দুনিয়ার মজদুর, এক হও!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: মঙ্গল, ০৭/১১/২০১৭ - ১১:৫৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

২০১৭ সাল ‘অক্টোবর বিপ্লব’ তথা ‘রুশ বিপ্লব’-এর শতবর্ষপূর্তির বছর। বিপ্লবের দিনটা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা মতে ৭ই নভেম্বর হলেও সেসময় রাশিয়াতে ব্যবহৃত জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে ২৫শে অক্টোবর তাই এর নাম অক্টোবর বিপ্লব। একে ‘অক্টোবর বিপ্লব’ বলা ঠিক নাকি ‘রুশ বিপ্লব’ বলা ঠিক সেসব নিয়ে ঢেড় কথা হয়েছে, সে বিষয়ে আর কথা না বাড়াই।

Tass-এর দেশ যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো তখন সারা দুনিয়ায় তথাকথিত কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে (উত্তর কোরিয়া, গণচীন, ভিয়েতনাম, লাও এবং ক্যুবা ছাড়া) তাদের সমাজতন্ত্রী অথবা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাও হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো। পৃথিবীর ইতিহাসে গোটা বিশ্বব্যাপী এমন ব্যাপক আকারের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের ঘটনা সম্ভবত আগে কখনো ঘটেনি; ভবিষ্যতে আবার কবে ঘটবে বলা মুশকিল।

এক স্পনসর সত্তরের দশকের শেষ দিকে মারা যাওয়ায় বাংলাদেশে তাদের স্পনসর্ড পার্টিগুলো জলপাই গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। এই দফা অবশিষ্ট আরেক স্পনসর মারা যাওয়ায় তাদের স্পনসর্ড জনভিত্তিহীন পার্টিগুলো নাই হয়ে গেলো। সেখানে বাস করা ভাগাড়ের শকুনগুলো প্রয়াত কমরেডদের দান করা সহায়-সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে কাজিয়ার একশেষ করে ফেললো। এই সময়ে মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিন-ত্রৎস্কি-মাও-তিতো-হোক্সা-হো-কাস্ত্রো-চে-রণদীভে-শিবতোষ ইত্যাদি ইত্যাদি অনিঃশেষ সংখ্যক তাত্ত্বিক, বিশ্লেষক, দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক গুরুর টন টন রচনা-বক্তৃতা-উক্তি-উদ্ধৃতি-ভবিষ্যৎবাণীর মধ্যে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশে কিছু দিন তুমুল ঝগড়াঝাটি হলো, তারপর অল্প কিছু মানুষ তাদের নিজেদের নিজেদের মতো করে একবার পার্টি গড়লেন, দশ বার পার্টি ভাঙলেন; আর সেখানেও পড়ে থাকা কিছু বঞ্চিত ভাগাড়ের শকুন নতুন ভাগাড় খুঁজে সেখানে ঠাঁই নিলো।

কিছু কিছু জ্ঞানী মানুষ কী কারণে যেন তাদের পার্টিকে গোপন রেখে দিলেন এবং নানা রকম রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন ডেকে মাঠ গরম করায় ব্যস্ত থাকলেন। তাদের গোপন পার্টি গুটিপোকার মতো গুটির ভেতরেই থেকে গেলো, কয়েক দশকেও আর প্রজাপতি হয়ে বের হতে পারলো না। একবার এমন এক পার্টির সদস্যকে তাদের পার্টির কার্যক্রমের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করলেন এবং পার্টির কার্যক্রমের ব্যাপারে কিছু বলে তার ‘ওমের্তা’ ভাঙতে চাইলেন না; অথচ তাদের পার্টিটি মোটেও গলাকাটা পার্টি নয়। গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দশকের পর দশক গোপনে আরও গোপনীয় কার্যক্রম চালিয়ে ষোল-সতের কোটি মানুষের দেশে বিপ্লব দূরে থাক, বৈপ্লবিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটানোও কি সম্ভব?

কিছু কিছু বুদ্ধিমান মানুষ কোন পার্টি না গড়ে যুগের পর যুগ ‘পার্টি গঠন প্রক্রিয়া’ অথবা ‘রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন’ চালিয়ে যাচ্ছেন। এক যুগের বেশি পার হওয়া এমন এক ‘আন্দোলন’-এর একজন নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘পার্টি গঠন করবেন কবে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এখনো সময় হয়নি’। আরও কয় যুগ গেলে তাদের সময় হবে সেটা তারা নিশ্চিত নন্‌। দুষ্ট লোকজন বলে তারা নাকি পার্টি গড়তে গেলেই ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে। তাই তাদের আহ্বায়ক কমিটি আর কখনো পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বা পলিটব্যুরো হতে পারে না।

আমি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম বাংলাদেশে মোট কতগুলো বাম/মার্ক্সবাদী/সমাজতন্ত্রী/কমিউনিস্ট/গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি আছে সেটা বের করতে। কোনবারই সফল হতে পারিনি। কারণ, কখনো নানা ভেক ধরা পার্টিগুলোকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারিনি, আবার কখনো আমি যে সময় ধরে খোঁজ নিচ্ছিলাম ততক্ষণে কোন পার্টি ভেঙে গেছে অথবা একাধিক পার্টি জোড়া লেগে নতুন পার্টি তৈরী করেছে। আর সশস্ত্র বিপ্লবী পার্টি নামক গোপন দলগুলো, যাদের বড় অংশ আসলে ডাকাত দল, সেগুলোর ব্যাপারে সঠিক তথ্য সম্ভবত কেবল পুলিশের কাছে আছে।

***************************************************

বাংলাদেশের এই পার্টিগুলোর কিছু সাধারণ (common) বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, ঢাকার বাইরের স্বল্প কিছু পার্টি ছাড়া বাকি সব বাম দলের সিংহভাগ ঢাকার বৃহত্তর পল্টন এলাকা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি অঞ্চলে বাস করে। তাদের প্রধান কার্যালয় না বলে ‘বাস করে’ বললাম এইজন্য যে তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মূলত এই এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ। শিল্পাঞ্চলগুলোতে তাদের কারো কারো সাইনবোর্ড পাওয়া যায় এবং কালেভদ্রে সেখানে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনেও তাদের কাউকে কাউকে পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের কেউ অঞ্চলভিত্তিক বা ইন্ডাস্ট্রিভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে না। কৃষিক্ষেত্রে এদের আন্দোলনের অবস্থা আরও করুণাকর। এখানে অতি সামান্য ব্যতিক্রম আছে কিন্তু সেগুলো এতো ক্ষুদ্র যে বৃহত্তর পরিসরে দেশের রাজনীতিতে তার কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।

দ্বিতীয়ত, এই পার্টিগুলো নিজেদেরকে মেহনতী মানুষের পার্টি বললেও এদের সদস্যরা দেশের মেহনতী মানুষের ভাষায় কথা বলতে, বক্তৃতা দিতে বা লিখতে পারেন না। তারা এক অদ্ভূত বানানো ভাষায় কথা বলেন, লেখেন। সেই ভাষা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মানুষ দূরে থাক নকল না করে, রীতিমতো পড়াশোনা করে স্নাতকোত্তর পাশ করা মানুষেরও বোধগম্য নয়। বিভিন্ন ধর্মের যেমন নিজস্ব দেবভাষা থাকে এদের এই ভাষা সম্ভবত অমন দেবভাষা পর্যায়ের কিছু। তাই তারা এই ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কথা বলতে পারেন না, লিখতে পারেন না।

তৃতীয়ত, কোন এক কালে এসব পার্টি (বা তাদের পূর্বসূরীরা) মাঠ পর্যায় বা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করলেও এখন এসব কাজে তাদের আর দেখা যায় না। সাধারণ মানুষের সাথে নিয়মিত আলোচনা করে তাদেরকে প্রয়োজনীয় নানা বিষয়ে অবগত করানো, ঘটিত বা ঘটমান বিষয়াবলী সম্পর্কে তাদেরকে ব্যাখ্যা করা, তাদের সমস্যা সম্পর্কে শুনে পরামর্শ দেয়া, স্থানীয় বিষয়াবলীতে নিজেদেরকে যুক্ত করে তার সমাধানে নেতৃত্ব দেয়া — এমন সব কাজ হয় এদের কাছে অদরকারী বলে মনে হচ্ছে অথবা সেসব করার মন-মানসিকতা-সামর্থ্য এদের নেই। অতি সামান্য ব্যতিক্রম সব জায়গাতেই আছে, সেসবের উল্লেখ অপ্রয়োজনীয়।

চতুর্থত, স্থানীয়, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সাধারণত এদের কোন প্রাক্কলন (forecasting) না থাকলেও বড় ঘটনা ঘটার পর এদের কেউ কেউ ‘আমি আগেই কইছিলাম বাঁধ ভাইঙ্গা যাইবো’ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এদের মধ্যে যারা মহাপণ্ডিতের ভেকধারী তারা আসলে শূন্য কলস। নয়তো শুধু সঠিক প্রাক্কলনের জন্য এদের কেউ কেউ সাধারণ মানুষের আস্থালাভ করতে পারতেন। প্রাক্কলন দূরে থাক অনেক সময় চলমান ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবন করতেও এদের সীমাহীন ব্যর্থতা আছে। এই ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরিস্থিতি অনুধাবন করতে এদের কারো কারো ব্যর্থতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধীতা স্মর্তব্য। নব্বইয়ের আগে পর্যন্ত এরা তাদের নিজস্ব ‘কেবলা’র দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সেখানে বৃষ্টি হলে এখানে ছাতা ধরতেন।

শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে না, জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও এদের কারো কারো অবস্থান সামরিক শাসকের পক্ষে গেছে। যেমন, ১৯৭৭ সালের ৮, ৯ ও ১০ই ফেব্রুয়ারীতে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় গৃহীত প্রস্তাবের পরিস্থিতি মূল্যায়ন অংশে বলা হয়,

“আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলি জাতীয় স্বাধীনতার সুফলসমূহ, রাষ্ট্রীয় চার নীতি, জাতীয়করণ, জোট-নিরপেক্ষ প্রগতিশীল বৈদেশিক নীতি সম্পূর্ণ পাল্টিয়ে দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা নস্যাৎ এবং পুনরায় পাকিস্তানী আমলের মতো অবাধ পুঁজিবাদী শোষণ কায়েমের জন্য যেভাবে তৎপর হয়ে উঠেছিল, তা কতক পরিমাণে প্রতিহত হয়েছে। দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়া এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলি বর্তমানে কিছুটা কোণঠাসা হয়েছে”।
(‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাব’; ৮, ৯ ও ১০ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৭-এ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় গৃহীত; পৃষ্ঠা ৩)

বাস্তবে জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলি শুধু প্রকাশ্যই হয়নি বরং পুনর্বাসিত ও প্রতিষ্ঠিতও হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলেও জেনারেল জিয়ার রাজাকারতোষণ বুঝতে অসুবিধা হবার কথা না। স্মর্তব্য সিপিবি জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচীতে অংশগ্রহন করেছিল, এবং তারও আগে তারা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে নিজেদেরকে বিলীন করেছিল। কোন জাতীয়তাবাদী, বুর্জোয়াঁ রাজনৈতিক দলে একটি কমিউনিস্ট পার্টির বিলীন হয়ে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

দুই সামরিক শাসক — জেনারেল জিয়াউর রহমান আর জেনারেল এরশাদের সময় বাংলাদেশের বামদের মধ্যে জেনারেলদের রাজনীতিতে যুক্ত হবার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছিল। এভাবে ন্যাপ গুড়ো গুড়ো হয়েছে, ইউপিপি বা জাগমুই-এর মতো পার্টি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

পঞ্চমত, কখনো এরা কোন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বড় আকারের কর্মসূচী আহ্বান করলেও সেটার জন্য গণসংযোগ করতে তাদের প্রবল অনাগ্রহ আছে। যেমন, তেল-গ্যাস বা সুন্দরবনের মতো জরুরী বিষয়ে হরতাল ডাকলেও পল্টন আর শাহ্‌বাগ ছাড়া খুব কম জায়গায় এদেরকে পিকেটিং করতে দেখা যায়। এদের পক্ষ থেকে এসব বিষয় সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে বলার মতো ছোট ছোট জনসমাবেশের বা জনআলোচনা চক্রের আয়োজন দেখা যায় না। ফলে হরতালের দিনেও দেখা যায় সাধারণ মানুষ একে অপরকে জিজ্ঞাসা করছেন — কারা হরতাল ডেকেছে, কেন হরতাল ডেকেছে। সাধারণের এইসব প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য তাদের কোন আয়োজন চোখে পড়েনা।

ষষ্ঠত, এদের মধ্যে যারা নিয়মিত ছোট-বড় সব নির্বাচনে অংশ নিয়ে থাকেন তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনটা সিরিয়াসলি করেন না। এসব দলের হোমরা চোমরা নেতারা যেসব আসনে প্রার্থী হন সেখানে ছাড়া অন্যত্র তাদের খুব কম প্রার্থী ভোট চাইতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে আগ্রহী। আমি এই জীবনে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অনেকগুলো নির্বাচন দেখেছি যেখানে আমার নির্বাচনী এলাকায় কোন না কোন বাম দলের হোমরা চোমরা নয় এমন প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তাদের কাউকে আমি কখনো ভোট চাইতে দেখিনি। কেউ কেউ আবার পোস্টার-লিফলেট ইত্যাদি প্রচারণা থেকেও দূরে থাকেন। ফলে কেবল ভোট চাইতে গেলে ব্যালট দেখে বোঝা যেতো উনাদের কেউ প্রার্থী ছিলেন। হয় জনগণের ব্যাপারে এদের অশ্রদ্ধা আছে, অথবা ভোট চাইবার, জনগণের মুখোমুখি হবার মতো নৈতিক জোর এদের নেই।

সপ্তমত, নিজেরা ছাড়া অন্য যে কারও ব্যাপারে, বিশেষত সাধারণ মানুষের ব্যাপারে এদের আসলেই অশ্রদ্ধা রয়েছে। ফলে এদের বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের সাথে মেশেন না, তাদের ভাষায় কথা বলেন না, বিপদের দিনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান না। এইজন্য মুক্তিযুদ্ধের সময়, তিন সামরিক শাসনামলে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীর আন্দোলনে এরা অংশগ্রহন করলেও নেতৃত্ব দিতে সমর্থ হননি। প্রতি বারই নেতৃত্ব বুর্জোয়াঁ দলগুলোর হাতে চলে গেছে। তাছাড়া কোন প্রকার সমালোচনা বা বিরুদ্ধ মত সহ্য করার মানসিকতা এদের কখনো ছিলো না। এককালে সমালোচনা বা বিরুদ্ধ মতের জন্য এরা পরস্পরের গলা কেটেছেন, সাধারণ মানুষকে নির্যাতন বা খুন করেছেন। এখন খুনোখুনির সুবিধা নেই বলে এরা সকল সমালোচক বা বিরুদ্ধ মতের মানুষকে গালি দেন।

অষ্টমত, ইন্টারনেট বাজারে আসার পর এদের অনেকে সারাটা দিন শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পার করেন। তারা মনে করেন একটা স্ট্যাটাস বা নোট লিখলে, অথবা একটা মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যে আলোচনা করলেই কর্তব্য পালন হয়ে যায়। ইন্টারনেটে বিপ্লব করতে করতে বাস্তবের দুনিয়ায় এদের আর কিছু করা হয়ে ওঠে না।

***************************************************

বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে, অনেকগুলো ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। সেসব ইন্ডাস্ট্রিতে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রমিক-কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মেশার এবং কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার আমি এই ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে কখনো কোন বাম দলের শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দেখিনি। আমার কর্মক্ষেত্রগুলোর কোনটাতে তাদের কোন কর্মসূচীও কখনো দেখিনি। আমি আমার পরিচিত অনেককে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে একই উত্তর পেয়েছি। কাজের প্রয়োজনে আমি গ্রামের কৃষকদের সাথে মিশেছি, তাদের সাথে কাজ করেছি। আমি সেখানেও কোন বাম দলের কৃষক সংগঠনের নেতা-কর্মীকে বা তাদের কোন কর্মসূচী দেখিনি। কারণ, তৃণমূল পর্যায়ে কাজের কষ্টগুলো করার মানসিকতা ও সাহস খুব কম জনের আছে। তারা এসব না করে কেবল নানা রকম তত্ত্ব দেন। সেসব তত্ত্ব বাস্তবের দুনিয়ায় খাটে কিনা সেটা তারা জানেন না, কারণ সেগুলো কোনদিন পরীক্ষীত হয়নি। এসব নিয়ে কিছু বললে তারা ফোঁস করে ওঠেন এবং গালাগালের তুবড়ি ছুটিয়ে দেন। একবার এক নেতাকে বাস্তবের দুনিয়ায় তার দেয় তত্ত্ব যে পরীক্ষীত না সে কথা বলায় তিনি আমার ওপর মারমুখী হয়ে উঠলেন। আমি যে এই ব্যাপারে কতো অজ্ঞ, এইসব ব্যাপারে অমন পরীক্ষণের যে কোন প্রয়োজন নেই সেসব নিয়ে তিনি লম্বা লেকচার দিলেন।

সমাজ ও মানুষের ক্ষেত্রে ভৌত বিজ্ঞানের সাধারণ গাণিতিক সূত্রাবলী সাধারণত কাজ করবে না। এখানে নিয়ামকের সংখ্যা বহু, প্রভাবকের সংখ্যাও বহু। তাছাড়া আচরণ ও প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনে মানুষ একটি জটিল প্রাণী। স্থান-কাল-পাত্রভেদে এখানে প্রতিনিয়ত কৌশল ও উপায় পরিবর্তন করতে হয়। যারা এখানে পরীক্ষণের মাধ্যমে তত্ত্বের উপযোগিতা যাচাইয়ের ব্যাপারটি অস্বীকার করেন তারা সবাই অজ্ঞ তা নয়; বরং তারা তত্ত্ব যাদের ওপর প্রযুক্ত হবে তাদের ব্যাপারে অশ্রদ্ধাশীল ও কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার।

কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের সাথে সত্যিকারের কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকায়, অধীত বিদ্যা থেকে লদ্ধ জ্ঞানের প্রয়োগের অভিজ্ঞতা না থাকায় এদের বেশিরভাগ বাকসর্বস্ব, বুলিসর্বস্ব ও গালিসর্বস্ব।

***************************************************

একটা পুরনো খবর পড়া যাক।

“জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধবাদী কর্মীরা শুক্রবার (৭ই নভেম্বর, ১৯৮০) জনাব খালেকুজ্জামান ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নামে একটি নতুন দল গঠন করেন।

শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই নতুন দল গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।

এই নতুন দলের ১১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটিতে রয়েছেন সর্বজনাব আবদুল্লাহ সরকার, এ এফ এম মাহবুবুল হক, মঈনউদ্দীন আহমদ বাদল, একরামুল হক, আসাফউদ্দৌলা, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, হাবিবউল্লাহ চৌধুরী, মুস্তাফিজুর রহমান, আবদুস সালাম ও মমতাজ বেগম।

জনাব খালেকুজ্জামান সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে বলেন যে, তাঁর দল একটি কম্যুনিস্ট পার্টির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে দেশে এই কম্যুনিস্ট পার্টি গঠন করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাসদ তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সমাজতন্ত্র কায়েমের অপরিহার্য পূর্বশর্ত তথা বিপ্লব সংগঠন করার মত কোন কার্যক্রম জাসদের নেই। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েমে তাঁর দল বিশ্বাসী নয়।“
(‘নয়া দল বাসদ’, দৈনিক বাংলা; ৯ নভেম্বর, ১৯৮০; রবিবার; পৃষ্ঠা ১ – কলাম ১ ও পৃষ্ঠা ১২ – কলাম ৩)

এই অনুষ্ঠানের পর ৩৭ বছর পার হয়েছে, কিন্তু বাসদ থেকে কি আজ পর্যন্ত কোন কম্যুনিস্ট পার্টি গঠন করা হয়েছে? আমার জানা নেই। পাঠকদের কারো জানা থাকলে দয়া করে জানাবেন। অথবা ভবিষ্যতে কবে নাগাদ গঠিত হবে সেটা জানা থাকলেও জানাবেন। এই বক্তব্য মোতাবেক বাসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েমে বিশ্বাসী দল নয়। তাহলে বাসদ এতগুলো জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে কী কারণে অংশ নিয়েছিল? নির্বাচনের মাধ্যমে তারা কী কায়েম করতে চেয়েছিলেন?

আসলে একা বাসদকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, আরেকটু খোঁজ নিলে অমন কথা আরও অনেকের নামে বলা যাবে। যারা নির্বাচন করে যাচ্ছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে জানা যায় না কবে নাগাদ তারা জাতীয় সংসদের সবগুলো আসনে প্রার্থী দেবার মতো এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো সবগুলো আসনে প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয় হবার মতো সামর্থ্য অর্জন করবেন। যারা নির্বাচনে যান না তাদের জিজ্ঞেস করলে খুব স্পষ্টভাবে জানা যায় না বিপ্লব সংগঠনের জন্য তাদের কী কী কর্মসূচী আছে এবং এভাবে কার্যক্রম চালিয়ে গেলে কবে নাগাদ তারা দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারবেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০ সালের অক্টোবরে গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের বাম দলগুলো তারই ধারাবাহিকতায় গঠিত। তার মানে এর মধ্যে ৯৭ বছর পার হয়ে গেছে।

***************************************************

যে শিশুটি ২০০০ সালে জন্মেছে আজ সে ১৭ বছরের তরুণ। আগামী বছর সে একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ হিসেবে গণ্য হবে, ভোটাধিকার পাবে। আগামী বছর সে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করবে, অথবা কাজে যোগ দেবে। আগামী বছর থেকে সে রাজনীতি করার অধিকারী হবে।

এই তরুণটি জন্মাবধি বাংলাদেশে প্রধানত আওয়ামী লীগের শাসনামল দেখেছে। ছদ্ম সামরিক শাসনামলের কিছু কথা হয়তো তার সামান্য মনে আছে, আর বিএনপির শাসনামলের কথা বড়দের মুখে শুনেছে। পতিত সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদকে সে চেনে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রয়োজনে টিকিয়ে রাখা একটা ‘রাজনৈতিক ভাঁড়’ হিসেবে। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নাম সে শুনেছে, কারণ কখনো কখনো সরকার (আওয়ামী লীগ) আর বিরোধী দলের (বিএনপি) লোকজন বক্তৃতায় তার নাম উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সে কিছু জানে, কারণ তাঁর সম্পর্কে মিডিয়াতে বলা হয়।

এই তরুণের যদি বইপত্র পড়ার অভ্যাস থেকে থাকে তাহলে সে দেশের ইতিহাস যতটুকু পড়েছে সেখানে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এই তিন জন আর তার সাথে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া সম্পর্কে জেনেছে। পার্টি হিসেবে সে আওয়ামী লীগ, বিএনপিকে চেনে; জাতীয় পার্টি আর জামায়াতের নাম জানে। আরও কিছু রাজনৈতিক দলের নাম সে শুনেছে তবে তাদের কোন কার্যক্রম তার চোখে পড়েনি।

এই তরুণটি জেএমবি-আইএস-আলকায়েদা-আনসারুল্লাহ-হিজবুত তাহ্‌রীর-হেফাজতের নাম জানে তাদের নৃশংসতা ও তাণ্ডবের জন্য। এগুলো কী প্রকার সংগঠন সেটাও সে কিছু জানে। জঙ্গীবাদ-খেলাফত-সাম্প্রদায়িকতা-নাস্তিকতা-মৌলবাদ এই শব্দগুলো প্রতিনিয়ত শুনতে শুনতে এগুলো সম্পর্কে ঠিকবেঠিক কিছু একটা ধারণা তার মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।

এই তরুণটি মার্ক্স-অ্যাঙ্গেল-লেনিন-স্তালিন-মাও’কে সে চেনে না। তবে চে গুয়েভারাকে সে চেনে, কারণ টী-শার্টে তার ছবি দেখেছে। মণি সিংহ-ফরহাদ-সিরাজ শিকদার-আবু তাহের’দের নাম সে শুনেছে কিনা মনে করতে পারে না। তবে সে জানে যে কমিউনিস্ট পার্টি বলে এক রকমের পার্টি আছে যারা বিপ্লবের কথা বলে, সমাজতন্ত্রের কথা বলে। পত্রপত্রিকায় সে দেখেছে বা লোক মুখে শুনেছে এদেরকে বামপন্থী বলে; কেন বলে তা সে জানে না। বাংলাদেশের বামপন্থীদের এই বিপ্লবটা কী জিনিস সেটা সে পঞ্চাশের একটু এপাশ ওপাশের বয়সী তার বাবা-কাকা-মামাদের জিজ্ঞেস করেছে; কিন্তু তারা খোলাসা করে কিছু বলতে পারেননি; কারণ, তাদের বাবাদের প্রজন্মের সামনেও বিপ্লবকে একটা ধোঁয়াটে জিনিস করে রাখা হয়েছিল। ইন্টারনেটে ব্রাউজ করতে গিয়ে অমন কয়েকটা বামপন্থী পার্টির ওয়েবসাইটে সে ঢুকে দেখেছিল সেখানে অনেক বিষয়ে লেখা আছে। গোড়া থেকে শুরু করার জন্য সে পার্টির ঘোষণাপত্র, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচী ইত্যাদি পড়তে নিয়েছিল, কিন্তু বেশি দূর আগাতে পারেনি। ওসব বাংলা বা ইংলিশে লেখা হলেও ভাষাটা কেমন যেন দুর্বোধ্য, অথচ কঠিন বাংলায় বা ইংলিশে লেখা রচনা সে মোটামুটি বুঝতে পারে।

এই তরুণদের নিয়ে বা সামনে আরও যে কোটি কোটি তরুণ আসবে তাদের নিয়ে এইসব বাম দলগুলোর কোন কর্মসূচী নেই। তাদের নিয়ে বিশেষ কোন ভাবনাও নেই। এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে যাদের ছাত্র সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে তারা বলেন যে তারা অনেক কাজ করছেন। বাস্তবে খুব অল্প কিছু সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বা স্নাতক মহাবিদ্যালয় ছাড়া অন্যত্র এইসব ছাত্র সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রায় অস্তিত্ত্বহীন। যেখানে তারা আছেন সেখানেও মূল দলের লেজুড়বৃত্তিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় নেই।

***************************************************

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করেন, তুমি কোথাকার কে হে বাপু যে এতসব কথা বলছো? আর আমাদের পার্টি কীভাবে চলবে না চলবে সেটা কি তোমাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে নাকি? উত্তরে সবিনয়ে বলতে চাই, আমি হচ্ছি দেশের ষোল-সতের কোটি মেহনতী মানুষদের একজন যাদের নাম ভাঙিয়ে আপনাদের রাজনীতি চলছে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহীতার ধাত আপনাদের মধ্যে নেই বলে আপনারা আমাদের প্রশ্ন করাকে সহ্য করতে পারেন না। আপনারা অনায়াসে দল ভাঙেন - দল গড়েন, দল ছাড়েন - দলে ফেরেন, কিন্তু এর জন্য কখনো কোন কৈফিয়ত দেন না। আপনাদের এক এক জনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইতিহাসে দলের নামের সংখ্যা কয়েক গণ্ডা। মাঝে মাঝে আমরা খেই হারিয়ে ফেলি আপনাদের এক একজনের আসল দল কোনটা! আপনারা নির্বিকারভাবে বলে দিতে পারেন, চল্লিশ বছর আগে আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। অথচ এই চল্লিশ বছরে আপনাদের ভ্রান্ত নেতৃত্ব ও রাজনীতিতে দেশ ও দেশের মানুষের যে ক্ষতি হলো তার দায় বহন করেন না। আপনারা কোন কিছুতে লজ্জিত হন না। আপনাদের কোন অনুশোচনা নেই। কারণ, আপনারা আমাদেরকে অশ্রদ্ধা করেন।

***************************************************

স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন জাগবে, আমরা কি তাহলে এইসব রাজনৈতিক দল আর তাদের নেতাকর্মীদের নাকচ করে দেবো? এবং আমরা কি বাম/মার্ক্সবাদী/সমাজতন্ত্রী/কমিউনিস্ট/গণতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার রাজনীতিকেই নাকচ করে দেবো? এক শব্দে এর উত্তর হচ্ছে, না।

আমরা জানি, অনেক পার্টি অমিত সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল তারপর হ্রষ-ই কার হবে নাকি দীর্ঘ-ই কার হবে সেইরকম বিতর্কে সব সম্ভাবনা শেষ করেছে। ‘দ্বন্দ্বেই বিকাশ’ বলে আসলে ‘বিভক্তিতে লয়’ হয়েছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের এইসব রাজনৈতিক দলে এমনসব নেতাকর্মী আছেন যারা আসলেই প্রাজ্ঞ, সৎ, নিষ্ঠাবান, দেশপ্রেমিক ও মানবহিতৈষী। তাদের কারো কারো জীবনেতিহাস জানলে আসলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়। কিন্তু যে কারণেই হোক এই মানুষগুলোকে নিয়ে বৃহৎ পরিসরের ঠিকঠাক রাজনৈতিক দলটি গড়ে ওঠেনি, বিভেদ মুছে ঐক্যের শক্তি জড়ো হয়নি।

সমালোচনা ও ভিন্নমতকে স্বাগত জানানো, নতুন নেতৃত্ব বিকশিত হবার সুযোগ দেয়া, পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মকৌশল নির্ধারণ করা, জনসাধারণের সাথে মিশে তাদের কথা শুনে বুঝে সে অনুযায়ী কর্মসূচী ঠিক করা, জনগনের ভাষায় কথা বলতে-লিখতে শেখা, সাধারণকে ও তাদের অভিমতকে শ্রদ্ধা করা, নিজেদের কাজের ব্যাপারে স্বচ্ছতা থাকা ও সর্বসাধারণে জবাবদিহীতা থাকা, সর্বোপরি সময়ের সাথে সাথে অভিযোজিত পুঁজিবাদের শক্তিগুলো সম্পর্কে জেনে সেই অনুযায়ী নীতি-কৌশলের পরিবর্তন করা দলকে সত্যিকারের গণমানুষের দলে পরিণত করবে। বিপ্লবের কর্মসূচী স্পষ্ট ও সাধারণে বোধগম্য হতে হবে; এবং এই ব্যাপারে লক্ষ্য ও সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। মানুষ কখনোই অস্পষ্ট লক্ষ্য, অনির্দিষ্ট কর্মসূচী নিয়ে বিপ্লবের জন্য অনির্ধারিত কাল অপেক্ষা করতে রাজী হবে না। এবং বাস্তবে তারা রাজী হয়ওনি।

যারা এখনো মনে করেন — অল্প কিছু মানুষের দল সশস্ত্র ঘটনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারকে উৎখাত করবেন আর দলে দলে মানুষ তাদের পতাকাতলে জড়ো হবেন, বিপ্লব সফল হয়ে যাবে — তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। অতীতে কোন এক কালে, কোন এক দেশে কী ঘটেছিল সেটাকে পরম সত্য বলে ধরে থাকলে বিপ্লব চিরকাল অধরা থেকে যাবে। এর জন্য অন্যদেরকে দোষারোপ করা যাবে, কিন্তু কোন ফললাভ হবে না। একজন নেতা/রাষ্ট্রবিজ্ঞানী/সমাজবিজ্ঞানী/দার্শনিক কোন এককালে সমাজ-রাষ্ট্র-বিশ্ব নিয়ে যা বলে গেছেন সেটাকে ঐশীবাণীর মতো অভ্রান্ত, অপরিবর্তনীয়, অসংশোধনীয় মনে করলে পরিণতি মৌলবাদীদের মতো হবে। জোর করে অন্যের ভালো করে দেবার মতো কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ধারণ করে থাকলে একসময় জনগণ ঠিক ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

বুঝতে হবে, যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে কয়েক কোটি মানুষকে মারতে হয়, এবং আরও কয়েক কোটি জনকে শ্রমশিবিরে পাঠাতে হয়, পরিবেশের বারোটা বাজাতে হয় সেটা বিপ্লব নয় — অসভ্য-উন্মাদ-জানোয়ারের কর্মকাণ্ড। বুঝতে হবে, নেতা মরতে না মরতে (অথবা জরাগ্রস্থ হতে না হতে) যে নীতি ধ্বসে পড়ে সে নীতির গোড়াতেই গলদ ছিল। বুঝতে হবে, গোপন পুলিশ আর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর অত্যাচার দিয়ে কণ্ঠ-হাত বন্ধ করে, মগজে কারফিউ দিয়ে স্বল্পমেয়াদী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা যায় — দীর্ঘমেয়াদে টেকা যায় না। বুঝতে হবে, মিথ্যা প্রচারণা দিয়ে জনগণকে সাময়িক ধোঁকা দেয়া যায়, কিন্তু তাদের মন জয় করা যায় না। বুঝতে হবে, সবকিছুতে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র খোঁজা, অন্তর্ঘাতের দোহাই দেয়া নিজেদের অযোগ্যতা আর দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে — শক্তিকে নয়।

***************************************************

সর্বক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদ, নয়া সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশবাদ যে অমানবিক, অসম, বিভেদমূলক, শোষণমূলক সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছে সেখানে অধিকাংশ মানুষ প্রতিনিয়ত শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত হচ্ছে। একটি আধুনিক, মানবিক সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা এমনটা হতে পারে না। এই অবস্থার অবসানের জন্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন আবশ্যক। বৈপ্লবিক পরিবর্তন সফল করতে গেলে বিপ্লবী সংগঠন, বিপ্লবী কর্মসূচী, বিপ্লবী কর্মী আবশ্যক। নিজেদের গোঁয়ার্তুমি, আমিত্ব, পুরনো ধ্যানধারণা, ‘পাত্রাধার তৈল নাকি তৈলাধার পাত্র’ জাতীয় বিতর্ক, অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা, খাটাখাটুনি করতে অনীহা পরিত্যাগ করতে না পারলে ডজন ডজন নামসর্বস্ব অকার্যকর দল তৈরী হয়ে দলাদলি হবে, কিন্তু বিপ্লবের পথে এক চুল আগানো যাবে না। শোষকেরা চায় এই দলাদলিটা বজায় থাকুক, এই অনৈক্য জোরদার হোক, নেতৃত্বের বিকাশ না হোক। মেহনতী মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের ‘ইগো’ বজায় রাখলে আখেরে প্রতিপক্ষ ছাড়া আর কারও লাভ হয় না।

***************************************************

আমি আস্থা রাখতে চাই নতুন দিনের মানুষদের ওপর যারা পুরনো ধ্যানধারণাকে ছুঁড়ে ফেলবেন। যারা কোন তত্ত্বকে অভ্রান্ত, অপরিবর্তনীয়, অসংশোধনীয় মনে করবেন না। যারা বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তনকল্পে বৃহত্তর সংগঠন গড়ে তুলবেন। যারা সঠিকটা গ্রহন করতে আর বেঠিকটা বর্জন করতে কুণ্ঠিত হবেন না। যারা ব্যক্তির স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, প্রকাশের স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা, বেছে নেবার স্বাধীনতাকে নীতি আর রীতির বেড়াজালে বাঁধবেন না। যারা যুক্তি, প্রমাণ ও পরীক্ষণে আস্থা রাখবেন। যারা সব সময় নতুন নেতৃত্বকে বিকশিত হবার সুযোগ দেবেন।

প্রকৃতিতে কোন প্রজাতি জাতিগতভাবে আত্মহননের পথে যাবার কথা নয়। এক সময় না এক সময় সে সেই পথ থেকে জীবনের পথে ফিরবে। মানুষও তার ব্যতিক্রম হবার কথা না। তাই মেহনতী মানুষের জয় হবেই। বিপ্লব অনিবার্য।


মন্তব্য

হাসিব এর ছবি

বৃহত্তর পরিসরে দেশের রাজনীতিতে তার কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।

আমি এটাতে দ্বিমত করি। বামপন্থিরা দেশের মিডিয়াতে (কর্মী বা অতিথি) তাদের পার্টির আকার অনুপাতে বেশ ভাল প্রভাব রাখে। মিডিয়াতে প্রভাব রাখতে পারা মানে রাজনীতিতে প্রভাব রাখা।

‘আমি আগেই কইছিলাম বাঁধ ভাইঙ্গা যাইবো’

এটার একটা পোশাকি নাম আছে - গেটিয়ার প্রবলেম। একটা পোস্ট লিখতে হবে এই সমস্যা নিয়ে।

বুঝতে হবে, যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে কয়েক কোটি মানুষকে মারতে হয়, এবং আরও কয়েক কোটি জনকে শ্রমশিবিরে পাঠাতে হয়, পরিবেশের বারোটা বাজাতে হয় সেটা বিপ্লব নয় — অসভ্য-উন্মাদ-জানোয়ারের কর্মকাণ্ড।

বাংলাদেশের বামপন্থিরা এই নির্মমতা তাদের আলাপে আনতে পারেনি। সারাক্ষণ দেশের এবং ৭২-৭৫এর পুঁজ রক্ত শুষেই এদের দিন পার করতে হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

"বৃহত্তর পরিসরে দেশের রাজনীতিতে তার কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না" - এই কথাটি আমি বলেছি শিল্পাঞ্চল ও কৃষিক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী (সাময়িক ইস্যুভিত্তিক নয়) আন্দোলন সংগঠনের প্রেক্ষিতে। এই দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন সংগঠনের ব্যাপারটি তার ক্ষুদ্রায়তন ও নিয়মিত বিরতির জন্য আসলেই বৃহত্তর পরিসরে দেশের রাজনীতির ধারাতে প্রভাব রাখতে পারছে না।

বামপন্থিরা দেশের মিডিয়াতে (কর্মী বা অতিথি) তাদের পার্টির আকার অনুপাতে বেশ ভাল প্রভাব রাখে। মিডিয়াতে প্রভাব রাখতে পারা মানে রাজনীতিতে প্রভাব রাখা।

- এটা যান্ত্রিক সরলীকরণ হয়ে গেলো। এটা ঠিক যে, বাম দলগুলোর কিছু নেতাকর্মী টেলিভিশনে ভালো কাভারেজ পাচ্ছেন এবং অনেকে সোশ্যাল মিডিয়াতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অনুসরণকারী তৈরী করতে পেরেছেন; কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে এবং যে কোন পর্যায়ের নির্বাচনের ফলাফলে তার কোন প্রভাব নেই। লোকে তাদের সুন্দর, যুক্তিপূর্ণ কথা শোনেন, সাথে সায়বাচক মাথা নাড়েন; কিন্তু তাদেরকে আস্থায় নেন না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বাংলাদেশের বামপন্থিরা এই নির্মমতা তাদের আলাপে আনতে পারেনি

- রোমানভ পরিবারের সদস্যদেরকে এবং তাদের নিকটজনদেরকে যে নৃশংস কায়দায় অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে, লাশ বিকৃত করা হয়েছে তার কারণ, যৌক্তিকতা আমি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের বা অন্য কোন দেশের বাম ধারার নেতা-কর্মী-বুদ্ধিজীবি-লেখকের কাছ থেকে শুনতে বা জানতে পারিনি। কারো জানা থাকলে দয়া করে জানাবেন।

বাংলাদেশে পুলিশ/আনসার/বিডিআর-এর সিপাই (যারা আসলে হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান); চাঁদা দিতে অসমর্থ মুদী দোকানদার বা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, হাটে মাল বেচতে আসা নিম্নবিত্ত; এবং যাকে তাকে প্রতিবিপ্লবী/সরকারের দালাল/সংশোধনবাদী আখ্যা দিয়ে যারা খুন করেছে (এবং করে যাচ্ছে) তাদের কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই করে কোন বক্তব্য দেশের বাম নেতা-বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। আবার তাদেরকে নাকচ করে, এবং তাদেরকে উৎখাত করতে রাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েও এরা কোন বক্তব্য দেয় না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নগণ্য সিং এর ছবি

বুঝতে হবে, যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে কয়েক কোটি মানুষকে মারতে হয়, এবং আরও কয়েক কোটি জনকে শ্রমশিবিরে পাঠাতে হয়, পরিবেশের বারোটা বাজাতে হয় সেটা বিপ্লব নয় — অসভ্য-উন্মাদ-জানোয়ারের কর্মকাণ্ড।

- এটা যান্ত্রিক সরলীকরণ হয়ে গেল না?

যাক গে, সুন্দর লেখাটার জন্য ধন্যবাদ।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

এটা আমার কাছে যান্ত্রিক সরলীকরণ মনে হলে আমি তা বলতাম না। আপনি ভিন্ন মত পোষণ করতেই পারেন। আপনি ইচ্ছে করলে আপনার মতের পক্ষের যুক্তিগুলো এখানে দিতে পারেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ফারুকুর এর ছবি

বাংলাদেশের বামপন্থীগনের বৃহত্তম(?) আখড়া সিপিবির নেতৃত্ব দীর্ঘদিন যাবত ছিল পাকিস্তান আমলের আমলাদের পুত্রদের হাতে। শ্রদ্ধেয় মনজুরুল আহসান খানের পিতা ছিলেন ফুড ইন্সপেক্টর (মাশাল্লাহ উনার কলেবরও ছিল বিপুল), মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের পিতাও ছিলেন আমলা। আমলাপুত্ররা জন্মাবধি নানারকম সুযোগ-সুবিধা পাইয়া ও দেইখা অভ্যস্ত। এর প্রতিফলন তার রাজনীতী জীবনেও পড়ে। খেটেখাওয়া মজদুরের নেতৃত্ব দিতে হলে আগে নিজে দুয়েক বছর খেটে খাইতে হবে ত। সারা জীবন মাখন দিয়া পাউরুটি আর হরলিকস খেয়ে সেলিম সাহেব হইলেন পান্তা খাইতে পায় কি পায় না এমন মানুষের সংগঠন ক্ষেতমজুর সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ফলাফল হইতেছে ক্ষেতমজুরদের কথা ঠিকমত কেউ বলেও না, ঠিকমত কেউ শুনেও না। মাঝখান দিয়া সংগ্রামী বিপ্লবী সেলিম সাহেব কন্যার গ্রেজুয়েশনে আমাদের সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকায় আইসা ফতোয়া দিলেন যে আমেরিকা ইজ এ গ্রেট নেশন। এই কথা যদি উনার সমিতির কোন ক্ষেতমজুর কইত, সেলিম সাহেবের লেকচারে আগুন বাইর হইত। উনাদের পার্টির কচি নেতাগুলির বাপ-মামার হদিশ নিলে দেখা যাবে অর্ধেক আসছে আইয়ুবপন্থী ফেমিলি থেকে।

বাংলাদেশের মস্কোপন্থী বামেরা যা বলে, তা করে না, যা করে, তা বলে না, যা করা উচিত আর বলা উচিত, তা বলেও না করেও না। সভিয়েত ইউনিয়নের ভাতা খেয়ে পেট ফুলায়ে এখন সারাক্ষন আশেপাশে ভাতার খুজে খুজে আর দশ হাজার মাইল দুরের বিপ্লব স্মরনে সভায় বক্তৃতা দিয়েই উনাদের দিন চলবে। সারাদিন সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ফেসবুকে সাম্রাজ্যবাদরে বকাবকি করে আংগুল ক্ষয় করা পর্যন্তই উহাদের দৌড়। উনাদের মধ্যে যারা চতুর, তারা বড় হয়ে একদিন শ্রদ্ধেয় মতিউর রহমান হয়ে ইতিহাসকে গনিমতের মাল বানাবেন, অথবা নুরুল ইসলাম নাহিদ হয়ে শিক্ষা ব্যাবস্থারে জার নিকলাস বানাবেন।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ভারতবর্ষে বাম আন্দোলনের নেতৃত্ব শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রধানত বুর্জোয়াঁ ভদ্রলোক বা তাদের পরিবারের সন্তানদের হাতে ছিল (আছে)। ভারত ভাগের পর পাকিস্তান হলে এদেশের বাম আন্দোলনের নেতৃত্ব "ও তো মুচলমানের ছেলে, ও কি কমিউনিস্ট হতে পারবে?" এমন প্রশ্ন করা বামুনের ছেলেদের হাত থেকে মূলত মুসলমান আইসিএস/সিএসপি'দের ছেলেদের হাতে চলে আসে। তার সাথে যুক্ত হয় দেউলিয়া জমিদার পরিবারের ছেলেরা। এই কারণে ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে পার্টির নেতৃত্বে সর্বহারা শ্রেণীর কেউ খুব একটা উঠে আসতে পারেনি। ভাষার ব্যারিয়ারটা এমন সব কারণে তৈরী করা হয়েছিল।

স্বাধীন ভারতে যখন বিলাতফেরত বা প্রতিদিন 'ব্লু লেবেল' পান করারা নেতৃত্বে এসেছে, তখন পাশাপাশি বাংলাদেশেও নেতৃত্বটা প্রধানত তরুণ বয়স থেকে জীপ/এসইউভি দাপিয়ে বেড়ানোদের হাতে এসেছে। পার্টির কাঠামোটা এমনভাবে দাঁড় করানো হয় যেখানে সর্বহারা শ্রেণীর কেউ খুব সহজে নেতৃত্বের সিঁড়ি বেয়ে খুব একটা উপরে উঠতে পারবে না।

সত্তরের দশকের কথা বলতে পারবো না, আশির দশকে যারা বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির নেতা ছিল নব্বইয়ের দশকে গিয়ে তাদের অবস্থান দেখলে বোঝা যায় নেহারুলরা সব কালেই ছিল।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আপনার লেখাটি যেমন সুবিশাল, এ নিয়ে আলোচনাও চলতে পারে দিনের পর দিন, আশা করি তাই চলবে। আপনার এটা কোন ধরনের লেখা, সে ব্যাপারে আপনার নির্দেশনা সংক্ষিপ্ত- রাজনীতি এবং চিন্তাভাবনা। আসলেই কি তাই? আমার তো মনে হয় এর ক্যাটাগরি হতে পারে অজস্র। আমার বেশ সন্দেহ- লেখাটিতে এই যে কঠোর সমালোচনা এবং নিষ্ঠুর মূল্যায়ন, তার আড়ালেও রয়ে গেছে এক ধরনের গভীর হতাশা এবং বেদনা।

তরুণ বয়সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম, এই বিশ্বের সর্বত্র আজ হোক কাল হোক, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে। তবে আমার নিজের দেশে অচিরেই যে তেমন কিছু ঘটবে, সে বিষয়ে খুব একটা আশাবাদি ছিলাম না। সক্রিয়ভাবে কোন দলের কর্মকান্ডে জড়িত না হলেও যাঁরা এ ব্যাপারে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের প্রতি বেশ শ্রদ্ধার ভাব ছিল। মস্কোপন্থীদের ছাত্র সংগঠনটিকে অনেকে হারমোনিয়াম পার্টি বলে কটাক্ষ করতেন। এর কারন জিজ্ঞেস করলে চীনপন্থী একটি দলের নেতা গোছের একজন বলেছিলেন- আসল কাজের খোঁজ নাই, আছে খালি নাচ গান তবলা হারমোনিয়াম নিয়া। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমার পছন্দ ছিল হারমোনিয়াম পার্টিওলারাই, কারন তাঁদের সাথে তত্ত্বালোচনা ছিল স্বস্তিদায়ক, তুলনায় চীনা পন্থীরা ছিলেন বেশ কট্টর। তবুও, যে কোন একটি পন্থীওয়ালারা অতি সত্বর দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করে ফেলুক, মনে মনে এটা চাইতাম।

সমাজতন্ত্রের প্রতি আমার এই মুগ্ধ ভালবাসায় একদিন কঠিন চপোটাঘাত করলেন আমার এক মেন্টর। তিনি সুনিদ্রিষ্টভাবে কোন ধরনের রাজনীতির প্রতি অনুরক্ত তা ঠিক বুঝে উঠতে পারি নাই, কিন্তু মনে মনে আশা ছিল, সমাজতন্ত্রের মত মহৎ একটি ব্যবস্থার প্রতি তাঁর অনুমোদন না থেকেই পারে না। তখন ভালেছা পোল্যান্ডে সমাজতন্ত্রের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন, আর রাশিয়ায় ইয়েলেতসিন সমাজতন্ত্রের অট্টালিকার গোড়া ধরে ঝাঁকুনি দিতে শুরু করেছেন। আমার মেন্টর বললেন, দেখ- এই সমাজতন্ত্র টমাজতন্ত্র আসলে মানুষের চরিত্রের সাথে যায় না। মানুষ পিপড়া কিংবা মৌমাছির মত নিঃস্বার্থ নয়, সে অন্যের সাথে স্বার্থ ভাগাভাগি করতে চায় না, অন্যকে ছাপিয়ে যেতে চায়। স্তন্যপায়ী প্রানীদের মধ্যে মানুষের বিবর্তন হয়েছে সবচেয়ে পরে, তাঁর বিবর্তনের গতিও সবচেয়ে বেশী। তাকে ছাঁচে ঢেলে কাঠামোবদ্ধ করা সম্ভব নয়। ১৯৩০ সালের মডেলের ঘড়ি কিংবা সাইকেল দিয়ে তাকে ১৯৯০ সালেও তৃপ্ত রাখা সম্ভব নয়। তখন গর্বাচেভ পেরেত্রেইকা চালু করেছেন, আমার মেন্টর রাশিয়া ঘুরে এসে জানালেন একটি কোকাকোলার ক্যান দিয়ে রাশিয়ান একটি ছেলের মাথা কিনে নেয়া যাচ্ছে, সস্তা একটি জিন্সের প্যান্ট দিয়ে একটি রাশান তরুণীর সর্বস্ব হরণ করে নেয়া যাচ্ছে। সমাজ, জাতি, দেশ বিপ্লব, ত্যাগের মহিমা, জনজীবনে এইসব আপ্তবাক্যের সত্যকার অর্থে কোন অস্তিত্ব নাই। এর কিছুদিন পর সত্যি সত্যি ভেঙ্গে পড়লো তাশের দেশ।

আমেরিকা প্রবাসী এক বন্ধু এসে মিঠে/কড়া পানীয়ের এক আসরে আমন্ত্রন জানালো। সেখানে দেখা হল চিনপন্থী এক অগ্রজ ভাইয়ের সাথে। জমজমাট রসের ফোয়ারা এড়িয়ে আমরা দুজন এক কোনে কিছুটা অন্ধকারে গিয়ে বসলাম। তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে পুস্প দলন ততদিনে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, চীনের সমাজতন্ত্র অটুট আছে, তবুও ভাইকে দেখলাম বিমর্ষ! রাশিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে গভীর পরিতাপের সঙ্গে বললেন- এই মানুষের জন্য লেনিন সংগ্রাম করে গেছেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এদের জন্যই দুকোটি মানুষ জীবন দান করে গেছেন? আমিই বা কি করেছি? করছি? কাদের জন্য? আমার এবং আরও অগণিত মানুষ তাঁদের সর্বস্ব ত্যাগ তাহলে কাদের জন্য? ভাইয়ের গভীর হতাশা কিংবা প্রবল অনুযোগ চলমান রসের ফোয়ারায় কোন বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারলো না।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ক্যাটেগরিতে শব্দের ভীড় বাড়িয়ে কী হবে! আসলে যা বলার তা শিরোনামে বলে দিয়েছি। লেখার বিশ্লেষণ বা টোনের কোন কিছুতে যদি হতাশা বা বেদনা পরিলক্ষিত হয় তাহলে দুঃখিত। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আনন্দ-বেদনা, আশা-হতাশা, উৎসাহ-ক্ষোভ কিছুই ফুটে ওঠা উচিত না।

শেখর দত্তের এই লেখাটা দেখতে পারেন। সেখানে কিছু গোঁজামিলের কথা জানতে পারবেন। অবশ্য শেখর দত্তের সোভিয়েত পরবর্তী অবস্থান জানলে এতে আর অবাক হবেন না। আমার কাছে যেটা অবাক লাগে তা হচ্ছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর গণচীনের বাইরের পার্টিগুলোতে এমন একজন মানুষও কি ছিলেন না যিনি অনিয়ম, গোঁজামিল, অমানবিকতা, নৃশংসতা, মূর্খতা, গড্ডল প্রবাহে গা ভাসানো, অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ইত্যাদির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন? এবং তিনি কি বলেছিলেন, এরা ভুল করছে, ভুল পথে যাচ্ছে?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ঈয়াসীন এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ধন্যবাদ।

অটঃ সুওমি'রা তাদের পূর্বদিকের কোন প্রতিবেশিকে পছন্দ করে - নব্বইয়ের আগের জনকে নাকি এখনকার জনকে?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ঈয়াসীন এর ছবি

সুওমালাইনেন (সুওমি দেশের নাম আর জাতির নাম এদের ভাষায় সুওমালাইনেন, বহুবচনে সুওমালাইসেত) রা তাদের এই প্রতিবেশিকে তুলনামূলক ৯০ এর আগের অবস্থাতেই পছন্দ করতো। সে সময় সেভিয়েত ইউনিয়ন তাদের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। বর্তমানে হাজার হাজার রুশ নাগরিক ফিনল্যান্ডে এসে বিভিন্ন ব্যবসা শুরু করেছে, এতে ফিনিশ মালিকানার অনেক কোম্পানি তাদের হাতে চলে যাচ্ছে, এতে তারা শঙ্কিত। তবে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও আছে। অনেক ফিনিশ নাগরিক মনে করে আগত রুশ নাগরিকেরা ক্ষেত্রবিশেষে আশীর্বাদ স্বরূপ। ছোট্ট একটা উদাহরন দিই- সীমান্তের কাছাকাছি একটি শহর আছে যার নাম 'ইমাত্রা'। শহরটি তৈরির সময় এক লক্ষ মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তা তৈরি করা হয়েছিল। ফিনল্যান্ডে অনেক কিছুই আছে কিন্তু মানুষ নেই। গোটা ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যা ৫৫ লক্ষ। ইমাত্রা শহর তৈরি হবার পর দেখা গেল সেখানে মোট জনসংখ্যা ৫ থেকে ৬ হাজার। বিশাল বড় শহর (ফিনল্যান্ডের অন্যান্য শহরের তুলনায়), হাসপাতাল থেকে স্কুল, স্কুল থেকে মার্কেট প্লেস, তা থেকে বসত বাড়ি- সবই দূরে দূরে। নতুন শহর বিধায় সেখানে অনেক দোকানপাট আর ব্যবসা গড়ে উঠলো কিন্তু পর্যাপ্ত গ্রাহক নেই। শেষে রাশিয়ানরা দলে দলে সেখানে আসাতে এখন সেখানকার জনসংখ্যা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা এতে দারুণ খুশী। আমার এক আত্মীয়র সেখানে গাড়ির দোকান। সে জানালো তার ৯০% গ্রাহক রাশিয়ান।

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বিস্তারিত তথ্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। একটা অনুরোধ করি। অভিবাসীদের ধারাবাহিক আগমনের দরুন ইউরোপের দেশগুলোর সংস্কৃতি, লোকাচার, আচরণ, অভ্যাস, খাদ্য, পোশাক, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে একটু একটু করে পরিবর্তন আসছে। আপনি ফিনল্যান্ডে যেসব স্থানে ছিলেন/আছেন সেসব স্থানের এইসব পরিবর্তন নিয়ে লিখতে পারেন। অনেক ছোট ছোট অ্যানেকডোট থেকে অনেক বড় কিছুর অস্তিত্ত্ব বা আগমন সম্পর্কে ধারণা করা যায়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ঈয়াসীন এর ছবি

আরেকটি বিষয়- এ বছর কিন্তু শুধু অক্টোবর অথবা রুশ বিপ্লবেরই ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে, তা নয়; ফিনল্যান্ডের স্বাধীনতারও ১০০ বছর এবং ১০০ বছর আগে ফিনল্যান্ড কিন্তু রাশিয়ার থেকেই স্বাধীনতা পেয়েছিল। রুশ বিপ্লবের এক দেড় মাস পরই কিন্তু সমঝোতার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে ফিনল্যান্ড আলাদা হয়ে যায়।

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

চমৎকার! এই তথ্যটা জানা ছিল না। মুক্ত, স্বাধীন ফিনল্যান্ড দীর্ঘজীবি হোক!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

আমার মতে, রাত যত গভীর হয় চোর তত নিকটে আসে। হো হো হো

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

যার দেখার দৃষ্টি যেমন। দেঁতো হাসি


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

এবারে অক্টবর বিপ্লবের উপর প্রকাশিত যতগুলো লেখা পড়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে চরম মনে হল এই লেখাটি। অফিসে ঝটিকা সময় নিয়ে পড়ে শেষ করে লিখছি। বিস্তারিত মতামত পরে লিখবো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

বিস্তারিত মতামতের অপেক্ষায় থাকলাম।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মাহবুব লীলেন এর ছবি

আপনের এই লেখা বামের পক্ষে গেলো নাকি ডানের পক্ষে সেইটা কিন্তু ধরতে পারলাম না

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার এই লেখা আপনার-আমার মতো মেহনতী মানুষের পক্ষের লেখা।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

লীলেন ভাই, জানছি যে বেশীরভাগ বামপন্থী এখন ডান হস্তে চালিত। বাংলাদেশে এরা সরকারের বাম বা মলম হিসাবে কাজ করে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনি যদি ক্রমাগত বাম দিকে যেতে থাকেন তাহলে এক সময় দেখবেন গোটা পৃথিবী ঘুরে সবচে' ডানে চলে এসেছেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ এর ছবি

চমৎকার বিশ্লেষণ।
তবে যে আশাবাদ দিয়ে শেষ করেছেন, আমি মোটেও আশাবাদকে আত্মস্থ করতে পারলাম না। তত্ত্বকে অভ্রান্ত, অপরিবর্তনীয়, অসংশোধনীয় বলে ধরে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া না শুধু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুযোগ সন্ধানী কার্যকলাপ, স্ববিরোধতা এবং বর্তমান রাজনীতির গতিপথের সাথে তাল মিলিয়ে ফিরে আসতে পারা আমার কাছে অসম্ভবই মনে হয়।

আপনার আশাবাদের উপর ভরসা রাখলাম।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনার পর্যবেক্ষণ মোটেও ভুল নয়। তবে আমি পুরনো বস্তা টানার ব্যাপারে আশাবাদী না, আমার আশাবাদ ফ্রেশ ব্লাডদের ওপর যারা শূন্য থেকে শুরু করবে। বুড়োরা তাদের খাঁচা ভেঙে বের হয়ে তাদের সাথে যুক্ত হতে পারলে ভালো, নয়তো তারা খাঁচার ভেতরে মরে পড়ে থাকবে। এই ধারা থেকে নিয়মিতভাবে ভাগাড়ের শকুন বের হয়। একটু মড়া'র গন্ধ পেলেই তারা সেখানে পড়িমরি করে ছুটে যায়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

আপনি ট্রটস্কিয়ান, আপনি সংশোধনবাদী, আপনি পুঁজিবাদের দালাল, মূৎসুদ্দী বুর্জোয়া, সিয়াইএর অন্তর্ঘাতক, এবং এই গৎ-এ আর যা যা বলা হত (ভুলে গেছি) তার সব। সব। হা হা হা! চোখ টিপি

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দুই যুগ আগে একবার এক বাম ছাত্র সংগঠন এক ঘটনায় আমাদের মানে পাণ্ডবদের ওপর ব্যাপক ক্ষেপে যায়। তারা এর পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে তারা আমাদেরকে স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন, সাম্রাজ্যবাদের দালাল ইত্যাদি ইত্যাদি তৎসম, তদ্ভব শব্দের উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সেখানকার কিছু শব্দের মানেই বুঝতে পারিনি। তবে হ্যাঁ, এদের গালাগালগুলো বেশ ভারিক্কী রকমের হয়। আপনার স্মৃতিশক্তি ভালো বলতে হবে অন্তত খান পাঁচেক গালি মুখস্থ রাখতে পেরেছেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

হে হে, "সাম্রাজ্যবাদের দালাল"-টা মনে ছিল না। এটা একটা ক্লাসিক। খুব পপুলার ছিল একসময়! দেঁতো হাসি

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আরও আছে। প্রতিক্রিয়াশীল, শ্রেণীশত্রু, আপোষকামী, র'-সিআইএ'র দালাল।

'উৎখাত করা' আর 'হালাল করা' মানে যে আসলে কাউকে খুন করা এটা বুঝতে আমার প্রচুর সময় লেগেছিল।

একবার ঢাকার এক দেয়ালে দেখি বিশাল করে লেখা 'আলবেনিয়ার নয়া ট্রটস্কীপন্থী হোক্সাবাদ নিপাত যাক'। কার গোয়ালে কে দেয় ধূঁয়ো!! অথচ বাংলাদেশ তখন জলপাই গাছের সুশীতল ছায়ায়; কমরেডদের অনেকে দল দলে সে গাছের ফল ডালেরটা পেড়ে, তলারটা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

চীনাবাদামীদের মধ্যকার একদল বিভ্রান্ত তাত্ত্বিক এক সময় ফতোয়া দিয়ে বসলো যে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ঘরানার কম্যুনিস্ট হলেন আনোয়ার হোজ্জা। তারই চীনাবাদামীয় প্রতিক্রিয়া।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সে কথা মনে আছে। আনোয়ার হোজ্জা ওরফে এনভার হোক্সাকে মহিমান্বিত করতে জোসিপ তিতোর পিণ্ডি চটকানো হতো। কমরেড হোক্সাই আসল স্তালিনিস্ট, চেয়ারম্যান মাও স্তালিনপন্থা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, লিন পিয়াও-এর পথই ঠিক, গ্রাম দিয়ে শহরকে ঘিরে ফেলতে হবে, আত্রাইতে জনযুদ্ধ চলছে ................... অনিঃশেষ কুতর্ক, অনিঃশেষ দিবাস্বপ্ন, অনিঃশেষ আত্মহনন!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

................... অনিঃশেষ কুতর্ক, অনিঃশেষ দিবাস্বপ্ন, অনিঃশেষ আত্মহনন!

...................এবং শেষ পর্যন্ত সব কুতর্ক, লেবেলিং, গালিগালাজ, দিবাস্বপ্ন আর বাতলামির পাট "শুকনার" ধোঁয়ায় নিঃশেষে চুকিয়ে দিয়ে লেনিন--স্তালিন-মাও নয়, বরং তাদের এতদিনের পূঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, শ্রেণীশত্রু আর তত্ত্বশত্রুর শত্রু-চূঁড়ামণি মার্কিনিদেরই একটি ডায়ালেক্টিক আপ্তবাক্যঃ

If you can't beat them, join 'em!

- কে মূলমন্ত্র ধরে নিয়ে অনেকেই এখন বিপুল বিক্রমে পুরনো সব ছোট-বড় তথাকথিত শত্রুর কোলে পরম ভালোবাসায় চড়ে বসাতেই নিজেদের মোক্ষ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের অনেকের এই নৈতিক - রাজনৈতিক আত্নবিক্রয় ও পতিতাবৃত্তিতেই মোক্ষ সন্ধানের এমন উদ্দাম আগ্রহ দেখে আরেকটি ইংরেজি বচন মনে পড়ে যায়ঃ

Hell hath no fury like a woman scorned

অবস্থাদৃষ্টে শেক্সপীয়রের অনুকরণে আমরাও হয়তো নতুন আপ্তবাক্য চালু করতে পারি -

Hell hath no fury like a fanatic or ideologue blatantly defeated or proven wrong...

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দেশে অনেক সাবেক বিপ্লবীকে বহুজাতিক কোম্পানী বা এনজিও'তে নানা প্রকার বিশ্লেষক বা উপদেষ্টা পদে কাজ করতে দেখতে পাই। উত্তর আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপের পুরনো পুঁজিবাদী দেশগুলোতে পূর্ব ইউরোপ বা সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর অনেক হাড়পাকা বিপ্লবী এখন নানা জায়গায় লেকচার দিয়ে বা উপদেষ্টার চাকুরী করে কড়কড়ে ডলার/ইউরো/পাউন্ডে পকেট ভরান।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ফারুকুর এর ছবি

হাল আমলের কচি বামগুলি (আমার এক বন্ধু এদের ডাকে বামাচি) একটা গালি পাইছে "দলকানা"। নিজের কথার সাথে না মিললে যারে-তারে দলকানা ডাইকা বসে। যেন নিজেরা দলকানা না, এক একজন পরীর দেশের নুরের পোলা।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

এটা হচ্ছে - "তুমি যদি আমার পক্ষের না হও তাহলে তুমি অবশ্যই আমার শত্রুপক্ষের" - এই নীতির। আত্মগর্বে গর্বিত লোকজন, যারা দীর্ঘদৃষ্টি ও ক্ষীণদৃষ্টি উভয় রোগে আক্রান্ত, তাদের নীতি হচ্ছে এটা।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হাসিব এর ছবি

এক একজন পরীর দেশের নুরের পোলা

ভেবে দেখলাম পরীর দেশের পরীর বয়ফ্রেন্ড বলে কেউ গালি দেয় না। এটা দিলে মনে হয় খারাপ লাগতো না।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পরীর বয়ফ্রেন্ড বলে কিছু নাই। কখনো কখনো পরীর সোয়ামী হয় বটে, তবে সেই সোয়ামী সাময়িক - বেশি দিন টিকে না। মনে করে দেখেন, কোন দেশের গল্পে কোন নায়ক একটা (বা অনেকগুলি) পরী নিয়া সুখে শান্তিতে ঘর করছে, বাড়িঘর ছেলেমেয়েনাতিনাতনীতে ভরে গেছে এমনটা দেখা যায় না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সোহেল ইমাম এর ছবি

মুগ্ধতা নিয়ে লেখাটা পড়লাম।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ধন্যবাদ।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নজরুল ইসলাম এর ছবি

দুনিয়ার মজদুর দূরে গিয়া মর
বিপ্লব করিবার দে মোরে অবসর

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

হ! বিপ্লব দীর্ঘজেবী হোক!!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA