গ্যালাপাগোসের প্রাণীরা

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৩/০৭/২০২০ - ৫:৩৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ সারা পৃথিবীর কাছে এক বিস্ময়, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর থেকে এক হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত এই ক্ষুদের আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ মূলত বিখ্যাত এখানের অসাধারণ সব প্রাণীকুলের জন্য, যাদের অধিকাংশই পৃথিবীর আর কোথাওই মেলে না, যাদের আমরা বলি এনডেমিক। আর তার চেয়েও বেশী বিখ্যাত এখানের কিছু পাখি আর দানব কচ্ছপের জন্য, যাদের প্রায় একই রকম দেখতে অথচ ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি ছড়িয়ে আছে সবচেয়ে বড় ১৩টি দ্বীপে, অর্থাৎ কিনা অতীতে পূর্বপুরুষ এক থাকলেও আলাদা আলাদা দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ার পর লক্ষ বছরে তারা বিবর্তিত হয়ে ভিন্ন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছেন, যা এই দ্বীপপূঞ্জে এসে সবার আগে লক্ষ্য করেছিলেন চার্লস ডারউইন, এবং নানা দ্বীপের পাখি, কচ্ছপ, ও অন্যান্য প্রাণীর নমুনা নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যেয়ে পরের কয়েক দশক সেই নিয়ে নিবিড় গবেষণা করে বিবর্তনবাদের বৈপ্লবিক সত্যে উপনীত হয়ে ছিলেন, যা বিশ্বকে এনে দিয়েছে এক নতুন আলোর দিগন্ত। বলা চলে গ্যালাপাগোস অতি বিখ্যাত হবার আরেক কারণ চার্লস ডারউইনের এখান্র ভ্রমণ ও সেই নিয়ে লেখাও, যে কারণে জাতিসংঘের ইউনেস্কো যখন বিশ্বসম্পদ ঘোষণা তালিক প্রস্তত করতে শুরু করেছিল সারা পৃথিবীর সর্বপ্রথম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষিত হয় ‘গ্যালাপাগোস দ্বীপ’।

যে কোন পাখিপ্রেমীর কাছেই গ্যালাপাগোস এক স্বর্গের নাম, এখানে ২৪টি এনডেমিক পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে একটি গোত্র, যাদের নামে চার্লস ডারউইনের নামে ‘ডারউইন ফিঞ্চ’ রাখা হয়েছে সেই গোত্রের ১৪ প্রজাতির পাখি এই দ্বীপগুলো ছাড়া আর কোথাওই মেলে না! শুধু তাই নয় এখানে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে যে পেঙ্গুইন বাস করে সেই গ্যালাপাগোস পেঙ্গুইন, পৃথিবীর একমাত্র উড়তে অক্ষম পানকৌড়ি, এবং এখানের এনডেমিক পাখি না হলেও সবচেয়ে বড় ডানার অধিকারী অ্যালব্রাট্রস পরিবারের ‘ওয়েভড অ্যালব্রাট্রস’ কিন্তু প্রজনন করে এই গ্যালাপাগোসেরই এস্পানিওলা দ্বীপে! আছে ৩ প্রজাতির বুবি, দুই জাতের ফ্রিগেট, মোট ১৮৫ প্রজাতির পাখি এখন অবধি দেখা গেছে এখানের দ্বীপগুলোতে। তাই কৈশোরে যখন প্রথম শুনেছিলাম এই দ্বীপ নিয়ে তখন থেকে স্বপ্ন ছিল কোন একদিন এখানে যাবার, প্রাণীগুলোকে দেখার।

এবার ইকুয়েডর ভ্রমণের সময় ( নভেম্বর, ২০১৯) সেখানের রাজধানী কুইটো শহরে দেখলাম গ্যালাপাগোস ভ্রমণের নানা প্যাকেজ দিচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি, কিন্তু গ্যালাপাগোস সস্তা জায়গা নয়, বেশ ব্যয়বহুল। একে তো প্লেনে করে যেতে প্রায় পাঁচশ ডলার লাগবেই কুইটো থেকে, আবার ন্যাশনাল পার্কে প্রবেশের ফি হিসেবে ১২০ ডলার। সেই সাথে নানা দুর্গম দ্বীপে বিশেষত যেখানে প্রাণীগুলো থাকা সেখানে নিজের মত করে যাবার কোন উপায় নেই, বিশেষ বিশেষ কোম্পানির জলযানে চেপে প্যাকেজ ক্রুজ কিনলেই তবে সেখানে যাওয়া সম্ভব এবং অধিকাংশ ক্রুজই ৩ থেকে ৫ হাজার ডলার মূল্যের! বেকে বসল ভ্রমণ সঙ্গী জেরিন আপা, তাঁর কথা এত দূর এসেছি আবার কবে আসব ঠিক নেই, আর গ্যালাপাগোসের ছবি দেখে তাঁর এতই ভালোই লেগেছে যে যেতেই হবে এবারি।

এমন এক কোম্পানির অফিসে ধর্না দিয়ে জানালাম মূলত পেঙ্গুইন আর পানকৌড়ি দেখতে চাই, সম্ভব হলে অ্যাল্ব্রাটস আর অবশ্যই দানবীয় কচ্ছপ ও সাগরের ইগুয়ানা, তারা অনেক হিসেবে করে গোলোন্ড্রিনা নামে এক জাহাজের নাম প্রস্তাব করল যা ৫ দিন ও ৪ রাত ধরে গ্যালাপাগোসের ৫টি দ্বীপে যাবে এবং সেখানে কাঙ্ক্ষিত অধিকাংশ প্রাণী দেখার সম্ভাবনা আছে। তাই এক শুভ দিন দেখে কুইটো থেকে প্লেনে চেপে গুয়াইইয়াকিল শহর ছুঁয়ে ফের উড়াল দিয়ে আমরা সোজা নামলাম গ্যালাপাগোরের বাল্ট্রা দ্বীপে, যেখানে মূল বিমানবন্দরটি অবস্থিত।

সেখানেই আমাদের সাথে দেখা হল দলের অন্যান্য ১২ সদস্যের সাথে যারা এসেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এবং আমাদের এই ভ্রমণের গাইড উইলিয়াম বিলির সাথে, যার তত্ত্বাবধানেই চলবে এই অপরূপ স্বর্গ দেখা। সেই সাথে বিমানবন্দরেই অপেক্ষায় সময়ই দেখা হয়ে গেল অন্তত দুই জাতের ডারউইনিয়ান ফিঞ্চ, গ্যালাপাগোস-ঘুঘুর সাথে! মাথার উপরে চক্কর কাটছে ফ্রিগ্রেট পাখির দল, শুরু হয়ে গেল রোমাঞ্চময় ভ্রমণ।

বিমানবন্দর থেকে সোজা বাস আমাদের নামিয়ে দিল জেটিতে, সেখান থেকে ক্ষুদের স্কুনার গোলোন্ড্রিনায় ওঠার আগে লাভা-বক (Lava Heron)

নীলপা-বুবি আর ল্যাগুনে সী-লায়ন সাঁতরে আমাদের বরণ করে নিল যেনো। নৌকায় প্রতি দুইজনের জন্য একটি কেবিনে, সাথে বাথরুম, বেশ প্রশস্ত এক খাবার ঘর যেটাতে মিটিংও চলবে আর দুইতলা ও তিনতলায় চমৎকার ডেক! মাঝে মাঝে মাস্তলের উপরে এসে বসত ফ্রিগ্রেট পাখি।

আর ছিল আমাদের স্কুনারের ক্রুরা, সবাইই ইকুয়েডরের মানুষ, গাইড বিলি, ক্যাপ্টেন মিল্টন, ফার্স্ট মেট মিগুয়েল, অফিসার, ডেক বয়, রান্নার লোক, সব মিলিয়ে বেশ ক'জন, যাদের সাথে খুব দ্রুত বন্ধুত্ব হয়ে গেল তাঁদের বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের কারণেই। ইনাদের কেউই কোনদিন বাংলাদেশের নাম শুনে নাই, দেখে বেশ অবাক হলো যে পৃথিবীর অন্য মাথা থেকে বাদামি চামড়া আদমিরা এসেছে গ্যালাপাগোস দেখতে।

প্রথম মিটিঙেই জাহাজের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গাইড খুব সুন্দর করে গ্যালাপাগোসের গুরুত্ব এবং পর্যটক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ব্যাখা করলো, কোন ভাবেই কোন প্রাণী যতই কাছে আসুক তাকে স্পর্শ করা যাবে না, এবং নির্দিষ্ট যে গণ্ডীতে আমাদের হাঁটার কথা তার বাহিরে যাওয়া যাবেই না, কারণ আপার দৃষ্টিতে সবুজ ঘাস বা নিষ্প্রাণ পাথর মনে হলেও সেখানে হয়ত আছে কোন সামুদ্রিক পাখি বা ইগুয়ানার ডিম, এবং কোন কিছুকেই এমনকি একটি মৃত শামুকের খোলসকেও তার জায়গা থেকে চ্যুত করানো যাবে না, কারণ হয়ত সেটি কোন প্রাণীর আশ্রয়!


( তিমির কংকাল)

সেই সাথে পইপই করে বুঝিয়ে দেওয়া হল সাঁতারের সময় কী কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এবং সেই বিকেলের সান্তাক্রুজ দ্বীপের এক আধো চন্দ্রাকৃতির বালিয়াড়িতে নামলাম আমরা সামান্য হেঁটে বেড়ানো এবং অগভীর পানির স্নরকেলিং এর জন্য, সেখানে একাধিক সীলায়ন ও অনেক মাছের ঝাঁক সারাক্ষণ কাছে কাছে থেকেই জানান দিল যে আগামি কটা দিন কতটা অপূর্ব যাবে আমাদের!

সেদিন সারারাত জাহাজ চলল ইসাবেলা দ্বীপের দিকে, উল্লেখ্য এটি দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ, টালমাটাল উত্তাল সাগরে ঘুমের খুব একটা ব্যাঘাত ঘটে নি পথের ক্লান্তিতে।

ঘুম ভাঙার পর ডেকে যেতেই নজরে আসল একটা লম্বা ঘাড়ের কালো মত পাখি সাঁতরে যাচ্ছে, দেখেই মনে হল পানকৌড়ি, কিন্তু নিশ্চিত হবার জন্য চোখ রগড়ে ভালো মত তাকাতেই দেখি সে টুপ করে পানির নিচে তলিয়ে গেল! গাইডকে বললাম মনে হল একটা পানকৌড়ি দেখলাম, উনি হেঁসে বলল হতেই পারে, তীরের দিকে তাকিয়ে দেখো, সব পাথর পানকৌড়ির মলে সাদা হয়ে আছে! এবং সেই পাথরের মাথায় বেশ কটা পানকৌড়ি বসে আছে !

সারা গ্রহে ৪০ প্রজাতির পানকৌড়ির আবাস, এবং এক একটি মাত্র গ্যালাপাগোস-পানকৌড়িই উড়তে অক্ষম, বেশ বড় আকৃতির পাখি, আমাদের পাতি-পানকৌড়ির চেয়ে আকারে বড় কিন্তু ডানা দুটো সেই অনুপাতে ক্ষুদে ক্ষুদে, বেশ কটা পাখিকে দেখলাম সেই ক্ষুদে ডানা মেলে রোদে শুকাচ্ছে! দ্বীপে যা হয় আর কী, ওড়ার দরকার নাই, কোন শত্রুও নাই, খাবার পানিতে, আর পানকৌড়িতো এমনিই সাঁতারে ওস্তাদ, তাই আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলেছে ওড়ার ক্ষমতা, এবং বহাল তবিয়তে টিকে আছে।

আর চোকোর করা ভিডিও এখানে

https://www.youtube.com/watch?v=yGJTt7crNQQ&feature=youtu.be

পানকৌড়ির আস্তানা কাছে থেকে দেখার জন্য ছোট নৌকায় চাপা হল, উথালপাথাল ঢেউয়ের মাঝে তাদের কাছ থেকে দেখে অন্তরীপের আরেক দিকে যাওয়া হল যেখানে ছিল নাজকা-বুবিদের আস্তানা। গ্যালাপাগোসে তিন প্রজাতির বুবির দেখা মেলে নীলপা-বুবি, লালপা-বুবি এবং নাজকা-বুবি। অপূর্ব সুন্দর পাখিগুলো যেমন আমাদের মুগ্ধ করল, তেমনই তাদের মাছ ধরার জন্য ডাইভ দিয়ে ঠিক পানি স্পর্শের এক মুহূর্ত আগে দুই ডানা বন্ধ করে দেহের সাথে সেঁটে একেবারে মিসাইলের মত পাখির গভীরে যেয়ে মাছ ধরার দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে বহুবার গ্যালাপাগোসে।

আর এখানে দেখা মিলল গ্যালাপাগোস- ফার সী লায়নের, উল্লেখ্য এখানে দুই ধরনের সীলায়ন থাকে, তারমধ্যে ফার-সীলায়নরা অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির কিন্তু চোখ বেশ বড় বড়, এদের সংখ্যা নানা কারণে পড়তির দিকে বিধায় অসাধারণ প্রাণীটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন।

এরপর আমাদের যাত্রা ছিল ইসাবেলা পাশেই যে ফার্নান্দিনা দ্বীপ আছে সেখানের এক ইগুয়ানা-নগরীর উদ্দেশ্যে, উল্লেখ্য যে সারা পৃথিবীতে এই একটিই গিরগিটি জাতীয় প্রাণী আছে সেটি সাগরে টিকে থাকতে পারে, এবং সেটা একমাত্র এই গ্যালাপাগোসেই! এক কালের এদের পূর্বপুরুষেরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোন উপায়ে ( সম্ভবত ঝড়ের ফলে তৈরি গাছের ভেলা) এই দ্বীপে আসে এবং লক্ষ বছর তারা খাপ খাইয়ে নেয় এমনকি সামুদ্রিক দ্বীপে সাগরের গহন থেকে খাদ্য আরোহণের উপায়েও সফল হয়! অনেকেই গ্যালাপাগোসে আসেন প্রকৃতির অপার বিস্ময় এই মেরিন-ইগুয়ানাদের দেখতে।

সেই অন্য গ্রহের বিকেলে হাজার হাজার ইগুয়ানা দেখলাম আমরা, দেখতে ভয়ংকর মনে হলেও এরা অত্যন্ত নিরীহ ও শুধুমাত্র সব্জিভোজী। সাধারণত দেখতে কালচে রঙের হলেও প্রজনন কালে লাল, সবুজ নানা রঙ ধারণ করে এই অনন্য সরীসৃপ। পাথরের সাথে এমন ভাবে মিশে থাকে যে বার কয়েক ওদের শরীরেই পা পড়ে যাচ্ছিল, আর তখনই হিস হিস শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম আর তাদের নাক থেকে কী এক পদার্থ ছিটকে ছিটকে আসছিল! তা এগুলো শত্রু দূরের রাখার কোন উপায় নয়, এগুলো হচ্ছে তাদের নাকে জমে থাকা সাগরের লবণ বের করে দেবার উপায়। ১৯৯৯ সালের এল নিনো ঝড় ও ঝড় পরবর্তী সমুদ্রে উষ্ণতা বাড়ায় খাদ্যের অভাব দেখা দিলে অধিকাংশ ইগুয়ানায় মারা গেছিল, এখন আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

ইগুয়ানা দ্বীপে দেখা হয়েছিল বেশ কটি সীলায়নের সাথে,যাদের কয়েকজন আধা জলের মধ্যে থেকেই ঘুমাচ্ছিল মহা আরামে, তাদের ভালো মত লক্ষ্য করার জন্য কাছে যেতেই দেখা গেল পানির মধ্যে সাদা-কালো কী যেন সাঁতরাচ্ছে, তার মানে এটি ইগুয়ানা নয়! এবং ভেসে ভেসেই আমাদের দিকে দ্রুত গতিতে আসছে সেটি, এবং অতি আনন্দের সাথে লক্ষ্য করলাম সেটি আমাদের বহু আরাধ্য গ্যালাপাগোস-পেঙ্গুইন! বেশ ছোট আকৃতির, ফুট খানেকের মত লম্বা, বিশ্বের পাখি জগতের মধ্যে এমনিতেই এক বিস্ময় ১৭ প্রজাতির পেঙ্গুইনেরা, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তরে একেবারে ত্রান্তীয় অঞ্চলে বিষুবরেখায় থাকার জন্য এই বিশেষ পেঙ্গুইন প্রজাতি আরও বিস্ময়ের দাবীদার!

সেই অসাধারণ বিকেলে আরও দেখা হয়ে গেলে গ্যালাপাগোসের একমাত্র নিজস্ব শিকারি পাখি গ্যালাপাগোস-হকের সাথে (Hawk) , সে তখন ব্যস্ত ছিল এক সীয়লায়নের প্ল্যাসেন্টা খেতে, পরে ওড়ার সময় দেখলাম তার পায়ে রিং পরানো।

পরদিন ইসাবেলা দ্বীপের ডারউইন হ্রদ দেখতে যাওয়া হল, এবং সেখানে দেখা মিলল কাঠঠোকরা-ফিঞ্চের, যে ফিঞ্চরা ছোট ছোট কাঠি ব্যবহার করে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত! সেখানে আমাদের চক্ষুচড়ক গাছ করে দিয়ে এক বিশাল আলফা সীলায়ন পাহাড় ডিঙ্গিয়ে চলে গেল থপথপ করে! এবং সাগরের কিনারে চোখে পড়ল এক গগনবেড় বসতি ভর্তি ছানা। গাইড জানালেন অনেকদিন পর এমন ছানাদের দেখলেন তিনি, তুলার বলের মত দেখতে সেই ছানারা মহা ক্ষুধার্ত, তাদের বাবা-মা মহাব্যস্ত সাগর সেঁচে তাদের খাদ্য জোগাতে।

এরপর আমরা চললাম ইসাবেলা দ্বীপের দুই মৃত আগ্নেয়গিরিতে দানব কচ্ছপদের দেখতে। সেখানে প্রথমেই দেখা গেল স্থলচর ইগুয়ানাদের, দারুণ হলুদ- কমলা বর্ণের ক্ষুদের ডাইনোসর ধরনের প্রাণী, অতি নিরীহ। মানুষ দেখে ভয় পায় না মোটেও, নিজের মতই বসে থাকে!

এবং এদের পরেই দেখা গেলো শতবর্ষী বিশালকায় কচ্ছপ। একসময়ে এই দ্বীপপুঞ্জে ১৪ ধরনের কচ্ছপ ছিল, এখন মানুষের অত্যাচারে ৪ ধরনের কচ্ছপ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। বাকীদের অবস্থাও ভালো না। প্রথম মানুষ যখন এখানে আস্তানা গেড়েছিল, সেই নাবিকদের কাজই ছিল কচ্ছপের মাংস, টাটকা এবং নোনা করে অন্য জাহাজিদের কাছে বিক্রি করা!

এই করতে করতে আজ বেহাল দশা, সেই আছে ছিল মানুষের আনা লক্ষ ছাগল, কুকুর, বেড়াল, শুঁয়োর, ইঁদুর অন্যান্য প্রাণী, যারা প্রথমেই কচ্ছপদের খাবার খেয়ে ফেলছিল, এবং অনেকেই খেয়ে শেষ করে দিচ্ছিল এদের ডিম! অবশেষে চার্লস ডারউইন রিসার্চ ষ্টেশন দায়িত্ব নেবার পর থেকে আস্তে আস্তে অবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকে, এখন অন্তত এই দ্বীপগুলোতে আর ছাগল, কুকুর, বিড়াল, শুয়োর ইত্যাদি মানুষের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারী প্রাণী নেই।


( মৃত কচ্ছপের খোল, হয়ত খুন হয়েছে মানুষের হাতে)

গ্যালাপাগোস ভ্রমণে গেলে সবার জন্য অবশ্যপাঠ্য চার্লস ডারউইনের বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী ‘ভয়েজ অফ দ্য বিগল’এর অন্তত গ্যালাপাগোস অধ্যায়টি। জাহাজে দ্বিতীয় রাতেই দুলুনির ফাঁকে ফাঁকে আরেক দফা পড়ে ঝালাই করে ফেললাম সেই মহান বিজ্ঞানীর গ্যালাপাগোসের প্রাণীকুল দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হবার অসাধারণ অনুভূতিগুলো।


(গাইড বিলি, আজীবন ব্যাচেলর থেকেই গেলেন গ্যালোপাগোসের প্রেমে পড়ে)

গ্যালাপাগোসে থাকার সময় প্রতিদিনই আমরা একাধিক বার করে সাগরে নেমেছি স্নরকেলিং এর জন্য, কখনো এক ঘণ্টা কখনো বা দুই ঘণ্টার জন্য। অপূর্ব সুন্দর রঙিন সেই বিচিত্র জগত, গ্যালাপাগোসের স্থল্ভাগের মতই। শুধু একটি দিনের কথা উল্লেখ করছি যা মানসপটে গেঁথে গেছে চিরতরে, ‘ পানিতে নামার মিনিট খানেক পরেই দেখেই লম্বা গলার কালো কী যেন একটা আমার পাশ দিয়ে নেমে পাথরের খোঁড়লের দিকে এগোচ্ছে, অবাক হয়ে দেখি সেটি গ্যালাপাগোসের অতি বিখ্যাত পানকৌড়ি! উড়তে না পারলেও তার খাদ্য সংগ্রহের জন্য যেটা আসল কাজ সে ডুবসাঁতারে সে অতি পটু! এবং সেই অতি অল্প সময়ে দুই পাথরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা মাছ ধরে সে ফেরত গেল উপরে। এই সময়ে দেখি কয়েক মিটার সামনে সবুজ সামুদ্রিক ঘাস ভরা পাথরে হাতপায়ের নখ দিয়ে নিজেকে আঁকড়ে ঘাস খাচ্ছে এক ছোট ডাইনোসরের মত দেখতে মেরিন ইগুয়ানা! এই দৃশ্য কতবার দেখেছি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ম্যাগাজিনের ছবিতে আর নানা তথ্যচিত্রে, আর সে এখন আমার সামনে!

ভিডিও লিঙ্ক এখানে

https://www.youtube.com/watch?v=mTHPyMLdiDA&feature=youtu.be

পাঁচ বন্ধু মিলে সেটার ছবি তুলতে লাগল কোনরকম বিরক্ত না করে, এবং মনে হল অন্ততকাল ধরে চলছিল সেই অসাধারণ অনন্য দৃশ্য। এর মাঝে দেখি বন্ধুরা সব কী এক অজানা কারণে ইগুয়ানার উপরে আকর্ষণ হারিয়ে অন্য দিকে ক্যামেরা ফেরাচ্ছে, পানির নিচেই আমি মনে মনে চিৎকার শুরু করলাম, “এই ইগুয়ানার চেয়ে আকর্ষণীয় আর কী আছে, এই পাগলেরা” এবং তখনই দেখলাম সাগরের এক অগভীর জায়গায় আস্তে আস্তে মৃদু ভাবে চরে বেড়াচ্ছে দুইটা বিশাল প্যাসিফিক গ্রিন কাছিম, কী অসাধারণ প্রাণীগুলো, এবং তাদের একটু কাছ থেকে দেখার জন্য এগোতেই ঠিক কাঁধের কাছে মৃদু ধাক্কার মত লাগলো, আর একরাশ বুদবুদ দেখলাম সেখানে, আর ছুটন্ত একটা অবয়ব! আবারও সেই পানকৌড়ি ফিরে এল নাকি ভাবতে ভাবতেই মহা আনন্দে দেখি সেটি আমাদের পরিচিত পাখি, গ্যালাপাগোস-পেঙ্গুইন! তার সাথেও সাঁতার কাটছি একই সাথে, এর চেয়ে রোমাঞ্চকর আর কিছু হতে পারে কিনা জীবনে এটা ভাবছি এবং তখন দেখি বেশ গভীর এলাকা থেকে উঠে আসল এক জোড়া সীলায়ন! পুরোটাই স্বপ্নের মত লাগলো এক ফ্রেমে পানকৌড়ি, পেঙ্গুইন, ইগুয়ানা, কাছিম, সীলায়ন দেখে!
পেরুভিয়ান বন্ধু চোকোর করা ভিডিও লিঙ্ক এখানে
https://www.youtube.com/watch?v=bX_zv8PoFLI&feature=youtu.be

এছাড়া আমাদের দেখা হয়েছিল সান্তিয়াগো ও সমব্রেরো দ্য চীন দ্বীপ, সব দ্বীপগুলোতেই খুব সর্ব উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি গ্যালাপাগোস-মকিংবার্ডের! উল্লেখ্য এখানের ৩ দ্বীপে ৩ প্রজাতির মকিংবার্ড এবং সারা দ্বীপপুঞ্জে এই ১ ধরনের মিলে মোট ৪ প্রজাতির মকিংবার্ড দেখেই কিন্তু প্রথম চার্লস ডারউইনের মনে এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির বিবর্তনের সম্ভাবনার কথা জেগে উঠেছিল, বিখ্যাত ডারউইন ফিঞ্চদের দেখে নয়।

এর মাঝে এক বিকেলে পাইলট তিমিদের ঝাঁকের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ায় জাহাজের ক্যাপ্টেন মিল্টন অত্যন্ত খুশী হয়ে বললেন যে ৪ বছর পর তিনি এই তিমিদের আবার দেখলেন! তাদের ছাড়া নিঃশ্বাসে রংধ্নুর জন্ম হতে দেখা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সেরা দৃশ্যদের একটি।

সেই সাথে বার তিনেক দেখা মিলল সাগরের বাদুড় খ্যাত বিশাল ম্যান্টা-রের, তারা পানির উপরে উল্টো ডিগবাজীও দেখিয়েছিল একবার। আর ঈগল রেও ছিল। ছিল হাঙ্গরেরাও।

যাত্রার শেষ দিন গ্যালাপাগোসের একমাত্র জনবহুল দ্বীপ সান্তাক্রুজের পুয়ের্তো আইয়োরায় অবস্থিত চার্লস ডারউইন রিসার্চ ষ্টেশন দেখতে গেলাম আমরা যেখানে একসময় ছিল পিনটা দ্বীপ থেকে আনা বিখ্যাত কচ্ছপ ‘লোনসাম জর্জ’, এখন সে মৃত, এবং সেই সাথে সেট প্রজাতিও বিলুপ্ত।

কিন্তু দেখে ভালো লাগলো কিছু অসাধারণ মানুষের প্রবল পরিশ্রমে এখনো টিকে আছে অন্যান্য প্রজাতি, বিশেষ করে দিয়েগো নামের সেই বয়স্ক বিশাল কচ্ছপ, সে এখন অবধি অন্তত ৮০০ ছানার জন্ম দিয়েছে।


( দিয়েগো, সম্প্রতি তাকে রিটায়ার করিয়ে দ্বীপে মুক্ত হয়ে দেওয়া হয়েছে)

সেখানে ঘোরার ফাঁকে ফাঁকেই দেখা মিলল বিশালদেহী বড়-ভূমিফিঞ্চ ( Large Ground Finch), ও ভেজেটেরিয়ান ফিঞ্চের সাথে! সেই সাথে ১৩টি এনডেমিক পাখি দেখার মিলেই গেলে এই গ্যালাপাগোসে! এখন আশা বাকিরা যেন টিকে থাকে, এবং অ্যালব্রাট্রসরাও। বুকের ভিতরে আবার একদিন এই এক ও অনন্য স্থানে আরও সময় নিয়ে ফিরে আসবার প্রগাঢ় আহ্বান নিয়ে প্লেনে চাপলাম কুইটোর উদ্দেশ্যে।

( এই লেখাটি জেরিনাপুর জন্য, তাঁর জোরাজুরি না থাকলে এই অপূর্ব ভ্রমণ সম্ভব হতো না। এবং এখন যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করে যে পৃথিবীর কোন জায়গায় আমি আরেকবার ফিরে যেতে চাই বা বার বার ফিরে ফিরে যেতে চাই সেটার নাম 'গ্যালোপাগোস!)


মন্তব্য

ওডিন এর ছবি

ক. আপনার সেরা লেখা।
খ. এই লেখাটা আরও বাড়িয়ে প্রচুর ছবিসহ একটা বই হিসেবে আসা উচিত।
গ. গত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি আপনার সেই দুই গোলার্ধ জুড়ে ভ্রমণ নিয়েও একাধিক বইপত্র আসা উচিত।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

ঝামেলা কইরেননা তো। এসব নিয়ে বেশি লেখালেখি অবিশ্বাস >> হিংসা >> দুঃখ >> অশান্তি তৈরি করে। না জানলেই শান্তি।

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

তারেক অণু এর ছবি

মায়া রে ব্যাটা, সবই মায়া

তারেক অণু এর ছবি

প্রতি পাখির ছবি দিলেই অনেক অনেক ছবি হয়ে যেত! আসলে দ্বীপ হিসেবে সিরিজ করা যেতো! দেখা যাক। ভিয়েতনামের লেখার অপেক্ষায় রইলাম

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

১।
গ্যালাপাগোস নামে কিছু নাই, এই দ্বীপের প্রকৃত নাম হল "ক্যালোট্রপিস" আইল্যান্ড! খাইছে

২।
সাঁতারের পোষাকে অণুদাকে দেখে প্রথমেই মাথায় এল- "সাঁতরাতে ডিপিকাল্টিজ ছিল না?" চাল্লু

৩।
কদিন আগে দ্বিজেন শর্মার অনূদিত 'বিগল যাত্রীর ভ্রমণকথা' পুনর্পাঠ করলাম। সাম্প্রতিক সময়ের গ্যালাপাগোস নিয়ে আসলেই একটা বই হোক, সচিত্র। পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

তারেক অণু এর ছবি

ওহ হ্যাঁ, আমি তো ক্যালিট্রপিস ভেবেছিলাম!

নাহ,স্নরকেলিং করা খুব একটা কঠিন না, তবে ঢেউ ছিল অনেক।

দ্বিজেন স্যারের বইটি এতই সংক্ষেপিত, র‍্যাপিড রিডারের মতো, মূল বইটা পড়া তো??

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

আমি এসব বিশ্বাস করিনা। বিশ্বাস করলেই হিংসা আর দুঃখ হবে।

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

তারেক অণু এর ছবি

কী হয় এট্টূ বিশ্বাস করলে।

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

ছবি আর লেখা দুটোতেই প্রাণ জুড়াল

তারেক অণু এর ছবি

ধন্যবাদ দাদা, পরের বার পুয়ের্তো আয়োরাই টানা থাকার প্ল্যান করে যাবো।

হাসিব এর ছবি

খরচের কথা পড়ে দমে গেলাম একদম!

তারেক অণু এর ছবি

আহা , একবার লিখেছিলাম কমেন্ট , উধাও হলো কিভাবে!

হ্যাঁ , গ্যালাপাগোস বেশ ব্যয়বহুল, কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় রাখা যেতে পারে যে এখান ব্যয় করা প্রতিটি পাইপয়সা আসলেই নিসর্গ সংরক্ষণের কাজে লাগে, বিপন্ন প্রাণীদের কাজেই মূলত ব্যয় হয়, সেটাও একটা তৃপ্তি। আবার দলে দলে হাজার হাজার লোক সেখানে গেলে সেটা গ্যালাপাগোসের জন্য ক্ষতিকর।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

তারেক অনু ইজ এগেইন ফুল ফর্ম। চলুক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।