নাদিয়া হোসেন, বাংলাদেশের মিষ্টি/পনির, এবং আমাদের হিরো ওয়ার্শিপ কমপ্লেক্স

ইয়ামেন এর ছবি
লিখেছেন ইয়ামেন [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ২২/০৬/২০১৬ - ৩:০০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

নাদিয়া হোসেন এর নাম অনেকেই শুনেছেন। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক, বাংলাদেশী অভিবাসী বাবা-মার সন্তান। গতবছর 'গ্রেট ব্রিটিশ বেক-অফ' নামক ব্রিটিশ রান্নার প্রতিযোগিতা-মূলক টিভি শো জিতে ব্রিটেনের মানুষের কাছে নাদিয়া 'ন্যাশনাল সুইটহার্টে' পরিনত হয়েছেন। ইউকের মাল্টিকালচারাল ডাইভার্সিটির এক উজ্জ্বল উদহারন হিসেবে নাদিয়াকে এখন ধরা হয়ে থাকে, এমনকি খোদ রানী এলিজাবেথের ৯০ই তম জন্মদিনের কেক বানানোর দায়িত্ব পান তিনি

স্বাভাবিকভাবে, বাঙ্গালী মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়াতে তাকে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হওয়া বাঙ্গালীদের পোস্ট অহরহ চোখে পড়ে থাকবে। অনেকেই তাকে 'বাংলাদেশের গৌরব' এবং 'বাংলাদেশীদের জন্য রোল মডেল' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তো গত রবিবার গার্ডিয়ান পত্রিকায় তার এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশী খাবার ঐতিহ্য নিয়ে তার কিছু বক্তব্য চোখে পড়ার মত।

১) "The concept of dessert doesn’t exist in Bangladeshi cuisine and so the only time we had it was at school." - বাংলাদেশে ডেজার্ট, অর্থাৎ ভোজের পরে মিষ্টি মুখ করার কন্সেপ্ট নেই?? কিন্তু বাঙ্গালী ট্রেডিশনে ভোজের পর একটু মিষ্টিমুখ করা তো বিশাল বড় জিনিস। সব দাওয়াতে মেইন ডিশের পর মিষ্টি/দই ইত্যাদি সার্ভ করা হয়ে থাকে।যে কোন বিয়ে/বউ-ভাতের দাওয়াতে পোলাও/রোস্ট/রেজালার পরে সবাই যে জর্দা/ফিন্নির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, সেটা তো ডেজার্টই। আর যদি পশ্চিমা বিশ্বের 'ডেজার্ট', তথা কেক/পেস্ট্রির কথা ধরি, তাহলে আজকের সুমিস হট কেক এন্ড পেস্ট্রি, মিঃ বেকার, অথবা আরও আগের কুপার্স, কফি কুকার্স সেভেন, সোবহানবাগের বেকারির দোকানগুলো আছে। সেসবের কথা বাদ দেই, মিষ্টিমুখ করার প্রচলন তো শুধু বাংলাদেশের শহরে সীমাবদ্ধ নয়, গমফঃস্বল গ্রামেও আছে। গ্রামে বেশ কয়েকবার বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়েছে, সেখানেও দেখেছি অতিথিদের মিষ্টিমুখ করাতে। আর পিঠা উৎসব তো বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ট্রেডিশনগুলোর একটি! নাদিয়া হোসেন 'বাংলাদেশী খাবার ঐতিহ্যে ডেজার্টের চলই নেই', এমন ঢালাও মন্তব্য কিভাবে করেন?

২) "I also have a senseless love affair with cheese. My mother never bought any because there was none in Bangladeshi cuisine. I was introduced to it – and grapes and crackers – at school and it was very painful because then I’d crave cheese every night at home. It felt very English – and French. I seem to fall in love with things I wasn’t brought up with." - এই বক্তব্যটাও তো অনেকাংশেই ভুল। পশ্চিমা বিশ্বে যাকে 'cottage cheese' বলা হয়, সেটা বাংলাদেশে 'পনির' হিসেবে পরিচিত এবং অন্তত শহরগুলোতে সহজলভ্য। হ্যাঁ, গ্রামে কিংবা মফঃস্বলে পনির পাওয়া কিছুটা দুষ্কর হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে পনিরের চল নেই, এটা আবার একটা খুবই অজ্ঞ বক্তব্য।

৩) বাংলাদেশী খাবার নিয়ে এমন হাস্যকর দুটো বক্তব্য করার পর সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে নাদিয়া বলেছেন, "When I went into Bake Off I never imagined I’d come out the other end elevated and a role model – for Bangladeshis, bakers, Muslims, women and all; I didn’t expect any of it." দুঃখিত, কিন্তু আমার কাছে উনাকে রোল মডেল হিসেবে মানা একটা নির্মম রসিকতার সমান। হ্যাঁ, লুটন শহরের একটি মধ্যবিত্ত রক্ষনশীল সিলেটি বাঙ্গালী পরিবার থেকে আসা নাদিয়ার কৃতিত্ব যে প্রশংসার দাবীদার, এটা মানতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু নিজের জানার ঘাটতি থেকে হোক, বা তার বাবা-মার শেখানোর গাফিলতির জন্য হোক, বাঙ্গালী মিষ্টির ঐতিহ্য বা বাংলাদেশী পনির নিয়ে যার নুন্যতম ধারনা নেই, তাকে বাংলাদেশীদের জন্য অনুপ্রেরণা কিভাবে মানা যায়?

অবশ্য নাদিয়া হোসেনের অজ্ঞতার দায় তার বাবা-মার উপরে আপেক্ষিকভাবে বেশী বর্তায় বলে আমি মনে করি। আরও অনেক বাংলাদেশী ইমিগ্রেন্টের মতই নাদিয়ার বাবা-মা ইউকেতে একটা ইন্ডিয়ান রেস্তরাঁ চালান বলে খবরের কাগজে উঠে এসেছে। যারা নিজেরা দেশীয় রান্নার সাথে যুক্ত, তারা নিজের কন্যাকে বাংলাদেশী মিষ্টি/পনিরের ব্যাপারে কোন রকম ধারনা দিতে পারেননি, এটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। অবশ্য অনেক প্রবাসী বাঙ্গালীদের মধ্যেই এমন দেখেছি। তারা যেই দেশ ফেলে এসেছেন, সেই দেশের নেতিবাচক দিকগুলোই ছেলেমেয়ের সামনে তুলে ধরেন বেশী করে, আমাদের যে হাজার বছরের পুরানো ঐতিহ্য আছে, শত ঝুটঝামেলা সত্ত্বেও অনেক কিছু নিয়েই গর্ব করার আছে, সেসব তারা তুলে ধরেন না। এ থেকে যায় হয়, নাদিয়ার মত ছেলেমেয়েরা বড় হোন নিজের বাবা-মার ফেলে আসা দেশের বিষয়ে নেগেটিভ একটা ধারনা নিয়ে। এমন ধারনা থাকলে আসলে নিজের পূর্বপুরুষের দেশ সম্পর্কে জানতে আগ্রহও কমে যাওয়ার কথা। সেরকম মানসিকতার প্রতিফলনই নাদিয়ার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

এখানে আমরা বাঙ্গালীদের অতিরিক্ত 'হিরো ওয়ার্শিপ' প্রবণতা নিয়েও কিছু বলার অবকাশ আছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাঙ্গালীদের মধ্যে দেখেছি, বাঙ্গালী অভিবাসী কেউ কিছুটা সাফল্য পেলেই তাকে আমরা তুমুল উৎসাহে আইকন/হিরো/রোল মডেল বানাতে উঠেপড়ে লেগে যাই। বাঙ্গালী বংশদ্ভত হলেই যে সে বাংলাদেশকে রেপ্রিজেন্ট করার, বা বাংলাদেশীদের জন্য রোল মডেল হবার উপযুক্ত, তা কিন্তু নয়। নাদিয়া হোসেনের বাংলাদেশের মিষ্টি/পনির নিয়ে জ্ঞানের অভাব এখানে তুলে ধরেছি। কিন্তু এমন আরও অনেকেই আছেন। জিয়া হায়দার রহমানের কথা যেমন বলা যায়। ব্রিটিশ এই লেখক ছোটবেলায় বাবা-মার সাথে বাংলাদেশ ছেড়ে ইউকেতে এসে থিতু হয়েছেন। দুই/তিন বছর আগে তার বই 'ইন দ্যা লাইট অফ ওয়াট উই নো' প্রকাশিত হলে নাদিয়া হোসেনের মতই বাঙ্গালী মহলে বেশ সমাদৃত হয় উঠেন। অনেকে তাকেও বাংলাদেশীদের জন্য অনুপ্রেরণা বলে দাবী করেন।কিন্তু সেই জিয়া হায়দার নিজের বাঙ্গালী পরিচয় নিয়ে কি ধারনা পোষণ করেন? কয়েক মাস আগে নিউ ইওর্ক টাইমস পত্রিকায় তার লেখা কলাম "ওহ, সো নাও আই এম বাংলাদেশী?' থেকেই সেটা বুঝা যায়। জিয়া হায়দার নিজেকে বাংলাদেশী মনে করেন না সেটা তার কলাম থেকে স্পষ্ট। তিনি সেখানে গর্ব করে বলেছেন তিনি বাংলা বলতে পারেন না, তিনি ছোটবেলা থেকে ব্রিটিশ টিভি শো দেখে দেখে ব্রিটিশ উচ্চারনে ইংরেজি বলা রপ্ত করেছেন। তার বিশাল আক্ষেপ, মানুষ এসবের পরেও তাকে বাংলাদেশী বলেই মনে করে, ব্রিটিশ নয়।

জিয়া হায়দারের নিজেকে ব্রিটিশ মনে করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। নাদিয়া হোসেনেরও বাংলাদেশে কি ডেজার্ট পাওয়া যায়, পনির আছে কি নাই, সেসব বিষয়ে অবগত না থাকার অধিকার আছে। কিন্তু একজন জিয়া হায়দার রহমান, একজন নাদিয়া হোসেন, এদেরকে আমরা বাঙ্গালীরা রোল মডেল বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি কেন? এনাদের প্রায় কারোরই বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই, বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেনও না, জানার আগ্রহও হয়তো নেই। এনারা যেই দেশে বড় হয়েছেন, যেই দেশের নাগরিক, এনারা সে দেশ, সেই সমাজেরই সৃষ্টি। জিয়া হায়দার/নাদিয়া হোসেন ব্রিটেনের অভিবাসী গোষ্ঠীর জন্য অনুপ্রেরণা অবশ্যই হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের কিভাবে? তবুও আমরা এনাদেরকে নিয়ে একটু অতিরিক্ত বেশীই মাতামাতি করি, যেটা আমার কাছে খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে হয়। নাদিয়া হোসেনকে নিয়ে আহ্লাদ না করে আমরা প্রয়াত, শ্রদ্ধেয় সিদ্দিকা কবির, অথবা আল্পনা হাবীবদের নিয়ে গর্ব করতে পারি। কিন্তু আমরা কেন জানি বিদেশে অবস্থিত মরীচিকার মাঝেই অনুপ্রেরণা খুঁজে ফিরি।

নাদিয়া হোসেন খুব শীঘ্রই বিবিসিতে একটি টিভি শো উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। দুই পর্বের এই শোতে তিনি নাকি বাংলাদেশী খাবারের ঐতিহ্য পরিবেশন করবেন। বোঝা যাচ্ছে তিনি এবং ইউকে মিডিয়া উভয়ই তার বাংলাদেশী পরিচয়কে সামনে তুলে ধরতে ইচ্ছুক। তাই যদি হয়ে থাকে, আমি আশা করবো এবার নাদিয়া বাংলাদেশী খাবারের গৌরবময় ঐতিহ্য এবং ইতিহাস নিয়ে একটু ভালো করে পড়াশোনা করে নিবেন। আপনি যখনই নিজেকে বাংলাদেশী সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে মনে করবেন, তখন সেই সংস্কৃতি, সেই ঐতিহ্যর বিষয়ে ভালোভাবে জেনে নেয়াটা আপনারই দায়িত্ব। না হলে 'বাংলাদেশীদের রোল মডেল' হিসেবে পরিচিত হয়ে যদি গার্ডিয়ানের সাক্ষাৎকারের মত আবারও চরম অজ্ঞতার পরিচয় দেন, তাহলে পরেরবার আর হাস্যকর নয়, রীতিমত লজ্জাজনক হবে জিনিসটা।

অবশ্য আমাদের 'বাঙ্গালী বংশদ্ভত কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়ে কিছুই না জানা বা কোন প্রকার টান-ছাড়া মানুষদেরকে নিয়ে আহেতুক গর্ব' করার বিরক্তিকর প্রবণতা থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য হয়তো এমন কিছু লজ্জা পাবার দরকার আছে। 'ব্রুটাল শক টু দ্যা সিস্টেম' না পেলে তো আবার আমরা কোন শিক্ষা নিতে চাই না সহজে!


মন্তব্য

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হাহাহা... নাদিয়া হোসাইনের খবরটা শুইনা প্রথমেই জিয়া হায়দার রহমানের ঠিক ঐ কলামটাই মনে পড়ছিল! অল সচল'স থিঙ্ক এলাইক! বিটিডব্লিও, এর চাইতে ফুয়াদ পুলাটাই ভাল, ডাইরেক্ট কথা কয়! চাল্লু

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

ইয়ামেন এর ছবি

সত্যানন্দ-দা আমারে জিগাইলে কমু জিয়া হায়দারও নাদিয়ার থেকে ভালো, অন্তত সাফ কলাম লিক্ষা কইয়া দিছে তার বাংলাদেশী হিসেবে পরিচিতি পাবার কোন ইচ্ছাই নাই। হাসি
পড়ার জন্য আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

মন মাঝি এর ছবি

আপনি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ওভার-রিয়্যাক্ট করছেন।

****************************************

হিমু এর ছবি

আপনি তো সচরাচর এমন ফালতু মন্তব্য করেন না।

মন মাঝি এর ছবি

কি করবো বলুন, আমার দূর্ভাগ্য আমি স্বর্গ থেকে স্ট্রেইট ধরাধামে অবতীর্ন কোনো ফেরেশ্‌তা-মেরেশ্‌তা বা মিঃ পার্ফেক্ট হয়ে জন্মলাভ করতে পারিনি, যে ২৪/৭ সর্বক্ষণ নিখুঁত জ্ঞানতু মন্তব্য করতে বা ফ্রেমে-বান্ধানোর মতো কথাবার্তা বলতে পারবো। নেহাতই দোষেগুণে, ভুলেভালে ভরা রক্তমাংসের আম পাব্লিক আমি, ২-৪ টা ভুলভাল বা ফালতু মন্তব্য করা তো আমার জন্মগত অধিকার! আমার মানবাধিকার! এইটুকুও আপনারা আমাকে দিবেন না?!!! মন খারাপ মন খারাপ

সে যাজ্ঞে, আমার মর্ত্যবাসী বুদ্ধিতে স্পিসিফিকালি এই সামান্য মন্তব্যটা আপনার হঠাৎ করে কেন এত ফালতু মনে হলো এখনও ঠিক ভাও করে উঠতে পারছি না। মাথাটা ভন্‌ভন্‌ করতেছে। আমার মানবোচিত ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে একটু বুঝিয়ে বলে আমার জ্ঞানচক্ষু উম্মীলণে একটু সাহায্য করবেন প্লিজ? কেয়ার টু এনলাইটেন মি?
........................................................

ও হ্যাঁ, মূল পোস্টটা পড়তে গিয়ে এই লেখাটার কথা মনে পড়ছিল বারবার, আপনিও পড়ে দেখতে পারেন (১ম ৫টা অনুচ্ছেদ)। ওম্‌ শান্তি! হাসি

****************************************

হিমু এর ছবি

ফালতু মন্তব্যের সমস্যা এটাই, পরে অনেক কিছু টাইপ করতে হয়।

মন মাঝি এর ছবি

হতে পারে। তবে কোনো অসুবিধা নাই, আপনি চাইলে আমি গোটা রবীন্দ্র রচনাবলী নামিয়ে দিতে পারি। আমি আমার মন্তব্য না (ঐ ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত!), আসলে আপনারটার কথা চিন্তা করেই লিখেছি। আমার স্টাইলটা একটু ভিন্ন এই যা! ওম শান্তি! হাসি

****************************************

শেহাব এর ছবি

চলুক

ইয়ামেন এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

হাসিব এর ছবি

সমস্যা আমি যেটা দেখলাম সেটা হল নাদিয়ারে জোর করে আমাদের কেউ এইটা ভাবছে কেউ। আদতে সে ব্রিটিশ। বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা আবছা। তার সফলতা আমাদের সফলতা ভেবে আনন্দিতরাই বেশি দুঃখিত তার এই অজ্ঞতাপ্রসূত আলাপে।

ইয়ামেন এর ছবি

হাসিব ভাই, সেটাই আসল সমস্যা। নাদিয়া বাংলাদেশে মিষ্টি/পনির আছে কি নাই সেটা না জানলেও আমার কিছু এসে যায় না, উনি ব্রিটিশ। উনি যে অবশ্যই ব্রিটিশ অভিবাসী গোষ্ঠীর জন্য অনুপ্রেরণা সেটা আমি বলেছি। কিন্তু উনাকে বাংলাদেশী রোল মডেল হিসেবে মাতামাতি করাতেই আমার ইস্যু। যে জন্য জিয়া হায়দারের উদহারনটাও দিয়েছি। বাংলাদেশের জন্য রোল মডেল হতে হলে একজন শেফ হয়ে বাংলাদেশের খাবারের ঐতিহ্য নিয়ে ধারনা থাকা উচিৎ, না থাকলে এমন ঢালাও মন্তব্য করা উচিৎ নয়। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় কথা হলো আমাদের নাদিয়া/জিয়া হায়দারদের নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করা।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

সোহেল ইমাম এর ছবি

ছোটবেলায় আশেপাশের বড়দের মুখে কখনওই বাঙ্গালীদের সম্পর্কে ভালো কিছু শুনিনি। তারা নিজেরা বাঙ্গালী হওয়া সত্ত্বেও এমন ভাবে বাঙ্গালী জাতিটাকেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন মনে হতো তারা বুঝি অন্য জাতের লোক। সেই মানসিকতা হয়তো এখনও কারো কারো মধ্যে থেকে গেছে আর সেই মন নিয়ে যখন দেখেন বিদেশে কোন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ব্যক্তি বিশাল কোন ঢাকঢোল বাজিয়ে ফেলেছেন তখন সেই ঢাকের তালেই নাচতে শুরু করে দেন। লোকটার রক্তে ছাড়া আর কোথাও বাঙ্গালীত্বের কিছু আছে কিনা, বাংলাদেশের প্রতি তার মনোভাবটা কি এসব না জেনেই অযথা গর্বিত হয়ে যান।
হ্যাঁ পড়তে পড়তেই জিয়া হায়দারের কথাই ভাবছিলাম। ওভার রিঅ্যাক্ট বলে মনে হয়নি, ইয়মেন ভাই আপনার সাথে একশো পারসেন্ট সহমত।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

ইয়ামেন এর ছবি

আমার লেখার পিছনের মূল উদ্দেশ্যটা বুঝতে পেড়েছেন ভাই। পড়ার জন্য অনেক আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

ইয়ামেন ভাই, নাদিয়া হোসেনের জীবনবৃত্তান্ত পড়ে দুই তিন মাস আগে বৌকে বলেছিলাম সে তো বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেই না, তার বাবা-মাও করে না। তারা যতটা বাংলাদেশি, তার থেকে বেশি আরবের সংস্কৃতিকে ধারণ করে। তাদের পোষাক থেকে শুরু করে মাটিতে বসে খাওয়া — এর কোনটাই আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না। কিন্তু আরবের সংস্কৃতির সাথে খুব যায়। আমি ধর্মপালনের বিপক্ষে নয়, কিন্তু সেটা নিজের সংস্কৃতিকে ছেড়ে কেন করতে হবে, তা আমার মাথায় ঢোকে না। আফসোস, বাংলাদেশেও এখন এমন প্রচুর পরিবার গড়ে উঠেছে। কিছুদিন পর ঐ পরিবারের ছেলেমেয়েরা নিজের দেশে বসেই দেশের সংস্কৃতিকে চিনবে না।

ইয়ামেন এর ছবি

নিয়াজ ভাই, মাটিতে বসে খাওয়া আমাদের দেশের গ্রাম-বাংলাতেও চলে, তাই সেটা নিয়ে আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। কিন্তু বাকি যা বলেছেন, তার সবকিছুর সাথে একমত।
অনেকে দেখছি এটাকে এখন ক্লাস ওয়ার বানিয়ে ফেলছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে, যে শুধু শিক্ষিত মদ্ধ্য-উচ্চমদ্ধ্যবিত্তরাই নাদিয়াকে নিয়ে সমালোচনা করছেন, কারন সে নাকি ওয়ার্কিং ক্লাসকে রেপ্রিজেন্ট করা সহজ সরল মেয়ে। কি আর বলবো। হাসি

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

ইয়ামেন ভাই, গ্রামের বসে খাবার বিষয়টা আমিও জানি এমন কি গ্রামে গেলে নিজেই বসে খাই। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টা সম্পূণর্ ভিন্ন। যারা ওয়ার্কিং ক্লাসের কথা বলছে, তারাও বুঝতে পারছে না। এর জন্যে ইস্ট লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলে ঘণ্টাখানেক খাবারের দোকানগুলোতে বসে থাকতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে ওখানে বসবাস করা অধিকাংশ বাংলাদেশি বাবা-মার ছেলেমেয়েরা কীভাবে বড় হচ্ছে বা তাদের কীভাবে বড় করা হচ্ছে। গত শুক্রবারই হোয়াইট চ্যাপেলের একটা দোকানে বসে পরিস্থিতি লাইভ দেখতে দেখতে বৌ-এর সাথে ঠিক এ বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। অন্যকোন দিন ক্লোডজ প্লাটফর্মে বিস্তারিত বলবো। হাসি

সত্যান্বেষী এর ছবি

এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখুন প্লীজ। কোন ক্লোজড প্লাটফর্মে নয়।

ইয়ামেন এর ছবি

নিয়াজ ভাই, এইটা নিয়ে ছদ্মনামে হলেও একটা লেখা আসা উচিৎ।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

মুদ্রা সংগ্রাহক  এর ছবি

লেখার মূলভাবের সাথে সম্পূর্ণ একমত

চীজ নিয়ে বক্তব্যটা হয়ত অনেকাংশে সত্য। পনির খাবার প্রচলন খুব কম বাংলাদেশীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্য শহরের কথা ছেড়েই দিলাম খোদ ঢাকাতেও পনির খুব সহজলভ্য নয়। কিছু বিশেষ বিশেষ জায়গায় শুধু দেখা পাওয়া যায়। বাংলাদেশী যাঁরা পনির খান তারাও ঠিক নিয়মিত খাবার হিসেবে পনিরকে গ্রহণ করেন নি। অন্যদিকে যেসব দেশে চীজ খাওয়ার চল রয়েছে সেসব দেশে কমবেশী সব গ্রোসারী স্টোরেই চীজ পাওয়া যায় এবং তা বেশীরভাগ মানুষের দৈনন্দিন খাবারের অংশ।

ইয়ামেন এর ছবি

আসলে পনিরের বিষয়টা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। ছোটবেলা থেকে দেখেছি পনির নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে ঢাকার রাস্তার পাশেও বিক্রি করতে। ঢাকাই পনির অনেক নামকরা। আমার বউ ফেনিতে গ্রামের বাড়িতে নিমকি খেতো, সেখানেও পনিরের পুড় দেয়া হতো। ইন ফ্যাক্ট, পনিরের পুড় দেয়া নিমকি তো বেশীর ভাগ সময় মিলাদের মিস্টির প্যাকেটে করেও দেয়া হতো।
আমি মানছি নাদিয়া হোসেন যে বাংলাদেশকে ছোটবেলায় বেড়াতে এসে দেখেছেন, সেই পরিবেশে পনির হয়তো ছিল না। কিন্তু উনি গার্ডিয়ানে যদি বাংলাদেশের কুইজিন নিয়ে কোন মন্তব্য করবেন, তাহলে বাংলাদেশী খাবারের বিষয়ে অন্তত কিছুটা জেনেশুনে করাই উচিত। অন্তত 'বাংলাদেশে নেই' এমন ঢালাও মন্তব্য না করে 'আমি যেই পরিবেশে বড় হয়েছি, দেখেছি, সেখানে ছিল না' বললেও কথাটা সঠিক হতো।
অবশ্য ইন দি এন্ড, নাদিয়া হোসেন একটা উদহারন মাত্র। উনি না হলে অন্য কাউকে নিয়ে আমরা বাঙ্গালিরা মাতামাতি করতাম, সেই ব্যক্তি আমাদের মাতামাতি ডিজার্ভ করুক আর না করুক।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

হাসিব এর ছবি

একটা সম্ভাবনা আছে পনীর তুর্কিদের হাত ধরে আসা। তুর্কি ভাষায় এটা peynir।

ইয়ামেন এর ছবি

হাসিব-ভাই, পনির পর্তুগীজরা বঙ্গে এনেছে, যদ্দুর জানি।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

হাসিব এর ছবি

পর্তুগিজেরা সেদিন এসেছে। তুর্কিরা তার কয়েকশ বছর আগে এসেছে।

সত্যপীর এর ছবি

পনির নামটা তুর্কি/পারসীকদের হাত ধরে আসা, কিন্তু ঢাকাই পনির তুর্কি তরিকার না। ঢাকাই (এবং ব্যান্ডেল) পনিরের পর্তুগীজ কানেকশন শক্ত। দুধ জ্বাল দেয়ার পর লেম্বুজুস ঢেলে "ছানা" করার টেকনিক পর্তুগিজ। তুর্কি পনির দুধ কাটার জন্য লেবুর রসের বদলে "রেনেট" (বাংলা জানি না) দেয়।

..................................................................
#Banshibir.

হাসিব এর ছবি

ছানা যদি পর্তুগিজ হয় তাহলে বৈদিক যুগে মিষ্টান্ন কী দিয়ে বানাতো?

সত্যপীর এর ছবি

সর দিয়ে। চৈতন্যের বর্ণনার দুগ্ধ-লক্ষী (রাবড়ি), সরভাজা এবং সরপোয়া সর দিয়ে বানানো। দুধ জ্বাল দিয়ে সর বানায়। সর ঘি দিয়ে ভেজে হয় সরভাজা। সন্দেশ হিসাবে যার বর্ণনা আছে তা খোয়া ক্ষীর। নো লেবুর রস বিজনেস।

এইখানে পৃষ্ঠা ৫২ এর শেষ প্যারা থেকে নিয়া পরের পাতা দেখতে পারেন

..................................................................
#Banshibir.

ইয়াসিন এর ছবি

জাম্বুরা সাইজ এর পনির বাইতুল মোকারম মসজিদের সামনে পাওয়া যেত কিন্তু বিক্রি হতো কম । পনির বানানোর প্রাকৃতিক পরিবেশ নেই

অতিথি লেখক এর ছবি

ডেজার্ট বিষয়ক মন্তব্যটা অবাক করা, বাকি কথাগুলোয় একভাবে ভেবে দেখলে আপত্তির কিছু দেখিনা। নাদিয়া আলীকে নিয়ে এই প্রথম কোনোলেখা পুরো পড়লাম, এটুকুতেও বুঝতে পারছি যে দেশী খাবারদাবার নিয়ে তার কোনোরকম ট্রেনিং নেই, পুরোটাই তার ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক খাবার টেবিলের অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সো এই স্মৃতিচারণ তার মনে "বাংলাদেশ"এ কী দেখেছেন, সেটার কথাই উঠে এসেছে। আর আরেকটা সম্ভাবনা আছে, ডেজার্ট বলতে কোনো কারণে উনি শুধু "বেক করা" ডেজার্টই বুঝিয়েছেন, যেমন কেক। কারণ ডেজার্টের কথার সাথেই ওভেনের কথা বলেছেন যে উনাদের ওভেন একেবারেই অব্যাবহৃত ছিল। চীজের ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারি, কারণ আমেরিকা/ব্রিটেনের সবচেয়ে "সস্তার সস্তা" গ্রোসারিতেও কমসেকম ৮ রকমের চীজ থাকে, বাংলাদেশে এক জেনারেশন আগে এমনকি ঢাকা শহরের লোকেরাও একটাই চীজ খেত, তাও মাঝে-মধ্যে।

বিবিসিতে নাদিয়া যে শো করতে যাচ্ছেন, সেটা নিয়ে আপনার এক লাইনের মন্তব্যটা যে অর্থ দিচ্ছে, নিউজ ঘেঁটে মনে হচ্ছে সেটা পুরা ঠিক নয়। আপনি বলছেন , নদিয়া "বাংলাদেশী খাবারের ঐতিহ্য পরিবেশন করবেন", আর খবরে পড়ছি যে এটা হবে মূলত "ট্রাভেল কুকিং শো, লুটন থেকে বাংলাদেশে তার গ্রাম পর্যন্ত যাবেন, তার প্রিয় দেশী খাবার রান্না করবেন, বন্ধু-বান্ধবদের খাওয়াবেন, নতুন রেসিপি শিখবেন, এবং বাংলদেশে তার দেখে আসা ১০ বছর আগের খাবারের সাথে এখন কী পার্থক্য, সেটা দেখবেন"। বলা যায় পুরোটাই নাদিয়ার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান।

----কৌতুহলি

ইয়ামেন এর ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ। তবে আমার মতে, উনার কথার যদি এত চিন্তা করে অর্থ বের করতে হয়, তাহলে তো বলতে হবে উনার সাক্ষাৎকার পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। আমরা বাঙ্গালীদেরই যদি এত চিন্তা করে বের করতে হয় 'এতে আপত্তিকর কিছু আছে কি নেই', সেখান একজন বিদেশী যে বাংলাদেশী সম্পর্কে কিছুই জানেন না, তিনি তো পড়ে বাংলাদেশকে নিয়ে একেবারেই ভুল একটা চিত্র পাবেন। উনি তো আর 'নাদিয়ার ব্যক্তগত অভিজ্ঞতা' বলে ধরে নিবেন না, নাদিয়া যখন বলেন 'বাংলাদেশে পনির/ডেজার্ট নেই' উনি মনে করবেন বাংলাদেশে একেবারেই নাই, যেটা সঠিক নয়। উনি যেহেতু এখন 'বাংলাদেশের জন্য আইকন বা রোল মডেল' হিসেবে কিছুটা পরিচিতি, তখন উনার বাংলাদেশ নিয়ে আরও বেশী জানা শুরু করা উচিত। হাসি

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

হাসিব এর ছবি

বাঙালিরাই তাকে রোল মডেল বানিয়েছে। এখন পড়ালেখার দায়িত্বটা তাকে নিতে হবে কেন? আমরা কেন সে কী করবে সেটা নির্ধারণ করে দিতে চাচ্ছি?

ইয়ামেন এর ছবি

হাসিব-ভাই। রোল মডেল বানিয়েছে বাঙ্গালীরা। কিন্তু উনিও সেই রোল মডেল হবার দায়িত্ব খুশিমনে নিয়ে নিয়েছেন। তাহলে এখন একটু পড়াশোনা করলে ক্ষতি কোথায়? হাসি

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

হাসিব এর ছবি

রোল মডেলের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় খুশিমনে কীভাবে নেয়?

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হাসিব ভাই,

১। এভাবে: "......When I went into Bake Off I never imagined I’d come out the other end elevated and a role model – for Bangladeshis, bakers, Muslims, women and all; I didn’t expect any of it. If I am a role model, in a positive manner for anyone, I’m very happy to bear the burden......" দেঁতো হাসি

২। আর মিডিয়া কবলিত বাঙ্গালী যে ভুল মানুষকে রোল মডেল বানিয়েছে কিংবা এখন থুক্কু দিয়ে রোল মডেলত্ব প্রত্যাহার করা যেতে পারে- এই কথা বলার জন্যও তো এই পোস্টের দরকার আছে। হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

মিতা চার্বাক এর ছবি

হাসিব সাহেব, কোন মানুষকেই কেউ কোন কিছু নির্ধারণ করে দেয়ার অধিকার রাখেনা । আর এখানে নাদিয়া হোসেনকেও কোন কিছু চাপিয়ে দেবার পক্ষপাতিত্ব করা হচ্চে না । তবে কি জানেন, যদি কেউ কোন দেশের সংস্কৃতি তুলে ধরতে চায়, সেক্ষেত্রে ভুল ভাবে আগানো কি উচিত ? যেহেতু, তিনি বিষয়টা সমন্ধে অবগত না, যেহেতু তাঁর মাবাবা এ ব্যাপারে কিছু বলেনি হয়তো, কিংবা কোন কারনে তার মিসটেক হয়ে গেছে, তাই পড়াশুনার ব্যাপারটা বারবার আসতেছে । নরমালি আমি যদি তিমিমাছ কিংবা পাকুড়গাছ সমন্ধে কোন আর্টিকেল লিখতে যাই, তবে কি আমি লেখার আগে পড়াশুনা করব না ? নিশ্চয় করব । কিংবা কোন অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে জানার চেষ্টা করব, এটাও তো এক ধরনের পড়াশুনা, তাইনা ? ব্যাপারটা তেমনেই ।

দেবদ্যুতি এর ছবি

চলুক

...............................................................
“আকাশে তো আমি রাখি নাই মোর উড়িবার ইতিহাস”

মাহবুব লীলেন এর ছবি

বাঙালি সমাজে ভাত খাওনের পর পান-তামুক খাওয়ার রেওয়াজ আছে; অন্তত সেইটাও তো কইতে পারত

ইয়ামেন এর ছবি

লীলেন-দা, আপসুস। মন খারাপ

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

ধ্রুব আলম এর ছবি

১। বিদেশে বসে মুসলিম বাঙালি বাপ-মার প্রধাণতম কাজ হচ্ছে, পোলাপানরে উত্তম মুসলমান বানানো। এ বিষয়ক হুমায়ন আজাদের আমেরিকায় অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা লেখা বা সাক্ষাৎকার আছে। ইউরোপেও আমি তাই-ই দেখেছি। নাদিয়া যতটা না বাংলাদেশি বা বাঙালি, তার থেকে ঢের বেশি পাকি-আরব-মুসলমান। বাঙালি কমিউনিটির সবচেয়ে বেশি খাতিরটা থাকে পাকিদের সাথে, একসাথে নামাজ রোজা করে, হালাল মিট খুজে, তারপরে খেয়ে দেয়ে, বোতল হাতে হিন্দি সিনেমা দেখতে বসে। নাদিয়া এদের বাই প্রডাক্ট, তার থেকে বাঙ্গালিয়ানা আশা করাই একটা অপরাধ; তাকে বরং ব্রিটিশ মুসলিম নামক একটি অদ্ভূত প্রজাতির সদস্য বলে গণ্য করা যায়। আমারা হীনমণ্যতাবশত তাকে বাঙালি বানাই, আমাদের যেকোন খাতে সাফল্য এতই কম।

২। ঢাকাই পনির মনে হয় মোঘল আমলের ঐতিহ্য, এমন পনির আমি আর কোথাও পাই নি। বাইরে একবার নিয়ে গিয়েছিলাম, পনির আমার অতি প্রিয় বলে। বন্ধুদের খাওয়ানোর পরে তারা পনিরে মুগ্ধ হয়েছিলো, পরে এক ব্রাজিলিয়ান বন্ধু ব্রাজিল থেকে (সাও পাওলো) পনির এনে খাইয়েছিলো। সেটিও অনন্য, আর কোথাও পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। সে থেকে আমার ধারণা হয়েছে, প্রতিটি দেশই হয়তো তাদের নিজেদের মত করে পনির বানায়। কেউ কেউ হয়তো নিজেরাই আবিষ্কার করেছে প্রণালী, আর কোথাও হয়তো বাইরে থেকে এসেছে (যেমনটি ধারণা করছি ঢাকায়)। বাইরে থেকে আসলেও পনিরের চল কম করে ২০০ বছর, যদি ধরি ইউরোপিয়ানরা এনেছিলো, আর মোঘলরা আনলে ৪০০ বছর। ঢাকাই পনির আমার দাদা-নানার আমল থেকেই পুরান ঢাকায় জনপ্রিয়, ঢাকার আশেপাশেও যে সেটা যায়নি, তা কিভাবে বলা যায়? নইলে নিমকির ভেতরে ঢুকলো কিভাবে?

৩। রসগোল্লা মোটামুটি বাঙ্গালির আবিষ্কার বলা যেতে পারে, বাঙালি তো জন্ম-জন্মান্তর ধরে সাদা মিষ্টি খেয়ে আসছে। এরপরে মোঘল-পাঠানরা এনেছে হালুয়া-শরবত আর হরেকরকমের মিঠাই। এখন বলা যেতে অধিকাংশই ছিলো ঢাকাকেন্দ্রিক, তাই বলে বাঙালি যে চিনতো না, তা বলা যাবে না। বিশেষ করে পাকিস্তান আমল থেকে তো কিছুই আর "ঢাকায় হয়, কিন্তু বাইরে হয় না", এমন অবস্থা ছিলো না।

আর এর বাইরেও, গুড় জিনিশটা যদি মিষ্টি না বা স্ন্যাকস না হয় তাহলে কি? বা তাল মিছরি? আমার বড়-আম্মা রাস্তা থেকে 'কিছুমিছু খেয়ে নিস' বলতে গুড়-মুডিই বুঝাতেন।

কিংবা আমার দাদা ভাত খেয়ে এককালে দুধের সরে চিনি দিয়ে খেতেন, বা ছানায় চিনি মিশিয়ে। দুধ-কলা-মুডি বা কাঠাল-দুধ দিয়ে মুড়ি বিক্রমপুরের লোকজন বহুকাল ধরে খেয়ে আসছে। এগুলো যে কখনো কখনো লাঞ্চ বা ডিনার হতো না তা বলছি না, কিন্তু বিকাল বা সন্ধ্যার খাবার হিসেবেই আমি খেতে দেখেছি। (দুধের সর বা ছানা তো আর বাটি ভরে কেউ খায় না, অল্পই খায়)।

ইয়ামেন এর ছবি

মুসলমান অ্যাঙ্গেলটা আমার মাথায় ছিল। আমি ইচ্ছা করেই সেই প্রসঙ্গ তুলিনি। কারন সেটা আনলে আর অন্য কিছু বাদ দিয়ে বেশীরভাগ মানুষ সেটা নিয়েই পড়ে থাকতো, আমাদের দেশের মানুষের বর্তমান হালচাল তুমি ভালো করেই জানো, আমার খুলে কিছু বলা লাগবে না। তাই সেদিকে আর ইচ্ছা করেই কথা বাড়াতে চাইনি। কারন নাদিয়া হোসেন আর তার পরিবারের 'মুমিনত্ব' নিয়ে কথা না তুলেও তার অজ্ঞতা এবং আমাদের বিদেশে বড় হওয়া বাঙ্গালীদের নিয়ে উদ্ভট ফ্যাসিনেশন নিয়ে আলোচনা করা যায়। তাই করতে চেয়েছি আর কি! দেঁতো হাসি

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

Emran  এর ছবি

নাদিয়া হোসেন সারা জীবন ব্রিটেনে থেকেও পশ্চিমা বেলেল্লাপনায় গা ভাসিয়ে দেননি; বরং ইসলামী ঈমান-আকীদা-তাহজীব-তমদ্দুন ধরে রেখেছেন - এটাও কি তাকে রোল মডেল বানানোর একটা প্রচ্ছন্ন কারণ হতে পারে না? চিন্তিত

সত্যপীর এর ছবি

বাইরে থেকে আসলেও পনিরের চল কম করে ২০০ বছর, যদি ধরি ইউরোপিয়ানরা এনেছিলো, আর মোঘলরা আনলে ৪০০ বছর।

দুধ টকিয়ে পনীর বানানোর কায়দা পর্তুগীজেরা বাংলায় এনেছিল, সেই হিসাবে ইয়োরোপীয়ানদের হাত ধরে সাড়ে তিনশ বছর। এর আগে দুধ দই করার সময় ভারতে টক (অ্যাসিডিক) কিছু দেয়া হত না।

..................................................................
#Banshibir.

সত্যপীর এর ছবি

পরে এক ব্রাজিলিয়ান বন্ধু ব্রাজিল থেকে (সাও পাওলো) পনির এনে খাইয়েছিলো

এইটা একটা চমৎকার ব্যাপার। সাড়ে তিনশ/চারশ বছর আগে লিসবন থেকে দুই দিকে ছেড়ে যাওয়া দুইটা জাহাজের দুই পর্তুগীজ দুনিয়ার বিচ্ছিন্ন দুই প্রান্তে আপনার পুর্বপুরুষ এবং আপনার বন্ধুর পূর্বপুরুষকে একইভাবে টক পনীর বানানোর কায়দা শিখিয়েছিল। চমৎকার!

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

পালতোলা জাহাজের যুগে বাণিজ্যবায়ু এমনভাবে কাজে লাগানো হতো যে পর্তুগাল থেকে ভারতে আসতে চাইলেও আগে ব্রাজিলে বুড়ি ছুঁয়ে আসতে হতো।

সত্যপীর এর ছবি

তাইলে আরো ভালো। একই জাহাজের আগেপরে দুই স্টপে নেমে যাওয়া দুইজন পর্তুগীজের শিখায় দেওয়া টক পনিরের গল্প।

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

নাদিয়া হোসেনকে না জানার জন্য দোষ দিবনা; কিন্তু যে কোন দেশ সম্পর্কে কিছু বলতে বা লেখতে গেলে অবশ্যই কিছু পড়াশুনা করা উচিত, এটা আসলে কমনসেন্স’র ব্যাপার । তবে আশার কথা এই যে, নাদিয়া হোসেনকে নিয়ে অনেক কড়া সমালোচনাও চোখে পড়ল ।

মিতা চার্বাক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA