আইডিয়াল স্কুলের রিইউনিয়ন ও একটি কাটছাঁট হওয়া লেখা

জ্বিনের বাদশা এর ছবি
লিখেছেন জ্বিনের বাদশা (তারিখ: সোম, ২৪/০১/২০১১ - ২:৩৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের রিইউনিয়ন হয়ে গেলো ডিসেম্বরের ২৫ তারিখে। সে উপলক্ষে ছাপা সাময়িকীতে একটা লেখা পাঠিয়েছিলাম। স্কুল নিয়ে অনেক আনন্দের আর কৃতজ্ঞতার স্মৃতি যেমন ছিলো, তেমনি অনেক ক্ষোভও জমা ছিলো। স্কুল ছাড়ার পরের কয়েকবছর তক্কে তক্কে ছিলাম কোন একদিন সুযোগ পেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ মানে স্যারদেরকে সেইসব ক্ষোভের কথা শুনিয়ে দেবো। সুযোগ হয়নি। পুরোনো ইচ্ছেটা এবার তাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। পাঠিয়ে দিলাম গর্ব, আনন্দ, বেদনা আর ক্ষোভের কথাগুলো। লেখার শুরুতে স্কুলের স্যারদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কিছু কথা লিখেছিলাম। তারপর স্কুল নিয়ে এবং স্যারদের নিয়ে খোলামেলা কিছু সমালোচনা ছিলো। লেখার একটা বড় উদ্দেশ্য ছিলো এই সমালোচনাটুকুই, এবং যেটা ভয় করেছিলাম সেটাই হলো।

আমাদের দেশে এখনও "ঘুম পাড়ানী মাসি-পিসির গল্প"ই চলে। এখানে এধরনের অনুষ্ঠানে "অতঃপর রাজারানীরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকেন"। সবাই খুব হাসিখুশী মুখে, সুখী সুখী চেহারায় সময় পার করে শেষে "অনুষ্ঠান খুব সফল হয়েছে"র সংস্কৃতিতেই আমরা অভ্যস্ত। সমালোচনায় আগ্রহ নেই। সাময়িকী কর্তৃপক্ষ তাই আশরাফুলের সুইপের মতোই সুন্দরভাবে লেখাটার "সমালোচনামূলক" অংশের পুরোটুকুকেই ঝাড়ুপেটা করে বিদায় করে দিলেন। আর যথারীতি, ছাপার অক্ষরে দেখার আগে আমি বেচারা জানতেও পারলামনা যে কতটুকু কাটাছেঁড়া হচ্ছে।

যাই হোক, অগত্যা লেখাটা নিজের ব্লগেই তুলে রাখলাম, এখানে ঠেকাবে কে? আইডিয়াল স্কুলের স্যার/ম্যাডামদের চোখে তুলতে পারলে একটু আরাম বোধ করতাম। কেউ পারলে তুলে দেবেন। আসল লেখাটা এরকম ছিলো।

আইডিয়াল স্কুল -- গর্বে, আনন্দে, বেদনায়, ক্ষোভে


বিষয়টা প্রথম প্রেমের মতো, এর আলাদা একটা স্বাদ আছে। জীবনের প্রথম স্কুল বলে কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমার শিক্ষা জীবনের প্রথম সাড়ে দশ বছরের পুরোটা আইডিয়াল স্কুলেই কেটেছে। শুধু তাই না, বাড়ি থেকে দুকদম পা ফেললেই স্কুল ছিলো বলে শুধু ক্লাস চলার পাঁচ/ছয়ঘন্টাতেই জীবনে আইডিয়াল স্কুলের প্রভাব থেমে থাকেনি। নিজের বেড়ে ওঠার সাথে সাথে দেখে এসেছি সেই টিনের আর বাঁশের বেড়ার ছাপড়া দিয়ে তৈরী ক্লাস রুম থেকে অতিকায় দালানে বেড়ে ওঠা স্কুলটিকে। এক অর্থে আইডিয়াল স্কুল ছিলো আমার সহপাঠী। আঠারো বছর আগে শেষ হয়েছে স্কুলজীবন, তবে এখনও এসএসসির রেজাল্ট বের হলে অজান্তেই উদগ্রীব হয়ে পড়ি এটা জানার জন্য যে আমার স্কুলটি এবছরও সেরার আসনটি ধরে রেখেতে পেরেছে কিনা!

স্যারদের কথা:


স্কুল ছাড়ার পর যখন কলেজে ঢুকেছিলাম তখন প্রথম হাড়েহাড়ে অনুভব করি আইডিয়াল স্কুলের কোন্ বৈশিষ্ট্যটি এত চমৎকার ছিলো। ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রথমদিকে বেশ নিয়মিত ক্লাস করতাম। কিছুদিনের মধ্যে লক্ষ্য করলাম শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের কোনো যোগাযোগ তৈরী হচ্ছেনা। শিক্ষকরা পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন, ছাত্রেরা উপস্থিত থাকার সিগনেচার দেয়া আর প্রয়োজনে নোট তৈলার দায়িত্ব। এই সমীকরণের বাইরে কিছু আসতে পারছেনা। তখন অনুভব করেছিলাম, আইডিয়াল স্কুলের স্যারদের অভাব, তিলে তিলে।

মনে আছে ক্লাস টেনে প্রিটেস্ট হয়ে যাবার পরের কয়েকমাসের কথা। একেকজন স্যার যেন জান দিয়ে ফেলবেন, কেন? শুধু আমরা ছাত্রছাত্রীরা যাতে এসএসসিতে ভালো ফল করি সেজন্য। সেসময়ে বাংলা থেকে শুরু করে ইসলামিয়াত পর্যন্ত সব বিষয়ের স্যারদেরই কথাবার্তায় আচার-আচরণে আমরা অনুভব করতাম যে তাঁরা মরিয়া হয়ে চাইছেন আমরা যাতে সবচেয়ে ভালো ফলাফলটি এনে দিতে পারি। এটা যেন একটা ক্রিকেট টিম, যে কোচ যতবেশী মরিয়া থাকেন এবং পরিপ্রেক্ষিতে যত বেশী বাস্তবধর্মী দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, তাঁর প্রত্যেকটি খেলোয়াড় ততবেশী নিজের সেরাটা খেলে আসতে পারে। এসএসসির পড়াশোনা এমন কিছু হাতিঘোড়া না যে ষোলো বছর বয়েসী তরুণ-তরুণীরা সেটা আত্মস্থ করে সবচেয়ে ভালো মার্কস তুলতে পারবেনা। তারপরও আইডিয়াল স্কুল কেন অন্যান্য স্কুলের তুলনায় এত ভালো রেজাল্ট করে? কারণ শিক্ষক-ছাত্রের এই টিমওয়ার্ক, যার কৃতিত্ব আমি শিক্ষকদের সেই মরিয়া হওয়া স্পিরিটকেই দেবো। যেদিন এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো, মনে হচ্ছিলো ফাইনাল খেলা শেষ হয়েছে। আর যেদিন রেজাল্ট বের হলো, স্কুল প্রাঙ্গনে ছাত্রছাত্রীদের হৈ-হল্লা, স্যার-ম্যাডামদের অশ্রুসজল চোখ দেখে মনে হচ্ছিলো যেন ট্রফি জিতেছি।

