শুভ জন্মদিন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

রাগিব এর ছবি
লিখেছেন রাগিব (তারিখ: মঙ্গল, ২৩/১২/২০১৪ - ৭:০১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

স্বপ্ন আর কল্পনা -- একটি শিশুর মনের বিকাশে এর চাইতে ভালো উপহার আর কি কিছু হতে পারে?

শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় স্কুলে থাকতে। কোন বইটা পড়েছিলাম এখন আর মনে নাই। কিন্তু কারো কাছ থেকে ধার করে পড়া কপোট্রনিক সুখ দুঃখ বইটার গল্পগুলা পড়ে কল্পনার জগতে এলো রবোট আর বিজ্ঞান। আমার শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলাতে কল্পবিজ্ঞানের জগতে এভাবে হারিয়ে যেতে পেরেছিলাম, ক্রিকি, ত্রিনি, আর নীষার আর সেই খুনে কম্পিউটার অথবা ভয়াবহ গ্রহ ট্রাইটনের পড়তাম অবাক বিষ্ময়ে। বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জাগাতে, আমার মনে বিজ্ঞান মনষ্ক চেতনা জাগাতে এই বইগুলা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।

জাফর স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা বইমেলাতে দূর থেকে, কাছে যাবার সাহস পাইনি। তার পর একবার বুয়েটে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার সময়ে জাফর স্যার বিচারকদের একজন হয়ে এলেন। তখন স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে উনার সাথে অনেকটা সময় কাটাতে পারি। খুব সামান্য সব কাজের মাধ্যমে জাফর স্যার বেশ কিছু জিনিষ শিখিয়ে ফেলেছিলেন, হয়তোবা উনার নিজের অজান্তেই। একটা উদাহরণ দেই, কনটেস্টের প্রশ্নগুলা খামে ভরে সীলগালা করে খামের মুখ আটকে দেয়া হচ্ছিলো। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, যে কেউ তো চাইলেই খামটা খুলে ফেলতে পারবে, প্রশ্নের গোপনীয়তা তো আর এতে রক্ষা পাচ্ছেনা। স্যার তখন অল্প কথায় বুঝিয়েছিলেন, সীলগালা করে মুখ বন্ধ করার উদ্দেশ্যটা কিন্তু খামের মুখ আটকানো না, বরং খামের মুখ কেউ খুলে ফেললে সেটা যাতে বোঝা যায়, তা। এই ব্যাপারটা যে আসলে কম্পিউটার সিকিউরিটির একটা ধারণা -- ট্যাম্পার এভিডেন্স, তা পরে পিএইচডি করতে গিয়ে টের পেয়েছি, অথচ খুব সহজে স্যার সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেইদিন।

স্যারের সাথে আরো অনেকবার দেখা হয়েছে, তবে তার চাইতে ইমেইলে যোগাযোগ হয়েছে অনেকবার। বিখ্যাত লেখকেরা অনেক সময় জনমানুষের থেকে অনেক দূরে থাকেন, ধরা ছোঁয়ার বাইরে, জাফর ইকবাল স্যার সেখানে ব্যতিক্রম।

স্যারের একজন ছাত্র শোয়েব আমার অধীনে গবেষণা করছে এখন। জাফর স্যারের হাতে গড়া এমন আরো অনেকের সাথে খুব ভালো পরিচয় হয়েছে, তাদের কাছে সরাসরি অথবা আড়ালে বুঝতে পেরেছি, একটা বিশাল বড় প্রজন্মকে স্যার গড়ে তুলেছেন, বিজ্ঞানমনস্ক আর মুক্ত চিন্তার আলোকিত মানুষ হিসাবে। আর এর বাইরেও সারা দেশে হাজার, লাখো কিশোর কিশোরীর মনটা গড়ে তুলেছেন স্যার, মনের জানালাটা খুলে দিয়ে স্বপ্ন আর কল্পনার আলো এনে দিয়েছেন তাদের মাঝে। এটা শিক্ষক হিসাবে আর লেখক হিসাবে জাফর ইকবাল স্যারের সার্থকতা।

সব শেষে ব্যক্তিগত আরেকটা স্মৃতিচারণ করি। এইচএসসি পাশের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসি, তখন সাথে আর কিছু না থাকলেও মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সাইন্স ফিকশন সমগ্রটা ছিলো। বাড়ি ছেড়ে প্রথমবারের মতো বাইরে থাকা আমার খুব একাকী আর বিষন্ন সেই দিনগুলাতে মন ভালো করার বড় অবলম্বন ছিলো সেই গল্প আর উপন্যাসগুলা -- যারা বায়োবট, অথবা টুকুনজিলের স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যেতাম মন ভালো করতে, স্বপ্ন দেখতে। আমি জানি, আমি একা নই, আরো বহু মানুষের মনে আলো আনতে, মন জাগাতে, স্বপ্ন দেখাতে জাফর ইকবাল স্যার পেরেছেন, খুব ভালো ভাবে পেরেছেন, হয়েছেন সফল। এক জীবনের অল্প সময়ে এটা যারা করতে পারে, তাঁরা অসাধারণ, সামান্য কোনো বিশেষণে তাঁদের সম্মানিত করা অসম্ভব। মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার -- শিক্ষক, বিজ্ঞানী, অথবা লেখকই কেবল নন, বরং এই মন জাগানো, স্বপ্ন দেখানো, আলোকিত একজন মানুষ হিসাবে এই বিশ্বে স্থান করে নিয়েছেন।

শুভ জন্মদিন, স্যার।

(মুহম্মদ জাফর ইকবালের জন্মদিনে সাস্ট সাহিত্য সংসদ সবার কাছে খোলাচিঠি আহবান করেছিলো, তার অংশ হিসাবে এটা লেখা)


মন্তব্য

মেঘলা মানুষ এর ছবি

দেশের বই পড়ুয়াদের বড় একটা অংশকে কল্পবিজ্ঞান পড়ার মজাটা ধরিয়েছেন উনি।
কিশোরদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে তাঁরা অবদান অনস্বীকার্য।

"আমার বন্ধু রাশেদ" পড়ে আমি কেঁদেছিলাম। কয়েকবছর পরে আমার ছোটবোন ওটা পড়ে কেঁদেছিল। আমাদের প্রজন্মের লাখো কিশোর কেঁদেছিল হয়ত। (এই বইটা স‌হপাঠ্য হিসেবে রাখলে ভালো হত)

স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা হাসি

সুবোধ অবোধ এর ছবি

শুভ জন্মদিন স্যার।

অতিথি লেখক এর ছবি

জাফর ইকবাল ছাড়া আমাদের শৈশব কেমন হতো তা আমার কল্পনায় আসে না।আর এখন যখন শুনে কোন কিশোর বড় হচ্ছে অথচ হাতকাটা রবিন পড়ে নাই বা সফদার আলি কে চেনে না তখন তার জন্য খুব কষ্ট লাগে।আমাদের শৈশব কে রঙ্গিন করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জাফর ইকবাল স্যার কে এবং সেই সাথে তার জন্মদিনে তাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

আবাক আমি

মাসুদ সজীব এর ছবি

শুভ জন্মদিন স্যার।

-------------------------------------------
আমার কোন অতীত নেই, আমার কোন ভবিষ্যত নেই, আমি জন্ম হতেই বর্তমান।
আমি অতীত হবো মৃত্যুতে, আমি ভবিষ্যত হবো আমার রক্তকোষের দ্বি-বিভাজনে।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

স্বপ্নের কারিগরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা!

তিথীডোর এর ছবি

শুভ জন্মদিন স্যার। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

সচল জাহিদ এর ছবি

শুভ জন্মদিন স্যার। অনেক হতাশার ভীরে আজও দেশ নিয়ে যতটুকু কাজ করি সেটা আপনার লেখার উৎসাহে।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA