দরবারে। মোগলের ভাষার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা জরুরী। তারা বাপদাদার মধ্য এশিয়ার ভাষা চালাইলনা আবার স্থানীয় ভারতীয়দের ভাষাও নিলনা, চালাইল ফার্সি। এলিট হবার চেষ্ঠা বোধ করি।

..................................................................
#Banshibir.

মন মাঝি এর ছবি

আপনার উপরের কমেন্টে ইরা মুখোতির উদ্ধৃতি দেইখা মনে হয় না বাবুরাংকেল নিজেরে "অশিক্ষিত বর্বর" মোঙ্গলদের সাথে এসোসিয়েট করতে চাইতেন।

****************************************

সত্যপীর এর ছবি

বাবুরের নিজেরই বউ ছিল যারা চেঙ্গিসের বংশধর। উপরের লাইনটা আমি পড়তেছি যে বাবুর ঘিন্না করতেন উজবেকদের যারা তার "মঙ্গল কাজিন", উজবেকদের উপর রাগ ও হতাশার পচুর কারণ বাবুরের ছিল এইটা আপনি জানেন। যেইখানে তৈমুর নিজেই মঙ্গলদের সাথে পাতি জমায়া জাতে উঠতে চাইছেন সেইখানে তার বংশধরের একই আকাঙ্ক্ষা থাকা অস্বাভাবিক না।

তবে ফুল ডিসক্লোজার আমি এ বিষয়ে তেমন গভীর খুঁটায়া দেখিনাই। ইরা আপা ভুলও হইতে পারেন। কে জানে। আরো কিছু পাইলে এসে জানাব, আপনিও জানায়েন। বাবুরের আত্মজীবনীতে সম্ভবত এর ফৈসালা করে দেয়া আছে সত্য, কিন্তু সেইটা এখন পড়ার টাইম নাই চিন্তিত

..................................................................
#Banshibir.

মন মাঝি এর ছবি

তিনি নিজেকে কি ভাবতেন তা বোধহয় তার আত্নজীবনীতেই সবচেয়ে ভাল পাওয়া যাবে। কিন্তু এইটা আমি এত আগে পড়ছি যে এর কিছুই এখন মনে নাই!!!

****************************************

হিমু এর ছবি
সত্যপীর এর ছবি

কটঠিন, আপনে তো পুরা ধ্রুব এষ হয়া গেসেন। গল্পের প্রথম পেইজে এইরাম ছবি দিলে বইয়ের পচুর কাটতি হওয়ার কথা।

পর্তুগীজ মশলাওলা আরকের উল্লেখ করছেন দেইখা ডাবল হাইফাইভ।

..................................................................
#Banshibir.

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

আপনাদের "যৌথ প্রযোজনায়" এইগুলা বই করে ফেলা যায় না? মালমশলা অনেক তো জমেছে!

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সত্যপীর এর ছবি

বই বিষয়ে বিস্তারিত গুপন আলুচনা হইছে আগের পর্বে। চেক্কইরা আসেন। সমাধান হইল কান্দাহার নিয়া লম্বা গপ মতান্তরে উপন্যাস লিখব একদিন। বিজলিবই হপে কেননা ছাপা বইয়ের পাব্লিশার কোন্দিকে কেউ তা জানেনা। বিজলিবই বের করলে তাতে ছবি দিবার জন্য হিমু ভাই গত সপ্তা থেকে বটি দিয়া পেন্সিল চাঁছা আরম্ভ করছেন।

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

আমি নতুন পেন্সিল ছুলতে পাথরে বটি শান দিতেছি।

সত্যপীর এর ছবি

সেই পাথর ক্ষয়ে যাবার আগেই নতুন পাথরের তালাশে নামা চাই। যাকে বলে ব্যাকাপ।

..................................................................
#Banshibir.

এক লহমা এর ছবি

পড়ে ফেললাম।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সত্যপীর এর ছবি

কী কী বুঝলেন এখন সব খোলাসা কইরা কন।

..................................................................
#Banshibir.

এক লহমা এর ছবি

গল্পে ইতিহাসের মালমশলাগুলো ভালো লেগেছে, আপনের লেখায় এইটাই আমার মূল আকর্ষণ থাকে। সেই রসে এইবারও বঞ্চিত হই নাই। যে কোন কারণেই হউক (সেইটা আমার নিজের কারণেই সম্ভবত) গল্পে এইবার মন বসে নাই।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সত্যপীর এর ছবি

পৃথিবীর যেই অবস্থা, মন বিক্ষিপ্ত না থাকাটাই অস্বাভাবিক। কোন সমস্যা না। পরের লেখা মন্দিয়ে পড়তে পারবেন আশা করি।

..................................................................
#Banshibir.

লুৎফুল আরেফীন এর ছবি

কামানের বারুদ পরীক্ষা করছিলাম। এত বড় মুখওয়ালা কামান কিন্তু বারুদের জায়গাটা ছোট। আর পিছনে ঘুরানোর জায়গাটা আলগা। উঠিয়ে ডানদিকে নিতে গেলে বাঁকা হয়ে পড়ে যাবে। তাক হবেনা।

ভালো হইছে ...!

সত্যপীর এর ছবি

বিজাপুরের বাইরে একটা বিরাট কামান আছে। তার নাম মালিকি ময়দান, অর্থাত ময়দানের রাজা। গল্পে যে হামাদানি কামানের উপরে লেখা প্রস্তুতকারীর নাম মুহম্মদ বিন হাসান রুমি, স্থান আহমদনগর হিজরি ৯৫৬ ইত্যাদি দেখছেন, সেগিলি আসলে মালিকি ময়দানের উপরে খোদাই করা। মালিক অম্বরের কামান ছিল মালিকি ময়দান, পরে তিনি মইরা যাওয়ার পরে কামানটা বিজাপুরের হাতে আসে। যাক আসল কথা হইল, মালিকি ময়দানের বারুদ ঢুকানোর জায়গাটাও কিছুটা ছোট ছিল তার সাইজের তুলনায়।

তিন নং গানপাউডার ডাইনেস্টি মোগলের কামান বারুদ নিয়ে বিস্তারিত লেখা আসা জরুরি। একসময় এই দেশে গোলন্দাজের কাজ করতে ইরান তুরান পর্তুগীজ ডাচ উসমানী তুর্ক নানা পদের লোক আসত। তাদের নিয়ে জব্বর গপ ফাঁদা যায়।

..................................................................
#Banshibir.

তারেক অণু এর ছবি

চামে দিয়া বামে কাইটে গেল , পরের গল্পের অপেক্ষায়

সত্যপীর এর ছবি

আপনের পর্তুগাল ভ্রমণ কি এখনো চলমান? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রিভিউ কিন্তু এখনো বাকি।

পর্তুগীজ ভারত নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে পোস্ট দিতেছি ভয় নাই। তখন চামে দিয়া ডাইনে কাটব ম্যাঁও

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

একান্ত ব্যক্তিগত মতামত – এতে লেখক বা কোন পাঠকের একমত হবার কোন দায় নেই।

গল্পের এই পর্ব পড়ে মনে হয়েছে দুই পর্বেই গল্প শেষ করার জন্য লেখককে কেউ বাধ্য করেছেন। আগের পর্বে প্রচুর তথ্য, ইঙ্গিত, ঘটনার ঘনঘটা ইত্যাদি ছিল; এই পর্বে সেটা আরও ব্যাপক মাত্রায় ছিল। বস্তুত খুব অল্প অল্প করে দেয়া অনেক তথ্যে ঠাসা এই পর্ব। এক কালে নবারুণ ভট্টাচার্যের ছোট গল্প পড়ার সময় গুগল খোলা রেখে পড়তে হতো, এবং একটা গল্প শেষ করতে অগণিত বার বিভিন্ন তথ্যের কূল-ঠিকুজী বের করতে হতো। অতোটা না হলেও এই গল্প মোটামুটি অমন রাস্তায় হেঁটেছে। পাঠক যদি এই দুই পর্বকে একটা উপন্যাসের প্রথম দুটো অধ্যায় বলে ধরতে পারতেন তাহলে আর কোন ল্যাঠা থাকত না। এই লেখকের আরও কিছু গল্প পড়তে গিয়ে আমার এই প্রকার অনুভূতি হয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি গল্প লেখার সময় কোন পূর্ব পরিকল্পনা না করে গল্পকে নিজের গতিতে চলতে দেই। তাতে গল্প আধা পৃষ্ঠায় শেষ হোক বা কুড়ি পৃষ্ঠায় শেষ হোক। আমি যেহেতু বাজারের বাইরের মানুষ তাই আমার ফর্মা বা শব্দসংখ্যা গোনার দরকার নেই। সম্পাদনার কালে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্ধণ, পরিমার্জন ইত্যাদি যা লাগে তাই করা হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সত্যপীর এর ছবি

এটি একটি চমৎকার পাঠপ্রতিক্রিয়া। মোটা দাগে দুইটি বিষয়, একে একে আসি। একমত দ্বিমত কোনটাই না হয়ে বরং আলাপ করা যাক সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে পেছনে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি গল্প লেখার সময় কোন পূর্ব পরিকল্পনা না করে গল্পকে নিজের গতিতে চলতে দেই।

থিবো সায়েবের দৌলত নামে একটা গল্প আমি আরম্ভ করেছিলাম। এক জহরতওলার হীরে নিয়ে গল্প। এক না দুই পর্ব লিখে হঠাৎ আটকে গিয়েছিলাম। আরম্ভ আর শেষটা ছকে রাখলেও মাঝপথে গল্পটা দাঁড়াচ্ছিল না। থামিয়ে দিতে হয়। আরেকটা সিরিজ লিখব ভেবেছিলাম, লালু লাও বাঙ। একটি ভারতীয় ছেলে আর এক চীনে বালক, আফিম সওদাগরি ব্যবসা নিয়ে তারা আচমকা বন্ধু হয়ে ঘুরে বেড়ায়। দুজনেরই সেট অফ কমন শত্রুজ। ভারত চীন ইন্দোচীন কাহাঁ কাহাঁ মুলুকে তাদের নাও নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর গল্প। খুব ভালো প্লট, শক্তিশালী লেখকের হাতে পড়লে নেটফ্লিক্সে পীকি ব্লাইন্ডারের মত সিরিজ হয়। কিন্তু মাঝপথে আমি আটকে যাই তথ্য আর চীন সম্বন্ধে পড়াশুনার অভাবে।

সেই থেকে নিজস্ব গতিতে লেখার ব্যাপারে আমি একটু সাবধান। নিজের-গতিতে-চলা গল্প আমি শুরু করে শেষ করতে পারব কিনা সেইটা চিন্তা করে আমি একটু আঁটঘাট বেঁধে লিখি এখন।

বস্তুত খুব অল্প অল্প করে দেয়া অনেক তথ্যে ঠাসা এই পর্ব।

বিবিধ তথ্য ঠাসার বিষয়টি ইচ্ছাকৃত। আমার সকল ইতিহাসভিত্তিক গল্পেই এটা থাকে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে গল্পের আকারের তুলনায় তথ্য বেশী হয়ে গিয়েছে হয়ত। লিখে শেষ করবার পরে মনে হয়েছে জর্জিয়ান নাচওয়ালি মরিয়মের তেলাভিজীবনের গল্প, ময়দানের কামানের গল্প, ভাটওয়াড়ির যুদ্ধে মালিক অম্বরের বাঁধ উড়িয়ে মোগল আদিল শাহী যৌথ বাহিনীকে পানিতে চুবানোর গল্প আরেকটু বিশদ বলা যেত (তবে অতিরিক্ত তথ্যের ভারে গল্প যেন আধা-প্রবন্ধ না হয়ে যায় সেটাও খেয়াল করতে হয়)। ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই আর তিন পর্ব করে ঝুলিয়ে রাখতে ইচ্ছে করল না। এমনিতেই পর্ব খেলাপ করেছি বহুবার। তাই শেষ করে দিলাম।

একদিন অবশ্যই খুব লম্বা একটা গল্প লিখব দাদা, কিম্বা উপন্যাস। নো ফাঁকিঝুকি।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

'থিবো সায়েবের দৌলত' ও 'লালু লাও বাঙ' দুটোর কথাই আমার মনে আছে। সময়ের অভাব, তথ্যের অভাব, পড়াশোনার/জানার ঘাটতি - এগুলো থাকবেই। তারপরেও গল্পের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহের দিকেই আমার সমর্থন থাকবে। একটা পদ্ধতি অবলম্বন করে দেখতে পারেন। এমন গল্প পুরোটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাঠকের পাতে দেবেন না। নয়তো পাঠকদের সাথে নানা প্রকার আলোচনায় গল্পের দাবিদাওয়াগুলো পাহাড়ের সমান উঁচু হতে থাকে। অসমাপ্ত গল্প পাঠকের পাতে না গেলে যে গল্প রিসোর্সের ঘাটতির জন্য আটকে যাচ্ছে সেটাকে সুবিধাজনকভাবে শেষ করে দিতে পারবেন। কিছু অতৃপ্তি থাকবে, কিন্তু মূল লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়ে যাবে।

আগে থেকে খুব পরিকল্পনা করে এটা বলা কঠিন কোন লেখা বড় গল্প হবে নাকি উপন্যাস হবে। তলস্তয়ের বড় গল্পগুলোর এক একটা হুমায়ুন আহমেদের কিছু উপন্যাসের দ্বিগুণ তিনগুণ সাইজের। সেগুলোকে বড় গল্প বলব নাকি উপন্যাস বলব সেটা নিয়ে কাইজ্যা করা যায়, কিন্তু সে কাইজ্যায় না গিয়ে একটা লেখা তার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে চলে যদি একটা ছয় ফর্মার উপন্যাস হয় অথবা এক ফর্মার গল্প হয় তাহলে সেটাই লাভ।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সত্যপীর এর ছবি

সেটা করা যায় অবশ্য। উত্তম প্রস্তাব। আমি পুরো গল্পের খসড়া লিখে তারপর একটা একটা করে পর্ব লিখি, আর অমনি ছাপিয়ে দেই। আস্ত গল্প লিখে পর্ব করে করে দিলে হয়। কিম্বা হাজার পাঁচেক শব্দের পুরা গল্পই একদানে দিয়ে দেওয়া যায়। কেন নয়।

তদুপরি, আরো সুবিধা আছে। ধরেন আমি পটল তুলার পরে কেউ আমার গুগল খসড়াগুলি "সত্যপীরের অপ্রকাশিত মণিমুক্তা" ইত্যাদি শিরোনামে প্রকাশ করে দিলে মানুষ আদ্ধেক গল্প পড়ে উহু আহা করবে আর বলবে ইশ, সত্যপীর যদি আর কয়টা দিন বেঁচে গল্পগুলো শেষ করে যেত তাহলে না জানি কি গল্প হত। হোয়াটিফ! আমি যে তথ্যের অভাবে লেখা ইচ্ছা করেই বন্ধ করে দিয়েছিলাম সেইটা আর কেউ ধরতে পারবে না।

বেশ বেশ।

..................................................................
#Banshibir.

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেকদিন পর সচলায়তনে ঢুঁ মেরে আপনার গল্প পেয়ে যাব ভাবিনি। গোগ্রাসে গিললাম।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

সত্যপীর এর ছবি

অনেকদিন পর পরই লিখি। বয়েস বেড়ে গেছে, টানা লিখলে ঘুম আসে। বুঝেনই তো।

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

এই গল্পের নায়ক কি জামশিদ হামাদানি, আর ভিলেন তাহির সিরাজি? আর নায়িকা মরিয়ম বিবি? আমরা উত্তর ভারতের মোগল সম্রাটগন এবং তাদের ছানাপোনাদের নাম ও কাহিনী যে পরিমান শুনি এবং জানি, সময়াময়িক কালের দক্ষিন ভারতীয় নায়কদের নাম কিংবা কাহিনী সে তুলনায় কিছুই শুনি না, জানি না। এই গল্পে উচ্চারিত আদিল শাহ এবং মালিক আম্বর এমনই দুটি নাম, যাদের সম্পর্কে শুনতে এবং জানতে গেলে আগ্রহী যে কাউকে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হবে।

যাক গে সে সব ঐতিহাসিক ব্যাপার স্যাপার। এই গল্পের মরিয়ম আমার মনে ভিন্ন এক প্রশ্নের উদ্রেক করলো। এই যে সে কিশোরী বয়সে সুদূর মধ্য এশিয়ার কোন এক অঞ্চল থেকে জীবনের বাঁকে বাঁকে, ঘাটে ঘাটে অগণিত পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে কাটিয়ে দিয়ে ভারতবর্ষে এসে ভবলীলা সাঙ্গ করলো, তা মাঝে এই দশ পনের বছরে তার যে আট দশটি, নিদেনপক্ষে চার পাঁচটি সন্তানাদি ভুমিষ্ট হওয়ার কথা, তার কী হলো? বাস্তবে এই সমস্যার সমাধান ঘটতো কী ভাবে? আমরা জানি, মাত্র কয়েক দশক আগে পর্যন্তও এরকম বিপুল সংখ্যক নারীকে রুপ ও যৌবনের বেসাতি করে জীবন ধারন করতে হত। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তারা অবশ্যই সন্তানবতীও হত, যা তাদের কাছে মোটেও আকাঙ্খিত হওয়ার কথা নয়। তখন তো আর মায়া বড়ি ছিল না, এই অনাকাঙ্খিত গর্ভধারন তারা কী ভাবে এড়াত, নাকি এড়াতেই পারতো না?

এই আপাত বেরসিক প্রশ্নের উদ্ভব ঘটানোর জন্য একান্তভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।

সত্যপীর এর ছবি

যা তাদের কাছে মোটেও আকাঙ্খিত হওয়ার কথা নয়।

হতে পারে, কিন্তু সবসময় নয়। সন্তানধারণ হেরেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দাসত্ব বললে আমরা যে চিত্রটা মনে মনে দেখি সেইটা আফ্রিকান মানুষের দাসত্বের চিত্র। ইউরোপীয় মালিক তাদের অত্যাচার করছে, তাদের মেয়েদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে, তাদের মেরে ফেলছে প্রয়োজনে, তাদের কোন অধিকার নেই, জমি বা সম্পদের আইনি মালিকানা নেই, সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তারাও দাসত্বের অংশ ইত্যাদি। তিন বারুদ সাম্রাজ্যের দাসব্যবস্থা (যৌনদাসী সহ) একটু ভিন্ন ছিল, এ আপনি জানেন। তাদের জীবন করুণ ও দুঃখময় কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু তারা পশ্চিমে আফ্রিকান দাসেদের মত সম্পূর্ণ আশাহীন নয়। (এই ভারতেই অনেক উদাহরণ আছে যেখানে মালিক দাসকে মুক্ত করে দিয়েছে বা মালিকের মৃত্যুর পরে দাস তার পরিবারসহ মুক্ত হয়ে গিয়েছে, যেমন মালিক অম্বর)।

হেরেম একটি অপেক্ষাকৃত জটিল প্রতিষ্ঠান। সন্তান অনাকাঙ্ক্ষিত হবে কিনা নির্ভর করতে পারে আপনার সামাজিক অবস্থানের উপর। কেউ যদি সম্রাট, রাজপুত্র বা মনসবদার ইত্যাদি আশরাফ শ্রেণীর লোকের প্রিয় শয্যাসঙ্গিনী হন, তাহলে তার পুত্রসন্তান হলে বিষয়টা তার জন্য ভালোও হতে পারে। হেরেম রাজনীতির মাঠে উপরে ওঠার সিঁড়ি, কেননা লর্ড বেইলিশ বলেছেন ক্যাওশ ইজে ল্যাডার। যদি তার মালিকের বউ পুত্রসন্তান দিতে অক্ষম হয় তখন বউকে লাথি দিয়ে রক্ষিতাকে সন্তানসহ প্রমোশন দেওয়া যেতে পারে। এইটা হল যাকে বলে বেস্ট কেস সিনারিও। এখন যদি রক্ষিতার প্রমোশন না ও হয়, মালিকের উপর প্রভাব কাজে লাগিয়ে ছেলেকে বড় করা যেতে পারে (পরে তার মাঝারি আকারের বড়লোক ঘরের মেয়ের সাথে বিবাহ দেওয়া যাবে ধরেন)। উওর্স্ট কেস সিনারিও ধরেন মালিক ঝাঁটা মেরে বের করে দিল ছেলেসহ আর রক্ষিতা ভদ্রমহিলা হেরেমের এক কোণে ঘর মুছে ইত্যাদি করে জীবনধারণ করতে থাকল। সেই ক্ষেত্রে ছেলেটিও মাঠে ঘাটে বড় হবে, বা হয়তো হেরেমের কোন রাজকুমারের বেয়ারা হিসেবে থাকবে। কিম্বা খোজা করে হেরেমে চাকরি দেয়া হবে।

কন্যাসন্তান হলে অবশ্য হিসেব একটু জটিল। সম্ভবত সে ও দেহব্যবসায় নামতে বাধ্য হবে দশ/বারো পেরুলে যদিনা হেরেমের কোন সম্ভ্রান্ত মহিলা তাকে চাকরাণী হিসাবে নিয়োগ দেয়। যদি কোনভাবে সে পড়াশুনা শিখে ফেলে (ছোট সম্ভাবনা, মালিকের মর্জির উপর) তাহলে মহলের অন্যান্য দাপ্তরিক এলাকা যেমন যেমন হিসাবরক্ষণ, খানসালার (পাকশালা), ভাণ্ডার ইত্যাদিতেও নোকরি মিলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সর্বোপরি মধ্যযুগে খোরাসান বা ভারতের মত লেবার ইনটেনসিভ মার্কেটে রক্ষিতা সন্তানধারণ করলে না খেয়ে মরার সম্ভাবনা অল্প। ছোটখাট কাজের অভাব নাই। শিশুমৃত্যুর হার খুব উচ্চ ছিল তাই আপনি যেটা বললেন "দশ পনের বছরে তার যে আট দশটি, নিদেনপক্ষে চার পাঁচটি সন্তানাদি ভুমিষ্ট হওয়ার কথা" এইটি অত্যন্ত সত্য কথা।

আধা-প্রাসঙ্গিকঃ কবুতর ফারুকের গার্লফ্রেন্ড তারাবাঈকে নিয়ে একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা ছিল। চা-চু খেতে গিয়ে আর লেখা হয় নাই। তারাবাঈ মহলের রক্ষিতা, তার জন্মও মহলের অন্দরে। নানান কাঠখড় পেরিয়ে সে এখন মহলের তহশিলদার আর পার্ট টাইম স্পাই। তার বয়ফ্রেন্ড কবুতর ফারুকের জন্ম নিয়েও কিছু গিয়াঞ্জাম আছে কিন্তু সেটা যথাসময়ে আসবে। চা-চু ফিনিশ করি আগে।

..................................................................
#Banshibir.

সত্যপীর এর ছবি

এই গল্পে উচ্চারিত আদিল শাহ এবং মালিক আম্বর এমনই দুটি নাম, যাদের সম্পর্কে শুনতে এবং জানতে গেলে আগ্রহী যে কাউকে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হবে।

জগৎ গুরু আদিল শা আর কিতাবে নওরাস নিয়ে লেখা আসতিছে। চা পান খাইতে খাইতে অপেক্ষা করেন।

..................................................................
#Banshibir.

IRTIZA KHAN এর ছবি

কামানের প্রতি আমার এক ধরণের দুর্বলতা কাজ করে। ভারতে কামানের আগমন, এর বহুবিধ ব্যবহার, কিভাবে কামান কাজে লাগায় এসব নিয়ে যদি একটা আলোচনা করতেন বা রেপ্লাই দেন ভাল লাগবে।

সত্যপীর এর ছবি

আপনার নামটাও কামানের সাথে খুব লাগসই। মোগল জমানায় সুদূর অটোমান সাফাভিদ এলাকা থেকে (কিম্বা হয়ত পর্তুগাল থেকেও) আসা এক তুখোড় গোলন্দাজঃ ইরতিজা খাঁ। কামান টেকনোলজিতে এক অদ্বিতীয় নামঃ ইরতিজা খাঁ। দুইটা যুদ্ধে প্রতিপক্ষের হাতিবাহিনীকে তছনছ করে দেয়া লিজেন্ডঃ ইরতিজা খাঁ। এইটা নিয়ে তিন পর্বের গপ নামানো কোন ব্যাপারই না।

এই বিষয়ে একটা ভালো বই হল জে জে গোমান্স এর বই মুঘল ওয়ারফেয়ার। পঞ্চম অধ্যায়ে কামান নিয়ে বিস্তারিত আছে। ভবিষ্যতে কামান নিয়ে নিশ্চয়ই লিখব বস, বিশেষতঃ সীজ ওয়ারফেয়ার নিয়ে লেখার পরিকল্পনা আছে। দূর্গ দখলে কামান অতীব জরুরী।

সম্পাদনাঃ আপনি সম্ভবতঃ শেষ নাম খান লেখেন। আমি একটা গল্পের আমেজ আনার জন্য শেষনাম খাঁ বানিয়ে নিলাম, বেয়াদবি মাফ কিজিয়ে।

..................................................................
#Banshibir.

IRTIZA KHAN এর ছবি

আপনার গল্পে ইতিহাসের উপাদান থাকে, তথ্য থাকে। এজন্য ভাল লাগে। আচ্ছা আপনি আমাকে চারটা তথ্য দেন।
১. উপমহাদেশে হাতি ছিল একজন রাজার গর্বের সিম্বল। হাতিকে বলা হত প্রাচীন কালের ট্যাঙ্ক। স্বয়ং আলেকজান্ডার বাংলার হাতির বাহিনীর কথা শুনে পিছিয়ে যান। কিন্তু হাতি বাহিনী কি আদৌ উপমহাদেশের কোন যুদ্ধে decisive ভূমিকা রেখেছে?
হাতীর কাহিনী শুধু শুনেই গেলাম কিন্তু হাতি যে যুদ্ধে বিপক্ষের সেনাদলকে গুড়িয়ে দিয়েছে এরকম কিছু শুনিনাই।

২. মুঘল সাম্রাজ্যের সেনা ব্যবস্থা। রাজু রাজের লেখা। ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত। এখানে কামান নিয়ে আলোচনা করা আছে। কিন্তু কামান নিয়ে জানার শখ মিটেনাই। বাংলায় কামান আর কামানের আক্রমণ নিয়ে বিস্তারিত কোন লেখা আছে???

৩. বাংলার মধ্যে মুঘল সেনা বাহিনী এত বড় বহর নিয়ে কিভাবে অগ্রসর হত? বিশেষত বাংলার মত নদী বিধৌত নিচু ভূমির এলাকায় কি করে তারা এত স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারল??

৪. নবাব সিরাজুদ্দউলা বা উপমহাদেশের রাজারা হারেন "উন্নত রণকৌশল" এর কারণে।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ইতিহাসবিদরা "উন্নত রণকৌশল" এই শব্দ দুটো ব্যবহার করেই তাঁদের দায়িত্ত শেষ করেন। এর চেয়ে গভীরে যান নাই বা যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন নাই।
"উন্নত রণকৌশল" - এই দুটি শব্দ দিয়েই আমি যত ইতিহাসবিদের বই পড়েছি তাঁদের পুর যুদ্ধের ফল নির্ধারণই বিষয়টা skip করে যেতে দেখেছি।

উন্নত রণকৌশলের কারণে বাংলা তথা অখণ্ড হিন্দুস্তান ইউরোপীয় শক্তির কাছে মাথা নত করে। পলাশির মাটিতে না হয় কুশীলবদের কারণে নবাব সিরাজুদ্দউলার পতন হয় কিন্তু ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে সম্মিলিত জোট মুনরো সাহেবের কাছে ধরাশায়ী হয়। হিন্দুস্তানের মাটি, রসদ, সিপাহি,কামান থাকা সত্ত্বেও ইংরেজদের কাছে পরাজিত হতে হয়।

বিষয়টি military related research topics কিন্তু এই উন্নত রণকৌশল এবং এর বিভিন্ন দিক নিয়ে যদি একটু details তথ্য শেয়ার করতেন বা ইউরোপীয়দের সাথে আমাদের রণকৌশলের মূল পার্থক্য , রণযন্ত্রের পার্থক্য যদি বিশদভাবে বলতেন তাইলে উপকৃত হতাম।

আমার কামান-বন্দুক-বারুদ-দুরবিন এর details specification, technical data sheet জানার চাইতে ইউরপিও শক্তির সাথে আমাদের বেঙ্গল তথা হিন্দুস্তানি ফৌজের মূল তফাৎ, কৌশল , কমান্ড পরিচালনা , গোলন্দাজ মোতায়েন ব্যাপারটাই মেইন ফোকাস।

কি করে শীতকালীন জল মাটির আবহাওয়ায় বেড়ে উঠা একজন ইউরোপীয় সামরিক ব্যক্তি হিন্দুস্তানের গরম আবহাওয়ায় এসে বনে যান রাজাদের ফৌজের প্রশিক্ষক।

"উন্নত রণকৌশল" আমার আগ্রহের অন্যতম বিষয়বস্তু। --- যদিও আমি বেসামরিক ব্যক্তি কিন্তু তারপরেও আমার এই আগ্রহ যদি আপনার বিরক্তের কারণ না হয় তাহলে যদি কোন রেফারেন্স/পুস্তিকা দিলে অশেষ কৃতজ্ঞ থাকব।
Can you help me about it?

অগ্রিম ধন্যবাদ।

সত্যপীর এর ছবি

বেশ বেশ।

১। হাতী পুরাতনকালে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ছিল যুদ্ধে। নানা কাজে হাতী কাজে আসত, প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেয়া ছাড়াও। তারা ভার টানত তাঁবুর, তাদের উপরে বসে সেনাপতি দূর পর্যন্ত দেখতেন। আর যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষের উপর হাতী চালিয়ে দেয়া তো আছেই। এখন, আমার বিচরণ ১৫০০ থেকে ১৭০০ পর্যন্ত, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস। সেইটাও অনেক জানি তা নয়, তবে মূলত মোগল ও ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম এলাকার ইতিহাসে আমি উৎসাহী। সমস্যা হল, মোগল আসতে আসতে হাতীর দাম কমে যায় কেননা তারা গানপাউডার টেকনোলজি নিয়ে আসে। সুতরাং নির্দিষ্ট করে যুদ্ধের কথা বলতে পারলাম না, ১৫০০ সালের পরে শুধু হাতীর জোরে কেউ যুদ্ধ জিতেনাই এবং ১৭০০ এর পরে হাতী ব্যবহার এমনিই কমে আসে। ১৫০০ এর আগে ভারতে হাতী দিয়ে জয় হয়েছিল বলেই ধারণা করি, কিন্তু সেই সময়ের উপরে পড়াশুনা স্বল্প বিধায় আর বলতে পারলাম না।

"উন্নত রণকৌশল" ব্যাপারটা অপেক্ষাকৃত জটিল। প্রচুর ইতিহাসলেখক ভারতীয়দের অবমাননা করে এই কথাটির অপব্যবহার করে গেছেন ধারণা করি। ইংরেজ বিশেষ করে, তাদের আত্মগরিমা যত উঁচু ছিল রণকৌশলে তারা তত দড় ছিলেন না কিন্তু তাদের লেখা পড়ে সেটা ধরা শক্ত। উপস্থিত আমি আপনাকে অন্য একটা উদাহরণ দেই যেইটার উপর আমি গবেষণা করেছি এবং মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি উন্নত রণকৌশল ব্যবহার করে কিভাবে বাবুর পানিপতে ভারতীয় বিরাট বাহিনীকে হারিয়েছিলেন। শতভাগ বুদ্ধি এবং রণকৌশল। আট বছর আগে একটা ভিডিও ব্লগ করেছিলাম বাবুরের পানিপতের যুদ্ধের উপর, নিচে ভিডিওটি সেঁটে দিলাম এখানেও। ছোট সাত মিনিটের ভিডিও, তিন মিনিটের দিক থেকে দেখবেন আমি বিস্তারিত বলে গেছি বাবুরের কৌশল। তিনি সামনে ক্যারাভান বেঁধে মাঝে দিয়ে কামান রেখেছেন, সেইটা দিয়ে হাতীকে ভয় দেখিয়ে পরে পায়দল সিপাইদের আটকে দেয়া হয় আর ঠিক সময়মত উইং দিয়ে ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে তিনদিক দিয়ে ঘিরে ধরে লোদী বাহিনীকে কচুকাটা করা হয়। বাবুর এই রণকৌশল শিখে এসেছেন তার এলাকা খুরাসান হতে, অটোমান-তুর্ক কৌশল।

ইংরেজদেরও এরকম থাকার সম্ভাবনা আছে অবশ্য, আমার সেই বিষয়ে বেশী পড়াশুনা এখনও নাই এই আর কি।

..................................................................
#Banshibir.

IRTIZA KHAN এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ। আচ্ছা আপনি কি আমাকে একটু হেল্প করবেন। পশ্চিম থেকে পুর্বে বাংলার মধ্যে দিল্লী সুলতানের বা মুঘল সেনাবাহিনী এত বড় বহর নিয়ে কোন পথ ধরে কিভাবে অগ্রসর হত? বিশেষত বাংলার মত নদী বিধৌত নিচু ভূমির এলাকায় কি করে তারা এত স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারল?? আমি বাংলায় ঢুকার পথ নিয়ে study করতে চাচ্ছি।
অগ্রিম ধন্যবাদ।

সত্যপীর এর ছবি

পশ্চিম থেকে পুর্বে বাংলার মধ্যে দিল্লী সুলতানের বা মুঘল সেনাবাহিনী এত বড় বহর নিয়ে কোন পথ ধরে কিভাবে অগ্রসর হত?

জে জে গোমান্সের যে বইটার কথা উপরে বলেছি, সেইখানে আপনার প্রশ্নের উত্তর আছে। বইটা যোগাড় করে পড়ে ফেলেন। নিচে ঐ বইয়ের পৃষ্ঠা ১৮ থেকে মোগল আমলের মহাসড়কের মানচিত্র দিলাম। রাজধানী থেকে বাংলা যাবার পথ এলাহাবাদ রাজমহল হয়ে। আস্ত এলাকাই কৃষিপ্রধান, মোগল সরকারী আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।

বিশেষত বাংলার মত নদী বিধৌত নিচু ভূমির এলাকায় কি করে তারা এত স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারল?

মোগল বাহিনীর পক্ষে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করা যেকোন দিকেই মুশকিল ছিল ধরেন। কাবুল কান্দাহারে তুষারপাত/ স্রোতস্বিনী নদী, যাবার পথে হয়তো মরুভূমি। দক্ষিণে গেলে পাহাড় আর খাড়াই। পূর্বে নদীবিধৌত নরম মাটি, কামান বসে যায় আর ঘোড়া দৌড়াতে আরাম পায়না। গেঞ্জাম কোনদিকে কম বলেন? আকবর জাহাঙ্গীর বাংলায় মনসবদার রাখতেন যাদের নিজস্ব স্থানীয় বাহিনী ছিল, নৌকাও ছিল। শাজাহান আওরঙ্গজেব নৌবাহিনী আরও পোক্ত করেন। সুতরাং মোগল নিয়মিত বাংলায় বিচরণ করলেও স্বচ্ছন্দে করতে পারেনি, বাংলার ডাকনাম তারা দিয়েছিল "বুলগাকখানা" অর্থাৎ কাইজ্যার এলাকা। গেঞ্জাম লেগেই থাকত কিনা তাই।

আমি বাংলায় ঢুকার পথ নিয়ে study করতে চাচ্ছি।

চমৎকার। এ বিষয়ে জেস্টরে আর্টিকেল খুঁজুন আর গুগল বুক্সে বই। প্রচুর রেফারেন্স পাবেন। স্টাডি শেষ করার পরে সচলায়তনে লেখার আমন্ত্রন রইল।

..................................................................
#Banshibir.

IRTIZA KHAN এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।