স্মৃতিচারণ করতে এসে ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন শিক্ষকের কথা স্মরণ করতেই হয়। নাইন-টেনে আমাদের বায়োলজী পড়াতেন, প্রয়াত শফিকুল ইসলাম সিদ্দিকী স্যার। অসম্ভব যত্ন নিয়ে পড়াতেন, বায়োলজীর ছবিগুলো যাতে ছাত্ররা ঠিকমতো আঁকে সেজন্য পারলে জান দিয়ে ফেলতেন। একই সাথে শফিক স্যার ক্লাসে শেখাতেন নৈতিকতা, প্রচ্ছন্নভাবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাটা আমি পেয়েছিলাম শফিক স্যারের কাছেই। সেই ঘটনাটা বলি।
একদিন ক্লাসে পড়া ধরেছেন, উত্তরটা ভুলে যাওয়ায় বলতে পারছিলামনা। তখনই পেছন থেকে এক বন্ধু ফিসফিস করে উত্তরটা বলে দিলো, আর আমিও একটু কান খাড়া করে শুনেই হড়হড় করে স্যারকে বলে দিলাম। আমার অপটু নড়াচড়া দেখে শফিক স্যার ঠিকই বুঝে ফেললেন যে ঘটনা কি। এক ধরনের অদ্ভুত দৃষ্টিতে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় স্যার বললেন,
"আমার মনে হয় তোকে পেছন থেকে কেউ উত্তরটা বলে দিয়েছে।"
আমি চুপ রইলাম। স্যার বলতে থাকলেন,
"এখন ব্যাপারটা আমি তোর উপরেই ছেড়ে দিলাম। তুই যদি দাবী করিস তুই নিজেই উত্তরটা দিয়েছিস তাহলে তোর কথাই আমি মেনে নেবো। তোকে ডায়রীতে ঠিকই পাঁচ দেবো। আর তুই যদি বলিস কেউ বলে দিয়েছে, তাহলে তোকে শূণ্য দেবো। ব্যাপারটা তোর ওপর ছেড়ে দিলাম।"
স্যারের সেই বলার ধরনে এক ধরনের আশ্বাস ছিলো। আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছিলাম যে এখন আমি যদি দাবী করি যে উত্তরটা আমি নিজেই দিয়েছি, তবে তিনি আমাকে মারবেননা, ঠিকই পাঁচ দেবেন। তবে স্যারের সেই অদ্ভুত দৃষ্টিটি বলছিলো অন্য কথা। সেখান থেকে বুঝতে একটুও কষ্ট হয়নি যে এখন মিথ্যে বলে পাঁচ পেলেও স্যারের বিশ্বাস আমি চিরতরে হারাতে যাচ্ছি। পনেরো বছর বয়েসের সেই মুহূর্তে এই ডায়লেমার মুখোমুখি হওয়াটা আমার জন্য সহজ ছিলোনা। ডায়রীর নাম্বার বার্ষিক ফলাফলে যোগ হতো, ওটার আকর্ষণ ছিলো। সত্য কথা স্বীকার করে শূণ্যকে বরণ করাটা তাই অত সহজ ছিলোনা।
তারপরও স্যারের সেই দৃষ্টি আমি উপেক্ষা করতে পারিনি। স্বীকার করে বললাম,
"স্যার, আমি পেছন থেকে উত্তরটা শুনে বলেছি। তবে কে বলেছে সেটা আমি বুঝতে পারিনি।"
স্যারও বুঝলেন বন্ধুটির নাম প্রকাশ করতে আমি চাচ্ছিনা। কে বলেছে তা নিয়ে তিনি আর আগ্রহ দেখালেননা। তবে সত্য প্রকাশ করার সাথে সাথে স্যারের দৃষ্টিতে যে স্বস্তির ছায়া দেখেছিলাম, তাতে নিশ্চিত হই যে স্যারের বিশ্বাস আমি অর্জন করতে পেরেছি। সেই মুহূর্তে ডায়রীতে শূণ্য পেয়ে তাই মোটেও বিচলিত হইনি, বরং নির্বিকারভাবে সত্যকে স্বীকার করার মধ্যে যে এক ধরনের স্বর্গীয় আনন্দ আছে, সেটা জীবনে সেই প্রথম অনুভব করে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতার আনন্দ লাভ করেছিলাম। আজো সে অনুভূতি মনে আছে। মজার ব্যাপার ঘটলো পরদিন। ক্লাসে ঢুকেই স্যার সরাসরি আমার দিকে চলে আসলেন, বললেন, "ডায়রী বার কর।" তারপর আগের দিনের সেই শূণ্যটিকে ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং দুটো দাগ দিয়ে কেটে সেখানে সাইন করে দিলেন।

তবে তারচেয়েও বড় কথা হলো, সেদিন শফিক স্যারের দৃষ্টিতে যে আশ্বাস আমি পেয়েছিলাম, তার মর্যাদা তিনি রেখেছিলেন। অনেকবার নানান উপলক্ষ্যে আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সেই ঘটনাটি, বলতেন, "মনে রাখবি, সত্যকে স্বীকার করে কেউ কখনও হারেনা।" আজ এত বছর পর যখন ভাবতে বসলাম স্কুলজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন জিনিসটি শিখেছি, কোন সমস্যা ছাড়াই মানসপটে ভেসে উঠলো স্যারের সেই শিক্ষাটুকু। আজও প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যখন সত্যমিথ্যার সংঘর্ষের মুখোমুখি হই স্যারের সেই শিক্ষা শক্তি যোগায়।

শফিক স্যারের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিকও না তুলে ধরলেই না। যদিও অধিকাংশই পড়তো, তবে শফিক স্যারের কাছে প্রাইভেটে বায়োলজী আমি পড়তে পারিনি। মূলত পিতামাতার ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ না ফেলার জন্য। আমাদের পাঁচ ভাইবোনের বিশাল পরিবারের সামর্থ্য ছিলোনা প্রত্যেক সন্তানকে বিষয়ওয়ারী স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়ানোর। আমার মতো এরকম আরো অনেক ছাত্রই ছিলো। স্যার কারণটা বুঝতেন, অন্য অনেক অবুঝের মতো এজন্য কোনো ছাত্রের ওপর তিনি রাগ করেননি। আমি আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করতাম যে আমরা যারা স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তামনা, তাদেরকে তিনি প্রায়ই বাড়তি উপদেশ দিতেন। লম্বা সময় ধরে তাদের খাতা পরীক্ষা করতেন। প্রত্যেকবার স্যার যখন খাতায় বায়লোজী বিষয়ে বাড়তি কিছু উপদেশ লিখে দিতেন, আমি অনুভব করতাম, স্যার সর্বান্তকরণে চাচ্ছেন আমরা সবাই ভালো করি। বাংলাদেশের নব্বই শতাংশের বেশী পরিবারের আর্থিক বাস্তবতাকে স্যার ভুলে যাননি।

শফিক স্যার চলে গেছেন অনেকদিন, রেখে গেছেন তাঁর শিক্ষা -- তাঁর ছাত্রদের জন্য, প্রজন্ম পরম্পরায় ছড়িয়ে দেবার জন্য। এমন একজন শিক্ষকের সান্নিধ্যে থাকতে পেরে ধন্য মনে করি নিজেকে, তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

প্রিয় শিক্ষকদের তালিকা খুব দীর্ঘ, এর মধ্যে এই মুহুর্তে জামশেদ আলী স্যারের কথা মনে পড়লো। শুধু স্কুল আওয়ারের পাঁচ/ছয় ঘন্টা ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো বা শাসন করাই যে শিক্ষকের কাজ না, এই সত্যটা সেসময়ে অসাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আইডিয়ালের শিক্ষকেরা। জামশেদ আলী স্যার ছিলেন এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মনে আছে একবার এক ছুটির দিনে পুরানা পল্টনের একবন্ধুর বাসা থেকে হুমায়ুন আহমেদের "বোতলভূত" বইটি নিয়ে ফিরছিলাম। পীরজঙ্গী মাজারে বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হয়ে এপাশে আসলাম, হঠাৎ খেয়াল করলাম পাশ থেকে কেউ একজন ডাকছেন। তাকিয়ে দেখি জামশেদ স্যার। রাশভারী স্যারকে কিছুটা ভয় সবসময়েই পেতাম, আর তখন তো আত্মাই শুকিয়ে গেলো যেন! ভাবলাম নিরীহ "বোতলভূতে"র জন্য না জানি কি মারটাই খেতে হয়!
স্যার ইশারা করে বইটি তাঁর হাতে দিতে বললে, কোন রকম হেঁয়ালী ছাড়াই ধরা পড়া অপরাধীর মতো স্যারের হাতে তুলে দিলাম। বই হাতে নিয়ে বেশ সময় নিয়ে পাতা উল্টে দেখতে লাগলেন। হয়তো কোনো কোনো অংশ পড়েও যাচাই করছিলেন যে আসলে বইটি কোন ধরনের। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, এই গম্ভীর মানুষটির মুখের কোণায় হালকা হাসির রেখা। তবে সেটা যাতে আর বেশী ফুটে না ওঠে সেজন্যই যেন তড়িঘড়ি করে বইটি আমার হাতে দিয়ে বললেন,
"এসব পড়ছো ঠিক আছে, সাথে আরো শিক্ষামূলক কিছু পড়লেও তো পারো।"

পরে ভেবেছিলাম, স্কুল আওয়ারেই তো স্যাররা সারাক্ষণ আমাদের নিয়ে নানান টেনশনে কাটান। তাই, এই ছুটির দিনে তো স্যার চাইলেই আমাকে উপেক্ষা করতে পারতেন। গায়ে পড়ে নিজের সময় নষ্ট করে তিনি এই যে বইটি চেক করে দেখলেন, যাতে তাঁর অসংখ্য ছাত্রের কেউই তাঁর চোখের সামনে নষ্ট হওয়ার মতো কিছু না করে -- স্যারের এই দৃষ্টিভঙ্গি আজ স্মরণ করে স্বীকার করতে হচ্ছে স্যাররা আমাদের জন্য কতটা মরিয়া ছিলেন!

মনে পড়ছে দেলোয়ার স্যারের কথা। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া বোঝানোর জন্য স্যার এতটাই মরিয়া হয়ে কথা বলতেন, যে মনে হতো পারলে আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে ঢুকে জায়গামতো যুক্তি-তথ্যগুলো রেখে আসতে পারলে তিনি শান্তি পেতেন। এতটা উৎসাহ নিয়ে পড়া বোঝানোর প্রচেষ্টা আমি আর কোথাও দেখিনি! মনে পড়ছে শামসুজ্জামান স্যারের কথা। আমরা ডাকতাম পীর স্যার। তিনি নিজেই ছিলেন একজন ইনস্টিটিউশন। স্কুলপর্যায়ে ক্লাস নেয়া মানে যে শুধু কিছু তত্ত্ব আর তথ্য ব্যবহারই না, বরং ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিপর্যায়ের উৎকর্ষ সাধনও, পীর স্যারের ক্লাসগুলো মনে করলে এখন সেটা বুঝতে পারি। মনে পড়ছে বাংলা ব্যকরণের জাহাজ লতিফ স্যারের কথা, তাঁর ক্লাসগুলো ছিলো যেন টিভির একেকটা কুইজ প্রোগ্রাম। অতিমাত্রিক মেধাবী শিক্ষক আহমদ আলী মৃধা স্যারের কথা, তাঁর একেকটা ক্লাস করতাম আর অনুভব করতাম নতুন জিনিস শেখায় কত মজা! বাকীউল্লাহ স্যার, মোস্তফা কামাল স্যারের ক্লাসগুলো ছিলো ক্রিয়েটিভিটিতে ভরপুর, নিজের মতামত প্রকাশের সহজ পরিবেশ অনুভব করায় নিজেদের পরিণত করে নেয়ার সুযোগ ছিলো খুব বেশী। গোলাম মোস্তফা স্যার, হক স্যার, জাহাঙ্গীরি স্যার, উনাদের অসম্ভব উপভোগ্য ক্লাসগুলোও আজ খুব মনে পড়ে।

এখান থেকে বাকীটুকু ঘ্যাচাং করে দেয়া হয়েছিলো

এবার কিছু অভিযোগ:


স্মৃতিচারণ আর বিশ্লেষণে স্যারদের সম্পর্কে যে শুধু ভালো ভালো কথা আসবে তা না। সমালোচনাও আসবে, সেসব এড়ানোও বুদ্ধিমানের কাজ না। আশা করছি পাঠক এটাকে ঠিক বেয়াদবি হিসেবে নেবেননা, বাস্তবতা জানানোর জন্যই এই উপস্থাপন।

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যকার পারস্পরিক কথাবার্তায় বুঝতাম, শিক্ষকদের অনেকের বিরুদ্ধেই
একটা অভিযোগ ছিলো, যা হলো তাঁদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ছাত্রছাত্রীদের ওপর তাঁরা নানান মানসিক অত্যাচার করেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এই সমস্যায় পড়েছিলাম ক্লাস টেনে, তবে এটা ঠিক যে মাত্র একজন শিক্ষকের আচরণে আমি এটা টের পেয়েছিলাম। যেখান থেকে ধারনা করছি যে এ ধরনের শিক্ষকের সংখ্যা খুব বেশী না। তবে এটা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আমার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে দুঃসহ স্মৃতিগুলোর একটি সেই শিক্ষকের আচরণ। নাম প্রকাশ করছিনা। তাঁর কাছে আমি প্রাইভেট পড়িনি বলে তাঁর হাতে খাতা গেলে নম্বর পেতাম খুবই কম। প্রতিবার টায় টায় পাশ। একবার তাঁর সাবজেক্টে নৈর্ব্যক্তিকের কল্যাণে সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়ায় তিনি আক্ষেপ করে এমন কথাও বলে ফেলেছিলেন যে, "নৈর্ব্যক্তিক থাকায় তোরে আটকানো গেলোনা"।

আইডিয়ালে স্কুলের আরেকটি বিষয়ে খুব হতাশ বোধ করেছি। তবে সেটা স্কুল ছাড়ার বেশ পরে। আমাদের হেডস্যার, ফয়জুর রহমান স্যার। ক্লাস নেয়ার সময় স্যারের ছিলোনা বলে এবং আপাতদৃষ্টিতে খুব গম্ভীর কঠোর প্রকৃতির অবয়বের কারণে স্যারকে নিয়ে আমাদের অধিকাংশেরই হয়তো তেমন কোন উল্লেখযোগ্য স্মৃতি নেই। কিন্তু স্কুলের আশি নব্বই দশকের যে কোন ছাত্র-ছাত্রীই একথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবে যে আজ যে আইডিয়াল স্কুল বাংলাদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে তা পুরোপুরিই ফয়জুর রহমান স্যারের নিজ হাতে গড়া। তাঁর হার না মানা "ভাঙবো কিন্তু মচকাবোনা" মনোভাবই আজকের আইডিয়াল স্কুলকে এখানে তুলে এনেছে।
আমার মনে আছে, নব্বইয়ের ডিসেম্বরে যখন এরশাদের পতন হলো, আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছিলো। নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবার কথা যে পরীক্ষার, রাজনৈতিক ডামাডোলে সেটা শেষ হলো ডিসেম্বরের পনেরো-ষোলো তারিখের দিকে। ডিসেম্বরের বাইশ-তেইশ তারিখের দিকে ফলাফল বের করার ট্রাডিশন আইডিয়াল স্কুলের। ফয়জুর রহমান স্যার সিদ্ধান্ত নিলেন অন্যান্য বছরের মতো সময়মতোই ফলাফল ঘোষনা করে ছাত্রছাত্রীদের শীতের ছুটিটা দেবেন তিনি। সংখ্যাটা ঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবত পাঁচদিন পাঁচরাত আইডিয়াল স্কুলের ভবনে আলো জ্বলতে দেখেছি তখন। হেডস্যারের অবিচল সিদ্ধান্তের নেতৃত্বে স্যার-ম্যাডামদের অমানুষিক পরিশ্রমের ফল হিসাবে একদম সময়মতো রেজাল্ট হাতে পেলাম আমরা।
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই অসামান্য কৃতিত্বটি সাধনের পরও হেডস্যার বা অন্যান্য স্যারদের মুখে সামান্য বড়াইও আমরা ছাত্ররা শুনিনি। অথচ কি অসম্ভব পরিশ্রমই না তাঁরা করলেন আমাদের শীতের ছুটি আর পরের বছর সময়মতো স্কুল শুরুর জন্য। আমি মনে করি আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলো, এমনকি সরকারী পর্যায়ের বড় বড় সংস্থাগুলোরও ফয়জুর রহমান স্যারের নেতৃত্বকে মডেল ধরে শিক্ষা নেয়া উচিত। তারা নাকি প্রায়ই ক্যালেন্ডার মেইনটেইন করতে পারেননা!

এই ফয়জুর রহমান স্যার, যিনি তাঁর পুরো জীবনটা দিয়ে গড়ে পিটে বড় করে তুলেছিলেন তাঁর অভীষ্ট আইডিয়াল স্কুলকে। দেখার দূর্ভাগ্য হয়নি, তবে শুনেছি খুব করুণভাবে তাঁকে ছাড়তে হয়েছে তাঁর নিজের হাতে গড়া সেই আলোকায়তনটিকে। পাঠককে প্রশ্ন, তিলে তিলে নিজ হাতে কিছু গড়ে তোলার কোনো অভিজ্ঞতা কি আপনার আছে? একটি থাকলেও আপনার বুঝতে কষ্ট হবার কথা না যে নিজ হাতে তিলে তিলে গড়ে তোলা একটা জিনিসের প্রতি একটা মানুষের কি ভীষন রকমের ভালোবাসা থাকে, কী অবিচ্ছেদ্য ধরনের দাবী থাকে। সন্তানের মতোই তো, তাইনা? বয়োবৃদ্ধ এই মানুষটিকে রাজনৈতিক শক্তিপ্রয়োগে যেরকম নিষ্ঠুরভাবে তাঁর প্রিয়প্রাঙ্গন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, তা আইডিয়াল স্কুলের ইতিহাসের সবচাইতে কলংকজনক ঘটনা। হাজার অর্জন দিয়েও আইডিয়াল স্কুল তার গায়ে লেপ্টে যাওয়া এই কলংককে মুছতে পারবেনা কোনোদিন। একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আইডিয়াল স্কুলের এই অবয়বের দিকে তাকিয়ে আমি লজ্জিত বোধ করি, ঘৃণা অনুভব করি সংশ্লিষ্টদের প্রতি। ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে স্যারের প্রয়াত আত্মার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।

শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে দুটো কথা:


এবার আসি আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতির আলোচনায়। এই স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতির গুণ বলে শেষ করা যাবেনা, তাই সেদিকে যাচ্ছিনা। বরং দুটো বিশেষ খুঁত তুলে ধরছি এখানে। প্রথমটি পদ্ধতিগত খুঁত, দ্বিতীয়টি দর্শনগত।

পদ্ধতিগত সমস্যা:

পদ্ধতিগত যে খুঁতটি, এটি আমি টের পেয়েছি জাপানের বিভিন্ন শহরের প্রাইমারী/হাইস্কুলগুলো ভিজিট করতে গিয়ে। আমি দেখেছি, এখানকার ছোটছোট ছেলেমেয়েদের দিয়ে স্কুলে তাদের পছন্দের অনেককিছু করতে দেয়া হয়। অর্থাৎ, কর্মকান্ডের প্রশ্নে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা খুব উদার। বইয়ে খাতাতে বেঁধে রাখার প্রবণতা নেই। আমার ধারনা এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের এ্যাটিচিউড গঠনে। জীবনকে সে কিভাবে নেবে, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে পারিপার্শ্বিকের প্রতি তার কি এ্যাটিচিউড গড়ে উঠেছে তার ওপর।
অথচ আইডিয়াল স্কুলে আমরা অসংখ্য নিষেধের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। এটা করা যাবেনা, ওটা ধরা যাবেনা, সেটা ছোঁয়া যাবেনা। স্কুলে আমরা সবাই যত "হ্যাঁ" শুনেছি, তার চেয়ে "না" শুনেছি অনেক বেশী। এমনকি দেয়ালপত্রিকা বা বিজ্ঞানপ্রজেক্টের মতো সৃষ্টিশীল কার্যক্রমেও। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এই "না-বোধক" শিক্ষার যে এ্যাটিচিউড গঠনে ভূমিকা রাখার কথা তা হলো, কোনো কিছু করতে গেলেই প্রথমে ভেবে বসা যে "কি কি কারণে এ কাজটা করা উচিত না?" ব্যক্তিকে অকর্মণ্য, এসকেপিস্ট, পেসিমিস্টিক হিসেবে তৈরী করে তোলাতে এর ভূমিকা আছে।
এখন যুগ পাল্টে গেছে। এই গতির যুগে আসলে "ভাবিয়া করিও কাজ" কথাটি চলেনা। "করিতে করিতে ভাবিতে থাকো" -- এটাই হয়তো এই দ্রুতগতির সভ্যতার দাবী। শুধু আইডিয়াল স্কুল না, বাংলাদেশের যে কোনো স্কুলের জন্য আমার পরামর্শ হলো, ছাত্রছাত্রীদের এটাতে ওটাতে বাঁধা দেবেননা। বরং ওরা যা করতে চায় তা থেকে তার প্লাস কি হতে পারে সেটা বের করে তাতে ফোকাস করার জন্য উৎসাহ দিন।

দর্শনগত সমস্যা:

এটি বেশ মারাত্মক একটি সমস্যা। আইডিয়াল স্কুলে শ্রেনীবিভাজন খুব স্পষ্ট ছিলো। এখানে কাটানো দশ বছরে যতটা নির্মমভাবে আমি অর্থনৈতিক শ্রেনীবিভেদ অনুভব করেছি, বাকী জীবনে এর সামান্যও অনুভব করিনি। এটা ঠিক আর্থিকভাবে তুলনামূলক অসচ্ছল পরিবারের সদস্য হওয়াতেই আমি যত সহজে এই ডিসক্রিমিনেশন অনুভব করেছি অনেকেই সেটা করেননি। আবার অন্যভাবে দেখলে, সেটাই তো স্বাভাবিক। আর্থিক কারণে শ্রেনীবিভেদ বা ডিসক্রিমিনেশন কোথাও থাকলে তা তো অপেক্ষাকৃত অসচ্ছলদেরই অনুভব করার কথা।

আইডিয়াল স্কুলের পলিসিতে, নিয়ম কানুনে এবং শিক্ষকদের আচরণেও অসংখ্যবার এই শ্রেনিবিভেদ খুব প্রত্যক্ষভাবে ফুটে উঠতে দেখেছি। অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারি তবে লেখাটি লম্বা করবোনা। দুটো ছোট্ট উদাহরণ দিই।

ক্লাস থ্রিতে আমরা কয়েকবন্ধু লক্ষ্য করি যে স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, মিলাদ -- এসবের জন্য অভিভাবকদের যে দাওয়াতপত্র দেয়া হচ্ছে, সেটা দুরকম। একটা হলো খুব পাতলা মলিন নীলচে কাগজের, আরেকটা বেশ মোটা অফসেট চকচকে সাদা বা অন্যান্য রঙের কাগজে। খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, যেসব ছাত্রেরা ডোনেশন দিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছে তাদের ডোনার বাবা-মাকে সম্মানসূচক ঐ বিশেষ ধরনের দাওয়াতপত্র দেয়া হয়। আমাদের ক্ষুদ্র মনগুলোতে সেদিন বিরাট এক ধাক্কা পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো, "ইশ্, আমরা যদি অনেক বড়লোক হতাম!" আমি জানিনা আসলে কি কারণ, তবে আজও যখন মাঝে মাঝে নিজের মধ্যে অর্থের প্রতি অপ্রয়োজনীয় আকর্ষণ টের পাই, আমার মনে হয় ছোটবেলার সেই ধাক্কাটা কাজ করে। এটা ছিলো পুরোপুরি একটা কুশিক্ষা।

আর্থিক বৈষম্য বাচ্চাদের যত কম বুঝতে দেয়া যায় তত ভালো। তত তারা অর্থের আকর্ষণের চেয়ে অন্য গঠনমূলক বিষয়ে আকর্ষণ বোধ করবে। অথচ আইডিয়াল স্কুলের নিয়ম কানুন গুলো এমন ছিলো যে যেসব পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিলোনা তারা সমস্যায় পড়ে যেত। প্রায় দ্বিগুণের মতো দাম দিয়ে স্কুল থেকে ড্রেস, জুতো, সোয়েটার থেকে শুরু করে খাতা, কলম, পেন্সিল -- সব কিনতে হতো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের নিয়মে যে অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবারই সমস্যায় পড়ার কথা সেটা স্কুল কর্তৃপক্ষ আমলে নিতেননা। এসব পরিবারের বাচ্চারা যে স্কুলে গেলে মন ছোট করে থাকবে -- এ বিষয়টিতে স্কুল কর্তৃপক্ষের নজর ছিলোনা। স্কুল থেকে না কিনলে শাস্তি দেয়া হতো। স্কুলের খাতা বা জুতো না থাকার কারণে অনেকবার মার খেতে হয়েছে, আমি নিশ্চিত আমার মতো অনেককেই।

দ্বিতীয় উদাহরণটি দিয়ে শেষ করি। স্কুলের কোন একটি কাজের জন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা আহবান করা হলো। সবার চাঁদা দেয়া বাধ্যতামূলক। যেদিন বেতনের সাথে চাঁদা তুললেন ক্লাস শিক্ষক, সেদিন হঠাৎ তিনি সব ছাত্রকে বসতে বলে একটা ঘোষনা দিলেন। ঘোষনার জন্য তিনি একজন ছাত্রকে তাঁর কাছে ডাকলেন। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত রকমের অহংকারের সঙ্গে বলতে লাগলেন,
"এই যে ছেলেটিকে দেখছো, এর বাবা আজ সকালে এসে কত চাঁদা দিয়ে গেছে জানো? পাঁচ হাজার টাকা! পাঁচ হাজার টাকা!!"
১৯৮৬ সালে পাঁচ হাজার টাকা এদেশে সচিবদের বেতনের স্কেল ছিলো হয়তো। ঢোল পিটিয়ে এই চাঁদার ঘোষনায় সেই ছেলেটি হিরো হয়ে গেলো ঠিকই, কিন্তু বাকী ছাত্রেরা সেখান থেকে কি শিখলো? সেটা কি স্যার একবারও ভাবেননি? বাকীরা কি শিখতে যাচ্ছে? অথবা সেই ছেলেটিই কি অহংকার ছাড়া অন্যকিছু শিখবে ঐ উদাহরণ থেকে?
একইসাথে স্যার বাকীদেরও নাম আর চাঁদার পরিমাণ বলতে লাগলেন উচ্চকন্ঠে। অনেক বলেকয়ে মা'র কাছ থেকে পঁচিশ টাকা আদায় করেছিলাম। মনে আছে, লজ্জায় মাথা হেঁট করেছিলাম সারা ক্লাস। যে বন্ধুদের সাথে আনন্দে হেসে খেলে কাটানোর কথা স্কুলজীবনে, তাদের অনেককেই মনে হতো অন্যগ্রহের বাসিন্দা। স্কুলের সাথেই আমাদের বাসা ছিলো। "অন্য গ্রহের বাসিন্দা" বন্ধুরা কি ভাববে -- সেই সংকোচে বন্ধুদের বাসায় আসতে বলতে সাহস পেতামনা। এই অপ্রোজনীয় সংকোচ আইডিয়াল স্কুল আমাকে শিখিয়েছে, আমার মতো আরো অনেক ছাত্রকে শিখিয়েছে। এটাও ছিলো স্রেফ একটা কুশিক্ষা।

পৃথিবীতে অনেক বেসরকারী বিদ্যালয়ই খুব খরুচে। সাধারণত ধনী পরিবারের সন্তান না হলে সেখানে কেউ পড়াশোনা করেনা। আইডিয়াল স্কুলেরও সেই হিসাবে খরুচে স্কুল হওয়াতে বাঁধা নেই। কিন্তু ইসলাম ধর্মের শিক্ষাকে ফোকাস করার দাবী যে স্কুলের ছিলো, সেই স্কুলে কি এই দ্বিচারিতা মানায়? ইসলামের সমাজতান্ত্রিক রূপের সাথে আইডিয়াল স্কুলের এই এলিটবাদী মনোভাব ছিলো সাংঘর্ষিক। দুটো সাংঘর্ষিক দর্শন একই সাথে শেখাতে গেলে কখনই মহত্ত্বর দর্শনটি প্রতিষ্ঠা পায়না, কারণ সেটির প্রতিষ্ঠায় এমনিতেই কষ্ট বেশী। আইডিয়াল স্কুলে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চর্চা তাই গোড়া থেকেই স্ববিরোধী।

আমি জানিনা এখন আইডিয়াল স্কুলের পলিসি বা নিয়ম-কানুন কি রকম। তবে শিক্ষকরা যদি মনে করেন যে তাঁরা যেভাবে চাচ্ছেন, ছেলে মেয়েরা সেভাবে গড়ে উঠছেনা, তবে আমার পরামর্শ রইলো, আপনারা আবারও গোড়ায় ফিরে যান। স্কুলের মূল দর্শনের রিভিশন করুন।

শেষকথা:


লেখাটি অনেক বড় হয়ে গেছে। দশ বছরের স্মৃতি, আঠারো বছরের ব্যবধানে সেগুলো অনেক বেশী কাতর হয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। এত ছোট পরিসরে কতটুকু লেখা যায়। বন্ধুবান্ধবদের সাথে এখনও যোগাযোগ আছে, তাই ওদের নিয়ে স্মৃতিচারণটুকু তুলে রাখলাম। আরো বুড়ো হলে যদি আবার কখনও স্কুলের রিইউনিয়ন হয়, তখনকার জন্য তুলে রাখলাম। আইডিয়াল স্কুল বেঁচে থাকুক, আমাদের হয়ে, ভবিষ্যত প্রজন্মের হয়ে। দিন দিন উন্নততর হোক এর পরিসর, শিক্ষা -- এই শুভকামনাটুকু সবসময়েই করি।


মন্তব্য

হাসিব এর ছবি
  • ইসলামের সমাজতান্ত্রিক রূপের সাথে

    ইয়ে ... ইসলাম মনে হয় সমাজতান্ত্রিক কনসেপ্ট না। অন্তত বিধর্মীদের সাথে না।

  • কোন লাইনগুলো কাটা পড়লো সেটা জানতে ইচ্ছা হচ্ছে হাসি
অতিথি লেখক এর ছবি

ইয়ে ... বিধর্মীদের সাথে ইসলামের আচরণ তো খুবই যৌক্তিক মনে হয় ।

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ইয়ে ... ইসলাম মনে হয় সমাজতান্ত্রিক কনসেপ্ট না। অন্তত বিধর্মীদের সাথে না।

একমত, এখানে "সমাজতান্ত্রিক" টার্মটার চেয়ে "অর্থনৈতিকভাবে সাম্যবাদী" টাইপের টার্ম হলে বেশী ফিট করতো। আসলে পলিটিকাল সাইন্সের দৃষ্টিকোণের চেয়ে আরো সারফেস লেভেলের দৃষ্টিকোণ থেকে টার্মটা ব্যবহার করে ফেলেছি -- স্বীকার করছি।

কোন লাইনগুলো কাটা পড়লো সেটা জানতে ইচ্ছা হচ্ছে

"এবার কিছু অভিযোগ" সাবহেডিং থেকে শুরু করে বাকীটুকু কেটে ফেলেছে চোখ টিপি
আমি অবশ্য আয়োজকদের অত দোষ দিইনা, মোটাদাগে এটাই বাংলাদেশের কালচার। স্কুল-কলেজ এমনকি ভার্সিটি লাইফেও শিক্ষকরা আমাদেরকে মতামত জ্ঞাপনের এমন কোন পরিবেশ দেননা যাতে হঠাৎ করেই একটি রিইউনিয়ন আয়োজক কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারে যে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কিছু চাঁছাছোলা বক্তব্য কোন তিক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করবেনা।
আমার আক্ষেপ আমাদের সংস্কৃতিতে গেঁড়ে যাওয়া এই টেন্ডেন্সী নিয়ে, কেউ নিজের সমালোচনা করতে তো রাজী নয়ই, শুনতেও রাজী না।
(অফটপিক, সেই হিসাবে মুহিতের শেয়ার বাজার নিয়ে স্বীকারোক্তিকে আমি হাইলি ইভ্যালুয়েট করি, দেশে এই সংস্কৃতিটা চালু হওয়া জরূরী)

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

শামীম এর ছবি

চমৎকার ঈর্ষনীয় স্মৃতিচারণ।

আমারও জানতে ইচ্ছা হয়, কোন লাইনগুলো কাটা পড়েছিলো শয়তানী হাসি

________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ বস্ .... কাটা যাওয়া অংশের বর্ণনা পোস্টে জুড়ে দিচ্ছি ...

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

শামীম এর ছবি

চমৎকার ঈর্ষনীয় স্মৃতিচারণ।

আমারও জানতে ইচ্ছা হয়, কোন লাইনগুলো কাটা পড়েছিলো শয়তানী হাসি

________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।

অতিথি লেখক এর ছবি

অভিযোগ অংশটি বেশী ভাল লেগেছে।

বিপ্লবী স্বপ্ন

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

অতিথি লেখক এর ছবি

স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম।তবে অভিযোগ গুলো খুবই সত্যি।

ইশরাত

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ ... আপনি কি আইডিয়াল স্কুলের ... একই বা অন্যান্য দৃষ্টিকোণের অভিযোগগুলোও এখানে উঠে আসতে পারে, থাকলে লিখুন

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

বিশ্বাস না করতে পারেন, তবে আজকেই মনে হচ্ছিলো যে আপনি অনেকদিন লেখা দেন না। হাসি

... আইডিয়াল স্কুলের বেশ কয়েকজন তুখোড় মানুষের সাথে পরিচয় আছে। আর প্রতিটি তুখোড় মানুষের পেছনে তার স্কুলের একটা বড় ভূমিকা আছে বলেই মনে হয় আমার।

ফয়জুর রহমান স্যারের ঘটনাটি শুনেছি খুব নিকট কিছু মানুষের কাছে দুঃখ পেয়েছিলাম।

আর পদ্ধতিগত সমস্যাগুলোতো মনে হয় বাংলাদেশের সবগুলো স্কুলেই দেখতে পাবেন। চিত্রটা খুবই নিরাশাজনক।

_________________________________________

সেরিওজার গল্প

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

বিশ্বাস না করতে পারেন, তবে আজকেই মনে হচ্ছিলো যে আপনি অনেকদিন লেখা দেন না।

বলেন কি? এটা তো আমার বিরাট সৌভাগ্য

ঠিক বলেছেন, পদ্ধতিগত সমস্যা, বিশেষ করে প্রথমটা সারা দেশ জুড়ে, আর দ্বিতীয়টা নামিদামী সব স্কুলেই কমবেশী থাকার কথা

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

জারুল ফুল এর ছবি

দারুন লাগলো পড়ে।

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ আপনাকে

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

বিলাশ এক্স আইডিয়াল এর ছবি

আহ, কতো কাল আগের স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিলেন। সুখ-দুঃখের কতো গল্প কতো কাহিনী! মৃধা স্যার ছিলেন আমার অসম্ভব প্রিয়। কামাল স্যার আর বাকি স্যারও। আর কবির স্যারতো ছিলেম সবচেয়ে হিট শিক্ষক। ইমরান স্যার ছিলেন পিটি শিক্ষক যাকে বাঘের মতো ভয় পেতাম (পরে অবশ্য স্যার মনে হয় মডেল না কোথায় যেনো চলে গিয়েছিলেন)। সেই তুলনায় বাশার স্যার কম জ্বালাতেন।

তবে আমি অবশ্য আইডিয়ালের অতি কড়াকড়ি পছন্দ করি নাই কোনো দিন। থ্যাঙ্ক গড সরকার বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পেটানো আইন করে বন্ধ করে দিয়েছে!

অনেক ধন্যবাদ এতো চমৎকার একটা লেখা জন্যে!

(আপনি কোন ব্যাচের, আমি ৯৪ এসএসসি)।

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

আমি ৯২ ব্যাচের ....
মৃধা স্যারের মতো জ্ঞানী লোক সম্ভবত খুব কমই আছে বাংলাদেশে

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

তানজিমুর এর ছবি

শ্রেণী বৈষম্যের যে বিষ স্কুল জীবনে আমার মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তা থেকে আজো মুক্তি পাইনি। বন্ধুদের মাঝে যারাই একটু সচ্ছল ছিল তাদের এখনও এড়িয়ে চলি নিজের অজান্তেই।কতদিন বন্ধুদের টিফিন বক্সের ভেতর জ্যাম দেয়া পাউরুটি দেখে নিজের বক্সের ভেতর সুজি না খেয়ে রেখে দিয়েছি তার হিসেব করিনি।এ রকম হাজারো বৈষম্য আমার কোমল শিশুমনকে রুক্ষ করে দিয়েছিল।আজো জ্যাম রুটি দেখলে আমার খেতে কষ্ট হয়। দেশ সেরা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশুনা করেও আমার মনের এই দারিদ্র দূর করতে পারিনি।
জাপান এর কথা বল্লেন...এখানে এসে দেখলাম স্কুল এর বাচ্চাদের দেখে বোঝার উপায় নেই কে কোন পরিবার থেকে এসেছে...সবার গাড়ি থাকলেও স্কুল এ যায় হেঁটে বা সাইকেলে।
খুবই কষ্ট পেলাম ভাই আপনার লেখা পড়ে দেঁতো হাসি
--------------------------------------------
কষ্ট শুধু কাঁদায় না অনুপ্রেরণাও দেয় এগিয়ে যাওয়ার

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ আপনার অনুভূতিটুকু শেয়ার করার জন্য
ঢাকা শহরে এখন অনেক বাবা-মায়েরাই ছেলেমেয়েদের সাধারন সরকারী স্কুলে দিতে চাননা ... পড়ালেখার মানের অবস্থা খারাপের পাশাপাশি আরেকটা কারণ আছে, সেটা হলো শিশুশিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে সরকারী স্কুলগুলোতে গরিবগুর্বোদের ছেলেমেয়েদের সংখ্যা নাকি "আশংকাজনক"ভাবে বেড়ে যাচ্ছে

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

অপছন্দনীয় এর ছবি

ভালো লাগলো আপনার লেখাটা পড়ে। তবে আমি আপনার মত অত আশাবাদী নই, নিজেকে পরিবর্তন করার সাহস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের থাকলে ওই অংশটুকু ছাপানোর সাহসও থাকতো।

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

আমি আসলে বেচারাদের হাত-পা বাঁধা অবস্থাটা টের পাচ্ছি ... সবাই মিলে একসাথে এতটা বিপ্লবী হয়ে ওঠার চান্স খুব কম

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

অতিথি লেখক এর ছবি

চমৎকার স্মৃতিচারণ চলুক

স্কুলজীবনের অনেক অব্যক্ত ঘটনা মনে পড়ে গেল।

-অতীত

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ ... ঠিক, ভীষন কড়াকড়ি ছিলো, তবে বেতের গড় ব্যবহার মনে হয় খুব একটা উনিশ-বিশ ছিলোনা
মজার ব্যাপার কি জানেন? ... ঢাকা কলেজে এসে টিচারদের সীমাহীন উদাসীনতা দেখে মনে হতো যে আইডিয়ালের কড়াকড়িটা খারাপ ছিলোনা হাসি

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

দিফিও-1 এর ছবি

লেখাটা খুব, খুব ভাল লাগল। আমি গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরীর ছিলাম, তাই আইডিয়ালের কড়াকড়ি আর বেতের বাড়ির কথাই বেশী শুনেছি দেঁতো হাসি

আইডিয়াল স্কুলের জন্য থাকল শুবকামনা।

নাশতারান এর ছবি

লেখাটা ভালো লেগেছে। আমার আত্মীয় ও বন্ধুমহলের চমৎকার কিছু মানুষ আইডিয়ালের গড়া। ক্লাস ওয়ানের ভর্তি পরীক্ষায় রিটেনে টিকেছিলাম। হলিক্রসের রেজাল্ট পাওয়ার পরে আর ভাইভা দিতে যাইনি। বর্ণপরিচয়ের পর থেকেই হলিক্রসে পড়ার শখ ছিলো, আর আইডিয়ালে নাকি মারধোর করা হতো শুনেছিলাম, সেই ভয়ও ছিলো। তবে সমালোচনার ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা সবখানেই প্রায় একই রকম, ইমেজ খারাপ করতে চান না কেউ। আপনার লেখার শেষ অংশটুকু ছেঁটে দিলেও কর্তৃপক্ষের নজরে যেহেতু পড়েছে, আশা করা যায় তাঁরা ভেবে দেখবেন কথাগুলো।

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধন্যবাদ
আসলে এই কর্তৃপক্ষটা হলো প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই ... স্কুল কর্তৃপক্ষ এই আয়োজনে ছিলেন মেহমান

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

নাশতারান এর ছবি

ও! মন খারাপ

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

তাসনীম এর ছবি

চমৎকার স্মৃতিচারণ। আমার বুয়েট জীবনের সেরা বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন আইডিয়াল স্কুলের। কড়াকড়ির ব্যাপার জানা আছে, সেটা নিয়ে ছাত্রদের ক্ষোভটাও জানি।

ফয়জুর রহমান স্যারের ঘটনাটি জানতাম, অত্যন্ত দুঃখজনক। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

স্কুলটার নৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে ঐ ঘটনাটি ... এর আগেও স্কুলে ডোনেশন নেয়া হতো, তবে পুরোটাই খরচ হতো স্কুলের কাজে ... আর এখন প্রিন্সিপালদের নামে কোটি কোটি টাকা তসরুপের অভিযোগ শুনি

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

নির্জন স্বাক্ষর এর ছবি

হুট করে ৯১ থেকে ২০০০ এর সেই স্কুলের সময়টায় চলে গেলাম। সাপ্তাহিক পিটিতে বাশার স্যারের কাছ থেকে দৌড়ানি খাওয়া, জামশেদ স্যারের সেই বিখ্যাত গলা যেটা শুনলেই সবাই ভয় পেতাম, পীর স্যারের কথা জীবনেও ভুল্বনা। দেলোয়ার স্যার, বাকী স্যার, বাংলার ফজলুল হক স্যার, মৃধা স্যার, মোস্তফা কামাল স্যারের ক্লাশ অনেক আগ্রহ নিয়ে করতাম। ক্লাশ টেনে বকর স্যার ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়।

আর বেতের বাড়ি খাইতাম প্রায়ই। হয় ক্লাশে পড়া না পারায় না হলে টিফিনের ব্রেকে হাউকাউ করায় নাইলে কোনো না কোনো দুষ্টামির জন্য। এতে আর যাই হোক শইল্যের হাড্ডি-গুড্ডি সব শক্ত হইয়া গেছে। কিন্তু এই মাইরপিটের ব্যপারটা সবসময়েই বাড়াবাড়ি মনে হত। যেমন সব যে দুষ্টামির জন্য মাইর খাচ্ছি তা না। দেখা গেলো মাঝখানের মাঠের কোনো চিপায় টেনিস বল দিয়ে ফুটবল খেলতাম লুকিয়ে। কোনো স্যার দেখল বা বাশার স্যার দেখল, আইসাই ইয়া বড় বেত নিয়া দৌড়ানি দিত। পোলাপান তো মাঠ পাইলে খেল্বেই। কিন্তু স্কুলে খেলাধুলা বা এই জাতীয় ব্যাপার ছিল পাপ। রুলস হচ্ছে চুপচাপ স্কুলে আসো, পুরা বই গিল্লা খাও আর ছুটি হইলে হাউকাউ না কইরা বাসায় যাও।

বেশি কড়াকড়ি করলে যা হয়, পোলাপাইনের রুলস ভাঙ্গার দিকে আগ্রহ থাকে। অনেক স্কুল পালাইছি মসজিদের কোনা দিয়া। ধরা পইড়া মাইরও খাইসি। টিসি খাইতে খাইতে বাচসি। আরো অনেক দুষ্টামি করতাম চান্স পাইলেই।

দাওয়াত কার্ডের ২ রকম চেহারা দেখাটা অভ্যেস হয়ে গেসিলো। আর টিউশনিতে না গেলে নাম্বার না পাওয়াটা মনে হত স্বাভাবিক। এইসব ব্যাপারগুলা থেকেই মনে ক্ষোভ আর বিরক্তি জমত। কিন্তু প্রতি বছর এইসব ক্ষোভ চলে যেত রেজাল্ট বের হলে। তখন মনে হত, একটু কড়াকড়ি হলেও আইডিয়াল স্কুলটা মনে হয় খারাপ না।

আর ফয়জুর রহমান স্যারের ঘটনা আমার এখনো মনে পড়ে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

সাদা জুতো, সাদা পাজামা, পাঞ্জাবি, সাদা দাড়ি আর ফর্সা মুখ, মাথায় সাদা টুপি...মসজিদের করিডর থেকে স্কুলের করিডরে হেঁটে আসছেন আর আমরা সেই সময় যে যেখানে যে অবস্থায় আছি একদম নট নড়ন-চড়ন হয়ে দেখছি...এই স্মৃতি কখনোই ভুলবার না।

আপনার লেখাটা খুব ভালো লেগেছে।

অছ্যুৎ বলাই এর ছবি

আইডিয়াল স্কুলে নাকি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে টুপি পরতে হয়।

আর ছাত্রদেরকে স্বাধীনতা দেয়া হলে সেটা আইডিয়ালের আদর্শের বিরুদ্ধেই যাবে। আইডিয়াল অর্থ একটা নিঁখুত ছাঁচ থাকবে এবং প্রত্যেক স্টুডেন্টকে সেই ছাঁচে ঢুকিয়ে দিয়ে সাইজ করা হবে। দেঁতো হাসি

---------
চাবি থাকনই শেষ কথা নয়; তালার হদিস রাখতে হইবো

জ্বিনের বাদশা এর ছবি

ধর্ম নির্বিশেষে টুপি পরতে হতোনা
তবে স্কুলের নিয়মকানুন বেশ ভালোভাবেই অমুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি ডিসক্রিমিনেটরি ছিলো ... যেমন, প্রতিদিন প্রথম পিরিয়ডে নাম ডাকার আগে ক্লাসে তালিম(হাদীস পড়ে শোনানো) হতো (মিশনারী স্কুলগুলোর মতোই কমবেশী).... দুপুরে টিফিন আওয়ারে মুসলিমরা নামাজ পড়তে গেলে বাকীদের একা একা বসে থাকতে হতো .... পুরো স্কুলের পরিবেশেই একটা ইসলামিক ইসলামিক ভাব ছিলো যেটা অন্যধর্মের ছাত্রছাত্রীদের উপভোগ করার কথা না

========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

ফাহিম হাসান এর ছবি

একসময় আইডিয়াল স্কুল সুন্দর বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করত। সেই সূত্রে অনেক বন্ধু। এখন কী অবস্থা জানি না।

স্কুল জীবন নিয়ে তিতা মিঠা দুইরকমেরই স্মৃতি আছে। বেশ কিছু আপনার সাথে মিলে গেল।

এরকম ব্যতিক্রমী একটা পোস্ট পড়ে অভিভূত। ভক্তের সংখ্যা আরো এক বাড়লো।

রায়হান আবীর এর ছবি

ক্লাস থ্রিতে আমরা কয়েকবন্ধু লক্ষ্য করি যে স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, মিলাদ -- এসবের জন্য অভিভাবকদের যে দাওয়াতপত্র দেয়া হচ্ছে, সেটা দুরকম। একটা হলো খুব পাতলা মলিন নীলচে কাগজের, আরেকটা বেশ মোটা অফসেট চকচকে সাদা বা অন্যান্য রঙের কাগজে। খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, যেসব ছাত্রেরা ডোনেশন দিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছে তাদের ডোনার বাবা-মাকে সম্মানসূচক ঐ বিশেষ ধরনের দাওয়াতপত্র দেয়া হয়। আমাদের ক্ষুদ্র মনগুলোতে সেদিন বিরাট এক ধাক্কা পেয়েছিলাম

থ্রি ফোরের দিকে ডোনেশন শব্দটার মানেই ঠিক মতো জানতাম না। তবে ক্লাসে এই দাওয়াত পত্র দিতে আসলে আমি গর্বের সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম, আমি ডোনেশনে ভর্তি হইছি। তারপর সুন্দর কার্ডটা নিতাম দেঁতো হাসি

পরে অবশ্য বোধ বুদ্ধি হবার পর বাপ মার কাছে জেনে নিয়েছিলাম আসলেই ডোনেশনে ভর্তি হইছিলাম কিনা। দেঁতো হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

লিখাটা পড়ে আমার স্কুল-কলেজের বন্ধুদের কথা মনে হচ্ছে।

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

অভিভাবকদের যে দাওয়াতপত্র দেয়া হচ্ছে, সেটা দুরকম। একটা হলো খুব পাতলা মলিন নীলচে কাগজের, আরেকটা বেশ মোটা অফসেট চকচকে সাদা বা অন্যান্য রঙের কাগজে।

পদ্ধতিগত সমস্যা মনে হয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটার জন্যে আরো বেশি। খালি পাঠ্যবই আর বাইরের কিছু খুব কম। বা করা হলেও সব স্কুলে নিয়মিত চর্চা অনেক কম। নিয়মনীতি জিনিসটা যদিও স্কুলেই শেখার কথা, কিন্তু সেটাও ছেলেমেয়েদেরকে কঠোরতা বাদ দিয়েও অনেক সুন্দর করে শেখানো যায়, যেমন আপনাদেরকে শিখিয়েছেন শফিক স্যার।

স্কুলের গল্প পড়লেই আমি আমার সবগুলো স্কুল থেকে এক এক করে ঘুরে আসি, মনে মনে...
খবর পাচ্ছি আমার সবচেয়ে স্মৃতিবিজড়িত স্কুলটা নাকি এখন আর আগের মতো নেই। লেখাটা ভালো লাগলো ভাইয়া।

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA