জাসদঃ অসংলগ্ন ভাবনা -১

নৈষাদ এর ছবি
লিখেছেন নৈষাদ (তারিখ: মঙ্গল, ১১/১১/২০১৪ - ৫:৪৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আলসেমি এবং ইন্টারনেট-টিভি আসক্তিতে আয়েশ করে ‘বই পড়া’ খুব একটা হয়ে উঠে না ইদানিং। তবে আমার জন্য সুখের সংবাদ যে সংবাদপত্রে ‘পড়ার মত’ তেমন কিছু পাইনা এখন আর।

গত কয়মাসে যে কয়টা ‘ইতিহাস বিষয়ক’, বই পড়া হয়েছে, তাতে কিছুটা হতাশই হয়েছি। তবে সবচেয়ে হতাশ হয়েছি সামরিক কর্মকর্তার রাজনীতিকে হেয়, তারচেয়ে বেশি নিজেকেই হাস্যস্পদ করে লেখা ইতিহাস বিশ্লেষণের বই হাতে নিয়ে।

তারপরও মহিউদ্দিন আহমেদের লেখা বই ‘জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি’ প্রকাশের সাথে সাথে, বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখার মত করে, কিনতে গেলাম। প্রথমা প্রকাশন দেখে আর কেনা হল না। ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পূর্নলিখন প্রজেক্টের’ বই পড়তে ইচ্ছে হয় না। সেদিন জনাব মহিউদ্দিন আহমেদকে টিভিতে একটা টকশোতে দেখে মনে হল তাঁর বই কেনা যায়।

প্রচুর খেটেছেন জনাব আহমেদ এই বই লিখতে। সাংবাদিকের নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছেন, যদিও পারিপার্শিক অনেক কিছু যোগ করে বইটাকে বেশ মূল্যবান করার সুযোগ ছিল তাঁর কাছে। তবে বইটাতে আছে সিরাজুল আলম খানকে কিছুটা মহামান্বিত করার এবং ১৫ আগস্টের ঘটনাকে অত্যন্ত সরলীকরণ করার চেষ্টা। আমার লেখাটা এই বই নিয়ে কোন আলোচনা না।

বরং সরলীকৃত অসংলগ্ন কিছু ভাবনা নিয়ে ব্লগর ব্লগেরের চেষ্টা। রেফারেন্স গুলি এই বই থেকেই নেয়া।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নিজেদের অভিযাত্রায় নিঃসন্দেহে একদল মেধাবী, ডেডিকেটেড, স্বপ্নচারী তরুণকে দলে নিতে পেরেছিল। জাসদের অফিসিয়্যাল ‘জন্ম’ স্বাধীন দেশে দশ মাসের মাথায় বাহাত্তরের অক্টোবরে- বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, ‘বিপ্লব’, ‘প্রতিবিপ্লবের’ স্বপ্ন নিয়ে উত্থানও ছিল খুব দ্রুত। তারপর মাত্র চার বছরের মাথায়, ছিয়াত্তরে দলের অস্তিত্বের সংকট। একটা স্কুল অভ থট (অথবা কন্সপিরেসি থিওরী) প্রশ্ন করে, জাসদের সেই স্বর্ণযুগ স্বপ্নচারী মেধাবী তরুণ, বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের আড়ালে স্বাধীনতা-বিরোধিদের ‘ইনকিউবেসন পিরিওড’ (Incubation Period) ছিল কিনা সেটা? তারপর ১৯৭৬ এ ‘হোস্ট সেলের’ মৃত্যু? তবে সেটা যে নেতাদের জ্ঞাতসারে করা হয়েছে তা নাও হতে পারে। কুশীলবরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে আজ পর্যন্ত। দেখা যাকঃ

১। জাসদের জন্ম নিয়ে একাধিক ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ আছে। শুরু করি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের (সিরাজপন্থী ‘রব গ্রুপ’ এবং ‘মুজিববাদী গ্রুপ’) বাহাত্তর এর ২১-২৩ জুলাই কেন্দ্রীয় সম্মেলনের ঘোষণা নিয়ে, যে দুটাতেই বঙ্গবন্ধুকে উদ্বোধন করার জন্য আমন্ত্রণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শুধু মুজিববাদী গ্রুপে গিয়েছিলেন। অনেকের ধারণা সেটাই জাসদের সূচনা। আরেকটু আগাই। রব গ্রুপের সম্মেলন আকর্ষণীয় করার জন্য কোলকাতা থেকে শিল্পী আনা হয়েছিল ‘আল মাহমুদের’ ব্যক্তিগত উদ্যোগে। উদীয়মান গণসংগীতশিল্পী ফফির আলমগীর গেয়েছিলেন স্বরচিত গান ‘এক’শ টাকা চালের দাম/ মুজিব বাদের অপর নাম’। যদিও তখনও চালের মন ৬০ টাকা। রব গ্রুপের কার্যক্রমে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। প্রতিবেদনে ‘শ্রেণি সংগ্রাম ত্বরান্বিত করে ধাপে ধাপে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করার’ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।

এবার পিছনে ফিরে যাই। জনাব আহমদ তার বইতে বলেছেন, 'সিরাজপন্থীরা এপ্রিলে (বাহাত্তর) একটা গোপন বৈঠক করেন। সভায় অন্যান্যের মধ্য উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ, আসম আব্দুর রব, মনিরুল ইসলাম, শাজাহান সিরাজ, মো. শাজাহান, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুলতানউদ্দিন আহমেদ, এম এ আওয়াল, নূরে আলম জিকু ও আলী রেজা। ...তারা নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরির ব্যাপারে একমত হন'। সুতরাং পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। হয়ত বীজ বোনা হয়েছিল ষাটের দশকে ‘নিউক্লিয়াস’ গড়ার মাধ্যমে।

১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে উপলক্ষে রব গ্রুপের 'জনসভায়' আ স ম আবদূর রব রাজনৈতিক দলের আভির্বাবের ইঙ্গিত দেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল করার আবশ্যকীয় শর্ত তখনো পূরণ হচ্ছিল না। পরে আরও আলোচনা হবে।

২। জাসদের মূখপাত্র পত্রিকাটির নাম ছিল ‘গণকন্ঠ’, সেটার ইতিহাসের দিকে দেখি। সিরাজপন্থী ছাত্রলীগের একদল কর্মী একাত্তরের শেষ দিকে পুরান ঢাকার র‍্যাংকিন স্ট্রিটে অবস্থিত জনতা প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজেসের দখল নিলেন, নেতৃত্ব ছিলেন ‘আফতাবউদ্দিন আহমেদ’। ঐ প্রেস থেকেই জামায়াত ইসলামীর পত্রিকা ‘সংগ্রাম’ ছাপা হত। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী আফতাবউদ্দিন প্রথম পত্রিকা বের করেন, সম্পাদকের নাম ছিল ‘কবি আল মাহমুদ’। (তারিখটা এবং নামগুলি খেয়াল করুন)

৩। স্বাধীন দেশের পথচলার মাত্র দশ মাসের মাথায় আত্মপ্রকাশ করা দলটির লক্ষ্য ও কর্মসূচীর কিছু অংশ উল্লেখ করি......’তাই জাতির এই যুগসন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজন এবং বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়ানক ও পুতুল সরকারকে উৎখাত করার উদ্দ্যেশ্যে এবং আগামী দিনের সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে...।’ সরকার উৎখাতের প্রতিজ্ঞা স্পষ্ট।

৪। নেতাদের কথা আলোচনা হোক। বাহাত্তরের ২৩ ডিসেম্বর জাসদের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে মেজর জলিল সভাপতি, আ স ম আবদূর রব সাধারন সম্পাদক এবং শাহাজান সিরাজ যুগ্ম-সম্পাদক হন। তাদের পরবর্তী ইতিহাস আমরা জানি। কিন্তু আমার মূল ইন্টারেস্ট সামরিক কানেশনে। দেখা যাক।

জলিল মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন কনিষ্ঠতম মেজর – ৯ নং সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। ডিসেম্বরে ‘ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রেপ্তার হন। তাকে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আদালতের প্রধান ছিলেন মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল আবু তাহের। জলিল নির্দোষ প্রমানিত হন, কিন্তু সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। এর পর থেকেই তিনি উদ্যেশ্যহীন ভাবে ঘোরাফেরা করতে থাকেন। জলিল যখন বুঝলেন সেনাবাহিনীতে তার আর ভবিষ্যৎ নেই, তিনি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। তিনি এসেছিলেন নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এবং অন্য অনেক সেক্টর কমান্ডার তাকে যথেষ্ট ‘এলিট’ মনে করতেন না এবং এড়িয়ে চলতেন। পরে সেই তিনিই কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দীক্ষা নিয়েছিলেন।

জনাব আহমেদ তার বইয়ের ১১৫ পৃষ্ঠায় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। চুয়াত্তরের গোড়ার দিকে মেজর জলিল ভয়েস অভ আমেরিকা, ইউপিআই এবং ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি আমানউল্লার সঙ্গে আলোচনা কালে তাঁকে পাকিস্তানে ভুট্টো ও তার দলের সাথে যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন, এবং তিনি যেন সাথে থাকেন সেই অনুরোধ করেন। জনাব আমানউল্লা অবশ্য জলিলের সেই মিটিঙে থাকতে পারেননি।

জনাব আহমেদ লিখেছেন, লে. কর্নেল আবু তাহের সর্বহারা পার্টিকে অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতেন। একপর্যায়ে তাহের সর্বহারা পার্টিকে একটা ওয়ারলেস ট্রান্সমিটার জোগাড় করে দেন। তাহেরের সাথে জাসদের যোগাযোগ আছে এটা সর্বহারা পার্টির নেতাদের কাছে অজানা ছিল না। তবে যোগাযোগ যে কতটা উঁচু পর্যায়ে, তা তারা বুঝতে পারেনি। আবার সর্বহারা পার্টির সাথে যে তাহেরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে, সেটাও জাসদের কাছে অজানা ছিল না।

আবার সেনাবাহিনীতে সর্বহারা পার্টির কাজ ছিল অফিসারদের মধ্যে। পুলিশ বাহিনীতেও তাদের অনেক লোক ছিল, যারা নিয়মিত তথ্য সরবারাহ করত। সেনাবাহিনীতে লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিন, লে. কর্নেল আবু তাহের, মেজর শরিফুল হক ডালিম (১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত), মেজর নূর চৌধুরী (১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত), ফ্লাইট লে. সালাহউদ্দিন ও মেজর জিয়াউদ্দিন সর্বহারা পার্টির সদস্য ছিলেন অথবা যোগাযোগ রাখতেন।

জনাব আহমদ ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের ব্যাপারে ১৭১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ১৫ আগস্ট ভোরবেলা ঢাকা শহরের অনেক অধিবাসীর ঘুম ভাঙে গোলাগোলির আওয়াজে। দিনটি ছিল ৩০ শ্রাবণ, শুক্রবার। রেডিওতে ঘোষণা শোনা যাচ্ছিলঃ ‘ আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। “সারা বিশ্বে” কারফিউ জারি করা হয়েছে’। তিনি ঘোষণা শেষ করলেন, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে। ঢাকা বেতারে প্রায় ৪৪ মাস পরে আবার জিন্দাবাদ ধ্বনি শোনা গেল।

আবার ১৭৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, লে. কর্নেল আবু তাহের মেজর রশিদের অনুরোধে সকাল নয়টায় ঢাকা বেতারকেন্দ্রে যান। সেখানে তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মেজর ডালিম ও মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে দেখতে পান।

লে. কর্নেল আবু তাহের বঙ্গোভবনেও জান, মিটিং করেন, সেনাবাহিনীর জেনারেল জিয়াউর রহমানকেও ডেকে নেন। তিনি মোশতাককে পাচটি প্রস্তাব দেন এবং সামরিক আইন জারির কথা বলেন। যদিও জনাব আহমেদ তাঁর বইতে লিখেছেন, ‘এ বিষয়ে তিনি গণ বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড কিংবা জাসদ পার্টি ফোরামের সঙ্গে আলোচনা করেননি এবং এসব প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য পার্টি তাঁকে মোন ম্যান্ডেট দেয়নি’।

তবে ১৫ আগস্টের পর গণবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি লিফলেট প্রচার করা হয়। লিফলেটের শিরোনাম ছিল, খুনি মুজিব খুন হয়েছে – অত্যাচারীর পতন অনিবার্য’।

ফিরে আসি ‘ঢাকা বেতারে প্রায় ৪৪ মাস পরে আবার জিন্দাবাদ ধ্বনি শোনা গেল’ এই লাইনটিতে। যদিও জনাব আহমেদ অভ্যুত্থান কে ‘কতিপয় সেনার পারসোন্যাল ভেন্ডাট্টা’ টাইপ বলতে চেয়েছেন, কিন্তু আমরা জানি এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের পিছনে ফরে চলা শুরু হয়।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ হঠাৎ কোন কাকতালীয় স্লোগান নয়, একটা বড় ছকেরই অংশ।

(পরে সম্পাদনা করা হয়েছে)

(চলবে)


মন্তব্য

শেহাব এর ছবি

আমি ধরে নিচ্ছি সব তথ্যের সূত্র মহিউদ্দীন আহমেদের বইটি। চালিয়ে যান।

নৈষাদ এর ছবি

সব তথ্যের সূত্র সেই বই, শুধু কন্সপিরেসি থিওরীটা না।

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

সিরিজটা থামাবেন না। জাসদ সম্পর্কিত নিজের কিছু পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে নিতে চাই।

_________________________________________

সেরিওজার গল্প

নৈষাদ এর ছবি

আশা করছি। ধন্যবাদ সুহান।

অতিথি লেখক এর ছবি

৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত সময়টা ছিলো এদেশের জন্য খুব ক্রুশিয়াল মুহুর্ত। সরকার তখন ব্যস্ত আন্তর্জাতিক মহলের অসহযোগীতা এবং নিজস্ব চরম অপ্রতুল সম্পদ নিয়ে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ গড়তে। জাসদ তখন ব্যস্ত ছিলো সরকার তথা আওয়ামী লিগ বিরোধিতা, মুজিববাদের বিনাশ, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সেনাবাহিনীতে বৈপ্লবিক বিদ্রোহ, সুপারহিরো প্রোজেক্ট (কর্নেল তাহের) ইত্যাদি নিয়ে। কিন্তু জাসদ সমর্থক সেই তরুণ প্রজন্ম দেশের জন্য সে সময় কি করছিলো? দেশ গঠনে এই বিপুলসংখ্যক তরুণ সে সময় কি ভুমিকা পালণ করছিলো?

----ইমরান ওয়াহিদ

নৈষাদ এর ছবি

কিছু কিছু ব্যাপার তুলে আনতে চেষ্টা করব। দেখা যাক।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

পড়ে চলেছি, পরের পর্ব আসুক দ্রুত।

নৈষাদ এর ছবি

ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

অসংলগ্ন হলেও ভাবনাগুলো খুব জরূরী । আমার নিজের কিছু অসংলগ্ন ভাবনা বা ধারনা আছে জাসদ এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোর ব্যপারে । বর্তমানের কিছু "ক্যারিজম্যাটিক" বাম নেতাদের কথাবার্তায় ধারনাটা আরো পোক্ত হচ্ছে দিনে দিনে ।

- সমস্যার সমাধানের চেয়ে কাউকে ( স্কেপগোট ) দোষারপ করা বা দোষ চাপানোর বেলায় আগ্রহ বেশি ।

- রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রনের অনভিজ্ঞতা এবং আজীবনই প্রেসার গ্রুপ হিসেবে থেকে যাওয়াও সামগ্রিক ভাবে দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের ব্যপারে দুরদর্শিতার অভাব ।

- বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশ পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মিশেলে নতুনের পথে এগোলেও ( স্ক্যান্ডেভিয়ান দেশগুলোকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায় ) আমাদের দেশের বাম দলগুলোর চিন্তাভাবনায় উন্নয়নের কোন ছোঁয়া এখনো চোখে পড়ে না । সরকারের গঠনমুলক সমালোচনার পরিবর্তে এখনো এরা "বুর্জোয়া, সাম্রাজ্যবাদী" টাইপ কিছু গালভরা ছেলে ভোলানো বুলি দিয়ে টকশো গরম করায় ওস্তাদ । ৭২ থেকে ৭৫ পরবর্তী সময়েও এদের একই রকম ভুমিকার চোখে পড়ে । ধংোসের মুখ থেকে উঠে আসা সদ্য গঠিত দেশে সরকারের সহযোগীতার পরিবর্তে এরা বিপ্লবের বুলিতে মাঠ গরম করার ব্যস্ত ছিল । সে সুযোগে জিন্দাবাদ বাহিনী আবার বাঙালীর ঘাড়ে চেপে বসে । বাঙালীর ঘাড়ে জিন্দাবাদের ভুত চাপিয়ে দেয়ার দায় পরোক্ষভাবে বাম দগুলোর উপরই বর্তায় (আমার ব্যক্তিগত মতামত) । এদের তৎকালীন আচরণের চুলচেরা বিশ্লেষন হওয়া দরকার ।

দস্যু ঘচাং ফু

==============================
চৈনিক নই, আমি নিতান্তই ভেতো বাঙালী,
নাই কোন তলোয়ার, কি বোর্ড খানাই সম্বল খালি;
জামাত দেখিলে তেড়েফুড়ে তাহাতেই ঝড় তুলি ।

নৈষাদ এর ছবি

হ্যা, কিছু 'ডায়লগ' সেই ষাটের দশকেরই রয়ে গেছে, কিন্তু সেই অ্যাপিল আর নেই। ফলাফল 'এলেবেলে' হয়ে থাকা।

হাসিব এর ছবি

চলুক। জাসদ একটা মিথিকাল দল। এই মিথের সূত্রপাত প্রাক্তন জাসদ ও আওয়ামী লীগ বিরোধী (যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডে আরাম বোধ করেছিলো) বামপন্থীদের অব্যাহত লেখালেখির কারণে। ভবিষ্যতে এটা নিয়ে একটা লিটারেচার রিভিউ করার ইচ্ছা আছে।

নৈষাদ এর ছবি

ঠিক। তবে মনে হয় বেশ বেকায়দায় রেখেছিল তখনকার সরকারকে।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

দারুণ, বইটা কেবলই হাতে এসেছে... চলুক সিরিজ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

মাসুদ সজীব এর ছবি

চলুক, সাথে আছি। জাসদের রাজনীতির সাথে জড়িত বিশিষ্ট লেখক “আহমদ ছফা” ও শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডকে কয়েকজন সেনা অফিসারের মনের খায়েশ হিসেবে চালিয়ে সরলীকরণ করে গেছেন চিরকাল।

-------------------------------------------
আমার কোন অতীত নেই, আমার কোন ভবিষ্যত নেই, আমি জন্ম হতেই বর্তমান।
আমি অতীত হবো মৃত্যুতে, আমি ভবিষ্যত হবো আমার রক্তকোষের দ্বি-বিভাজনে।

অতিথি লেখক এর ছবি

"ডিসেম্বরে ‘ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রেপ্তার হন। তাকে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আদালতের প্রধান ছিলেন মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল আবু তাহের। জলিল নির্দোষ প্রমানিত হন, কিন্তু সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।"

উক্ত বই হতে উদ্ধৃত? না লেখক কর্তৃক নিজস্ব উদ্ধৃতি? তবে এখানে একটি প্রশ্ন জন্মায় মনে, ভারতের ভূমিকা কি আসলেই অনুরুপ ছিল? তা নাহলে জলিল নির্দোষ প্রমাণিত হতেন না।
এব্যাপারে আপনার মতামত কি?

নব্য মানব

নৈষাদ এর ছবি

সব রেফারেন্স সেই বই থেকে দেয়া হয়েছে।

বাহিনী হিসাবে 'সিস্টেমেটিক লুটপাটের' কোন ঘটনা হয়নি, কিংবা আমার জানার মধ্যে নাই। বাহিনীর সদস্য হিসাবে বিচ্ছিন্ন লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

অতিথি লেখক এর ছবি

‘শ্রেণি সংগ্রাম ত্বরান্বিত করে ধাপে ধাপে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করার’ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়'
জাসদের মুখে হরহামেশাই 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এর কথা শুনি। এই 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এর বিশদ ব্যা্খ্যা কি এই বইতে দেয়া আছে?

দেশ বন্ধু

নৈষাদ এর ছবি

না দেয়া নেই। কিংবা আমার ব্যাখ্যা হবে কিছুটা বিপদজনক। তারচেয়ে কনটেক্সটা বলি, আপনি আপনার মত করে ব্যাখ্যা করে নিয়েন। এই টার্মটা প্রথম ব্যবহার করেন শেখ মুজিব। ২৬ মার্চ (বাহাত্তর) রেডিও-টেলিভিশন ভাষণে বলেন...

আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ-বিপ্লবে বিশ্বাসী। পুরোনো সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। অবস্তব আস্তিকতা নয়, আমার সরকার বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের বাস্তব প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে পুরানো সামাজিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে নতুন সমাজ গড়তে হবে।

অতিথি লেখক এর ছবি

১৯৭২-১৯৭৫ সময়ে কর্নেল তাহেরের ভূমিকাকে নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা উচিৎ। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, কর্নেল তাহের এবং জাসদের কার্যক্রম সে সময় প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং (ভবিষ্যৎ) স্বৈরাচারকে শক্তিশালী করেছে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা - শুধু এই কারণে তাঁকে ছাড় দেয়া ঠিক না বলেই মনে হয়।

Emran

নৈষাদ এর ছবি

নিশ্চয়ই। আবু তাহেরের সব ভাই আসলে ভীষণ সাহসী, যেটা বিশ্বাস করে সে ব্যাপারে ভীষণ কনভিশন আছে, আপাত কোন ‘পারসোন্যাল এজেন্ডা’ নিয়ে কাজ করেনি বলে মনে হয়েছে (পরে ব্যাখ্যা করব)। কিন্তু তাহের কে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা/কিংবা মিস-গাইডেড কিনা সেটা ভিন্ন কথা।

মরুদ্যান এর ছবি

ভাল লাগল, জাসদ সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা, চলুক। চলুক

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

চলুক চলুক

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

এই মন্তব্য মহিউদ্দিন আহমেদের বই না পড়ে জাসদের ওপর করা। পোস্টদাতা যেটাকে ‘অসংলগ্ন ভাবনা’ বলছেন এই মন্তব্যও অমন কিছু।

সূচনাঃ

দেশ স্বাধীন হতে না হতে নতুন দল গঠন করাটা ভুল কিছু নয়, বরং ভালো কিছু হবার ইঙ্গিতবাহী হবার কথা। কিন্তু গোড়াতেই বিদ্যমান সরকারকে উৎখাত করার ঘোষণা এবং অচিরেই সশস্ত্র উইং গঠন করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা থেকে ধারণা করা যায় জাসদ আর দশটা সাধারণ রাজনৈতিক দলের মতো রাজনীতি করার জন্য জন্মায়নি।

জাসদের নেতৃবৃন্দের একাংশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত মুজিববাহিনীর সদস্য। এখান থেকে এবং শুরু থেকে জাসদের কর্মকাণ্ড লক্ষ করে একটা হাইপোথিসিস ধারণা করা যেতে পারে যে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সম্ভাব্য বাম চরমপন্থী আন্দোলনের উত্থান ঠেকাতে প্রতিষেধ হিসেবে জাসদের মতো একটা বাম দল গঠন করা হয়েছিল। এখানে সম্ভাব্য পরিকল্পকদের মধ্যে ভারতের ‘র’কে হিসেবে আনা যেতে পারে। কারণ, এই বিষয়টা মুক্তিযুদ্ধকালে এবং পরেও ইন্দিরা গান্ধী সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথা ছিল। ভিয়েতনামে মার খাওয়ারাও দক্ষিণ এশিয়ায় আরেকটা লাল বিপ্লব দেখতে রাজী ছিল না, সুতরাং তারাও পরিকল্পকদের দলে থাকতে পারে।

দ্বিতীয় হাইপোথিসিস হতে পারে পাকিস্তান আমলে দেশ শাসনে অভ্যস্ত সামরিকবাহিনীর একাংশ দেশ স্বাধীন হবার পর নিজেদেরকে ব্যারাকে সীমাবদ্ধ দেখতে রাজী ছিল না। তারা হয়তো চেয়েছিল নতুন একটা রাজনৈতিক দল গঠন করে সেটার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণ করবে। জাসদের নেতৃবৃন্দে সাবেক সামরিক কর্তাদের ব্যাপক উপস্থিতি, পরবর্তীকালে সাধারণ সৈনিকদের অনেকের ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’য় যোগদান, সশস্ত্র সামরিক উইং ‘গণবাহিনী’ গঠন করা, আরো পরে সামরিক অভ্যুত্থানে অংশগ্রহন এই হাইপোথিসিসের পালে হাওয়া লাগায়। ষাট ও সত্তরের দশকে যারা সারা দুনিয়ায় মিলিটারি ডিকটেটরদের দিয়ে দেশ চালানোর এক্সপেরিমেন্ট করছিলো তারাও এই উদ্যোগের স্পনসর হতে পারে।

তৃতীয় হাইপোথিসিসটা হচ্ছে বাংলাদেশ বিরোধীতা। একথা সবাই জানেন যে, ১৯৭১-এর এপ্রিল মাস থেকেই (হয়তো আরো আগে থেকেই) খন্দকার মোস্তাক আহমেদ, মাহবুবুল আলম চাষী, তাহের উদ্দীন ঠাকুর, কাজী জহিরুল কাইয়ুমেরা বাংলাদেশ বিরোধীতার সূচনা করেছিল। তাদের প্রাথমিক উদ্যোগগুলো ব্যর্থ করে দিয়ে দেশ মুক্ত, স্বাধীন হয়ে গেলে বাংলাদেশবিরোধীরা ভিন্ন স্ট্র্যাটেজি গ্রহন করে। এটাও সবাই জানেন যে, যুদ্ধ শেষ হবার পর পর সাবেক যোদ্ধাদের মনে নানা রকম হতাশার উদ্ভব ঘটে। তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য দ্রুত অর্জিত না হওয়া, বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে সোজা অবস্থায় দাঁড়াতে সময় লাগা, যুদ্ধকালীন ট্রমা তাদেরকে হতাশ করে তোলে। এই গ্রুপকে খুব সহজে খেপিয়ে তোলা যায়। জাসদ এই কাজটি করেছিল। এই জন্য ১৯৭৩-এর নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক মানুষ ‘সাত তারিখ সকালে, ভোট দিবেন মশালে’ বলে শ্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু তারা বুঝতে পারেননি নির্বাচনে জয়লাভ করার মতো জনপ্রিয়তা ও সাংগঠিক শক্তি তখনো জাসদের তৈরি হয়নি। ফলে নির্বাচনে হেরে গিয়ে এই দল খেপে ওঠে, এবং গণবাহিনীতে লোক রিক্রুট করা সহজ হয়ে যায়।

উত্থানঃ

১৯৭২-১৯৭৫ পর্ব বাদ দিলে আওয়ামী লীগ কস্মিনকালেও বাম দল নয়। মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলস-লেনিনের চিন্তাধারার সাথে আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্মকৌশলের মিল ঢাকার কাকের সাথে দক্ষিণ মেরুর পেঙ্গুইনের সম্পর্কের সমান। ৭২-৭৫ পর্বেও আওয়ামী লীগ যে বাম দল, তা নয়। ঐ সময়কালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন, সিপিবি-ন্যাপের মতো দলকে আত্তীকরণ করা হয়েছে — ব্যাস ঐটুকুই। আওয়ামী লীগ ঘোরতরভাবে বিপ্লব নয় বরং বিপুল জনসমর্থন, সর্বস্তরের নির্বাচনে শক্তিশালীভাবে অংশগ্রহন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনে বিশ্বাসী। এই জন্য সূচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ হয় সরকারী দল, অথবা সংসদে প্রধান বিরোধী দল। আওয়ামী লীগের মুখে সমাজতন্ত্রের বুলি শুনে বামপন্থায় বিশ্বাসীদের বড় অংশ আওয়ামী লীগ থেকে দূরে থাকাটাই সঠিক বলে মনে করেছেন। ফলে, জাসদের সদস্য সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হয়নি।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে অনেক সুবিধাবাদী নৌকায় উঠে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তাদের কেউ কেউ নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়লেও ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকার দল দেশ স্বাধীন হবার পর দেখতে পেল তাদের সামনে জীবনের সবচে’ বড় সুযোগ অপেক্ষমান। এদের সাথে নতুন নতুন সুবিধাবাদী গ্রুপও নৌকায় উঠে পড়ে। এই লুটেরা, সুবিধাবাদীদেরকে বঙ্গবন্ধু ‘চাটার দল’ বলে অভিহিত করেছিলেন। চাটার দলের উত্থান আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দুর্বল অবকাঠামো সাধারণ মানুষের বঞ্চনার পরিমাণ বাড়ায়। ফলে বঞ্চিত মানুষের মধ্যে ক্ষোভের পরিমাণও বাড়ে। এই ক্ষুদ্ধ মানুষদের নিয়ে গণবাহিনী গড়ে তুলতে তাই বেগ পেতে হয়নি।

(একটা অফটপিক বিষয় ঠিক এইখানে বলে রাখা দরকার বলে মনে করছি। একথা অবশ্যই সত্য যে, কিছু মানুষ ১৯৭২-১৯৭৫ সালের সময়কালে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছে। সেটা ১৯৭৬-১৯৮১, ১৯৮২-১৯৯০ বা ১৯৯১-১৯৯৬-এ চালানো লুটপাটের মতোই। ১৯৭২-১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বা তার পুত্র-কন্যাগণ লুটপাট চালালে আজ তাঁরা দেশের অন্যতম ধনী পরিবার হতেন। কিন্তু এত বছরেও সেটা কেউ দেখাতে পারেনি। ঐ সময়ে যারা লুটপাট চালিয়েছে আজ তারা কোনভাবেই চায় না যে ঐ সময়টা নিয়ে বিশদ আলোচনা বা গবেষণা হোক। তাই ঐ সময় নিয়ে কথা উঠলেই তারা ‘বঙ্গবন্ধুকে অপমান করা হচ্ছে’ ইত্যাদি বলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে চায়। সত্যটা হচ্ছে এই যে, বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এই চাটার দল তাঁর নাম বিক্রি করে খেয়েছে আর আজ বঙ্গবন্ধু নিহত হবার ৩৯ বছর পরেও তাঁর নাম ভাঙিয়েই পার পেতে চায়।)

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার দরুণ সামরিকবাহিনীর অফিসারেরা যথোপযুক্ত প্রমোশন ও সুবিধাদি পেলেও সাধারণ সৈনিকদের বরাতে তা জোটেনি। তাছাড়া ব্যাটম্যান প্রথার মতো অবমাননাকর প্রথা ও বিষয়াদিও তাঁদেরকে ক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল। পাকিস্তানফেরত অফিসারেরা দেশে ফিরে যখন দেখতে পায় তাদের জুনিয়ররা মুক্তিযুদ্ধ করার সুবাদে তাদের উপরে বসে আছে তখন তারাও ক্ষুদ্ধ হয়। এই ক্ষুদ্ধ সৈনিকের দলকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থায় টেনে নিতে তাই বেগ পেতে হয়নি। আর ক্ষুদ্ধ অফিসারের দল তখন উপযুক্ত সময় ও সুযোগের জন্য ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলো।

একটা গণতান্ত্রিক দেশে সরকারী দলের বিপরীতে বিরোধী দলের উপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী। ১৯৭০ সালে ভাসানী ন্যাপের সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নেয়াটা ঐ দলটির ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপের কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহন ন্যাপ ভাসানীর বেঁচে ওঠার কিছুটা আশা জাগালেও স্বাধীন দেশে মাওলানার ক্রমাগত অসংলগ্ন আচরণ ও উদ্বায়ী অবস্থানের ফলে তার দল সাধারণের আস্থা হারায়। তাছাড়া পরাধীন দেশে ন্যাপের মতো ‘সর্বমতের মঞ্চ’ টাইপ দল দরকার থাকলেও স্বাধীন দেশে তার প্রয়োজনীয়তা নেই। ফলে ন্যাপ তার যা পরিণতি হবার কথা তাই লাভ করে। ন্যাপ মোজাফফর কোনকালেই ব্যাপকভাবে জনগণের দল ছিল না। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তাদের আওয়ামী লীগের স্নেহধন্য হয়ে থাকার প্রবণতা তাদেরকে আরো মাইক্রোস্কোপিক দলে পরিণত করে। বাকি থাকে সিপিবি। বস্তুত এই দলটার কাছেই মানুষের প্রত্যাশার পরিমাণ বেশি ছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ঘটিত ইতিহাস, চলমান ঘটনাবলী ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রূপ বিশ্লেষণ ও নিরূপণ করতে সিপিবি কখনোই দক্ষতার পরিচয় দেয়নি। তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সিপিবি কি ক্ষমতাসীন দলের সমালোচক হবে নাকি প্রধান অনুচর হবে সেটা ঠিক করে উঠতে পারেনি। ফলে এক সময় সিপিবি আওয়ামী লীগে আত্তীকৃত হয়ে যায়। সিপিবি আর দুই ন্যাপের ব্যর্থতা কার্যকর, শক্তিশালী বিরোধী দলের জন্য যে শূন্যতার সৃষ্টি করে জাসদ সেই স্থানটিই অনায়াসে পূরণ করে ফেলে।

(চলবে)


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

চলুক চলুক চলুক
পোস্টান না বস পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

[ হাইপোথিসিসের তিনটাই কি সত্য হওয়া সম্ভব? আমার কাছে কিন্তু সেরকমই মনে হয়! ]

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার দরুণ সামরিকবাহিনীর অফিসারেরা যথোপযুক্ত প্রমোশন ও সুবিধাদি পেলেও সাধারণ সৈনিকদের বরাতে তা জোটেনি। তাছাড়া ব্যাটম্যান প্রথার মতো অবমাননাকর প্রথা ও বিষয়াদিও তাঁদেরকে ক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল। পাকিস্তানফেরত অফিসারেরা দেশে ফিরে যখন দেখতে পায় তাদের জুনিয়ররা মুক্তিযুদ্ধ করার সুবাদে তাদের উপরে বসে আছে তখন তারাও ক্ষুদ্ধ হয়। এই ক্ষুদ্ধ সৈনিকের দলকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থায় টেনে নিতে তাই বেগ পেতে হয়নি। আর ক্ষুদ্ধ অফিসারের দল তখন উপযুক্ত সময় ও সুযোগের জন্য ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলো।

পাণ্ডবদা,
ক্ষুব্ধ অফিসারের দল এবং ক্ষুব্ধ সৈনিকের দল কি (৭ নভেম্বর একপক্ষে থাকা ছাড়া) কখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে একত্র হয়েছে? একই অনুচ্ছেদে পরপর এদের বর্ণনা একটু বিভ্রান্তিকর লাগছে।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

না, ক্ষুদ্ধ অফিসারের দল মূলত পাকমনপিয়ারু, আর ক্ষুদ্ধ সৈনিকের দল মুক্তিযুদ্ধ করা। ৭ই নভেম্বর ও তার আগে-পরে ক্ষুদ্ধ সৈনিকের দলকে ক্ষুদ্ধ অফিসারের দল ব্যবহার করেছে। ফলে ৭ই নভেম্বর গণহারে মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা নিহত হয়েছেন আর পরে গণহারে সৈনিকেরা ফাঁসির দড়িতে জীবন দিয়েছেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

তাহলে ঠিকাছে, আমিও তাই জানতাম।

একসঙ্গে দেখে একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলাম যে এদের মাঝে আবার কোনও আঁতাত ছিল কিনা।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

জাসদের রাজনীতি বা ৭২-৭৫'এ আওয়ামী লীগ বাদে বাকিদের রাজনীতি নিয়ে এরকম একটা লেখা পড়ার জন্য বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছি আমরা অনেকেই, পাণ্ডবদা। এটাকে সম্পুর্ণাকারে পোস্ট হিসেবে দিয়ে আমাদের তৃষ্ণা মেটাবেন কি?

----ইমরান ওয়াহিদ

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার বক্তব্য তো এখানেই পড়তে পাচ্ছেন, সাথে অন্যদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। সুতরাং আলাদা পোস্ট দেবার দরকার দেখছি না। তাছাড়া আমি আবার লিখলে তো এই কথাগুলোই লিখবো। তাহলে সেটা নীতিমালায় আটকে যাবে না?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ এর ছবি

বিতর্ক থেকে কিন্তু কনফিউশনের এরিয়া গুলি বের হয়ে আসছে। বিস্তারিত পোস্ট দিলে নীতিমালা লঙ্ঘন হবে বলে মনে করিনা। তাছাড়া, যারা তখন সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত ছিল তারা তো কিছু লিখে গেল না। মধ্যে মধ্যে 'প্রজেক্টের' লেখা বের হচ্ছে। আপনারা যারা (আপনি, সুমন চৌধুরী), সেই সময় নিয়ে জানেন, বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের কাছ থেকে লেখা আসা কাম্য।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

৭২-৭৫ সময়কালটায় গুজবের বাজার ছিল দারুন রমরমা। বস্তুতপক্ষে জাসদ নিজেই ছিল হরেক রকম গুজবের এক ডাকসাইটে ফেরিওয়ালা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, গুজবের আক্রমন থেকে জাসদ নিজেও বোধ হয় রেহাই পায় নি। তেমনই দুটি গুজব(যদি এগুলো সত্যি সত্যি গুজবই হয়ে থাকে), আপনার লেখায় হাইপোথিসিস বলে চিহ্নিত হয়েছে-
১। "রুশ-ভারত চক্র সমাজতন্ত্রের নামধারী জাসদের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের সাম্যবাদী সংগ্রামকে বিভ্রান্ত করে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার হীন উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছে"। এই গুজব কিংবা ধারনার প্রবক্তা ছিল চীনপন্থি সাম্যবাদী দলগুলো, দক্ষিনপন্থী চিন্তা চেতনার ধারক বাহক অনেক সাধারন মানুষও এটা বিশ্বাস করতো।
২। "সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামকে বিভ্রান্ত করার হীন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এটা করেছে"। এই গুজব কিংবা ধারনার প্রবক্তা ছিল সিপিবি ও মস্কোপন্থী ন্যাপ, আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন সাধারন জনগণের অনেকেও এটা বিশ্বাস করতো।

আমার মনে হয় এই দুটো প্রচারনাই গুজব ছাড়া আর কিছু নয়। আমেরিকা যদি জাসদ গঠনে জড়িত থাকত, তবে এই সুদীর্ঘ সময়কালে কোন না কোনভাবে সে সংক্রান্ত দলিল কিংবা স্বীকারোক্তি আলোর মুখ দেখত। রুশ-ভারতের মদদে কিছু হয়ে থাকলেও সে প্রমান এতদিনে উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার কথা।

তৃতীয় হাইপোথিসিসটার স্বপক্ষেও কখনো কোন দলিল বা স্বীকারোক্তির অদ্যাবধি দেখা মেলে নি। তবে এ কথা তো অনস্বীকার্য যে, জাসদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মোশতাক-ফারুক-রশিদ চক্রের জন্য একটা সুবিধাজনক ক্ষেত্র প্রস্তত করে দিয়েছিল।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

জাসদ ভিন্ন বাংলাদেশের আর কোন রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে এমন কনস্‌পিরেসি থিওরি কি কখনো শোনা গেছে? না। তাহলে জাসদের ব্যাপারে এমন থিওরি/হাইপোথিসিসের উদ্ভবের কারণ কী? কারণটা গত ৪২ বছরে জাসদের কর্মকাণ্ড থেকে প্রমাণিত।

১। জাসদ গঠনের পেছনে র'-এর ভূমিকার গুজব থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার গুজব কখনো ছিলনা। "এই গুজবের উদ্যোক্তা চীনপন্থীরা" এই হাইপোথিসিস হালে পানি পায় না। কারণ, চীনপন্থীদের সাথে জাসদের কখনো খারাপ সম্পর্ক ছিলনা। জাসদ সবসময়েই 'ডালেও ছিল, খালেও ছিল'।

২। জাসদের পেছনে মার্কিনী হাত ছিল কিনা সেটা সিরাজুল আলম খানের সুদীর্ঘ মার্কিন সুসম্পর্ক দিয়ে কিছুটা আঁচ করতে পারবেন। আর একথা ভাবার কোন কারণ নেই যে, মার্কিনীরা তাদের সব দলিলই উন্মোচিত করে। ষাট-সত্তরের দশকে কাদের কাছে প্রতি মাসে মুখবন্ধ ইনভেলপ যেতো সেই তথ্য কি মার্কিনীরা কখনো বিস্তারিত উন্মোচিত করেছে?

বস্তুত ১৯৭৬ সাল থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদ আর গোনাগুনতিতে পড়ে না। জাসদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ায়ই এমনটা হয়েছে। মুজিবকে হঠানো গেছে, মার্ক্সবাদী বিপ্লবের সম্ভাবনা নস্যাৎ করা গেছে, পাকমনপিয়ারুদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার প্রক্রিয়া শুরু করা গেছে - আর কী চাই!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

কারণটা গত ৪২ বছরে জাসদের কর্মকাণ্ড থেকে প্রমাণিত।

প্রমানিত? তিনটি হাইপথিসিসের কোনটি প্রমানিত? আসলে কোনটিই প্রমানিত নয়, তবে কোনটিই অপ্রমানিতও নয়। আর জাসদের উদ্ভবের এই থিয়োরি কিন্তু গত ৪২ বছরের কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা কিংবা বিশ্লেষণ করে তারপর উপস্থাপন করা হয় নি, কোন প্রমান ছাড়াই ৭৩/৭৪ সালেই এই থিয়োরি বাজারে চলে এসেছে। আমার মতে জাসদের উদ্ভবের কারণটা অনুধাবন করা প্রয়োজন, তাহলেই এইসব থিওরির প্রয়োজনিয়তা ফুরিয়ে যাবে।

জাসদ ভিন্ন অন্য কোন দল গঠনের ব্যাপারে এমন কনস্‌পিরেসি থিওরি শোনা যায় নি, তাও বোধ হয় পুরোপুরি ঠিক নয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও থিওরি উত্থাপন করা হয়েছিল যে এটা হিন্দুস্তানের মদদে, হিন্দুস্তানের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এই অভিযোগ থেকে এখনো মুক্তি মেলেনি আওয়ামী লীগের। অন্য প্রায় সকল দলের পৃষ্ঠপোষক পরিস্কার ভাবে চিহ্নিত থাকার কারনে তাদের ব্যাপারে অনুমান ভিত্তিক কোন তত্ব সৃষ্টির সুযোগ হয় নি।

জাসদের পেছনে মার্কিনী হাত ছিল কিনা সেটা সিরাজুল আলম খানের সুদীর্ঘ মার্কিন সুসম্পর্ক দিয়ে কিছুটা আঁচ করতে পারবেন।

জন্মকালীন সময় থেকে জাসদের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল রুশ-ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান, মার্কিনীদের বিষয়ে তারা তেমন একটা কিছু বলতো না। রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্যই তারা এই শ্লোগান ব্যবহার করতো, কারন তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার রুশ-ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ। যে দলটি প্রকাশ্যে রুশ-ভারতের প্রতি এমন বৈরী, তাদের প্রতি তো আমেরিকার বিরুপ হওয়ার কোন কারন নেই, হোক না সেটা একটা সমাজতন্ত্রি দল।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

প্রমাণিত হলে তো আর হাইপোথিসিস বলতাম না, ফ্যাক্ট বলতাম।

জাসদের সাথে আওয়ামী লীগের প্রতিতুলনাটা ক্লিশে হলো। আওয়ামী লীগ কখনো মিলিটারি ক্যু করার চেষ্টা করেনি, বিপ্লবের নামে সশস্ত্র ডাকাত দল তৈরি করেনি।

১৯৭২ সালে বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল ভেবে অনেকেই তখন জাসদে গিয়েছিলেন। তাদের সেই ভুল এক সময় ভেঙেছে।

'রুশ-ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান' - এই শ্লোগানের উদ্যোক্তা জাগদল/জাগফ্রন্ট, জাসদ নয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

শ্লোগানটা জাসদেরই ছিল, ৭২ থেকে আশির দশকেরও কিছুটা সময় তারা এই শ্লোগানটি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে আক্রমণের প্রয়াস পেত। জাগফ্রন্ট এবং জাগদল জাসদের কাছ থেকেই শ্লোগানটি গ্রহণ করেছিল।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

তাহলে ১৯৭৬ অনওয়ার্ড জাসদ আর কোনদিন এই শ্লোগান দিলো না কেন? জাগদল > জাগফ্রন্ট > বিএনপি তো ১৯৮১ সাল পর্যন্ত এই শ্লোগান দিয়ে গেছে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ এর ছবি

পাণ্ডব’দা, আনেক ধন্যবাদ অনেক সময় নিয়ে অনেক কিছু তুলে আনার জন্য। আরও কিছুর অপেক্ষায় থাকলাম।

স্বাধীন দেশে নতুন দল গঠন করাটা ভালো কিছু হবার ইঙ্গিতবাহী – পুরোপুরি সহমত। মূলত একটা ভাল বিরোধি দলের অভাবে জাসদ গঠন করাটা সহজ হয়েছিল। প্রপনেন্টরা বলেন, জাসদের জন্ম অনিবার্য ছিল। জনাব আহমেদ তার বইতে বলেছেন, “ঐ সময় যদি জাসদের জন্ম না হত, তাহলে ছাত্রলীগের র‍্যাডিক্যাল অংশটি কোথায় যেত, এ নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা ছিল। আওয়ামীলীগের মত একটা রক্ষণশীল দলে তাদের কোন ভবিষ্যত ছিল না। অনেকেই হয়ত ‘চরমপন্থী দলে যোগ দিত। ছাত্রলীগের এই অংশটির উপর পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির নজর ছিল বেশকিছু দিন ধরে। জাসদ গঠিত হওয়ার পর সিরাজ শিকদার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমাদের রিক্রুটমেন্ট লাইন বন্ধ হয়ে গেল”।‘

র’এর হাতে জাসদের জন্ম, এটা সবচেয়ে বেশি শোনা হাইপোথিসিস আমার কাছে। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে, সচলের এক রাজনীতি এক্সপার্ট সরাসরি উবানের কথাই বলেছিলেন (মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান)। এন্টি-ভারত উইং আরও যোগ করে মুজিবের জনপ্রিয়তাকেও ভয় পেয়েছিল ভারত – এই উপমহাদেশে কোন নেতা দাঁড়িয়ে যাক, সেটা চায় নাই ভারত। যদিও আমি এই হাইপোথিসিসে খুব ভরসা পাই না। উবানও এখানে ফিট হয় না, তিনি গেরিলা-ওয়ারফেয়ার এক্সপার্ট। ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব কখনও।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

যদিও আমি এই হাইপোথিসিসে খুব ভরসা পাই না। উবানও এখানে ফিট হয় না, তিনি গেরিলা-ওয়ারফেয়ার এক্সপার্ট।

এখানে র' = উবান হিসেবটা ভাবনা থেকে দূর করলেই ভরসা করার উপাদান পাওয়া যেতে পারে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ এর ছবি

ঠিকাছে, আমার হাইপোথিসিসের আবার ‘স্যানিটি চেক’ করে দেখব।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

কর্নেল তাহেরঃ

বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণ ও ঐতিহাসিক বিষয়ে করা গালগল্প পাঠ করে আমরা এটা বুঝতে পারি যে, কর্নেল তাহের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য থাকা অবস্থাতেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং সিরাজ শিকদারের পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন/ মাও সেতুং গবেষণা কেন্দ্র/ পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির কর্মকাণ্ডের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধে পা হারানোর ফলে সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে দেশের সামরিকবাহিনীতে নেতা হিসেবে তাঁর উত্থানের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ফলে নানা কারণে তাঁর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এই সময়ে তিনি আরো বেশি করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন যা একজন ইন-সার্ভিস আর্মি অফিসারের জন্য অনুচিত। তাঁর ক্ষোভ আরো বাড়লে তিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার বিভাগে কাজ নেন। এটিও সরকারী চাকুরী। এবং এই সরকারী চাকুরীতে থাকা অবস্থাতেও তিনি জাসদের রাজনীতি করে গেছেন, যা সরকারী কর্মবিধির পরিপন্থী।

কর্নেল তাহের জাসদের উদ্যোক্তা ছিলেন না। তাঁকে পিক করা হয়েছিল। তিনি অন্য কোথাও (যেমন, সর্বহারা পার্টি) যাবার চেয়ে জাসদ করাটাকেই পছন্দ করেছিলেন কারণ, জাসদের নেতৃত্ব তাঁকে একটু নিরুপদ্রব রেখেছিল এবং তিনি একটা সামরিক উইং নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সিরাজ শিকদারের সাথে পূর্ব যোগাযোগ থাকলেও সিরাজ শিকদারের মতো নার্সিসাস ও মেগালোম্যানিয়াক লোকের পক্ষে কর্নেল তাহেরের মতো নেতৃত্বেঅভ্যস্ত ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি মানা সম্ভব নয়। তাহের মেজর জলিলের মতো জাসদের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে পুরোপুরি জড়াননি। বস্তুতঃ জাসদের নেতৃবৃন্দও চায়নি তাহের প্রকাশ্যে আসুন। তাহলে তাহেরের সাথে তাদের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব যেমন অবশ্যম্ভাবী ছিল, তেমন যে উদ্দেশ্যে তাহেরকে তারা পিক করেছিল সেই উদ্দেশ্য সাধিত হতো না। দেশব্যাপী গণবাহিনীর কার্যক্রমের ওপর তাহেরের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে মনে হয় না। সেটার জন্য সিরাজুল আলম খান, হাসানুল হক ইনুরা ছিল। তবে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবে তাঁর ভূমিকা ছিল। এর পরেও এটা স্পষ্ট যে, ক্যান্টনমেন্টে আগুন লাগালে তার কনসিকোয়েন্স কী হতে পারে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ তো দূরে থাক তার ধারণাও তাহেরের ছিল না। এমনকি এটা নিয়ে জাসদের নেতৃত্বের কী পরিকল্পনা তাও তিনি জানতেন না। ফলে ৭ই নভেম্বর সিরাজুল আলম খানেরা নিরাপদে গা ঢাকা দিতে পারলেও তাহের গোটা ঘটনাবলীতে আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন। তাহেরের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে জাসদ ক্ষমতায় যাবার যে স্বপ্ন দেখেছিল সেনাবাহিনীতে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ও তাদের বেসামরিক সহযোগীরা সেটা ধুলিস্মাৎ করে দেয়। জেনারেল জিয়া যে তাদেরকে বোকা বানিয়ে ক্ষমতা দখল করে ফেলেছে এটা স্পষ্ট হতে জাসদের কর্মীদের হতাশামূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। ফলে ১৭ দিনের মাথায় জিয়া তাঁকে অনায়াসেই গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। ১৯ দিনের মাথায় জাসদের সদস্যদের ভারতীয় হাইকমিশনারকে অপহরণের চেষ্টা তাদের দেউলিয়াত্বকে আরো স্পষ্ট করে।

গণমানুষের মুক্তির কথা বলা জাসদের গণবাহিনী যখন হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা পুলিশ/বিডিআর/আনসার বাহিনীর সিপাইদের হত্যা করেছে, দালাল নিধণের নামে খেটেখাওয়া কৃষক-শ্রমিকদের হত্যা করেছে, প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার নামে ১০ জন নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিসহ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের সাধারণ কর্মীদের হত্যা করেছে তখন কর্নেল তাহের বা জাসদের নেতৃত্ব তা সমর্থনই করে গেছে। জাসদ ও গণবাহিনীর তথাকথিত বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণবিহীন কর্নেল তাহের জেনারেল জিয়া ও তার প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকেও চিনতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে তাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি বিপ্লব (আসলে সামরিক অভ্যুত্থান) করতে গিয়েছিলেন। আর্মি অ্যাকাডেমির পরিচয়, সামরিক বাহিনীতে একসাথে কাজ করা এগুলো যে প্রতিপক্ষের হাত থেকে বাঁচার উপায় হতে পারে না সেটা ১৯৭১ সালেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাহের সেসব কথা মনে রাখেননি। তাই স্বাভাবিকভাবে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই তাঁকে তাঁর ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে।

তাহের সংক্রান্ত যে কোন আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা হাইলাইট করা হয়। সেটা স্বাভাবিক এবং সেটাই উচিত। কিন্তু সদ্য স্বাধীন একটা দেশে সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করে অরাজকতা তৈরি করা, গণবাহিনী কর্তৃক হত্যা-নির্যাতন, সরকারী চাকুরীরত অবস্থায় রাজনীতিতে জড়ানো, ৭ই নভেম্বর সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলাসৃষ্টি ও ব্যাপক হতাকাণ্ড চালানোর জন্যও যে তাঁর দায় আছে সেটা সহসা কেউ স্বীকার করতে চায় না। সামরিক আদালতে বিচারের নামে কর্নেল তাহেরকে হত্যা করা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু তাঁর প্রতি এই অবিচার পূর্বোক্ত ঘটনাবলীতে তাঁর দায়কে হ্রাস করে না।

(চলবে)


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

চলুক চলুক চলুক
শেষ অনুচ্ছেদের সাথে বিশেষ ভাবে সহমত, তাহেরের জীবনের তিনটি বিচ্ছিন্ন অংশকে বিচ্ছিন্ন ভাবে বিচার করাই উত্তম! নির্মোহভাবে এই কাজটা কেন যেন চোখে পড়ে না। মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

সেই সময়কে উপস্থিত থেকে দেখা আর জানার অভিজ্ঞতা থেকে আমি ষষ্ঠ পাণ্ডবের বিশ্লেষণের সাথে সহমতই পোষণ করি। আর একটা বিষয় নিয়ে আমাদের একটা গবেষণা বা বিশ্লেষণ দরকার। জাসদের জন্মকাল, উদ্দেশ্য এবং ৭৫ পরবর্তী সময়ে দলের ভগ্নদশা এবং পরে অনেক হতাশ নেতা-কর্মীর আওয়ামীলীগে যোগদান। আর তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানের রহস্যজনক ভূমিকা ইত্যদি।

আপনার সাথে সুর মিলিয়ে আমিও বলি, ষষ্ট পাণ্ডবের বিশ্লেষণ চলুক।

নৈষাদ এর ছবি

‘তিনটি সেনা অভ্যুথন এবং কিছু না বলা কথা’ বইতে লে. কর্নেল এম এ হামিদ লিখেছেন, (১৫ আগস্ট পরবর্তী)ঃ

‘জিয়া তলে তলে আর একটি কাজ করছিলেন। তা হলো, তিনি সবার অজ্ঞাতে জাসদের কর্নেল (অব) তাহেরের সাথে গোপন কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জাসদের আর্মস উইং ইতিমধ্যে আন্ডার গ্রাউন্ড রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। শেখ সাহেবকে উৎখাতের জন্য ইতিপূর্বে তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। জিয়া সবার অজ্ঞাতে সম্পূর্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার সুহৃদ কর্নেল তাহেরের সাথে গোপন বিপ্লবের কথাবার্তা চালিয়ে যান। জাসদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মতে একটি সেনা বিপ্লবের লক্ষে জিয়াউর রহমানের সাথ তাদের রীতিমত পাকাপাকি কথবার্তা হয়। তার সাথে বেশ ক’টি গোপন মিটিং হয়। যদিও বিপ্লবের ব্যাপারে জিয়ার সদিচ্ছা নিয়ে তাদের উর্ধ্বতন মহলে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল, কিন্তু কর্নেল তাহেরের পীড়াপীড়িতে তারা জিয়ার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়েন’।

যদি এই হাইপোথিসিসে বিশ্বাস করি যে জাসদের আর্মস উইং কোন তৃতীয় কুশীলবদের (দেশে/বিদেশ) ভেস্টেড ইন্টারেস্ট ছিল, তবে আরও এগিয়ে গিয়ে বলা যায় ১৫ আগস্টের ঘটনা প্ল্যান ‘বি’ ছিল। ‘এ’ কাজ করেনি তাই। যাক, ৩/৭ নভেম্বর কিছু ইন্টারেস্টিং প্যাটার্ন পাওয়া যায়, চেষ্টা করব লিখতে...।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

একজন ইন-সার্ভিস সেনা কর্মকর্তা যখন সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করছে তখন এটা স্পষ্ট যে, সে নিজে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে এই কাজ করছে। কোন রাজনৈতিক দল যখন জেনে বুঝে তার সাথে যুক্ত হয় তখন এটা স্পষ্ট যে, হয় তারা ঐ সামরিক শাসককে বৈধতা দেবার মাধ্যম হিসেবে কাজ করার কথা ভাবছে (যথাঃ বিএনপি, জাতীয় পার্টি) অথবা তারা গোলমালের এক ফাঁকে ঐ সেনা কর্মকর্তাকেও নিকাশ করে নিজেরাই ক্ষমতা দখলে আগ্রহী। এখানে জাসদ কোনটা করার কথা ভেবেছিল?

যে কোন অ্যাকশনে অন্ততঃ একটা এক্সিট প্ল্যান থাকে। দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল তাহেরের এক্সিট প্ল্যানটা কী ছিল?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ এর ছবি

কর্নেল তাহের কোনটা ভেবেছিলেন জানিনা।

ষাটের দশকে এই উপমাহাদেশে প্রশিক্ষিত একজন সামরিক কর্মকর্তা সুযোগে ক্ষমতা দখল করতে চাইবে (জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ) সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু কর্নেল তাহেরের রামায়নের সেই ‘সিংহাসনে রামের পাদুকা বসিয়ে’ রাজ্য শাসন সিন্ড্রোম কনফিউজ করে।

আমি পরের পর্বে বাহাত্তরের নভেম্বর টার্গেট করব।

হিমু এর ছবি

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন আর মেজর জিয়াউদ্দিন কি দুই ভিন্ন লোক?

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন সর্বহারা পার্টীর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, আর মেজর জিয়াউদ্দিন ছিলেন জাসদের সাথে যুক্ত।

নৈষাদ এর ছবি

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন আর মেজর জিয়াউদ্দিন দুই্জন ভিন্ন লোক। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন বাহাত্তরের ২০ শে আগস্ট হলিডে পত্রিকায় ‘হিডেন প্রাইড অভ ফ্রিডম ফাইটার্স’ শিরোনামে একটা আর্টিক্যাল ছাপায়, সরকার ক্ষমা চাইতে বলে। তিনি সামরিক বাহিনী ছেড়ে দেন এবং সর্বহারা পার্টির কাজে পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে যান, তারপর আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতেই থাকেন। মেজর জিয়াউদ্দিন সামরিক বাহিনীতেই ছিলেন, ডিজিএফই (তখনকার ডিএফআই) তে ছিলেন।

হিমু এর ছবি

কাকতালীয়ভাবে আজই কর্নেল জিয়াউদ্দিন আর কর্নেল শাফায়াত জামিলের একটা সাক্ষাৎকার খুঁজে পেলাম, ১৯৭১ সালের। দুইজনই মেজর ছিলেন তখন।

নৈষাদ এর ছবি

চলুক

মুস্তাফিজ এর ছবি

চলুক

...........................
Every Picture Tells a Story

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

বাহাত্তর-পঁচাত্তর সময়কালে আমি হাইস্কুল বয়। সুতরাং জাসদের সাথে সংশ্লিষ্ট সাধারন কর্মী থেকে শুরু করে পাতি নেতা, মাঝারি নেতা, এমনকি উচ্চ স্তরের নেতাদের কাউকে সরাসরি, কাউকে পত্রিকা মারফত এবং অনেককে গণকাহিনী মারফত জেনেছি ও চিনেছি। যদিও সেসব মানুষের কার কি রকম গভীরতা, জাসদেরই বা গভীরতা কতটা, তখন সেসবের কিছুই তেমন বুঝিনি। কিন্তু তখনকার সেই স্মৃতি পরবর্তীতে কিছুটা কাজে লেগেছে, এটা বলা যায়। সিরিজের পরবর্তী লেখাগুলোয় ভাবনাসমুহ আরও কিছুটা এগুলে আমার ভাবনাগুলো শেয়ার করার ইচ্ছা রইল। আজ শুধু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কে একটু মতামত জ্ঞাপন করি-
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র জাসদের উদ্ভাবিত কোন মতবাদ নয়, যতদূর জানি- মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রই হল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। পশ্চিম ইউরোপে প্রচলিত অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে এঙ্গেলস বলেছেন ইউটোপীয় তথা ভাববাদী সমাজতন্ত্র, তার বিপরীতে মাক্সীয় ধারার সমাজতন্ত্রকে আখ্যায়িত করেছেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র নামে। কারন, তাঁর মতে শুধুমাত্র মার্ক্স নির্দেশিত সমাজতান্ত্রিক তত্ব বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুতারং বাংলাদেশে সে সময় অন্যান্য যে সকল সমাজতান্ত্রিক দল ছিল, তারাও ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রেরই অনুসারী। অনেকদিন আগে অভিজিৎ দা মার্ক্সবাদ নিয়ে সচলে একটি পোষ্ট দিয়েছিলেন, সময় থাকলে সেটি পড়ে দেখা যায়।

নৈষাদ এর ছবি

চলুক অপেক্ষায় থাকব।

মরুদ্যান এর ছবি

অ:ট:

মার্ক্সবাদ নিয়ে অভিদার লেখা পড়লাম। তারপর কমেন্ট গুলা পড়লাম, মাথা ভোঁ ভোঁ করতেসে :(। সবচেয়ে ভাল লাগল সুবিনয়দার প্রশ্ন। আর ফারুক ওয়াসিফ, পি মুনসি, শান্ত এরা যা বলে এত কঠিন করে বলে কেন?? কোন লাইন একবারে বুঝিনা। নাকি মার্ক্সবাদ সহজ ভাষায় বলা যায়না?? ইয়ে, মানে...

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

দারুণ আলোচনা চলছে। জাসদের সময়টাকে স্বচক্ষে দেখে আসা অন্তত তিনজন এখানে যোগ দিয়েছেন বোধ করি। প্রত্যক্ষদর্শী সকলেই নিজ স্মৃতিকথা লিখুন, এই প্রত্যাশা থাকল। নইলে বিশেষ প্রকাশনা সংস্থা থেকে "প্রস্তুত করা" সেকেন্ডারি তথ্যের ভিড়ে আদি ও অকৃত্রিম প্রাইমারি তথ্যেরা হারিয়ে যাবে।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল,
ক্ষণকালের ছন্দ -
উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল,
সেই তারি আনন্দ .
জাসদ সম্বন্ধে ঐ কথাগুলোই যেন মনে ভাসে। মনে পড়ে কারমাইকেলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। এর আগে ছাত্রইউনিয়নের ছাত্রনেতারা রাজনীতিতে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। আমরা কারমাইকেলে পড়ার সময় জেলা জাসদের সম্পাদক ও অন্যান্য নেতারা ক্লাশ শেষ হতেই ক্লাশ রুমে ঢুকে পরতেন। থাকত মেয়েরা আর কিছু আমাদেরই সহপাঠি ছাত্র। তারা এক দেড় ঘন্টা ধরে সমাজতন্ত্র, দেশের সব অস্ত্র, মিল, কারখানা ভারতীয় সৈন্যরা খুলে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে অরাজকতা, দূর্নীতি, লুটপাট এসবের কথাই বলতেন । মেডিকেল, কারমাইকেলের মেধাবী ছাত্রদের সম্মেলন ছিল জাসদে।
তখন রাজনীতি কি আর এমন বুঝতাম, আব্বাকে বলেছিলাম, আব্বা জাসদের কি কোন সম্ভাবনা আছে?
উত্তরে শুনেছি ... ধুর ! শুনে দোদুল্যমনতায় ভুগেছি । আর ঐদিকে সহপাঠিদের জাসদ নিয়ে উচ্ছাস আর আগ্রহ। মনে পরে একবার আমাদের শহরে রব , জলিল এলেন, যে বাড়িতে উঠেছিলেন সেখানে আমরা দল বেঁধে গেলাম। পরে ট্রাকে উঠে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে। বিরাট জনসমাগম! অনলবর্ষী বক্তৃতা । আমরা মোহমুগ্ধ! জাসদের লিফলেট, পত্রিকা বের করতেন মারুফ চিনু (প্রয়াত )। আমাদের ক্লাশের মেধাবী ছাত্রী আন্ডারগ্রাউন্ডে গেল ৭৫ এ তার মুখে শুনেছিলাম নেদারল্যান্ডের পিটার কাস্টার এর কথা (অই সময় বাংলাদেশে ছিলেন)। পরে নেদারল্যান্ড থাকাকালীন নেইমেখেন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরীতে পড়েছি পিটার কাস্টার নেদারল্যান্ড থেকে চাঁদা উঠিয়ে জাসদ ক্যাডারদের দিতেন। ঘটনাক্রমে দেখা হয়েছিল তার সাথে । চমৎকার বাংলা বলেন।
জাসদ অনেক মেধাবী ছাত্র-জনতার প্রান নিয়েছে – জীবন তছনছ করেছে।
স্বাধীনতাউত্তর মুক্ত বাংলাদেশের সোপানতলে তাদের আত্মউৎসররগ এখনও হাহাকার করে বাতাসে ......
স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল,
ক্ষণকালের ছন্দ -
উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল,
সেই তারি আনন্দ .
জাসদ সম্বন্ধে ঐ কথাগুলোই যেন মনে ভাসে। মনে পড়ে কারমাইকেলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। এর আগে ছাত্রইউনিয়নের ছাত্রনেতারা রাজনীতিতে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। আমরা কারমাইকেলে পড়ার সময় জেলা জাসদের সম্পাদক ও অন্যান্য নেতারা ক্লাশ শেষ হতেই ক্লাশ রুমে ঢুকে পরতেন। থাকত মেয়েরা আর কিছু আমাদেরই সহপাঠি ছাত্র। তারা এক দেড় ঘন্টা ধরে সমাজতন্ত্র, দেশের সব অস্ত্র, মিল, কারখানা ভারতীয় সৈন্যরা খুলে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে অরাজকতা, দূর্নীতি, লুটপাট এসবের কথাই বলতেন । মেডিকেল, কারমাইকেলের মেধাবী ছাত্রদের সম্মেলন ছিল জাসদে।
তখন রাজনীতি কি আর এমন বুঝতাম, আব্বাকে বলেছিলাম, আব্বা জাসদের কি কোন সম্ভাবনা আছে?
উত্তরে শুনেছি ... ধুর ! শুনে দোদুল্যমনতায় ভুগেছি । আর ঐদিকে সহপাঠিদের জাসদ নিয়ে উচ্ছাস আর আগ্রহ। মনে পরে একবার আমাদের শহরে রব , জলিল এলেন, যে বাড়িতে উঠেছিলেন সেখানে আমরা দল বেঁধে গেলাম। পরে ট্রাকে উঠে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে। বিরাট জনসমাগম! অনলবর্ষী বক্তৃতা । আমরা মোহমুগ্ধ! জাসদের লিফলেট, পত্রিকা বের করতেন মারুফ চিনু (প্রয়াত )। আমাদের ক্লাশের মেধাবী ছাত্রী আন্ডারগ্রাউন্ডে গেল ৭৫ এ তার মুখে শুনেছিলাম নেদারল্যান্ডের পিটার কাস্টার এর কথা (অই সময় বাংলাদেশে ছিলেন)। পরে নেদারল্যান্ড থাকাকালীন নেইমেখেন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরীতে পড়েছি পিটার কাস্টার নেদারল্যান্ড থেকে চাঁদা উঠিয়ে জাসদ ক্যাডারদের দিতেন। ঘটনাক্রমে দেখা হয়েছিল তার সাথে । চমৎকার বাংলা বলেন।
জাসদ অনেক মেধাবী ছাত্র-জনতার প্রান নিয়েছে – জীবন তছনছ করেছে।
স্বাধীনতাউত্তর মুক্ত বাংলাদেশের সোপানতলে তাদের আত্মউৎসররগ এখনও হাহাকার করে বাতাসে ......

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

এই হচ্ছে পিটার কাস্টার্স


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

সশস্ত্র লড়াই সংগঠিত করতে জাসদ নেতৃত্ব 'সি আই এ'র লোক বলে কথিত পিটার কাস্টারের নিকট হতে ৪০ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেন।

ফ্যাক্টস্ এন্ড ডকুমেন্টস্ ঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড - অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।